বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি

Facebook Twitter Email

ঠিক এক মনে নেই, বোধ হয় ১৯৫৫ ইংরেজি সালে, অর্থাৎ আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, আপনাদের এই সম্মেলনের লখনৌ অধিবেশনে আপনারা আমাকে মূল, অর্থাৎ সাধারণ সভাপতির আসনে আহ্বান করেছিলেন। আমার সাধ্যানুযায়ী সে-আহ্বানে আমি সাড়া দিয়েছিলাম শুধু নয়, আপনাদের কর্মপ্রকরণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম, সাগ্রহে, সানন্দে।  আজ পঁচিশ বছর পর, যখন আমি প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই করছি, যখন-

 

যত কিছু ছিল কাজ, সাঙ্গ তো করেছি আজ, দীর্ঘ দিনমান … (যখন)

পরপারে উত্তরিতে পা দিয়েছি তরণীতে …

তখন আবার আমাকে আপনারা আহ্বান করেছেন সেই একই সম্মানের সিংহাসনে। আমার সনির্বন্ধ আপত্তিতে আপনারা কর্ণপাত করলেন না!

 

এই পঁচিশ বছরে, বৃহত্তর পৃথিবীর কথা না হয় বাদই দিলাম, শুধু মাত্র বঙ্গভাষাভাষী, বঙ্গসংস্কৃতিপুষ্ট প্রায় বার তের কোটি হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জনসাধারণের সামগ্রিক জীবনে মস্ত একটা ওলোটপালট ঘটে গেল, মনে হয় যেন জীবনের মানচিত্রটাই গেল বুঝি বদলে। রাষ্ট্রীয় ও অর্থনীতিক অদল বদলের কথা তত বলছি নে যেহেতু সে-সব কথা তো আপনারা প্রত্যহ পড়ছেন খবরের কাগজের পাতায়, শুনছেন নেতাদের বক্তৃতা ও বিবৃতিতে। আমার চিত্ত ও চেতনায় যে ভাবনা সক্রিয় তা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়ে। এই জীবনের মানচিত্রে কত সীমা ও সীমান্ত রেখার, কত রঙ ও কত উচ্চাবচ ভূমিবিন্যাসের, কত নদনদী খালবিখালের অদল বদল যে হল এবং হচ্ছে, আজও তার জরিপ হয়ত হয় নি। কিন্তু একটি তথ্য তো সূর্যালোর মতো স্পষ্ট, এবং তা হচ্ছে এই যে, এই পঁচিশ বছরে একটি নতুন বঙ্গ ভাষাভাষী মানব বংশ সাবালক হয়ে উঠেছে শুধু নয়, পরিণত বোধ ও বুদ্ধি নিয়ে তারা পৃথিবী ও পৃথিবীর মানব সমাজকে দেখছে, দেখছে নতুন এক দৃষ্টিতে, যে-দৃষ্টির সঙ্গে আমার আপনার স্পষ্ট পরিচয় নেই। যে-সব বিশ্বাস, আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর বিগত দেড়শ-দুশ বছরের বঙ্গভাষাভাষী মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছিলাম এবং যা ছিল আমাদের আবাস ও আশ্রয়, সে-সব বিশ্বাস, আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর এই নতুন মানব বংশের কিছুমাত্র নির্ভরতা নেই, থাকলেও যতটুকু আছে তা অত্যন্ত শিথিলমূল। অতীত ও পরম্পরার সঙ্গে আমার আপনার যে আত্মীয়তা সে-আত্মীয়তার গভীর কোনো অনুভূতি আজকের সচেতন বুদ্ধিদীপ্ত নব যৌবনের মধ্যেও নেই। এ কোনো ব্যক্তিগত ভালমন্দ লাগার, ব্যক্তিগত রুচির কথা নয়, নৈর্ব্যক্তিক একটি ধারণার বিনীত স্বীকৃতি মাত্র।

 

আমাকে সভাপতি নির্বাচনের মধ্যে পঁচিশ বছরের এই পরিবর্তনের ও আমার এ ধারণার স্বীকৃতি নেই। এ-ই ছিল আমার আপত্তির প্রধান কারণ। আমি চেয়েছিলাম, এমন কাউকে আপনার এ-সম্মানে আহ্বান করুন যিনি আজকের এই নতুন যৌবনের মুখের কথা বুকের কথাকে ভাষা দিতে পারবেন, তাঁদের জীবন-যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করতে পারবেন, তাঁরা কি চাইছেন, কীসের স্বপ্ন দেখছেন তা মূর্ত করে তুলতে পারবেন। তা হল না।

আমার আপত্তির আরও একটু কারণ ছিল।

 

পঁচিশ বছর আগে লখনৌতে যখন আপনারা আমাকে এই আসনে আহ্বান করেছিলেন স্বাধীনতা লাভের পর তখনও এক দশক অতিক্রান্ত হয় নি। তখনও উদ্বাস্তু, উৎক্ষিপ্ত, উন্মথিত বাঙালি কঠোর নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সম্মুখীন হয়েও বাঁচবার দুর্মর সংকল্পে দৃঢ়। বাঙালির সেই মূর্তি তখন আমার চোখে দীপ্যমান ছিল; সেই দীপের জ্যোতিতে আমি আপনাদের আশার বাণী শুনিয়েছিলাম, আমার নিজের ও আমার শ্রোতাদের চিত্ত ও চেতনায় নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঞ্চার করতে প্রয়াস করেছিলাম।

 

এরপর আরও দু-এক বৎসর বাঙালি জীবনের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হয়েছিল, বোধ হয় আমি খুব ভুল করি নি!

 

তারপর দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে কি যেন কি হওয়া শুরু হয়ে গেল। সমস্ত বাঙালি জীবন ও তার সযতœ-লালিত সংস্কৃতি দেখতে দেখতে রাজনৈতিক দাবাখেলার গুটি হয়ে গেল, এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল ও দলপতিরা চতুরঙ্গ বল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই খেলায়। সেই খেলাই চলছে গত পঁচিশ বছর ধরে, এবং তারই ফলে আজ সমস্ত বাঙালি জীবন ও সমাজ প্রায় তছনছ হয়ে যেতে বসেছে। ভাষা ও ভাষাশিক্ষা, কবি ও লেখক, চিত্রকর ও নাট্যকার অধ্যাপক ও গবেষক, ব্যবসায়ী ও দালাল, জোতদার ও বর্গাদার, ভাগচাষী ও ভূমিহীন শ্রমিক, স্কুল কলেজ য়ূনিভার্সিটি দেখতে দেখতে সবই হয়ে গেল রাজনৈতিক পণ্য; কে কী দরে বিক্রীত হবেন যে-নীলামের বাজারে সেই বাজারের নামই তো হচ্ছে গণতান্ত্রিক নির্বাচন কেন্দ্র, পঞ্চায়েৎ থেকে পার্লামেন্ট পর্যন্ত। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও মন্ত্রীর শুধু নয়, তাঁর দপ্তরের বড় কেরানিদের টেলিফোনাহ্বানে উর্দ্ধাশ্বাসে ছুটে যান মন্ত্রালয়ে। সমাজের ও সংস্কৃতির অবস্থা যখন এই স্তরে এসে নামে, তখন চিত্ত অসাড় হয়, বুদ্ধি স্তব্ধ হয়, জীবন বিস্বাদ লাগে, এবং বলতে ভয় হয়, মানুষের উপর বিশ্বাসও বুঝি হারিয়ে যেতে চায়! 

 

কিন্তু আমি ইতিহাসের ছাত্র; বহু মানব সমাজ ও সংস্কৃতির উত্থান পতনের ইতিহাস আমার অজানা নয়! অজানা নয় যে, মানুষের ইতিহাসে, যে কোনো মানব সমাজের, বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাসের দেশে, পঁচিশ বছর পঞ্চাশ বছর একশ বছর নিরবচ্ছিন্ন কাল সমুদ্রে ছোট বড় জলবিন্দু মাত্র। আজ যা আমার চিত্ত ও চেতনাকে ব্যথাতুর করছে, শতাব্দীর ইতিহাসে কাল বা পরশু তা না-ও থাকতে পারে। ‘ক্ষতি যত ক্ষত যত/ মিছে সব হতে মিছে। নিমেষের কুশাঙ্কুর/ পড়ে রবে নীচে’ তা ছাড়া, আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ে মানুষ; তিনি বলেছেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। এই মহাভারতীয় আপ্তবাক্যে আমি বিশ্বাসী।

 

সুতরাং, বাঙালি, বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির ভবিষ্যতে আমার বিশ্বাস অটুট; তা যদি না হবে তা হলে আামি বাঁচব কী নিয়ে, কোন পরিচয়, মানসাশ্রয় পাব কোথায়! বাংলা ভাষা যে আমার প্রাণের নিশ্বাস, জীবনের আশ্বাস।

কিন্তু যত অটুট, যত গভীরই থাকুক আমার বিশ্বাস, বাঙালির ইতিহাস ও বাঙালি সমাজের নিষ্ঠাবান ছাত্র হয়েও চলমান বাঙালি জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে কোনো অর্থবহ সামগ্রিক বিশ্লেষণ, তার অদূর বা সুুদূর ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট রেখাচিত্র আজ আপনাদের সামনে আমি উপস্থিত করতে পারছি নে। আমার এ অক্ষমতা আমি অকপটে স্বীকার করছি। বিগত দু-এক বছরের ভেতর বাঙালি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির সংকট সম্বন্ধে নানা আলোচনা-বিশ্লেষণ এদিক-সেদিকে আমি করেছি, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায়ই। কিন্তু সে-সমস্তই অতীত রোমন্থন, বুদ্ধিজীবীর আত্মানুসন্ধান। তা থেকে ভবিষ্যতের দিশা যে খুব কিছু পাওয়া যায়, এমন মনে হয় না, শুধু এইটুকু ছাড়া যে, উনিশ ও বিশ শতকে বঙ্গভাষাভাষী জনের মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে বুর্জোয়া নগরনির্ভর ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন তার পরিধি যত সীমিত ও অগভীরই হোক, তাকে একেবারে নস্যাৎ করা, এমনকি অবজ্ঞা করাও হবে মূর্খতারই নামান্তর। সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব যাঁরা ঘটিয়েছেন আমাদের কালে, সেই মার্কস- এঙ্গেলস-লেনিনও তা কখনও করেন নি; এমন কি স্ট্যালিনও নন। এরা কেউই বুর্জোয়া সংস্কৃতির, এমন কি মানব সংস্কৃতির কোনো সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারকেই অস্বীকার করেন নি, অবজ্ঞা দূরে থাক। আর, মাও-জে-ডঙ-তাঁর কালচারেল রেভেল্যুশন করতে গিয়ে যে বিভ্রান্তি ঘটিয়েছিলেন তা আর আজ কারু অজানা নয়।

 

সে যাই হোক, এবার আপনাদের অনুগ্রহের দান এই সম্মানের আসন থেকে গভীর সুরে কোনো গভীর কথা শুনাতে আসিনি; যত সাধই থাকুক সাধ্যে তা কুলোবে না। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, যা নিয়ে আপনাদের এই সম্মেলন তা একান্তভাবে সমাজনির্ভর, সমাজই তার একান্ত আশ্রয়, এবং সেই সমাজে রাজনীতি, অর্থনীতি সমস্তই অঙ্গাঙ্গী জড়িত। আমি এ-ও বিশ্বাস করি, যে-কোনো যুগের সাহিত্যে, শিল্পে ও সামগ্রিক সংস্কৃতিতে সমসাময়িক যুগের প্রতিচ্ছবি প্রতিভাত ও প্রতিফলিত হয়; কী ভাবে ও রূপে তা হবে তা একান্তই নির্ভর করে কবি, লেখক ও শিল্পীর বুদ্ধির দীপ্তি, বোধির প্রজ্ঞা, চিত্র ও চেতনার তীক্ষ্মতা, সংবেদনশীলতা, সহমর্মিতা ও সামগ্রিক জীবনবোধের উপর।

শুধু এই যুক্তির উপর নির্ভর করেই আমাদের সামগ্রিক জীবন ও সমাজ এবং সেই জীবন ও সমাজনির্ভর যে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তার কথা একটু বলে নিলাম। তা না হলে নিরঙ্কুশ শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদির কথা বলার কোনো অর্থ হয় না।

 

 

একটু আগে বলেছি, আপনাদের আজ আমি আশা ও উদ্দীপনার বাণী শুনাতে পারবো না; কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে আমরা হতাশায় ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকব। বরং নতুন করে আবার স্বপ্ন দেখব, নতুন করে পুরাতন সংকল্প-মন্ত্র উচ্চারণ করব-

‘এ মৃত্যু ছেদিতে হবে, এই ভয়জাল,

এই পুঞ্জ পুঞ্জীভূত জড়ের জঞ্জাল,

মৃত আবর্জনা। ওরে জাগিতেই হবে

এ দীপ্ত প্রভাতকালে, এ জাগ্রত ভবে

এই কর্মধামে। …’

 

আজকের এই অভিভাষণে আমি দুটি মাত্র সীমিত বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখব; একটি, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও সে-শিক্ষায় ভাষা শিক্ষার স্থান, এবং দ্বিতীয়টি, চলমান বাংলা গদ্যের ভাষা। দুটি বিষয়ই খুব ‘গাদ্যিক,’ সন্দেহ নেই; কিন্তু উপায়ও নেই। সাহিত্য মাত্রই ভাষানির্ভর, এবং সাহিত্য শুধু নয়, সমাজও ভাষানির্ভর। ভাষা ছাড়া সমাজ নেই, সমাজ ছাড়া ভাষা নেই। সুতরাং, আমি যদি বেশ কিছুটা সময় আপনাদের নিই এই ভাষা প্রসঙ্গে, আশা করি, আপনারা আপত্তি করবেন না।

কিন্তু তার আগে একটি অবশ্য করণীয় কর্তব্য আমার আছে, এবং তা হচ্ছে বিগত বর্ষে যাঁরা বিগত হয়েছেন সেই শিল্পী সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি সেবকদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করা এবং তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা, আপনাদের সকলের মুখপাত্র হিশেবে এবং নিজের পক্ষ থেকে।

 

দুই

 

বিগত বর্ষের বিয়োগপঞ্জী দীর্ঘ এবং আমার পক্ষে বড় বেদনাবহ। দীর্ঘায়ু হবার দুঃখ নেই, এমন নয়। অনেক দুঃখের একটি হচ্ছে যত বেশি বয়স বাড়ে প্রিয়জন বিয়োগের দুঃখও বাড়ে; সমবয়সী বন্ধুজনেরা একে একে সরে যান জীবনের অন্তরালে, আর কমবয়সী প্রীতিভাজনেরা অগ্রজদের ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ খসে পড়েন জীবনের মালা থেকে, তারা যেমন খসে পড়ে আকাশ থেকে। আর, যার বয়স বাড়তেই থাকে, তার নিঃসঙ্গতাও সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান হয়, আত্মার আত্মীয়তার পরিধি ক্রমশ সীমিত হতে থাকে। যে বর্ষ অতিক্রান্ত হল প্রায়, সে বর্ষে পরিধির এই সংকুচন আমার পক্ষে বড় বেশি হল। আমার ব্যক্তিগত জীবন দরিদ্রতর হল, বোধ হয় সাম্প্রতিক বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনও। কিছু ছবি আর দেখা যাবে না, কিছু সুর আর শোনা যাবে না, কিছু কণ্ঠ আর উচ্চারিত হবে না ! জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টি ও বিলয়ের এই তো অমোঘ নিয়ম!

 

তখনকার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পুবদিকে একটি পুরান বাড়ির দোতলায় ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েণ্ট্যাল আর্টের ছোট দপ্তর এবং তার চেয়ে ছোট একটি স্টুডিও। আমি তখন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক। স্টুডিওর পাশের ঘরটিতে শিল্পী গোপাল ঘোষের বাস; সেই ঘরটির খাট ও মেঝের উপর আর পাশের স্টুডিওতে গোপালের ছবি আঁকার কারখানা। পুরো দশটি বছর, চল্লিশের পুরো দশকটাই বোধ হয়, তাঁর কেটেছে ওই দুটি ঘরে; আমি তার নিকটতম প্রতিবাসী এবং অগ্রজোপম সুহৃদ। ঝুঁকে পড়ে নিবিষ্ট চিত্তে স্কেচ করে যাচ্ছেন, ছবি এঁকে যাচ্ছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, লাল আর হলুদ, নীল আর সবুজ ফুটে উঠছে স্তবকে স্তবকে, তীক্ষ্ম দ্রুতরেখা জীবনকে দোলা দিচ্ছে, লতাপাতা গাছ-পালা পাখি-পাখনা জল-মাটি মানুষ চরাচর সব নতুন প্রাণ পাচ্ছে রঙ আর রেখার প্রাণবস্তু ভাষায়। ছবি যখন আঁকছেন না, তখন ডায়েরি লিখছেন অথবা পড়ছেন বার্নার্ড শ বা বাট্রে- রাসেল, অথবা কাঁধে একটা ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন পথে ঘাটে মাঠে হাটে বাজারে; দুদিন হয়ত তাঁর দেখাই নেই। স্বল্পবাক, অন্তর্মূখীন, অসাধারণ সংবেদনশীল এই প্রতিভাবান শিল্পীটির তুলি ও মন সজাগ ছিল মৃত্যুর কিছুদিন আগে পর্যন্তও।

 

আদিম প্রাণের নির্বাধ বিস্ফোরণ দেখেছিলাম রামকিঙ্করের জীবনে ও শিল্পে। যেমন তাঁর উর্মিউচ্ছল অট্টহাসির জীবনরোল আর মাঠ কাঁপানো গলা ফাটানো গান, যেমন তার শান্তিনিকেতনের প্রান্তরের মত উম্মুক্ত প্রশস্ত হৃদয় আর বজ্রের মতন দৃঢ় পেশীবহুল বাহু, ঠিক তেমনই তাঁর সৃষ্টি-স্টিলে কংক্রিটে পাথরে- প্রাণ-প্রাচুর্যে জীবনকে যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা দিকে, শক্তির বিচ্ছুরণে উদ্বেজিত করছে জীবনের দিগন্ত। সুজাতা, সাঁওতাল পরিবার, যক্ষ আর যক্ষী, আশ্রমের কেন্দ্রে প্রাচীনতম কুঠি বাড়িটির সামনে নবীনতম বিমূর্ত রূপের মূর্ত ছন্দময় একটি রূপ, আর তাঁর অসংখ্য স্কেচ আর ছবি, আর তাঁর ব্যক্তিত্ব রামকিঙ্করের যে উদ্বেলিত জীবনকে আমাদের এত কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল সেই জীবন চলে গেল আমাদের চোখের আড়ালে; পড়ে রইল তাঁর সৃষ্টির অগুণতি টুকরোগুলো।

 

বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কথা কি আর বলব! নন্দলালের শিষ্য ও দক্ষিণ বাহু, রামকিঙ্করের বন্ধু ও সহকর্মী, সত্যজিং রায়ের অন্যতম গুরু ও ঘনিষ্ঠ সুহৃৎ বিনোদবিহারী যে-জগতে বাস করতেন সে বুঝি আমার আপনার জগৎ নয়। সে যেন এমন একটা জগৎ যেখানে বস্তু ও কল্পনা, মাটি ও আকাশ, মানুষ ও প্রকৃতি একই সঙ্গে এক গভীর প্রেম  ও প্রীতিময় মিথুনে আলিঙ্গনদ্ধ হয়ে বিরাজ করে। এমন উপলব্ধি না হলে কি সম্ভব হত, বিধাতা যার চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছেন দ্রুত, সেই তিনি শুধু চারিত্রিক বীর্য আর জীবনে গভীর বিশ্বাসের উপর ভর করে শান্তিনিকেতনে চিনা-ভবনের প্রায় সিলিং ঘেষা মাচানের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে পুরু কাঁচের লেনসের আর আয়নার সাহায্য নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নতুন নতুন জীবনাকুতির ছবি এঁকে যাচ্ছেন, গুচ্ছের পর গুচ্ছে, দিনের পর দিন, ঠিক যেমন করে মিকেল এঞ্জেলো এঁকেছিলেন সিস্টাইন চ্যাপেলের ছাতের ছবিগুলো। চিনা-ভবনে সে দৃশ্য আমি দেখেছি, বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে। বিধাতা শেষ পর্যন্ত তাঁর মর্ত্য দৃষ্টি একেবারেই কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু যত তিনি নিয়েছিলেন তত বুঝি তিনি দিয়েছিলেন তাঁর অন্তশ্চক্ষুর তেজোময় দীপ্তি। সেই দীপ্তি চোখে নিয়ে তিনি শেষবারের জন্য চোখ বুঁজেছেন। আমরা চোখ মেলে দেখলাম তিনি নেই।

 

দেবব্রত বিশ্বাস যাকে তাঁর বাল্যবয়স থেকে জানতাম জর্জ বলে এবং পারিবারিক সূত্রে যে ছিল আমার অনুজোপম, সেই দেবব্রত চেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গানকে সূক্ষ্ম, মার্জিত, পরিশীলিত মধ্যবিত্ত কণ্ঠ থেকে তুলে নিয়ে যাবে সাধারণ মানুষের নির্বাধ নির্দ্বন্দ্ব কণ্ঠে যে-কণ্ঠ দিগন্ত কাঁপায়, শত চিত্তে সাড়া জাগায়, সহস্র চিত্তকে এক সূত্রে গাঁথে। ভালমন্দ জানি নে, কিন্তু গান পাগল জর্জের জীবন সাধনাটাই ছিল এই পথে; শিল্পকে সংগীতকে গণজীবনের জীয়নকাঠি করে গড়ে তোলা। ব্রহ্মসংগীত থেকে শুরু করে গণনাট্য সংঘের ঘূর্ণী পথে রবীন্দ্রসংগীতের শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব শৈলীর গান ছিল তাঁর দীর্ণ জীর্ণ হতভাগ্য মানুষকে জাগাবার, বাঁচাবার মন্ত্র। সে-মন্ত্র, সে-সংগীত শৈলী সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করতে পারে নি। তজ্জনিত হতাশা ও দুঃখ, ক্রোধ ও সরব-নীরব নালিশ তার শেষ জীবনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে, পুড়ে পুড়ে ছাই করেছে। শিল্পীর এ পরিণতি মর্মান্তিক, অথচ এমন নয় যা অস্বাভাবিক বা অনৈতিহাসিক। তবু, জর্জের মৃত্যুতে সমসাময়িক বাঙালি জীবন দরিদ্রতর হল, একথা মনে না করে পারছি নে।

 

উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের একই পাঁচমিশেলি মেসে একই ঘরে একই জীর্ণ তক্তাপোসের উপর একই ব্যক্তি দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী প্রায় যাপন করে, জীবনটাকে তুড়ি মেরে জীর্ণ বস্ত্রের মতো এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন যে পথভোলা, মহাবিবাগী, ছন্নছাড়া মানুষটি তাঁর নাম শিবরাম  চক্রবর্তী। সারাটা জীবন তিনি যাদের সঙ্গে কাটালেন তাঁর মানস-জগতে, তাঁরা সব কিশোর-কিশোরী, মানস-মিথুন মধুর আত্মীয়তা তাদের সঙ্গে, হাস্যপরিহাসময় এক পরিবেশের মধ্যে। আর, বয়সে যাঁরা বড় তাদের সঙ্গে, তো সমস্ত সম্বন্ধটাই হাস্যপরিহাস ঠাট্টা তামাশার। অশনে বসনে সাজে সজ্জায় দৃষ্টিলেশহীন, নিজের সম্বন্ধে একান্ত অবজ্ঞাবিলাসী এই মানুষটির সঙ্গে এ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল; যোগসূত্র ছিলেন একাধিক বিপ্লবী রাজনৈতিক বন্ধু। তারপর আর বহুদিন আর কোনো বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। তবু, উত্তর ও মধ্য কলকাতায় ফুটপাতে কদাচিৎ কখনো দেখা হয়ে গেলে কাছে এসে হাত ধরে বলতেন, ‘হে বন্ধ, আছো তো ভালো?’ তারপর আর কোনো কথা নেই, বলা নেই, কহা নেই, ধাঁ করে ঢুকে পড়তেন নিকটতম সস্তা, নোংরা যে কোনো একটি চা-এর দোকানে। অথচ, অদৃষ্টের এমনই পরিহাস, মৃত্যুর মাত্র দু-তিন মাস আগে শিবরাম তাঁর জীবনের শেষ পুরস্কার, একটি রৌপ্য পদক ও কিছু বই, নিয়ে গেলেন আমারই হাত থেকে কবি কালিদাস রায় এর এক স্মৃতি-সন্ধ্যায়। যাবার আগে বলেছিলেন, ‘আমি তো আর বেশি চলা ফেরা করতে পারি নে, তবু একদিন আসব, বসে বসে গল্প করব।’ আসা আর তাঁর হয় নি। আমি জানি, তাতে শিবরাম চক্রবর্তীর কিছু ক্ষতি হয় নি, ক্ষতি যা হয়েছে তা আমার।

 

সর্বশেষ যার কথা বলছি সেই বিনয়, বিনয় ঘোষ, সে ছিল আমার অন্যতম প্রাক্তন ছাত্র, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী, সুহৃৎ। তার মৃত্যুর পর অনেকে অনেক কথা বলেছেন, লিখেছেন;, সে সম্বন্ধে আমার কিছুই বলবার নেই। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে দেখেন নিজেদের দৃষ্টির আলোকে আমিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিনয়ের মনের গড়নের ইতিহাস আমার অজানা নয়, কারণ সে ইতিহাসের প্রত্যেকটি পৃষ্ঠা রচিত হয়েছে আমার চোখের নীচে, আমার সজ্ঞান সচেতনতার সীমার মধ্যে। আজও সেই ইতিহাস আমার গৌরব। তবু, স্বীকার করতে আমার এতটুকু দ্বিধা নেই, বিনয় আমাকে অতিক্রম করে, অথবা এড়িয়ে গিয়ে নিজের পথ নিজে খুঁজে নিয়েছিল; তারও মালমশলা আমিই জোগাড় করে দিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত সে নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্লেষণ-পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল। তার ফলে পশ্চিম বাংলার লোক-সংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি নিয়ে সে তার যা বিশ্লেষণ ও বিচার রেখে গেছে তা যে শুধু পরিমাণে প্রচুর তা-ই-নয়, গুণে ও অর্থময়তায়ও তা মূল্যবান। বিনয়কে নিয়ে, তার সঙ্গে শত মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও, কিছু গর্ব আছে আমার; সেই গর্বই তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার স্বীকৃতি।

 

তিন

গোড়াতেই বলেছিলাম বাংলা ভাষার ব্যাপার নিয়ে আপনাদের কিছুটা সময় নেব। এ সম্মেলন সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সম্মেলন, এবং সাহিত্য একান্তই ভাষা-নির্ভর। সুতরাং সাহিত্যালোচনার আগে ভাষা নিয়ে কিছু আলোচনা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

মানব শিশু মায়ের কোলে যে ভাষা শেখে, শিশু ও কিশোর যে-সমাজে বাস করে সে-সমাজ থেকে যে-ভাষা সে মুখে তুলে নেয় সেই ভাষাই তার পরিণত জীবনের ভাষার বুনিয়াদ, সন্দেহ নেই। সাধারণ মানুষের আটপৌরে দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম তাতেই চলে যায়। কিন্তু শুধুমাত্র সে বুনিয়াদের উপর সেই ভাষাভাষী সমাজের ক্রমবর্ধমান সভ্যতা সংস্কৃতির তলের উপর তলে হাজার কোঠার বিচিত্র, বিরাট ও সমৃদ্ধ সৌধ গড়ে তোলা যায় না। জীবন যত প্রসারিত হয়, যত বেশি জটিল ও সমস্যা-সংকুল হয়, তার দাবি দাওয়া আশাআকাঙ্কা যত বাড়ে, স্বপ্নকল্পনা যত সূক্ষ্ম ও গভীর হয় সেই ভাষাকে তত বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হয়, মার্জিত ও পরিশীলিত হতে হয়। সজ্ঞান সচেতনতায়, প্রয়োজনের তাড়নায় সামাজিক মানুষই এক মার্জনা, এই পরিশীলন, এই শৃঙ্খলা রচনা ক্রিয়াটি করে। এই ক্রিয়ার যোগফলকেই আমরা বলি ভাষার ব্যাকরণ, নীতি নিয়ম, রূপকালঙ্কার ইত্যাদি। এই যে বিচিত্র উপায়ে অবিরাম পরিশীলিত ভাষা এ-ভাষা কেউ মাতৃক্রোড়ে শেখে না, প্রকৃতির দোলনায় বসে স্বভাবের তাড়নায়ও নয়। বহু আয়াসে-প্রয়াসে, সজ্ঞানে সচেতনভাবে এ ভাষা শিখতে হয়, আয়ত্ত করতে হয়। এ ভাষা আয়ত্ত না করলে বৃহত্তর সমাজে কোনো প্রকার আদান-প্রদানই সম্ভব হতে পারে না, এমন কি সমাজ-রচনাই সম্ভব হয় না, জ্ঞানবিজ্ঞানদর্শনচর্চা, শিল্পসাহিত্যসৃষ্টি, বুদ্ধির অনুশীলন, ইন্দ্রিয় ও চিত্তবৃত্তির বিকাশ, ধর্ম-অর্থ-কাম এই ত্রিবর্গের সুষ্ঠু ও অর্থবহ আচরণ ইত্যাদির কথা না হয় বাদই দিলাম। ভাষাই বস্তুত মানব-সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাহক ও ধারক। এইই-হচ্ছে ভাষাশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার অমোঘ যুক্তি, এবং এই শিক্ষা-ক্রিয়ার কোনো বিরতি জীবনের কোনো পর্যায়েই থাকতে পারে না। যদি তা হয় তা হলে মানবসংস্কৃতির অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

 

বিরামবিরতিহীন ভাষা-সাধনার আর একটি গভীরতর যুক্তিও আছে। ভাষা বড় আশ্চর্য জিনিশ। সহজে একথা আমাদের ধারণায় আসে না যে, বয়স্ক মানুষ যে চিন্তা করে, ভাবে, স্বপ্ন দেখে, কল্পনা করে তার মাধ্যম কিন্তু তার ভাষা। যতক্ষণ পর্যন্ত এ-সব চিন্তাভাবনা স্বপ্নকল্পনা অস্ফুট অব্যক্ত থাকে, ততক্ষণ সে-সব ছায়াছবির, প্রতীকপ্রতিমার, কিন্তু যে মুহূর্তে তা স্ফুট হল, ব্যক্ত হল সেই মুহূর্তেই তা ভাষাশ্রিত হয়ে গেল। সুতরাং মানুষের চিন্তাভাবনা স্বপ্নকল্পনাকে ব্যক্ত করতে হলে ভাষা যদি যথেষ্ট আয়ত্ত না থাকে তা হলে চিন্তাভাবনা স্বপ্নকল্পনা পঙ্গু, আড়ষ্ট ও দুর্বল হতে বাধ্য। বস্তুত, ভাষার বুনানী ও বিন্যাস এবং মানুষের চিন্তা ভাবনা স্বপ্নকল্পনার বুনানী ও বিন্যাস অত্যন্ত গভীর উদ্বাহবন্ধনে পরস্পর আবদ্ধ। এ-তথ্য যার জানা নেই মানবসমাজের গড়ন ও বিকাশের ইতিহাস তার কাছে অর্গলবব্ধ।

অবিরাম ভাষা-শিক্ষার এই যেখানে সাধারণ যুক্তি এবং সে-যুক্তি যখন পৃথিবীর বিবুধম-লে সর্বত্র স্বীকৃত, তখন বাংলা ভাষাভাষী বিজ্ঞানী মহলে হঠাৎ একদিন শোনা গেল, যারা বিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েট হবেন তাঁদের বাংলা ও ইংরেজি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে পড়তে হবে না, পরীক্ষাও দিতে হবে না। ভাষা-শিক্ষার তাঁদের কোনও প্রয়োজন নেই। শুনে কিছুক্ষণের জন্য বুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু খুব বিস্মিত হই নি, কারণ একথা আমার অজানা ছিল না যে, মোটামুটি ১৯৫০ উত্তর বাঙালি বৈজ্ঞানিকেরা- দুচারজন প্রাচীনতর লোক ছাড়া- কেউই বাংলায় বিজ্ঞানের কথা বলতেন না, বলতে পারতেন না। অর্থাৎ বিজ্ঞান তাঁরা কতটুকু আয়ত্ত করেছেন তার পরীক্ষা তাঁরা দেন নি, দিতে প্রস্তুতও ছিলেন না। কে কতটুকু কি শিখেছে এবং কতটুকু সে শিক্ষা দিতে সমর্থ তার একটা পরীক্ষা তো নিজের ভাষার তার কতটুকু সে রূপায়িত করে তুলতে পারে, তার উপর। সে পরীক্ষা তাঁরা দিতে অস্বীকার করলেন শুধু নয়, তাঁদের ছাত্রছাত্রীদেরও বারণ করলেন তার সম্মুখীন হতে!

 

কিছুদিন পর শোনা গেল, শুধু বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের নয়, স্নাতক হবার জন্য যারা বি. এ. বা বি. কম পড়বেন তাঁদেরও ডিগ্রি পরীক্ষার ভাষা জ্ঞানের পরীক্ষা তেমন কিছু প্রয়োজনীয় ব্যাপার নয়, যেহেতু বাংলা ও ইংরেজি ভাষা-পরীক্ষাতেই বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে ফেল করে। সুতরাং তাঁদের সুবিধার জন্য ভাষাশিক্ষা ও পরীক্ষাকে যতটা সস্তাদরে বিক্রি করে সমাজের একাংশের মতানুকুল্য পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করা অবশ্য প্রয়োজন বলে আমাদের শিক্ষাকর্তৃপক্ষ মনে করেছেন, এবং তা বিধিবদ্ধও করেছেন। জয় হোক তাঁদের। যখন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, বি.এ-বি.কম-বি. এসসি পাশ করা ছেলেমেয়েরা দু-পৃষ্ঠার একটা চিঠিতে দশটি বানান ভুল করে, শব্দচয়ন করতে শেখে নি, পদাংশ বিন্যাস জানে না, সুগঠিত কোনো বাক্য রচনা করতে পারে না, সুশৃঙ্খলায় কোনো চিন্তাভাবনাকে ব্যক্ত করতে পারে না, তখন আমাদের শিক্ষাকর্তৃপক্ষেরা স্নাতকস্তরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে নিশ্চয়ই দেশের মহদুপকার সাধন করেছেন! কোথায় আমরা ভাষা-শিক্ষার উপর জোর বেশি করে দেব, না তা নয়, সেটাই আরও শিথিল না করলেই নয়! কারণ ভাষা শিক্ষার অন্য নাম যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক শৃঙ্খলার সংরক্ষণ, সে কথা আমরা ভুলে গেছি। এই শৃঙ্খলার সংরক্ষণ আমরা চাই নে। এ শৃঙ্খলা বোধ হয় বুর্জোয়া শৃঙ্খলার পরিপোষক, এবং সেই হেতু পরিত্যজ্য!!

 

বাংলাভাষার সৎকার যা করবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা করছেন; এ-নিয়ে আমার আর কিছু বলবার নেই। এই সম্মেলনে আপনারা আমায় একটু সুযোগ দিলেন; সেই সুযোগ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত বেদনা আপনাদের কাছে ব্যক্ত করলাম মাত্র, আমার নিরুদ্ধ নিশ্বাসকে কিছুটা মুক্তি দেবার উদ্দেশ্যে।

 

প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক, বাংলাভাষা সম্বন্ধে যা শুনবার তা তো শোনা হল, কিন্তু ইংরেজি কি আমরা পড়ব, পড়লে কতটা পড়ব, কতটা শিখব। যেহেতেু ইংরেজি অ-ভারতীয় ভাষা, একদা বিজয়ী শাসকদের ভাষা সেই হেতু ইংরেজি একেবারেই কি পরিত্যজ্য? যদি তা না হয় তবে কতটুকু কোথায় গ্রহণীয়, কোথায় পরিত্যজ্য?

 

প্রশ্নটা ইংরেজি ভাষা নিয়ে নয়। আসলে কথাটা হচ্ছে, আমরা সমৃদ্ধ শক্তিশালী বিদেশি কোনো ভাষা, এমন ভাষা যার আর্ন্তজাতিক ব্যাপ্তি সর্বত্র স্বীকৃত, তেমন কোনো ভাষা শিখব কি না, শিখলে কতটা শিখব। এ-ভাষা হতে পারত ফ্রেঞ্চ বা রুশি বা স্প্যানিশ বা জর্মান। কিন্তু তা হয় নি, হয়নি একটি বিরাট ঐতিহাসিক কারণে, এবং সে ইতিহাসকে আপাতত মুছে ফেলে দেবার কোনো উপায় নাই। ইংরেজি ভাষাটা এসেছে ইতিহাসের স্রোতে। গত প্রায় দেড়শ বছর ধরে দেশের শিক্ষিত লোকেরা ইংরেজি ভাষার চর্চা করছেন, এবং যদিও দেড়শ বছর পরও তাঁরা শতকরা দুজন কি আড়াই জন মাত্র, দেশের মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি, আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব আজও কিন্তু এঁদেরই হাতে; এঁদের গড়া বিধিবিধান আইনকানুন শিক্ষাসমাজ আদর্শবিশ্বাস প্রভৃতিই আমাদের সামগ্রিক জীবনের নিয়ামক। আর, অন্যদিকে ইংরেজের সামাজ্য আজ অতীত ইতিহাস মাত্র, কিন্তু ইংরেজি ভাষার সামাজ্য ক্রমবর্ধমান। সুতরাং স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি একটা ভাষা যদি শিখতেই হয় তা হলে ইংরেজিই সেই ভাষা যা আমাদের শেখা উচিত, এবং তা-ই স্বাভাবিক। এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বিদেশি একটি ভাষা শেখা, এবং ভালো করেই শেখা যে উচিত এ সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

 

কারণ কোনো জীবন্ত সমৃদ্ধ সংস্কৃতিমান সমাজের ভাষাই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। নানা দেশ নানা সংস্কৃতির সঙ্গে সে সমাজের যোগাযোগ ঘটে, নানা বস্তু, ভাব আদর্শ, কল্পনা, অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের আদান-প্রদান হয়। এই যোগাযোগ ও আদান-প্রদানের আশ্রয় ও মাধ্যমই হচ্ছে বিদেশি কোনো একটি কি দুটি ভাষা। আমাদের ক্ষেত্রে ইংরেজি হচ্ছে সেই বিদেশি ভাষার সদর দরজা যার মাধ্যমে আমরা প্রাগসর পৃথিবীর সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি গত দুশ বছর। আর, যে আধুনিক বাংলাভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আমাদের গর্ব, সেই ভাষা ও সাহিত্যের যে সমৃদ্ধ রূপ আজ আমাদের গোচর তা কি সম্ভব হত আধুনিক ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের সদর দরজা যদি আমাদের সামনে উন্মুক্ত না থাকত? বাংলা গদ্য ও কবিতার আধুনিক যে ভাষা, বিচিত্র অলিগলিতে যে সাহিত্যের যে বিচিত্র রূপ তার পেছনে ইংরেজি ও ইংরেজির মাধ্যমে অন্য গুটি দুই পাশ্চাত্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রেরণা যে কত ব্যাপ্ত ও গভীর তা অনেক সময় আমরা ভুলে যাই।

 

সুতরাং ইংরেজি না শেখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না, এবং শিখতেই যদি হয় প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখা ভালো। কিন্তু সে ইংরেজি শেখাটা হওয়া চাই মাতৃভাষার মাধ্যমে, এবং তা ভাষাশিক্ষার আধুনিক পদ্ধতিতে। বস্তুত, শিক্ষার মাধ্যম যে কলেজে স্নাতকস্তরেও, মাধ্যমিক স্তরে তো বটেই, মাতৃভাষাই হওয়া উচিত এ-সম্বন্ধে আমি কৃতনিশ্চয়। মাধ্যমিক স্তরেই যাদের শিক্ষা সমাপ্ত হবে, তাঁদের সে স্তর পর্যন্ত ইংরেজি পড়তেই হবে, বিশুদ্ধ জীবিকা সংস্থানের জন্যই। কিন্তু যাঁরা জীবনের নানা উচ্চতর ক্ষেত্রে সমাজের দায়দায়িত্ব নির্বাহ করবেন, সমাজকে নেতৃত্ব দেবেন, নানা সামাজিক কর্মের নিয়ামক হবেন, সাহিত্য সৃষ্টি করবেন, নানা জ্ঞানবিজ্ঞান, বিদ্যা ও অবিদ্যার চর্চা করবেন তাঁদের সকলকেই ইংরেজি একটু ভালো করে শিখতে হবে, অন্তত একেবারে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শৈথিল্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বিজ্ঞাননির্ভর, একান্ত বুদ্ধিনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকীর্ণ পৃথিবীতে।

মাধ্যমিক স্তরে তিনটি ভাষা শেখার যে নীতি সর্বভারতীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে আমি তার অন্যতম সমর্থক। প্রাথমিক স্তরে বাংলা বা যা যার মাতৃভাষা এবং ইংরেজির কথা বলেছি। মাধ্যমিক স্তরে এসে তৃতীয় ভাষা হিশেবে হিন্দি শেখা সকলেরই উচিত হবে। সর্বভারতীয় যোগাযোগ আদান-প্রদানের জন্য, ভারতীয় ঐক্যবোধের পরিপোষণের জন্য। কিন্তু পশ্চিম বাংলায় কেউ যদি হিন্দির বদলে, মাধ্যমিক স্তরেই, সংস্কৃত বা আরবি বা ফার্সি পড়তে চান তাকে তা পড়তে সুযোগ দেওয়া উচিত হবে। উচিত হবে দুটি কারণে; প্রথমত উত্তরভারতীয় সমস্ত ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষাই বোধ হয় একমাত্র ভাষা যার সঙ্গে সংস্কৃত-এর সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠতম। সেই হেতু, বাংলাভাষার ব্যাপারে যারা উৎসাহী তাঁদের সংস্কৃত শেখবার একটা সুযোগ থাকা উচিত, মাধ্যমিক ও স্নাতক এই দুই স্তরেই। দ্বিতীয়ত, সংস্কৃতই তো পরস্পরাগত ভারতীয় সাধনা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। সুতরাং সে ভাষাটা শেখবার একটা সুযোগও সমভাবেই থাকা উচিত। বাঙালি মুসলমানদের তরফ থেকে আরবি ও ফার্সি সম্বন্ধেও প্রায়ই একই কথা বলা চলে।

 

চার

কিছুদিন যাবতই বাংলা গদ্যভাষার চলমান রূপ নিয়ে চিত্তে কিছু শংকাবোধ করছিলাম। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘরোয়া আলাপ আলোচনায় এবং ছোটোখাটো সাহিত্য-সভায় আমার এ-শংকা কিছু ব্যক্তও করেছিলাম। আজ এই বিপুল সম্মেলনের সুযোগ আমার এই শংকার কথাটা প্রকাশ্যে এবং একটু সবিস্তারে নিবেদন করি।

 

বাংলা গদ্যের ইতিহাস নিয়ে অনেক সাধুপ্রচেষ্টা হয়েছে, উনিশ শতকে হয়েছে, আমাদের কালেও কিছু কম হয় নি, এখন হচ্ছে। কিন্তু এ-সব রচনায় ইতিহাস যতটা আছে, গদ্যের নির্মিতির আলোচনা বিশ্লেষণ ও তার বিচার ততটা নেই। তার ফলে বাংলা গদ্যের চরিত্রের সুস্পষ্ট রূপ এখনও আমাদের কাছে খুব গোচর নয়। তবু, ইতিহাস হিসেবে এ-সব রচনা অতি মূল্যবান এবং সকল জিজ্ঞাসুরই অবশ্য পাঠ্য। কিন্তু তার পরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি ইতিহাসের ছাত্র, কিন্তু আমি অতীত বিলাসী নয়। বাস করি আমি একান্ত বর্তমানে, তাকিয়ে থাকি ভবিষ্যতের দিকে। বাংলা গদ্যের বর্তমান ও ভবিষ্যতই আমার অন্যতম চিন্তার বিষয়। এ গদ্যের অতীত আমার জানা প্রয়োজন বর্তমান বাংলা গদ্যকে বুঝবার জন্য, তার চরিত্র ও প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য এবং তার চেয়েও যা বড়ো প্রয়োজন, আগামী কালের গদ্যের পথনির্দেশ পাবার জন্য। জানি ভাষা নির্মাণ করেন ভাষার লেখকরা মননশীল কল্পনাকুশল সচেতন ও সংবেদনশীল লেখকরা, পন্ডিতেরা নন, বৈয়াকরণিক-ভাষাতাত্ত্বিক-শব্দতাত্ত্বিকেরাও নন, ঐতিহাসিকেরা তো ননই, তবু লেখকরা, অবশ্য দায়িত্ব সচেতন লেখকরা তো সামাজিক জীব, এবং সামাজিক প্রয়োজন- চেতনাও যে কোনো লেখকের সর্বতোভদ্র জীবন চেতনার অচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই ভূমিকার মন্তব্য সেই স্পষ্ট বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এই বিশ্বাস প্রোথিত একটি সামাজিক সত্যের উপর। সে সত্যটি হচ্ছে, ভাষা সামাজিক বস্তু, সমাজ ছাড়া ভাষা নেই ভাষা ছাড়া সমাজ নেই। দায়িত্ব সচেতন যে কোনো লেখক তা জানেন বলে আমার ধারণা।

 

নিজে আমি বৈয়াকরণিক নয়, শব্দতাত্ত্বিক নয়, ভাষাতাত্ত্বিকও নয়। সুতরাং যে-বিষয় সম্বন্ধে বলছি, সে বিষয়ে কিছু বলবার অধিকারই হয়ত আমার নেই, এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিকারী ভেদে আমি বিশ্বাসী। তবু যে বলতে সাহসী হয়েছি তার প্রধান কারণ আমি সামাজিক জীব, এবং বঙ্গ ভাষাভাষী সমাজ সম্বন্ধে কিছুটা সচেতন। তদুপরি আমি বাংলা গদ্যের দীনতম হলেও অন্যতম লেখক; প্রাণের টানে আমাকে বাংলা গদ্য লিখতেই হয়, পরিমাণে ইংরেজির চেয়ে হয়ত কম, কিন্তু তা হলেও বাংলা গদ্য না লিখে আমার উপায় নেই।

 

তবু সবিনয়ে স্বীকার করি এবং আপনারা আমাকে বিশ্বাস করুন আমি নিজেই আমার নিজের গদ্যভাষার কঠোরতম সমালোচক। আমি ভালোই জানি, আমার গদ্য রচনা বহুক্ষেত্রে খুব শিথিল, শ্লথগতি যার নির্মাণে কোনো পারিপাট্য নেই, কোনো নান্দনিকতার স্পর্শমাত্রও হয়ত নেই। বেশ জানি যা প্রথম লিখি তার একাধিকবার পরিশোধন, পরিমার্জন, পরিলিখন প্রয়োজন, কিন্তু অকপটে স্বীকার করি সে সময় ও সুযোগ আমার জীবনে আমি পাই নি, আজ এই আশি ছুঁই ছুঁই বয়সেও পাচ্ছি নে। মধ্যবিত্ত জীবনের সংগ্রাম, মানবজীবনের সকলদিকে প্রবল আকর্ষণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের আকর্ষণ, ভারতশিল্পে ইতিহাসে সমাজতত্ত্বে গবেষণালব্ধ স্বল্প আমার যতটুকু সঞ্চয় তা প্রকাশ করে বলবার প্রয়াস, ইত্যাদি সমস্ত মিলে যে পরিশোধন, পরিমার্জন, পরিলিখনের প্রয়োজন ছিল, তার অবসর আমাকে দেয় নি। এ আমার কিছু অজুহাত নয়, নালিশও কিছু নয়। হয়ত এর অন্যথা কিছু হতে পারত না; তা হলে আমি অন্য মানুষ হতাম ; তবু জীবনের শেষলগ্নে ত্রুটি স্বীকৃতি রেখে গেলে বোধহয় কিছুটা দায়মুক্ত হওয়া যায়।

 

যাই হোক, যেহেতু বাংলা গদ্য আমি লিখি এবং সেই গদ্যইআমার ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার একমাত্র বাহক, ঠিক সেই হেতুতেই চলমান বাংলা গদ্য নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা কিছু আছে। সচেতন যথেষ্ট সময় ও সুযোগ হাতে আছে এমন মুহূর্তে যখন আমি কিছু লিখি তখন সেই চিন্তাভাবনা আমার চিত্তে সক্রিয় থাকে সেগুলোকে আমি কাজে লাগাই, যেমন সব দায়িত্বশীল লেখকই করে থাকেন। রচনা নামক সম্যক প্রক্রিয়ায় এটি একটি ক্রিয়া, যাকে এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সময় যখন থাকে না, ইচ্ছে যখন ক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয় না তখন রচনা শিথিল হয় শ্লথগতি হয়, যুক্তি শৃঙ্খলায় সাজানো আর হয় না। তেমন রচনা আমারও আছে এবং আমিও এই বিরূপ সমালোচনার উদ্দিষ্ট।

কথা উঠতে পারে, ওঠা উচিত আমি যে প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাইছি তা কি শুধু বাংলা গদ্যের, বাংলা কবিতার ভাষা নিয়ে কিছু নয়, নাটকের ভাষার কিছু নয়? না অন্তত আপাতত আমার তা মনে হচ্ছে না; কবিতার ও নাটকের চলমান ভাষার রূপ ও চরিত্র নিয়ে শংকাবোধ করবার কোনো কারণ এখনও পর্যন্ত ঘটে নি। কেন একথা বলছি, তার ভেতর এখন আর প্রবেশ করব না।

এইমাত্র বলেছি, যেহেতু আমি গদ্য লিখি সেই হেতু গদ্য নিয়ে আমার একটু চিন্তাভাবনা আছে। কিন্তু গদ্য লেখক হলেও আমি বাংলা গদ্যের নির্মাতা কেউ নয়; অত বড় সাহস ও আস্পর্ধা আমার নেই। সুতরাং যে চিন্তাভাবনার কথা বলছি তা প্রধানত বাংলা গদ্যের অন্যতম মনোযোগী পাঠক হিশেবে গৌণত লেখক হিশেবে।

 

বাংলা গদ্যের বয়স দুশ বছরেরও কম; রামমোহন মৃত্যুঞ্জয়-ফোর্ট উইলিয়াম কালেজ থেকে তার সূত্রপাত। কথাটা শুনতে অবাক লাগে, একটু রাগও যে না হয় এমন নয় কিন্তু কথাটা সত্য। এর আগে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র বা সরকারী বা ব্যবসা বাণিজ্যগত দলিলপত্র ছাড়া গদ্যের কোনো ব্যবহারই ছিল না। মৌখিক বা লিখিত  সাহিত্য যা ছিল তা সব  কিছুই ছিল পদ্যে বা কবিতায়, এবং সে সাহিত্য মুখ্যত বিবরণাত্মক ও কল্পনাশ্রয়ী, ভাবাত্মক ও পুরাণাশ্রয়ী। বিশুদ্ধ মননশীল, পরিশীলিত, সূক্ষ্ম ও জটিল চিন্তাশ্রয়ী, বুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর রচনা যখন কেউ লিখতেন (খুব কম লোকই তা করতেন) তখন তিনি তা সংস্কৃত ভাষাতেই লিখতেন, সে ভাষাভিজ্ঞ লোকদের জন্যই বাংলার আশ্রয় কেউ সাধারণত নিতেন না। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত আর বড় একটা নেই। কিন্তু সে স্তরের লেখক ও পাঠক তো ছিলেন ‘কোটিকে গুটিক’, এককোটি লোকের সমাজে মাত্র কয়েকজন সুতরাং মননশীলতা বলে কোনো বস্তু, চিন্তাশ্রয়ী মানস বলে কোনো জিনিশ বঙ্গ ভাষাভাষী সমাজে গড়ে ওঠবার কোনো বিশেষ সুযোগই ছিল এমন মনে হয় না, দুচারটি ছোট ছোট কেন্দ্রে ছাড়া। ইতিহাসেও তেমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আর, মনন ক্রিয়ার বা মননশীলতার, বুদ্ধি ও চিন্তার চর্চার সুযোগ ও অভ্যাস যে-সমাজে থাকে না সে সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল ও মেরুদন্ডহীন হতে বাধ্য। এমন যে শুধুমাত্র বর্ণনাত্মক, বিবরণাত্মক কল্পনাশ্রয়ী গদ্য, সে গদ্যও মানবচিত্তে গ্রহণীয় হতে হলে তার ভেতর যুক্তি শৃঙ্খলা কার্যকারণ পরম্পরা, নিয়ম সংযমে বাঁধা শব্দচয়ন, পদবিন্যাস ও বাক্যগঠনের রীতিপদ্ধতি ইত্যাদি মেনে চলতে হয় সুস্পষ্ট বোধগম্যতার দাবি স্বীকার করে নিতে হয়। তেমন গদ্যের পরিচয়ও উনিশ শতকের আগে বিশেষ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রেও রামমোহন-মৃত্যুঞ্জয়ই প্রাক-প্রত্যূষের সূচক। সুতরাং গদ্যভাষার ভেতর দিয়ে যে যুক্তিশৃঙ্খলা ও মননশীলতার, যে যথাযথতার ও বস্তুময়তার সঞ্চার হয় সমাজের চিত্ত ও চেতনায় তার বিশেষ কোনো সুযোগ মধ্যযুগীয় বাঙালি সমাজে ছিল না।

 

তা ছাড়া, যারা বাংলা ভাষার স্বভাব জানেন তারা একথাও জানেন, আগেও অনেকে একথা বলেছেন, এভাষার উচ্চারণ পদ্ধতি হ্রস্ব দীর্ঘস্বরের তারতম্যহীনতা, পদবিন্যাস ও বাক্যগঠন রীতি এমন যাতে এই গদ্যরীতিতে দৃঢ়তার সঞ্চার করা বড় কঠিন, পারা যায় না বললেই চলে। বাক্যগুলোর ঝোঁক কেমন যেন এলিয়ে পড়ার দিকে। বাংলা গদ্য নির্মাণে যারা প্রথম ব্রতী হন সেই রামমোহন ও মৃত্যুঞ্জয়ের চোখেই এই ত্রুটি ধরা পড়েছিল। এ ত্রুটি সংশোধন করে বাংলা গদ্যে দার্ঢ্য সঞ্চারের জন্য এঁরা সংস্কৃতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এঁরা দুজনাই শাস্ত্রচর্চা ও বিচার যখন করেছেন তখন তো একেবারে সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থের ভাষা ও বাকভঙ্গি একেবারে ঘেঁষে ঘেঁষেই চলেছেন, কেউ বা কোথাও কম। এরা দুজন বিশুদ্ধ বর্ণনাত্মক গদ্য যখন লিখেছেন তখন তাদের ভাষা সংস্কৃত ঘেঁষা হয়ত নয় কিন্তু সংস্কৃত নির্ভর, একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। পরেও যাঁরা বাংলা গদ্য নির্মাণে অগ্রণী হয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলেই ভাষায় দৃঢ়তা সঞ্চারের জন্য প্রায় সর্বদাই তৎসম ও তদ্ভব শব্দ, সন্ধি-সমাস, কৃৎ-তদ্ধিত শতৃশানচ প্রত্যয়, সংস্কৃত শব্দ ও পদবিন্যাসের ধ্বনিমহিমা প্রভৃতি ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করেছেন। বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের কথা না হয় বাদই দিলাম; তাঁরা তো করেইছেন, বঙ্কিমচন্দ্র তো তাঁর উপন্যাস, প্রবন্ধ নিবন্ধাদিতেও করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথও করেছেন, বিশেষ ভাবে করেছেন তাঁর মননশীল প্রবন্ধাদিতে, রাজা ও প্রজা থেকে শুরু করে সভ্যতার সংকট পর্যন্ত সে প্রমাণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। তাঁর সাহিত্যালোচনার ভাষা ও ধ্বনি তো একান্তই সংস্কৃত-এর প্রতিধ্বনি। ক্রিয়াপদের রূপ যাই হোক, চলিত ভাষার সবচেয়ে সোচ্চার প্রবক্তা প্রমথ চৌধুরীও যখন মননশীল রচনা লিখেছেন তখন তিনিও সংস্কৃত-এর প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেন নি। আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যিনি বলতেন সংস্কৃত হচ্ছে বাংলার অতি-অতি-বৃদ্ধ প্রপিতামহ যার কথা স্মৃতিতে ধারণ করবার প্রয়োজন বাংলা গদ্যলেখকদের একেবারেই নেই, তিনিই কি পেয়েছিলেন? তাঁর প্রাচীন সাহিত্যের আলোচনায় বৌদ্ধধর্ম সাহিত্য ও সমালোচনা ও বিশ্লেষণে কি সংস্কৃত ও সংস্কৃতাশ্রিত সাহিত্যের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় না। হ্যাঁ, যায় না একমাত্র ভাষার যাদুকর অবনীন্দ্রনাথের গদ্যে কিন্তু অবনীন্দ্র-গদ্যে তো রূপকথা কল্পকাহিনি পশুপক্ষী ভূতপত্রীর দেশের কথাই লেখা যায়, সে গদ্যে কি অন্য আর কিছু লেখা যায়! মননশীল, যুক্তিনির্ভর রচনা দূরে থাক, গল্প-উপন্যাসও বোধ হয় লেখা যায় না সে ভাষায়। বর্ণনাত্মক-বিবরণাত্মক গদ্যে, অর্থাৎ গল্প উপন্যাস ভ্রমণকাহিনি আত্মচরিত জাতীয় রচনায় লিখিত ভাষা ক্রমশ লোকের মুখের ভাষার কাছাকাছি এসে গেছে ক্রমশ আরও যাচ্ছে, সহজ হবার দিকে, প্রাঞ্জলতার দিকে দেশজ শব্দ ও দেশীয় বাক্ভঙ্গি পদ ও পদাংশ ব্যবহারের দিকে প্রবণতা বাড়ছে। এটা হওয়াই স্বাভাবিক এবং এতে কিছু শংকাবোধের কারণ নেই। কারণ যে নেই তার প্রধান হেতু হচ্ছে গদ্য যুক্তিনির্ভর, বুদ্ধির ও যুক্তির নিয়মশৃঙ্খল, কার্যকারণ পরম্পরার নিয়মশৃঙ্খল, তাকে মেনে চলতেই হয় তা না হলে পাঠকচিত্তে স্বীকৃতি লাভ করা যায় না। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের গল্প উপন্যাসের ভাষা এমন কি শেষের কবিতা এবং রবিবার-এর গল্প তিনটির ভাষাও। আর শরৎচন্দ্রের কথা যদি এ-প্রসঙ্গে বলতেই হয় তাহলে আমার বলতে দ্বিধা নেই, শরৎচন্দ্রের গদ্যের ভিত তো রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে, চোখের বালিতে চতুরঙ্গে ঘরে বাইরেতে। কথাবাড়িয়ে লাভ নেই, সংক্ষেপে বোধ হয় বলা যেতে পারে শরৎচন্দ্রের পর যাঁরা সার্থক গল্প উপন্যাস বা আত্মচরিত ইত্যাদি লিখছেন, ভাষার দিক থেকে তাঁরা প্রায় সকলেই অল্পবিস্তর রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র অনুসারী; কারু বা বাঁধুনী শিথিল কারু বা ঠাস বুনানো, কারু গতি শ্লথ গতি বা উপলব্যথিত কারু বা দ্রুত তির্যক। কিন্তু যেহেতু বুদ্ধি, যুক্তি ও কার্যকারণ পরম্পরার শৃঙ্খলা ছাড়া পাঠকচিত্তে স্বীকৃতি লাভ করা যায় না সেইহেতু কোনো লেখকই তাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। এই শৃঙ্খলাকে মূর্ত করে তোলে যে বস্তু তার নাম ভাষা। গদ্য ভাষার যাদু এই শৃঙ্খলার মধ্যেই নিহিত। এই শৃঙ্খলারই অন্য নাম ছন্দ, তাল, লয়, মান, পরিমিতিবোধ, ধ্বনি ও ব্যঞ্জনাবোধ ইত্যাদি। এক কথায়, ভাষার শুচিতাবোধ। চমকে উঠবার কোনো কারণ নেই, এই শুচিতাই ভাষার প্রাণ। গল্পে উপন্যাসে কল্পনার মুক্তগতির স্থান তো আছেই, কিন্তু গদ্যরচনা সে মুক্তগতি বিহঙ্গকেও যুক্তি ও বুদ্ধির বশ্যতা স্বীকার রা করে উপায় নেই।

এ পর্যন্ত যা বলেছি তার ‘ক্ষীরমিবাম্বুমধ্যাৎ’ হচ্ছে এই

 

(ক) বাংলা ভাষার মেরুদন্ডাস্থির নির্মিতি দুর্বল, সেজন্য বাংলা গদ্যের নির্মাতারা সকলেই সংস্কৃত এর দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছেন। এ কথা আর নতুন করে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না যে বাংলা গদ্যে দার্ঢ্য সঞ্চার করতে হলে সংস্কৃত-এর দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই অব্বশ্যই যদি আমরা বাংলা গদ্যের চরিত্ররক্ষায় আগ্রহী থাকি।

(খ) গদ্যের ধর্ম বুদ্ধি, যুক্তি ও কার্যকারণপরম্পরার স্বীকৃতি নির্ভর তা না হলে কোনো গদ্যভাষা পাঠকচিত্তে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে না। অন্য কথায় ও অন্যার্থে, গদ্যভাষা মানসিক শৃঙ্খলানির্ভর, কবিতার মতো ততটা কল্পনানির্ভর নয় পঞ্চেন্দ্রিয়-নির্ভর নয়। তৎসত্ত্বেও কবিতার মতোই, গদ্যেরও ছন্দ আছে, তাললয়মান আছে, ধ্বনি ও ব্যঞ্জনাবোধ আছে, পরিমিতিবোধ আছে। এই মৌলিক শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো ভাষা গড়ে উঠতে পারে না। এই শৃঙ্খলার মধ্যেই নিহিত আছে ভাষার শুচিতা; এই শুচিতাই ভাষার প্রাণ।

এতক্ষণে সময় হলো চলমান গদ্য সম্বন্ধে আমার শংকার কথা বলবার এর পর আমার যা বক্তব্য তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।

 

কিছুদিন যাবতই লক্ষ্য করছি বিগত প্রায় দুই তিন দশক যাবত আমাদের গল্প উপন্যাসের গদ্যে, belles letters যার বাংলা আমরা করেছি রম্যরচনা, সেই গদ্যে, আত্মচরিত, ভ্রমণকাহিনি জাতীয় রচনার গদ্যে বেশ কিছু শৈথিল্য; সকলের রচনায় অবশ্য নয় কিন্তু অনেকের রচনায় এবং সেই অনেকের মধ্যে বহুখ্যাত বহুলপঠিত লেখকরাও আছেন। এই শৈথিল্য ধরা পড়ে শব্দচয়নে, পদবিন্যাসে,বাক্যগঠনে, যতিচিহ্ন ব্যবহারে, অনুচ্ছেদবিভঙ্গে, বয়নের অপরিপাট্যে, ধ্বনি-প্রতিধ্বনির প্রতি মনোযোগের অভাবে। দৃষ্টান্তে উল্লেখ করা কঠিন নয়, কিন্তু লেখকেরা প্রত্যেকেই আমার ঘনিষ্ঠ, সুহৃৎ, প্রীতিভাজন বন্ধু। সুতরাং দৃষ্টান্ত উল্লেখে বিরত থাকা ছাড়া আমার অন্য উপায় নেই। তবে একথা না বলে উপায় নেই যে, আমাদের গদ্যের ভাষা নিয়ে একটু সচেতন হবার সময় হয়েছে, যেহেতু ভাষার শুচিতার উপর নির্ভর করে বঙ্গভাষাভাষী সমাজের জনসাধারণের চরিত্রের শুচিতা। এ শুচিতা কোনো ছুঁৎমার্গীয় শুচিতা নয়; যে শুচিতার কথা একটু আগে বলেছি এ সেই শুচিতা। ‘যাবনী মিশাল’ ভাষার আনকোরা কাঁচামাটির কাদামাটির কটু গন্ধমাখানো দেশজ শব্দ, পদ, শ্ল্যাঙ, গালিগালাজে-বোনা ভাষায়ও আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু এই মেশানো, এই ধরনের বোনার মধ্যেও একটা পরিমিতিবোধের, ছন্দবোধের ধ্বনি ও ব্যঞ্জনাবোধের, সর্বোপরি একটা সমাজবোধের প্রশ্ন আছে। এ-সব প্রশ্নের চেতনা যে-ভাষার রীতি ও রূপের মধ্যে নেই সে ভাষা সমাজের আবহকে দূষিত করে।

 

ভাষা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষাতেও কারু আপত্তি কিছু থাকতে পারে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকবে এটাই তো একটা জীবন্ত চলমান ভাষার যৌবনের লক্ষণ। তা না হলে ভাষার অগ্রগতি হবে কী করে। এ-বিশ্বাস আছে বলেই না অভিধান ঘেঁটে ঘেঁটে হোঁচট খেতেও সুধীন্দ্রনাথের গদ্য পড়ি, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হলেও কমল মজুমদারের গদ্য পড়ি যেমন করে একমসয় পড়েছিলাম জয়েস-এর Ulysses থেকে শুরু করে Finnegans Wake পর্যন্ত ছাত্রের মতো প্রত্যেকটি শব্দ, পদ, ছত্র, বাক্য অনুসরণ করে করে। মানুষ পরিশ্রম করে কিছু ফল লাভের আশায়। কষ্ট করে জয়েস পড়ে লাভ হয়েছে এই, বুঝতে পেরেছি ইংরেজি ভাষার দিগন্ত প্রসারিত করতে না পারলেও মানুষের চেতনার দিগন্ত প্রসারিত করবার একটা পথ তিনি দেখিয়েছেন, এবং তা ভাষা পরীক্ষার মাধ্যমে। ঠিক একই কথা বলা যেতে পারে কমল মজুমদারের অন্তর্জলী সম্বন্ধে। কিন্তু তাঁর পরের রচনাগুলি সম্বন্ধে কি বলব জানিনে। সকল ধর্মের esoterism বলে একটা বন্তু থাকে। সমাজের ক্ষুদ্র একটি কোণে, গুহার অন্ধকারে, নানা অবুদ্ধিগ্রাহ্য অসামাজিক ক্রিয়াকর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা সেখানে হয়, যেমন হয়েছিল আমাদের দেশে বজ্রযানী, সহজযানী বৌদ্ধদের মধ্যে নাথপন্থীদের মধ্যে- অবধূত কাপালিকদের মধ্যে। ভাষার ব্যাপারেও এ-ধরনের esoteric পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারে, হয়ও কিন্তু তার কি কোনো বৃহত্তর সামাজিক মূল্য আছে? আমার কেমন যেন একটা আশংকা হয়, এই esoterism-এর মোহাকর্ষণ কি এ-ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যায়? সুধীন্দ্রনাথ যখন বাংলা গদ্যে দার্ঢ্য সঞ্চারের জন্য অপ্রচলিত তৎসম বা তদ্ভব শব্দ ও পদ ব্যবহার করেন তখন আমি প্রশংসমান, কিন্তু তাঁর গদ্যেরও এ ধরনের esoterism নেই এ-কথা বলতে আমি অক্ষম। এ-কথা আমার অজানা নয় যে কোনো প্রাচীন শব্দ পদ বা কাহিনির নতুন অর্থসন্ধান ও প্রতিষ্ঠা-প্রয়াসের স্বাধীনতার যে কোনো লেখকেরই আছে। এ-ধরনের নতুন অর্থের সন্ধান ও প্রতিষ্ঠা রবীন্দ্রনাথ যে কত করেছেন তার হিসেব নেই, এবং এমনভাবে করেছেন যে সহজে তা বোঝাই যায় না; অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন অর্থ আমরা ভুলেই গেছি, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া অর্থই এখন দাঁড়িয়ে গেছে। এ ধরনের চেষ্টা সুধীন্দ্রনাথ করেছেন কিন্তু সকল ক্ষেত্রে কি তা সার্থক হয়েছে? Art for artÕs sake অর্থে কলাকৈবল্য শব্দের ব্যবহার তার একটি মাত্র দৃষ্টান্ত, এমন দৃষ্টান্ত আরও অনেক আছে।

 

ভাষা সামাজিক বস্তু; সমাজের প্রয়োজনে তার সৃষ্টি, বিকাশ ও পরিণতি। সমাজের কথা এড়িয়ে গিয়ে বা আড়াল করে একান্ত ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ যে-ভাষায়, সে গদ্যভাষা সামাজিক আদান-প্রদানের, ভাব ও চিন্তা বিনিময়ের ভাষা হতে পারে না।

 

আমার শংকার দ্বিতীয় কারণ, পশ্চিমবঙ্গের চলমান সাংবাদিকতার ভাষা। গত দশ বার বছরে এ-ভাষার প্রভাব দ্রত বর্ধমান, এবং আজ তা খবরের কাগজের পৃষ্ঠা থেকে উঠে এসে গল্প-উপন্যাস রম্যরচনার ভাষায় ঢুকে পড়েছে বানের জলের মতো। দেখতে দেখতে যেন কল্পনাশ্রয়ী ও বর্ণনাত্মক সৃষ্টিমূলক সাহিত্যের ভাষা হয়ে উঠল সব রম্যরচনার ভাষা, যে রম্যতা চটুল, তির্যক, ক্ষণিক। স্থিরচিত্তে ভাবতে গেলে মনে হয়, সাংবাদিকতার ভাষা হওয়া উচিত স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, নৈর্ব্যক্তিক ও যথাযথভাবে প্রতিচ্ছবি; নিরক্ত নয় কিন্তু নিবর্ণাঢ্য। কিন্তু নানা কারণে পৃথিবীর সর্বত্রই এখানে ওখানে দু-চার-দশ খানা জাতীয় সংবাদপত্র ছাড়া, বিশেষভাবে সংবাদ ও সংবাদ নির্ভর মন্তব্যবাহী সাপ্তাহিকে, পাক্ষিকে, সাংবাদিকতার ভাষা আর কোথাও নৈর্ব্যত্তিক নেই, দ্ব্যর্থহীন নেই, যথাযথতার প্রতিচ্ছবি নেই, বরং অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে বর্ণাঢ্য, চিত্রালু, চটুল, চতুর ও তির্যক এবং পক্ষপাতদুষ্ট। যে-মন্তব্য করলাম তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের Time, Newsweek প্রভৃতি সাপ্তাহিক। ভালর জন্য কি মন্দর জন্য, জানিনে, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাদের সার্থক, প্রতিপত্তিশালী সম্পাদক, বার্তা-প্রতিবেদক ও বার্তা-সম্পাদক যারা তাঁরা সকলেই এই জাতীয় বিদেশি সাপ্তাহিক-পাক্ষিকগুলোর হুবহু নকল করে যাওয়াই সাংবাদিকতার চরম পরম উদ্দেশ্য বলে মনে করেছেন; ইংরেজি পত্র-পত্রিকাগুলোর তো কথাই নেই, বাংলাগুলোতেও। সবচেয়ে বড় এবং আমার মতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে Time, Newsweek -এর ইংরেজি গদ্যের প্রভাব বাংলা গদ্যের উপর। সেই ভাসা ভাসা চটুল চাতুর্য যাকে বলা হয় smartness,ব্যক্তিগত ভালো বা মন্দ লাগার বর্ণাঢ্য বর্ণনা, ভাষার তির্যক গতি, বাকভঙ্গির অপূর্ব কুশলতা বা sophistication! বাঙালি পাঠক এ গদ্য পড়ে মুগ্ধ, এবং হয়ত ভাবেন যে, এই হচ্ছে বাংলা ভাষার যথার্থ রূপ ও রীতি!

 

বাংলা সাংবাদিকতার এই ভাষায় আমার শংকিত হবার কারণ হয়ত কিছু নেই। আমি জানি, সকালবেলায় ধূমায়িত চা-এর সঙ্গে সঙ্গে যে বাংলা দৈনিকটি পড়া হয় বেলা ১০টার পর তা মাটির ধুলোয় গড়াগড়ি যায়, কেউ আর তার দিকে ফিরেও তাকায় না। কিন্তু সমাজ জীবনে ক্ষণিকের জীবনতৃষ্ণাও যে মেটায় তারও তো কিছু দাবি দাওয়া থাকে; সে দাবি দাওয়া কি এত সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায়? বোধ হয় না। ঠিক এই কারণেই অন্তত শহুরে বাঙালির রুচি গত দশ পনের বছরে এই ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেছে, এবং তারই ফলে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটছে, ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। এমন কি, কলকাতা শহরতলার মুখের ভাষায়ও তা ঢুকে গেছে। যে-যুগে আমরা বাস করছি, সে-যুগে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরাবগাহ।

আমি রাজনৈতিক নেতা নয়, সামাজিক নেতাও নয়। আমি মানব সংস্কৃতির ইতিহাসের দীনতম একজন ছাত্র মাত্র। সেই হিশেবে আমি একটি শংকার কথা আপনাদের কাছে নিবেদন করলাম সভয়ে সবিনয়ে। শেষ করার আগে একটি প্রার্থনা উচ্চারণ করি,  রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে

বাঙালীর পণ, বাঙালীর আশা

বাঙালীর কাজ, বাঙালী ভাষা

সত্য হউক, সত্য হউক

সত্য হউক, হে ভগবান।

 

জামসেদপুরে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলন, ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরের শেষে মূল সভাপতির ভাষণ

Facebook Twitter Email