অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

Facebook Twitter Email

সম্প্রতি মারা গেছেন বিশিষ্ট অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। ১৯৯০ সালে এপ্রিল মাসে এক দুপুরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই গুণী অভিনেতার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম তাঁর কাঁঠালবাগানস্থ বাসভবনে। তখন সংবাদপত্রে কাজ করতাম।আনোয়ার হোসেন লোকান্তরিত হওয়ার পর আতিপাতি করে খুঁজে সাক্ষাৎকারটি পুনঃউদ্ধার করতে সক্ষম হই।

বাংলাদেশের নন্দিত ও জনপ্রিয় অভিনেতা আনোয়ার হোসেন ১৯৩১ সালে জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বিয়ে করেন ১৯৬১ সালে। তিনি ছিলেন চার সন্তান ও এক কন্যার জনক। জীবদ্দশায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

এ সাক্ষাৎকারটি যখন নেওয়া হয়েছিল তখন আনোয়ার হোসেন জানিয়ে ছিলেন, তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা তিনশ’র অধিক এবং তাঁর প্রথম অভিনীত প্রথম ছবির নাম ছিল ‘তোমার আমার’।

 

বর্তমানে বাংলাদেশের ছবি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

ছবির মেকিং উন্নত হয়েছে। কিন্তু ছবি তো নির্মিত হয় একটি কাহিনিকেই অবলম্বন করে। আজকালকার ছবির যে গল্প সেগুলো অনেকে বিশেষ করে সুধীজনেরা পছন্দ করছেন না। ছবিগুলো আসলে তাদের জন্য বানানো হচ্ছে না, বানানো হচ্ছে একেবারে সাধারণ দর্শকদের জন্যে। এর কারণ বিদগ্ধজনেরা এখন আর ছবি ঘরে গিয়ে ছবি দেখেন না। প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন ভিসিআর রয়েছে। হলে গিয়ে যারা ছবি দেখেন তারা সমাজের সাধারণ স্তরের মানুষ। সুতরাং যারা ছবি দেখেন না তাদের জন্যে ছবি বানানোর চেয়ে সাধারণ দর্শক যারা হলে গিয়ে ছবি দেখেন তাদের জন্যে ছবি বানানো হচ্ছে। তবে আমি আবারও বলছি, আগের দিনের ছবির তুলনায় এখনকার ছবির মেকিং মানে টেকনিক্যাল দিক অনেক উন্নত হয়েছে। যেমন আমি আমার আগের দিনের ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘এতোটুকু আশা’ দেখি তখন মনে হয় খুব স্লো, ব্যাকডেটেড ছবি আর কি? তবে অভিনয়ও বেশ উন্নত হয়েছে, শিল্পীদের এক্সপ্রেশনেরও পরিবর্তন হয়েছে।

 

আপনি বলেছেন, সুধীজনেরা এখন আর হলে গিয়ে ছবি দেখেন না। এর অর্থ কি মানসম্মত ছবি তৈরি হচ্ছে না এটি বড়ো সত্য নয়?

আসলে কিন্তু তা না। যেমন আমি একটা ছবি বানিয়েছি ‘পেনশন’। ‘পেনশন’ সিনেমা হলে চলে নি। একই ছবি যখন টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে তখন সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে। কিন্তু এঁরা যদি হলে গিয়ে ছবিটা দেখতেন তা হলে ছবিটা মার খেতো না। আর মার না খেলে সে ছবির প্রযোজক সেও বেঁচে যেত, আবার ছবি বানাতেন।

 

আপনি দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় করে আসছেন। নিজের অভিনয়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আমি অভিনয় করছি বেশ কিছুদিন হলো। তবু নিজের মূল্যায়ন করতে গেলে ভীষণ বিব্রত হতে হয়। একটা জিনিস আমি বুঝেছি, আমার অভিনয় মোটামুটি দর্শকেরা পছন্দ করেন। যদি পছন্দ না করতেন তা হলে পরিচালকেরা আমাকে তাদের ছবিতে কাষ্ট করতেন না। যেহেতু তারা এখনো আমাকে ডাকে তাতে অনুভব করি দর্শকদের কাছে আমার অভিনয় এখনো সমাদৃত হয়। যেদিন দর্শক আমার অভিনয় পছন্দ করবেন না, সেদিন তারা আমার যতোই বন্ধু হোক, আমাকে আর ডাকবেন না। এ থেকে বুঝি আমার অভিনয় দর্শক পছন্দ করেন।

 

তাহলে আপনি নিজেকে সার্থক অভিনেতা মনে করেন?

না, আমি নিজেকে সার্থক অভিনেতা মনে করি না। আমার অভিনয় করতে ভালো লাগে, মজা লাগে, তাই অভিনয় করি। সার্থকতা ঠিক বুঝিনা। বুঝিনা এ জন্যে, অভিনয়টা আমার কাছে পরকীয়া প্রেমের মতো। যাকে ভালোবেসেও পাওয়া যায় না তবু ভালোবাসতে হয়। অভিনয়টাও ঠিক পাওয়া যায় না, সম্পূর্ণ পাওয়া হয়ে ওঠে না। তবু তাকে ভালোবাসতে হয়।

 

শক্তিমান অভিনেতারা নাকি চলমান জীবন থেকে ম্যানারিজম রপ্ত করেন। আপনিও কি সেই রকম কিছু করেন?

মানুষের জীবনাচরণ থেকে অনেক অভিনেতা হয়তো ম্যানারিজম রপ্ত করেন। ম্যানারিজম ব্যাপারটি আমি ঠিক অতোটা ম্যান্টেইন করতে পারি না। তবে আমি পথে ঘাটে চলতে চোখ কান খোলা রাখি। একজন রিকশাওয়ালা ভাড়া হাতে নিয়ে হয়তো বললো- এটা কি দিলেন স্যার? এটা তার একটা অ্যাটিচ্যুড। আমি তাকে অনুকরণ করি, অবিকল তার মতো করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমি শুধু তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। এটা অনেকটা ফুল তোলার মতো। বাগানে গিয়ে আমি এলোপাথাড়ি ফুল তুলে নিই, এগুলো মনের কোঠায় সঞ্চিত রাখি। আমার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে যা আসে তাই অভিনয় করি। প্রত্যেকের মতো আমার নিজেরও নিশ্চয় একটা আলাদা ঢং আছে, আমি যেভাবে কাঁদাবো অন্য আরেক জন সেই ভাবে কাঁদাবে না, এটাই ম্যানরিজম, আমার কান্নাটা কিন্তু আমার আবেগ থেকে হবে। আমি বেশি নির্ভর করি আমার ইমোশনের ওপর।

 

সাধারণত কোন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে আপনার ভালো লাগে?

আমার ভালো লাগে, মাটির কাছাকাছি যে মানুষ তাদের হাসি কান্নার চরিত্রে অভিনয় করতে। এ্যলসেশিয়ান ডগ কিংবা লাল কার্পেট নয়। আশা করি আমি কি বলতে চাচ্ছি, আপনি বুঝতে পেরেছেন।

 

 

 

প্রথম দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে কি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন?

সে রকম কিছু হয়নি। বরং আমার আনন্দ লেগেছিলো। আনন্দ থাকলে ভয় ভীতি জড়তা আসতে পারে না। তবে প্রথম রেডিওতে অডিশন দিতে গিয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলাম। অডিশন রুমে কেউ নেই, সামনে মাইক্রোফোন ঝুলছে। আগে মঞ্চ নাটক করেছি, কিন্তু এভাবে তো কিছু করিনি। আমি প্রথম আমার নামটি পড়লাম। তারপর ….. অ্যা-অ্যা-ইই-ইই-করতে করতে লাইনগুলো আমার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেলো। তখন রেডিও অফিস ছিলো সেই নাজিম উদ্দিন রোডে। বড় জামান সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কণ্ঠটা বড়ো সুন্দর, এ রকম কণ্ঠ তো আমাদের রেডিওর জন্যে দরকার। কিন্তু আপনার এমন হলো কি করে? স্ট্রেইট বললাম, আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন এটা কিছু নয়, এরকম অনেকে ঘাবড়ায়, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এক কাজ করুন, আপনি কবিতা পড়েন, মাস দু’এক পরে আবার অডিশন নেয়া হবে। দু’মাস খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কবিতা টবিতা পড়ে আবার গিয়ে বড় জামান সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। আবার অডিশন নেয়া হলো, সিলেক্ট হলাম। বড় জামান সাহেব আমাকে ‘নৌফেল ও হাতেম’ নাটকে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দিলেন। অভিনয় করে সম্মানী পেয়েছিলাম পনেরো টাকা, জীবনের প্রথম রোজগার। পনেরো টাকার একটি চেক। চেক নিয়ে গেলাম স্টেট ব্যাংকে। ব্যাংক আমাকে কচকচে এক টাকার পনেরোটি নোট দিলো। টাকাগুলো এনে আমি বাবাকে দিলাম। বাবা টাকাগুলো মার হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও তোমার ছেলে রোজগার করে এনেছে, এক মজার ব্যাপার আর কি। সেই পনেরো টাকা নিয়ে আমার অভিনয় জীবন শুরু।

 

প্রথম ছবিতে অভিনয় করে কতো টাকা পেয়েছিলেন? 

আমার প্রথম ছবি ‘তোমার আমার’। এতে অভিনয় করে তিনশ’ টাকা পেয়েছিলাম।

 

নাটকের অভিনয় সম্বন্ধে আপনার মূল্যায়ন কী?

টিভি নাটকের অভিনয় টাইপড হয়ে গেছে। যেমন, আমি-আমি-আমি-আমি, একই কথা, একই সুরে, বারবার রিপিট করা হয়, এটা খারাপ লাগে, সাধারণত আমরা যেভাবে কথা বলি সেইভাবে কথা বললেই হয়। টেলিভিশনের অভিনয় সাধারণত নরমালই হবে। কারণ টেলিভিশনের অভিনয় আমরা ড্রয়িং রুমে, ঘরে বসে দেখি।

 

আপনার এ অভিযোগের জন্যে বোধহয় নাট্যকার দায়ী। কারণ তিনি যেভাবে সংলাপ রচনা করেন পাত্রপাত্রী তো সেরকম সংলাপই উচ্চারণ করেন। তাই নয় কি?

সংলাপের জন্যে নয়। এটা নির্ভর করে যিনি সংলাপ বলান, নাটকটি পরিচালনা করেন তার ওপর। আসলে আজকাল যারা অভিনয় করেন, তারা অধিকাংশ এসেছেন গ্রুপ থিয়েটার থেকে, ধারণাটা বোধহয় সেখান থেকে এসেছে। কিন্তু মঞ্চ আর টেলিভিশন দুটোর মাধ্যমগত পার্থক্য আছে। এজন্যে দেখা যায় মঞ্চে যারা নাম করেছে, টেলিভিশনে তারা সবাই না হলেও অনেকে মোটামুটি অভিনয় করে। আবার টেলিভিশনে যারা নাম করেছে চলচ্চিত্রে তারা তেমন সুবিধা করতে পারেন নি।

 

চলচ্চিত্র ও মঞ্চ নাটক দুটোর কোনটিতে আপনি অভিনয় করতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন?

দুটোর মিডিয়াই তো আলাদা তাই না? কাজে দুটোতে অভিনয় করে আনন্দ পাই। তবে চলচ্চিত্রাভিনয়ে একবার ভুল হলে, বারবার সংশোধন করে নেয়া যায়। কিন্তু মঞ্চ নাটকে সেই সুযোগটা নেই। নাটকে একবার যা বললাম তো বললামই, সেটি আর ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ নেই। নাটকে যে এক মাস দুই মাস রিহার্সেল দেয়া হয় সেই রিহার্সেলে অনেক কিছু শেখা যায়।

যেমন : একটি সংলাপ ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ নাটকে এটা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে বলে বলে একটাকে সেট করা যায়। নাটকে শেখার সুযোগ আছে, চলচ্চিত্রে শেখার কোনো সুযোগ নেই, চলচ্চিত্রে শিখে আসতে হয়।

 

আপনার জীবনে এখনো পর্যন্ত অপূর্ণ আকাক্সক্ষা কী?

আমি আরো ভালো অভিনয় করতে চাই। আমি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শকদের আনন্দ দিতে চাই, তাদের মনে দোলা দিয়ে যেতে চাই। কারণ আমি মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি তার চেয়ে মহার্ঘ্য আর কিছু হতে পারে না।

 

আপনি একজন এতো বড়োমাপের অভিনেতা হয়েও আজকাল খুব কম ছবিতে অভিনয় করেন কেন?

অভিনয় করব কোথায়? এখন কেউতো আমাকে খুব একটা ডাকে না।

 

আপনি সময় কাটান কিভাবে?

নামাজ পড়ি আর অবসর সময়ে রবীন্দ্র সংগীত শুনি। রবীন্দ্রসংগীত তো সব বয়সের মানুষের জন্য। রবীন্দ্রসংগীতে কি নেই বলুন? প্রেম, বিরহ দেশাত্ববোধ, আধ্যাত্মিকতা, সবই তো রবীন্দ্রনাথের গানে আছে। উদাহরণ দিয়ে বলব?

 

বলুন―

আমার যখন চেংড়া বয়স তখন আমি একটি মেয়েকে পছন্দ করেছিলাম। এক সময় এই পছন্দের মাত্রাটা এত বেড়ে যায় যে, সারাক্ষণ মনে হতো ওকে না পেলে আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে, আমি অন্ধকারে তলিয়ে যাব। তখন আমি ছাত্র, কিছুই করি না। তবু এই মেয়েকে বিয়ে করলে ওকে আমি কোথায় রাখব, খাওয়াব কি, এসব কিছুই আমার মনে উদয় হয় নি। একটি মেয়েকে নিয়ে আমার মনের অবস্থা যখন এ রকম তখন আমি গলা ছেড়ে গাইতাম, ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে শুধু তোমাকে জানি…।’ এখন এই প্রবীণ বয়সেও এই গানটি গাই। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, নবীন বয়সে যে গান আপনাকে প্রেমে শক্তি যুগিয়েছে এ বয়সে সে গান গাইলেও লাভ কি প্রেম তো আর করতে পারবেন না এবং সে গানের ভাবার্থও বদলাতে পারবেন না। হ্যাঁ, ভাবার্থ বদলাতে পারব না ঠিকই এবং আমার বর্তমান বয়সের সাথে জীবনবোধের পরিপ্রেক্ষিতও বদলিয়ে গেছে স্বীকার করি। তাই এখন আমি এই গানটি প্রার্থনার অংশ হিসেবে গেয়ে থাকি। যে গানটি চেংড়া বয়সে একটি মেয়ের কাছে প্রেমের দৃঢ়তা ব্যক্ত করার জন্যে সর্বোত্তম মাধ্যম মনে হয়েছিল এখন এই প্রবীণ বয়সে সেই একই গানটি গেয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে হাত উঠিয়ে বলি, হে মহান প্রভু তুমি আমাকে ক্ষমা করো, আমি ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে, জানিনে, শুধু তোমাকে জানি’। এই প্রসঙ্গে ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে’ পঙ্ক্তি ক’টির কথা একবার ভেবে দেখুন না। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা নিয়ে গবেষণা করেন তাঁরা হয়ত সুন্দর ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আমি তো সেই জ্ঞানীগুণীদের সারিতে পড়ি না। তবে একজন নগণ্য ব্যক্তি হিসেবে বুঝি, মানুষের যাবতীয় প্রার্থনার একটি মাত্র অর্থ কোনো শর্ত ছাড়া সৃষ্টিকর্তার নিকট আত্মসমর্পণ করা। এই পরম সত্য কথাটি প্রকাশের জন্য ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ রবীন্দ্রনাথের মতোন এত সুন্দর করে বাংলা ভাষায় আর কেউ বলেছেন কিনা আমি জানি না।

 

জহির রায়হান ও আলমগীর কবির এই দু’জন প্রগতিশীল পরিচালকের ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও ‘রূপালী সৈকত’-এর মূল চরিত্রে আপনি অভিনয় করেছেন। এই দুই পরিচালক সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

শুনুন, তরুণ বয়সে কবিতা আবৃত্তি অনুশীলনের সময় একজন উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’ আবৃত্তির জন্যও ভালো কবিদের কবিতা নির্বাচন করতে হয়। উদ্ধৃতিটুকু কার এ মুহূর্তে মনে করতে পারলে ভালো হতো কিন্তু মনে করতে পারছি না।

 

জীবনানন্দ দাশের।

ধন্যবাদ আপনাকে। রূঢ় শোনালেও কথাটা কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। অর্থাৎ যাঁরা ছবি নির্মাণ করেন তাঁদের পরিচালক বলতে বাধ্য হলেও বড়ো পরিচালক বলা যায় না। তবে কেউ কেউ বড়ো পরিচালক। চলচ্চিত্রে কিছু কিছু ছবিকে বলা হয় ডিরেকটরস্ ফিল্ম অর্থাৎ এঁদের ছবি দেখলে বোঝা যায় ছবিটির পেছনে একজন যথেষ্ট মেধাবী পরিচালক রয়েছে। বাংলা ছবিতে সত্যজিৎ রায় ছিলেন এ রকম পরিচালক। জহির রায়হান ও আলমগীর কবির ছিলেন সুশিক্ষিত এবং বেশ গুণী পরিচালক। জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’ করেছিলেন নির্দিষ্ট কোনো দর্শকের জন্য নয় সারা দেশের মানুষের জন্য। পরিচালক এ ছবির মাধ্যমে গোটা দেশের মানুষকে স্বাধিকার চেতনায় উজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। মূলত এই ছবির নায়ক আমি আনোয়ার হোসেন নয়, আসলে নায়ক ছিলেন বাংলাদেশের জনগণ। যে পরিচালক ব্যক্তির চেয়ে নিজ দেশের জনগণকে নায়কে উত্তীর্ণ করেন অথবা মুখ্য চরিত্র করে ছবি নির্মাণ করেন, সে তো অবশ্যই শ্রদ্ধার পাত্র। আলমগীর কবিরের ‘রূপালী সৈকত’ ছিল একটি পরিচ্ছন্ন রুচির ছবি। আলমগীর কবির সমাজের ওপরের আর নীচের তলার মানুষের পার্থক্যটা বুঝতেন। যে কটি ছবি সে করেছেন এর কোনটিতে নায়ক নায়িকারা বড়ো লোকের মেয়ে অথবা ছেলে অপেক্ষাকৃত গরীব ঘরের কাউকে ভালবেসে কিংবা বিয়ে করে ঘর সংসার ফেঁদে বসে নি। আলমগীর কবির তাঁর নির্মিত কোনো ছবিতে অলৌকিক কল্পনার বিলাসিতা করেন নি। ফর্মুলা ছবিতে যেমন গাড়ি দ্বারা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তাকে টেনে টেনে প্রেমের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় সে রকম উদ্ভট ছবি উনি করতেন না। কিংবা অনেক ছবির কাহিনিতে যেমন দেখা যায় বস্তির কোনো যুবক হঠাৎ লটারিতে টাকা পেয়ে দানবীর হয়ে কি সব মহৎ কাজে নেমে পড়ে এবং বড়ো লোকের মেয়ে বিয়ে করে। এ রকম ছবি বানানোর বেসাতি উনি করেন নি। আলমগীর কবির অত্যন্ত সমাজসচেতন ছিলেন বলে অবাস্তব, অলৌকিক বিষয় নিয়ে ছবি করার জন্য সময়ের অপচয় করেন নি। এমনকি তাঁর ছবিতে অপ্রাসঙ্গিকভাবে কোনো গান জুড়ে দিতেও তিনি পছন্দ করতেন না। আলমগীর কবির ছিলেন একজন মোহমুক্ত পরিচালক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ তাই তাঁর ছবিও ছিল স্বচ্ছ।

 

কার অভিনয় আপনার ভালো লাগে?

কাকে রেখে কার কথা বলবো?

 

আনোয়ারা আপার কথা বলুন। ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’য় আলেয়ার চরিত্রে উনি তো অসাধারণ অভিনয় করেছেন।

আনোয়ারা কোন চরিত্রে সাধারণ অভিনয় করেছে? বরং বলা যায়, আনোয়ারা যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সে চরিত্রই অসাধারণ হয়ে ওঠেছে। আনোয়ারা আসলে একজন বড়ো অভিনেত্রী। ওর অভিনয়-নৈপুণ্য এত চমৎকার যে, আমি মনে করি অভিনয়ের ওপর যদি কোনো পরীক্ষা নেওয়া হয় তাহলে আনোয়ারাকে একশর মধ্যে নব্বই এর উপরে ছাড়া নীচে কেউ নাম্বার দিতে পাবে না। আর আমি যদি সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একজন হই তাহলে পঞ্চাশ ষাট-এর উপরে উঠতে পারব বলে আশা করি না। আনোয়ারা যেই চরিত্রে অভিনয় করুক না কেন সেই চরিত্রানুগ অভিব্যক্তি এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে যে, এর মধ্যে কেউ ত্রুটি খুঁজে পাবে না। ভালো কথা নাটক, চলচ্চিত্র যদি বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য বিকাশের অংশ হয়ে থাকে তাহলে এক্ষেত্রে অভিনেত্রী আনোয়ারার অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ আছে কি? আজকাল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিল্পীদের নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়ে থাকে অথচ আনোয়ারার অভিনয় প্রতিভার কোনো মূল্যায়ন করা হয় নি কেন? কেন পুরস্কৃত করা হয় নি?

 

আপনার ভক্তদের সাথে দেখা হলে কীরকম অভ্যর্থনাপান?

ঢাকারই একটি কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি। অভিনয় করলেও আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করি। একদিন এক বন্ধুর সাথে আড্ডা সেরে বাসায় ফেরার জন্য বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছি। এ সময় অপেক্ষমান অনেক যাত্রীর ভিড় থেকে বয়স্ক এক যাত্রী বলে উঠেন, ‘আহা! কি লোকটি খাড়াইয়া আছে, রাজা সাজাও তো রাজা, ফকির সাজাও তো ফকির।’ ওই লোকের সাথে কাঁচা বয়সী এক ছেলে ছিল। সে জানতে চাইল, কেডা বাবা কেডা?

আরে ভালা কইর‌্যা চোক্ মেইল্যা দেখনা আমাগো আনোয়ার সাব্ খাঁড়াইয়্যা রইছে। বালকটি হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এভাবে সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, ঠেলা গাড়িওয়ালা থেকে সুধী দর্শক পর্যন্ত সবার ভালোবাসা আমি পেয়েছি।

Facebook Twitter Email