কবি দিলওয়ার

Facebook Twitter Email

কবি দিলওয়ারের কবিতা যারা পড়েন বা তাঁর সম্পর্কে জানেন, তারা সকলেই লক্ষ করবেন যে, মানবেতিহাসের প্রথম মানবশিশুটির প্রতি তিনি যেমন সংবেদনশীল ও অসহায়ত্বের তীব্র মমত্ববোধে কাতর, তেমনি যে-শিশু আজ ভোরে জন্মগ্রহণ করেছে, হোক না পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের পর্ণকুটিরে, তার প্রতিও কবির সমান সংবেদনশীলতা, মমত্ববোধ ও দায়। সেই দায় ও মমত্বকে কাঁধে নিয়ে পৃথিবীর খুব কম কবিই কবিতা লিখে গেছেন, কবিত্ব বা শিল্পের প্রশংসা পাবার তোয়াক্কা না করেই। বিশেষ করে কবিতাকে গণমানুষের অধিকার আদায়ের অস্ত্র ও এক কল্যাণকর ব্রত হিসেবে মোহময় পৃথিবীতে একটা গোটাজীবন কাটিয়ে দেওয়া কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব কি-না, তা একমাত্র শুভবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

 মানুষ ও মানবতাই কবি দিলওয়ারের জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র। শুধু কবিতা নয়, তাঁর প্রতিদিনের আলাপচারিতা, চিন্তা-চেতনা, গদ্যরচনা, খেদোক্তি, বক্তৃতা, তর্ক প্রভৃতিতে মানুষের মুক্তি ও প্রগতি, মানব হয়ে ওঠার প্রকল্প এবং মানবজাতির মহাঐক্যের সুর অবিসংবাদিতভাবে উচ্চকিত। গোটা জীবন-জুড়ে তাঁর আরাধ্যও ছিল তাই। এই আরাধ্য-বাসনা শৈশব থেকেই তাঁর মর্মমূলে যে-গেঁথে গিয়েছিল, নানা বক্তৃতা ও আত্মরচনা থেকে আমরা জানতে পারি; এবং এও উপলব্ধি  করতে পারি যে, দিলওয়ার খান-এর দিলওয়ার হয়ে ওঠার পেছনে সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেরও একটা সুগভীর ভূমিকা রয়েছে।

গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের মাঝামাঝিতে জন্মকারী এই মানব সন্তানটি শৈশব-কৈশোরে চাক্ষুষ করেছেন এক পৈশাচিক জগতের। আন্তর্জাতিক দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপরে দুইমেরু-কেন্দ্রিক স্নায়ুযুদ্ধ এবং জাতীয় দিক থেকে ভারত বিভাগ তথা বঙ্গবিভাজন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-এ-সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এতদ্-অঞ্চলের মানুষের ভেতরে যে-সুগভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, সেইসব ক্ষত নিয়েই জীবনের স্বাভাবিক ধাপগুলো অতিক্রম করছিলেন কবি। একদিকে অর্থহীন বিশ্বযুদ্ধের দানবীয় লীলা, মানবাত্মার পরাজয়, দুই মেরুকেন্দ্রিক পৃথিবীর ভয়াল রূপ, নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর পৃথিবীব্যাপী আগ্রাসন, অর্থপুঁজির বিস্তার, অস্ত্রের হুঙ্কার ও মারণাস্ত্রের মজুত; সর্বোপরি সমাজে বিদ্যমান অনাচার ও শোষণ; এবং অন্যদিকে দেশবিভাগে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের জন্ম, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভরপুর প্রতিবেশী দুই বাংলার মানুষের উন্মুল হয়ে ওঠার গল্প, নব্য ধনিকশ্রেণির উদ্ভব ও উল্লাস, নিঃসহায় মানুষের উৎপীড়িত জীবন ও বঞ্চনা যে-সমাজ-আবহ এবং প্রতিবেশ তৈরি করেছিল তার ইতিবাচক শক্তি হিসেবে এই কবিপুরুষটির শাণিত-সংগ্রাম। সর্বোপরি স্বদেশ ও স্বকালের মানুষের প্রতি এক অপ্রতিরোধ্য দায় ও দায়িত্বের  নিবিড় পরাকাষ্ঠা হিসেবে দিলওয়ারের কবিপ্রতিভার উন্মেষ ও উদ্ভাসন। একইসঙ্গে, জন্ম থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে-দুঃসহ নীতি বাঙালি জীবনের ওপর খড়্গহস্ত ছিল; বেসামরিক-সামরিক শক্তির দানবীয় ঘটনাক্রম, জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ আর এর সঙ্গে সকলপ্রকার অনাচার-উৎপীড়ন-অপ্রেম-বাধাবিপত্তি-বঞ্চনা-পীড়ন অতিক্রম করে যে-বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ও ক্রমবিকাশ, কবি দিলওয়ারের তারুণ্য ও যৌবনের উদ্যমতা অনেকটা এ-সবকে কেন্দ্র করেই।

 

সুতরাং দিলওয়ারের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তাই মানবেতিহাসের অমোঘ নিয়তি যেমন কার্যকর ছিল, তেমনি সমভাবে কার্যকর ছিল সমকালীন ইতিহাসের অপ্রতিরোধ্য ঘটনাপ্রবাহও। আর একজন বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে সমাজরাষ্ট্রের অপশক্তির বিরুদ্ধে লেখনি ধরা ছাড়া, প্রতিবাদী কবিকণ্ঠ হয়ে ওঠা ছাড়া তাঁর অন্য বিকল্প ছিল বলে মনে হয় না। কবি দিলওয়ারকে আমার কখনো মনে হয় গ্রিক অ্যাস্ফিথিয়েটারের কোনো বেদনাবিধূর চরিত্র, আবার কখনো মনে হয় ভারত-পুরাণের আরেক বেদনাবিধূর চরিত্র, রাবণের মতো। এরূপ মনে হওয়ার কারণ, তাঁর সমকালীন সমাজরাষ্ট্র, তাঁর সুগভীর মনীষা, তাঁর সংবেদনশীলতা এবং তাঁর ব্যক্তিজীবন-সকলদিক বিবেচনা করেই। দিলওয়ারের কবিতায় ঘুরে-ফিরে এসেছে গ্রিক-রোমান পুরাণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা-আসলে যার মর্মের প্রণোদনা সমকাল ও সমকালীন মানুষের দুঃসহ অনুভব ও বৈরি পরিবেশ। অনায়াসে তিনি তাই গ্রিক-পুরাণের ভেতর ঢুকে তমোহর ব্যক্তিসত্তা হয়ে ক্রান্তিকালের স্বদেশকে অনুভব করেন :

 

ফেডিপাইডিসের, আমার হৃদয়ের ম্যারাথনের সময়

সমগ্র সমতল ভূমি ঘিরে শত্রু সৈন্যের সমাবেশ,

আমি খবর পাঠাবো আমার বন্ধুদের  কাছে স্পার্টায় :

সেই দেশের বীরদের হাতে বৈরীনাশা হাতিয়ার

শাণিত বিদ্যুল্লতার মতো ক্ষণে নৃত্যমুখর…

 

দিলওয়ারের স্বদেশে এক ভয়াল যুদ্ধ হয়েছিল। উনিশ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তিনি তার স্বাক্ষী। এমন যুদ্ধ গ্রিসেও হয় নি। লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতাও এসেছিল। দিলওয়ারের  কাছে সেই রক্তদান, লক্ষপ্রাণ আর স্বাধীনতা বড়োই অর্থহীন ঠেকে বাস্তবের বর্তমান পর্যবেক্ষণ করে। সর্বদা তাঁকে ক্ষতাক্ত করে মধ্যসত্তরের নব্যস্বাধীন রাষ্ট্রের দানবীয় লীলা ও জাতির জনকের সপরিবার নৃশংস হত্যাকা-। স্বাধীনতাকে তাঁর কাছে অর্থহীন করে তোলে স্বাধীনতা-উত্তর সামরিক শাসন ও নানা অন্যায় জেল-জুলুম, হত্যাকা- এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে কেটেছেঁটে সাম্প্রদায়িক করে তোলার ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে সমাজ-রাষ্ট্রের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসা মুনাফাখোর দুর্বৃত্তরা যেভাবে ধীরে ধীরে সমাজের ও রাষ্ট্রের  ত্রাতা-ভাগ্যবিধাতা বনে গেল এবং এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমাজ-প্রতিবেশের ভেতর থেকে জন্ম নিল সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক গোষ্ঠী, দেশজুড়ে সৃষ্টি হলো এক অন্ধ মধ্যযুগীয় দাঁতাল চরিত্রের সমাবেশ- যাদের  দুর্বৃত্তপনা ও অশুভ তৎপরতা সমাজরাষ্ট্রের মুক্তি ও প্রগতির চাকাকে অকার্যকর করে তুলতে সর্বদা বদ্ধপরিকর হলো। এই অন্ধকার পরিবেশে সমগ্র স্বদেশের মানুষের হয়ে, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হয়ে, মানবাত্মার শুভ্রবাহক হয়ে, স্বদেশ ও মানুষের জন্য দিলওয়ারের গগণভেদী আর্তি শুনি :

 

সুউচ্চ অলিম্পাসের চূড়াবাসী দেবতাকূলই আজ

আমার ভায়ের, আমার বোনের, প্রিয়তম ও সন্তানদের

জঘন্য আরতি। তারা নতুন যুগের প্লুয়োটাস। তারা

দানবনিন্দিত মুনাফালোভের সুরম্য প্রাসাদকক্ষে বসে :

ইউরেপিডিস, এস্কাইলাস, সকোক্লিস আর আরোস্টোফানিসের

নাটকের পাতায় হিসাবের অংক কষে দেখো,

ফেডিপাইডিস, মনুষ্যের বীর্যরসে এরা কোন ধাতব রাক্ষস?

 

এইসব ‘ধাতব-রাক্ষস’ই সমাজ ও সভ্যতার চিরশক্র এবং এই শত্রুদের প্রতিই কবির শাণিত অস্ত্র। দিলওয়ার জানতেন সুবিধাভোগী এ-সব মনুষ্যবেশী জানোয়ার মেহনতি মানুষের রক্তচুষে খেয়ে তাদের দেহকে কংকালসার করে তুলছে। মানুষের মূল লড়াই আসলে এদের বিরুদ্ধেই। তাই তাঁর লড়াই চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু।

 

বলেছিলাম কবি দিলওয়ারকে ভারত-পুরাণের চরিত্র রাবণের মতোই ভাবতে ভালো লাগে। আর্যসভ্যতা রাবণকে রাক্ষস হিসেবে তুলে ধরলেও, নবযুগের বার্তাবাহক কবি মধুসূদন সে-রাবণকে আমাদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন এক মহাপুরুষ হিসেবে। প্রাজ্ঞ তিনি, দেশপ্রেমিক, ত্রাতা, পিতা ও স্বামী। সুগভীর চারিত্র্যিক গুণাবলি তাকে মহান পুরুষে পরিণত করেছে। তা না হলে রাবণ ট্র্যাজেডির নায়ক হবেন কীভাবে? রাবণের ট্র্যাজেডির মূলে স্বদেশের প্রতি দায়বোধ ও সন্তানের প্রতি সুগভীর মমত্ব। নিজের চোখের সামনে রাবণের স্বর্ণলঙ্কা অপশক্তির আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে; একে একে প্রিয় পুত্র ও জাতীয় বীরেরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, রাবণ শুধু বেঁচে থেকে দেখছেন তার প্রিয় স্বদেশ ও সন্তানদের বিনাশী-দৃশ্য। অর্থাৎ নিয়তির নিষ্ঠুর যজ্ঞে রাবণ অসহায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কিন্তু জীবনবিমুখ নন এতটুকু। স্বর্ণলঙ্কা বিদেশি শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে কি নিদারুণ আর্তি ছিল আমরা শুনি রাবণের মুখে : ‘বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে/একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে/নাশে বৃক্ষে হে বিধাতাঃ, এ-দুরন্ত রিপু/তেমনি দুর্বল দেখ করিছে আমারে/নিরন্তর…।’

 

ট্র্যাজেডির নায়ক রাবণেরই মতো অসহায় মাতৃভূমির এককোণে বসে ক্রনিক ব্রংকাইটিস রোগে ভুগতে ভুগতে দিনের পর দিন জীবন-জয়ী কবিতার মন্ত্র উচ্চারণ করছেন দিলওয়ার। তিনি কি ভেবেছিলেন প্রিয় দেশের এই নিষ্ঠুর পরিণতি? যুদ্ধজয়ী জাতির জীবনে এমন অপঘাত? মানুষ যেখানে দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, শোষিত  এবং রাষ্ট্রীয় যাতাকলে পিষ্ট? অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে, একে একে মারা গেছেন কবির প্রিয় পরিজন ও সহচর-সহচরীবৃন্দ। ভালোবাসার জ্বলন্তমূর্তি প্রেয়সী স্ত্রী আনিসা মারা গেলেন, তারপর শেষ জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী, আনিসারই সহোদরা, কবির দ্বিতীয় স্ত্রী ওয়ারিসা মারা গেলেন; সবশেষে মারা গেলেন প্রিয় কবিপুত্র কিশওয়ার। এই এক-একটি মৃত্যু কবিকে করে তুলেছে সহায়হীন, প্রাজ্ঞ ও শুদ্ধতম; করে তুলেছে নিবিড় দার্শনিক। না হলে প্রিয় পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁর মুখে এত স্বস্তি আসে কোথা থেকে? প্রাণ থেকে আসে কিভাবে এত সুন্দর মানবিক হাসি? কারণ তিনি মানুষ ও কবি।

 

মানুষের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হলো মানুষ, যে, বেশির ভাগ সময়ই মানুষ এটা ভুলে যায়। কবি দিলওয়ার তাঁর এই পরিচয় কখনো ভুলেন নি। আরেকটা পরিচয়ও তিনি সর্বদা মনে রাখতেন যে, তিনি একজন কবি, দারিদ্র্য- লাঞ্ছিত তৃতীয় বিশ্বের একজন কবি। সর্বশেষ তাঁর বক্তৃতা শুনেছিলাম মুরারিচাঁদ কলেজ মিলনায়তনে। কলেজ বার্ষিকী পূর্বাশা ২০০৭-এর মোড়ক-উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যের শুরুতেই তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন এভাবে, ‘আমার পরিচয়, মানুষের সন্তান আমি, মানুষ; এবং পরের পরিচয়, আমি একজন কবি।’ ওই বক্তৃতায় মানুষ ও কবি হিসেবে তাঁর দায়-দায়িত্বের কথা তিনি অকুণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন; এবং অকপটে বলে গেছেন মানুষ ও কবি হিসেবে তাঁর ব্যর্থতার কথাও। অনেক বছর আগে দিলওয়ারের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মানুষ হিসেবে আপনার অপরাধ কী?’ স্মিত হেসে কবির স্বতঃস্ফূর্ত জবাব ছিল, ‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধ হচ্ছে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসায় অবিচল থাকা।’ সদ্য লোকান্তরিত এই মানব সন্তান ও কবিকে হারিয়ে মানবজাতি তার এক পরম সুহৃৎ ও  শিল্পীকে হারালো। আর বাঙালি পাঠক বিশ্বসাহিত্যের মানবমুক্তির ওপর কবিকুল পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত, বের্টল্ড ব্রেখ্ট প্রমুখের সঙ্গে এই কবিকেও দীর্ঘদিন মনে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

‘মানুষ হিসেবে আমার অপরাধ হচ্ছে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসায় অবিচল থাকা’-দিলওয়ার

 

কবি দিলওয়ারের একটি সাক্ষাৎকার 

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন জফির সেতু ॥ সাল ১৯৯৮॥

 

[কবি দিলওয়ার (১৯৩৭-২০১৩)। গণমানুষের কবি হিসেবে স্বীকৃত ও পরিচিত। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক ও বাহক। জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৩৭, সিলেটের ভার্থখলায়। পিতা-মরহুম মোহাম্মদ হাসান খান। মাতা-মরহুমা মোছাম্মৎ রহিমুন নেছা। লেখালেখি করেছেন দেশবিদেশের নানা পত্র-পত্রিকায়, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায়ই। কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন ছড়া, গান, নানা ধরনের গদ্য ও দিনপঞ্জি। প্রথম প্রকাশিত কাব্য জিজ্ঞাসা। প্রকাশকাল ১৮৫৩। মোট প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা ১২। উল্লেখযোগ্য কাব্য হচ্ছে ঐকতান (১৯৬৪), উদ্ভিন্ন উল্লাস (১৯৬৯), স্বনিষ্ট সনেট (১৯৭৯), রক্তে আমার অনাদি অস্থি (১৯৮১), নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৭), সপৃথিবী রইল সজীব (২০০৪), দুই মেরু দুই ডানা (২০০৯) ও শ্রেষ্ঠ কবিতা  (২০১১) ইত্যাদি। Facing the Music  নামে তাঁর একটি ইংরেজি কাব্যও রয়েছে। ১৯৭৭ সালে সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে দিলওয়ারকে গণসংবর্ধনা প্রদানসহ তাম্রফলকে উৎকীর্ণ মানপত্র ও স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। কবিপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন একুশে পদক (২০০৮) সহ বাংলা একাডেমির সাহিত্য-পুরস্কার ও ফেলোশিপ (১৯৮০), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য-পুরস্কার (১৯৮৬), দেওয়ান গোলাম মোর্তজা সাহিত্য-পুরস্কার (১৯৯১) এবং আরও সম্মাননা ও পুরস্কার। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আমৃত্যু ভাতা দিয়েছে দেশপ্রেমিক এই কবিকে। উল্লেখ্য যে, স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে কবি দিলওয়ারের একাধিক দেশাত্মবোধক জাগরণী গান প্রচারিত হতো।

কর্মজীবনের প্রথমদিকে দিলওয়ার শিক্ষকতা করলেও পরবর্তীকালে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন। ১৯৬৭ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সিলেটে চলে আসেন এবং সিলেটের কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের নিয়ে গঠন করেন ‘সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা’।  এই সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বপর্যন্ত সিলেটে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৩-৭৪ সালে তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক গণকণ্ঠ-এর  সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৪ সালে দিলওয়ার ঢাকাস্থ রুশ সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত মাসিক উদয়ন পত্রিকার সিনিয়র অনুবাদক ছিলেন। তিনি ১৯৬৯-১৯৭০ সালে প্রকাশিত সমস্বর সাহিত্য সাময়িকীটি একাধিক সংখ্যা সম্পাদনা করেন।

কবি দিলওয়ার গত ১০ আক্টোবর প্রয়াত হন। নাগরিক কোলাহল-দূরবর্তী মফস্বলবাসী এই কবি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবিতায় সচল ছিলেন।

গণমানুষের কবি দিলওয়ারের বাষট্টিতম জন্মদিনকে সামনে রেখে ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসের সারা দুপুর জুড়ে এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন জফির সেতু। এখানে তা পত্রস্থ হলো।]

 

জফির সেতু : আপনার একটি কবিতা দিয়ে আজকের সাক্ষাৎকারটি শুরু করতে পারি। আপনার বিখ্যাত একটি কবিতা, যা বহুল পঠিত, ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন’; কবিতাটির শুরু এভাবে : ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন যদি অপরাধ হয়,/আমরা কি আজও দিতে পারলাম/ মানুষের পরিচয়?’ আমাদের প্রশ্ন-মানব ভাগ্যের  প্রশ্নে এই পিতা কে?

দিলওয়ার : তাহলে আমাকে যেতে হচ্ছে দূর অতীতে। আমার ছেলেবেলায়। তখন থেকেই আমার মন ছিল অনুসন্ধিৎসু । তাই স্কুল জীবন থেকেই সমাজতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। সেই সাথে রাষ্ট্রতত্ত্ব দর্শন, ধর্ম, মানুষের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে। এবং স্কুল জীবনেই একটি বই আমার হাতে এসে পড়ে। অমলদাশ গুপ্তের  আকাশের ঠিকানা, পৃথিবীর ঠিকানা ও মানুষের ঠিকানা -এ তিন প্রবন্ধসম্বলিত গ্রন্থখানি আমাকে খুবই আলোড়িত করে। তখন থেকেই আমি বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনেতিক প্রভৃতি বিষয়ের তুলনামূলক চিন্তা করতাম-চিন্তা করতাম দুই গোলার্ধের মানুষের ভাগ্য-দুর্ভাগ্য নিয়ে। আমি দেখতাম আমাদের সমাজে উচ্চশ্রেণির মানুষ নিম্নশ্রেণির মানুষকে কিভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, অবহেলার চোখে দেখে, পশু বিবেচনা করে। মানুষের মধ্যে এই বিভাজন, শ্রেণিবৈষম্য আমার তরুণ মনে নাড়া দেয়। আমি এসব নিয়ে একা একা চিন্তা করতাম, আমাদের সমাজে মানবতাবোধের অভাব বোধ করতাম। এসব ব্যাপার আমার মনকে প্রবল আঘাত দিত।

আমার আট/ন-বছর  বয়সের একটি ঘটনাবলি মনে পড়ে, মসজিদে গিয়ে আমি খোদার কাছে দোয়া করেছিলাম, আমার দেশের মানুষের শরীরে পুষ্টির অভাব, খোদা আমার শরীরে যেন আর গোশত না বাড়ে। আমি তখন খুব স্বাস্থ্যবান ছিলাম তো। শিশু মনের এই যে অভিব্যক্তি, সেই সময়ে এটা কোনো উদারতার প্রশ্ন নয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটা অভিব্যক্তির প্রকাশ মাত্র। এই যে কথাগুলো আমি বললাম, এখান থেকে একটা মানসিকতা তোমরা ধারণা করতে পারো-এই কবিতায় মধ্যে। কারণ, আমরা জানি, তাদের লেখা নিশ্চয়ই তোমরাও পড়েছ-রবীন্দ্রনাথের ছোটোবেলা, নজরুলের ছোটেবেলা; বিদেশি যারা-টলস্তয়,  ম্যাক্সিম গোর্কি, দস্তয়েভস্কি এদের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি তাদের ছোটোবেলার দর্শন, যা গেঁথে যায় অন্তরের মধ্যে, তা সমস্তজীবন তাড়া করে এবং অভিব্যক্তি ঘটে রচনার মধ্যে।

তোমরা নিশ্চই লক্ষ করবে আমার পুত্র কিশওয়ার (অকালপ্রয়াত কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার) যে সমস্ত কবিতা লেখে, তার সাথে আমার কবিতার বিষয়ভাবনার অনেক ব্যবধান। তার কারণ তার মানসিকতা যেভাবে গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ ভাবুকমনে তার মধ্যে মিস্টিসিজম কাজ করেছে প্রবলভাবে; কিন্তু আমার মধ্যে মানুষের জীবনধর্মটা খুব গভীরভাবে এসেছে-যারই একটা প্রতিফলন এই কবিতাটি। এই কবিতার সাথে ঐকতান-এর ‘নবজাতকের  প্রতি’ কবিতার একটা মেলবন্ধন তোমরা  দেখতে পাবে। এই কবিতা আমার  বড়োপুত্র শাহীনের জন্মের পর লেখা। যাই হোক,‘শ্রদ্ধেয় পিতা’ বলতে আমি  আমার সমাজ…। মনে রাখবে জাতিরাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানি। তারা জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় চেতনার মধ্য গ্রথিত করেছে, অন্তর্ভুক্ত করেছে। …তো ‘পিতা’ বলতে দেশীয় সমাজের নিয়ন্তা বা সমাজপ্রতিভূকে বোঝানো হয়েছে।

জফির সেতু : আমরা দেখতে পাই, আপনার কবিতার মূল লক্ষ্য মানুষ অর্থাৎ গণমানুষ। আপনার এই গণমানুষের ধারণা কি ব্যাখ্যা করবেন?

দিলওয়ার : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রসঙ্গ।  আমার গণমানুষের ধারণা হলো আমি মানুষের ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি-হ্যাঁ, দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থাৎ ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আমরা জানতে পারি, নিরস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ববান হওয়া; বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় ঠিক তার উলটো। ধর্ম একটি প্রতিভূ দাঁড় করিয়েছে-অ্যাডাম ও ইভ; আর বৈজ্ঞানিকরা নৃতত্ত্ব¡। নৃতত্ত্বের আলোকে বিচার করলে আমি স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি, এটা শেষ কোনো কথা নয় কিন্তু। এ-ব্যাপারে ইনসানিয়াত (কবিপুত্র কামরান ইবনে দিলওয়ার সম্পাদিত সাহিত্যপত্রিকা)-এ আমার একটি পঙ্ক্তি আছে, নিশ্চয়ই পড়েছ তুমি, ÔThe journey of life ends in death beyond death’…। এখন আমাকে জন্মগতভাবে খুঁজতে গেলে পিতা থেকে দাদা হয়ে পিছন দিকে লংমার্চ করতে করতে, দেখতে পারি, পৃথিবীর প্রতি ঘরে আমার অবস্থান বিদ্যমান। আমি যদিও সামাজিকভাবে খানপরিবারে ভার্থখলায় জন্ম; দেশের আশেপাশে আমার স্বজনরা বিস্তার করছে বা আছে, কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে পৃথিবীর এমন কোনো জাতি নেই যেখানে আমি নেই। অন্যদিকে বলা হয়ে থাকে, আমাদের ইতিহাস বিশ লক্ষ বছরের অর্থাৎ বিশ লক্ষ বছর ধরে মানুষের যে রূপ-আমরা কিভাবে এসেছি-এই যে অনুভূতি, এটাই গণমানুষের। এ-প্রসঙ্গে আমরা T. S. Eliot -এর ঐতিহ্যচেতনার ধারণা আনতে পারি। তাঁর মতের সাথে আমি শক্ত একটা মিল খুঁজে পাই-গণমানুষ আমার কাছে, ওই যে রিকশা শ্রমিক, টেম্পো শ্রমিক, এটার মধ্যে আমি নেই, এটা হলো একটি অংশ মাত্র। মূল গণচেতনার একটি অংশ। আমি বিশ্বাস করি আমি মানুষের বাচ্চা, এই যে …

জফির সেতু :  Child of mankind?

দিলওয়ার : হ্যাঁ, মানবজাতির সন্তান হিসেবে আমি বলছি। এই সত্যটা খুব ভালো করে বুঝেছিলেন, ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। যার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। তিনি মানবমুক্তির একজন শ্রেষ্ঠদূত।

জফির সেতু : কিন্তু মুক্তির প্রশ্নে একমাত্র শর্ত ওখানে ধর্ম নয় কি?

দিলওয়ার : যে-কোনো মানুষই  আষ্টেপৃষ্টে ধর্মের  সাথে জড়িত; একজন কট্টর কম্যুনিস্ট যদি মারা যায়, অথবা হিন্দু কি মুসলমান, তাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে শ্মশানে কিংবা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়…

জফির সেতু : এটা হয়ত একটা প্রথা হয়ে গেছে…

দিলওয়ার : কিন্তু প্রথা ভেঙেছিল কে? যদি ধর্মগুরুদের মধ্যে কেউ প্রথা ভেঙে থাকেন, তাহলে তুমি মনে রেখো প্রথম প্রথা ভেঙেছিল খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৩০০ বছর পূর্বে ইথনাটন, আসল নাম অমেন হোটেপ। সে ছিল ফেরাও। মিশরের। প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বড়ো আরাধ্য দেবতা ছিলেন আমন-রা, তো লোকটি যখন ক্ষমতায় আসল, সে ছিল কবি; যার অনেক কথা, বলা হয়, বাইবেলে ঢুকে গেছে পরবর্তীকালে । সে বলল, আমি মানি না, আমন-রা-কে মানি না। দেখো, তার ঐতিহ্য ও শত শত বছরের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসল। সে বলেছিল, যদি মানতে হয় তবে মানবো আটন বা সূর্যকে; এবং সে আটনের স্তোত্র রচনা করে। …ইসলামের নবীর মধ্যেও তার পূর্বপূরুষের চিরাচরিত  ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে দেখি।

জফির সেতু : আপনার কবিতা বরাবরই শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে,  সকল বৈষম্যের  বিরুদ্ধে হাতিয়ার। শ্রেণিহীন মানুষ নিয়ে লালিত আপনার যে-স্বপ্ন, সে-ক্ষেত্রে আপনাকে কি আমরা মার্কসবাদ প্রভাবিত কবি বলতে পারি?

দিলওয়ার :  শোনো, সেদিন মুসলিম সাহিত্য সংসদে একটা বক্তৃতায় আমি বলেছিলাম, যদি ইসলামের আবির্ভাব না ঘটত তবে সমাজতন্ত্রের সৃষ্টি হতো না।

জফির সেতু :  আপনি তাহলে বলতে চাচ্ছেন মার্কস ইসলামের সাম্যনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন?

দিলওয়ার : নিশ্চয়ই। এবং তুমি নিজে চিন্তা করে দেখ যেখানে আজও ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদ…, যেটা রবীন্দ্রনাথকে  পর্যন্ত কট্টর ব্রাহ্মণরা সহ্য করতে পারে না; বলে পিরালি ব্রাহ্মণ! তোমরা জানো ভি. পি. সিং ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন, যখন তা পাশ হয়ে যায় তখন অনেক ব্রাহ্মণ সন্তান গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।

জফির সেতু : কিন্তু মার্কসবাদে ধর্মকে উপেক্ষা করা হয়েছে, কার্ল মার্কস্ ধর্মকে আফিম বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং সমাজ অগ্রগতির পথে বাধা মনে করেছেন।  সে ক্ষেত্রে আপনি ধর্মকে কিভাবে দেখেন?

দিলওয়ার : কার্ল মার্কস্কে আমি একজন সেইন্ট হিসেবেই গ্রহণ করেছি। মাও সেতুংকেও করেছি, লেনিনকেও। …আমি মনে করি, যে-সব মানুষ মানুষদের থাকা-খাওয়ার  ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে, তারা বিধাতার অতি উত্তম সৃষ্টি; যারাই এই কাজ করেছে। কেননা তারা সুমার্জিত মানবতাবাদী সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত।

জফির সেতু : কিন্তু তারা তো, যেমন মার্কস, লেনিন নিজেদেরকে সন্ত হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন নি, তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করে গেছেন মাত্র, নয়, কি?

দিলওয়ার : আমরা বলতে পারি। তুমি যখন আমাকে কবি বলছ; আমাকে এ-আভিধা না দিলে তো কবি হতে পারছি না। মানুষ এই যে শব্দ আরোপিত করছে তা ভালো থেকে যেমন করছে, মন্দ থেকে তেমনি। …অন্যদিকে ধার্মিক, যে নাকি মানবকল্যাণের সঙ্গে জড়িত নয়, তার চেয়ে রক্তঘামঝরা মানবপ্রেমিক অনেক অনেক মহৎ ও উত্তম।

জফির সেতু : কিন্তু ওই যে মার্কসবাদে ধর্মকে…

দিলওয়ার : শোষণবাদ জিনিসটা মানুষের মজ্জাগত। এ-শোষণবাদ কিভাবে এসেছে? মানুষের ইতিহাসের পথ ধরে? প্রাচীন নীলনদের তীরে যারা বাস শুরু করেছিল, তারা সবাই ছিল সমান এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাদের মধ্যে শ্রেণিরূপ আমরা লক্ষ করি। দেখতে পাই পেশিশক্তির বলে ক্ষমতাবানরা শোষক হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় অনুগত শক্তির, তাদেরকে কেন্দ্র করে শাসন ও শোষণ শুরু হয়; তারা নাম ধারণ করে ‘ফেরাও’ (যার অর্থ হলো বড়োমিয়া)।

জফির সেতু : এবং মানুষের ইতিহাসে এও দেখি গোত্রের বা অঞ্চলের ক্ষমতাবান শাসক একসময় মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে নিজেকে অলৌকিক সত্তার প্রেরিত পুরুষ বলে দাবি করে বসে। এবং ধর্মবাদী হয়ে পড়ে। এও শোষণের প্রবল এক রূপ। মৃত্যুর প্রশ্নে সাধারণ মানুষ যেখানে ভীতু ও আড়ষ্ট। ড. ডানিয়েল  তাঁর Philoshopy of religion গ্রন্থে ধর্মের উদ্ভব সম্পর্কে এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন…

দিলওয়ার : কুমির যে-রকম তার শিকার ধরে একসঙ্গে খায় না, তাকে বাসস্থানে রেখে পঁচিয়ে ভক্ষণ করে, তেমনি একশ্রেণির মানুষ ধর্মের জীবন্ত সত্যকে দূষিত-গলিত করে তাদের রুটিরুজির পথ করে নেয়, এবং আমার বিশ্বাস মতে, কার্ল মার্কস্ ওদেরকেই আফিম ধর্মনীতির জন্মদাতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। যে-ধর্ম শোষণের হাতিয়ার হয়ে গেছে সেটাকেই তিনি আফিম বলে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে মার্কস্ তো বলেছিলেন, আমি যিশুকে ভালোবাসি যেহেতু তিনি শিশুকে ভালোবাসেন।

জফির সেতু : নিশ্চয়ই এই  ভালোবাসা ধর্মের প্রশ্নে নয়; মানব সন্তানকে যিশু ভালবাসেন বিধায়…

দিলওয়ার : মানুষের সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে আনুমানিক ছয়হাজার বছর। কিন্তু পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই প্রাণিজগতের বিকাশ ঘটতে কোটি বছর পেরিয়ে গেছে, এবং আমাদের  বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা হয়ত শিশু পর্যায়েই আছি; অন্যদিকে মানুষের অফুরন্ত ভবিষ্যৎ রয়ে গেছে। অতএব এখনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। অন্য বিবেচনায় পৃথিবী সৌরজাগতিক, সে-ক্ষেত্রে আমরাও মহাশক্তির একটা অংশ, আকাশের দিকে তাকালে এ-সত্য কি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না? সৌরজাত পৃথিবী থেকেই আমাদের উদ্ভব হয়েছে-এ-বোধ আমাকে অভিভূত করে।

জফির সেতু :  তাহলে কি আমরা বলতে পারি আপনি ডারউইনের বিবর্তনবাদে সমর্থন করেন?

দিলওয়ার : কুসংস্কারমুক্ত ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত না করে আমি বিবর্তনবাদের আবিষ্কৃত সত্যগুলোর আলোকে বিবর্তনবাদকে বিশ্বাস করি।

জফির সেতু : এখন কবিতা প্রসঙ্গে আসা যায়;  T.S. Eliot  বলেছিলেন, কবিতা কখনোই আত্মবাদী হতে পারে না। কবিতা নৈর্ব্যক্তিক। কবির ভূমিকা হবে মেকানিকের মতো। এলিয়টের কবিতায় তার উদাহরণ মেলে এবং পরবর্তীকালে অনেক কবি তাকে সমর্থনও করেন; কিন্তু আপনার কবিতায় আমরা আত্মবাদিতা লক্ষ করি, এটা একটু ব্যাখ্যা করবেন?

দিলওয়ার : এ-প্রসঙ্গে আমি T.S. Eliot -এর একটি কথা বলতে চাই। তিনি বলেছিলেন, The great poet, in writing himself, writes his time ,-এখানে great শব্দটা প্রয়োগ করা হয়েছে । আমি সেই শব্দটিকে বক্তব্য প্রকাশের খাতিরে সম্মান করি। আমাদের মনে রাখতে হবে ভৌগোলিক বিভাজনের কথা-প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের কথা। তখন এ-সত্য বেরিয়ে আসবে। প্রতীচ্যের মানুষ যে-সব বিষয়কে মোকাবেলা করেছে যেমন-সামাজিক, রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামরিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক ইত্যাদি; আমরা প্রাচ্যের মানুষ বহুলাংশে সে-সব থেকে এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। T.S. Eliot,যাকে বলা হয় ঐতিহ্যসন্ধানী কবি, তিনি নিশ্চয়ই এ-সব ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। তাই তার কবিতা বিষয়ে ধ্যান-ধারণা বা কবিতা তার দেশজ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। কিন্তু এখানে একটি কথা জেনে রেখো, এলিয়ট সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক কাব্যচেতনার অধিকারী ছিলেন না। প্রসঙ্গত বলতে পারি, এলিয়ট ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণকারী নোবেল বিজয়ী রুডিয়ার্ড কিপলিংকে নিয়ে  গ্রন্থরচনা করলেও নোবেল বিজয়ী ভারতীয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখার তাগিদ বোধ করেন নি।

জফির সেতু : আচ্ছা, কেউ কেউ-যেমন এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, হুইটম্যান প্রমুখ কবি কবিতাকে শ্রমসাধ্য বিষয় বলে মনে করেন; অন্যদিকে ওয়ার্সওয়ার্থ, কোলরিজ, ইয়েট্স প্রমুখ কবিরা কবিতাকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ বলে মনে করেন-এ-ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

দিলওয়ার : প্রথমেই বলে রাখি, প্রাবন্ধিক-গাল্পিক-ঔপন্যাসিক ইত্যাদি সৃষ্টি করা যায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, কিন্তু প্রকৃত একজন কবিকে সেই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করা কখনই সম্ভব নয়। প্রকৃত কবির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা অবশ্যই থাকবে; তবে যারা উৎকর্ষপ্রয়াসী কবি তারা তাদের সৃষ্টিকর্মকে শৈল্পিক  শ্রম দিয়ে কালোত্তীর্ণ করে তোলার চেষ্টা করেন। এ-ব্যাপারে একটা উদাহরণ দেয়া যায়। আমার প্রয়াত মার্কিন কবিবন্ধু নর্মান রস্টান-এর একটি কাব্যের  নাম  Thrive upon the Rock । এ-গ্রন্থে তাঁর একটি কবিতা নিবেদিত হয়েছে ওরিয়েক কাম্বারা নামক একজন জাপানি কবিকে উদ্দেশ্য করে। যে-কবি জীবনে মাত্র চারখানি গ্রন্থ লিখেছিলেন  এবং এ-গ্রন্থসমূহের পরিমার্জন করেছিলেন চল্লিশ বছর পর্যন্ত।

জফির সেতু : আমরা দেখতে পাই সাহিত্যের ইতিহাসে বিভিন্ন ইজম বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবিদের মধ্যে সেই চেতনা বারবার তাদের কবিতায় প্রবাহিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন সুররিয়ালিজম, ইমপ্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ফিউচারিজম, প্যাগানিজম, ফবিজম, ফ্রয়েডিজম ইত্যাদি বোধ/চেতন/ইজম কাজ করেছে; আপনার সমসাময়িক কবিদের কবিতায়ও। কিন্তু আপনার কবিতায় এ-ধরনের কোনো আধুনিক চেতনা আমরা লক্ষ করি না, এর কারণ কী?

দিলওয়ার : অতি তরুণ বয়সে আমার জীবনে গ্রন্থের মাধ্যমে কিছু সংখ্যক ধ্রুপদী কবি-সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের মধ্যে শাহনামার রচয়িতা ফেরদৌসি, মহাভারত রচয়িতা দ্বৈপায়ন, রামায়ণ-এর  বাল্মীকি, ইলিয়াড-ওডিসির হোমার, ডিভাইন-কমেডির দান্তে, ঈনিড-এর ভার্জিল, প্যারাডাইস লস্ট-এর মিল্টন, মেঘনাদবধ কাব্য-এর মধুসুদন প্রমুখ আছেন। তাঁদের একজন ছাড়া অন্য সবাই এসেছিলেন অনুবাদের মাধ্যমে। জন্মগতভাবে প্রাপ্ত আমার Classical চেতনায় এইসব মহৎ কবি ফল্লুধারার মতো কাজ করে গেছেন এবং আজও তারা আমার এক প্রবল নৈতিকশক্তি। আমি এদেরই আলোকে পরবর্তীকালে উল্লিখিত মতবাদকে সসম্মানে মূল্যায়ন করি।

জফির সেতু : আপনার উল্লিখিত কবিরা যে-যুগের আপনি তো সে যুগের নন, আপনি যন্ত্রযুগের মানুষ ও কবি, এই যুগের চেতনা আপনার মধ্যে প্রবাহিত হতে কি বাধ্য নয়?

দিলওয়ার : প্রবাহিত হতে বাধ্য বলেই আমি পৃথিবীকে একটি ঘুরন্ত গ্রহ হিসেবে গণ্য করি এবং বহু লেখায় সেটা ব্যক্ত করেছি। শুধু বাংলাদেশে নয়, এখনো পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে যারা এই পৃথিবীকে মাহাশূন্য ঘূর্ণমান গ্রহ বলতে রীতিমতো কুণ্ঠিত।

জফির সেতু : আমরা আমেরিকার সদ্য প্রয়াত কবি এলেন গিন্সবার্গ সম্পর্কে জানি বা বীট জেনারেশন সম্পর্কে-যে নগ্ন জীবনচেতনা বা জীবনাচরণ তাদের মধ্যে ছিল, যাকে তারা বলতেন সমকালীন আমেরিকা বা পাশ্চাত্যের জীবনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ-এ-সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

দিলওয়ার : প্রশ্নটির শিকড় আমেরিকা বা কোনো দেশকেন্দ্রিক নয়, বর্তমান মানবসমাজের আদি মানবসত্তা কেন্দ্রিক। সেই আদিম মানবসমাজের সুখ-দুঃখ হিংস্রতা-হৃদ্যতা ইত্যাদি মানবিক অনুভূতির আধুনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এদের মধ্যে। পঁয়ত্রিশ হাজার বছর পূর্বেকার যে-মানবগোষ্ঠীকে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা ÔThe wise man’ বলা হয়ে থাকে-এ-প্রসঙ্গে তার স্মরণ করতে পারি।

জফির সেতু : আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন আমাদের দেশের তরুণরা বর্তমানে  কবিতা বা সাহিত্যক্ষেত্রে উত্তরাধুনিক চেতনার চর্চা করতে প্রয়াসী-এ-ব্যাপারে আপনি কি ধারণা পোষণ করেন?

দিলওয়ার : প্রথমে দেখতে হবে কোন ধরনের  সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশের জনসমষ্টি বাস করছে; তখন আমরা জানতে পারব সর্বাধিক-সংখ্যক মানুষ প্রকৃত সমাজহীন সমাজের অধিবাসী। তদুপরি এই সমাজের আঙ্গিকগঠন মধ্যযুগীয়, যেমন জীবন-যাপনে তেমনি চিন্তাভাবনায়, এ-রকম মানব-অধ্যুষিত সমাজে ‘উত্তরাধুনিকতা’ শব্দটি ÔGod save the king…’ গানের এই পঙ্ক্তির মতো চমক সৃষ্টি করে।

জফির সেতু : আপনার এ-পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যসমূহ সম্পর্কে কোনো ভিন্নধর্মী বক্তব্য আছে কি?

দিলওয়ার : অবশ্যই আছে। আজ-অবধি একখানি সুনির্বাচিত নিখুঁত-নির্ভুল রচনাসমগ্র পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয় নি, এটি আমার গভীরতম অর্ন্তজ্বালা।

জফির সেতু : এই যে আপনার রচনা বা সৃষ্টিকর্মের প্রতি প্রকাশকদের দৃষ্টি পড়ছে না, তা কি মফস্বলে পড়ে আছেন বলে? নাকি প্রকাশকদের নিকট ধর্ণা দিচ্ছেন না বলেই?

দিলওয়ার : এ-জাতীয় প্রশ্ন আগেও আমাকে করা হয়েছে। আমি বলব দেশ ও জাতির জন্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা একাডেমি যাকে পুরস্কৃত ও ফেলোশিপ প্রদান করে, তার সাহিত্যকর্ম প্রকাশের প্রকৃত দায়িত্বশীল ব্যক্তি কারা?

জফির সেতু : কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, আশির দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম কবি-আপনার আত্মজ। পুত্র ও কবি হিসেবে অর্থাৎ একটি প্রতিভার এই যে আপচয় হচ্ছে এ-ব্যাপারে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কী?

দিলওয়ার : তুমি তো শুধু একজন জফির সেতু নও, অনেকের  কাছে কবি বলেও পরিচিত।  অতএব যে-কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, আশির দশকের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকৃত, তাকে ও তার রচনাকে বাঁচানোর দায়িত্ব তাদের হাতে, যারা সাহিত্য-সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় অভিভাবকরূপে দায়গ্রস্ত।

জফির সেতু : এবার অন্যরকম একটি  প্রশ্ন করি। গত এক হাজার বছরে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি, যা মানব জীবনে পরোক্ষভাবে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে?

দিলওয়ার : আমরা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখব কখন থেকে বাঙালিশাসন চালু হলো, এবং এই শাসনব্যবস্থা সময়ে সময়ে মোড় নিলো। এই মোড় নেওয়ার একটা সময় আমরা ইতিহাসে পাই, যার নাম ‘মাৎস্যন্যায়ের যুগ’-এটা প্রায় আড়াইশ বছরকাল স্থায়ী হয়; এই সময়ের ভিতরে কতটা প্রজন্ম পেরিয়ে যায়, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। মাৎস্যন্যায়ের সময়ে যে-সব জেনারেশন তৈরি হয়,-তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও অপমানিত  প্রজন্মের উত্তরাধিকারীরাই বহন করে এনেছে বর্তমান কালের মাৎস্যন্যায়। এটাকে আমাদের ভবিষ্যত সুন্দর সুষম সমাজব্যবস্থা রচনার পথে এক ভয়ানক অন্তরায় বলে গণ্য করি।

জফির সেতু : এ-যাত্রায় আমার শেষ প্রশ্ন, মানুষ হিসেবে আপনার অপরাধ কী?

দিলওয়ার : (একটু হেসে) মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসায় অবিচল থাকা!

জফির সেতু : আপনাকে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ এবং আপনার বাষট্টিতম জন্মদিনে পাঠকের  পক্ষ থেকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিবাদন!

দিলওয়ার : আমার পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক-ব্যবসায়ী-শিক্ষক-রাজনীতিবিদ ও সর্বসাধারণের  জন্য রইল আমার  যুগ যুগান্তের সালাম ও শুভেচ্ছা।

ধন্যবাদ, তোমাকেও।

 

 ডিসেম্বর ১৯৯৭, ভার্থখলা, সিলেট

 

দিলওয়ারের নির্বাচিত পাঁচটি কবিতা

 

কীনব্রিজে সূর্যোদয়

 

এখন প্রশান্ত ভোর। ঝিরঝিরে শীতল বাতাস

রাত্রির ঘুমের ক্লান্তি মন থেকে ঝেড়ে মুছে নিয়ে

আমাকে সজীব করে। ঊর্ধ্বে সুনীল আকাশ

পাঠায় দূরের ডাক নীড়াশ্রয়ী পাখিকে দুলিয়ে।

 

নিচে জল কলকল বেগবতী নদী সুরমার,

কান পেতে শুনি সেই অপরূপ তটিনীর ভাষা :

গতিবন্ত প্রাণ যার জীবনের সেই শ্রেয় আশা,

সৃষ্টির পলিতে সে-ই বীজ বোনে অক্ষয় প্রজ্ঞার।

 

সহসা ফিরিয়ে চোখ চেয়ে দেখি দূর পুবাকাশে

তরুণ রক্তের মতো জাগে লাল সাহসী অরুণ,

পাখির কাকলি জাগে। ঝিরঝিরে শীতল বাতাসে

দিনের যাত্রার শুরু। অন্তরালে রজনি করুণ!

 

ধারালো বর্শার মতো স্বর্ণময় সূর্যরশ্মি ফলা

কীনব্রিজে আঘাত হানে। শুরু হয় জনতার চলা।

 

(ঐকতান, ১৯৬৪)

 

জনৈক শিল্পীর স্বগতোক্তি

 

দুঃখের মতো বিশাল আর

সুখের  মতো দুর্লভ

এই পৃথিবীতে :

আমার জন্ম,

 

এবং স্বপ্নের মতো বার্ণিক আর

আয়ুর মতো অমূল্য

এই আমাতে :

জন্মের মৃত্যু,

বিধাতার অস্তিত্বের চেয়েও একটি অপূর্ব ঘটনা।

 

এই বিস্ময় এবং এই বিস্ময়ের যাদু ঘরে :

আমার কণ্ঠ গাইবে কার গান?

আমার তুলি আঁকবে কার ছবি?

আমার কলম লিখবে কার কথা?

 

মৃত্তিকার উঠোন থেকে আকাশের ছাদ

স্পর্শের ব্যর্থতায় বর্ণহীন,

অতএব আকাশের রঙ নয় আমার,

নক্ষত্রের প্রেম নয় আমার,

 

এবং দৃশ্যমান নীলিমার আরো ঊর্ধ্বে

ভয়াল সব কৌতূহলের বাস।

জাগাক তারা মর্ত্যরে  আর্তি-বিমুখ

মানুষের জিগীষার সুখ,

 

আমি  হতে দেবো না তাদের

আমার রক্তের আহ্লাদ,

কেননা দুঃখের মতো বিশাল আর

সুখের মতো দুর্লভ

এই পৃথিবীতে :

আমার নিশ্বাসের শুরু

আমার নিশ্বাসের শেষ,

আমার অতীতের আদি

আমার ভবিষ্যতের অন্ত।

 

অতএব জীবনের মহাগ্রন্থের প্রচ্ছদে

অঙ্কিত যে-অপর্ণা পৃথিবীর ছবি,

আমি তাকেই আমৃত্যু অপরিমেয় আনন্দে

জড়িয়ে রাখব বুকের পাশটিতে,

জড়িয়ে রাখব

আমার সংগ্রামের নামে,

ভালোবাসার নামে

আর কোটি কোটি মাতৃময় ‘তৃণের’

রক্তধৌত হৃৎপিন্ডের নামে।

 

(উদ্ভিন্ন উল্লাস, ১৯৬৯)

 

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন

 

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন যদি অপরাধ হয়,

আমরা কি আজো দিতে পারলাম

মানুষের পরিচয়?

ডুবে আছি আজো খন্ডে  খন্ডে সাম্প্রদায়িক পাঁকে

দম্ভদূষিত নাগপাশে বেঁধে

মানুষের বিধাতাকে।

 

প্রতিদিন ভোরে ও-কার সূর্য মর্মরক্তে ভিজে

আমাদের ঘরে আলো দিয়ে যায়

বিগলিত হয়ে নিজে?

ও-কার বাতাস প্রতি নিশ্বাসে বিশ্বজনীন হয়?

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন,

এ তো ভুলবার নয়।

 

শুধু মুখে নয় বুকেও ক্ষরিত সাম্প্রদায়িক বিষ,

অঘ্রাণে তাই ব্যথারক্তিম ঐশী ধানের শিষ!

কতকাল ধরে, বলতে পারি না,

আত্মহনন কাজে-

ব্যস্ত রয়েছি আমরা সবাই। প্রভাত মথিত সাঁঝে।

 

কেটে গেল কত পিতামহ আর

প্রপিতামহের কাল,

বোধির গোড়ায় সার হলো কত

বিভেদের জঞ্জাল।

 

শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন,

চিরাচরিতের পথে

জীবন কখনো চলতে পারে না-

নদীর জীবন স্রোতে!

 

ঔরসজাত মানবতা চাই

কালের শুদ্ধসুধা

রক্তে আমার এই তো ধর্ম,

এই তো মাতৃক্ষুধা।

 

(রক্তে আমার অনাদি অস্থি, ১৯৮১)

 

ফেডিপাইডিসের প্রতি

 

ফেডিপাইডিস, আমার হৃদয়ের ম্যারাথনের সময়

সমগ্র সমতলভূমি ঘিরে শক্রসৈন্যের  সমাবেশ,

আমি খবর পাঠাব, আমার বন্ধুদের কাছে স্পার্টায় :

সেই দেশের বীরদের হাতে বৈরিনাশা হাতিয়ার

শাণিত বিদ্যুল্লতার মতো ক্ষণে নৃত্যমুখর,

 

ফেডিপাইডিস, হে দৌড় সম্রাট, আমি তাদের কাছেই

খবর পাঠাব সাহায্যের, তুমি তাই আমাকে

তোমার ইতিহাসখ্যাত দ্রুতযাত্রার মন্ত্রদান করো,

 

সুউচ্চ অলিম্পাসের চূড়াবাসী দেবতাকুলই আজ

আমার ভায়ের, আমার বোনের, প্রিয়তমা ও সন্তানদের

জঘন্য অরাতি। তারা নতুন যুগের প্লুয়োটাস। তারা

দানবনিন্দিত মুনাফালোভের সুরম্য প্রাসাদকক্ষে বসে :

ইউরিপিডিস, এস্কাইলাস, সফোক্লিস আর আরিস্টোফেনিসের

নাটকের পাতায় হিসাবের অঙ্ক কষে দেখো,

ফেডিপাইডিস, মনুষ্যের বীর্যরসে এরা কোন ধাতব রাক্ষস?

 

মাধবের করুণাশ্রয়ে নয়, গিরিসংকট পার হতে চাই-

তোমার মতই কোনো এক ব্রহ্মপুত্রের লোকোত্তর

উদ্দীপক অগ্নিমশাল জ্বালিয়ে। স্মরণে ক্ষরিত হবে :

জননীর সমৃদ্ধ পয়োধর-পার্থিব মৃত সঞ্জীবনী,

দৃঢ়মুষ্টির অগ্নিমশালে আমি ছারখার করে যাব

ডায়োনিসাসদের দ্রাক্ষাকুঞ্জ, নারকীয় মদ্য বিলাস!

 

তুমি হয়ত জানো না বন্ধু এ-যুগের ডায়োনিসাস :

হাজারো মেহনতি মানুষের দেহপুষ্পে বানায় শারাব,

এ-যুগের  ইজিয়ানের গভীরতায় কোথায় নীলাক্ষীর মাদকতা?

শ্বেতোজ্জ্বল ঊর্মি পরে দেখা যায় না-তো ভেনাসের রাতুল চরণ,

 

এ-যুগের আফ্রোদিতে জঠরের অগ্নিকু- পার্শ্বে

রতিলোলুপ ক্লেদাক্ত দেহের মোহরকামিনী

কখনো কুমারী সে, কখনো মৃত বৎসা, কখনো জননী,

 

আঁধার যখন লোমশ হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে

জননী আফ্রোদিত চোখের জলে লুকিয়ে ফেলে তার শিশু

তারপর ঝরা বকুলের বিষণ্ণ আভা অধরে ফুটিয়ে

ধরা দেয় পাইথন কিউপিডের কঠিন মায়াপাশে,

তখন ডাস্টবিনের ধারে বিশ শতকের হারকিউলিস

শতাব্দীব্যাপী দানব দলনে অস্থিচর্মসার,

নেড়িকুকুরের সাথে খাদ্যলাভের মহড়ায় ব্যস্ত!

ফেডিপাইডিস, আমি যন্ত্রণার সমস্ত শাখা প্রশাখা

কেটে ছিন্নভিন্ন করে দেবো, যদি তুমি

আমাকে আত্মঘাতী আলস্যনাশের মহামন্ত্র দাও,

 

পথ থেকে পথে, নগর থেকে নগরে আমি যাব

যদি তুমি, বন্ধু থেকে বন্ধুর সান্নিধ্যে যাবার তরস্বান।

 

(রক্তে আমার অনাদি অস্থি, ১৯৮১)

 

 

হে মানুষ কখন তুমি

 

পাখির চোখে পাখি দেখা কত গভীর হতে পারে

এ-রকম একটি জটিল প্রশ্ন আমাকে তাড়া করছে

বেশকিছু কাল ধরে,

ঘরে-বাইরে, এমন কী চরাচারে এই প্রশ্ন নিয়ে

অনবরত, অবিশ্রান্ত পর্যটন করেও

বারবার দেখা যায় সদুত্তর, দুরআস্ত!

 

আমি দুধসাদা শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করি

ন-হাজার প্রজাতির পাখির উদ্দেশে।

আমার বড়ো অভিমান, হাতের কাছে টুনটুনিও

দেয় না আমাকে সান্ত¡না,

কাকগুলোও জবাববিহীন

উড়ে যায় সমান্তরাল রেখায়।

 

অস্ট্রিচের সাথে অ্যালবাট্রসের তুলনা চলে

শারীরিক বলবীর্যের জন্যে,

তবে কি না মেধার প্রশ্নে হামিংবার্ডকে

ছাড়িয়ে যেতে ওরা অক্ষম।

 

ব্রন্টোসরাসের লম্বা গলা ছায়া ফেলে  

(বিবর্তনের সূত্র ধরে) উটপাখির গলায়,

তবু আমার প্রশ্ন নাগালের বাইরে থেকে যায়।

 

পাখির চোখে পাখি দেখার প্রশ্নটি

আমার জন্যে আজীবনের এক পাথেয় হয়ে গেছে

সেই অসাধারণ প্রাপ্তির উষ্ণতায় আমি বলি,

বারবার বলি, যতই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকুক

অনিবার্য প্রয়োজনেই পাখিরা বাসা ছাড়ে

আর নির্ভুল দূরদর্শিতায় ঘরে ফিরে আসে…।

 

নিজেকে বলি, হে মানুষ, কখন তুমি পাখির মতো কার্যকর হবে?

(দুই মেরু দুই ডানা, ২০০৯)

Facebook Twitter Email