খোন্দকার আশরাফ হোসেন : যে পার্থ জন্মবাউল

Facebook Twitter Email

খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে প্রথম দেখি বাংলা একাডেমির বইমেলায়। কোকড়ানো চুলের দীর্ঘদেহী মানুষটির ভিতর কী যেন এক আকর্ষণ ছিল, ছিল এক অনতিক্রম্য দেয়ালও, কেননা তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কবি হিসেবে সমীহ জাগানিয়া, উপরন্তু আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজফার হোসেনের শিক্ষক। বন্ধুর শিক্ষক হিসেবে প্রথমদিকে তাকে দূর থেকে দেখেছি, কাছে ভিড়বার সাহস হয় নি। তাঁর সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে তাঁরই সম্পাদিত ‘একবিংশ’ পত্রিকায় লেখা মুদ্রিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিনতেন না। ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও কেবল কবিতার বিচারে লেখা মুদ্রিত হওয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশে খুব বেশি না থাকায় বিস্মিত হয়েছিলাম, সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছিল। পরবর্তীতে কাছে ভিড়ে দেখলাম মানুষটি প্রাণখোলা ও আড্ডাপ্রিয়। এক অদ্ভুত সারল্য আছে তাঁর, আছে চমৎকার রসবোধ। তরুণদের লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আন্তরিক এবং তরুণ কবিদের সাথে বন্ধুর মতোই মিশতেন। আজকের স্বনামখ্যাত অনেক তরুণ কবির প্রথম লেখা তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘একবিংশ’-এ ছেপেছেন। নিজে প্রতিভাবান ছিলেন বলেই প্রতিভা চেনার এক দুর্দান্ত ক্ষমতা ছিল তার। ‘একবিংশ’ হয়ে  উঠেছিল নতুন লিখিয়েদের প্রিয় পত্রিকা এবং আত্মপ্রকাশের প্লাটফর্ম।

 

আমৃত্যু তিনি ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয় নি সরাসরি তাঁর ছাত্র হওয়ার, কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মুখেই শুনেছি শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। সাহিত্যের জটিল বিষয়কে সহজ করে তুলতে পারার দক্ষতা ছিল সহজাত, আর কবি বলেই কাব্যিক মাধুর্যে ভরা ছিল বক্তৃতা। বাংলা ও ইংরেজি-দু’ভাষাতেই সাবলীল এবং শক্তিমান  লেখকের সংখ্যা খুব বেশি নেই এ দেশে, এ বিচারেও তিনি ছিলেন বিরল শক্তির লেখক। তাঁর অনুবাদের উচ্চমান থেকে এটা স্বপ্রতীয়মান। তিনি ছিলেন গ্রামের সন্তান এবং পুরোপুরিই একজন স্বনির্মিত মানুষ, মেধার জোরে ঠাঁই নিয়েছিলেন সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে। বহুমাত্রিক মানুষটি কবি পরিচয়ে সবচেয়ে বেশি গর্বিত হতেন। বয়সের বিচারে তিনি ষাটের শেষভাগের কবি বলে পরিগণিত হতে পারতেন, কিন্তু কিছুটা বিলম্বে তার কাব্যজগতে প্রবেশ (প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় শ্রম) এবং আবির্ভাবেই বাজিমাত। প্রথম দুটি কাব্য তিন রমণীর ক্বাসিদা (১৯৮৪) এবং পার্থ তোমার তীব্র তীর (১৯৮৬) সমালোচক ও কবিদের নজর কাড়ে এবং কবি হিসেবে তিনি দ্রুতই নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন। কবি আল মাহমুদ সে সময়ে বলেছিলেন, ‘বাংলা কবিতায় এক শক্তিমান কবির আবির্ভাব ঘটেছে।’ কবি শামসুর রাহমান তাকে সুপ্রসন্ন অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালেই কবিতার জন্য ‘আলাওল পুরস্কার’ পান। ২০০৮ সালে ‘ব্রহ্মপুত্র পদক’ ছাড়াও ২০১৩ সালে ‘জীবনানন্দ পুরস্কার’ তাঁর কবিপ্রতিভার স্বীকৃতি। বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য, মাটি ও মানুষের প্রতি ঘোরানো ছিল খোন্দকার আশরাফের কাব্যের মুখ। প্রথাগত ভাষায় লিখলেও তার কবিতার ছন্দোমাধুর্য, ধ্রুপদী চারিত্র ও নিটোলত্ব মুগ্ধ করেছিল পাঠকদের। তবে তিনি সময়ের সাথে দ্রুতই বদলে নিয়েছেন কবিতা। শেষের দিকে হয়ে উঠেছিলের উত্তরাধুনিক কবি। আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতায় এই যাত্রায় তিনি বারংবার নিজেকে ভেঙেছেন, কখনো অতিক্রম করে গেছেন নিজেকেই। এসবই তার প্রতিভার নিগূঢ় স্বাক্ষর। বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেছেন কবিতায়, কোথাও থেমে থাকেন নি। ওই দুটো কাব্য ছাড়া তিনি লিখেছেন জীবনের সমান চুমুক (১৯৮৯), সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর (১৯৯২), যমুনাপর্ব (১৯৯৮), জন্মবাউল (২০০১), তোমার নামে বৃষ্টি নামে (২০০৭), (আয় ) না দেখে অন্ধ মানুষ (২০১১) প্রভৃতি অসামান্য কবিতাগ্রন্থ। কুয়াশার মুশায়েরা ছিল এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্য। অনুবাদে সিদ্ধহস্ত খোন্দকার আশরাফ হোসেন ১৯৮৬ সালেই তিনটি ধ্রুপদী গ্রিক নাটক সফোক্লিসের রাজা ঈদিপাস এবং ইউরিপিদিসের মিডিআ ও আলসেস্টিস  অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদ কেবল মূলের প্রতি বিশ্বস্ত নয়, সৃজনশীল।

 

আগেই বলেছি বাংলা কাব্যজগতে কিছুটা বিলম্বে তাঁর প্রবেশ। বয়সের বিচারে তিনি ষাটের শেষার্ধের বা সত্তরের প্রথমার্ধের কবি হতে পারতেন, তাঁর কবিতা চর্চার  প্রারম্ভকালও সেটাই। সজ্ঞানেই তিনি আশির দশকের শুরুতে আবির্ভূত হলেন। একদিকে সত্তরের শ্লোগান মুখর ঝাঁঝাঁলো ধারা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে, অন্যদিকে অনেক নক্ষত্রজ্বলা ষাটের দশকে হারিয়ে না যেতে তাঁর এই সতর্ক পদক্ষেপ। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতার স্বরটি আলাদা; আশির দশককেই তাঁরা মনে হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন, যেখানে তিনি নিজেকে একজন ‘স্থিতপ্রজ্ঞ দার্শনিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে  চেয়েছেন। মননশীলতায় ঋদ্ধ প্রথম গ্রন্থ তিন রমণীর ক্বাসিদা-য় রয়েছে ঐতিহ্যিক মন্ময়তা। ঐতিহ্যসূত্রকে ছিন্ন না করে নতুন উচ্চারণে বাংলা কবিতার অভিমুখ ফেরাতে চেয়েছেন নন্দনের দিকে। এ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘প্রার্থনায় নম্র হও পাবে’-তে তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত, পয়গম্বরসুলভ উচ্চারণ: ‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহংকার আমার কবিতা’। তিন রমণীর ক্বাসিদা-য় খোন্দকার আশরাফ হোসেন যে তিন রমণীর শাব্দিক চিত্র আঁকলেন তারা জননী, জায়া ও দয়িতার ত্রিমাত্রিক ভূমিকায়। তিন রমণী চিরকালই সাহিত্য ও চিত্রকলার এক কৌতূহলকর বিষয়। শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথে পাই তিন ডাইনির সাক্ষাৎ। পটুয়া কামরুল হাসানের ছবিতেও তিন রমণী যুথবদ্ধ দাঁড়িয়ে। সেখানে তারা সহচরী, একই বয়সের নারী। খোন্দকারের কবিতায় সেই চিত্রটি আছে কবিতাটির প্রথম অংশে, দ্বিতীয় অংশে পাই দার্শনিক অভিজ্ঞানপূর্ণ পুরাণের মতো ছবি, দ্বিতীয় অংশ সমুখে নিয়ে আসে শেক্সপিয়রের তিন রমণীকে, অপ্রত্যাশিত যাদের আবির্ভাব, অভিশাপে যারা জর্জর করে দেহ। তৃতীয় অংশে পরিস্ফুট হয় জননী, জায়া ও দয়িতার ছবি। এমনিভাবে অধীত অনেক চরিত্র ও প্রেক্ষাপট উঠে আসে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতায়, আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন না তিনি, অধীত বিষয়কে স্থাপন করেন বাংলার আলো-হাওয়ায়, ঐতিহ্যকে করে তোলেন মননের কেন্দ্রভূমি।

 

দ্বিতীয় গ্রন্থ পার্থ তোমার তীব্র তীর-এ দার্শনিকের ভূমিকা ছেড়ে তিনি বাংলা কবিতার পার্থের ভূমিকা নিলেন। সমাজভাবনাকে উপস্থিত করলেন নান্দনিকতার বিবিধ মাত্রায়। খোন্দকারের তীব্র জীবনমুখীনতা ও সমাজমনস্কতা খুঁজে পাওয়া যায় এ গ্রন্থে। প্রথম গ্রন্থে যা ছিল চিরকালীনতার শব্দমালা, দ্বিতীয় গ্রন্থে তা সমকালীনতার শৈল্পিকরূপে প্রকাশিত হলো। দুটি কাব্য তাকে পাকাপোক্ত আসন দিলো বাংলা কবিতার মঞ্চে। দ্বিতীয়ের প্রারম্ভেও প্রথম গ্রন্থের সমান্তরাল আত্মপ্রত্যয়ী ঘোষণা :

 

‘আমি একটু অন্যরকম পেখম মেলার ইচ্ছা রাখি।

                বুকে আমার একটু জখম অন্যরকম,’

 

সুতরাং তিনি তাঁর অভিপ্রায় ও আত্মবিশ্বাসকে লুকিয়ে রাখেননি। ছিল আত্মগর্বী উচ্চারণ-‘তোমরা বামন, হ্রস্ব খাটো, তোমাদের ঐ মাপের কাঠি/একটু ছোট আমার জন্য, তোমাদের ঐ ঘরের কপাট/বড়ই নিচু, আমি একটু দীর্ঘদেহী-। ঝাকরা চুলের আশরাফ হোসেন শারীরিক গঠনে দীর্ঘকায় ছিলেন-এ যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি তাঁর কবিতা সমসাময়িকদের চেয়ে অনেকটাই উঁচু। তাঁর এ প্রবল আত্মবিশ্বাস এসেছিল নিভৃতচর্চা ও প্রস্তুতি থেকে, সমসাময়িকরা যখন প্রচারের জোয়ারে ভাসমান এবং জনপ্রিয়তার মোহে আচ্ছন্ন, তখন তিনি নিভৃতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, আলাদা একটি জগৎ নির্মাণের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। সহজাত কাব্যপ্রতিভা ও প্রকাশ উৎসারণ যুগিয়েছে আত্মবিশ্বাস। ‘একবিংশ’ পত্রিকা প্রকাশ এবং এ পত্রিকার উদ্দেশ্য বয়ানের মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব কাব্যমতাদর্শ ও অভীপ্সাকে নির্দিষ্ট করে নিলেন, অগ্রজদের থেকে আলাদা করে নিলেন নিজের জগৎকে, কাছে টানলেন অনুজদের।

 

প্রথম প্রকাশের খোন্দকার আশরাফ হোসেন পুরোমাত্রায় আধুনিক কবি, রোমন্টিকতার রেশ তাতে মাঝে মাঝে যুক্ত হলেও তিনি সৌন্দর্যে অনিবার্য বিনষ্টি প্রত্যক্ষ করেছেন, দেখেছেন সম্পর্কের ভাঙাসেতু। যে কালপর্বে তিনি কাব্যজগতে প্রবেশ করেছেন, তাতে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। প্রথাগত প্রেমের বা সৌন্দর্যমুগ্ধতার কবিতা তাঁর কাব্যপরিম-লে খুঁজে পাওয়া কঠিন না হলেও বিরল। যে শাকিলাকে তিনি প্রথম যৌবনে সোনালি ফিতের মতো চুমু উপহার দিয়েছিলেন, যার পিরহান ওঠালে গোল ছাপ দেখা যাবে, সে শাকিলাও কোকিলা হয়ে অন্য বনে উড়ে গেছে। প্রণয়ের পরিণতি মিলন নয়, ব্যর্থতা। ‘শিকার‘ কবিতায় তিনি যদিও বলেন, ‘তোমার চুম্বন পেলে আমি নীল মৃত্যুকেও বলবো বাহবা/ঘাসের বনের মধ্যে তুলে নেবো সর্পাহত কাঠুরের হরিৎ মরণ’। কিন্তু এও জানেন ‘টোঙ থেকে পা নামালে মুন্ডুসহ গিলে খাবে সাপিনী আগুন’। তাঁর রোমান্টিক চেতনার কেন্দ্রে কখনো উল্লসিত কিশোরীদের গোল্লাছুট দেখি, ফ্রয়েডীয় মনঃস্তত্ত্বের আলো ফেলে পাঠক পৌঁছে যাবেন দূর কৈশোরে যেখানে কিশোরীদের রতিবাসনাকে কবি এঁকে নিচ্ছেন আকাক্সক্ষার সাদাপৃষ্ঠায়, বয়সকালেও তাঁদের সাথে ঝাঁপুই খেলায় যার আগ্রহের কমতি নেই। কবি মাত্রেই কিছুমাত্রায় রোমন্টিক এ প্রতিপাদ্যকে মেনে নিয়েও বলা যায় খোন্দকার আশরাফ হোসেনে রোমান্টিকতা বাহ্য, অন্তঃসলিলে তা বিপর্যয় বহন করে। তিনিই লিখতে পারেন, ‘নৃ-মুন্ডু-শিকারীদের তুমি নও একজন কে জানে সুজাতা?’ প্রেমিকাকে নৃ-মুন্ডু-শিকারী কল্পনা করা বিস্ময়কর, বাংলা কাব্যে অভিনব!

 

আধুনিক এ কবির কবিতার কেন্দ্রে  প্রকৃতি নয়, রয়েছে মানুষ, যে মানুষ ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে চায়। তৃতীয় গ্রন্থ জীবনের সমান চুমুক-এ মানুষ সম্পর্কিত তাঁর ঘোষণা আমাদের বিস্মিত, সম্মোহিত করে :

 

‘মানুষকে কেউ ধারণ করতে পারে না

না নিসর্গ না ঈশ্বর না প্রেম না ঘৃণা

মানুষের হাতে নীল বেলুন তার চোখে দুই কালো মাছি

মানুষকে কেউ ধারণ করতে পারে না, মানুষের

কোনো জন্মদাতা নেই, তার কটির উত্তাল যৌবন কারো

উত্তরাধিকার নয়।’                                         (মানুষ)

 

তাঁর এ উচ্চারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং মানুষের সীমাহীন সম্ভাবনা ও সার্বভৌমত্ব সমান সাহসে ঘোষণা করে। ধর্মীয় সংস্কারমুক্ত কবি আগাগোড়াই মানুষের বিজয় পতাকা ওড়ানো এক আমূল ঈশ্বরদ্রোহী। মানুষকে তিনি ভালোবাসেন, কেননা ‘একদিন সে নিজ হাতে নিজেকে পোড়াবে’, অর্থাৎ তার নবজন্ম হবে। ‘জন্মবাউল’ কাব্যের ‘জেনেসিস’ কবিতায় তাকে লিখতে দেখি, ‘আমরা অন্য কোনো নামগান মুখস্ত করিনি/প্রশংসা তাহার নামে যার কাছে রুটিই রহিম॥’ আধুনিক মানুষ এলিয়েন (আমি তোমাদের নগর চিনি না, পুষ্পিত বাগান চিনি না : এলিয়েন/তিন রমণীর ক্বাসিদা)। তাঁর কাছে মানুষ হচ্ছে ‘বালুকারাশির মধ্যে মুখ রেখে কেঁদে ওঠা কিষন কান্হাই’। মানুষকে কেন্দ্রে রেখে তাঁর কাব্যের পরিধি বিস্তৃত হয় সমাজভাবনায়; রাষ্ট্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পার্থের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি।

 

‘কিন্তু আমি অন্য রকম পার্থ আছি,

আমার রথের শীর্ষদেশে যে পতাকা ছিঁড়তে পারো॥

এমন আশা নিস্ফলতা।’ (আত্মপক্ষ/পার্থ তোমার তীব্র তীর)

 

আধুনিকতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীকালে তিনি হয়ে উঠেছেন পুরোদস্তুর উত্তরাধুনিক ঘরাণার কবি। নবআবিষ্কৃত প্রপঞ্চকে শিরোধার্য মেনে আধুনিকতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপলব্ধি ও বিমর্ষতার ধূসর পৃথিবীকে পিছনে ঠেলে এগিয়ে গেছেন উত্তরাধুনিকতার বহুমাত্রিক, বহুমানুষে ঠাঁসা প্রান্তরের দিকে। প্রান্তিক মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, পুরাণমুগ্ধতা আর নিজ ভূমি ও জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়বদ্ধতা এই ঐতিহ্যপ্রিয় কবির মাঝে আগাগোড়াই ছিল, কেবল প্রয়োজন ছিল নতুন আঙ্গিকে বলা। সেও তিনি বলেছেন পরম দক্ষতায়। জীবনের সমান চুমুক থেকে শুরু করে, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর পেরিয়ে যমুনাপর্ব বেয়ে তাঁর কাব্যের তরী আয়না দেখা অন্ধ মানুষ ও জন্মবাউল দর্শন শেষে কুয়াশার মুশায়েরা পর্যন্ত এগিয়েছে আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার যৌথ স্রোতধারাকে সঙ্গে নিয়েই। এ পর্বের খোন্দকার আশরাফ হোসেন ততটা প্রথাগত নন যতটা তিনি ছিলেন তার কবিতার আদিপর্বে (যদিও মাঝে মাঝেই তিনি প্রথাগত কাব্যভাষায় ফিরেছেন), বরং এ পর্বে তিনি প্রবল নিরীক্ষাপ্রবণ। কবিতা নাম্নী ললনাকে নিয়ে রঙ্গ-তামাশা করার স্ফূর্তি কখনই কমে নি এ কবির, তাকে তিনি বিবিধ প্রসাধনে সাজিয়ে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন, কখনো ললিত হাতে সুকঠিন ধাতুর ধারালো দাঁ তুলে দিয়েছেন সংহারের উদ্দীপনায়, পড়িয়েছেন রুদ্রমূর্তি সাজ, ধনুকে ভরে দিয়েছেন বিষাক্ত তীর!

 

তাঁর কাব্যসমগ্র পর্যালোচনা করলে এ কথা প্রতিভাত হয় খোন্দকার আশরাফ হোসেন সুপ্রচুর থিমেটিক কবিতা লিখেছেন। তার অনেক কবিতায় পূর্ণ গল্প রয়েছে (একটি কবিতার নাম ‘কালো বাক্সের গল্প’)। তিনি বর্ণনা ভালবাসেন, অন্ততঃ তাঁর প্রথম দিককার কবিতা বর্ণনাপ্রধান-এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবে সত্তর দশকের অধিকাংশ কবিতার মতো সাদামাটা পুনরুল্লেখে আগ্রহ নেই তাঁর, নেই পরিচিত উপাদানের পুনরাবৃত্তি দিয়ে কাব্যদেহ ভরে দেওয়া, বরং বর্ণনাকে অভিনব উপাদান ও প্রচুর কাব্যিক অলঙ্কারে মুড়িয়ে দিয়েছেন। প্রচুর উপমা, চিত্রকল্প আর অনুপ্রাসে মোড়ানো হলেও সেগুলোকে আমি বর্ণনামূলকই বলব। পুনরাবৃত্তির একটি ঝোঁক আছে, যদিও উপাদানসমূহ প্রথাগত কবিতার মতো নয়, তাঁর নিজস্ব, আশরাফীয়। উদাহরণ দিই:

 

‘আমি কি চেয়েছিলাম এই উদার বাতাসের উচ্ছাস?

এই হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে ফুটে থাকা অবিশ্রান্ত শাপলাগুলো?

ধানখেতের আলে বসে বাতাসের দুদ্দাড় গোল্লাছুট দেখা?

এই একঘেয়ে সমতল প্রান্তরের বিশ্বস্ততা, কিংবা মেটেরঙ ঘাস?

ধান গাছের নিচে খরার জলসেচনের বুড়বুড়ি, এবং

ভটভট আওয়াজ-তোলা পাম্পমেশিনের আখড়াই?’ (প্রশ্নের নদী উত্তর বাহিনী)

 

গ্রামীণ প্রকৃতির জলরঙে আঁকা রিয়ালিস্টিক চিত্র! বিশেষ্যকে বিশেষায়িত করা হয়েছে, আছে কাব্যমেজাজও, কিন্তু একইসঙ্গে আছে বিবরণ। শেষের দিকের কাব্য আয় (না) দেখে অন্ধ মানুষ-এর ‘আই হসপিটাল’ কিংবা ‘আবার আসতে পেলে যা যা করব (না) কবিতাদ্বয় সংক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী, কিন্তু একই সঙ্গে ক্যাটালগিং ধরনের, যা ছিল ষাট ও সত্তর দশকের কবিতার একটি প্রধান চরিত্র এবং দুর্বলতা।

 

তাঁর পরবর্তী প্রায় সকল কবিকেই একটি স্মার্ট নাগরিক কাব্যভাষা সৃষ্টি করে প্রভাবিত করেছিলেন শামসুর রাহমান। তাঁর কাছে ঋণ আছে প্রায় সকল কবির। খোন্দকার আশরাফ হোসেন এই ঋণকে স্বীকার করেন অবলীলায়। কোরানের একটি জনপ্রিয় আয়াতের আদলে তিনি লিখেন, ‘এবং আমার কোন্ কোন্ দান তুমি অস্বীকার করবে মানুষ?’ স্মতর্ব্য, শামসুর রাহমানের ‘একটি মোনাজাতের খসড়া’ মোনাজাতের আদলে নির্মিত। শেষ কাব্য ‘কুয়াশার মুশায়েরা’ গ্রন্থের ‘ভাঙা সার্কাস’ কবিতাটিও শামসুর রাহমানকে উৎসর্গীত। সেখানেও পাই বর্ণনা অর্থাৎ বর্ণনাপ্রধান কবিতা লেখার ঝোঁক খোন্দকার আশরাফকে কখনই পুরোপুরি ছেড়ে যায় নি।

 

‘আমারও ছিল একটি সার্কাসের দল; হাতী ছিল দুইপায়ে

ভর দিয়ে দাঁড়ানো, বৃংহতি শুনে কেঁপে উঠত দর্শকের বুক;

ছিল ঘোড়া সাটিনের জিন্ পরা; ছিল তার চাবুক সোয়ারি;

একদল গাধাও ছিল মাঝে মধ্যে সকৌতুক জোকারের সাথে,

আর ছিল ট্রাপিজ পরীরা সব, বিকিনীর মোহিনী মায়ায় আর

উজ্জলিত ভুরুর ভঙ্গিমা নিমেষে করতো খুন অসতর্ক জাল ধরা

নিচের মানুষদের।’  

 

বর্ণনাটি রাহমানীয়। এরপরই বলেছেন, ‘আর হ্যাঁ জনাব, আমিই ছিলাম বটে রিঙমাস্টার-’। সার্কাস তাঁর কবিতার একটি প্রিয় ধৎবহধ। বহুপূর্বেই ‘জীবনের সমান চুমুক’ গ্রন্থে ‘সার্কাস’ কবিতায় তিনি লিখেছেন ‘অপেক্ষায় তুঙ্গ করো চূড়া/বুকের জাজিম পেতে ধরো রাখো পিপাসু পতন/নিম্নগামী সুচের সংহার/ট্রাপিজের দোলা থেকে অন্য এক ঝুলন্ত ট্রাপিজে/হাতের নাগাল পেলে বাহবা বাহবা’ বরং অধিকতর অর্থবহ ও চমৎকার প্রতিকায়িত। একই গ্রন্থের ‘রিঙ মাস্টার’ কবিতায় জীবনকে অর্ধশিক্ষিত বাঘের সাথে তুলনা করেছেন যে কেবল গজরাতে শেখে, কানুর পীরিতি শেখে না, জীবন নামের বাঘ একদিন রিঙ মাস্টারকেই খেয়ে ফেলে। খোন্দকার আশরাফ এ সত্য জানতেন বলেই তার কোনো কাতরতা নেই, আছে সত্য প্রকাশের দুঃসাহস, সকল প্রকার ছুৎমার্গ থেকে মুক্ত তিনি এক আধুনিক পুরুষ, যিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, ‘তোমরা এসেছ ভালো, তোমরা বেসেছো ভালো, বসো,/ আজ রাতে মেনুতে রয়েছে দেখি তোমাদের মাংসের কাবাব।’

 

কেবল শামসুর রাহমান নন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন প্রভাবিত হয়েছেন আল মাহমুদ দ্বারা। ‘তিন রমনীর ক্বাসিদা’ ও ‘পার্থ তোমার তীব্র তীর’-এ এর প্রমাণ মেলে। ‘নিদ্রার গভীরে যাবো, হে সময়, তুলে রাখো তীক্ষ্ম তরবারি (ইনসমনিয়া) যেমন শামসুর রাহমানীয় তেমনি ‘আরেকবার পাখিদের অট্টহাসি শুনে জেগে উঠলাম’ (জীবনের সমান চুমুক) আল মাহমুদীয়। শুরুর ওই প্রভাব তিনি কাটিয়ে উঠেছেন নিজ শক্তিতেই। কেবল আল মাহমুদ নন, তাঁর তীব্র ঐতিহ্যমুখীনতা ও স্বাদেশিকতার সঙ্গে ষাটের মোহাম্মদ রফিক ও মুহাম্মদ নুরুল হুদার কাব্যচেতনার মিল রয়েছে, যদিও খোন্দকারের কাব্যপ্রকাশ মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে একেবারেই মেলে না, মুহাম্মদ নুরুল হুদার সাথে কিছুটা মেলে। তাঁর ভাষারীতি এবং শব্দের ব্যবহার বরঞ্চ মিলে যায় আবুল হাসানের সাথে, যে ছিল তাঁর প্রিয় কবি। যতই প্রভাবিত বলি না কেন (কে প্রভাবিত নয়?), আশির দশকে প্রকাশিত কণ্ঠস্বরেই তাঁকে সনাক্ত করা সহজ হয়, পরবর্তীতে তিনি ভাষা ও প্রকরণ নিয়ে অনেক অস্থির নিরীক্ষা করেছেন, কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বরটি পরিপূর্ণরূপে খুঁজে পান নি। আবির্ভাবকালে যে সাবলীল প্রবাহ ছিল তার উচ্চারণে, তা অনেকটাই আড়ষ্ট আরোপিত হয়ে গিয়েছিল।

 

মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিতার ক্যানভাসে বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি অনবদ্য কবিতা আছে তাঁর-‘বাউসি ব্রিজ’ ৭১’। উনিশশ একাত্তরে একুশ বছরের টগবগে যুবক তিনি, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ‘বাউসি ব্রিজ’ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে উঠে আসা বলেই শক্তিমান

 

‘কাঠবিড়ালির মতো ত্রস্ত নৈপুণ্যে আমরা  নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়েছিলাম

তখন কৃষ্ণা একাদশীর ডাইনী রাত ছিলো গর্ভবতী, আর তার কিছুক্ষণ পর

ষাঁড়ের বাঁকানো মিঙ নিয়ে চাঁদ তার হাইডআউট থেকে বেরিয়ে এসেছিলো

আকাশ-এরিনার অন্য কোনায় তখন মেঘ নামক যোদ্ধা অপেক্ষমান’

 

যুদ্ধের পটভূমি প্রস্তুত। সেইরাতে আঠারজন উত্তাল যুবকের আকাশ ছাড়া আর কোনো শিরস্ত্রান ছিল না, ঘাস ছাড়া ছিল না কোনো পাদুকা কিন্তু শত্রুর জন্য ছিল সুতীব্র ঘৃণা, আঠারো যুবকের অস্ত্রের পুষ্পিত উল্লাসের ধাতব কোরাসের অঝোর বৃষ্টিতে দুলে উঠল বাউসি ব্রিজ। মুক্তিযুদ্ধে বিস্মৃত শহীদদের একজন মাদারগঞ্জের দৌড়বিদ সন্তান সাহেব আলীকে নিয়ে লিখেছেন ‘সাহেবালী যুদ্ধে গিয়েছিলো’; জামালপুরের ফুলকান্দি গ্রামের গণহত্যায় শহীদ আসাদুজ্জামান নোটনের জন্য লিখেছেন ‘নোটনের জন্য শোক’। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সাথে টগবগে দীপ্ত বোধ আর কাব্যিক শক্তি যোগ হয়ে এসব কবিতা মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিলে পরিণত হয়েছে। ‘নোটনের জন্য শোক’ আঙ্গিকের দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার মধ্যে একটি অনবদ্য সংযোজন। কবিতার গাম্ভীর্যের মাঝে ছড়ার ছন্দোবদ্ধ দুলুনি মিশিয়ে তিনি  তৈরি করেন এক নতুন আঙ্গিক, যা পরবর্তীতে তার কোনো কোনো কবিতায় দেখা যায়, হয়ে ওঠে তাঁর কাব্যধারারই একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য। কবিতাংশে পাই পাক হানাদারদের নারকীয় তান্ডব, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা আর ছড়া অংশে রয়েছে শোকের পদাবলী, কল্পনা আর হাহাকার। উদাহরণ দিই :

 

কবিতার অংশ

‘প্রান্তর পেরিয়ে যায় ঘাতকের কালো বুট

হলুদ সরিষা ক্ষেত, পালানের বাঁধাকপি, নামিলা মরিচ

ধর্ষিতা নারীর মতো, এলোমেলো শুয়ে থাকে, সারা দেশ জুড়ে

কে যেন বিছিয়ে দিলো দুঃখের সমান এক বিস্তৃত কাফন।’

 

ছড়ার অংশ

‘আজ নোটনের মুখে হাসি

কাল নোটনের বিয়ে

নোটনের বিয়ে হবে

টোপর মাথায় দিয়ে’

 

প্রখ্যাত ছেলেভুলানো ছড়াটিকে দুঃখের বিস্তীর্ণ ভূমিতে ছেড়ে দিয়েছেন নোটনকে হারানো তীব্র শোক ভোলানোর জন্যই, গড়ে তুলেছেন এক আপাত বিপ্রতীপ পটভূমি। কারবালা প্রান্তরের বিষাদ চরিত্র কাশেম ও সখিনাকে উপস্থাপিত করেছেন বাংলার কারবালা একাত্তরের যুদ্ধময় প্রান্তরে। এরপরেই রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের আশাবাদী বয়ান ‘জ্বলন্ত সূর্যের মতো একঝাঁক দীপ্ত ঘোড়সওয়ার,/সূর্যের ফার্নেসে ওরা গড়েছে ওদের তীব্র লক্ষ্যভেদী শর,/বাহুতে বজ্রের বন্দ, চোখে কাঁপে ঈগলের ডানা/আর যা ছিল তাদের চোখ আজ তারা ইস্পাত ফলক।’ অনিবার্যভাবেই এরপরে আসে আনন্দময় ছড়ার ‘উঠোন ঘিরে নামলো কখন/হঠাৎ বোদের ঝালর/ওলো তোরা আয় দেখে যা/বুলবুলি নয়, ধানের খেতে/হাট বসেছে আলোর’। কবিতাটি শেষ হয় শোক দিয়ে-

 

‘রাতের চাদর ফের ঘিরে নেয় আলোর কফিন;

শোকের সলিতা জ্বেলে বসে আছি নির্জন মানুষ

নোটনেরা পুবের প্রান্তর থেকে ফিরবে না আর কোনোদিন,’

 

বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত এই দীর্ঘ কবিতাটিতে আাঙ্গিকের যে ভাঙা-গড়া তা তাঁর অন্য কবিতাতেও লক্ষ করি। বৈচিত্রময় আঙ্গিকে লেখার ঝোঁক খোন্দকার আশরাফের নতুন রীতি খুঁজে চলা এবং একই সঙ্গে কাব্যিক শক্তিমত্তার পরিচয়বাহী।

 

তাঁর অনেক কবিতাই ক্লাসিক মেজাজের। ‘নীল সাবানের প্রেম’ কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিতে লিখেন, ‘নীল সাবানে মেয়েটি ধোয় আগুন-রঙা শাড়ি’, পরের স্তবকের শুরুতে ‘নীল সাবানে মেয়েটি ধোয় লাল কাপড়ের দুখ’, তৃতীয় স্তবকে ‘নীল সাবানে মেয়েটি ধোয় নীরব চোখের জল’, শেষ স্তবকে লিখেন ‘নীল সাবানের ফুরিয়ে যাবে গভীর প্রেমিক মন/নদীর জলে ভাসবে মেয়ের শাড়ি ও যৌবন’। বাংলার নারীর অপার দুঃখের জীবনের বয়ান কবিতায় বুনে যান পুনরাবৃত্তিমূলক থিমেটিক ভঙ্গিমায়, যা ক্লাসিকধর্মী। বাঙালি নারীর আব্রু ও সৌন্দর্যের প্রতীক শাড়ি বেশ কিছু কবিতায় উপস্থিত। ‘নুলো ভিখিরীর গান’ কবিতাটির প্রথম পঙ্ক্তি এরূপ: ‘পড়ে আছি রাজপথে ঈশ্বরের ঘৃণার উদ্গার’; আর শেষ পঙ্ক্তি ‘পড়ে আছি রাজপথে অভিশপ্ত ঈশ্বরের রুগ্ণ বীর্যপাত।’ ‘অভিশপ্ত ঈশ্বরের রুগ্ণ বীর্যপাত’ আধুনিক কবির সংস্কারবর্জিত উচ্চারণ। সেখানে ‘দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি নরকুলে তিষ্ঠ ক্ষণকাল’ বলে মধুসূদনীয় আবহ ফিরিয়ে এনেছেন। ধ্রুপদী সাহিত্যকে নবতর ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন তাঁর একটি অবসেসিভ ঝোঁক। ‘নানরুটি’ কবিতায় ‘নানরুটি ফুলে ওঠে দাউ দাউ চুল্লির ভেতর/ফুলে ওঠে আগুনের নগ্ন প্রেমে’ প্রেম যে সর্বনাশী আগুনের মতোই পুড়িয়ে ঝাঁঝড়া করে দেয় সে সত্যকে তুলে ধরে। চূড়ান্ত আবেগ প্রকাশে কিংবা কবিতার অনিবার্য উপাদান সমাবেশে তিনি ছিলেন কার্পণ্যহীন। বিবাহিত পুরুষের অনবদ্য চিত্র এঁকেছেন একটি কবিতায় : ‘একাকী রুইয়ের মতো বিবাহিত পুরুষের মন-/ঘেটি থেকে ধড় তার নিয়ে গেছে চিল/… … /বাকীটুকু হাসে খেলে, দশটায় যায় মতিঝিল।’ এই কাব্যভাষা খোন্দকার আশরাফের নিজস্ব। আয়  (না) দেখে অন্ধ মানুষ গ্রন্থে ‘কালো বাইবেল’ কবিতায় পাই,

 

‘আমার বাইবেলের কালো অক্ষরগুলো অগুনতি কৃষ্ণকায় মানুষের মতো

নীরব শোকমিছিল করে পার হয়ে চলে গেল অন্ধকারে:

আমার চোখের সামনে তখন শূন্যতার সাদা পৃষ্ঠা শুধু, ধূ ধূ।’

 

কালো অক্ষরগুলো চলে গেলে সাদা পৃষ্ঠা তো অনন্ত শূন্যতা, অর্থহীন। মহাবিশ্বের আলো-আঁধারির মতো সাদা-কালো মানুষের মিলিত কোলাজেই পৃথিবীর সম্পূর্ণতা। দার্শনিক জিজ্ঞাসা খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতার একটি প্রধান দিক, কবির দেয়া উত্তরের মাঝেও রয়েছে দর্শন।

 

‘কি খুঁটছ সারাদিন অনন্তের পাখি

খুঁটছি যবের দানা, শস্যবীজ, খুঁটছি জীবন।

কি নিচ্ছ ঠোঁটের ফাঁকে সুদূরের পাখি?

আমি নিচ্ছি দুটো খড়, এই মৃত্যু, আরেক জীবন।’ (সুদূরের পাখি)

 

এটি তাঁর একটি প্রিয় কবিতা। আরেকটি প্রিয় কবিতা ‘এ-ও দুঃখ কেটে যাবে’, (প্রায়শই এই দুটি কবিতা পাঠ করতেন) যেখানে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘এ-ও দুঃখ কেটে যাবে প্রাজ্ঞপারমিতা, তুমি আমি মিশে যাবো পাথরে পাথর,/মাটিতে সমূহ মাটি, ভস্মাধারে ছাই,/কবিতায় নিথর কবিতা।’ এই উপলব্ধি তাকে শান্তি দেয় না, কিন্তু সুস্থিত করে। ‘চতুষ্পদ দর্শন’ একটি অধিবিদ্যক কবিতা। কবিতাটি পাঠককে চমকে দেয়: ‘অতো রাতে ষাঁড়গুলো কোথা থেকে আসে/ কোত্থেকে হাঁ? গাঁয়ের সরল কৃষকদের সোনার ফসল তছনছ করতে আসা এই ষাঁড়গুলো হলো জোতদার ও তার লাঠিয়ালদের প্রতীক।

 

খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রায় সকল কবিতাই বক্তব্যে দৃঢ় এবং প্রাঞ্জল। অহেতুক দুর্বোধ্যতা তিনি সৃষ্টি করেন নি, পাঠকের সাথে অমোচনীয় দূরত্ব সৃষ্টি করতে চান নি। তাঁর কবিতার আড়াল প্রতীক, উপমা, চিত্রকল্পের আড়াল, এছাড়া অনপনেয় কোনো আড়াল বা কুয়াশা নেই, যদিও শেষ কাব্যের নাম ‘কুয়াশার মুশায়েরা’ রেখেছেন, সেখানেও আড়াল অনতিক্রম্য নয়। তাঁর কবিতা জনবোধ্য হয়ে ওঠার এটি একটি বড়ো কারণ। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিতা লেখা তাঁর কাছে একটি বার্তা প্রেরণের মতো দায়িত্ব, যা তিনি নিষ্ঠার সাথে করতে চেয়েছেন। স্রেফ কবিতার খাতিরে কবিতা তিনি লেখেন নি; যখন কোনো বিষয় তাকে আলোড়িত করেছে, তখন তিনি কলম ধরেছেন, সাম্প্রতিক বাস্তবতা বারবার ক্ষুব্ধ করেছে তাকে, ষাটের কবিদের মতো প্রলয় দেখে চোখ বন্ধ করে রাখেন নি। মৌলবাদীদের ছোঁড়া পাথরে মৃত্যুবরণকারী নারী নূরজাহানকে নিয়ে লিখেছেন একই শিরোনামের অনবদ্য কবিতা যেখানে তিনি কল্পনা করেছেন ওই মেয়ে একদিন আবাবিল পাখি হয়ে নির্মম মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে। গার্মেন্ট শ্রমিককে সম্বোধন করেছেন ‘পোশাক শিল্পের রাধা’ বলে যারা দিনরাত্রি ‘সীবনযন্ত্রে তিনশ-তেত্রিশ জোড়া হাতপা কনুই চিবুক জোড়া দেয় নতমুখে’। বস্তুত তারা জোড়া দিচ্ছে নগ্ন হয়ে পড়া সভ্যতাকেই। আরেকটি প্রধান যে বৈশিষ্ট্য তাকে বহুকাল পাঠক হৃদয়ে জাগিয়ে রাখবে তা হল কবিতার দার্শনিকতা। ‘ভুয়োদর্শন’ কবিতায় লিখেন,

 

‘দুঃখ হলো এক গিটার যে বাদকের আঙুল কেটে

নিজের তারের ধার পরীক্ষা করে;

আর সুখ এমন বাড়িঅলা, ঘর খালি নেই তবু টু লেট

নামায় না; দুঃসময় এমন বিরাট গেট

যার ভেতর দিয়ে দেখা যায় বন্ধুর আসল মুখ;’

 

অটোমেটিক রাইটিং তাঁর কাব্যে অদৃশ্য না হলেও অপ্রতুল। কবিতা লেখা তাঁর কাছে একেকটি প্রকল্পের মতো, কিন্তু বার্তা পাঠাতে গিয়ে বা দার্শনিকতা প্রবিষ্ট করাতে তিনি সাদামাটা কবিতার পথে হাঁটেন নি, হেঁটেছেন কবিতার অলঙ্কারসমৃদ্ধ পথে, বাক্যবন্ধকে প্রধানত কবিতা করে তুলতে চেয়েছেন, স্লোগান বা পোস্টার নয়। গদ্যের আদলে উত্তরাধুনিক শব্দবন্ধে লেখা অনেক কবিতা খটোমটো হলেও একরৈখিক নয়, বহুমাত্রিক। তাঁর আলাদা স্বরটি বোঝা যায় এসব কবিতায়। উদাহরণ দিই:

 

‘লোলজিহ্ব ছুরিটার নাসারন্ধ্রে জমে ওঠে ঘাম

হঠাৎ বাগিয়ে ঘাড়

তীব্র বেগে গেঁথে দিই চাকু, রক্তপাতের

ঝাঁ-সাঁ-সাঁ

স্বনন রণন এত সূক্ষ্ম যেন কামার্ত নারীর সী-শীৎকার।’ (হনন/জীবনের সমান চুমুক)

 

এ কাব্যভাষা পুরোমাত্রায় আশরাফীয়। নারীর সী-শীৎকার বাংলা কাব্যে অদৃষ্টপূর্ব। ‘জীবনানন্দের চিল’ কবিতায়  চিরপরিচিত বাংলাকে খুঁজে পান না , পান ভিনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনে পর্যুদস্ত এক বাংলাকে (‘ভিডিও গানের মধ্যে, হায় হুক্কু/ত্রিতাল বোম্বেটে সুর, নীল ছবি আর এই/বিষণ্ণ সন্ধ্যায়/হরিণীরা ফিরিতেছে, বস্ত্রবালিকারা/যেন মৃণালিনী ঘোষালের শব/এইমাত্র উগরে দিয়ে গ্যালো/অদূর শহর থেকে প্যাসেন্জার বাস।’ জীবনানন্দ দাশের কাল থেকে খোন্দকার আশরাফের কাল কতটা বদলেছে, সঙ্গে বিষয় ও ভঙ্গি নিয়ে বাংলা কবিতা, তা এই কবিতায় কিছুটা দৃশ্যমান। এখন প্যাসেন্জার বাস মৃণালিনী ঘোষালের শব উগরে দিয়ে যায়, আর বস্ত্রবালিকারা হরিণীর ন্যয় ব্যঘ্রজনপদে ত্রস্ত লুকায়।

 

তাঁর প্রতিটি কবিতাই অর্থবোধক। পাতা ভরানোর জন্য কবিতা লেখেন নি, যদিও আমৃত্যু তিনি কবিতার ভেতরেই কাটিয়েছেন। সময়ের বাঁকবদলের সাথে বদলে নিয়েছেন নিজের কবিতা। প্রারম্ভকালে তাঁর কবিতা প্রথাগত কাব্যভাষাতেই রচিত হয়েছিল, কিন্তু তিনি তাঁর সময়ের তরুণ কবিদের নিরীক্ষা ও কাব্যের বাঁকবদলটি দ্রুত ধরতে পেরেছিলেন, দ্রুতই ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিলেন নিজের কবিতার প্রকাশভঙ্গি ও অভিমুখ। আধুনিকতা পেরিয়ে তাঁর কবিতা উত্তরাধুনিকতায় তারুণ্যের দীপ্ত উল্লাসেই প্রবেশ করেছিল। তাঁর উত্তরাধুনিক কবিতাসমূহ যেমন তরুণদের প্রভাবিত করেছে, তিনি নিজেও প্রভাবিত হয়েছেন তরুণদের কবিতা দ্বারা, তাদের রন্ধনশালার চমকপ্রদ মালমশলা থেকে নিজস্ব অনেক ডেলিকেসি বানিয়েছেন। খোন্দকার আশরাফের এই অভিযোজন ক্ষমতা বিস্ময়কর। সঙ্গী হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন তরুণদেরই, নিজের সম্পাদিত পত্রিকা ’একবিংশ’-এ তিনি তরুণদের কবিতাই মুদ্রিত করতেন এবং সজ্ঞানে এড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রবীণদের। নতুনের পথে হাঁটতে, নতুন প্রকরণের ভিতর পৌঁছাতে, নতুন কাব্যভাষা আবিষ্কারে তাঁর সততা ও দৃঢ়তা এতে প্রমাণিত। তাঁর এই তারুণ্যপ্রীতি পছন্দ হয় নি জেষ্ঠ্যদের।

 

তাঁর কবিতায় বস্তুকে উপমায়িত  করে তোলার এক জাদুকরী দক্ষতা দেখি। পুনরাবৃত্তিমূলক হলেও সৃজনের অপূর্ব উদ্ভাসনে সেসব তুলনা মনোরঞ্জনকারী। ‘আমার ঘাতক’ কবিতায় তিনি তাঁর ঘাতককে, যে অনিষ্টের প্রতীক, অস্ত্র হাতে আহবান জানান মল্লযুদ্ধে। সেখানে ঘাতকের অস্ত্র একইসঙ্গে কিংবা ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠে ‘ক্রুদ্ধ নুনের ছুরি’, ‘মোহাবিষ্ট চকিত চাকু’, ‘শাণিত ফলার নাচ’, ‘বল্লমের মুগ্ধ জিভ’, ‘ক্ষুব্ধ চাবুক’। একই বস্তুকে বিভিন্নরূপে বিশেষায়িত করে তোলার, বিপরীতার্থে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার এই ঝোঁক খোন্দকার আশরাফের কাব্যে সবিশেষ লক্ষণযোগ্য। এখানে তিনি ষাটের কবিদের সমগোত্রীয়। ভৈরবী নাচন নাচা নদীতীরের ঘাসে গরুর হাম্বারবের সাথে নৃত্যরত কসাইয়ের হাসি হয়েও থেমে যাবে না, যাবে আরো আরো বিস্তারে…

 

‘দেখি তোর ঝোলাঝুলি ছুরি বাট বিষয় আশয়

দেখি তোর সকল উলম্ফ চোখ প্রেতায়িত ঘৃণা ও ঘুঙুর

ঘূর্ণিত গোঁফের নিচে হাফচাঁদ হাসি ক্রুর

বণিকের মতো তোর প্রজ্জ্বলন্ত হিসেবী আঙুল’        

(আমার ঘাতক/জীবনের সমান চুমুক)

 

পুরো কবিতাটিই উপমায়িত করে তোলার কাব্যিক দক্ষতার নিদর্শন। ফেনিয়ে তোলার, নাটকীয় করে তোলার এই প্রবণতা খোন্দকার আশরাফের কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আশ্চর্য সবই কাব্যিক, নীরস পুনরাবৃত্তিমূলক নয়। ঘাতক ক্রুর হলেও সুন্দর; আসলে সে তো কবি সত্তারই অন্যদিক। দ্বৈরথে রয়েছি আমরা সকলেই। আত্মসত্তার সাথে বহুবার দ্বৈরথে মুখোমুখি হয়েছেন এ কবি। আত্মদ্বন্দ্ব তাঁর কবিতার একটি ডাইমেনসন। যে শত্রু মোহন সুন্দর, সে শত্রু তো কবির ভেতরেই বাস করে।

 

উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক, অনুপ্রাসে সমৃদ্ধ তাঁর কবিতা। সুধীনদত্তের কবিতার মতো মেদহীন নয় তাঁর কবিতা, বরং অনেক অলঙ্কারে সজ্জিত কবিতা-দেহ জীবনানন্দের কবিতার মতো কিছুটা পৃথ্বুলা। তাঁর কবিতা যেটুকু দুর্বলতা প্রতিভাত হয় তা বর্ণনার পুনরোক্তি ও অনেক কবিতায় পর্যাপ্ত আঁড়ালের অনুপস্থিতি- যা সহজ করে বলার বা বিষয়কে সরাসরি উপস্থাপনের জন্য ঘটেছে। সহজ করে বা সরাসরি যা কিছুই তিনি বলেছেন তা কাব্যের ভাষাতেই বলেছেন, গদ্যের পথে হাঁটতে চান নি, যদিও গদ্যভাষণ তিনি পুরোপুরি এড়াতে পারেন নি। বাংলা কবিতা, বাংলা ভাষা ও বাংলার জনপদের সুমহান ঐতিহ্য তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল। ছিল চিরায়তের প্রতি দুর্দমনীয় আগ্রহ। লিখেছেন এমন অনেক কবিতা যা চিরকালের সত্যকে ধারণ করে। দূর অতীত এবং চিরভবিষ্যের প্রতি মুগ্ধ হয়েও তিনি ছিলেন তীব্রভাবে সমসাময়িক। খোন্দকার আশরাফ ব্যক্তিত্বে এবং কবিতায় ছিলেন প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী, অন্যায় ও দুঃশাসনের বিরোধী, ছিলেন নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। কিন্তু তিনি তাঁর বয়সে সমসাময়িকদের মতো অশৈল্পিক প্রতিবাদ, কাব্যমাধুর্যহীন প্রগতিশীলতাকে লালন করেন নি বরং পরিহাসচ্ছলে তীক্ষ্ণ কৌতুকে কাব্যিক চাতুর্যে আক্রমণ করেছেন গোঁড়ামি, পশ্চাৎপদতাও প্রতিক্রিয়াশীলতাকে। সঙ্কীর্ণ গোড়ামী ও কুসংস্কারমুক্ত এ কবি প্রতিক্রিয়াশীরতার বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন, তাঁর ভূমিকা এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট, কিন্তু তিনি ঘৃণা করেছেন চিৎকারকে।  কবি বলেই তাঁর প্রতিবাদের ভাষা কাব্যিক।

 

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে তাঁর লেখায় বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের, বিবিধ উপকরণ স্বভাবজাত নিয়মেই জড়ো হয়েছে। তাঁর প্রচুর কবিতার শিরোনাম ইংরেজি। কেবল শিরোনাম নয়, কবিতার পঙ্ক্তিতেও প্রচুর ইংরেজি শব্দ, ইংরেজি কাব্যের বিষয় ও চরিত্র সংযুক্ত করেছেন। কাকের ঠোঁটের ভেতর ‘থ্রি-স্ট্রোক ইঞ্জিন’ কল্পনা করেছেন, দেখেছেন ‘স্কেটপড়া মেঘের উন্মাতাল’ নাচ। কেবল ইংরেজি নয় তিনি প্রচুর আরবী, ফারসী শব্দ স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করেছেন কবিতায়। আর রয়েছে খাঁটি বাংলা শব্দের, পুরাণ, পুঁথির ভাষার উন্মাতাল প্রবেশ। নিজ কাব্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য দশভূজার মতো দশদিগন্ত থেকে আহরণ করেছেন শব্দাবলি। তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন বাংলার চিরকালীন ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির রূপ ফুটে ওঠে, তেমনি সমকালীনতার তীব্র চাবুকে বারংবার তাঁর পঙ্ক্তিমালা রক্তাক্ত হয়েছে। সনাতনকে সমকালের প্রেক্ষাপটে পরিস্ফুট হতে দেখি তাঁর কবিতায়। তিনি যে ঘরানার কবি তাতে বাংলা ও বাঙালির অতীত ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পুরাণ তাঁর কবিতার মর্মমূলে প্রোথিত। সুবর্ণ অতীতমুখিনতার সঙ্গে সমোচ্চারিত হয় বিবর্ণ বর্তমান।

 

তাঁর অনেক কবিতাতেই জীবনান্দের ছায়া পরিদৃশ্যমান, নিয়েছেন কবিতার শিরোনাম (যে জীবন ফড়িঙের)। আরেকটি কবিতার শিরোনাম ‘জীবনানন্দের চিল’। বিখ্যাত পাখিটিকে শ্যালো মেশিন প্রকম্পিত ইউরিয়া পটাশের গন্ধমাখা রূপান্তরিত বাংলায়, যেখানে ক্ষুধা দিগন্তবিস্তৃত, পুনর্বার আবিষ্কার করেন জলকষ্ট ঠোঁটে। আশ্চর্য যে, আঙ্গিকের বিচারে জীবনান্দের ঠিক বিপ্রতীপ ঘরাণার সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার প্রতিও খোন্দকার আশরাফের সমান আগ্রহ ছিল। জীবনানন্দের হৃদয়-সংবেদের সাথে সুধীন্দ্রনাথের বোধ ও চেতনাকে মেলাতে চেয়েছেন কাব্যে। কল্লোল-পরবর্তী পাঁচ কবিকে ঘিরে তাঁর উৎসাহ, আগ্রহের কমতি ছিল না কখনো। ‘একবিংশ’-এর শেষ সংখ্যাগুলো এক এক করে তিনি এই পঞ্চপা-বের জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে অতীব যত্নে সাজিয়েছিলেন। সুধীনদত্তের বিখ্যাত ঘোড়সওয়ারকে নিয়ে লিখেছেন, ‘এ চোরাবালিতে ডেকো না আমাকে/দিগন্তের হে ঘোড়সওয়ার’। বিভিন্ন কবিতাগুচ্ছে, বিষয়ভাবনায় ত্রিশের আধুনিক কবিরা তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কুয়াশার মুশায়েরা গ্রন্থে জীবনানন্দের বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’ কে অনুসরণ করে লিখেন ‘আকাশের শেষ সূর্য নিভে গেলে জেগে থাকে তিমির সফেন-/ত্রিতল দুঃখের ঘরে মুখোমুখি বসিবার আশরাফ হোসেন।’ নিজের নামে নামাঙ্কিত কবিতাটি মনে পড়িয়ে দেয় খোন্দকারের প্রিয় কবি আবুল হাসানের নিজ নামের কবিতাটির কথা। জীবদ্দশায় তাঁর উপর লিখিত বিভিন্ন প্রবন্ধ সংকলিত করে নাম দিয়েছিলেন ‘মুখোমুখি বসিবার আশরাফ হোসেন’। বারংবার নিজের মুখোমুখি হতে চেয়েছেন, অন্যের দর্পণে দেখতে চেয়েছেন নিজেকে। আকাশের শেষ সূর্য মনে পড়িয়ে দেয় ‘দিবসের শেষ সূর্য’। রবীন্দ্রভুবনের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী ত্রিশের কবিকুলের ভাবাদর্শী খোন্দকার আশরাফ হোসেনে রবীন্দ্রপ্রভাব দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে অনুপস্থিত; যদিও রবীন্দ্রনাথ তাঁর মস্ত প্রেরণা, তবুও রাবীন্দ্রিক আদলে কিছু লিখেন নি তিনি।

 

বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যান বারবার ফিরে এসেছে তার কাব্যে ; পুরাণের প্রতি আগ্রহী কবির ভালোলাগা এখানে স্থির। বাংলাদেশকে বলেছেন ‘বেহুলা বাংলাদেশ’। নির্বাচিত কবিতার কবিকৃত অনুবাদের নাম On Behula’s Raft । বিভিন্ন প্রতীকে ফিরে আসে সুতানালী সাপ আর গাঙুরের জলে বেহুলার যাত্রা হয়ে ওঠে প্রতিবাদী অভিযাত্রার অবলম্বন।  কেবল লখিন্দরকে নয়, বেহুলাকেও কেটেছে সন্তাপের সাপ। প্রথম কাব্যের ‘সাপ’ কবিতায় সাপকেই আহবান করেন (‘তোমাকেই হতে হবে চন্দ্রবণিকপুত্রের অমোঘ ঘাতক’) পুঁজির হৃদপিন্ডে ছোবল বসাতে। এখানে চন্দ্রবণিকপুত্র লখিন্দর পরাক্রান্ত পুঁজির প্রতীক। তবে লখিন্দরকে তিনি অন্য ভূমিকাতেও দেখেছেন। কখনো চাঁদ সদাগর সপ্তডিঙা ভরে বিলাসের বস্ত্র নিয়ে আসে। আগুনকে তাঁর মনে হয়েছে ফণা তোলা সাপিনী আর প্রিয়ার আকাক্সক্ষায় বনের মাঝে যে মরণে তিনি প্রস্তুত তাও অন্য কিছু নয়, সর্পাহত কাঠুরের মরণ। বন, বনের কাঠুরিয়া, পাতাকুড়–নি মেয়ে খোন্দকারের প্রিয় অনুষঙ্গ, যিনি কখনো কখনো কবিতার সাদাপাতাকে নাটকের মঞ্চ হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন। আর বারংবার ফিরে এসেছে আয়না ও ছুরি। অবাক হই না তার একটি গ্রন্থের নাম ‘আয় (না) দেখে অন্ধ মানুষ’। কবিতা কোলাজে একটি কবিতাংশের নাম ‘ছুরি ও আরশি’। লালনের আরশিনগরের পড়শির হাতে ছুরি দেখেছেন এ কবি। ‘আমার ঘাতক’ কবিতায় ঘাতককে উদার আহবান করেন, ‘আয় তোর ক্রুদ্ধ নুনের ছুরি মোহাবিষ্ট চকিত চাকুর/ শানিত ফলার নাচ বল্লমের মুগ্ধ জিভ আয়’। অন্যদিকে ‘নকটার্ণগুচ্ছ’ কবিতায় লিখেন, ‘…তারপর চাঁদ তার চাকুটাকে/ আকাশের পিঠে গেঁথে পালিয়ে যাবে দূরে।’ অন্যত্র বলেন, ‘শানানো হয়েছে ছুরি, বন্ধ ঘরে চুল্লির আগুন’, কিংবা ‘নাচছে ছুরি, হায় ভগবান, নাচছে ছুরি নিখাদ আলোয়’। কখনো আয়না ও ছুরি একসঙ্গে এসেছে কবিতায়- ‘তবু যায় দিন তবু আরশিতে দেখি নিজ মুখ/চোখের ক্রোধের নিচে একসারি দুলছে ছুরিকা’, কিংবা ‘আরশিতে উঠবে জ্বলে ধাঁধানো আলোর লাল বাতি/ছুরি ও ছুড়ির পায়ে ঝমাঝম বাজবে ঘুঙুর।’ ছুরি ও ছুড়িকে মিলিয়ে দেওয়া আশ্চর্যকর! কবিতা কোলাজের ‘আরশি ও ছুরির মধ্যে ঢুকে যাবে তৃষ্ণায় কুকুর’ বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। ‘হনন’ কবিতায় ‘ঢিল ছুঁড়ে আয়নাটা ভেঙেই দিলাম শেষতক’ বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। এ শহরে পুরুষেরা ছয়দিন পরস্পরের গলা কাটে চতুর ছুরিতে। সপ্তম দিন জামার আস্তিনে গাঁথে ঈশ্বরের ছাপ। সপ্তাহব্যাপী পরস্পরের হননে মগ্ন থেকে একদিন জুম্মায় গিয়ে আল্লাহর করুণা চায়? কী নিদারুণ ভন্ডামী! কী কবিতায়, কী সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি ছিলেন ভন্ডামীর বিরুদ্ধে আপোশহীন এক উচ্চকণ্ঠ মানুষ। আয় (না) দেখে অন্ধ মানুষ গ্রন্থের ‘আই হসপিটাল’ কবিতায় লিখেন,

 

‘আমার চোখে কী হয়েছে ডাক্তার, কেন আজকাল

মানুষের মুখ দেখে বুঝি না

কে পথিক, কে পথের ঠিকাদার

কে নাবিক, কে জলের ঢেউ গুনে পয়সা তোলে,‘

 

পঁচে যাওয়া সময়ের প্রতি তাঁর রিরংসা এতে রূপকের আড়ালে প্রকাশিত। ‘আবার আসতে পেলে যা যা করব (না) তার তালিকাতেও একই বিক্ষোভ:

 

‘যদি আসি আগুন হয়ে আসবো তৃষ্ণার জল

একসাথে হবো ছুরি আর ক্ষতের মলম

জিহ্বা থাকবে দুটো, ফেলে আসবো অপ্রসন্ন  কলমের ভার

প্রেমে হবো চতুর কৃষ্ণ, যুদ্ধক্ষেত্রে মিথ্যুক অর্জুন

আবার আসতে পেলে তোমাদের

মিথ্যেবাদী বিদ্যালয়ে অনাচার্য হবো।’

 

তীব্র নঞর্থকতার ভেতরে আসলে তো ক্রোধ, অন্যায়কে অস্বীকারের ভেতর দিয়ে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার বাসনা প্রস্ফুটিত। একের ভিতর বৈপরীত্যের বা দ্বৈতের এই প্রকাশ বিভিন্ন ধর্ম, যেমন অগ্নি উপাসকদের মাঝে দেখা যায়, যারা বিশ্বাস করে- শুভ ও অশুভের প্রতিনিধিত্ব করে দুজন আলাদা ঈশ্বর (একেশ্বরবাদীরা দ্বিতীয় ঈশ্বরকে শয়তান বলে) এবং এও বিশ্বাস করে পরিশেষে শুভের জয় ও অশুভের পরাজয় ঘটবে। 

 

আয় (না) দেখ অন্ধ মানুষ গ্রন্থে সমকাল ও মিষ্টিক চেতনার যুগলবন্দী প্রত্যক্ষ করা যায়। শুরু থেকেই যা ছিল তার কাব্যের একটি পরিচয়সূত্র, তা এই কাব্যে সম্প্রসারিত হয়েছে। সহজ ভাষায় জটিল দর্শনের অবতারণা করেছেন তিনি। ‘মির্জা গালিবের না- লেখা কবিতা’য় তিনি লেখেন, ‘তোমার না-দেখা চোখে যদি জ্বলে আমার কবর/তবুও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে দেবো না খবর॥’ সহজভাবে লিখিত পঙ্ক্তিমালা, কিন্তু সহজ নয়। অন্যত্র লিখেন, ‘তৃপ্তির পেছনে ছুটলাম, সে আমাকে দেখালো নদী,/পিপাসা ঝুলিয়ে রাখলো আগডালে ঘুড়ির মতো/প্রেম বললো, একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকো সারস’ (মোহর)। ‘মনমাঝি’ কবিতায় লিখেন, ‘বাতাসের মধ্য থেকে রোদের উপান্ত ছুঁয়ে এই মাছরাঙা/কোথা যাবে? কার ঘরে জ্বালাবে সে রঙিন ঝালর/মনমাঝি জানে নাকি তার সে খবর?’ সহজিয়া দর্শন, লালন তাকে আগাগোড়াই টেনেছিল। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক জন্মবাউল, সংসারে থেকেও বিবাগী। আঙ্গিক ও কাব্যভাষা নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’ গ্রন্থের ‘কবিতা কোলাজ’-এর বারোটি কবিতা এর চমৎকার নিদর্শন, তাঁর শক্তিমত্তা এতে প্রকাশিত।

 

‘তোরা যাবি, তোরা তো অবশ্যি যাবি, যা

আমার যাত্রার ধ্বনি শুষে নেবে কাল

চৈত্র সংক্রান্তির ঘূর্ণ্যমান পাতা আমি নববৈশাখ

প্রমত্ত ডালের ’পর ঝুলে আছি আহত বৃশ্চিক

কাকের ঠোঁটের মধ্যে কম্পমান থ্রি-স্ট্রোক ইঞ্জিন।’ (যাত্রা)

 

‘কত রঙ্গ দেখি যাদু, রঙ্গে রঙ্গে বেলা গ্যালো ভাটি

আকাশে প্রস্তুত হলো মেঘবতী ঘোড়া

ধুলোর আদর নিয়ে রুক্ষ্ম চুলে শুধু পথ হাঁটি

পশ্চাতে টিনের বাদ্য, পিঠে পড়ে কোড়া

… … … … … … … … …

আকাশ বুড়িয়ে যায় সোনারঙ ধুয়ে হয় কালি

রঙ্গ দেখে বেলা গ্যালো, হারে বিধি কি সঙ দেখালি’ (রঙ্গ)

 

     ‘ধান ভানে তিনজন, তিন বোন।

বেহুলা কনিষ্ঠা তার বড়ো বোন যুবতী খুল্লনা

মেজটি লহনা

তারা ধান ভানেও ভালো জানেও ভালো

তাদের গায়ে রূপার সোনার গহনা’ (ধানরমণী)

 

‘তামার পাত্রে রাখো বৌ মাছ

না হয় অন্ধকার কুলুঙিতে কাচের বৈয়ামে

দু’হাতের অঞ্জলিতে রাখো

ঝিলিক দিয়েছে তার ল্যাজের উদ্ভাস’ (বৌ মাছ)

 

কবিতা কোলাজের কিছু স্তবক তুলে আনা হলো খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতার উত্তরাধুনিক মেজাজটি বোঝার জন্য। তাঁর পঠন-পাঠনের গভীরতাও নজর এড়াবে না সচেতন পাঠকের। বাংলার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে প্রভূত প্রেরণা পেয়েছেন এ কবি, তাদের উপস্থাপিত  করেছেন আধুনিক প্রেক্ষাপটে, অত্যন্ত নির্মোহভাবে। পুঁথি ও পুরাণের অনেক বিষয় তাঁর মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেত। কবিতাসমূহে অনেক অভাবিত শব্দ ও বাক্যবন্ধের ব্যবহার প্রমাণ করে তিনি সচেতনভাবেই ধাক্কা দিতে চেয়েছেন পাঠকদের। নিজস্ব একটি ভাষারীতি গড়তে সচেষ্ট ছিলেন তিনি, সন্দেহ নেই। ‘যমুনা পর্ব’-এ এমনি একটি পাঁচখ-ের কবিতা কোলাজ দেখি, যার পঞ্চম কবিতাটির আবার রয়েছে তিনটি অংশ। চতুর্থ কবিতা ‘বাসন্তী কথা’য় ফিরিয়ে আনেন পুঁথির ভাষা।

 

‘প্রথমে বন্দনা করি খোয়াজ খিজির

পানির ফকির তারা পানিতে আস্তানা

শরীরে জলের ডাকে তারাও মস্তানা

আর শুনি জালে বন্দী মাছের জিকির।’

 

উত্তরে শুনেছি আছে উঁচু এক পাথরের ঢিবি

যেখানে জিব্রিল নাকি একদিন রেখেছিল পাও

আর সেথা মহাসুখে মহাদেব আর তার বিবি

মহাসুখে যান নিদ্রা, তুরন্ত উধাও

 

খোন্দকার আশরাফ হতে পারতেন আধুনিক কালের শ্রেষ্ঠ পুঁথি রচনাকারী। এই রচনারীতিতে তিনি অনবদ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিহীন। তিনি অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারমুক্ত মানুষ, তাই তার পঙ্ক্তিনিচয়ে কোনো ভক্তিরস নয়, ফুটে ওঠে তীব্র শ্লেষ ও অসঙ্গতির প্রতি তুলে ধরেন দ্ব্যর্থহীন আঙুল। এরপরেই ‘নায়িকার সাজ বর্ণনা’ বলে তিনি যোগ করেন ভিন্ন আস্বাদ।

 

‘প্রথমে পিন্ধিল শাড়ি

শাড়ির নামটি হিয়া

শাড়ির শধ্যে আঁকা আছে

তিন সহস্র টিয়া

                .. .. .. .. .. ..

                তারপরে পিন্ধিল শাড়ি

                শাড়ির নামটি দেশ

                সেই শাড়িতে সুন্দর কন্যা

                                 দেখতে হইলো বেশ’

 

পুঁথির আদলে লেখা হলেও তিনি যা বর্ণনা করেন তার বিষয় চূড়ান্ত আধুনিক। সুন্দরী কন্যা এক এক করে আরো অনেক শাড়ি পরিধান করে, কেননা ‘মনে না পোষাইলে শাড়ি/টান দিয়া খসায়’। কন্যার রূপবর্ণনায় ‘খাসা তাহার পাছা’ জাতীয় রোমান্টিকতাহীন বাক্যবদ্ধও জুড়ে দেন নির্দ্বিধায়। কন্যার পরিণতি কিন্তু সকরুণ, যমুনার তুফানে সলিল সমাধি ঘটে তার, ‘সায়ংকালের শেষে সে হয় জালের বন্দিনী। প্রসঙ্গত বলে রাখি তার কবিতায় বারংবার ফিরে আসে ছন্দের দোলা। ছন্দে তিনি দারুণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

 

ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা ও পরিহাসপ্রবণতার অনুপম উদাহরণ হয়ে থাকবে T. S. Eliot -এর বিখ্যাত কবিতা The Lovesong of J. Alfred Prufrock -এর বাংলা অনুবাদ। এখানে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুরোনো ঢাকার অধিবাসীদের ব্যবহৃত মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। শিরোনামটি পড়লেই এর মেজাজ বোঝা যায় ‘আলফু সরদারের পিরীতের লাচাড়ি’। T. S. Eliot -এর মূল আর খোন্দকার আশরাফ হোসেনের অনুবাদ পাশাপাশি রেখে পড়লেই পাঠক বিস্মিত হবেন কবির রসবোধের তীক্ষ্মতা ও অনুবাদের মুনশিয়ানা দেখে।

 

‘লও যাই, তুমি আর আমি

এই মাগরেবের ওক্তে আসমানডা যহন ভ্যাটকায়া রইছে

টেবিলের উপরে মিরকির বিমারীর লাহান;

লও যাই আদ্দেক সুনসান গলির মইদ্দে দিয়া

যেহানে নওয়বপুরের হ¹ল একরাইতের হৈটালগুলাত

কারা জানি ফাসুরফুসুর করে

আওর ছালাদিয়া রেস্টুরেন্টগুলানভি বেচে ইলিশমাছের সালুন।’

 

এত ভালো adaptation সহসা চোখে পড়ে না। sawdust restaurant আর oyster-shell হয়ে গেল ছালাদিয়া রেস্টুরেন্ট ও ইলিশমাছের সালুন! মনে পড়ে ঢাকার কুট্টিদের ভাষায় একটি অনবদ্য কবিতা লিখেছেন আশির দশকের জুয়েল মাজহার (চান্দনী পশর রাইতের লৌড়), তবে সেটি মৌলিক কবিতা, অনুবাদ নয়। ভূমিকাসহ এই দীর্ঘ কবিতাটি খোন্দকারের শেষ গ্রন্থে সংকলিত। পরিহাসপ্রবণতা উত্তরাধুনিক কবিদের একটি বিশেষ প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য। পূর্বেই বলেছি তিনি যেমন তরুণ কবিদের প্রভাবিত করেছেন, তেমনি তিনিও তরুণদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। সমকালের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে জানতেন এই কবি, যিনি পৌরাণিক হয়েও আধুনিক। ওই একই গ্রন্থে দেখি  Robert Frost-এর বহুলপঠিত কবিতা Stopping by Woods on a Snowy Evening ঊাবহরহম-এর একই মেজাজে অনুবাদ করা ‘মগরেবের ওক্তে জঙ্গলের কিনারে’ কবিতাটি।

 

‘কোন্ মিঞার এই জঙ্গল, মনে লয় জানি

এই মহল্লায় ভি হ্যার হাবেলি অয়া পারে

এই যে খাড়াইয়া এইহানে হালা জানা ভি পারবো না,

দেকবার লইছি ক্যাম্নে বর্ফে ভরতাছে জংলারে!’  

 

Robert Frost-এর কবিতাটির শেষের সেই অন্তহীন উচ্চারিত পঙ্ক্তিমালা ÔThe wood is lovely, dark and deep/But I have promises to keep/And miles to go brfore I sleep’ এর তর্জমা ‘জঙ্গলডা হালায় জবর সোন্দর, আণ্দাইরা গহিন লাগে;/মাগার আমার তো বহুত জবান দেওন আছে-? যাওন লাগব দূরের রাহা নিন্দ যাওনের আগে’ এককথায় অসাধারণ! শামসুর রাহমান ফ্রস্টের কবিতার একটি অনবদ্য অনুবাদ করেছিলেন, তবে প্রমিত বাংলায়। স্মরণযোগ্য পুরানো ঢাকার কুট্টিদের মুখের ভাষায় প্রথম অনবদ্য কবিতা লেখেন শামসুর রাহমানই।

 

বস্তুত পরিহাসপ্রবণতা ব্যপ্ত হয়ে আছে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতা প্রান্তরে। এমনকি তাঁর প্রতিবাদের ভাষাও পরিহাসময়। তিনি লিখেন ‘বাস্তুঘুঘুর সময় এসেছে তুলনাহীনের দেশে’। ‘সদানন্দের পদাবলী’-শীর্ষক দীর্ঘলেখায় তাঁর পরিহাসপ্রবণতা দক্ষতার শীর্ষ ছুঁয়ে গেছে। এই আশ্চর্য সৃষ্টিকে কী নামে ডাকা যায়? গদ্য, পদ্য, গান, ব্যাখ্যা, খ- পুঁথি, ছড়া- কী নেই তাতে? উদ্ধৃতি দেই:

 

‘(আর ) গুরুশ্রেষ্ঠ মহামতি ফারাক নাজার।

কেমনে বর্ণিব আমি তার সমাচার॥

অতিবড় সিদ্ধজন বিদগ্ধ মহান

কূটতর্কে তার সাথে হারে বুজুর্গান॥

বড়বড় বাঘ সিংহ হেলায় মারেন

ফগগার চৌধুরী হইতে প্রজ্ঞানন্দ সেন॥

ফেরেব বুঝিতে পারে হেন সাধ্য কার।

এক্কও ধরিতে পারে নাহি খন্দকার॥

তাঁর হাঁকে মূর্চ্ছা যায় শৃগাল ও গর্দভ

এক ঘাটে পানি খায় ছাগল ও বৃষভ॥’

 

কবিতাংশের ‘ফারাক নাজার’কে চিনতে কবিতা পাঠকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিম-লে নব্য মৌলবাদী ধ্যানধারণা বিস্তারকারী একজন ছদ্মবেশী প্রগতিশীল তত্ত্বগুরুর প্রতি তাঁর রাগ ও বিবমিষা এভাবেই বয়াণ করেছেন ‘খন্দকার’। তিনি রাখঢাক রাখেন নি, ‘কোদাল’কে ‘কোদাল’ই বলেছেন। এই (খাঁটি) আচরণ তাকে অজনপ্রিয় করেছে সত্যি, কিন্তু তিনি ছিলেন ভ্রুক্ষেপহীন। এই দীর্ঘ পদাবলির ‘পয়লা পদ : সদানন্দের প্রার্থনা’ অংশে তিনি লিখেন:

 

                ‘আমাকেই হত্যা করে শিষ্য চলে যায়

                আমাকে ভুলিয়া ভক্ত রামানন্দ জপে

                যে ভুলে ভুলুক কোটি কিউরিও শপে

                আমারই নামের পদ্য মুফতে বিকায়’

 

বাংলা কবিতায় উপরের উদ্ধৃতাংশ সমূহের সমতুল্য কিছু দেখি না। এর কাব্যরীতি ও প্রকাশভঙ্গি সক্ষমতার হাত ধরে হতে পারতো খোন্দকার আশরাফের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অঞ্চল। রাগপ্রকাশের এমন অভিনব শ্লেষ কবে দেখেছি আমরা? মধ্যযুগের ব্রিটিশ কবি Edmund Spencer এর Faerie Queene কবিতায় একই প্রকার রূপকায়িত একাধিক চরিত্রের সমাহার দেখা যায়। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে বিস্তর পড়াশোনা নিঃসন্দেহে তাকে সমৃদ্ধ করেছে, অনেক ঋণ পাঠকের অগোচরে থেকে গেছে (যেমন ঋণী ত্রিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের কবিরা)। কিন্তু খোন্দকার আশরাফের কৃতি হচ্ছে সে সব বিষয়কে তিনি বাংলা সাহিত্যে সফল অভিযোজন করেছেন, মিলিয়েছেন বাংলা কাব্যের মেজাজের সাথে।

 

গত বছর সার্ক সাহিত্য উৎসবে লক্ষ্মৌয় কাটানো কয়েকটি দিন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাকে দেখার সুযোগ আমার হয়। এরও আগে কলকাতায় একটি সাহিত্যিক আমন্ত্রণে একত্রে যোগ দিয়েছিলাম। দেখেছি প্রিয় সহধর্মিণীর স্মৃতিতে কাতর মানুষটির চোখে বেদনার জল। অল্পবয়সে ভালোবেসে যাকে বিয়ে করেছিলেন, যার সাথে কেটে গেছে যৌবন ও মধ্যবয়সের সকল দিনরাত্রি, তার আগেভাগে চলে যাওয়াকে তিনি মেনে নিতে পারেন নি। সহধর্মিণী ছাড়াও মায়ের মৃত্যু তাকে শোকাতুর রাখতো। আপাত কাঠিণ্যের আড়ালে তার মনটি ছিল দয়ার্দ্র। প্রকৃত কবির মতো তার চেতনা জুড়ে শুধুই কবিতা বিষয়ক ভাবনা বইতো। সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে তিনি তিনি যেমন কাব্য কাঠামোর চুলচেরা বুঝতেন, কবি হিসেবে বুঝতেন তাদের মান। নিরহঙ্কারী মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুপ্রিয়, সরস মন্তব্যে চমক দিতেন আর মাতিয়ে রাখতেন সকলকে, নিজেকে নিয়েও মশকরা করতেন প্রচুর। প্রতিটি বইমেলায় তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়বার মতো, শেষের দিকে বাণিজ্যিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভন্ডামীকে পাশ কাটাতে তিনি নিজেই নিজের বই প্রকাশ করতেন, একাধিক বই, আর সেসব সাজিয়ে নিজেই বসতেন লিটলম্যাগ চত্বরে। তিনি যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে পরিচয়কে অগ্রাহ্য করে কেবল কবি ও সম্পাদক হিসেবে বিরাজ করতেন নতুন লিখিয়েদের প্রাণবান মেলায়। প্রায় প্রতিদিন বইমেলা শেষে আমরা কয়েকজন হেঁটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ক্লাবে এসে কিছুক্ষণ বসতাম। তিনি আমাদের আপ্যায়ন করতেন এবং সরস কৌতুক ও বিদগ্ধ আলোচনায় প্রহরগুলো ভরিয়ে তুলতেন।  

 

তিনি যে কেবল একজন শক্তিমান কবি ছিলেন তাই নয়, তার হাতে ফুটতো অসাধারণ গদ্য। যারা তার প্রবন্ধ পাঠ করেছেন তারাই মুখোমুখি হয়েছেন এক অননুকরণীয় গদ্যের, ভাষা তার কলমে সাদা পৃষ্ঠার মঞ্চে ঘুঙুর পরে নেচে ওঠা সুন্দরী হতো। পঞ্চাশ ও ষাটের প্রধান কবিদেরও নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধসমূহ নতুন করে চিনিয়ে দেয় ওইসব কবিদের। বস্তুত তার মূল্যায়নের অপেক্ষা করতেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি। কবি বলেই সেসব গদ্যের শরীরে একদিকে ছিল কবিতার অলঙ্কার ও মাধুর্য, অন্যদিকে ছিল মেধার দীপ্তি ও  শাণিত বিশ্লেষণ। বাংলাদেশের কবিতা : অন্তরঙ্গ অবলোকন এ সকল প্রবন্ধকে এক মলাটের ভেতর ধারণ করে। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি ছিল বাংলা কবিতায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব নিয়ে রচিত, যা পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। বাঙালির দ্বিধা ও রবীন্দ্রনাথ এবং বিবিধ তত্ত্বতালাশ এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ প্রবন্ধের বই।

 

খোন্দকার আশরাফ হোসেন যদি একটি কবিতা বা প্রবন্ধও না লিখতেন, তবু ‘একবিংশ’ পত্রিকা সম্পাদনার জন্য তিনি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হতেন। ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে মৃত্যুর বছরটি পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৮ বছর সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে তিনি কবিতা এবং কবিতা বিষয়ক গদ্যের অত্যন্ত উঁচুমানের পত্রিকাটি সম্পাদনা করে আসছিলেন। এ পত্রিকা সম্পাদনার জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘লিটলম্যাগ’ পুরস্কার লাভ করেছিলেন নব্বই দশকের গোড়ার দিকেই। লেখা সংগ্রহ, বাছাই, প্রুফ রিডিং থেকে আরম্ভ করে প্রকাশনার প্রতিটি খুঁটিনাটি তিনি নিজে দেখতেন। একবিংশের জন্য তিনি প্রচুর প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন বিদেশী সাহিত্য, লিখেছেন বইয়ের আলোচনা। কখনো পর্যাপ্ত গদ্য না পেলে রাশেদ মিনহাজ ছদ্মনামেও লিখেছেন। কাব্যাঙ্গনে বিলম্বে প্রবেশের কারণে তাঁর চেয়ে বয়সে ছোটো কবিদের সাথে এক অসম অথচ নির্ভেজাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। অগ্রজদের এড়িয়ে, সমসাময়িকদের ভিড় ডিঙ্গিয়ে তিনি সখ্য গড়ে তুলেছিলেন নবীন কবিদের সাথে। সত্তরের কবিতার অগভীরতা, শিল্পহীন চিৎকার তাঁর পছন্দ হয় নি, বরং নিরীক্ষাপ্রবণ নবীন কবিদের মাঝে তিনি পেয়েছিলেন সেই প্রকরণ ও ভাবাদর্শগত গভীরতা যা ছিল তাঁর নিজেরও অন্বিষ্ট। ‘একবিংশ’ ঘিরে এইসব নবীন কবিরা জড়ো হয়েছিল, কেউ কেউ সম্পাদকীয় কাজে তাকে সাহায্যও করেছেন। ‘একবিংশ’-এ তিনি অগ্রজ বা সমসাময়িক কবিদের কবিতা প্রকাশে কখনই আগ্রহী হন নি, ভেবেছেন তাদের জন্য পত্রিকার অনেক পৃষ্ঠাই খোলা আছে, বরং যাদের দুয়ার রুদ্ধ, যারা প্রথা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী, যারা দৈনিকে লিখবেন না, তাদের তিনি ঠাঁই দিয়েছেন একবিংশের পাতায়। একবিংশের সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো ত্রিশের পঞ্চপা-ব কবিকুল ঘিরে, বাংলা ভাষার প্রণম্য কবিদের উপর অত্যন্ত নিষ্ঠা ও মেধা সহকারে প্রকাশ করছিলেন একেকটি সংখ্যা। মাঝে নিজের পিএইচডি কাজের জন্য কয়েক বছরের বিরতি ছাড়া বিরতিহীনভাবে এবং অপত্যস্নেহে কাগজটিকে লালন করেছেন আর তরুণ কবিদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন সৃষ্টিশীলতার বাতাবরণ। নতুন প্রতিভা সনাক্ত করা ও লালন করার গুরুদায়িত্বটি পালনের জন্যই তিনি আমাদের নমস্য হতেন। তরুণদের পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের বিপুল ঐশ্বর্যের সাথে। তাঁর বিশ্ব কবিতার বিচিত্র শস্য গ্রন্থটি এরকম প্রবন্ধে ঠাঁসা (উল্লেখ্য বইটি তিনি তুষার গায়েন, খলিল মজিদ, বায়েতুল্লাহ কাদেরী ও আমাকে উৎসর্গ করেছেন)। এসবই তিনি করেছেন পরম নিষ্ঠায়, নিজ ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।

 

তিনি ছিলেন প্রগতিমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক চেতনার মানুষ। ছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী। কেবল চেতনাবাহী বললে কম বলা হবে, তিনি যৌবনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তার সারল্য কোদালকে কোদাল বলতে শিখিয়েছে, যা তাকে কখনো কখনো কারো অপছন্দের পাত্রে পরিণত করতো। তবে সেসবই সাময়িক, কেননা মানুষটির মহৎ স্বভাবের পরিচয় বিরুদ্ধবাদীরা শীঘ্রই পেতেন। অল্প সময়ের নোটিশে তাঁর মরদেহ দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসা কবি-লেখকদের ভিড় প্রমাণ করে তিনি কতখানি প্রিয় ছিলেন সকলের। 

 

দীর্ঘদিন একবিংশে লেখালেখি ও আড্ডার সূত্রে আমি তার বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলাম। সে ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবেই কিনা জানি না, একদিন বিস্মিত হয়ে দেখি ‘একবিংশ’-এর প্রিন্টার্স লাইনে সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার নাম মুদ্রিত। যদিও সম্পাদনার সুদূরতম কাজটিও তিনি কখনো আমাকে দেন নি, তবু আমার নাম মুদ্রিত করতেন। ২০১২ সালে বইমেলায় প্রকাশিত আমার ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের মোড়ক তিনিই উন্মোচন করেছিলেন। এরও আগে আরও কিছু বইয়ের মোড়ক উন্মোচন তাঁর হাতেই হয়েছে। আমার ‘ঈশ্বরের নিজগ্রহ’ কবিতাগ্রন্থটি আমি তাকে এবং ‘নিসর্গ’ সম্পাদক সরকার আশরাফকে যৌথভাবে উৎসর্গ করি, যা ছিল তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়। 

 

তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা ‘হোরেশিওর প্রতি হ্যামলেট’-এ বন্ধু হোরেশিওকে মৃত্যুপথযাত্রী হ্যামলেট বলছে,

 

‘আমি যাই। তুমি থাকো; জীবনের দুর্বিষহ ভার

বাষ্পাকুল পৃথিবীর শ্বাসরোধী চন্দ্রাতপ-তলে

বয়ে যাও আরো কিছু দিন।’

 

এই বোধ আমূল প্রোথিত ছিল খোন্দকারের অনুভবে। স্বপ্নের পৃথিবীকে না পেয়ে তিনি বিমর্ষ ছিলেন। একই কবিতায় তিনি লিখেন ‘মরণ এমন দেশ যার ধূম্র আলিঙ্গন থেকে/ফেরে না পথিক কোনো, ফিরবো না আমি কোনোদিন,’। অন্যত্র মৃত্যুকে বলেছেন ‘নিবিড় সুবাসঘেরা আলোকিত ঘর’। এস্ত্রাগন ও পলায়িত উট কবিতায় লিখেছেন, ‘কথা ছিল বহুদূর যাবো, কে জানত পথিমধ্যে এমন ঘটনা হবে।’ বাংলা কবিতায় আরো বহুদূর যাওয়ার প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, অসময়ের মৃত্যু কী অযাচিত ঘটনাই না ঘটাল, সংক্ষিপ্ত করে দিল তাঁর চলার পথ।

 

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা তাকে বলতাম, এ বছর আপনি অবশ্যই একাডেমী পুরস্কার পাবেন। শুনে তিনি  আনন্দিত হতেন। পুরস্কার ঘোষণার পরে আমরা মুখ লুকাতাম আর তাঁর চোখেমুখে একটা উদাসীন বিষণ্ণতা ভেসে উঠত। এটা ঘটছিল গত পনের বছর ধরেই। এখন সকল পুরস্কার, তিরস্কারের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। মৃত্যু তার তীব্র তীর পার্থের বুকে বিঁধিয়েছে; কিন্তু আমরা জানি, জানে বাংলা সাহিত্যের সকল মুগ্ধ পাঠক, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের মৃত্যু নেই, যমুনা (পর্ব) বেয়ে তার কাব্যের ভেলা চিরকাল বয়ে যাবে। জীবনের সমান চুমুক-এর কবিতো আসলে জীবনেরই সমান, কেননা তার সমগ্র জীবন কবিতাকে ঘিরেই আবর্তিত, অন্য সকল ভূমিকা পোশাকী মাত্র। তাঁর সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয় সূর্যসেন হলে, যে হলের তিনি প্রভোস্ট ছিলেন। সেদিনই তিনি ত্রিশালের কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আমি জানতাম না সে সুসংবাদ, কি এক প্রাণের টানে চলে গিয়েছিলাম। তখন কি জানতাম হৃদয়ের জমিনে ঘরবাড়ি তোলা মানুষটির সাথে সেটাই আমার শেষ দেখা হবে, সকলকে বিমূঢ় ও শোকস্তব্ধ করে তিনি নিরালোকে পাড়ি দিবেন? যার হাতে নিত্যই সমৃদ্ধ হতে পারতো বাংলা সাহিত্য, বড়ো অসময়ে তিনি চলে  গেলেন। বাংলা কবিতার জন্মবাউল পার্থকে আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন! 

Facebook Twitter Email