কথাকারের সঙ্গে : আবদুশ শাকুর

Facebook Twitter Email

কবিতা ছাড়া সাহিত্যের প্রায় সব ধারাতে লেখালেখি করলেও লেখক হিসেবে আবদুশ শাকুরের যে কটি পরিচয়, তন্মধ্যে প্রাবন্ধিক পরিচয়টাই হয়ত প্রধান। ভাষা, সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, সংগীত, নিসর্গসহ বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ তাঁর প্রবন্ধের বিষয়।গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত, ভাষাশৈলী ও বর্ণনার দিক থেকে তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধই বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তবে তাঁর লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় প্রবন্ধের মাধ্যমে নয়, আত্মকথনমূলক ‘কাঁটাতেও গোলাপও থাকে’ শীর্ষক রচনাটির মাধ্যমে। কোনো এক দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল, সন-তারিখ মনে নেই, গত দশকের শুরুর দিকে হবে বলে অনুমান করি। এটির লেখনশৈলী আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল, এরপর থেকে পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা চোখে পড়লে না পড়ে রাখি না। কয়েক বছরের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে নানা বিষয়ে তাঁর আরো কিছু লেখা পড়ার সুযোগ হয়। যত পড়ি মুগ্ধতা ততই বাড়ে। মনে হয়, অন্যদের চেয়ে তাঁর লেখা আলাদা, পড়ে কিছু যেন শিখতে পারছি।

লেখা পড়তে পড়তে স্বাভাবিকভাবেই লেখকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বাসনাটাও ভেতরে কাজ করতে থাকে, কিন্তু তেমন কোনো সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ২০০৮ সালের দিকে সাপ্তাহিক-এর জন্য লেখা চাইতে একদিন তাঁর মোবাইল ফোনে কল দিলাম। নাম বলা মাত্র চিনতে পারলেন। যে কারণে ফোন করেছি তা বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, সমকালে আপনার লেখা পড়ি। ইবনুল আরাবির আন্তঃধর্মীয় ঐক্য বিষয়ে লেখাটি খুব ভালো। সময় হলে একদিন আমার বাসায় আসবেন, কথা বলব।’

তখন ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনা করছিলাম। সেই সুবাদে মাধ্যযুগের প্রাচ্যদেশীয় চিন্তাবিদদের চিন্তা বিষয়ে বেশ কটি নিবন্ধও লিখি। ২০০৬ থেকে পরবর্তী তিন বছর দৈনিক সমকালের উপসম্পাদকীয় পাতায় ‘ধর্ম ও দর্শন’ শিরোনামে ছাপা হয়। ফলে দর্শন যাদের আগ্রহের বিষয়, মোটামুটিভাবে তাঁদের কাছে আমার নামটি পরিচিত হয়ে উঠল। তাই বলে আবদুশ শাকুরের মতো প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ একজন লেখকও আমার লেখা পড়েন, এটা আমার ধারণার বাইরে। তাই খানিক বিস্মিত হলাম।

কিন্তু যে কারণে তাঁকে ফোন দেয়া তা-ই তো বলা হলো না! তিনি বিরক্ত হবেন ভেবে দ্বিতীয়বার ফোন না দিয়ে আমার অফিস থেকে ঠিকানা জোগাড় করে পরদিন বিকেলে তাঁর ধানমন্ডির বাসার দিকে রওনা হলাম। যেতে যেতে ভাবছি, তাঁকে কী বলে সম্মোধন করব? ভাই, আঙ্কেল, নাকি স্যার? ভাবছি, মানুষটা নিশ্চয়ই খুব আড্ডাবাজ, নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ থাকতে হবে তাঁর সঙ্গে।

কলিংবেল চাপলে এক কিশোর দরজা খুলে দিল। তিনি তখন ড্রইংরুমে। প্রথম সাক্ষাতে সৌজন্যতাবশত ‘কেমন আছেন ভাই’ কথাটি বলতে যাব, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো, ‘কেমন আছেন স্যার?’ প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে তিনি তাঁর একাকিত্ব জীবন ও লেখালেখি বিষয়ক ব্যস্ততার বর্ণনা দিলেন। জানতে চাইলেন আমার বাসা কোথায়। আমি তখন সাভার থাকি। বললেন, ‘তাহলে তো তোমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।’ বললাম, ‘না, আমি সময় নিয়েই এসেছি।’ স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘প্রতিদিন তো তোমাকে অনেক জার্নি করতে হয়! কষ্ট হয় না? শোনো, যারা দীর্ঘসময় যানবাহনে কাটায় তাদের আয়ু কিন্তু কম হয়। যে-কোনো সময় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। সাবধানে চলাফেরা করবে।’

অভিভাকসুলভ তাঁর আন্তরিক কথাগুলো শুনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার মাত্রাটা বাড়ছে, ঠিক তখনই তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, কেন এসেছ বলো তো?’

এবার তো আমি দারুণ বিব্রত! আসতে বলেছেন তিনি, অথচ জিজ্ঞেস করছেন কেন এসেছি! উত্তর খুঁজে না পেয়ে জানতে চাইলাম, তার শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের কোনো বই বেরিয়েছে কিনা। তিনি বললেন, না। কেন?

: না, এমনি। পড়ার জন্য।

: তুমি আমার লেখা পড় নাকি? বাহ! আমার তো পাঠক নাই। অনেকে আমাকে বলে, আমি নাকি লেখকদের লেখক। কী হাস্যকর উপাধি দেখ! এই কথা বলে লেখক হিসেবে তারা আমাকে খারিজ করে দেয়। সেক্ষেত্রে জীবদ্দশায় নিজের লেখাকে শ্রেষ্ঠ খেতাব দিয়ে কোনো সংকলন বের করলে তো তারা আমাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়ার একটা ভালো মওকা পাবে।

: কথাটা ঠিক না স্যার, এটা  আপনার ধারণা। আপনার লেখার সঙ্গে যারা কমবেশি পরিচিত তারা কখনোই আপনাকে খারিজ করতে পারবে না। সংকলনটি নিজে করতে না চাইলে কাউকে দায়িত্ব দিয়েও তো করানো যায়। তাতে পাঠক হিসেবে আমরা উপকৃত হবো।

: কে করবে? আমি তো বিবরজীবি নির্বান্ধব মানুষ।

কী ভেবে বলে ফেললাম, আপনি অনুমতি দিলে কাজটা আমি করতে চাই।

: ঠিক আছে, করো। আমার কোনো আপত্তি নাই।

তারপর তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ব্যস্ততার কারণ তবলাবাদকের আগমন। মসোহারার ভিত্তিতে একজন তবলাবাদক আসেন তাঁর বাসায়। তার সঙ্গে এখন তিনি গানের রেওয়াজে বসবেন বলে আলাপ সমাপ্তির দিকে টানলেন। তাঁর ব্যস্ততা দেখে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। মন খুলে আলাপ করতে না পারার বেদনায় মন খানিকটা ভাঙা। ফোনালাপে তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা হয়েছিল, সরাসরি আলাপে মনে হলো, আমার ধারনার ঠিক বিপরীত মেরুর মানুষ তিনি। আসলেই যে তিনি নির্বান্ধব, বিবরজীবি― কথাটা মিথ্যে নয়। ভাবছি, তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলনের মতো এত বড়ো একটা কাজের ভার যেচে মাথায় নেয়াটা কি উচিত হলো? এরকম একটি সংকলন করা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে? অহেতুক একটা ঝামেলা ডেকে আনলাম! এখন তাঁর সব কটি প্রবন্ধ পড়তে হবে, বেছে বেছে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ নির্বাচন করতে হবে। প্রস্তাবটা যেহেতু আমার, নিজ থেকেই যেহেতু দায়িত্বটা মাথায় নিয়েছি, যে করেই হোক এটি এখন আমাকে করতেই হবে। করতে না পারলে আমার সম্পর্কে তাঁর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। ভাববেন, তাঁকে খুশি করার জন্যই এমন একটা প্রস্তাব দিয়েছি।

দোনোমনায় ভুগতে ভুগতে শেষ পর্যন্ত দৃঢ় সংকল্পে স্থির হই, যে করেই হোক সংকলনটি করবই। পরদিন থেকে মাওলা ব্রাদার্স ও ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থগুলো সংগ্রহ শুরু করি। কিছু পেলাম, কিছু পেলাম না। অধিকাংশ বই বাজারে নাই। ওগুলোর জন্য লেখকের শরণাপন্ন হতে হবে। বাকি বইগুলো সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কয়েকদিন পর আবারো তাঁর বাসায় গেলাম। ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে বেশ কিছু প্রবন্ধগ্রন্থ দিলেন আমাকে।

তখন সেপ্টেম্বর মাস, বইমেলা আসতে বেশি দেরি নাই। এ বছর সংকলনটি বের করা প্রায় অসম্ভব। প্রস্তাব দিলাম, তাঁর কিছু ভালো গল্প নিয়ে একটা বই প্রকাশের। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, কথা তো ওই একই হলো, নিজের গল্পকে শ্রেষ্ঠ বলা! বললাম, না, ওরকম কিছু না স্যার। এ বইয়ের নাম হতে পারে ‘নির্বাচিত গল্প’।

 

প্রস্তাবটা তাঁর মনে ধরল। রাজি হয়ে গেলেন। বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বও নিয়ে নিলাম। তাৎক্ষণিক রোদেলা প্রকাশনীর প্রকাশক রিয়াজ খানকে ফোন দিয়ে পান্ডুলিপির কথা জানালাম। অমত করলেন না তিনি। শুরু হলো গল্প নির্বাচনের কাজ। স্যার নিজেই নির্বাচন করলেন, তবে আমার সঙ্গে আলোচনা করে। উভয়ের মতামতের ভিত্তিতে গল্প নির্বাচন করে প্রায় আড়াই শ পৃষ্ঠার একটি পান্ডুলিপি তৈরি হলো। অবশেষে ২০১০-এর একুশে বইমেলায় তাঁর ‘নির্বাচিত গল্প’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এর ফলে তাঁর সঙ্গে আমার হৃদ্যতা আরেকটু গাঢ় হলো। অতএব শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলনের কাজ থেকে পিছু হটার উপায় নেই। চলতে লাগল তাঁর প্রবন্ধ পাঠ। পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে আমার ভেতর এই উপলব্ধি জন্মায় যে, প্রবন্ধসাহিত্যে আবদুশ শাকুর যে সমৃদ্ধি এনেছেন তা আমাদের প্রবন্ধসাহিত্যের দৈন্যদশাকে অনেকটা ঘুচিয়েছে। প্রবন্ধকে সাধারণত মননশীল সৃষ্টিকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু তিনি এতটা দক্ষতা ও অভিনবত্বের সঙ্গে লিখেছেন, তাঁর প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধই সৃজনশীলতার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে বলা চলে। তাঁর প্রবন্ধ মানেই নতুন কিছু, নতুন আস্বাদ, নতুন অভিজ্ঞতা। যে বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রবন্ধ রচনা করেছেন সেই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন বৈশ্বিক জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে। ভাষার ঐশ্বর্য, তথ্য, তত্ত্ব ও সৃজনশীলতার গুণে প্রতিটি প্রবন্ধই সুখপাঠ্য। জ্ঞানের বিভিন্ন উপাদানকে বিষয়ের সঙ্গে একাঙ্গীকরণে তাঁর দক্ষতা অভিভূত হওয়ার মতো। প্রতিটি প্রবন্ধই বিষয়, ভাষা ও শৈলীর দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মননশীল পাঠকের জন্য যেমন তৃপ্তিদায়ক তেমনি প্রজ্ঞার উৎকর্ষের সহায়ক। প্রতিটি প্রবন্ধের বিষয়ও অভিনব, বৈচিত্র্যমুখী। তিনি যেসব দুর্লভ ও কঠিন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন বাংলা সাহিত্যে সেসব দুর্লভই বলা চলে। পাঠেই বোঝা যায় এমন পরিশ্রমলদ্ধ কাজ একমাত্র জ্ঞানযোগী আবদুশ শাকুরের পক্ষেই সম্ভব।

 

ওই বছরের অক্টোবর নাগাদ প্রায় ৩২টি প্রবন্ধের একটি তালিকা তৈরি করে মেইল করে পাঠালাম তাঁকে। ভয় হচ্ছিল, আমার নির্বাচনে কোনো গলদ আছে কিনা! ভালো কোনো প্রবন্ধ বাদ পড়ল কিনা! সেদিন রাতেই আমাকে ফোন দিলেন তিনি, তালিকাটি সম্পর্কে তাঁর মতামত জানালেন। খানিকটা সঙ্কোচকণ্ঠে বললেন, ‘রচনা সাহিত্য’ ও ‘যুবতির কাহিনি’ নামের দুটি প্রবন্ধ আছে, তুমি পড়ে দেখতে পারো। তোমার সংকলনে এ দুটি প্রবন্ধও যোগ করা যেতে পারে।

প্রবন্ধ দুটি আসলে আমার পড়ার বাইরে রয়ে গিয়েছিল। রাতেই তিনি মেইল করে পাঠিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত এ দুটিও তালিকায় যুক্ত হলো। প্রায় পনের দিন পর নির্বাচিত ৩৪টি প্রবন্ধের একটি বিশাল ওয়ার্ডফাইল মেইল করে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। আমার ধারণা ছিল, প্রবন্ধগুলো বুঝি নতুন করে কম্পোজ করতে হবে। এ নিয়ে একটা চিন্তা ছিল আমার মধ্যে। পাঠক সীমিত বলে তাঁর বই এমনিতেই তেমন বিক্রি হয় না। প্রকাশক লস না দিলেও খুব একটা যে লাভ করতে পারেন তাও নয়। সুতরাং এতগুলো প্রবন্ধ কম্পোজের কথা প্রকাশককে বলিই-বা কেমন করে! তাছাড়া প্রুফ দেখার বিশাল ঝামেলা তো আছেই। স্যার সব কটি প্রবন্ধ নির্ভুলভাবে মেইল করে পাঠানোয় কাজটা খুবই সহজ হয়ে গেল। কিন্তু ঝামেলা গেল না। ৩৪টি প্রবন্ধ দিয়ে সংকলনটি করতে গেলে পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাত শ। একটা দারুণ বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম। এত বড়ো বই কোন প্রকাশক ছাপবে? ছাপলেও কে কিনবে? দাম তো হবে সাত শ টাকার বেশি।

কদিন চুপচাপ থেকে একদিন ব্যাপারটা স্যারকে খুলে বললাম। তিনি বললেন, তোমার যা ভালো মনে হয় করো। দরকার হলে কিছু বাদ দাও। নির্বাচনের কাজ চুড়ান্তভাবে শেষ করে আমাকে জানাবে।

 

শেষ পর্যন্ত বেছে বছে চৌদ্দটি প্রবন্ধ বাদ দিয়ে বিশটি রাখলাম। এতে পা-ন্ডুলিপির পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় চার শ। ‘সংকলকের নিবেদন’ শীর্ষক আমার লেখা তিন পাতার একটা ভুমিকা যোগ করে পান্ডুলিপিটি তাঁকে মেইল করে পাঠালাম। পরের বছর জানুয়ারির শেষের দিকে পান্ডুলিপির ট্রেসিং বের করে রিয়াজ ভাইকে পাঠিয়ে দিলেন স্যার। ২০১১ সালের একুশে বইমেলায় এটি প্রকাশিত হলো। এ ধরনের সংকলিত বইয়ে সংকলকের নাম সাধারণত ভেতরেই থাকে। বইটি প্রকাশের পর এর প্রচ্ছদ দেখে আমি খানিকটা বিব্রত। প্রচ্ছদে লেখা : ‘আবদুশ শাকুরের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, সংকলক : স্বকৃত নোমান’।

রিয়াজ ভাইকে বললাম, এটা কেমন ব্যাপার হলো! সংকলকের নাম প্রচ্ছদের উপরে কেন? তিনি বললেন, আমাকে নয়, শাকুর স্যারকে জিজ্ঞেস করুন। সঙ্গে সঙ্গে স্যারকে ফোন দিলাম। স্যার বললেন, ‘দেখ নোমান, আমার মতো নির্বান্ধব একজন লেখকের বন্ধু হয়ে এত বড়ো একটি কাজ তুমি করেছ। এ কাজটি আমার নয়, তোমার। সে কারণেই ধ্রুবকে (ধ্রুব এষ) বলেছি তোমার নামটি প্রচ্ছদে দিতে।

 

দুই.

আবদুশ শাকুরের প্রবন্ধগুলো পড়তে গিয়ে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করল তা হচ্ছে তাঁর ঐশ্বর্যমন্ডিত ভাষাশৈলী। তাঁর ভাষার যে ছন্দ, যে স্বাতন্ত্র্য, যে মহাকাব্যিক দ্যোতনা, তা অগ্রসর যে-কোনো পাঠককে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করার মতো। কথাকে কী ভাবে শিল্পে রূপান্তর করা যায় সেই প্রয়াস দেখি লেখায়। দেখতে পাই, তিনি বাংলা ভাষায় বহু শব্দের আবিস্কারক ও পুনর্জ্জীবনদাতা। তাঁর প্রতিটি লেখায় দেখা যায় অসংখ্য নতুন শব্দের সমারোহ। শব্দ আবিস্কারের বিস্ময়কর একটা ক্ষমতা ছিল তার। ধারণা করি, ক্ষমতাটা তৈরি হওয়ার পেছনে নিরন্তর পঠন-পাঠন ও একাধিক ভাষায় তাঁর দক্ষতার বিষয়টা কাজ করেছে। প্রথম জীবনে তিনি মাদ্রাসায় পড়েছেন বলে আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষাটাকে ভালোভাবে রপ্ত করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা ও অধ্যাপণার সুবাধে এই ভাষাটিকেও রপ্ত করে নেন। পাশাপাশি নিজের চেষ্টায় সংস্কৃত ভাষাটাও কিছুটা আত্মস্থ করতে সক্ষম হন। বহুভাষাবিদ হওয়ার কারণে অনন্য এক সৃজনক্ষমতা তৈরি হয় তাঁর মধ্যে। তাঁর গদ্য বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষিপ্র, কাব্যময়, রঙিন ও ক্ষুরধার। গদ্যশরীর কতখানি নিখাদ আর শাণিত হতে পারে, তাঁর ভাষা সেটা প্রমাণ করে। যেমন ‘ফ্ল্যাট’কে তিনি লিখতেন ‘মহল’, কথাসাহিত্যিক না লিখে লিখতেন ‘কথাকার’। জিজ্ঞেস করলাম, ফ্ল্যাট সর্ববাঙালির কাছে পরিচিতি একটি শব্দ। বাংলা ভাষায় ফিউশন হওয়া এই ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করলে অসুবিধা কী?

 

উত্তরে তিনি বললেন, বাংলা ভাষায় শব্দটি ফিউশন করেছে কারা? নিশ্চয়ই লেখকরা! সেই লেখক দলিল লেখক হোক, কেরানি, পুস্তক লেখক বা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক হোক। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে শব্দটি হয়ত মুখে মুখে ব্যবহার করত ইংরেজি ভাষার আগ্রাসনের শিকার সাধারণ মানুষ। কিন্তু লেখক তার লেখনির মাধ্যমে শব্দটিকে স্বীকৃতি দিলেন বলেই তো বাঙালিসাধারণ এটিকে অতিউৎসাহের সঙ্গে ব্যবহার করছে। লেখকরাই ভাষার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেন। আমি একজন লেখক, জেনেশুনে একটি ইংরেজি শব্দকে অকারণে আমার লেখায় কেন ফিউশন করব? এই স্বাধীনতা ভাষা আমাকে দেয় না। দেখ, ফ্ল্যাট শব্দটি লেখা কতটা কঠিন। প্রথমে ‘ফ’, ফ-এর সঙ্গে ‘ল’ সংযুক্ত, তারপর ‘য’, তারপর ‘আ’, তারপর ‘ট’। ঘোরানো-প্যাঁচানো এই জটিল শব্দটি কেন আমি ব্যবহার করব? বাংলা ভাষায় মাত্র তিন অক্ষরে সহজ-সাবলিল ‘মহল’ শব্দটিকে আমি কেন উপেক্ষা করব? এই উপেক্ষা ঔপনিবেশিক প্রভাবিত হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ বলে আমি মনে করি।

 

: কিন্তু স্যার, নগর সভ্যতায় বহুল প্রচলিত ‘ফ্ল্যাট’-এর পরিবর্তে আমি যদি ‘মহল’ লিখি তা হলে তো সাধারণরা বিভ্রান্ত হবে। ধরুন, নোয়াখালীর রামেশ্বরপুর থেকে আপনার নামে একটা চিঠি পাঠাল আপনার কোনো স্বজন। তিনি যদি ‘ফ্ল্যাটে’র বদলে চিঠির খামের উপর ‘মহল’ লেখেন, তাহলে ডাকপিয়ন বিভ্রান্ত হবে না?

: শোনো, ডাকপিয়নকে তুমি এত মুর্খ মনে করো না। সে তো বাঙালি, তার রক্তের ভেতরে ঐতিহ্যবাহী ‘মহল’ শব্দটি রয়েছে। খামটাতে চোখ বুলিয়ে প্রথমবার বুঝতে না পারলেও দ্বিতীয়বার সে ঠিকই বুঝে ফেলবে ‘মহল’ মানে যে ‘ফ্ল্যাট’ কিংবা ‘ফ্ল্যাট’ মানে যে মহল। একবার যদি সে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে এটি বুঝে নিতে তার আর অসুবিধা হবে না। অসুবিধা যে হবে না এর প্রমাণ আমি পেয়েছি। তুমি জানো যে কলকাতা থেকে আমার বিভিন্ন বই প্রকাশিত হচ্ছে। আমি আমার কলকাতার প্রকাশককে ডাকযোগাযোগের যে ঠিকানাটা দিয়েছি তাতে ‘ফ্ল্যাটে’র বদলে ‘মহল’ লিখে দিয়েছি। একবার তিনি আমাকে ডাক মারফত একটা চিঠি পাঠালেন। চিঠির খামে ঠিকই ‘মহল’ লেখা ছিল। কই, চিঠিটা আমার মহলে আসতে তো কোনো অসুবিধা হয় নি!

 

তাঁর আবিস্কৃত নতুন নতুন শব্দ, শব্দের প্রায়োগিক কৌশল ও বাক্য বিন্যাস অনেক সময় পত্রিকার প্রুফ রিডাররা ধরতে পারত না। যেমন ‘বৈদ্যুতিক’ শব্দটিকে বৈয়াকরণিক যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণিত করে তিনি লিখতেন ‘বৈদ্যুতিন’। প্রুফরিডার ‘বৈদ্যুতিন’কে ভুল শব্দ মনে করে ‘বৈদ্যুতিক’ করে দিত। তাঁর লেখা বহু বিশুদ্ধ শব্দ এভাবে বিকৃতির শিকার হতো। এই কারণে তিনি মাঝেমধ্যে ক্ষেপে যেতেন। একদিন প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদককে ফোন করে তাঁর ক্ষোভের কথা জানালেন। সেদিন থেকে সম্পাদক সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আদেশ জারি করলেন, আবদুশ শাকুরের লেখার প্রুফ দেখা যাবে না। তাঁর ক্ষেত্রে পত্রিকার নিজস্ব বানানরীতি প্রযোজ্য নয়।

এরকম বহু পত্রিকায় তিনি স্বীয় বানানরীতি বিষয়ক অধিকারটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাষা নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, আবদুশ শাকুর ছিলেন তার ঘোর বিরোধি। এ জন্য তাকে পালটা সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে বহুবার, কিন্তু জয় শেষ পর্যন্ত সমালোচকদের হয় নি, হয়েছে তাঁরই।

নিজের লেখালেখি সম্পর্কে তিনি এতটাই সতর্ক থাকতেন, প্রতিবছর মেলায় যখন তাঁর বই বের হতো, তখন তিনি প্রুফ দেখানোর জন্য কখনো প্রুফরিডারকে পান্ডুলিপি দিতেন না, কষ্ট হলেও নিজেই দেখতেন। পান্ডুলিপির সফ্টকপিও প্রকাশককে হস্তান্তর করতেন না, নিজদায়িত্বে সরাসরি ট্রেসিং বের বরে তারপর প্রকাশকের হাতে তুলে দিতেন। যান্ত্রিক জটিলতার কারণে পাছে কোনো শব্দ ভেঙে যায়, যদি কোনো বাক্যের ওলট-পালট ঘটে যায়! বইগুলোর মেকআপ দেয়ার জন্য একজন কম্পিউটার অপারেটরও রেখেছিলেন।

 

একজন মানুষ নিরন্তর জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞার একটা উচ্চতায় যে পৌঁছতে পারেন, সেই সাক্ষ্য বহন করেছিলেন প্রয়াত কথাকার আবদুশ শাকুর। তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চার নিবিষ্ট এক ধ্যানী মানুষ। গতানুগতিকতার জোয়ারে গা না ভাসিয়ে, জনপ্রিয়তার ফাঁদে পা না বাড়িয়ে লেখক হিসেবে একটা স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠার ঘটনা বাংলাদেশে বিরল। কাজটা বিস্তর কঠিন। আবদুশ শাকুর এমনই এক অনন্য প্রতিভা, যিনি নিজেকে সচেতনভাবে জনপ্রিয়তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে নিভৃতে সাহিত্যচর্চায় নিরত থেকেছেন নিরলস। ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকেই পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। পড়া ও লেখায় তাঁর নিমগ্নতা এতটাই ছিল, প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা তো বটেই, কোনো কোনোদিন ১২, এমনকি ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লেখাপড়ায় মগ্ন থাকতেন। একমাত্র লেখালেখির স্বার্থেই বাসা থেকে তেমন একটা বের হতেন না। প্রতি মঙ্গলবার কেবল মীরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে যেতেন স্ত্রীর কবর জেয়ারতের উদ্দেশ্যে। তখন প্রায়ই আমাকে ফোন করে বলতেন সেখানে আসতে। বহুদিন স্যারের সঙ্গী হয়েছি। মাঝে মাঝে বলতেন, ‘চল নোমান, তোমার সঙ্গে আজ সাভার চলে যাই। একটা নৌকা ভাড়া করে বংশী নদীতে ঘুরব।’ বলতেন, কিন্তু যাওয়া হতো না। কবর জেয়ারত শেষে বাসায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। প্রতিবারই বলতেন, ‘আজ নয়, আরেকদিন যাব।’

 

শেষের দিকে তিনি রবীন্দ্রজীবনী প্রণয়ণের কাজে হাত দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর পান্ডিত্যের কথা সর্বজন বিদিত। মৃত্যুর বছরখানেক আগে ‘দেশ টিভি’তে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলে তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিচ্ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। প্রসঙ্গক্রমে আবদুশ শাকুর বললেন, ‘ছোটোবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি পৃথিবীতে মহাসমুদ্র পাঁচটি। কিন্তু বড়ো হয়ে জানলাম, মহাসমুদ্র আসলে ছয়টি। ষষ্ঠ মহাসমুদ্রের নাম রবীন্দ্রনাথ।’

 

তাঁর এই উক্তির মধ্যে কিছুটা আতিশয্য থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর জানাশোনার পরিধি যে ব্যাপক, এতে কোনো আতিশয্য নেই, সন্দেহ তো নেই-ই। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণাঙ্গ জীবন নিয়ে কোনো গবেষণামূলক গ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অনুরোধে কাজটা শুরু করেছিলেন তিনি। দুই খ- লিখেও ফেলেছেন। এই রবীন্দ্রজীবনী প্রণয়নের কাজে হাত দিয়ে তিনি গভীর মগ্নতায় ডুব দিয়েছিলেন। কাজটি শুরুর আগে দু দিন পরপরই তার সঙ্গে আমার ফোনালাপ হতো। সাধারণত মধ্যরাতেই তিনি ফোন দিতেন। কাজটি শুরুর পর তার সঙ্গে ফোনালাপ অনেকটা কমে যায়, দু-দিনের বদলে এক সপ্তাহ পর পর তিনি একবার ফোন দিতেন। আমি কখনো ফোন দিলে খুব ব্যস্ত হয়ে বলতেন, ‘নোমান, রবীন্দ্রনাথে ডুবে আছি, তোমাকে আমি পরে ফোন দেব।’ কিন্তু পরে আর ফোন দেয়া হতো না। আমারও সাহস হতো না তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করি।

 

সর্বশেষ তিনি আমাকে ফোন দিলেন মৃত্যুর আগের দিন। নানা বিষয়ে কথা বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে আমার একবারও মনে হলো না তিনি অসুস্থ। অসুস্থতার কথা বলেছেন বটে, কিন্তু আমি তেমন আমলে নিই নি। শেষে বললেন, ‘বিকেলে একবার এসো, কথা আছে।’ না, ব্যাক্তিগত ব্যস্ততায় স্যারের ডাকে সাড়া দিতে পারি নি। অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় স্যারের বাসায় যাওয়ার কথাটা ভুলেই গেলাম। মনে পড়ল পরদিন বিকেলে। মনে পড়ার ঘণ্টাখানেক পর কবি নওশাদ জামিল ফোন করে জানতে চাইলেন আবদুশ শাকুরের মৃত্যুসংবাদটা সত্য কিনা। আমি তখন ছবিরহাটে, এক দৌড়ে আজিজ মার্কেটের কোণায় এসে রিকসায় চড়ে বসি। আধঘণ্টার মধ্যে ধানমন্ডি স্যারের ‘মহলে’ এসে দেখি, সাদা কাপড়ে ঢাকা তাঁর মৃতদেহ। এক অদৃশ্য টাইফুন বুকের ভেতরে আছড়ে পড়ে, নিজেকে ঘোরতর একজন অপরাধী মনে হতে থাকে। তাঁর ডাকে কেন সাড়া দিলাম না আমি? এই অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে সারা রাত নির্ঘুম কাটে। হয়ত সারা জীবন এই দায় বয়ে বেড়াতে হবে।

ক্ষমা করবেন মহামহিম কথাকার, আপনার স্নেহধন্য এই অধম আপনার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছে।

Facebook Twitter Email