আবদুল মান্নান সৈয়দের বন্ধুতা ও সাহিত্য আড্ডা

Facebook Twitter Email

এক সিরাপ উড়ো নদীর মতো

লেখকদের আড্ডার ভরকেন্দ্রে থাকে নতুন কিছু সৃষ্টির দুরন্ত আবেগ ও আমেজ। ষাটের তরুণ লেখককুলের হৃদয়েও বয়ে গিয়েছিল সেই আবেগ ও আমেজের দুর্বিনীত ঝড়। সেসময়ের তরুণ লেখকরা মত্ত থাকতেন দেশ-বিদেশের নবাগত বই পড়ায়, লেখায়, সাহিত্য আড্ডায়  ও নিজের লেখাপাঠ ও প্রকাশে। ষাটের

দশকে বিভিন্ন আড্ডায় ও আয়োজিত অনুষ্ঠানে লেখা পাঠের অভ্যাস প্রবল ছিল। বিভিন্ন বিদ্যায়তন থেকে শুরু করে সংঘ, সংস্থা, সভা কিংবা নানা ছোটবড় আড্ডায় লেখাপাঠের মধ্যে সাহিত্যচর্চার প্রয়াস চলত। আবদুল মান্নান সৈয়দও ষাটের প্রতিনিধি হয়ে মাঝে মাঝে নিজের রচনা পড়েন সতীর্থ লেখকবন্ধুদের আড্ডার বিভিন্ন পরিসরে। কখনো-কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকা ঘর বেছে নেওয়া হত সাহিত্যপাঠের আড্ডাস্থল হিসেবে। এই সমস্ত আড্ডায় যাঁরা শ্রোতা ও পাঠের ভূমিকায় থাকতেন তাঁদের কেউ কেউ আজকের বাংলা সাহিত্যের এক-একজন দিকপাল, এক-একটি দিগন্ত, এক-একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। এই ধরনের আড্ডা-আলোচনায় অংশ নিতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আসাদ চৌধুরী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হুমায়ুন চৌধুরী ও মান্নান সৈয়দের মতো সেসময়ের সেরা সন্তানেরা। এঁদের মধ্যে মান্নান সৈয়দসহ হুমায়ুন চৌধুরী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রয়াত হয়েছেন। হুমায়ুন চৌধুরী বয়সে কিছুটা বড় হলেও মান্নান সৈয়দদের সহপাঠী ছিলেন। উত্তরণ ও সপ্তকে নতুন ধারার গল্প লিখে বেশ নাম করেন তখন। তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। তিনি প্রচার সাংবাদিকতায় দেশের বাইরেও কাজ করে সুনাম অর্জন করেন। কুয়ালালামপুর ভিত্তিক এশিয়া ভিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রচার সাংবাদিকতায় কাজ করতে গিয়ে গল্প লেখার আর কোনো ফুরসত পেলেন না। তিনি ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্টের আইওয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুবরণ করেন। তুখোড় কথাশিল্পী আখতারুজ্জামানা ইলিয়াস মারা যান ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি।

 

একবার সহপাঠী গাল্পিক-বন্ধুদের উপস্থিতিতে মান্নান সৈয়দ পাঠ করলেন মাতৃহননের নান্দীপাঠ নামে এক গল্প। গল্পটি উপস্থিত সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি নির্জন রূপান্তর নামে ঢাকা রেডিওতে একই বছর আরো এক গল্প পাঠ করেন তিনি। পরের বছর শহীদ কাদরীর প্রযোজনায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রফিক আজাদ ও মান্নান সৈয়দ মিলে প্রথম টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেন। তখন শহীদ কাদরী চাকুরি করতেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ষাটের লেখকদের রচনা প্রকাশ ও প্রচারে তাঁর ভূমিকাও অনন্য। এরকম পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনের হৃদয় ছিল ষাটের তরুণদের মধ্যে। তখন নিয়ত আড্ডার মধ্যেই সাহিত্যের পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে, বিস্তৃত হয় সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র ও প্রবাহ। মান্নান সৈয়দ এই সাহিত্যমুখী প্রজন্মের মেধাবী সন্তান। বিভিন্ন আড্ডায় ও অনুষ্ঠানে শামিল হয়ে তিনি নানা দিকে পা বাড়াতে থাকেন, হৃদয়ের দুয়ার খুলে দুহাতে কলম চালাতে শুরু করেন।

 

একসময় লেখক সংঘের অফিস ছিল বাংলা একাডেমির মূল ফটকের সামনের দুটি ঘর। সেখানেও মাঝে মাঝে সাহিত্য-আলোচনা বসত। ১৯৬৫ সালে মান্নান সৈয়দ লেখক সংঘের অফিসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ভয় নামে এক গল্প পাঠ করেন। শ্রোতার সারিতে ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ, রাজিয়া খান, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও শাহাবুদ্দীন আহমদসহ আরো অনেকে। এইসব প্রণম্য লেখকের কাছে তরুণ মান্নান সৈয়দের সাহিত্যস্পৃহা ও শক্তির পরিচয় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। এইভাবে স্বরচিত লেখা পাঠ করে-করে সাহিত্যপরিমণ্ডলে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হতে থাকে। লিখতে লিখতে মান্নান সৈয়দের চিন্তা ও কল্পনার দরোজা খুলে যায়। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও প্রকাশমাধ্যমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মান্নান সৈয়দ এই প্রসঙ্গে তাঁর স্মৃতির নোটবুকে বলেন, ‘যৌনপত্রিকা থেকে গবেষণাপত্রিকা- কোথায় না লিখেছি। রেডিও, টেলিভিশন, জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ- প্রায় সবখানেই অগণন প্রোগ্রাম করেছি।’১

 

বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান, গবেষণাকাজে সব সময় মান্নান সৈয়দের উপস্থিতি ছিল অবিরল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের ভাষ্যকার। জাতীয় পর্যায়ের রবীন্দ্র-নজরুল বিষয়ক জয়ন্তী ও মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অনিবার্য বক্তা। তাঁর মতো আত্মবিশ্বাসী দৃঢ়চেতা বক্তা সমকালে আর একজনকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। তিনি ছিলেন কতকগুলো জাতীয় অনুষ্ঠানের অদ্বিতীয় বাগ্মী। তাঁর চিন্তা ও বাচনিকতায় প্রকাশ পেত মৌলিকতা, তীক্ষ্ণতা এবং একইসঙ্গে প্রবল আবেগময়তা। তথ্য উপস্থাপনমূলক রচনা কিংবা তত্ত্ব-উদ্ধারী ব্যাখ্যায় তাঁর স্বভাবসুলভ আবেগাত্মক সাহিত্যিক ভঙ্গি সব সময় বজায় থাকত। জীবনের শেষ দশটি বছর হৃদরোগ নিয়ে কাটালেও তাঁর স্বভাবসুলভ স্পষ্টসুন্দর বাচনিকতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। আমৃত্যু তাঁকে দেখা গেছে বিশুদ্ধ উচ্চারণে ও মসৃণ অ্যাকসেন্টে কথা বলতে। মননপ্রধান রচনায়ও তিনি আবেগময়তার সংস্থান দিয়ে সৃষ্টি করতে পারতেন প্রবল সংহতি। শুধু রবীন্দ্র-নজরুল কেন, চর্যার পদকারদের কাল থেকে আরম্ভ করে বৈষ্ণব পদাবলি, ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরগুপ্ত, লালন কিংবা মধুসূদনসহ উনিশ-বিশ-একুশ শতকের যেকোনো সমকালীন সাহিত্যিকের জীবন বিশ্লেষণ ও সাহিত্যকর্ম মূল্যায়নে তাঁর দক্ষতা ছিল অভূতপূর্ব। পেরিয়ে আসা পুরোনো কালের চেয়ে তিনি বেশি কাজ করেন আধুনিক কাল নিয়ে। বলা চলে তাঁর বিশেষ দুর্বলতার ক্ষেত্রও ছিল আধুনিক কালের সাহিত্য। পূর্বজ  ও সমকালীন বিশ্বের তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্ব পর্যবেক্ষণেও ছিল তাঁর স্বচ্ছ দৃষ্টি। সাহিত্যের যেকোনো বিষয়ে তাঁর পাঠ ও পাঠোত্তর অর্জিত জ্ঞান ছিল ঈর্ষণীয়। মান্নান সৈয়দ যখন সাহিত্যমঞ্চের ভাষ্যকার হিসেবে অবতীর্ণ হতেন, তখন দেখা যেত তাঁর রেফারেন্স প্রয়োগে প্রবল আত্মবিশ্বাসী অবস্থান। সাহিত্যপাঠের সারি সারি তথ্যকে তিনি অনায়াসে আলোচনার সমর্থনে যুক্ত করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কোনো গতানুগতিক মত কিংবা পূর্বগৃহীত কোনো মন্তব্যকে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেওয়া কিংবা প্রতিধ্বনি করার দিকে উৎসাহী ছিলেন না মোটেই। প্রতিটি পদক্ষেপে স্বকীয়তাকে তিনি প্রধান অবলম্বন মনে করতেন। এইসব গুণের সমর্থনে তাঁকে সহায়তা দিয়েছে তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও শ্রমনিষ্ঠ মন। তাঁর আলোচনা বা বক্তব্যমাত্রই হত স্বতঃস্ফূর্ত, ক্ষিপ্র, মৌলিক ও আবেগময়ী। মান্নায় সৈয়দকে যাঁরা খুব নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, দেখেছেন লেখায় এবং বলায় দুই রূপেই তিনি সমভাবে প্রাণবান ও সফল। বলার ক্ষেত্রে তাঁর সুস্পষ্ট ও প্রমিত উচ্চারণ অন্য আলোচকদের চেয়ে পৃথক করেছে সব সময়। তবে বলা না লেখা, ভাষ্যদাতা না লেখকতা কোন রূপে তিনি নিজের কাছে বেশি প্রশান্তি পান। নিশ্চয় লেখক হিসেবে কলম-কাগজের লেখকতা রূপই তাঁর ভালো লাগার কথা। তিনি অকপট বলেন- 

শেষ পর্যন্ত শাদা কাগজের পৃষ্ঠায় অক্ষর বসিয়ে যাওয়ার চেয়ে আনন্দ পাইনি আর কোথাও। আজো পাই না। ছাপার অক্ষরে এক জিনিশ, সম্প্রচার এক জিনিশ;- কিন্তু যে-মহূর্তে একটি কবিতা লিখে উঠলাম, একটি গল্প লেখা শেষ হলো, একটি প্রবন্ধ দাঁড় করালাম, নির্মিত হল একটি নাটক- সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে নক্ষত্র নেমে আসে আকাশ থেকে; মাটি অর উদ্ভিদ, মানুষ আর পাখি, আনন্দ ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এক সিরাপ উড়ো নদীর মতো প্রবাহিত হতে থাকে।২

 

বাংলাবাজার, স্টেডিয়াম, নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট ও এখনকার কনকর্ড অ্যাম্পোরিয়াম রাজধানীর লেখকদের তীর্থস্থান। এইসব স্থান ছিল মান্নান সৈয়দের প্রাণের বিপণিকেন্দ্র। কলেজ থেকে এক-দুবার নিউমার্কেটে চক্কর না দিলে তাঁর সেদিনের ঘুম হারাম হয়ে যেত। নিউমার্কেটের নলেজ হোম কিংবা মহীউদ্দীন অ্যান্ড সন্সে পা পড়েছে অগণিতবার। নলেজ হোমে পাওয়া যেত দেশ-বিদেশের রকমারি বই আর মহীউদ্দীন অ্যান্ড সন্সের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ ছিল নানা রঙের প্রচ্ছদসংবলিত ইংরেজি বই, পেপারব্যাক ও পেঙ্গুইন সিরেজের বই ও দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকার প্রলুব্ধকারী সমাহার। নলেজ হোমের স্বত্বাধিকারী এ এম খান মজলিশ ১৯৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নলেজ হোমের আগে তাঁর বইয়ের দোকান ছিল বাংলাবাজারে। সেখানে ষাটের আগের প্রজন্মের লেখক-শিল্পীরা যেতেন। নলেজ হোমের মালিকের আরো এক কথা জানা যায়। তিনি মান্নান সৈয়দের কয়েকটি বইয়ের প্রকাশকও হয়েছিলেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শুদ্ধতম কবি। কৃতজ্ঞতাপ্রকাশী চিত্ত ছিল মান্নান সৈয়দের। যিনি-যখন তাঁর সামান্য সহায়তা করেছেন তাঁর প্রতি তখনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মান্নান সৈয়দের হৃদয় ছিল উন্মুক্ত। বইপ্রকাশসহ নানা কারণে এ এম খান মজলিশ সম্পর্কে তিনি বলেন-

স্বনির্মিত মানুষ, কঠোর পরিশ্রমী, আমার প্রতি ভরসা ছিল অনেক, মৃত্যুর বছরখানেক আগে দোকান বিক্রি করে দিয়েছিলেন, এখন সেখানে অন্য বইয়ের দোকানের সাইনবোর্ড।৩

১৯৬৭-১৯৭২ : তাক লাগানো কয়েকটি বই

গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ তিন শাখাস্থ প্রথম তিন বইয়েই মান্নান সৈয়দ নজর কেড়েছিলেন সমকালের অনেকের। তাক লাগিয়েছিলেন তিন শাখার তিনটি প্রথম বইয়েই। সময়টা ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২-এর মধ্যে। ধ্রুপদ থেকে ১৯৬৭ সালে বের হয় জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান বুক কর্পোরেশন থেকে সত্যের মতো বদমাশ আর ১৯৭২ সালে নলেজ হোম থেকে শুদ্ধতম কবি। তিন নামেই তিনি জয় কুড়িয়েছিলেন। প্রকাশের উদ্যোক্তা ছিলেন ওই তিন প্রকাশনালয়ের কর্ণধার যথাক্রমে আসাদ চৌধুরী, আলমগীর রহমান ও এ এম খান মজলিশ। গল্পের বই সত্যের মতো বদমাশ তো প্রকাশের পরের বছর হল বাজেয়াপ্ত। তার পরের বছর আবার অবমুক্তি। এইদিক থেকেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মান্নান সৈয়দ। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০, এই দুই-আড়াই বছর সিলেটে অধ্যাপনাকালে তাঁর মধ্যে সাহিত্যচর্চায়  অভিনিবেশ তৈরি হয়। এই সময় তিনি প্রস্তুত করেন আরো দুই বইয়ের পান্ডুলিপি জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা ও মাতাল মানচিত্র। জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা কাব্যনাট্য, প্রকাশ পায় ধ্রুপদ থেকে, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশের পরের বছর ১৯৬৮ সালে। এ-প্রসঙ্গে মান্নান সৈয়দের অত্যন্ত সংরাগী স্মৃতিচারণ- লেখেন ১৯৯৬ সালে, তখন তাঁর বয়েস তিপান্ন, ‘আমার জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা বই-এর তিনটি কাব্যনাট্যই সিলেটের পটভূমিতে লেখা- এমনকি যে-পরিপ্রেক্ষিতে থাকতাম আমি, ওই পরিপ্রেক্ষিতেই পুরোপুরি। এখন, পঞ্চাশ পার হয়ে দেখছি, যত কাব্যনাট্য আমি লিখেছি সবই জনপদ সমতলভূমি আর কোলাহল থেকে দূরে। সিলেট ওই কাব্যনাট্যের ভূমি আমাকে দিয়েছিল তার টিলা আর আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু রাস্তা আর অগণন মাজার আর চা-বাগান আর ঝরনার এক ভিনদেশি আবহ উপস্থিত করে। বলা বাহুল্য, তার সঙ্গে মিশেছিল কল্পনা। কিন্তু কল্পনার বীজও ছড়াতে হয় একটুখানি বাস্তব জমিতে। সিলেট আমাকে তা দিয়েছিল।’৪ শিল্পকলা থেকে ১৯৭০ সালে প্রকাশ পায় অনুবাদ কবিতার বই মাতাল মানচিত্র। ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ কবিতার ভেতর ডুবে ছিলেন তখন। পড়েছেন আর অপার মুগ্ধতা নিয়ে অনুবাদ করেছেন। এই অনুবাদকর্ম সম্পর্কে তাঁর আরেক স্মৃতিবহ মন্তব্য, ‘আমি তখন সিলেটে বসে বিদেশি কবিতায় বুঁদ হয়ে ছিলাম। বিদেশি কবিতা মানে মূলত অ-ইংরেজি কবিতায়- ফরাশি, জর্মন, স্প্যানিশ কবিতায়। তখনই বস্তুত আবিষ্কার করি ইংরেজি কবিতার বাইরের বিশাল জগৎ। বাংলাদেশের মতো একটা প্রত্যন্ত দেশে, এবং তারও একটি প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করেও, আমি তখন গ্রিক কবি ওডিসিয়ুস এলিটিস এবং হিস্পানি কবি ওক্তাবিয়ো পাজ্-এর কবিতারও তরজমা করেছিলাম- যে-দুজন নোবেল প্রাইজে সম্মানিত হন পরবর্তীকালে।’৫

 

একেবারে অভাবিত সময় ও বয়সে প্রকাশ পেল মান্নান সৈয়দের প্রথম কবিতার বই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ। শুধু লেখা ছাপা নয়, অল্প বয়সে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সমকালীন সতীর্থদের ভালোবাসার দরোজা এক-এক করে খুলে যায়। তখন পাকিস্তান আমল। লেখালেখি, পত্রিকা সম্পাদনা ও বই প্রকাশের পক্ষে এক অবরুদ্ধ সময় যাচ্ছে। কোনো অবরুদ্ধতা তোয়াক্কা না-করে ষাটের তরুণ লেখক-শিল্পীরা যে-যাঁর অবস্থান থেকে ছোটবড় নানা বন্ধুজোট গড়ে তুলছেন। কলেজ-ইউনিভার্সিটি পাঠপর্বে কিংবা চাকুরিরত জীবনের বিভিন্ন অবস্থান থেকে এই সৃষ্টিকামী বন্ধুরা এগিয়ে আসেন সাহিত্যে নতুন কিছু করার মন নিয়ে। পকেটে যথেষ্ট টাকা নেই, তাতে কী। চাঁদা তুলে, ঘড়ি কিংবা জমি বিক্রি করে ষাটের সৃষ্টিপাগল অনেক তরুণই সাহিত্যচর্চা করার মানসে নিবেদিত হওয়ার বিরল নজির রাখেন। লেখকদের মধ্যে অন্তত বেশ কয়েটি নামের কথা বিশেষভাবে উপস্থিত করা যায়, যাঁরা এই কাজে অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পিছপা হননি। মান্নান সৈয়দ অবিশ্যি তাঁর স্মৃতিসঞ্চারী কিছু লেখায় জোর দিয়ে বলেন রফিক আজাদ, মনোরঞ্জন বিশ্বাস  ও আসাদ চৌধুরীর কথা।

 

মান্নান সৈয়দের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিলেন আসাদ চৌধুরী। পাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে চাকুরি নিয়ে চলে যান। বেশ অনেকটা সময় ওই কলেজে পড়ান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাহিত্য-সংস্কৃতি উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। আসাদ চৌধুরী ষাটের দশকের এক নতুন ঘাঁটি তৈরি করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আসাদ চৌধুরীরা কয়েকজন মিলে চাঁদ তুলে বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তাঁদের প্রকাশনা সংস্থার নাম কপোতাক্ষ।

 

আসাদ চৌধুরী বই ছাপার জন্য মান্নান সৈয়দের কাছে পা-ুলিপি চান। তাঁর অনুরোধে মান্নান সৈয়দ পা-ুলিপি তৈরি করেন। প্রকাশিত হয় জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ। মান্নান সৈয়দের তখন সবে ২৪ বছর বয়স। এত অল্প বয়সে ওই আমলে বই করার দৃষ্টান্ত খুব একটা দেখা যায় না। লেখেন একেবারে নতুন আঙ্গিকে, টানা গদ্যে। এসব নিরীক্ষা অনেকের কাছে হাস্যকর ঠেকেছিল তখন। অনেকে মনে করেন, এগুলো কাব্যচর্চা না নিছক বেয়াদবি। তবে একটা পক্ষ আবার ইতিবাচকভাবে এই বইকে গ্রহণ করেন। এই বই নিয়ে লেখেন শওকত ওসমান, শাহাবুদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ুন কবির, স্বয়ং প্রকাশক আসাদ চৌধুরীসহ অনেকে। কণ্ঠস্বর-সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই বইয়ের উপর তাঁর পত্রিকায় দীর্ঘ ২১ পৃষ্ঠার আলোচনা লিখে অনেক বন্ধুর বিরাগভাজনও হন। সবচেয়ে আলোচিত বড় প্রবন্ধটি লিখেছিলেন শওকত ওসমান সমকালে। আকারে ছিল সম্ভবত সিকিশত পৃষ্ঠারও বেশি। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ ছিল ৪০ পৃষ্ঠার বই। প্রচ্ছদ করেন রফিকুন্ নবী। সে আমলে লাইনো হরফ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় বস্তু। এই বইয়ের প্রচ্ছদে দেওয়া হয় লাইনো হরফ। সংগ্রহ করে দেন রশীদ হায়দার।

 

মান্নান সৈয়দ ১৯৬৮ সালে সিলেটের এম সি কলেজে জয়েন করেন। চাকুরি নিয়ে সিলেটে যাওয়ার আগের তিন বছর ১৯৬৫, ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে প্রায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন সমকাল অফিসে। ঢাকায় এলেই তাঁর দ্বিতীয় ঠিকানা হয় সমকাল অফিস। একসময় পাকিস্তান বুক কর্পোরেশন নামে এক বড় মাপের প্রকাশনা সংস্থা ছিল। ওই প্রকাশনা সংস্থার মালিকের সন্তান আলমগীর রহমান বর্তমান অবসর ও প্রতীক প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার। তিনি মান্নান সৈয়দের প্রবন্ধের বই করার ব্যাপারে বিপুল আগ্রহ দেখান। প্রবন্ধের বই ছাপার জন্য মান্নান সৈয়দকে আমন্ত্রণও জানান। কিন্তু ঠিক সেসময় লেখক সংঘ প্রকাশনী থেকে তাঁর প্রবন্ধের বই বের হওয়ার কথা চলছে। মান্নান সৈয়দ আগ্রহী প্রকাশককে নিরাশ না-করে বিকল্প প্রস্তাবে তাঁর গল্পের বই বের করার ব্যাপারে সায় দেন। অতঃপর চূড়ান্ত হয় প্রকাশক তাঁর গল্পের বই-ই বের করবেন। এই আলাপের ফল হিসেবে  মান্নান সৈয়দের  সত্যের মতো বদমাশ বইটির পা-ুলিপি প্রস্তুত হয়ে যায়। প্রকাশ পায় ১৯৬৮ সালে। গল্পের এই বই তৎকালের পাঠক-লেখক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বের হওয়ার পর সত্যের মতো বদমাশ নিয়ে আলোচনাও ছাপা হয় অনেক। আনোয়ার পাশা, অভিনয়কুমার দাস ও কায়েস আহমেদসহ অনেকে এই বইয়ের আলোচনা লেখেন। মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতিমূলক লেখার এক জায়গায় উল্লেখ করেন, এই বইয়ের একটি গল্প চমৎকার অবচেতন নিয়ে চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির হলিডে পত্রিকায় লেখেন। তখন তিনি হলিডে পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সাংবাদিক সালাহ্উদ্দীন চৌধুরী একই গল্প নিয়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লেখেন। সত্যের মতো বদমাশের প্রচ্ছদ আঁকেন শিল্পী গোলাম সারোয়ার। সম্ভবত ১৯৯৫ সালে মারা যান তিনি। প্রকাশের পরের বছর অশ্লীলতার দায়ে বইটি বাজেয়াপ্ত হয়। ১৯৭২ সালে তা পুনর্মুক্ত হয়। পাকিস্তান বুক কর্পোরেশনের তখন নতুন নাম হয় বাংলাদেশ বুক কর্পোরেশন। বাংলাদেশ বুক কর্পোরেশন থেকে এই বই আবার প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। একইসঙ্গে তাঁর আরো একটি গল্পের বই চলো যাই পরোক্ষে একই প্রকাশনী থেকে বের হয়। আশির দশকে সত্যের মতো বদমাশের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে চারিত্র। তারপর পাঠক সমাবেশ এর অখ- চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশ করে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায়। এটিই সত্যের মতো বদমাশের সর্বশেষ সংস্করণ। লেখক এই সংস্করণে যুক্ত করেন পরিশেষ-অংশ, যেখানে রয়েছে পূর্ববর্তী সকল সংস্করণের ভূমিকা এবং ওই সময় বই বাজেয়াপ্ত হওয়ার কারণে যেসব প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিভিন্ন পত্রিকা মারফত যেসব বিবৃতি বের হয়েছিল তার তথ্যাদি। সত্যের মতো বদমাশ যখন প্রকাশ পায় তখন পাকিস্তান আমল। রাজনৈতিকভাবে যাচ্ছে তখন অবরুদ্ধ সময়। পাকিস্তান সরকার তখন মানুষের চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই একের পর এক বাজেয়াপ্ত করে। দৈনিক পাকিস্তানের ২৩ নভেম্বর ১৯৬৯ তারিখে প্রকাশ করা হয়-

 

সরকার সত্যের মতো বদমাশ শীর্ষক বাংলা গ্রন্থের সকল কপি এবং উক্ত গ্রন্থের কপি পুনর্মুদ্রণ অনুবাদ অথবা উক্ত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি সম্বলিত সকল কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন। গতকাল শুক্রবার সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে একথা বলা হয়।৬

 

সত্যের মতো বদমাশের সময়ে পর পর আরো কয়েকটি বই পাকিস্তান সরকার বাতিল করে। তার মধ্যে বাজেয়াপ্তের তালিকায় ছিল ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর জেলে তিরিশ বছর, বদরুদ্দীন উমরের সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা ও সংস্কৃতির সংকট, সত্যেন সেনের আলবেরুনী ও কমরুদ্দিন আহমদের সোশ্যাল হিস্ট্রি অব ইস্ট পাকিস্তান। প্রাদেশিক সরকারের এই নোটিশ জারির বিরুদ্ধে তখন তিরিশজন সাহিত্যিক যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন- ড. মুহম্মদ এনামুল হক, জসীমউদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল, সিকান্দার আবু জাফর, ড. আহমদ শরীফ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, রণেশ দাশগুপ্ত, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, কামালউদ্দীন খান, কামরুল হাসান, শহীদুল্লাহ কায়সার, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদ্দীন, সরদার ফজলুল করিম, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসির আলী, রোকনুজ্জামান খান, আল মাহমুদ, আহমেদ হুমায়ুন, সানাউল্লাহ নূরী, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী, জাহানারা হাকিম এবং রাজিয়া খান।৭ সরকারের এই ধরনের বিধ্বংসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিবৃতিকারীদের স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল-

একতরফাভাবে এসবের ওপর পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রোষ এদেশের বিদ্বৎ-সমাজকে উক্ত সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান না-করে পারে না। চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এই হামলা স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশের কণ্ঠরোধ এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বর্তমান সকল প্রয়াসের পরিপন্থী বলে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে মনে করি। সরকার এ গ্রন্থগুলোর ওপর থেকে সর্বপ্রকারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুন এ দাবিই আমরা উত্থাপন করছি।৮

 

১৯৭০ সালের ১৪ জানুয়ারি বুবধার সকালবেলা ছাত্রদের পক্ষ ক্ষেত্রে বটতলায় বাজেয়াপ্তির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরের দিন ১৫ জানুয়ারি লেখক স্বাধিকার সংরক্ষণ সমিতির উদ্যোগে বাকস্বাধীনতা ও চিন্তাস্বাধীনতার উপর সরকারি হস্তক্ষেপের নিন্দা করে প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। একইদিন পল্টন ময়দানে এই উপলক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বুদ্ধিজীবীসহ প্রতিবাদী অনেকেই যোগ দেন। অবশেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সত্যের মতো বদমাশের প্রকাশের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতির নোটবুকের এক জায়গায় উল্লেখ করেন, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আতাউর রহমান খানের আন্তরিক চেষ্টায় বইটি পুনর্মুক্তির পথ দেখে। আতাউর রহমান খান পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক ক্ষণে কণ্ঠস্বর-সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ঘরে সত্যের মতো বদমাশ বাজেয়াপ্তির পর আলোচনায় সমবেত হন সে-আমলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক। মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতির নোটবুকে সে আলোচনাপর্বের ঐক্যবদ্ধ লেখকদের একটি আলোকচিত্র যুক্ত করেন। ছবিতে প্রদর্শিত সকলের নামও ক্যাপশানে উল্লেখ করেন। এঁরা হলেন- মনসুর মুসা, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ আবু জাফর, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, হুমায়ুন কবির, মোহসিন রেজা, মাহমুদ আবু সায়ীদ, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ মুজাদ্দেদ, আল মনসুর ও আসাদ চৌধুরী।৯

 

নতুন রূপের আদল নিয়ে মান্নান সৈয়দের প্রথম কবিতার বই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ বের হয়। প্রচ্ছদ আঁকেন শিল্পী রফিকুন্ নবী। বইটি ছিল একেবারে টানা গদ্যের। এরপর তিন বছরের মাথায় প্রকাশ পায় দ্বিতীয় কবিতার বই জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা। প্রচ্ছদ করেন শিল্পী গোলাম সারোয়ার। এবারে আর টানা গদ্যে নয়, লিখলেন ছন্দোবদ্ধ কবিতা। অবিশ্যি একগুচ্ছ টানা গদ্য ঢুকিয়ে দেন এর সঙ্গে। তখন তিনি সিলেটে অবস্থান করছেন। সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও এক নারী তাঁর জীবনে প্রভাব বিস্তার করেছিল বলে স্মৃতির নোটবুকে সামান্য সংকেত১০ দেন। এইসব কারণে মান্নান সৈয়দের মনের ভেতরও একধরনের পরিবর্তন আসে, তোলপাড় শুরু হয় আরো নতুন কিছু করার। তাই প্রথম কাব্যগ্রন্থের টানা গদ্যের পর তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতায় তাড়িত হলেন জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসায়। বইয়ের শেষে ছোট কয়েকটি কাব্যনাট্যেরও স্থান দেন। হঠাৎ এই পরিবর্তন তাঁর মানসরূপান্তরের কারণে ঘটে।

 

আরো একটি শাখায়ও মান্নান সৈয়দের বিচরণ ছিল শুরু থেকেই। উপন্যাস। একেবারে কম লেখেননি। ২০১০ পর্যন্ত মোট পনেরটি। প্রথম উপন্যাস বের হয় পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী ১৯৭৪ সালে এভারনিউ প্রেস থেকে, আর সম্ভবত তাঁর জীবৎকালে শেষটি বের হয় ২০১০ সালে সূচীপত্র থেকে। নাম ইছামতির এপার-ওপার। মাথার ভেতর উপন্যাসের যে আকার-আইডিয়া ঘুরপাক খেত সেরকম বড়ব্যাপ্তির উপন্যাস তিনি যথার্থ অর্থে লিখতে পারেননি, একথা তিনি নিজেই স্বীকার করেন। উপন্যাসের ব্যাপ্তি ও বিশালতায় তাঁর হাঁটা হয়নি কখনো। উপন্যাসের নামে যা লিখেছেন তাকে তিনি শেষ পর্যন্ত নভেলা নাম দিয়ে নিজের অভিরুচির কাছে পরিষ্কার হতে চেয়েছেন-

প্রকৃত উপন্যাস লিখবার মতো লিখনের ও জীবনের অভিজ্ঞতার কোনোটিই আমার হয়নি। অর্থাৎ সোজা কথায়, আমার ধারণা, আমি উপন্যাস লিখতে অক্ষম। কাজেই কখনো সে-চেষ্টাই করিনি। তাহলেও আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে ছোট উপন্যাস বা নভেলা হয়তো সম্ভব- এই বিবেচনা থেকেই কয়েকটি দীর্ঘ কাহিনী লিখে ফেলেছি।১১

উপন্যাস লেখার যে অন্তর্গত চাপ তা মান্নান সৈয়দের হয়তো কোনোদিনই ছিল না। যে কটি লিখেছেন বন্ধুবান্ধব আর পত্রিকার সম্পাদকদের চাপে। গল্প-কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি প্রতীক-রূপকের প্রবল আশ্রয় নেন। কিন্তু উপন্যাসে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। কোনো প্রতীক বা রূপকের আড়ালে উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রকে তিনি আবডালে আনেননি। তাঁর উপন্যাসের নায়কগুলোও পরাজিত জীবনের পথেই শেষ পর্যন্ত এগিয়েছে। তিনি নিজে বলেন-

 

নিজের উপন্যাসগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখছি আমার সব উপন্যাসের নায়করাই শেষ-অব্দি পরাজিত। জীবনের বিস্ময়ের আশ্চর্য পথ দিয়ে চলে যায় তারা, কিন্তু শেষ-পর্যন্ত তারা শোচনীয় পরাজয়কেই ডেকে আনে। আমার বিশ্বাস, আমি কোনো মন-গড়া তমসা লিপ্ত উপন্যাস লিখিনি। জীবনের কথাই লিখেছি- অন্তর্জীবনের কথা- স্বাভাবিকভাবেই যা কোনো নির্দেশিত বা পূর্বনির্দিষ্ট ব্যাপার নয়, জীবনের পথে চলতে চলতে যা আমারই নিজস্ব উপার্জন।১২

পঁচিশে মার্চের আড্ডা

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের এক ঘটনা বর্ণনা করেন মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতির নোটবুকে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও আড্ডা দিচ্ছিলেন নিউমার্কেটে। কয়েকটি বইয়ের দোকানে বইকেনা সূত্রে যাতায়াত ঘটত যখন তখন। তার মধ্যে নলেজ হোম আর মহীউদ্দীন অন্যতম। মহীউদ্দীন সস্তায় ইংরেজি পেপারব্যাক বিক্রি করত যা ছিল সেসময়ের তরুণদের জন্য ক্রয়সাধ্য। বইয়ের দোকান ছাড়া মান্নান সৈয়দরা বসতেন নিউমার্কেটের ভেতরের তিনকোনা এক পার্কে। এই পার্কে এখন হয়েছে মসজিদ। ওই তিন কোনা পার্কের সবুজ ঘাসের মধ্যে বসে আড্ডা চলত। আড্ডার ঘনসময় ছিল বিকেল সন্ধে আর রাত। একাত্তরের পঁচিশে মার্চেও আড্ডা চলছে। অনেকে ছিলেন। তাঁর মধ্যে মান্নান সৈয়দ একজনের কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেন। তিনি মফিজ। মোটা মফিজ নামে পরিচিত। মোটা কারণ তাঁদের আরেক বন্ধু মফিজ আলম। এই কারণে মোটা মফিজ। মফিজ ছিলেন এম সি কলেজের মান্নান সৈয়দের সহকর্মী। ওখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও পরে প্রবল বন্ধুতা। তিনি সেদিন ওই আড্ডায় এসেছিলেন, মান্নান সৈয়দ কিছু বই নিয়ে ছিলেন পড়ার জন্য সেগুলো ফেরত নিতে। বই নেওয়ার জন্য মফিজ মান্নান সৈয়দদের গ্রিন রোডের বাসায় চলে আসেন। বই নিয়ে এগারোটায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যান। বারটার দিকে শুনতে পান ভয়াবহ অপরিচিত আওয়াজ। শব্দে-আওয়াজে তখন ঢাকা শহর ফেটে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল আওয়াজটি মান্নান সৈয়দদের বাড়ির খুব কাছেই, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসছে। মান্নান সৈয়দ যখন সিলেট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন তখন তাঁর বাবা লেখকপুত্রের সাহিত্যচর্চার জন্য বিরাট বাড়ির এলাকার ভেতর মূল বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে তাঁর ঘর করে দেন। সেই ঘরে একা মান্নান সৈয়দ, বিকট শব্দে তখন পাগলে মতো ছুটোছুটি করেন। মনে হচ্ছিল আগুনের গোলা এসে পড়বে তাঁর ঘরের উপর। এই রাতে তাঁর ঘর থেকে মূল বাড়িতে ঢুকবেন এমন সাহস তাঁর কুলোয়নি। অবিরল গুলির বিকট শব্দে তাঁর রাত কেটেছে। তাঁর বড়ভাই ডাক্তার সৈয়দ আবদুল মঈদ ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক। তিনি সেরাতে ফোন দিয়ে বাবামাকে কেঁদে কেঁদে বলেন, জীবনে হয়তো আর দেখা হবে না। তারপর একসময় টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় যায়। কারফিউ চলছিল সেসময়। দুদিন বাদে কারফিউ শিথিল হলে বড়ভাই বাড়িতে ফিরে আসেন বহুকষ্টে। বড়ভাইয়ের পায়ের অসুবিধা ছিল তাই বাড়ি ফিরতে তাঁর কষ্ট হয়। অনেকদূর হেঁটে এসে তারপর অনেক মিনতি করে রিকশা পান। সে রিকশায় তিনি বাড়ি ফেরেন। সাতাশ মার্চ কিছু সময় আর আটাশ মার্চ কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হয়। মান্নান সৈয়দ আটাশ মার্চ শাহ্নূর খানকে নিয়ে বের হন। শাহ্নূর খান ছিলেন ষাটের দশকের কবি ও সাংবাদিক, বয়সে মান্নান সৈয়দের তিন বছরের ছোট। তাঁর বাড়ি মান্নান সৈয়দদের বাড়ির খুব নিকটেই। তিনি ১৯৮৮ সালের ৮ আগস্ট হৃদরোগে মারা যান। এক থমথমে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে মান্নান সৈয়দরা সেদিন বের হন। এক পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে গিয়ে দেখা মেলে সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হকের। ওয়াহিদুল হকের বয়স তখন ৩৭-এর কোঠায়। তিনি মারা যান ৭৪ বছর বয়সে, ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি। ১৯৭০ সালের দিকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও মান্নান সৈয়দ সপ্তাহের রবিবার ওয়াহিদুল হকের কাছে বেশ কয়েক সপ্তাহ গানের তালিম নেন। এই ওয়াহিদুল হকই জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মর্মান্তিক বার্তাটি দেন। তখনো জ্যোতির্ময় গুহুঠাকুরতা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। তিনি পঁচিশে মার্চের গণহত্যায় গুলিবিদ্ধ হন। সেদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হলে আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করছিলেন। পাকিস্তান বাহিনির অতর্কিত গুলিতে আহত হয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

মান্নান সৈয়দরা ঘুরে ঘুরে দেখলেন, গোবিন্দ দেবের বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। রোকেয়া হলের পূর্বদিকের কিছু দূরে বর্তমান ডাস এলাকায় অনেক লাশ চাপা দেওয়ার কথা জানলেন। জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশেও অনেক লাশ চাপা দেওয়া হয়। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মান্নান সৈয়দের আরেক প্রিয় শিক্ষক। সাবসিডিয়ারি ক্লাসে এই মহান শিক্ষকের দেখা পেয়েছিলেন। তিনি তখন দর্শন বিভাগের প্রধান ও জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট। তাঁকেও ওই রাতের শেষ প্রহরে পাকসেনারা ব্রাশফায়ার করে মারে। সদাহাস্য-অজাতশত্রু এই মানুষটিকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার ঘটনাও মান্নান সৈয়দকে অস্থির করে তোলে। মান্নান সৈয়দ তখন সাতাশ-আটাশ বছরের যুবক। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর ইতিহাসের আরেক রক্তিম অধ্যায় তিনি প্রত্যক্ষ করেন, যার এক চিলতে বর্ণনা তিনি স্মৃতির নোটবুকে এঁকে গেছেন। লিখে গেছেন ১৪ ডিসেম্বরে দেশের বুদ্ধিজীবী নিধনের নির্মমতার কথাও। বিশেষ করে অপার স্নেহ ও আশীর্বচন পেয়ে যাঁদের কাছ থেকে চিরঋণী হয়েছেন, সেই প্রণম্য দুই মনীষী অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। দুজনকেই কুখ্যাত আলবদর বাহিনি অপহরণ করে নিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। স্মৃতির নোটবুকে মান্নান সৈয়দ রক্তিম তুলির আঁচড়ে ইতিহাসের এইসব নিষ্ঠুরতার কথা বড় সংবেদনা নিয়ে প্রকাশ করেন।    

কিছু ঋণ কয়েকজন প্রাণবান মানুষ

মান্নান সৈয়দ টেলিভিশনে প্রথম প্রোগ্রাম করেন শহীদ কাদরীর মাধ্যমে। প্রথম অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পড়েন রফিক আজাদ ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। ওই অনুষ্ঠানে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। শহীদ কাদরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত সত্তরের দশকে আবিদ আজাদের মাধ্যমে। শহীদ কাদরীর পুরানা পল্টনের বাসায় ব্যাপক আড্ডা চলত। মূলত সত্তরের কবিরা বেশি ভিড় জমাতেন। দিনভর আড্ডা চলত। আসতেন শিহাব সরকার, আতাহার খান, ইকবাল হাসান প্রমুখ। শহীদ কাদরী ব্যক্তিজীবনে ছিলেন একেবারেই অদ্ভুত প্রকৃতির। মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতির নোটবুকে তাঁর কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি কোথাও স্থির হয়ে চাকুরি করতে পারতেন না। একবার কিছুকালের জন্য টেলিভিশনের প্রযোজক হিসেবে চাকুরি করেন। গণবাংলা পত্রিকায় কিছুকাল কাজ করেন। কাজ করেন দুএকটি ইংরেজি পাক্ষিক বা সাপ্তাহিকে। কোথাও স্থির থাকেননি। বিচিত্র কারণে তিনি চাকুরি করেও ছেড়ে দিতেন। আবার পেয়েও অনেক সময় যোগদান করেননি এমন দৃষ্টান্তের কথা আবদুল মান্নান সৈয়দ উল্লেখ করেন। তিনি তৎকালীন একটি দৈনিকে চাকুরি করবেন মনস্থ করছেন। হঠাৎ মনে হয় তাঁর এক হবু সহকর্মী বেঢপ লম্বা এইজন্য চাকুরি ছেড়ে দেন। অদ্ভুত সব কা- করেন। চাকুরি পেয়ে দুঃখবোধ হয়েছে তাঁর, এজন্য কবিতা লিখেছেন চাকুরি হয়ে যাওয়ার পর। কবিতায় দুঃখ করে পার্ক, ঝরা পাতা, রাস্তা, রেস্তরাঁ, বেড়ানো, আড্ডা ও দুপুরের ঘুমের প্রতি করুণভাবে বিদায় চেয়েছিলেন। যাহোক, এই শহীদ কাদরীই টেলিভিশনে যখন চাকুরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন, ষাট ও সত্তরের দশকের সাহিত্যিকদের অনুষ্ঠান করার সুযোগ করে দেন। সে দলে মান্নান সৈয়দও পড়েছেন। অনেক অনুষ্ঠান করেন। সম্মানী পান। তবে বেশিরভাগ ছিল কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান। জীবনের প্রথমপর্বে টেলিভিশন থেকে কবিতা পড়ে কিংবা কিছু অনুষ্ঠান করে টাকা উপার্জনের বিষয়টি মান্নান সৈয়দের ভীষণ কাজে লাগে। শহীদ কাদরীর প্রতি তাঁর এই ঋণ দৃঢ়ভাবে স্বীকার করেন। এরপর মান্নান সৈয়দ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি চ্যানেলগুলোর অসংখ্য অনুষ্ঠানে। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অবিরল ধারায় অনুষ্ঠান করেন। তিনি চ্যানেল-কর্তৃপক্ষের কাছে কতকগুলি বিষয়ে ছিলেন অদ্বিতীয় ভাষ্যকার। জীবনানন্দ, রবীন্দ্র-নজরুল, মোহিতলাল, মাইকেল, ঈশ্বরগুপ্তসহ অজস্র বিষয়ের তিনি অতুলনীয় বিশেষজ্ঞ-বক্তা, অনুষ্ঠানের শ্রীবৃদ্ধিতে তাঁর ডাক পড়ত যখন-তখন।

 

মান্নান সৈয়দের চাকুরি জীবন ও প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির পেছনে হাসান হাফিজুর রহমান অনন্য ভূমিকা নেন। তিনি ছিলেন কবি, সাংবাদিক ও সমালোচক, জন্ম ১৯৩২ সালে, মৃত্যু ১৯৮৩ সালে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ১৬ খন্ডের দলিল সম্পাদনা করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি অধ্যাপনাও চালিয়ে যান। তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫২ সালে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় কাজ করার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের যাত্রা। তারপর বিভিন্ন সময়ে সওগাত, ইত্তেহাদ, দৈনিক পাকিস্তানের বিভিন্ন পদে চাকুরি করেন। দৈনিক পাকিস্তানে তিনি ১৯৬৫ সালে সহকারী সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হন। এই হাসান হাফিজুর রহমান মান্নান সৈয়দের প্রথম চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল ও আবদুল গনি হাজারীর পরিক্রম পত্রিকার অফিস এবং রেডিওতে নিয়ে যান। মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের বাসভবনেও প্রথম নিয়ে যান তিনি। তাঁর প্রতি মান্নান সৈয়দের ঋণের অন্ত নেই। কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন লেখার স্তবকে-স্তবকে।

লেখা পাঠ ও প্রকাশ

সমকালে ছাপানো বেগানা সেরেনাদ পাঠ

সমকালের কাল ছিল ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০। সমকালের আলোচিত সংখ্যা ছিল কবিতা সংখ্যা। প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে। কলেবরে ছিল বিরাট। ষাটের কবিরা যূথবদ্ধভাবে সমকালের এই সংখ্যায় আত্মপ্রকাশ করেন। এর আগে অবিশ্যি কারো কারো কবিতা সমকালে ছাপা হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে এইবারই প্রথম। ফলে ষাটের তরুণদের চেহারাটি সমকালের এই সংখ্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠল। আলোচিত হল ব্যাপক মাত্রায়। সমকালের আগে অবিশ্যি স্বাক্ষরে ষাটের কবিদের প্রথম পদপাত ঘটে। এরপর বড় কাগজ সমকাল স্বীকৃতি দেয়। সমকালের কবিতা সংখ্যায় মান্নান সৈয়দ লেখেন কবিতা বেগানা সেরেনাদ ও কয়েকটি সমকালীন বইয়ের আলোচনা। সমকাল কবিতা সংঘের প্রকাশনা উৎসব হয়েছিল বাংলা একাডেমির অডিটোরিয়ামে। পাকিস্তান কবিতা সংসদ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। আবদুল গনি হাজারী অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। কবিতা পড়ার জন্য সবার আগে মান্নান সৈয়দের নাম উচ্চারণ করেন। কবিতাটি পড়েন কবিতা সংখ্যা থেকে। মান্নান সৈয়দের নাম শুরুতেই উচ্চারিত হওয়ায় সকলের কাছে তাঁর অনন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

কণ্ঠস্বর-বর্ষপূর্তিতে দুই মনীষীর নৈকট্যলাভ

সাহিত্য অনুষ্ঠানে লেখাপাঠের মধ্য দিয়ে তরুণ মান্নান সৈয়দের সঙ্গে দেশের সম্মানীয় অনেক মহান ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় ও আলাপ হয়। আলাপ-পরিচয়ের পর আমৃত্যু বন্ধুতা, ভালোবাসা ও সম্মানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এরকম সাহিত্য অনুষ্ঠানে। কণ্ঠস্বরের চতুর্থ বর্ষপূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠান হয় তোপখানার পাকিস্তান কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে, ১৯৬৯ সালের ২৯ জুন১৩ বিকেলবেলায়। এক শস্যপর্যায় : কবিতা শিরোনামে মান্নান সৈয়দ প্রবন্ধ পাঠ করেন এই অনুষ্ঠানে। প্রবন্ধের এলাকা ছিল ষাটের দশকের তরুণ কবিরা। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর পাকিস্তান কাউন্সিলের নতুন নাম হয় বাংলাদেশ পরিষদ। বাংলাদেশ পরিষদ এখন উঠে গেছে। পরবর্তীকালে মান্নান সৈয়দ এখানে অনেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

 

কণ্ঠস্বর-বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। উপস্থাপনায় ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সভাপতির বক্তৃতায় মুনীর চৌধুরী প্রথমবারের মতো মান্নান সৈয়দের গদ্যের প্রশংসা করেন। মুনীর চৌধুরী-কৃত প্রশংসা এক বিরাট স্বীকৃতি ও গুরুত্ব এনে দিয়েছিল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যজীবনে। মুনীর চৌধুরীর মতো বাংলা সংস্কৃতির আইকন যখন মান্নান সৈয়দের তারিফ করেন তখন বুঝে নিতে হয় সত্যিই প্রবন্ধকারের গদ্যের মধ্যে নিজস্বতা ও সম্ভাবনা আছে। কৃতজ্ঞতার নিদর্শনে মান্নান সৈয়দ ১৯৭২ সালে তাঁর শুদ্ধতম কবি উৎসর্গ করেন মুনীর চৌধুরীকে।

 

সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আহসান হাবীব। তিনি তখন দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক। তখনকার দৈনিক পাকিস্তানের বাংলাদেশ পর্বের নাম দৈনিক বাংলা। দৈনিক বাংলা এদেশের অনেক বড় কাগজ। মতিঝিলের পল্টনের কোনায় যেখানে এর কার্যালয় ছিল সেখানকার নাম এখন দৈনিক বাংলা মোড়। অধুনা কাগজটি লুপ্ত হলেও দৈনিক বাংলা মোড় লুপ্ত হয়নি। এই প্রতিষ্ঠিত দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক ছিলেন আহসান হাবীব। তাঁর জন্ম ১৯১৭ সালে, মৃত্যু ১৯৮৫ সালে। সাহিত্য সম্পাদক ও কবি, দুদিকেই তাঁর প্রবল খ্যাতি। সেসময় তাঁর সান্নিধ্য যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের অনেকেই আজ দেশের বড়কবি। মান্নান সৈয়দও এই মহান ব্যক্তির ভালোবাসা পেয়েছিলেন। ভালোবাসার প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটেছিল কণ্ঠস্বর-বর্ষপূর্তির সাহিত্য সভায়, ওই প্রবন্ধ পাঠের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানস্থলেই তিনি সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপার জন্য ষাটের উঠতি তরুণ মান্নান সৈয়দের কাছে লেখা চাইলেন। আরেক বিরাট আনন্দ বয়ে গেল তরুণ লেখকের হৃদয়ে। তখন বিরাট শ্লাঘার বিষয় ছিল এই পত্রিকায় লিখতে আমন্ত্রিত হওয়া ও লেখা ছাপা হওয়া। মান্নান সৈয়দ কথামতো রাস্তা নামে একটি গল্প পাঠিয়ে দেন। গল্পটি বেশ পছন্দ করেন আহসান হাবীব। বেশি পছন্দের কারণে সম্পাদক এটি দৈনিক পাকিস্তানের আজাদি সংখ্যায় ছাপেন। মান্নান সৈয়দের সাহিত্য বিস্তারণের আরো এক দরোজা খুলে যায়।

 

কণ্ঠস্বরের সাহিত্য সভায় মান্নান সৈয়দ আসেন সিলেট থেকে। তিনি তখন এমসি কলেজে পড়াচ্ছেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিতে ডুবে থাকতেন। তখন মাথায় ঝোঁক এসেছিল বিদেশি সাহিত্যপাঠের। ইংরেজি কবিতার বাইরে বিদেশি কবিতার বিশাল ভান্ডারে তিনি ডুবে ছিলেন। যত্ন নিয়ে অনুবাদ করেন সেসব কবিতা। পাঠিয়ে দেন আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব সেগুলো সাদরে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তানে ছাপেন।

শশাঙ্ক পাল-স্মরণে বিচিত্রায় লেখা

মান্নান সৈয়দ তাঁর স্মৃতিমূলক লেখার অনেক জায়গায় শশাঙ্ক পালের কথা লেখেন। আবুল হাসান-হুমায়ুন কবিরদের বন্ধু শশাঙ্ক পাল। তিনি রাজনীতি ঘেঁষা পরিবারের সন্তান। পাঁড় কমিউনিস্ট হিসেবে সে-আমলে সবাই তাঁকে জানত। তাঁর বাড়ি বরিশাল। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তিনি নিখোঁজ বা নিহত হন। স্বাধীনতার পর বিচিত্রা পত্রিকায় মান্নান সৈয়দ তাঁর কলামে শশাঙ্ক পালের কথা লেখেন। ওই সূত্রে শশাঙ্ক পালের বন্ধুরা আবদুল মান্নান সৈয়দের বাড়িতে আসেন। তাঁরাই শশাঙ্ক পালের শেষ দিনগুলোর কথা বলেন। ওঁরা বের করেন শ্রাবস্তীর শশাঙ্ক পাল সংখ্যা। তাতে প্রথমেই ছিল মান্নান সৈয়দের লেখা। ১৯৬৬ সালের ২০ মে১৪ শশাঙ্ক পালের আজিমপুরের বাড়িতে তাঁরই আহ্বানে তিনি এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি ছিল রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী নিয়ে। তখন রবীন্দ্রনাথের উপর অনুষ্ঠান করা সরকারিভাবে বিপজ্জনক ছিল। সেই বিপজ্জনক সময়ে মান্নান সৈয়দ আলোচ্য বিষয়ে আলোকপাত করেন।

রেডিওতে গন্তব্য নামের গল্পপাঠ

মান্নান সৈয়দ ১৯৬৬ সালে রেডিও এবং টেলিভিশনে প্রথম অনুষ্ঠান করেন। তখন মান্নান সৈয়দের কোনো বই বের হয়নি। রেডিওতে প্রথম গন্তব্য নামে একটি গল্প পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মান্নান সৈয়দ সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অনাবাসিক ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৫ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল বার্ষিকীতে মান্নান সৈয়দের একটি গল্প ছাপা হয়। নাম পিঠ ফিরিয়ে দুজন। এই গল্পটিই খানিক পরিবর্তন করে গন্তব্য নামে রেডিওতে পড়েছিলেন। এরপর রেডিওতে বিভিন্নি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মান্নান সৈয়দ। ষাটের দশকে এমসি কলেজে থাকাকালে সিলেট রেডিও থেকেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছেন। ওইসময় তিনি বেশ কিছু গানও লিখেছেন। এগুলো সবই গাওয়া হয় কয়েকজন শিল্পীর কণ্ঠে। শামসুন্নাহার করিম তাঁর গান গেয়েছেন। তিনি ঢাকা রেডিওতে একসময় গান গেতেন।

বিরুদ্ধতায় রোষানল, নৈকট্যে প্রেম

সব আমলেই তরুণরা কখনো-কখনো নিগৃহীত হন প্রথমে, পরে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেন। নতুন সময়কে অনেকেই নিতে পারেন না সহজে। পরে আবার আস্তে আস্তে সবকিছু সমতায় চলে আসে। নতুনে-পুরানে চলে সম্মিলন। এমন ঘটনা সব কালে কমবেশি ঘটে। যিনি বিরুদ্ধতা দিয়ে সব কিছুর সূত্রপাত করেন তিনিই আবার গভীর বন্ধু হয়ে যান অনায়াসে। মান্নান সৈয়দ-প্রজন্মেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা তিনি তাঁর অনেক লেখায় উল্লেখ করেন। তাঁর ও তাঁদের নিয়ে বিরুদ্ধতার এক-চিত্র মান্নান সৈয়দ উপস্থাপন করেন স্মৃতির নোটবুকে-

 

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো নিতান্ত ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তিকেও একজন বেয়াদব বলে উল্লেখ করেছিলেন।…কী-জানি কেন আমাদের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল আনুপূর্ব। পূবালী পত্রিকায় তিনি স্বাক্ষরে প্রকাশিত রফিক আজাদ আর আমার কবিতাকে ব্যঙ্গবিদ্রূপকরেছিলেন। কণ্ঠস্বরকে অভিহিত করেছিলেন সবচেয়ে রুচিশীল যৌনপত্রিকা বলে। রফিক আজাদের বেশ্যার বিড়াল কবিতাটি কণ্ঠস্বরে পড়ে নিউমার্কেটে সাহিত্যিক গোলাম রহমানের বইয়ের দোকানে (সেখানে আমাদের নয়- অন্য লেখকদের আড্ডা হত) কবি আবদুল কাদের ছি ছি করতে করতে দোকানের বাইরে গিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন। সেই আবদুল কাদির, যিনি অনেক শারীরিক কবিতা লিখেছিলেন একসময় এবং তার জন্যে আক্রান্তও হয়েছিলেন- পুরোনো দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সেকালে পড়েছিলাম, মনে আছে। অগ্রজ একজন কবি আমাদের উদ্দেশে একটা ব্যঙ্গকবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটির প্রথম লাইন অনেকটা এরকম, এইসব বাছুরেরা একদিন ষাঁড় হবে জানি।১৫

২.

আবদুল গনি হাজারী ছিলেন পরিক্রম পত্রিকার সম্পাদক। পরিক্রম পত্রিকা তখন পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখার মুখপত্র। মান্নান সৈয়দ সেসময় কবিতার পাশাশাশি গল্পও লিখতেন। গল্পকার হিসেবে বেশ পরিচয় পাচ্ছেন। নাম করছেন। এক-একটি গল্প দুতিনবার করে লিখতেন। ভয় নামে তাঁর একটি গল্প ১৯৬৩ সালে পূর্বমেঘ পত্রিকায় ছাপা হয়। পূর্বমেঘ বের হত রাজশাহী থেকে, সম্পাদক ছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। পূর্বমেঘ সে আমলের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা। ভয় গল্পটি ছাপা হয় তাঁরই ছদ্মনামে, অশোক সৈয়দ। নির্ভুল একটি কাগজ ছিল পূর্বমেঘ। এই ভয় গল্পটি পাঠ করেছেন মান্নান সৈয়দ পরিক্রম পত্রিকা অফিসের লেখক সংঘের কার্যালয়ে ১৯৬৫ সালের শেষদিকে। ব্যবস্থাটি করে দেন হাসান হাফিজুর রহমান। বাংলা একাডেমির গেইটসংলগ্ন এই লেখক সংঘের অফিসেই মান্নান সৈয়দের সঙ্গে কবি ফররুখ আহমদের আলাপ হয়। একই জায়গায় দেখেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে। পঠিত ভয় গল্পটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী মত তৈরি হয়। আজহারুল ইসলাম গল্পটির বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উত্থাপন করেন, বিপরীতে অভিযোগের প্রতিবাদে কথাশিল্পী রাজিয়া খান প্রশংসা করেন।

৩.

১৯৭০ সালের ২৭ জুন ন্যাশনাল বুক সেন্টার সিকান্দার আবু জাফরের ওপরে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান করে। কবির চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। আলোচক ছিলেন আবদুল গনি হাজারী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও নির্মলেন্দু গুণ। সবাই লিখিত আলোচনা উপস্থাপন করেন। তখন ন্যাশনাল বুক সেন্টার ছিল এখনকার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জায়গায়। ন্যাশনাল বুক সেন্টারের প্রধান ছিলেন সরদার জয়েনউদ্দীন। ওখানে কোনো মিলনায়তন ছিল না। অফিস কক্ষেই চেয়ার-টেবিল সরিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার যাকে নিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন তিনিই শেষপর্যন্ত সেখানে যাননি। তাঁর কারণ মান্নান সৈয়দ উল্লেখ করেছেন সিকান্দার আবু জাফরের জবানিসহ-

জাফর ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করে করে তিনি আর এলেন না। কিন্তু ঘর ভরে গিয়েছিল!…পরে যখন জাফর ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কেন আসেননি, তিনি বললেন, ‘তোমরা আমাকে বসিয়ে বসিয়ে আমার চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করবে, আর আমি বসে বসে তা শুনব? আমি ঢাকা ক্লাবে চলে গিয়েছিলাম।’ এমনি ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। আপাত রুক্ষ আপাত কর্কশ, কিন্তু ভিতরে লাজুক ও কবি ও বিশুদ্ধ ভদ্রলোক।১৬

৪.

মাসখানেকের মধ্যে আরেকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ন্যাশনাল বুক সেন্টার। ১৯৭০ সালের ২১ জুলাই। এখানে তরুণ কবিদের কবিতাপাঠের আয়োজন করা হয়। কবিতা পড়েন আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, দাউদ হায়দার ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। মান্নান সৈয়দ পড়েছিলেন কবি শিরোনামে একটি কবিতা। কবিতাটি ছিল সংলাপধর্মী। তাঁর নির্বাচিত কবিতার বইটি শুরু হয়েছে এই কবিতা দিয়ে। রাজিয়া খান তাঁর কবিতার কয়েকটি লাইন পুনরোচ্চারণ করে প্রশংসা করেন। পরের দিন শামসুর রাহমান ন্যাশনাল বুক সেন্টারের কবিতা আসর নিয়ে দৈনিক পাকিস্তানে ছদ্মনামা কলামে মৈনাক ছদ্মনামে একটি কলাম লেখেন। সেখানে মান্নান সৈয়দের কবিতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য রাখেন। এমনকি রাজিয়া খানের প্রতি বিরূপতা প্রকাশ করেন। এই বিষয়টি পরের দিন নিউমার্কেটে দাউদ হায়দার তাঁকে দেখান। এর পরের কোনো একদিন শামসুর রাহমানের সঙ্গে আকস্মিক দেখা হয়ে যায় মান্নান সৈয়দের। মান্নান সৈয়দ স্টেডিয়ামের একটি দোকানে বই কেনার উদ্দেশ্যে ঢুকেছিলেন আর ঠিক তখন শামসুর রাহমান ওই পথ দিয়ে অফিসে যাওয়ার সময় মান্নান সৈয়দকে দেখে তাঁর অফিসে যাওয়ার আহ্বান করেন। দৈনিক পাকিস্তান তখন দৈনিক বাংলা হয়ে গেছে। মান্নান সৈয়দ কয়েকদিন বাদে দৈনিক বাংলার অফিসে গেলেন। স্বভাবতই মান্নান সৈয়দ ওই বিরূপ কলামের কথা ভোলেননি। তাই আলোচনার এক ফাঁকে জানতে চান ওই প্রসঙ্গে। শামসুর রাহমান ওই অনুষ্ঠানে না-গিয়ে কেন তাঁর উপর অকারণে বিরূপ মন্তব্য লিখলেন। জানতে চাইলেন, ‘রাজিয়া খান আমার যে-প্রশংসা করলেন, তার জন্যে কী আমি দায়ী? আমার কী অপরাধ?’১৭ তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক ছিলেন আহমেদ হুমায়ুন। তিনি শামসুর রাহমানের সঙ্গে একই ঘরে বসতেন। আহমেদ হুমায়ুন তাঁদের দুজনের আলাপের মাঝখানে বললেন, ‘আপনি যখন ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন না, তখন এ বিষয়ে আপনার লেখা ঠিক হয়নি।’১৮ মজার ব্যাপার হল, শামসুর রাহমান বললেন, ‘দাউদ হায়দার এসে যা বলেছিল তার ভিত্তিতে আমি লিখেছিলাম।’১৯ তিনি অকপটে এই লেখার পেছনের ঘটনা সম্পর্কে বলেন। পরে তিনি রাজিয়া খানেরও কিছু তারিফ করেন। অস্বস্তিকর এই পরিস্থিতির দায়মুক্তির জন্য শামসুর রাহমান পরে কয়েকটি কাজ করেন। ১৯৭২ সালে আবদুল মান্নান সৈয়দের শুদ্ধতম কবি প্রকাশ পায়। প্রকাশের পর দৈনিক বাংলার কলামে বইটির পক্ষে স্বীকৃতিসূচক আলোচনা লেখেন। আরো পরে ১৯৭৩-এর অক্টোবরে একটি মেধাবী গ্রন্থ নামে শুদ্ধতম কবি নিয়ে দৈনিক বাংলায় প্রবন্ধও লেখেন। বেশ কয়েক বছর পরে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত শামসুর রাহমান তাঁর একটি কবিতাও উৎসর্গ করেন মান্নান সৈয়দকে। 

৫.

বাংলা একাডেমিতে একুশের বইমেলায় মাসব্যাপী প্রবন্ধমালা পাঠের নিয়ম চলে আসছে অনেক আগে থেকেই। ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি বটতলায় আল মাহমুদ একুশোত্তর আধুনিক কবিতা শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করেন। সভাপতি ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। সে আমলে একাডেমির বটতলায়ই প্রবন্ধ পাঠের রীতি ছিল। আল মাহমুদ ওই প্রবন্ধে রফিক আজাদ ও মান্নান সৈয়দের কবিতা নিয়ে কটাক্ষমূলক মন্তব্য করেন। রফিক আজাদ তখন ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন না। তিনি তখন ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলে অধ্যাপনা করছেন। মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে কটাক্ষ করে বলেন ষাটের এই সদ্যতরুণকে দুজন গদ্যকার শওকত ওসমান ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্বকৃতি দেন।

 

আবদুল মান্নান সৈয়দের ছিল নি-িদ্র লেখালেখির জীবন। যতদিন জীবন পেয়েছেন প্রাণপণে লিখে গেছেন। শেষপর্যন্ত তাঁর লেখাই তাঁর প্রেম। তাঁর সাহিত্য তাঁর জীবন। জীবনের অঙ্কও। জীবনকে পুরো মাত্রায় সাহিত্যের মধ্যে তিনি ঢেলে দিয়েছেন। তাঁর বিকাশ-প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সেই ষাটের দশক থেকে আমৃত্যু নানা বর্ণিল মানুষের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়, শত্রুতা-বন্ধুতা, ঈর্ষা-দ্রোহ আবার ভালোবাসা সবই ঘটেছে। সবই তাঁর অর্জন। বিরুদ্ধতা সাময়িক, বন্ধুতা চিরকালের। বিরুদ্ধতার বড় গুণ সে একসময় রূপ পালটায় বন্ধুতায়। মৃত্যুর পর তাঁর অজস্র লেখা ও আড্ডাতুর স্মৃতিতাড়িত এই বন্ধুতাই ফিরে আসে বারবার। ২০১৩.১১.১৪

 

তথ্যনির্দেশ

১.    আবদুল মান্নান সৈয়দ, স্মৃতির নোটবুক, শিল্পতরু, ঢাকা ২০০২, পৃষ্ঠা ২০ 

২.    ঐ, পৃষ্ঠা ২০

৩.    ঐ, পৃষ্ঠা ২১

৪.    ঐ, পৃষ্ঠা ৬১

৫.    ঐ, পৃষ্ঠা ৬২

৬.    আবদুল মান্নান সৈয়দ, পরিশেষ ২, সত্যের মতো বদমাশ, পাঠক সমাবেশ সংস্করণ, ঢাকা ২০১০, পৃষ্ঠা ১১১

৭.    দৈনিক পূর্বদেশ, ৩ জানুয়ারি ১৯৭০; আবদুল মান্নান সৈয়দ, পরিশেষ ২, ঐ, পৃষ্ঠা ১১৩

৮.    আবদুল মান্নান সৈয়দ, পরিশেষ ২, ঐ, পৃষ্ঠা ১১৩

৯.    আবদুল মান্নান সৈয়দ, স্মৃতির নোটবুক, ঐ, পৃষ্ঠা ৫৫

১০.   ঐ,  পৃষ্ঠা ৫১

১১.   আবদুল মান্নান সৈয়দ, আমার কথকতা, আমার বিশ্বাস, প্রবন্ধসংগ্রহ ১, অনন্যা ২০১০, পৃষ্ঠা ৪০৪

১২.   ঐ, পৃষ্ঠা ৪০৫

১৩.   আবদুল আবদুল মান্নান সৈয়দ, স্মৃতির নোটবুক, ঐ, পৃষ্ঠা ৫৬। অনন্যা প্রকাশিত প্রবন্ধসংগ্রহে ১-এ আছে ২৮ জুন। পৃষ্ঠা ৪৮১

১৪.   আবদুল আবদুল মান্নান সৈয়দ, স্মৃতির নোটবুক, ঐ, পৃষ্ঠা ৫৫

১৫.   ঐ, পৃষ্ঠা ৫৬

১৬.   ঐ, পৃষ্ঠা ৫৮

১৭.   ঐ, পৃষ্ঠা ৫৮

১৮.   ঐ, পৃষ্ঠা ৫৮

১৯.   ঐ, পৃষ্ঠা ৫৯

 

Facebook Twitter Email