রোমান সাম্রাজ্য

Facebook Twitter Email

মূল : আইজ্যাক আসিমভ

অনুবাদ : আফসানা বেগম

ক্যালিগুলা                  

৩৭ খ্রিষ্টাব্দে (রোমান ৭৯০ সালে) টিবরিয়িাসের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি টানা তেইশ বছর রোম শাসন করেছিলেন। তার মৃত্যুর পরে যথারীতি আবার উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা শুরু হয়।

টিবারিয়াসের নিজের কোনো সন্তান ছিল না। আর একমাত্র ভাগ্নে জার্মানিকাস যে কিনা স্ত্রী লিভিয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিল। অবশ্য জার্মানিকাসের নিজের কয়েকজন সন্তান ছিল। কেউ কেউ ততদিনে মরে গেছে তবে একজন পুত্র সন্তান তখনও বেঁচে ছিল। তার নাম গেইয়াস সিজার। সম্পর্কে তিনি টিবারিয়াসের নাতি, অগাস্টাসের প্রপৌত্র।

গেইয়াস সিজার জন্মেছিলেন ১২ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি জন্মেছিলেন জার্মানির যুদ্ধক্ষেত্রের ক্যাম্পে। তার বাবা জার্মানিকাস আর মা অ্যাগ্রিপিনা তখন সেখানে ছিলেন। তিনি তার জীবনের প্রথম কয়েক বছর সৈন্যদের সাথে কাটান। কঠোর সংকল্পবদ্ধ গম্ভীর সৈন্যরা একসময় তাদের নেতার শিশুর সাথে হেসে খেলে দিন কাটাতে লাগল। সৈন্যদের সংকল্প আরও দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে জার্মানিকাস তার ছোট্ট ছেলেকে দিয়ে নানান উৎসাহব্যঞ্জক কাজ করতেন। গেইসার সিজারকে সৈন্যদের মতো কাপড় পরাতেন, এমনকি সৈন্যদের মতো ছোট্ট একজোড়া জুতোও পরাতেন তাকে। সৈন্যরা তাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠত। আদর করে তাকে ক্যালিগুলা (ছোট্ট জুতো) বলে ডাকত। তখন থেকে সেটাই তার ডাকনাম হয়ে গেল। আর একমাত্র সে অদ্ভুত নামেই তিনি পরবর্তীকালে ইতিহাসে পরিচিত হলেন।

ক্যালিগুলা একেবারেই অগাস্টাস আর টিবারিয়াসের মতো ছিলেন না। রোমের প্রাচীন ঐতিহ্যের ব্যাপারে তার কোনো মায়া মমতা তৈরি হয় নি। তাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রেখে এমন করে মানুষ করা হয়েছিল যেখানে তিনি কেবল নিজেকে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে বুঝতে শিখেছিলেন। যতরকম সম্ভব সবরকম আরাম আয়েশের ব্যবস্থা তার জন্য করা হয়েছিল। আরও একটা জিনিস তিনি জেনেছিলেন তখন, তা হলো তার জীবন সবসময় একরকম হুমকির মুখে আছে। এভাবে থাকতে থাকতে তিনি শিখেছিলেন কেবল ভয় পাওয়া আর মানুষকে সন্দেহ করা। তারপর আস্তে আস্তে রোম রাজ্যের পূর্বদিকের দূরবর্তী প্রদেশগুলোর রাজপুত্রদের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। রাজপুত্রেরা রোমে কোনো না কোনো কাজে আসা-যাওয়া করত। তাদের মধ্যে একজন হলেন হেরোড অ্যাগ্রিপা। জুডিয়ার প্রথম হেরোড রাজার নাতি। এইসব বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প শুনে শুনে ক্যালিগুলা পূর্বের রাজতন্ত্রের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করতেন।

ক্যালিগুলার শাসনামল শুরু হলো খুব নীরবে। চারদিকের পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ। সবাই তাকে বিপুল আনন্দের মধ্যে দিয়ে বরণ করে নিল। বিচারকাজ অগাস্টাস কিংবা টিবারিয়াসের সময়ে যেমন ঘটনাবিহীন আর নিরস ছিল তেমন আর রইল না। ম্লান হয়ে যাওয়া সব জায়গা ঝকমক করতে লাগল। সবাই বুঝতে পারল, এই সম্রাট খুব স্বাধীনচেতা আর প্রাণবন্ত। কিন্তু তিনি এতই স্বাধীনচেতা ছিলেন যে আনন্দে কাটাতে গিয়ে, অগাস্টাস আর টিবারিয়াস সত্তর বছর হিসেবি হয়ে রাজ্যশাসন করে রাজকোষে যে ধনদৌলত জমা করেছিলেন, সেসব ওড়াতে তার বড়োজোর এক বছর লাগল।

৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালিগুলার মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলো। তারপরে তিনি যখন সুস্থ হলেন ততদিনে সবকিছু বদলে গেছে। দীর্ঘ অসুস্থতা তার মানসিক অবস্থা বদলে দিয়েছিল আর এটাও সত্য যে তার আগের কয়েক বছরও তিনি ভালো অবস্থায় ছিলেন না। সিনেটের ঐতিহাসিকরা তার এই মানুসিক অসুস্থতার কথা খুব বাড়িয়ে লিখেছেন। নির্দ্বিধায় তারা লিখেছেন যে ক্যালিগুলা আসলে এক খারাপ শক্তি ছিল পুরো পরিবারটির জন্য আর রাজ্যের জন্যও। তারা যতই বাড়িয়ে লেখেন না কেন, সত্য আসলে ছিল অন্যরকম।

৩৮ সালের পরে ক্যালিগুলার খরচের বাতিক মারাত্মকভাবে বেড়ে গেল। তিনি যেভাবে পারেন অর্থের জোগাড় করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য অর্থ প্রাপ্তির আশায় তিনি নানারকম নিপীড়ন আর জুলুম শুরু করলেন। তখন এমন ব্যবস্থা ছিল যে কোনো ধনী লোকের বিরুদ্ধে কোনোরকমে রাজনৈতিক প্রতারণার অভিযোগ আনতে পারলেই তার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি সম্রাটের কোষাগারে চলে আসত। অভিযোগ অমূলক হলেও কোনো হেরফের হতো না। যেমন একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে ক্যালিগুলা মৌরিতানিয়ার রাজা টলেমির সমস্ত সম্পত্তি হরণ করেছিলেন। নিরপরাধ রাজা টলেমিসহ তার উত্তরাধিকারী মার্ক অ্যান্টনিকে রোমে ডেকে এনে হত্যা করেন তিনি। আর তারপর মৌরিতানিয়ার কোষাগার পুরোপুরি চলে আসে ক্যালিগুলার হাতে।

ক্যালিগুলা অগাস্টাসের আইন-কানুন বদলানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তিনি পূর্বের দেশগুলোর রাজতন্ত্রের অনুকরণে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নতুন একটা চেহারা দিতে চাইতেন। এজন্য তিনি চাইতেন প্রজারা তাকে স্বর্গীয় দেবতার মতো আরাধনা করুক।

প্রকৃতপক্ষে তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী এরকম উপাসনা কেবল মৃত মানুষদেরই করা হতো। খুব প্রাচীন কিছু সভ্যতায় জীবিতদের জন্যে সে ধরনের আয়োজন দেখা যেত। (ইহুদিরা এই ধরনের বিপক্ষে ছিল বরাবর।) রোমান সম্রাটদের মৃত্যুর পরে তাদের দেবতার মতো পূজা করা হতো। নির্দিষ্ট নিয়মে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আর সম্মান প্রদর্শন করা হতো। কিন্তু বহু ঈশ্বরবাদী সমাজে এসবের কোনো অর্থ হয় না। সিনেটের সদস্যরা অবশ্য এ ব্যাপারে স্বস্তিবোধ করছিলেন যে জীবিত সম্রাটকে সেরকম দেবতার মর্যাদা দেয়া হবে কি না, এই সিদ্ধান্ত তাদের ভোটাভুটির উপরে নির্ভর করবে। তখনকার দিনে সিনেটের জন্য একজন অত্যাচারী, জুলুমকারী সম্রাটকে শায়েস্তা করার মতো একটিই পদ্ধতি ছিল; তা হলো তাকে জানিয়ে দেয়া যে মৃত্যুর পরে তাকে তার যোগ্য সম্মান দেয়া হবে না। এরকম করলে মৃত সম্রাটের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না কিন্তু সিনেটের সদস্যরা অবশ্যই শান্তি পায়।

ক্যালিগুলা নিজের এই অতি সম্মানিত বা অতি আদরণীয় হওয়ার বাতিকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন। জীবিত অবস্থায়ই তিনি মৃতের মতো আরাধনা দাবি করছিলেন। এই দাবি রোমান সংস্কৃতি অনুযায়ী অবান্তর হলেও অন্য অনেক সংস্কৃতিতে বহাল ছিল। যেমন মিশরের ফারাও রাজারা জীবিত অবস্থায় বিধাতার মতো সম্মান পেতেন। তাদেরকে চলমান, জীবন্ত বিধাতা হিসেবে দেখা হতো। এই চিন্তাধারা তখনকার মিশরিয়দের কাছে একবারেই অস্বাভাবিক ছিল না। একজন মানুষ এটা স্বাভাবিক কি অস্বাভাবিকভাবে নেবে সেটা আসলে নির্ভর করে, বিধাতাকে সে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে, তার ওপরে। আধুনিক রাষ্ট্র তার পত্তনকারী বা প্রধান নাগরিকদের যতই নিরাপত্তা আর সুযোগসুবিধা দিক না কেন, মানুষ তাদের বিধাতা মনে করে না। প্রাচীন সভ্যতায় যখন তাদের কাছে বিধাতার সংখ্যা ছিল অশেষ আবার কখনও কখনও বিধাতার মধ্যে মানুষের মতো দুর্বল গুণাবলিও থাকত, তখনকার দিনে এভাবে ভাবা হয়ত স্বাভাবিক ছিল।

রোমানদের কাছে সত্যিকার অর্থে একজন তরুণ সম্রাটকে তাদের দেবরাজ জুপিটারের মতো পোশাক পরতে দেখা আর জুপিটারের মন্দিরে মূর্তি সরিয়ে দিয়ে নিজের মুর্তি স্থাপন করার আদেশ খুবই অদ্ভুত ঠেকছিল। তারা সবাই ছিল সম্রাটের উপরে যারপরনাই বিরক্ত।

অগাস্টাস আর টিবারিয়াসকে সাধারণভাবে কেবল ‘প্রথম শ্রেণির নাগরিক’ বলা হতো। তাদের উপাধি ছিল প্রিন্সেপ। তাদের হাতে ক্ষমতা যা-ই থাকুক, নিজেদের তারা কেবলই রোমান নাগরিক মনে করতেন। সাধারণ মানুষেরাও তাদের রোমান নাগরিক হিসেবেই দেখত। যদিও এসব একেবারেই অবাস্তব আর যুক্তির কথা। ক্যালিগুলা যদি বিধাতাতুল্য সম্রাট হয়ে যান তবে তিনি আর সাধারণ কোনো নাগরিক থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন আর সব নাগরিকদের থেকে উচ্চমানের, অসাধারণ। তখন রোমান নাগরিক আর অনাগরিকদের কাছে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান আর প্রজারা সব হয়ে যায় তার দাস। রোমান নাগরিকদের যেসব অধিকার ছিল, তা আর চর্চা হতে পারে না। রাতারাতি তারা সবাই অনাগরিকের মতো হয়ে যায়।

ক্যালিগুলার বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র শুরু হলো। এর মধ্যে একটি ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত সফল হলো। ৪১ খ্রিষ্টাব্দে (৭৯৪ রোমান সালে) ক্যালিগুলা তার স্ত্রী আর কন্যাসহ খুন হলেন। একদল বিদ্রোহী প্রিতোরিয়ান পাহারাদারের হাতে তাদের মৃত্যুবরণ করতে হলো। তখন তার বয়স তিরিশও হয় নি।

ক্লডিয়াস

এভাবে প্রথমবারের মতো একজন সম্রাটকে হত্যার ঘটনা ঘটায় সিনেটের সদস্যরা যা খুশি তাই করার ক্ষমতা পেয়ে গেল। একজন অপ্রকৃতিগ্রস্থ সম্রাট তাদের ততদিনে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন যে সম্রাটের পক্ষে কতদূর কী করা সম্ভব। সত্তর বছর ধরে যে পদটির আবেদন মানুষের কাছে ভয়ানক উঁচু ছিল সেই পদ একদিনেই যেন তাদের চোখে নিচে নেমে গেল। সত্তর বছর ধরে কঠোর আইনের প্রয়োগের মধ্যে থাকা মানুষগুলো যেন সুযোগ পেয়ে রাজ্যের যেখানে সেখানে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াতে লাগল। তাই সম্রাটের হত্যার পরে সিনেট প্রথমেই মনে করল যে আইনের প্রয়োগ আবার কঠোর হওয়া উচিৎ।

কিন্তু পরে দেখা গেল সিনেট কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। কারণ যে সৈন্যের দল সম্রাট ক্যালিগুলাকে হত্যা করেছিল তারাই সব কর্তৃত্ব নিতে চাইছে। তারা নিজেরাই যা করার করে নতুন একজন সম্রাটকে অধিষ্ঠিত করার স্বঘোষিত দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।

দুর্ঘটনা ঘটার সময়ে ক্যালিগুলার চাচা তার সাথে ছিলেন। এই চাচার নাম ক্লডিয়াস (টিবারিয়াস ক্লডিয়াস ড্রুসাস নিরো জার্মানিকাস)। তিনি ছিলেন রোমের পূর্ববর্তী বড়ো দুই নায়ক, জার্মানিকাসের ছোটো ভাই আর বড়ো ড্রুসাসের ছেলে।

ক্লডিয়াস অবশ্য তার ভাই বা বাবার মতো শক্তিশালী ছিলেন না। বরং বেশ দুর্বল আর দেখতে শুনতে একেবারেই আকর্ষণীয় ছিলেন না। তাই কেউ তাকে তেমন পাত্তা তো দিতই না, বরং বেশ অবহেলার চোখে দেখত। তাই তিনি সবসময় মানুষের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। তিনি কারও আগেপিছে থাকতেন না। কারও কোনো ব্যাপারে নাক গলাতেন না। তার এই স্বভাবই তাকে ক্যালিগুলাকে হত্যার সময়ে সাহায্য করেছিল। তাকে কেউ নিজেদের জন্যে হুমকি মনে করে নি।

কিন্তু আসলে ক্লডিয়াস সেরকম আত্মভোলা ছিলেন না। ভেতরে ভেতরে তিনি বেশ জ্ঞানী ছিলেন। তিনি অনেক ঐতিহাসিক গবেষণাও করেছিলেন। এট্রুসকানস আর কার্থাজিনিয়ান্সের সাথে পাল্লা দিয়ে তিনি ইতিহাসের কিছু বইও লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে রোমান রাজবংশ তাকে অভিজাত আর বুদ্ধিমান হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।

ক্যালিগুলা তার এই নির্দোষ চাচাকে খুব পছন্দ করতেন। অথবা তিনি তাকে কেবল রাজসভার ভাঁড় বলে মনে করতেন। ক্যালিগুলার শাসনামলের প্রথম দিকে তিনি সম্রাটের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ক্যালিগুলাকে আক্রমণ আর হত্যার সময়ে তিনি সেখানেই উপস্থিত ছিলেন।

ভয়ার্ত ক্লডিয়াস আক্রমণের সাথে সাথেই একটা কোনো আসবাবের পেছনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আক্রমণকারী সৈন্যেরা যখন পাগলের মতো কেবল আঘাত করে চলছিল তখন সামনে কে আছে না আছে খেয়াল করে নি। তারপর যখন তাদের উত্তেজনা কমে আসে তখন তারা ক্লডিয়াসকে খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে লুকানোর জায়গায় তারা তাকে পেয়েও যায় আর টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনে। বোকার মতো তিনি কেবল তাদের কাছে নিজের প্রাণভিক্ষা চেয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আসলে তাকে হত্যা করার তেমন কোনো ইচ্ছেই সৈন্যদের ছিল না। সম্রাটকে মেরে ফেলার পরে সৈন্যেরা সাথে সাথেই সম্রাটের শূন্য সিংহাসনের কথা ভেবেছিল। সেই শূন্যস্থান পূরণের তাগিদ অনুভব করেছিল। তারা জানত যে ক্লডিয়াস রাজকীয় পরিবারের বংশধর। তাই কোথায় ক্লডিয়াস তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবে, তার আগে তারাই ক্লডিয়াসের পায়ে পড়ে তাকে সম্রাট হওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগল।

ক্লডিয়াস হয়ত অনুরোধটা ততটা পছন্দ করেন নি। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অস্ত্রধারী সৈন্যদের সাথে তর্ক করবেন এতটা বোকাও তিনি ছিলেন না। তিনি শুধু রাজিই হলেন, তা নয়; এই আক্রমণ আর বিদ্রোহের জন্য তাদের পুরস্কারও দেবেন ঠিক করলেন। সৈন্যদের জন্য এটা খুব খারাপ একটা উদাহরণ হয়ে গিয়েছিল। তারা শিখে গেল যে এভাবে সিংহাসন ছিনিয়ে নেয়া যায় আর তার জন্য তিরষ্কারের বদলে পুরস্কার প্রাপ্য। তিনি যত দিতে চেয়েছিলেন, সৈন্যরা তার চেয়েও বেশি দাবি করছিল। তারপর তাদের দাবি বাড়তেই থাকল।

আবার আগের মতো রাজ্য ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন সিনেটের সদস্যরা দেখছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে গেল। ক্লডিয়াস হলো সম্রাট আর বিদ্রোহী সৈন্যদের দাবি মেটাতে মেটাতে তারা কাহিল হয়ে গেল।

ক্লডিয়াসের বয়স তখন পঞ্চাশ বছর। তিনি তার জীবন ব্যয় করেছিলেন জ্ঞানার্জনের জন্য। রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ তার জন্য ছিল খুবই কঠিন কাজ। কোনো সিদ্ধান্তই তিনি নিতে পারতেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন খুবই শান্ত আর দুর্বল মনের মানুষ ছিলেন। যাই হোক, তিনি একজন ভালো সম্রাট হওয়ার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি রোমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- চালাতে লাগলেন। প্রধান সড়কের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ালেন যাতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলো। লেকের পানি সেচ করে চাষাবাদের সুবিধা করে দিলেন। সিনেটের প্রতি দায়িত্ব প্রদর্শন করে তিনি সম্রাট হিসেবে স্বর্গীয় দেবতার সম্মান দাবি না করে অগাস্টাসের মতো কেবল একজন প্রথম শ্রেণির নাগরিক থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ক্লডিয়াস সম্রাট হিসেবে খুব শান্তশিষ্ট হলেও তার সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন কিছু না কিছু বৃদ্ধি পেয়েছিল। ক্লডিয়াস এক দিক দিয়ে অবশ্য টিবারিয়াসের পথ অনুসরণ করেছিলেন, তা হলো সাম্রাজ্যের দূরের বিচ্ছিন্ন সব অংশে, যেসব জায়গায় শান্তি বজায় ছিল, সেগুলো পুরোপুরি রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে ফেললেন। ক্যালিগুলা টলেমিকে হত্যা করার পর থেকে মৌরিতানিয়ায় কোনো শাসক ছিল না। তবে ক্যালিগুলার এই অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে মৌরিতানিয়ার মানুষেরা প্রতিবাদ করেছিল। ৪২ খ্রিষ্টাব্দে ক্লডিয়াস সেই বিদ্রোহ দমন করে মৌরিতানিয়াকে রোমের একটি প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে।

এশিয়া মাইনরের দক্ষিণপশ্চিমে লিসিয়াও ৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমের আরেকটি প্রদেশ হিসেবে পরিচিত হয়। আর ৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এগান সাগরের উত্তর দিকে থ্রেইসও রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সাম্রাজ্যে দু’একটি দূরবর্তী কোণ কেবল স্বাধীন ছিল। যেমন এশিয়া মাইনরের পূর্বদিকে কমাজিন নামে একটি রাজ্য ছিল যেটি কোনো কারণে ক্যালিগুলা একটু অবহেলা করেই রোমান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীন করেই রেখেছিলেন। বহু প্রজন্ম ধরে এখানে রাজ্যের নিজস্ব রাজা ছিল।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে ক্লডিয়াসের সময়ে রোমান রাজ্য গাউল থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছে যায়।

বৃটেন দ্বীপটি (ইংল্যান্ড, ওয়েলস আর স্কটল্যান্ড নিয়ে, এখন যেটিকে গ্রেট বৃটেন বলা হয়) গাউলের অপর দিকে সমুদ্রের সরু একটা অংশ দিয়ে বিচ্ছিন্ন। এই অংশটিকে বর্তমানে বলা হয় ইংলিশ চ্যানেল। প্রাচীনকালে, জুলিয়াস সিজারেরর আমলের আগে এই জায়গাগুলোর কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল না। ফোনেশিয়া আর কার্থাগিনিয়ানরা নিশ্চয়ই টিনের খোঁজে বৃটেনের উদ্দেশ্যে জাহাজ পাঠিয়েছিল। টিন এমন এক ধাতু যা ব্রোঞ্জ তৈরিতে লাগে। তারা তাদের টিনের উৎসের খবর অন্য সবার কাছে গোপন রাখতে চেয়েছিল।

সিজার যখন গাউল জয় করেছিলেন, তখন তিনি বৃটেনের ব্যাপারে জানতেন। সেখানকার সেলটিক জাতি গাউলের ভাষা আর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত ছিল। তাই যখন রোমানরা বৃটেনে আক্রমণ করার সম্ভাবনা দেখা দিলো তখন তারা গাউলের সাহায্য প্রার্থনা করল।

এই অবস্থা বন্ধ করার জন্য সিজার ৫৫ আর ৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বৃটেনে দুবার হামলা চালালেন। তিনি সেখানে কিছুটা সফল হয়েছিলেন। রোমান বাহিনী টেমস নদী পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিল। সেই দূরবর্তী দ্বীপে রাজ্য স্থাপনের কোনো ইচ্ছা সেই সময় তার ছিল না। তাই সেখানে এত কষ্ট করে না গিয়ে রাজ্যের অন্যান্য জরুরি কাজে মনোনিবেশ করেন।

বৃটেনের লোকেরা প্রায় একশ বছর ধরে স্বাধীন ছিল। তারা চুপচাপ গাউলে রোমান আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা দেখছিল। আর গাউল ধীরে ধীরে রোমান সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। তবে বৃটেনের লোকেরা ভেতরে ভেতরে বেশ ভয়ে ছিল রোমান আগ্রাসন নিয়ে। গাউলে নানান সমস্যা তৈরির ব্যাপারে ভূমিকা রাখাকে তারা রোমানদের বিরুদ্ধে নিজেদের একরকম প্রতিবাদ হিসেবে মনে করত।

ক্লডিয়াসের সময় গাউল ভালোভাবে রোমের পক্ষে আসে। অবশ্য বলাবাহুল্য তারা বৃটেনের প্রতি ততটা সদয় ছিল না। অগাস্টাস আর টিবারিয়াসের সময়কার নাগরিকত্ব নিয়ে আইনকানুনের জটিলতা ক্লডিয়াসের সময় অনেক কমে আসে। গাউলের লোকদের রোমান নাগরিকত্ব দেয়া হয়। এই দূরদর্শী পদক্ষেপ গাউলের জনগণকে পরবর্তীকালে অন্য কোনো ক্ষমতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে। (৪৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে অগাস্টাসের মৃত্যুর পরে এক প্রজন্ম অতিক্রান্ত হলে সেখানে রোমের নাগরিকের সংখা বেড়ে দাঁড়ায় ষাট লাখ।)

দেখতে দেখতে বৃটেনের ভেতরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এমনভাবে বদলে গেল যা তখনকার সময়ের জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। বৃটেনে একজন রোম সমর্থক শাসক কিউনোবেলিন (শেক্সপিয়ারের নাটকের ‘সিমবেলিন’ চরিত্রটি এসেছে তার থেকে) মৃত্যুবরণ করেছিলেন আর মৃত্যুর সময়ে রেখে গিয়েছিলেন রোমান সাম্রাজ্যবিরোধী কয়েকজন পুত্র সন্তান। রোম সমর্থক একজন বৃটিশ নেতা বৃটেনে আইনকানুন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে রোমের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। রোম তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। রোমান সেনাবহিনী ৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (রোমান ৭৯৬ সালে) ইংল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্বদিকে ঘাঁটি গাড়ে যেখানে রোমের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল। জায়গাটি এমনিতেও রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্তই হয়ে গিয়েছিল প্রায়। ক্লডিয়াস নিজেও সেনাবাহিনীর সাথে সেখানে গিয়েছিলেন আর তার ছোটো ছেলে, যে এক বছর আগে জন্মেছিল, তার নাম রাখা হয়েছিল বৃটানিকাস।

বৃটেনের লোকেরা জোর যুদ্ধ শুরু করল। বিশেষ করে বৃটেনের উত্তর আর পশ্চিমের পাহাড়ি অঞ্চলে। বৃটিশ নেতা কারাকটাকাস ৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধরা পড়ে নি। তারপরে ৬১ খ্রিষ্টাব্দে বউডিকার (সাধারণত ভুল করে নড়ধফরপবধ বানান করা হয়) একটা অংশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল। টেমসের উত্তর দিকের রাজ্য ইংল্যান্ডের রানী রোমান রাজ্যের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসতে রোমের সব আইন বদলে দেয়া শুরু করলেন। আজকের ইংল্যান্ড বা ওয়েলসের যে চেহারা আমরা দেখি, রোমের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তা তৈরি করতে মোটামুটি তিরিশ বছর লেগেছিল।

পরিবারের ভেতরে ক্লডিয়াস ছিলেন নারীপরিবেষ্টিত। সম্রাট হওয়ার পরপর তিনি যাকে বিয়ে করেছিলেন তার নাম ছিল ভ্যালেরিয়া মেসালিনা। তিনি তার তৃতীয় স্ত্রী। তিনি ছিলেন ব্রিটানিকাসের মা। পরবর্তীকালে সিনেটের ঐতিহাসিকরা ভ্যালেরিয়া মেসালিনার জীবন এমন কুৎসিতভাবে বর্ণনা করে যে ‘মেসালিনা’ শব্দটি এখন কেবল একজন অত্যাচারী নারীর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। শেষ পর্যন্ত ক্লডিয়াস নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে মেসালিনা আসলে তাকে হত্যা করতে চাচ্ছিলেন। তিনি ভাবতেন তাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে মেসালিনা হয়ত তার একজন প্রেমিককে সেখানে বসাতে চায়। তাই ৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মেসালিনার ফাঁসির আদেশ দেন।

তারপর তিনি বিয়ে করেন অ্যাগ্রিপিনাকে। অ্যাগ্রিপিনা ছিল ক্যালিগুলার বোন আর তার নিজের ভাগ্নি। অ্যাগ্রিপিনা ক্লডিয়াসকে বিয়ে করার আগেই তার একটি পুত্র সন্তান ছিল। নাম ছিল ডমিশিয়াস। বিয়ের পরে ক্লডিয়াসের পারিবারিক নাম সে গ্রহণ করে। মা স¤্রাজ্ঞী হয়ে গেলে রাজপরিবারের সাথে মিলিয়ে তার নাম হয় নিরো ক্লডিয়াস সিজার ড্রুসাস জার্মানিকাস। ইতিহাসে তিনি নিরো নামেই পরিচিত। নিরো ছিল জার্মানিকাসের পৌত্র আর অগাস্টাসের প্রপৌত্র।

অ্যাগ্রিপিনার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল নিরোকে সম্রাটের সিংহাসনে বসতে দেখা। তাই তিনি নিরোকে দত্তক গ্রহণের জন্য ক্লডিয়াসকে বুঝিয়ে রাজি করান। নিরোকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করলে পরবর্তী সম্রাট তার হওয়ার কথা কারণ ক্লডিয়াসের নিজের ছেলে বৃটানিকাস নিরোর চেয়ে বয়সে ছিল ছোটো। ৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নিরো ক্লডিয়াসের কন্যা অক্টাভিয়াসকে বিয়ে করে তার সম্রাট হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তোলেন। সে সময়ে নিরোর বয়স ছিল পনেরো আর অক্টাভিয়াসের এগারো।

এই সমস্ত করা হলে ক্লডিয়াসকে অ্যাগ্রিপিনার আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। পরবর্তীকালে সিনেটের ঐতিহাসকদের বর্ণনায় দেখা যায় যে, ৫৪ খ্রিষ্টাব্দে (রোমান ৮০৭ সালে) অ্যাগ্রিপিনা ক্লডিয়াসকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। আগে থেকেই প্রিতোরিয়ান গার্ডদের বলা ছিল যে ক্লডিয়াস মৃত্যুবরণ করলে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিরোকে যেন চিহ্নিত করা হয়। এজন্য অ্যাগ্রিপিনা তাদের মোটা অংকের বখশিশ দেয়ার কথা ঘোষণা করে রেখেছিলেন। সৈন্যেরা যখন এই বিষয়ে মত প্রদান করে তখন সিনেটের আর দ্বিমত পোষণের কোনো সুযোগ থাকে না। এভাবে নিরো রোমের পঞ্চম সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আসীন হন।

নিরো

সিংহাসনে আসীন হওয়ার সময়ে নিরোর বয়স ছিল মাত্র ষোল। তিনিও ক্যালিগুলার মতো অনেক সম্ভাবনা নিয়ে রাজ্য পরিচালনা শুরু করলেন। যে বয়সে একটি মানুষ অন্য কারও কাছে আবদার করে কাটায় সে বয়সে নিজেকে গুছিয়ে একটা পুরো রাজ্য পরিচালনার ভার হাতে তুলে নিতে হয়েছিল তাকে।

খুব তাড়াতাড়ি নিরো নিজের ইচ্ছের বাস্তবায়ন ঘটাতে শিখে ফেললেন। তার শখ পূরণের পথে যত বাধাবিপত্তি আসছিল সব তিনি মাড়িয়ে যেতে লাগলেন। তিনি বৃটানিকাসকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। তারপর নিজের তরুণী স্ত্রীকে বিচ্ছেদের মাধ্যমে দূরে সরিয়ে দেন। বস্তুত রাজ পরিবারের কন্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে সাধারণ জীবন যাপন করতে বাধ্য করেন। ৫৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি এত ভয়ানক স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন যে নিজের মাকেও ফাঁসিতে ঝোলাতে পিছপা হন না। তার মায়ের দোষ ছিল তিনি ক্লডিয়াসের উপরে যেমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তার উপরেও তেমনই ছড়ি ঘোরাতে চাচ্ছিলেন।

আরও একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল যে নিরো কখনই সরকারি কাজকর্ম করতে পছন্দ করতেন না। তিনি আসলে মঞ্চাভিনেতা হতে চাইতেন। আজকের দিনে, দিনরাত মঞ্চে পড়ে থাকা বলতে আমরা যা বোঝাই, তিনি আসলে ছিলেন ঠিক তেমন। তিনি কবিতা লিখতেন, ছবি আঁকতেন, গ্রিসের তৈরি বীণের মতো এক বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, সংগীত সাধনা আর আবৃত্তি করতেন। দর্শকের সামনে একটা কিছু করে দেখিয়ে প্রচুর তালি আর অভিনন্দন পেতে তার ভালো লাগত। তবে এখন এটা বিবেচনা করার কোনো উপায় নেই যে তার সেসব পরিবেশনা কতটুকু শিল্পসম্মত ছিল। কারণ তার কোনো নমুনা আজ আর কোথাও নেই। শোনা গেছে তিনি সবসময়ই এসব পরিবেশনার জন্য প্রচুর অভিনন্দন পেতেন। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু সেসব কি তিনি পেয়েছিলেন তার মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার জন্য নাকি সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত থাকার জন্য, সেটা একটা প্রশ্ন। প্রায় সকলেই মনে করেন পরের কারণটিই সঠিক। পরে সিনেটের ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় জানা গেছে, তাকে যতটা গুণী শিল্পী হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছিল, তিনি ততটা যোগ্য ছিলেন না।

হয়ত নিরো একজন শিল্পী না হলে সম্রাটের দায়িত্বটা ভালোভাবে পালন করতেন, তাহলে তার জীবনও যেমন সুন্দর হতো, ইতিহাসও তাকে সম্মানের সাথে স্মরণ করত। ইতিহাসে তিনি সম্মানিত একজন ব্যক্তি যেমন হতে পারতেন, পারতেন নিজস্ব জীবনেও হয়ত একজন ভালো মানুষ হতে। যাই হোক, সম্রাট হিসেবে তার অবস্থানকে রোমান ইতিহাস একজন ভিলেইনের অবস্থান হিসেবেই দেখতে পছন্দ করে।

কিন্তু নিরো যতই অবহেলা আর অরাজকতার সাথে রাজ্য পরিচালনা করেন না কেন, রাজ্য তার নিজস্ব গতিতে ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল।

তখন রাজ্যের পূর্বদিকে আবার সমস্যা শুরু হলো। আর সমস্যা সেই আগের মতোই রোম আর পারথিয়ার মধ্যে কথায় কথায় যুদ্ধ লেগে রইল। তাদের দুই দেশেরই আকর্ষণ ছিল মাঝখানের উৎপাদনশীল রাষ্ট্র আর্মেনিয়ার দিকে। ক্লডিয়াসের মৃত্যুর পরপরই রোমান সাম্রাজ্যের বসানো শাসককে সীমান্তবর্তী উপজাতির লোকেরা হত্যা করল। আর পারথিয়ার রাজা সেই সুযোগে আর্মেনিয়ায় ঢুকে পড়ল। সেখানে নতুন রাষ্ট্র গঠন করে তার ভাই টিরিডাসকে সেখানকার রাজা বানিয়ে দিলো।

নিরো নিয়াস ডমিশিয়াস করবুলোকে আর্মেনিয়ায় পাঠালেন সেখানে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের আশায়। করবুলো ক্লডিয়াসের অধীনে জার্মানিতে দক্ষতা নিয়ে শাসনকাজ পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই উপযুক্ত একজন সেনাপ্রধান। তাই সেনাবাহিনীকে সংগঠিত করে প্রস্তুত করতে টানা তিন বছর সময় নিলেন। ৫৮ সালে তারা আর্মেনিয়ায় অভিযান চালায়। তারপর যুদ্ধের মাধ্যমে এক বছর পরে আর্মেনিয়া দখল করে নেয়। পারথিয়া দখল করে সেখানে রোম রাজ্যের মনমতো একজন শাসককে বসিয়ে দেয়।

করবুলোর অধীনে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকলে তিনি হয়ত পারথিয়াও দখল করে নিতেন। কিন্তু কোনো সেনাপ্রধান যেন এত বেশি সফল প্রমাণিত না হয় তাই নিরো দ্রুত করবুলোকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে সেখানে অভিজ্ঞতায় অপেক্ষাকৃত কম, এমন একজনকে বসিয়ে দেন। ৬২ খ্রিষ্টাব্দে নতুন সেনাপ্রধান ভয়াবহভাবে পরাজয় বরণ করে। করবুলোকে তখন আবার সেনাবাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি নতুন করে সেনাবাহিনীকে সংগঠিত আর উৎসাহিত করতে থাকেন। আর্মেনিয়ায় তখনও রাজা ছিলেন টিরিডেটস। কিন্তু ৬৩ সালে তিনি রোমে এসে নিরোর হাত থেকে রাজার মুকুট গ্রহণ করেন। এভাবেই শেষ পর্যন্ত আর্মেনিয়া রোমের প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এর মধ্যে জুডিয়ায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ইহুদিরা হেরোডসের আর তার পরিষদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিদ্রোহ করে যাচ্ছিল। তার শাসনে অনাস্থা পোষণ করছিল। একজন মাসিহার জন্য তাদের আজীবনের অপেক্ষা খুব সাংঘাতিক পর্যায়ে উপনীত হলো। কিন্তু এর জন্য নিজেদের ধর্মের সাথে কোনো সমঝোতা করতেও তারা ছিল নারাজ। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের ম্যাকাবিস আর তার ভয়ঙ্কর শক্তিশালী বিদ্রোহী সাথীদের তাদের ধর্মের প্রতি সহৃদয়তা আর অ্যান্টিকাস ৪ এর বিরুদ্ধে মতবাদ তাদের হৃদয়ে তখনও জ্বলজ্বল করছিল।

সম্রাটের প্রতি যে কোনো ধরনের সম্মান প্রদর্শন যা কিনা ইহুদিদের দৃষ্টিতে সম্রাটকে বা তার কোনো চিহ্নকে পূজা করা হচ্ছে মনে হলেই তারা ক্রমাগত সেই আচরণ প্রদর্শন করতে অস্বীকৃতি জানাত। পন্টিয়াস পাইলেট যখন যথোপযুক্ত সাজসজ্জা করে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন তখন তার বাহনের উপরে সম্রাট টিবারিয়াসের একটি ছবি আঁকা ছিল। সেই ছবিকে তারা এক ধরনের উপাসনার বস্তু বলে মনে করে। তাই পন্টিয়াস শহরে ঢোকার সাথে সাথেই সেখানে দারুণ বিদ্রোহ দেখা দেয়। পন্টিয়াস পাইলেটের যুদ্ধ পতাকার মধ্যে সম্রাট টিবারিয়াসের ছবি ছিল। সেই সময়ে টিবারিয়াস কোনো ধরনের উটকো ঝামেলা এড়াতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তখনই সবকিছু থেকে তার ছবি অপসারণের আদেশ দেন।

ইহুদিরা মনে করত তাদের বিধাতাই এক এবং অদ্বিতীয়। তাদের বিধাতা ছাড়া বাকি সব উপাসনার জিনিস তাদের কাছে ছিল বিরক্তিকর আর পরিত্যাজ্য। বিধাতার প্রশ্নে এরকম আপোশহীন ব্যবহারের কারণে ইহুদিদের প্রতি রাজ্যের মানুষের সমর্থন দিন দিন কমে যেতে লাগল। কারণ পুরো রাজ্যে একমাত্র ইহুদিরা ছাড়া বাকি সবার একের অধিক উপাসনার বিষয়বস্তু ছিল। আর তারা অন্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতিও সহনশীল ছিল। গ্রিকদের কাছে ইহুদিরা বেশি অপছন্দের হয়ে উঠল কারণ তারা একাধিক বিধাতার উপাসনা করত আর তাদের জীবনাচরণও ছিল ভিন্ন। ইহুদিরা তাদের নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরে অন্য কোনো মানুষের সংস্কৃতি বা আচরণের প্রতি এতটুকু আগ্রহী ছিল না। অন্যদের আরাধনার বস্তু সম্পর্কে জানতেও তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।

আলেক্সান্দ্রিয়া সে সময়ে মিশরের রাজধানী। শহরটিতে তখন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গ্রিক মানুষের বাস আর সেদিক দিয়ে রোম ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু আলেক্সান্দ্রিয়ার ভেতরে ইহুদিদের একটি বড়ো কলোনি ছিল যেটিকে মনে হতো শহরের ভেতরেই আরেকটি অন্য রকমের শহর। অগাস্টাস তাদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রদান করেছিলেন। (কারণ অগাস্টাসের শেষ যুদ্ধে তারা তাকে সমর্থন দিয়েছিল ও সাহায্য করেছিল।) সুবিধাগুলোর মধ্যে ছিল, দেশের নানারকম আচার ব্যবহারে অংশগ্রহণের থেকে তাদের অব্যহতি দেয়া, সেনাবাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতার অনুপস্থিতি ইত্যাদি। এদিকে এই দুই কারণে গ্রিকরা রুষ্ট হয়েছিল।

আলেক্সান্দ্রিয়ায় গ্রিকরা তাদের থেকে পৃথক ইহুদি জাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল। তাই ইহুদিরা ক্যালিগুলার কাছে সুবিচারের আশায় আবেদন পাঠিয়েছিল। গ্রিকরা এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিল যে বোধহীন সম্রাট ইহুদিদের কোন কথায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বসেন তার কোনো ঠিক নেই। তাই গ্রিকরা তাড়াহুড়ো করে সম্রাটের কাছে ইহুদিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি আবেদন পাঠাল। তারা সম্রাটকে জানাল যে ইহুদিরা সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সভায় ইচ্ছে করে উপস্থিত হয় নি তাই তারা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহী।

ক্যালিগুলা চাইতেন সম্রাট হিসেবে রাজ্যের সব জায়গায় তার খুব আরাধনা হোক। তাই তিনি রাজ্যের বিভিন্ন মন্দিরে তার মূর্তি স্থাপনের আদেশ দিয়েছিলেন। রাজ্যের অনেক জায়গায় তার আদেশ সাথে সাথে পালন করা হলো। মন্দিরে অনেক মূর্তির সাথে আরেকটি পাথরের টুকরো স্থাপন করার মধ্যে নতুন কী? এখন তারপর যেটা হলো, ক্যালিগুলা তার মূর্তি জেরুজালেমের মন্দিরে স্থাপনের আদেশ দিলেন। সম্রাটের ধারণা ছিল, একেশ্বরবাদী ইহুদিরা একটি মাত্র মানুষের মূর্তি মন্দিরে দেখলে খুশি হবে। কিন্তু আসলে এ রকম একটি ব্যাপার ইহুদিদের জন্য এতটাই অপছন্দের ছিল যে তারা এটি মেনে নেয়ার আগে মৃত্যুবরণ করতেও রাজি ছিল। সিরিয়ার গভর্নর ক্যালিগুলাকে চিঠি লিখে জানালেন ইহুদিদের প্রতিক্রিয়ার কথা। আর সম্রাটের আদেশটি মানতে শুধু শুধুই দেরি করতে থাকলেন। ক্যালিগুলা এই খবর জানার পরে ইহুদিদের রাজ্যে হামলা করাটাই ছিল খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ঠিক তখনই তিনি নিজেই নিহত হন। যাই হোক ইহুদিদের অভ্যুত্থান না ঘটানোর জন্য ক্যালিগুলার মৃত্যু যথাসময়ে হয়েছিল বলে তার পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত ইহুদিদের উপরে হামলা ঠেকিয়ে রাখা গেল।

ক্লডিয়াস সম্রাটের আসনে আসীন হওয়ার পর ক্যালিগুলার পুরোনো বন্ধু হেরোড অ্যাগ্রিপাকে ইহুদিদের রাজা বানিয়ে জুডিয়ায় বসালেন। এভাবে জুডিয়া আবারও তাত্ত্বিকভাবে রোমের অধীনে চলে এল। হেরোড অ্যাগ্রিপা ইহুদিদের মন জয় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। আর সত্যিই ইহুদিদের মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে সফল এবং জনপ্রিয় একজন শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল। (এরকম গল্প শোনা যায় যে একবার এক সভায় তিনি কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন যে, তার দুর্ভাগ্য যে তিনি একজন ইহুদি নন। এটাই ছিল তার প্রতি ইহুদিদের ভালোবাসার মূল কারণ। সেই সভায় তিনি আরও বলেছিলেন যে,  ‘আমি ইহুদি না হলেও, তোমরা ইহুদি আর তোমরা আমার ভাই।’)

দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার রাজত্ব ছিল খুব অল্পদিনের। মাত্র তিন বছর পরেই তা ফুরিয়ে যায় তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। ৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র হেরোড অ্যাগ্রিপা ২ কিছুদিনের জন্য জুডিয়ার কিছু অংশে শাসনকাজ চালান। তারপর জুডিয়াকে আবারও একটি প্রদেশ হিসেবে রোমের যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।

সেই কর্তৃপক্ষের সদস্যরা ছিল নেহায়েত লোভী। তাদের একজনকে সম্রাট নিরো ইহুদিদের মন্দিরের কোষাগার লুট করতে পরামর্শ দিলো। তখন ইহুদিদের মধ্যে রোমের বিপক্ষের মৌলবাদী শক্তির (যাদের বলা হয় জেলটস) প্রভাব খুব বেড়ে যাচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে রায়ট শুরু হয়ে গেল। হেরোড অ্যাগ্রিপা ২ সে সময়ে জেরুজালেমেই ছিলেন। সবাইকে তিনি শান্ত হতে বলছিলেন। কিন্তু তার কথা কেউ শোনে নি। ৬৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে (৮১৯ রোমান সাল) ইহুদিরা রোমের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। 

রোমান নাগরিকরা কিছুদিনের মধ্যেই ইহুদিদের বিদ্রোহের ভয়ানক শক্তি আঁচ করে বিস্মিত হলো। জুডিয়ায় উপস্থিত সেনাবাহিনীরা অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না। নিরো তাই তিনটি বড়ো সেনাবাহিনীর দলকে সেখানে পাঠালেন। সেনাবাহিনী ভেসপাসিয়ানের ( টাইটাস ফ্লেভিয়াস সাবিনাস ভেসপাসিয়ানাস) নেতৃত্বে পূর্বদিকে রওনা দিলো। ক্লডিয়াসের অধীনে তিনি জার্মানিতে কাজ করেছিলেন আর দক্ষিণ বৃটেনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে সময়ে তিনি সেনাবাহিনীকে অগ্রসর করিয়ে উইট দ্বীপ দখল করেছিলেন। ৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কনসল হিসেবে আর তারপর আফ্রিকা প্রদেশের গভর্নর হিসেবে কাজ করেন। তাকে যে নতুন দায়িত্ব দেয়া হলো তা তিনি খুব দক্ষতার সাথেই পরিচালনা করছিলেন। কাজ ঠিকঠাকমতো এগোচ্ছিল তবে ইহুদিরা মৃত্যু পর্যন্ত লড়ে যাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল।

৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ভেসপাসিয়ান জুডিয়া থেকে রোমে ফিরে যান। কিন্তু তার পুত্র টাইটাস (টাইটাস ফ্লেভিয়াস সাবিনাস ভেসপাসিয়ানাস) তার বাবার মতোই ছিলেন। তিনি তার বাবার অর্ধসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর তিনি জেরুজালেমের দখল নিয়ে নিলে মন্দিরটি দ্বিতীয়বারের মতো ভাঙা হয়। (প্রথমবার ব্যাবিলনীয়রা ভেঙেছিল প্রায় পাঁচশ বছর আগে।) টাইটাস পরের বছর রোমে গিয়ে এই বিজয় উদযাপন করেন। টাইটাসের সেই বিজয় স্মরণে বানানো তোরণ এখনও রোমের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। এখনও লোকে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে টাইটাসকে স্মরণ করে।

যেসব ইহুদিরা তখনও বেঁচে ছিল আর সেখানেই ছিল, তারা ভীষণ হতাশ হয়ে গেল। আকস্মিক দেখল জুডিয়ায় তারা পড়ে রয়েছে অসীম ধ্বংসের মুখে। তাদের প্রাণপ্রিয় মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, থামিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের ধর্মীয় উপাসনার পদ্ধতি। আর তাদের চোখের সামনে জেরুজালেমে রোমান সেনাবাহিনীকে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

আদর্শ এবং ধর্মীয় প্রথা 

সেই থেকে রোমান আর ইহুদি সংস্কৃতির মধ্যে লড়াই চলতেই থাকল। লড়াই এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে চলতেই থাকল। এই লড়াই যেন চলতেই থাকবে, কেবল স্থান-কাল-পাত্র বদলে যাবে।

রোমানদের ধর্ম বেশিরভাগ এট্রুসকানসের কাছে ধার করা, শুরুর থেকে বলতে গেলে মূলত কৃষিভিত্তিক। তাদের অসংখ্য দেবদেবীর আত্মা প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিরই বিভিন্ন শক্তির বাহক। তাদের বেশিরভাগ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে আর চাষের জন্য বৃষ্টির প্রার্থনায় নিবেদিত। সাধারণত সব ধর্মীয় আচার শেষ পর্যন্ত কৃষিকে আরও উন্নত করার উদ্দেশ্যে ছিল নিবেদিত। যে সমাজে কৃষিকাজে উন্নতিসাধন না করলে মানুষকে না খেয়ে থাকতে হতো সেখানে ধর্মীয় আচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে কৃষির উন্নতি করার চেষ্টা অবশ্যই অনুধাবনযোগ্য। তাদের দৈনন্দিন জীবনের নানান নিয়ম রীতির জন্যও অনেক দেবতা ছিল। সেই দেবদেবীদের আদর্শ অনুযায়ী তাদের জীবন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অনায়াসে কেটে যেত। ধর্মীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠান ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই সাধারণ। সে রকম একটা ব্যাপারের জন্য একজন ব্যস্ত আর ক্লান্তÍ কৃষক যতটুকু সময় ব্যয় করতে পারে ঠিক ততটুকুই করত।।                                              

এই প্রাচীন ধর্মে রাজ্যের হস্তক্ষেপে একটিই মাত্র নতুন নিয়ম সংযোজিত হয়েছিল, তা হলো রাজকীয়ভাবে সম্রাটের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা প্রদর্শন। এই সম্মান প্রদর্শনের অনুষ্ঠানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সম্রাট আর স¤্রাজ্ঞীকে তাদের মৃত্যু পরবর্তীকালের জন্য একরকম ধরাবাঁধা আন্তরিকতাবিহীন শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতি দেয়া হতো। একই অনুষ্ঠানে মৃত সম্রাট আর স¤্রাজ্ঞীকে স্বর্গীয় দেবতা হিসেবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হতো।

রোমের উচ্চ শ্রেণির মানুষেরা যখন গ্রিক সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করল, গ্রিসের প্রথাগত ধর্ম তখন যেন রোমের ধর্মের মধ্যে প্রবাহিত হতে শুরু করল। রোমের ধর্মীয় দেবতা জুপিটার আর গ্রিসের জিউস একই দেবতা। আবার রোমানদের মিনার্ভা আর গ্রিসের এথিনা একই দেবী।

যাই হোক, কাগজে কলমে গ্রিস আর রোম, দুই রাজ্যেরই ধর্মের কঠোর অনুশাসন আসলে ততদিনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রোমের উচ্চশ্রেণির মানুষেরা ধর্মীয় অনুশাসনগুলো কেবল যন্ত্রের মতো, কিছুটা উদাসীনভাবে পালন করে আসছিল।

প্রাচীন কোনো ধ্যান ধারণা এ ধরনের কোনো সমাজের জন্য উপযুক্ত নয় যেখানে কেবল সংস্কৃতিবর্জিত কৃষিজীবীরাই বাস করে না, যেখানে বাস করে অভিজাত, শিক্ষিত, শহুরে যারা পৃথিবীতে এসেছে তাদের সভ্য মন নিয়ে, সুরুচিসম্পন্ন কিছু করার জন্য।

সেই শ্রেণির আগ্রহ কেবল একটি ভালো ফলনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার থেকে অনেক বড়ো কিছুতে। তাদের ভাবনায় ছিল একটি সুখী জীবনের স্বপ্ন; চমৎকারভাবে অবসর কাটানোর, তাদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানো আর জাগতিক জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর স্বপ্ন। গ্রিকরা এই আদর্শের একটি জীবনাচরণের মাধ্যমে সুখ হাতড়ে বেড়াচ্ছিল আর রোমানরাও তাদের সাথে অলিখিতভাবে যোগ দেয়।

এক ধরনের অদ্ভুত আদর্শের প্রবক্তা ছিলেন এপিকারাস। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪১ সালে গ্রিসের সামোস দ্বীপে বাস করতেন তিনি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৬ সালে তিনি এথিনায় একটি স্কুল স্থাপন করেন। সেই স্কুল খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত ঠিক তেমনই ছিল। এপিকারাস তার আগের কিছু গ্রিক দার্শনিকের দর্শন গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী কতকগুলো ছোটো ছোটো পরমাণু দিয়ে তৈরি। এই পরমাণু বা একগুচ্ছ পরমাণুর পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের উপরেই পৃথিবীর যাবতীয় পরিবর্তন নির্ভর করে। এপিকিউরিয়ান আদর্শের এই জায়গায় পৃথিবীর যাবতীয় পরিবর্তন আর মানুষের বেড়ে ওঠার রহস্য নির্ভর করে দেবদেবীর ইচ্ছার উপরে, এই ধরনের বিশ্বাসের জন্য তেমন কোনো স্থান ছিল না। এই আদর্শটি যদিও এক ধরনের নাস্তিকতা কিন্তু এ নিয়ে তাদের কোনো গোঁড়ামি ছিল না। তারা নিজেদের খামাখা ঝামেলায় ফেলার চেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় অনুশাসনগুলো বেশ আনন্দ নিয়েই পালন করত।

এরকম একটি মহাজাগতিক অবস্থায়, যেখানে পরমাণুগুলো সবসময় এদিক সেদিকে ছোটাছুটি করছে, সেখানে মানুষ দুটো জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারে: আনন্দ এবং বেদনা। এই আবিষ্কারের কারণ ছিল মানুষকে বোঝানো যে মানুষ যেন আনন্দের পুরোটা উপভোগ করে আর বেদনাকে যতটা পারে কম মুষড়ে পড়ে। তাই এপিকারাসের মতে, কোনো কিছুর সামান্য অংশ যদি কাউকে ব্যাপক আনন্দ দিতে পারে তবে সেই একই জিনিসের প্রচুর লভ্যতা যে আরও বেশি আনন্দ দেবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। না খেতে পেয়ে উপোস থাকা যেমন কষ্টকর তেমনি অতিরিক্ত খেয়ে হজমের গ-গোল করে ফেলাও একই রকমের বেদনাদায়ক। পরিমিত খাদ্য গ্রহণের মধ্যেই খাবার খাওয়ার আনন্দ লুকিয়ে আছে। একইভাবে জীবনের আর সব আনন্দের উপকরণের ক্ষেত্রেও তাই। অন্যদিকে মানুষের নিজের মনের শান্তি মেটানোর কথা ভুললেও চলবে না। শেখার ও জানার আনন্দ, বন্ধুত্বের আবেগ, ভালোবাসার প্রশান্তি, এসবের মধ্যেই মানুষের মানসিক মুক্তি লুকিয়ে আছে। এপিকারাসের মতে শুধু শরীরের আনন্দ-উত্তেজনার চেয়ে এই সব জাগতিক আনন্দের মধ্যে ঢের বেশি লাভ।

পরবর্তী প্রজন্মের তার মতাদর্শী সব মানুষ এপিকারাসের মতোই জ্ঞানী আর ধৈর্যশীল ছিল না। কারণ শরীরের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দেয়া ছিল খুব সহজ আর সেসবের উপরে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা ছিল খুব কঠিন। যে যাই বলুক, আজ যে আরাম আয়েশ হাতের কাছে বিদ্যমান তাকে অবহেলা করার কোনো যুক্তি আছে? পরের জন্য অপেক্ষা করে থাকলে হয়ত খুব দেরি হয়ে যেতে পারে। তাই এই ‘এপিকিউরান’ শব্দটি পরবর্তীকালে ভাষায় সংযোজিত হয় ‘আভিজাত্যে অবগাহন’ করার অর্থ নিয়ে।

আলেক্সান্ডারের আমলের পরের শতাব্দীতে এই এপিকিউরিয়ান মনোভাব ইহুদি আর গ্রিকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে গেল। যেসব ইহুদিরা গ্রিক সংস্কৃতিকে ভালোবেসে নিজেদের ধর্ম বিসর্জন দিয়েছিল তাদের বলা হতো ‘এপিকিউরিয়ান’। আর আজকের দিনে কোনো অন্য ধর্মের মানুষ ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করলে তাকে বলে ‘এপিকরস’।                          

রোমানরা এপিকিউরিয়ান ধারায় বিশ্বাসী হয়ে গেল। রোম গ্রিসের চেয়ে অনেক বেশি সম্পদশালী ও শক্তিশালী ছিল। রোমের যে কোনো শহর গ্রিসের যে কোনো শহরের চেয়ে বেশি অভিজাত সাজসজ্জায় সজ্জিত ছিল। দেখতে দেখতে রোমের এপিকিউরিয়ানিজম খোদ গ্রিসের তুলনায় বিশাল হয়ে দেখা দিল। রাজ্যের ভেতরে সব জায়গায় নিজেকে যে কোনো রকম আরাম আয়েশে ডুবিয়ে দেয়ার সময়ে এপিকিউরিয়ানিজমের দোহাই দেয়া হতো।

রোমান এপিকিউরিয়ানের জলন্ত উদাহরণ হতে পারেন হেইয়াস পেট্রোনিয়াস। তিনি রোমে কনসল হিসেবে কাজ করেছিলেন। আবার এশিয়া মাইনরে বিথিনিয়ায় তিনি গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তার সারা জীবনই আভিজাত্য আর আরাম আয়েশে কাটিয়ে গেছেন। কিন্তু এভাবে জীবন কাটানোর পরেও তিনি সেই জীবনযাপন পদ্ধতিকে নানান কটাক্ষ করতেন। তার লেখা ‘স্যাটিরিকন’ বইয়ে তিনি তার বিশ্বাসের কথা লিখে গেছেন। এই বইয়ে তিনি আভিজাত্যে জীবন কাটানোকে এক ধরনের ভুল বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কৃষিকাজের উপরে নির্ভরশীল লোকেদের চেয়ে যাদের হাতে বেশি টাকা আছে, তারা আরাম আয়েশের পেছনে যে ধন দৌলত খরচ করে তা কেবলই অপচয়।

যাই হোক, তার এই নতুন তত্ত্ব এতই প্রশংশিত হলো যে এই বিষয় নিয়ে কথা উঠলে তিনি নিরোর সহচর হয়ে গেলেন। নিরো তার উপরে এই ব্যাপারে যে কোনো মতবাদ দেয়ার জন্য নির্ভর করতেন। তার সাহায্যে নিরো আরও নিত্যনতুন সময় কাটানোর খেলা আর মজার কাজকর্ম আবিষ্কার করতে লাগলেন। তাকে ডাকা হতো ‘আর্বিটার এলেগ্যানটিয়ারাম’ (রুচি আর স্বকীয়তার প্রতীক)। কখনও আবার তার নামের সাথে মিলিয়ে তাকে ‘পেট্রোনিয়াস আর্বিটার’ও বলা হতো। নিরোর অনেক বন্ধু আর অধস্থনদের মতো পেট্রোনিয়াসের শেষটাও হলো বেশ খারাপ। নিরো যখনতখন যারতার ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠতেন। পেট্রোনিয়াসকেও সন্দেহকরা শুরু করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে পেট্রোনিয়াস অন্যের হাতে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আত্মহত্যা করেন।

গ্রিক দর্শনের দ্বিতীয় বিখ্যাত স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন জিনো। (ধরে নেয়া হয় যে তিনি ফোনেশিয়ান পরিবারের।) তিনি জন্মেছিলেন আধা গ্রিক আর আধা ফোনেশিয়ান হয়ে। প্রায় এপিকিউরাসের জন্মের সময়ের কাছাকাছি সাইপ্রাস দ্বীপে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

জিনো, এপিকিউরাসের মতোই অ্যাথিনায় একটি স্কুল তৈরি করেন। বাজারের মাঝখানে এক জায়গায় তিনি তার স্কুল স্থাপন করেন। তার স্কুলের বারান্দা আর করিডোর ট্রোজান যুদ্ধের নানান দৃশ্যের আঁকা ছবি দিয়ে ভরা ছিল। একে বলা হতো ‘স্টোয়া পইকিল’ (ছবি আঁকা বারান্দা)। আর সেখানে জিনোর পড়ানোর পদ্ধতিকে বলা হতো ‘স্টয়সিজম’।

স্টয়সিজমেও একজন মাত্র দেবতার কথা বলা হয়। একেও তাই একরকমের একেশ্বরবাদ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু আরও কিছু ছোটোখাটো দেবদেবীর উপরেও যে স্বর্গীয় কিছু কিছু ক্ষমতার জন্য নির্ভরতা ছিল সেটা অবশ্য দেখা গেছে। কোনো কোনো মানুষকেও আবার দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত করার কাহিনি শোনা যায়। এভাবেই হয়ত তারা তাদের কট্টরপন্থী ধর্মীয় আচার আচরণ থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক হতে চেয়েছিলেন।

স্টয়সিজম মানুষকে দুঃখবেদনায় অহেতুক ডুবে থাকতে নিরুৎসাহিত করত। তবে বিষাদ থেকে উতরানোর জন্য ফূর্তি করে সময় কাটাতে কখনও বলে নি। কারণ মানুষ তার জন্য সঠিক আনন্দ খুঁজে পায় না; যদিওবা পায়, সেই আনন্দ কেবল মানুষের জন্য আরেকরকম ব্যথার সৃষ্টি করে। মানুষের ক্ষণস্থায়ী আনন্দ ফুরিয়ে গেলে সেই স্মৃতি নিয়ে সে কেবল হা-হুতাশ করে। ধনসম্পদ একসময় খরচ হয়ে যায়, স্বাস্থ্য নষ্ট হয় আর ভালোবাসা মরে যায়। তাই স্টয়সিজজমে উদ্বুদ্ধ স্টয়িকরা নিজেদেরকে আনন্দ ও বেদনার ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করত। নিজেদের এভাবেই তারা তৈরি করত যেন সুখ বা দুঃখের দাস না হয়ে পড়ে। সুখ-দুঃখের মোহ আর যন্ত্রণা থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। কেউ যদি কিছু আশা না করে তবে তার আশাহত হওয়ারও কোনো ভয় বা দুশ্চিন্তা থাকে না। একজন মানুষের সব ধরনের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক সে নিজে। তাই তারা মনে করত মানুষ যদি নিজের প্রভু হয় তাহলে আর অন্য কারও দাস তাকে হতে হবে না। কেউ যদি এরকম আদর্শ একটি জীবনযাপন করে তবে দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আজকের দিনে ইংরেজি ভাষায় ‘স্টইক’ শব্দটি ‘আনন্দ-বেদনার প্রতি নির্লিপ্ত’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

স্বাভাবিকভাবে এরকম একটি আদর্শ এপিকিউরিয়ানের মতো অত বেশি জনপ্রিয় হলো না। কিন্তু কিছু কিছু রোমানের কাছে মনে হলো এটা রোমের প্রাচীন ধর্ম অনুযায়ী পরিশ্রমের প্রতি সৎ হওয়া, ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া, এসবের মতোই। তারা স্টয়সিজমের আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করল। সেই ভয়ঙ্কর বিলাসে গা ভাসানোর দিনেও রোমের কিছু কিছু মানুষ স্টয়সিজমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল।

সে সময়ের রোমান স্টয়িকদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন সেনিকা (লিউসিয়াস অ্যানাউয়াস সেনিকা)। তিনি জন্মেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ৪ সালে স্পেনের করডুবা (বর্তমানে করডোভা) অঞ্চলে। তার বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী আর তরুণ সেনিকাও আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি রোমে একটি স্টয়িক স্কুলে পড়েন আর একজন সুবক্তা হিসেবে এতই পরিচিত হন যে ক্যালিগুলার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ক্যালিগুলার মৃত্যুর পরে সেনিকার সাথে ক্লডিয়াসের স্ত্রী মেসালিনার কিছু কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সম্রাট ক্লডিয়াস ৪১ খ্রিষ্টাব্দে তাকে রোম থেকে বহিষ্কার করেন। অবশ্য মেসালিনাকেও পরে মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হয়। ক্লডিয়াসের পরের স্ত্রী অ্যাগ্রিপিনা সেনিকাকে আবার সাম্রাজ্যে ডেকে নিয়ে আসেন তার ছোটো ছেলে নিরোকে পড়ানোর জন্য। সেনিকা নিরোকে স্টয়িক মতে পরিচালনা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু হায়, সেই শিক্ষা নিরোর জীবনে কোনো ছাপ ফেলতে পারে নি।

সেনিকা স্টয়িক দর্শনের উপরে প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন। গ্রিক দার্শনিক ইউরিপিডেসের অনুকরণে তিনি গ্রিসের প্রাচীন কাহিনিগুলো বহুবার লিখেছিলেন। কিন্তু পুরোপুরি স্টয়িক চিন্তাভাবনার না হয়ে সেগুলো এত বেশি আবেগে পরিপূর্ণ আর ভালোবাসায় সিক্ত ছিল যে সেগুলোকে স্টয়িক লেখা হিসেবে পরেও তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় নি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেসবই একমাত্র রোমান বিয়োগান্তক কাহিনি যা আজ এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়ছে।

তার নিজের সময়েও তিনি এত বেশি জনপ্রিয় ছিলেন যে সহজেই নিরোর বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন। নিরো তার নিজের কাজ নিয়ে খুব গর্বিত ছিরেন। রোমানরা অনেকে যেমন মনে করত যে নিরোর বেশিরভাগ লেখা আসলে সেনিকা লিখে দেন, এই ভাবনাটা নিরোকে খুব বিরক্ত করে রাখত সারাক্ষণ। কিন্তু সত্যিই তিনি নিরোর নামে কিছু লেখা লিখেছিলেন। সেনিকাকে গৃহবন্দী হতে হয়েছিল। ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তাকে নিজের বাড়িতেই নির্বাসিত করা হয়। তারপর তাকে সে অবস্থায়ই আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়।

রোমের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা এপিকিউরিয়ানিজম অথবা স্টয়সিজম, কোনো মতবাদের সাথেই নিজেদের একাত্ম করতে পারে নি বা করবে এমন আশা করা যায় নি। তাদের সম্পদের এবং অবসরের এতই অভাব ছিল যে তারা প্রকৃত এপিকিউরিয়ানস বা স্টয়িক কী করে হয়ে উঠবে তা ভাবার সুযোগ পায় নি। এছাড়া তাদের আর করারই বা কী ছিল। কারণ তাদেরকে সুখকে অবজ্ঞা করতে বলা হতো নিতান্তই হাস্যকর। যাদের জীবনে ন্যূনতম আমোদপ্রমোদ অনুপস্থিত তাদেরকে সেটা অবজ্ঞা করতে বলার কোনো মানে হয় না।

তাদের জন্য সামান্য সান্তͦনাই ছিল যথেষ্ট। একজন দরিদ্র মানুষ যতটুকু পর্যন্ত কল্পনা করতে পারে। তাদের জন্য এমন কোনো পথের কল্পনাই যথেষ্ট ছিল যে পৃথিবীর এই দুর্বিসহ জীবনের পরে, মৃত্যুপরবর্তীকালে কেবলই শান্তি অপেক্ষা করছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রিসের দুর্বোধ্য ধর্মে, যেখানে শেষকৃত্যানুষ্ঠানও সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না, কেবলমাত্র আয়োজকরাই সেখানে অংশ নিতে পারত; এমনকি যারা সেখানে অংশগ্রহণ করত তারাও ফিরে এসে সেখানে কী হলো না-হলো, সেসব কিছুই কাউকে বলতে পারত না। তাদেরতে একরকমের বোবা হয়ে যেতে হতো। এখান থেকেই তাদের ধর্মের ব্যাপারে ‘মিসটিক রিলিজিয়ন’ বা ‘আধ্যাত্মিক ধর্ম’ কথাটি প্রচলিত হয়েছে। এখনও ইংরেজিতে এই অতীন্দ্রিয়তাকে গোপন, ব্যাখ্যার অতীত বা ব্যাখ্যার অযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এই ধরনের গোপন শেষকৃত্যানুষ্ঠান, তখন যেমনই হোক, খুব আবেগ আর গাম্ভীর্যের সাথে পালিত হতো। উপস্থিত সবাই একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতো। তারা আয়োজকদের সাথে এক হয়ে মৃত্যুপরবর্তী নতুন জীবনে প্রবেশের শপথ নিত। এই কৃত্যানুষ্ঠান থেকে তারা তাদের জীবনের মহৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতো। তারা অনুভব করত যে এখানে, এই পৃথিবীতেই তাদেরকে এক হতে হবে। এক হয়ে তারা শপথ গ্রহণ করত যে মৃত্যু তাদের পৃথক করতে পারবে না। তারা নিজেদের ভেতরে বিশ্বাস আনত যে এই পৃথিবী তাদের জন্য শেষ গন্তব্য নয়, এটি একটি রাস্তা মাত্র। তাদের জন্য মৃত্যুর পরে আরও ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।

গ্রিক আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন বা অতীন্দ্রিয় ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পূজনীয় ছিল এলিউসিনিয়ান ধর্ম। এই ধর্মের কেন্দ্রে ছিল এলিউসিস। এর উৎপত্তি হয়েছিল এথিনা শহর থেকে কয়েক মাইল উত্তরপশ্চিমে। গ্রিক প্রাচীন কাহিনি ডিমিটার ও পার্সিফোনের উপর নির্ভর করে এই ধর্ম গড়ে উঠেছিল। পার্সিফোন হেউডের লুক্কায়িত রাজ্যের আড়ালে ছিল বহুদিন। আবার তাকে মানুষের সামনে তুলে ধরা হলো। এই ধর্মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই ধর্মে বিশ্বাসীরা মনে করত শরতের শস্যভরা ক্ষেতে কোনো মানুষ মারা গেলে আবার বসন্তের কোনো দিনে ফিরে আসবে। মূল কথা হলো এই ধর্ম ভীষণ সম্মানজনক পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ছিল। এই ধর্মেরই আবার আরকেটি বিভাগ ছিল ‘অর্ফিক মিস্ট্রিস’। এই ধর্মের প্রবক্তা ছিলেন অর্ফিউস, যিনি হেইডের একজন উত্তরাধিকারী। এই ধর্মের মাধমেই তিনি পরিচিত হন।

গ্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতার পতনের পরেও তাদের এই প্রাচীন ধর্মগুলো একই রকম গুরুত্ব নিয়ে পালন করা হতো। এলিউসিনিয়ান ধর্মের জনপ্রিয়তা এতই প্রবল ছিল যে খোদ সম্রাট নিরো ৬৬ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিসে সফরে এলে তিনি এই ধর্মগ্রহণ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু নিরোর সেই ইচ্ছাকে গ্রহণ করা হয় না। কারণ নিরোকে তার মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হতো। এই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ তাকে চিরদিনের জন্য সেই ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের অংশ হতে বাধা প্রদান করেছিল।

এভাবে এই আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ধর্মের প্রতি মানুষ তার শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিল। বিষয়টি ছিল, যারা এই ধর্মের নিয়মকানুন সৃষ্টি করেছে তারা কখনও কারও জন্য এই নিয়মের কাছে হার মানবে না। সে সম্রাট নিরোই হোক আর যে-ই হোক না কেন। অবশ্য অন্য সবকিছুতেও নিরোকে নিয়ে গ্রিসের মানুষেরা হাসাহাসি করত। কবিতা আবৃত্তি, সংগীত আর নাট্টাভিনয়ের বিশেষ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা তারা সবসময় করত সম্রাট নিরোর জন্য। আর সবসময় খেয়াল রাখত যে নিরো যেন সেসব প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ সম্মানের প্রাইজ পেতে পারে। ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে এগুলো ছিল নিরোর জন্য আরও বেশি সম্মান প্রদর্শন। কারণ নিরো, যে কিনা নিজেকে কখনও ব্যর্থ দেখতে সহ্য করতে পারে না, ধর্মে অংশগ্রহণের আবেদন খারিজ করাতে তার মনে ভয়ানক কোনো কষ্ট যেন না আসে।

গ্রিসের এসব আধ্যাত্মিক ধর্মই সেখানকার প্রাচীনতা আর উন্নতির চিহ্ন বহন করত। রোম সাম্রাজ্য তারপর পূর্বদিকে বর্ধিত হতে থাকে। এভাবে বাড়তে বাড়তে রোম একসময় পূর্বের আবেগী আর বেশ উৎসবের আমেজপূর্ণ ধর্মগুলোর সান্নিধ্যে আসে। সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতে আবার সেই জন্ম-মৃত্যু আর পুনর্জন্মের বিশ্বাস আছে। দেখেলে মনে হতো গ্রিসের আধ্যাত্মিক ধর্মের সেই এক ঋতুতে মৃত্যুবরণ করে আরেক ঋতুতে জেগে ওঠার বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত।

এশিয়া মাইনরের দিকে সাইবেল নামে দেবতার আরাধনা তখন খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল। একে অনেকাংশে গ্রিক ডেমিটারের মতো লাগত। সাইবেলের আরাধনার আধিপত্য একসময় গ্রিস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০৪ সালে রোমানরা যখন ক্যাথাজিনিয়ান সেনাপ্রধান হানিবেলের বিপক্ষে তাদের দীর্ঘযুদ্ধ লড়ছে, তখন তারাও সাইবেলের কাছে প্রার্থনা করত। স্বর্গ থেকে সাইবেলের হাত দিয়ে পৃথিবীতে গড়িয়ে পড়া একটি পবিত্র পাথর এশিয়া মাইনর থেকে রোমে বিশেষ উৎসবের মধ্যে দিয়ে বয়ে আনা হয়। প্রথম দিকে এই কথিত পবিত্র পাথর, তার সাথে উপস্থিত একগাদা ধর্মযাজক আর তাদের জড়িয়ে নানান উৎসবে রোমানরা একটিু বিব্রতবোধ করে। কিন্তু শুরুর দিকের বছরগুলোতে সাইবেলের পূজা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল।

মিশরীয় দেবত্ববাদও একসময় রোমে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। গ্রিস সভ্যতার সময়ে মিশরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেব আর দেবী ছিল অসিরিস আর আইসিস। অসিরিস দেবতা একবার মৃত্যুবরণ করে আবার পুনর্জন্ম লাভ করেন। তিনি নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে একটি পবিত্র ষাঁড় এপিসের মাধ্যমে আবার পুণর্জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রিকদের কাছে অসিরিস-এপিস দেবতার নাম হলো ‘সেরাপিস’। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ সালে গ্রিসে সেরাপিসের পূজা খুব জনপ্রিয় হয়ে যায়। এক শতাব্দী পরে এই পুজার নিয়ম রোমে প্রবেশ করা শুরু করল। অগাস্টাস প্রাচীনপন্থী ছিলেন বলে এই পূজা বন্ধ করার আদেশ দিলেন। কিন্তু পরে ক্যালিগুলা একে উৎসাহ দান করেন।

ডিমিটার, সাইবেল আর আইসিসের মতো দেবীরা বিশেষ করে মহিলাদের কাছে ছাড়াও বাকি সকলের কাছেও বেশ সমাদৃত ছিল, যারা ভালোবাসা আর সহমর্মিতার প্রতি দুর্বল। দেবতারা বেশিরভাগই ছিল যুদ্ধ আর রোষের। আর তাই যুদ্ধরত সৈন্যেরা করত দেবতার আরাধনা।

রোমান সাম্রাজ্যের পুর্বদিক থেকে, পারথিয়া অথবা পার্সিয়া (পারস্য) থেকে মিথরাস নামে এক স্বর্গীয় দেবতার আবির্ভাব হলো। মিথরাস সূর্যের দেবতা ছিল। তার ছবিতে সবসময় দেখা যেত যে তিনি একটি ষাঁড়কে ছুরিবিদ্ধ করছেন। ছবিতে তিনি ছিলেন পূর্ণ তরুণ। আর তাই তার অনুসারীরা ষাঁড় বধ করে তার পূজার ব্যবস্থা করত। মহিলারা এই পূজায় অংশগ্রহণ করত না। কারণ মিথারাস ছিল শক্তি আর বীর্যের প্রতীক। মিথরাসের পূজা বেশিরভাগ করত সৈন্যেরা। টিবারিয়াসের শাসনামলে প্রথম রোমে মিথরাসের আগমন ঘটে।        

খ্রিষ্টধর্ম

সেই যে ইহুদি রাজ্যে যে নতুন ধর্মটির প্রবর্তন হয়েছিল তার কথা এখনও বলা হয়নি। প্রথম ধর্মটি ছিল ইহুদি ধর্ম যেটি ইহুদি রাজ্য জুডিয়া থেকে ইহুদিদের মাধ্যমেই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইহুদিরা রাজ্যের বিভিন্ন দিকে, বিশেষ করে পূর্বদিকে গিয়ে থাকা শুরু করল। রোমের ভেতরেও তাদের বিশাল এক কলোনি গড়ে তুলেছিল।

একসময় এমন হলো যে জুডিয়ার বাইরে অবস্থানরত ইহুদিদের সংখ্যাই জুডিয়ার চেয়ে বেড়ে গেল। তারা একসময় হিব্রু ভাষা ভুলে গিয়ে গ্রিক শেখা শুরু করল, কিন্তু তাই বলে তাদের ধর্ম ভুলে গেল না। তাদের পবিত্র বই বাইবেল গ্রিক ভাষায় অনুদিত হয়েছিল যেন তারা তা পড়তে পারে। কারণ খ্রীষ্টপূর্ব ২৭০ সালে এমন অনেক ইহুদি ছিল যারা তখন আর প্রাচীন হিব্রু ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারত না। 

সে সময়ে এমনও ইহুদি ছিল যারা গ্রিক ভাষায় নিজেদের শিক্ষিত করে তুলেছিল কারণ যেন নিজেদের ধর্ম নিয়ে গ্রিকে তর্ক করতে পারে। তখন রোম অথবা গ্রিসে গ্রিকে কথা বলাই ছিল স্বাভাবিক। গ্রিক ভাষায় শিক্ষিত ইহুদিদের মধ্যে অসাধারণ ছিলেন ফিলো জুডাইয়াস (ফিলো দ্য জিউ)। ফিলো জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টপূর্ব ২০ সালে আলেক্সান্দ্রিয়ায়। পূর্ণবয়সে তিনি রোমে আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। ক্যালিগুলার সাথে ইহুদিদের সমস্যা সমাধানই ছিল সেই আবেদনের উদ্দেশ্য।

স্বাধীন রাষ্ট্র থাকার শেষের দিকে আর সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যাওয়ার প্রথম দিকে রোমের অনেক অধিবাসীদের মধ্যেও ইহুদি ধর্ম কিছু পরিবর্তন এনেছিল। এমনকি সমাজের উঁচু অবস্থানে আছেন এমন অনেকেও ইহুদি ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

ইহুদি ধর্ম যদি তাদের গোঁড়া মনোভাব থেকে কিছুটা ছাড় দিত তবে তা আরও দ্রুত ছড়িয়ে যেত। অন্যান্য ধর্মেও নানান ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ছিল কিন্তু তাদের অনুসারীদের কখনও সম্রাটের ধর্মীয় বন্দনায় অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয় নি। ইহুদিরা তাদের অনুসারীদের নিশ্চিত করত যে তারা সমাজের অন্যান্য ধর্মের সবচেয়ে নির্দোষ কোনো অনুষ্ঠানেও যেন যোগদান না করে। সুতরাং রোমানদের মধ্যে কেউ যদি ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করতে চাইত তবে তাকে রাষ্ট্রের মূল ধর্ম প্রত্যাহার করতে হতো। তারা বস্তুত সমাজ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতো আর অনেক সময় ভয়াবহ রাজনৈতিক প্রতারণা করার দায়ে শাস্তি পেত।

এত কিছুর পরে ইহুদিদের ধর্মপালন এতই কঠিন ছিল যে যদি কেউ ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তার ভেতরে থেকে শিক্ষা নিতে থাকে তো তার পক্ষেই কেবল তা সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব। গ্রিক সভ্যতায় লালিত হয়ে এই ধর্মের কিছু অংশ পালন করা কারও জন্য খুব অযৌক্তিক আর বিব্রতকর হতে পারে। তারপর আবার কেউ যদি ইহুদি হতে চাইত তো তাকে খৎনা করার ব্যথাটা সহ্য করতে হতো। শেষ পর্যন্ত ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় কার্যালয় হিসেবে জুডিয়াই টিকে রইল। বিষয়টি এমন ছিল যে জেরুজালেমের মন্দিরই সেই কেন্দ্র যেখানে তাদের বিধাতাকে পাওয়া যাবে।

জুডিয়ায় ভয়াবহ বিদ্রোহ হওয়াতে ইহুদিরা, যারা ধর্মান্তরিত হতে চেয়েছিল তা আর হতে পারল না। ইহুদিরা তখন রোমের বড়ো শত্রু হয়ে উঠল। পুরো রাজ্যের মধ্যে তারা তাদের জনপ্রিয়তা হারাল।

যাই হোক ইহুদি ধর্ম ততদিনে আর একটি মাত্র অভিন্ন ধর্ম নেই। সেখানে নানান দলাদলি হয়ে গেছে। কিছু কিছু দল আবার রোমেরই অন্যান্য ধর্মের মতো কাজকর্ম করতে শুরু করে দিয়েছে।

এদের মধ্যে একটি দল যিশুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গেল। যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার পরে মনে হয়েছিল যে তার অনুসারীরা তখনই যিশুর আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসবে। অন্তত তার মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের কাছে এটুকু প্রমাণিত হবে যে তিনি কোনো মাসিহাজাতীয় কিছু ছিলেন না। সে জন্যেই এত সহজে মৃত্যুবরণ করেছেন। যাই হোক, ক্রুশে বিদ্ধ হওয়ার তিন দিন পরে তাকে আবার দেখা গেছে বলে একটি গল্প চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েছিল। ধরে নেয়া হয়েছিল যে তিনি মৃত্যুর পরে আবার ফিরে এসেছেন। তিনি আসলে কোনো সাধারণ মানব মাসিহা ছিলেন না, তিনি স্বয়ং রাজা যিনি ইহুদি রাজ্যে আবার শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। তিনি ছিলেন একজন স্বর্গীয় মাসিহা, ঈশ্বরের পুত্র। তার রাজ্য ছিল স্বর্গে আর তিনি শিগগির সেখানেই আবার ফেরত যাবেন (যদিও কেউ জানত না কবে)।তিনি সেখানে ফিরে যাবেন মানুষের পার্থিব জীবনের হিসাবনিকাশ করতে আর বিধাতার রাজ্যে নিজেকে আবার অধিষ্ঠিত করতে।

খ্রিষ্টানরা (এভাবেই যিশুর আদর্শে অনুপ্রাণিত মানুষ আর অনুসারীদের ডাকা হতো) প্রাথমিকভাবে ইহুদি ধর্মে আর আচার আচরণেই বিশ্বাসী থাকল তারপর ধীরে ধীরে তারা সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলো।

এদের মধ্যে অনেক ইহুদি ছিল যারা জুডিয়ার জাতীয়তাবাদে তীব্রভাবে বিশ্বাসী ছিল। যে মাসিহা তার অনুসারীদের কষ্টভোগের জন্য রেখে গিয়ে নিজে মৃত্যুবরণ করেন এমন কোনো নেতা তারা চায় নি। তারা চেয়েছিল সাহসী, বীর কোনো মাসিহা যিনি কিনা রোমের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবে। সুতরাং এটাও রোমের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে জেগে ওঠার পেছনে এক ধরনের অনুপ্রেরণা ছিল।

এই বিদ্রোহের ঘটনায় খ্রিষ্টানরা অংশগ্রহণ করে নি। তারা তাদের মনমতো মাসিহা ততদিনে পেয়ে গেছে। তারা মনে করত, রোম রাজ্য আর কতদিন টিকবে? আর ইহজাগতিক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রবর্তনের ব্যাপারে ঈশ্বরের যে পরিকল্পনার গল্প তারা শুনেছে তা ততদিনে মিথ্যে হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। খ্রিষ্টানদের ধর্ম ছিল আক্রমণবর্জিত। শত্রুকেও ভালোবাসতে শেখানো হতো। কেউ এক গালে আঘাত করলে তাকে আরেকটা গাল পেতে দেয়াই ছিল তাদের শিক্ষা। তাই সিজারের বিরুদ্ধে বা সিজারের অধীন কোনো মানুষের বিরুদ্ধে লড়ার কোনো তাগিদ তারা বোধ করে নি। এই ধরনের মনোভাব তাদের ইহুদি বিদ্রোহে অংশগ্রহণে বাধা দেয়।

ইহুদি রাজ্যে বসবাস করে, নিজেদের স্বার্থে রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ না করার দায়ে তাদেরকে সবাই আলাদা চোখে দেখে। বিদ্রোহের পরে বেঁচে থাকা ইহুদিদের মাঝে তারা ব্যাপকহারে তাদের জনপ্রিয়তা হারায়। তাই সেসব ইহুদিদের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম আর ছড়িয়ে যেতে পারে না। সর্বোচ্চ সম্ভব চাপ দেয়া সত্ত্বেও, ইহুদিদের মধ্যে একজনও আজ পর্যন্ত যিশুকে তাদের মাসিহা হিসেবে মেনে নেয় নি।

কিন্তু ইহুদিদের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার হচ্ছে না বলে যে আর কোথাও হয়নি, তা নয়। ধর্মের এই প্রসারের জন্য খ্রিষ্টানরা একজন প্রগতিশীল ইহুদির কাছেই ঋণী, যার নাম সাওল। ইহুদি রাজ্য ছাড়া বাইরে তিনি সাওল নামেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু রোমান উচ্চারণে তাকে বলা হতো পল।

এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ সমুদ্রতীর ঘেঁষে টারসাস নামের এক শহরে পল জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন রোমান নাগরিক। তাই জন্মসূত্রে তিনিও রোমান নাগরিক হয়ে যান। তিনি জেরুজালেমে ইহুদি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। আর তাই তিনি হয়ে ওঠেন গোঁড়া ইহুদি। তিনি এতটাই গোঁড়া ছিলেন যে প্রথম প্রথম যখন খ্রিষ্টানরা জেরুজালেমে তাদের ধর্ম প্রচার শুরু করেছিল তিনি তাদের ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ব্যস্ত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে উঠতি খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি ছিলেন প্রগতিশীলদের নেতা। খ্রিষ্টানবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি দামাস্কাসে আন্দোলনের কার্যকলাপে অংশ নিতে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, দামাস্কাসের পথে যিশুর ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তিনি সবকিছু যিশুর চোখ দিয়ে দেখা শুরু করেন। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে তিনি হয়ে যান একজন অতি ভক্ত খ্রিষ্টান।

ইহুদি ধর্মের বাইরে অন্যান্য মানুষকে পল প্রাণপণে খ্রিষ্টান ধর্ম শিক্ষা দিয়ে যেতে থাকেন। শিক্ষা দান করতে করতে তিনি অনুভব করেন যে ইহুদি ধর্মের অন্তর্নিহিত জটিল নিয়মকানুনগুলো ধার্মিক থাকার জন্য জরুরি নয়। বরং অনেক বাড়তি নিয়মনীতি মানতে গিয়ে মানুষ এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে ধর্মের মূল বিষয়টি থেকে সরে যায়। (বাইবেলের ভাষায় ‘ফর দ্য লেটার কিলেথ বাট দ্য স্পিরিট গিভেথ লাইফ’।)

খ্রিষ্টান হতে চাইলে একজন অন্য ধর্মের মানুষকে নতুন করে খৎনা করতে হতো না। আবার ইহুদিদের ধর্মের কঠোর অনুশাসন অনুযায়ী নানান নিয়মের আওতায়ও আসতে হতো না। এমনকি নিজের স্বকীয়তা ইহুদি রাজ্যের জাতীয়তাবাদের কাছে বিকিয়ে দিতে হতো না। এমনকি জেরুজালেমের মন্দিরের কাছে দায়বদ্ধ হওয়ারও মতোও কোনো ব্যপার ছিল না।

প্রায় হঠাৎ করেই খ্রিষ্টান ধর্ম এশিয়া মাইনর আর গ্রিসের সব শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এমনকি খোদ ইতালিতেও এই ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। যিশুর ক্রুশে বিদ্ধ হওয়া আর পুনরুজ্জীবিত হয়ে ফিরে আসা, এই পুরো বিষয়টি জড়িয়ে যাবতীয় কাহিনি আধ্যাত্মিক ধর্মটিকে বারবার আরও বেশি স্মৃতিবহ এবং ইঙ্গিতপূর্ণ করে তুলেছে। যিশুর মা মেরির মোলায়েম মুখ এই ধর্মকে দিয়েছে আরও কোমলতা। ভেতরের নির্দিষ্ট ভাবধারাটি অনেকটা স্টয়িক আদর্শের সাথে মিলে যায়। মানুষের মনে হলো, এই ধর্ম এমন, যে তৈরি হয়েছে সবাইকে একটু শান্তি দেবার জন্য।

এটা তো সত্যি যে, ইহুদি ধর্মে নিয়মকানুন নিয়ে যত কড়াকড়ি, খ্রিষ্টান ধর্মে তা কখনই ছিল না। খ্রিষ্টান ধর্ম ইহুদিদের সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষদের মধ্যেই বেশি করে ছড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যারা এই ধর্মগ্রহণ করেছিল তারা বেশিরভাগ পৃথিবীর জনপ্রিয় ধর্মগুলোর কোনোটাই অনুসরণ করত না (পেইগান কাস্টমস)।গ্রিক সভ্যতায় অভ্যস্ত অনেক মানুষও এই ধর্মগ্রহণ করেছিল।

যেমন ধরা যাক মিথরেইজম ছিল খ্রিষ্টান ধর্মের সবচেয়ে বড়ো প্রতিযোগী ধর্ম। কয়েকশ’ বছরব্যাপী তারা ডিসেম্বরের ২৫ তারিখে তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পালন করছিল। মিথরেইজম এক ধরনের সূর্য উপাসনাকারী ধর্ম। আর ডিসেম্বরেরর ২৫ তারিখে সূর্য নিরক্ষরেখার থেকে দূরবর্তী অবস্থানে চলে যায় বলে সেই দক্ষিণায়নের সময়ে তারা তাদের উৎসব পালন করত। দুপুরবেলা সূর্য নামতে নামতে দক্ষিণের শেষ প্রান্তে চলে যায় আর তারপর ধীরে ধীরে আবার উত্তর দিকে হেলতে থাকে। একেই মনে করা হতো সূর্যের পুনর্জন্ম। এটাই যেন তাদের নিশ্চয়তা দিত যে এই প্রবল শীত মিলিয়ে যাবে আর সূর্য আবার নতুন বসন্তের দিন সাথে নিয়ে আসবে। সেই বসন্ত তাদের কাছে হবে নতুন জীবনের পরিচায়ক। বছরের এই সময়টা অন্য অনেক ধর্মের লোকেরাও পালন করত। প্রাচীন রোমের মানুষেরা এই সময় কৃষির দেবতাকে স্মরণ করত। দেবতার নাম ছিল স্যাটার্ন আর উৎসবটির নাম হরো স্যাটার্নালিয়া। স্যাটার্নালিয়া ছিল পুরুষদের (এমনকি দাসেরাও সেই সময়ে সাময়িকভাবে একই আসনে বসার সুযোগ পেত) মনোবলের প্রতীক। এই উৎসবে তারা ভোজন আর উপহার বিতরণে ব্যস্ত থাকত।          

খ্রিষ্টানরা ঋতুর উপরে নির্ভর করে সূর্যের এই পুনর্জন্মকে অবজ্ঞা করতে পারল না। এর বিরুদ্ধে কোনো উচ্চারণ না করে তারা একে গ্রহণ করল। এই নতুন উৎসবের কাছে তারা আবেগী হার মানল। বাইবেলে যেহেতু নির্দিষ্ট করে বলা হয় নি, তাই তারা এমনিতেও জানত না যে যিশু কোনদিন জন্মেছিল। তারা ধরে নিলো যে ২৫শে ডিসেম্বর যিশুর জন্ম হয়েছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তারা বড়োদিন হিসেবে তা পালন করছে। আর তাই তখন থেকেই খ্রিষ্টমাস পালনের আচারের মধ্যে একটা স্যাটার্নাল প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

রোমানদের কাছে অন্তত যিশুর জন্মের অর্ধশতাব্দী পরেও খ্রিষ্টান ধর্ম ইহুদি ধর্মের একটি শাখামাত্র বলে মনে হতো। আসলে তারা এই বিশেষ শাখাটির উপরে একটু বিরক্তই ছিল যেহেতু এই ধর্মে প্রবেশ করার একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।

যেহেতু খ্রিষ্টানরা রোমের প্রকৃত দেবতাদের আরাধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিত না তাই তাদেরকে নাস্তিক মনে করা হতো। যেহেতু রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানে তারা অংশগ্রহণ করছে না তাই তাদেরকে মনে করা হতো রোমানদের জন্য বিপজ্জনক আর পরিত্যাজ্য। তখনকার দিনে রোমানদের মনোভাব খ্রিষ্টানদের প্রতি এমন উগ্র ছিল ঠিক যেমন আমেরিকানদের কমিউনিস্টদের প্রতি।

৬৪ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এই রেষারেষি এমন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যে রোমে ভয়ানক গ-গোল লেগে গেল। ছয়দিনব্যাপী চলতে থাকা সেই হানাহানিতে রোম শহর প্রায় ধ্বংস হতে বসল। এরকম একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার সূত্রপাত যে কী করে হলো তা আর কারও বুঝতে বাকি রইল না। রোমের দরিদ্র মানুষেরা দুর্বল কতকগুলো ভাঙাচোরা কাঠের তৈরি পাঁচিল বানিয়ে নিজেদের নিরাপদে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু তখনকার দিনে আজকের মতো আগুন প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, আবিষ্কারও হয় নি। তখন শহরের এক জায়গায় আগুন লাগলে দেখতে দেখতে পুরো শহর অনায়াসে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। নিরো ক্ষমতায় আসার আগে আর পরে শহরে বেশ কয়েকবার আগুন লেগেছিল। কিন্তু সেবারের ৬৪ খ্রিষ্টাব্দের এই আগুনের ক্ষয়ক্ষতি ছিল ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য।                

শহরে যখন আগুন লাগল, সম্রাট নিরো তখন ছিলেন রোমের দক্ষিণে তিরিশ মাইল দূরে অ্যান্টিয়াম সমুদ্র বন্দরে (বর্তমানে অ্যানজিও)।রোমে আগুন লাগার খবর যখন নিরোর কাছে পৌঁছল তখন তিনি আগুন প্রতিহত করার জন্য যতরকম ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব তা করতে লাগলেন। যারা ততক্ষণে গৃহহীন হয়ে পড়েছে তাদেরকে সাময়িকভাবে নতুন জায়গায় ঠাঁই দিলেন।

প্রকৃতপক্ষে লোকদেখানো চাকচিক্য প্রদর্শন করার নেশা একসময় তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। হতবুদ্ধি হয়ে দিগন্ত রেখায় আগুনের হলকার দিকে তিনি তন্ময় হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। চারদিকে আগুনের আগ্রাসন দেখে তার পুড়তে থাকা ট্রয়ের কথা মনে পড়েছিল। তিনি তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র (লাইর) হাতে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ট্রয়ের আগুনের সামনে গাওয়া সেই গান গাওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত করতে পারেন নি। এই দৃশ্য আজও মানুষ কথায় কথায় মনে করে যে রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বেহালা (যদিও তার পরের কয়েক শতাব্দীতেও বেহালা আবিষ্কার হয় নি) বাজাচ্ছিলেন।

যে কারণে আগুন লেগেছিল, তাকে প্রতিহত করতে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলো। ধ্বংসের প্রাথমিক ভয়াবহতা কাটিয়ে ওঠা গেলে, বাসস্থানগুলো নতুন করে তৈরি করা শুরু হলো। এবারে ইমারতগুলোর উচ্চতা আরও বাড়িয়ে নেয়া হলো আর নিচের তলাগুলোতে আগুন যেন না ধরে সেরকম অদাহ্য পদার্থের ব্যবহার শুরু হলো। এটা রোমকে নতুন করে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে ঢেলে সাজানোর একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কিন্তু মালিকেরা আগের মতো করে যার যা ছিল তেমনই আবার বানাতে লাগলেন। সুতরাং রোম আবারও সেই আগের মতোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠল।

শুধু সম্রাট নিরো নিজের জন্য একটি নতুন ইটে মোড়ানো কংক্রিটের তৈরি চাকচিক্যময় প্রাসাদ বানানোর সুযোগ লুফে নিলেন। আগুন প্রতিরোধকারী পদার্থের তৈরি শক্তপোক্ত প্রাসাদটি পরবর্তীকালে যারা অনুকরণ করতে সমর্থ ছিল তাদের জন্য একটি আদর্শ ইমারত হয়ে উঠেছিল।

রোমের মানুষেরা মনে করেছিল যে নিরো নিজেই শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। হয়ত শহরে তার শত্রু বেড়ে যাওয়ার খবর শুনে দিশেহারা হয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নিরো বুদ্ধি খাটিয়ে তখন এই দোষটা খ্রিষ্টানদের উপরে চাপিয়ে দিলো। মানুষের রোষ আগে থেকে এমনিতেই তাদের দিকে ছিল। তাই এভাবেই প্রথম তাদের আনুষ্ঠানিক বিচার আচার শুরু হলো।

তাদের একে একে হত্যা করা হলো। তাদের কাউকে কাউকে নিরস্ত্র অবস্থায় সিংহের খাঁচায় ঠেলে দেয়া হলো। অন্যদের জন্যও নানান ভয়ঙ্কর মৃত্যু নিশ্চিত করা হলো। খ্রিষ্টানদের নিয়ম অনুযায়ী তাদের নেতা পল তখন রোমেই ছিলেন। আরেক নেতা পিটারও ছিলেন। অনুসারীরাও প্রায় সবাই সেখানে ছিলেন। (পিটারকে রোমের প্রথম বিশপ হিসেবে নির্বাচন করা হয় তাই তিনিই রোমের প্রথম পোপ ঘোষিত হন।) পল এবং পিটার দুজনকেই ধর্মের কারণে ভয়ানক মৃত্যুবরণ করতে হয়।

তাদের দুজনের জন্য বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থা এত কঠোর হয়েছিল যে এমনকি খ্রিষ্টান নয় এমন মানুষও তাদের জন্য প্রার্থনা করেছিল। রোমের সাধারণ মানুষদের পক্ষ থেকে তাদের শাস্তি মওকুফের আবেদন উচ্চারিত হয়েছিল। এই ধরনের ভয়াবহ পরিণতি পরবর্তীকালে খ্রিষ্টান ধর্মের জন্য কুফলের বদলে সুফল বয়ে আনে। এই ঘটনার সূত্র ধরেই খ্রিষ্টান ধর্মের ব্যাপক প্রসার অরম্ভ হয়।

নিরোর সমাপ্তি

পূর্বের সব সম্রাটের মতোই নিরোও রোমের অভিজাত শ্রেণিকে সন্দেহ করতেন আর ভয়ও পেতেন। তিনি সবসময়ই ভয় পেতেন যে সিনেটররা রোমের আগের সমৃদ্ধ দিনগুলোর সাথে তুলনা করে তার আমলের সমালোচনা করবে। তাই তিনি সবসময় তাদের প্রতি কড়া নজর রাখতেন আর তাদের গতিবিধি সতর্কভাবে অনুসরণ করতেন। নিরোর শত্রুতামূলক আচরণই সিনেটের সদস্যদের বারবার বর্তমানের বিশ্রী সময়ের চাপে অতীতের গৌরবময় সময়ের স্মৃতিচারণে বাধ্য করত। এক পর্যায়ে তারা সম্রাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করতে বাধ্য হলো।

৬৫ খ্রিষ্টাব্দে সত্যি সত্যি নিরোর বিরুদ্ধে একটি গোপন ষড়যন্ত্র দাঁড়িয়ে গেল। সিনেটের সদস্যরা নিরোকে সরিয়ে দিয়ে সে জায়গায় সিনেটর গেইয়াস ক্যালপুর্নিয়াস পিসোকে বসানোর জন্য পায়তারা শুরু করল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ষড়যন্ত্রকারীরা কাজের সুফল দেখতে পেল না। ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হওয়ার আগেই একজনের মাধ্যমে সংবাদটি নিরোর কানে পৌঁছে গেল। সেনিকা এবং পেট্রোনিয়াসকে সে সময় ষড়যন্ত্রের দায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হলো। তার কিছুদিন পরে পার্থিয়ানদের বিরুদ্ধে জয়লাভকারী সেনাপ্রধান করবুলুকেও আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনাবসান করতে হলো।

করবুলুর হত্যাকা- হয়তবা সেনাবাহিনী কিংবা সেনাপ্রধানদের মধ্যে তেমন কোনো ছাপ ফেলত না। দু-চারজন সিনেটর আর অভিজাত লোকের মৃত্যুও হয়ত তেমন কোনো বড়ো বিষয় হতো না। কিন্তু যখন একে একে অনেক সেনাপ্রধান আর সিনেটর মারা পড়তে লাগল তখন বিষয়টি খুব জটিল হয়ে পড়ল।

অন্যদিকে তখন জুডিয়ায় ইহুদিদের বিদ্রোহ রোমের আবহাওয়া আরও ভারি করে তুলেছিল। কয়েকজন দুর্গত ইহুদি কৃষক রোমান সেনাবাহিনীর মূল অংশকে অকার্যকর করতে সমর্থ হয়েছিল। দেখেশুনে মনে হচ্ছিল এসব অরাজকতার জন্য তখন সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়াই সবচেয়ে সহজ। এটা আরও সহজ হয়েছিল যখন একদিকে সৈন্যেরা ক্রমাগত মৃত্যুবরণ করছে আর আরেকদিকে নিরো সেসব উপেক্ষা করে গ্রিসে গেছেন সম্রাট হিসেবে নিজের বন্দনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। (তখনই যেন সেই ‘রোম পুড়ছে আর নিরো বেহালা বাজাচ্ছে’ কথার যথার্থ প্রয়োগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল।) সেই সময় গ্রিসে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নিরোর পরাজয়ও ছিল খুব লজ্জাজনক। যারা তখনও মনে করতেন যে রোমের সম্রাটকে হতে হবে একজন বিজয়ী যোদ্ধা, কোনোমতেই কেবল একজন অভিনেতা বা শিল্পী নয়, তারা খুব হতাশ হয়েছিল।  

বিভিন্ন জায়গায় কার্যরত বড়ো বড়ো সেনাবাহিনীরা বিদ্রোহ শুরু করল। তারা তাদের নিজ নিজ সেনাপ্রধানকে সম্রাটের আসনে বসাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। ৬৮ সালে (রোমান ৮২১ সাল) নিরো তাড়াহুড়ো করে ইতালিতে ফিরে আসেন। কিন্তু ততদিনে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। স্পেনে অবস্থানকারী সৈন্যবাহিনী তাদের সেনাপ্রধান সার্ভিয়াস গালবাকে সম্রাট বানাতে বদ্ধপরিকর হয়ে গিয়েছিল। প্রিতোরিয়ান গার্ডেরা তাকে সম্রাট হিসেবে মেনে নিলো আর নিরোকে দেশের শত্রু ঘোষণা দিয়ে দিলো।

নিরোর সামনে তখন বিচারের সম্মুখীন হওয়া আর নিজেকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার পরে নিরো শেষপর্যন্ত নিজেকে ধারাল তলোয়ারে বিদ্ধ করেন। তলোয়ারের ফলা শরীরে প্রবেশের পরপর নিরো চিৎকার করে বলছিলেন (প্রচলিত কাহিনি অনুসারে), ‘তোমরা দেখ, আমার ভেতরে কী ভীষণ এক শিল্পীর মৃত্যু হলো!’ মৃত্যুর সময়ে তার বয়স ছিল মাত্র একত্রিশ।

নিরোই ছিলেন শেষ সম্রাট যিনি অগাস্টাসের বংশধর। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ সাল থেকে যদি আমরা ধরি, তাহলে দেখা যায়, জুলিয়াস সিজার যখন পম্পিকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তারপর থেকে ওই জুলিও ক্লডিয়ান পরিবার রোমকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শাসন করেছিল। এই বংশটি একজন স্বৈরশাসকসহ পাঁচ পাঁচজন সম্রাট দিতে পেরেছিল রোমকে।

নিরোর মৃত্যু জুলিও ক্লডিয়ান পরিবারের আধিপত্য পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে নি। তার পরে প্রায় ডজনখানেক সম্রাট এসেছিলেন যাদের শরীরে এক বিন্দুও সিজার বা অগাস্টাসের পারিবারিক রক্ত ছিল না কিন্তু তারা প্রত্যেকে সজ্ঞানে জুলিও ক্লডিয়ান পরিবারের পারিবারিক নাম গ্রহণ করেছিলেন।

পরবর্তীকালে ‘সিজার’ শব্দটি ‘সম্রাট’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। আধুনিক যুগে জার্মানি, অস্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির সম্রাটদের ‘কেইসার’ বলে ডাকা হতো। এটা আসলে জার্মান ভাষায় (আর সঠিক উচ্চারণে) ল্যাটিন ‘সিজার’।রুশ শব্দ ‘টিজার’ (Tsar) আর ‘সিজার’ (Czar), দুটোই এসেছে ল্যাটিন ‘সিজার’ থেকে। ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে বুলগেরিয়ার শাসক ছিলেন টিজার সেমিওন-২ আর ১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়ায় একজন বৃটিশ সম্রাট ছিলেন যার নামের উপাধি ছিল ‘কেইসার-ই-হিন্দ’ (Keisar-e-Hind)। সুতরাং জুলিয়াস সিজারকে বন্দী করে হত্যা করার পরে আরও দুই হাজার বছর ব্যাপী পৃথিবীতে শাসক শ্রেণির মধ্যে তার নাম সম্মানের সাথে টিকেছিল।

          

          

 

 

 

Facebook Twitter Email