লজ্জাবতী লতা : রাজেন্দ্র সিং বেদী

Facebook Twitter Email

অনুবাদ : জাফর আলম

 রাজেন্দ্র সিং বেদী

উর্দু সাহিত্যের শক্তিধর কথাশিল্পী রাজেন্দ্র সিং বেদীর জন্ম ১৯১৫ সালে লাহোরে। দেশ বিভাগের পর বেদী দিল্লি চলে আসেন। দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকরি করেন। পরে মুম্বাই-এ সিনেমার জন্য কাহিনি রচনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। অবশ্য ডাক বিভাগের কেরানী হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর প্রযোজিত ছবি ‘দস্তক’ শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে ভারতীয় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৬৫ সালে তিনি তার বিখ্যাত উর্দু উপন্যাস ‘এক চাদর ময়লী সী’ (ময়লা চাদর)-এর জন্য সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পান। ১৯৮৪ সালে তিনি মুম্বাই-এ পরলোক গমন করেন।

‘লাজবন্তি’ (লজ্জাবতী লতা) বেদীর ৪৭ এর দাঙ্গা নিয়ে লেখা বিখ্যাত উর্দু গল্প। গল্পটি বেদীর উর্দু গল্প সংকলন ‘বেদীকে বেহতরীন আফসানে’ (বেদীর শ্রেষ্ঠ গল্প) থেকে নেয়া হয়েছে।

 

[ এটি একটি ছোট্ট লজ্জাবতী চারা, হাত লাগালেই সংকুচিত হয়- পাঞ্জাবি লোকগীতি ]

 

দেশ ভাগ হলো। আর আহত হলো অগণিত লোক। সকলে উঠে শরীর থেকে রক্ত মুছে ফেলে। আর সকলে মিলে একজনের দিকে ছুটে যায়, যার দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু হৃদয় আহত। মহল্লা মহল্লায় গলিতে গলিতে ‘আবার পূনর্বাসন’ সম্পর্কিত কমিটি গঠিত হয়েছে। প্রথম দিকে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যে পূনর্বাসন, জমিতে পুনর্বাসন, আর বাড়ি ঘরে পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু করা হয়। তবে একটি কর্মসূচি ছিল যার প্রতি কারও তেমন মনযোগ ছিলনা। তা হলো অপহৃত মহিলাদের উদ্ধার কর্মসূচি। এর স্লোগান ছিল ‘হৃদয়ে পুনর্বাসন’। কিন্তু এই কর্মসূচির ব্যাপারে নারায়ন বাওয়ার মন্দির এবং আশে পাশে বসবাসকারী প্রাচীনপন্থী গোত্রের লোকজন প্রচ- বিরোধিতা করে।

 

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্দিরের পাশের মহল্লা ‘মোল্লা শুকুর’ এ একটি কমিটি গঠিত হয়। এগারো ভোটে সুন্দর লাল বাবুকে সম্পাদক এবং উকিল সাহেবকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। কালান থানার বৃদ্ধ কেরানী এবং মহল্লার অন্যান্য মাতব্বর লোকদের ধারণা, সুন্দর লাল ছাড়া এই দায়িত্ব অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অন্য কেউ সম্পাদন করতে পারবেনা। কারণ সুন্দর লালের স্ত্রী অপহৃত হয়েছে আর তার নাম ছিল লাজবন্তি। অতএব, প্রভাত ফেরীর মিছিলে সুন্দর লাল, তার বন্ধু রেসালো এবং নেকীরাম ও অন্যান্যরা মিলে যখন গাইতে থাকে ‘হাত লাই কমানী লাজওয়ান্তি দে বুটে’ (অর্থাৎ এটি একটি লজ্জাবতী লতার চারা, হাত লাগালেই সংকুচিত হয়।) তখন সুন্দর লালের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না। সে নীরবে মিছিলে সবার সাথে এগিয়ে যেতে যেতে লাজবন্তির ব্যাপারে ভাবতে থাকে, ‘জানি না সে কোথায় কি অবস্থায় আছে। আমার ব্যাপারে কি ভাবছে। সে কি কখনও ফেরত আসবে নাকি আসবেনা?’ ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার পা নড়বড় করে উঠে।

এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, লাজবন্তি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনাই ত্যাগ করেছে। তার দূঃখ সারা দুনিয়ার বেদনায় পরিণত হয়েছে। সে দুঃখ বেদনা থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছে। অবশ্য এরপরও তার সাথীদের সাথে গানে সুর মিলাতে গিয়ে তার অবশ্যই মনে হয়, মানুষের হৃদয় কত নাজুক। সামান্য ঘটনায় আঘাত পায়। সে লজ্জাবতী লতার মতো। ওর দিকে হাত বাড়ালেই সংকোচিত হয়। কিন্তু সে লজ্জাবতীর সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করেছে। সে তার চলাফেরা, খাবার ব্যাপারে অমনযোগী হওয়া এবং এ ধরনের মামুলী মামুলী ব্যাপারে তাকে মারধর করত।

 

আর লাজু শাহতুত (এক প্রকার ফলের গাছ) গাছের হালকা ডালের মতো নাজুক ফর্সা গ্রাম্য মেয়ে ছিল। রোদে ঘোরাঘুরি করায় তার গায়ের রং শ্যামলা হয়ে গেছে। তার স্বভাব আচরণে এক বিচিত্র অস্থিরতা ছিল। তার অস্থিরতা শিশির বিন্দুর মতো যেটা বড়ো পাতায় এদিক সেদিক ছুটাছুটি করে। তার দেহের গড়ন ছিল হালকা পাতলা যেটা তার দুর্বল স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয় বরং সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। তাকে দেখে প্রথমে ঘাবড়ে যায় সুন্দরলাল। কিন্তু পরে দেখল, লাজু সব ধরনের বোঝা আর দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারে। এমনকি মার খাওয়ার পরও যথারীতি সহ্য করে যাচ্ছে। তখন সুন্দর লাল লাজুর উপর তার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে জানত না, এরও একটা সীমা আছে, সীমা অতিক্রম করলে মানুষের ধৈর্য্য ভেঙে যায়। অবশ্য এর জন্য লাজুরও কিছু ভূমিকা ছিল। সে কখনও উদাস হয়ে বসে থাকতে পারে না। তাই দারুণ ঝগড়া বিবাদের পরও সুন্দর লাল মুছকি হাসলে লাজু হাসি চেপে রাখতে পারত না আর লাফিয়ে ওর কাছে চলে আসত। আর গলায় দুহাতে জড়িয়ে বলত, ‘আবার আমাকে মারলে তোমার সাথে কথা বলব না …।’ এতে সুস্পষ্ট যে, এতক্ষণের মারপিট খাওয়ার ঘটনা সে ভুলে গেছে। গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের মতো সে জানে, পুরুষরা মেয়েদের সাথে এমনি ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য মেয়েদের মাঝে কেউ বিদ্রোহ করলে তখন মেয়েরাই হতবাক হয়ে বলতে থাকে, ‘দেখ, এ কেমন পুরুষ, মেয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।’ এই মারপিটের ঘটনা তাদের গীতে উচ্চারিত হয়। স্বয়ং লাজু গাইতে থাকে-

‘আমি শহরের বাবুকে বিয়ে করেব না।

ওরা জুতা পরে আর

আমার নিতম্ব যে অত্যন্ত ছোটো।’

 

কিন্তু প্রথম দফায় লাজুর শহরের এক ছেলের সাথে তার হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। তার নাম সুন্দর লাল। একটি বরযাত্রীর সাথে সে লজ্জাবতীর গ্রামে এসেছিল। সে বরের কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার শালী তো বেশ চটপটে, তোমার স্ত্রীও চটপটে হবে।’ লাজবন্তি সুন্দর লালের এই কথা শুনেছিল। কিন্তু সে ভুলেই গিয়েছিল, সুন্দরলাল কিরূপ কুৎসিত জুতা পরেছিল আর তার কোমর কতখানি চিকন। প্রভাত ফেরিতে সুন্দর লালের এসব কথা মনে পড়ছে। আর সে ভাবছিল, যদি ‘লাজবন্তির’ আবার সে দেখা পায়, তবে সত্যিই সত্যিই সে তাকে হৃদয়ে স্থান দেবে আর লোকজনকে বলবে, বেচারী মেয়েদের অপহৃত হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো অপরাধ নেই। যে সমাজে এই সব নিরপরাধ ও নিষ্পাপ মহিলাদের গ্রহণ করে না, তাকে আপন করে নেয় না, সেটা একটি গলিত পঁচা সমাজ। তাকে নিশ্চিহ্ন করা দরকার। সে এসব অপহৃতা মহিলাদের প্রত্যেক বাড়িতে পুনর্বাসনের শপথ নেয় আর তাদের এমন মর্যাদা দানের ইচ্ছা প্রকাশ করে যেমন যে-কোনো নারী, মা, বোন, স্ত্রী আর কন্যাকে দেয়া হয়। আবার সে মনে মনে ভাবে, তার আকার ইঙ্গিতেও লাজবন্তির প্রতি সংঘটিত নির্যাতনের কথা স্মরণ করা উচিত হবেনা। কারণ তার হৃদয় আহত, সেটা অত্যন্ত নাজুক যেমন লজ্জাবতী পাতা-হাত লাগালেই সংকুচিত হয়ে যায়।

অতএব, ‘হৃদয়ে পুনর্বাসন’ কর্মসূচিকে বাস্তবায়নের জন্য ‘মোল্লা শুকুর’ মহল্লায় গঠিত কমিটি কয়েক দফা প্রভাত ফেরী বের করেছে। ভোর চার থেকে পাঁচটা হলো প্রভাত ফেরীর উপযুক্ত সময়। লোকজনের ভীড় আর ট্রাফিক জাম থাকে না, সারারাত চৌকিদারী করার জন্য জেগে থাকা কুকুরগুলো পর্যন্ত রুটি তৈরির চুল্লির পাশে কু-লী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। বাড়িতে ভোরবেলা বিছানায় ঘুমন্ত লোকগুলো প্রভাত ফেরির আওয়াজ শুনে মন্তব্য করে, ওই সেই হৈচৈ। তারপর ধৈর্য্য সহকারে বাবু সুন্দর লালের প্রচারণা শুনতে থাকে। যেসব মহিলা নিরাপদে এপারে ফিরে এসেছে, ওরা তাদের স্বামীর বাহু বন্ধনে বুকের সাথে জড়িয়ে প্রভাত ফেরীর হৈ চৈ এর জন্য মুখে মিন মিন করে প্রতিবাদ জানায়। ঘুমন্ত শিশুরা মিছিলের আওয়াজ শুনে সামান্য সময়ের জন্য চোখ খুলে আর হতভাগ্য ফরিয়াদী আর বিষন্ন মানুষের প্রচারণার গান ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

কিন্তু ভোরবেলা কানে যে শব্দ প্রবেশ করে তা বৃথা যায় না। সেটা সারাদিন চিন্তা রাজ্যে বাদানুবাদের মতো চক্কর দিতে থাকে। অনেক মানুষ-এর অর্থ ও বুঝতে পারে না। তবুও গুন গুন করতে থাকে। এই আওয়াজই গৃহে পুনর্বাসনের বিষয় ছিল। কিছুদিন আগে মিস মৃদুলা সারা বাই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অপহৃত মহিলাদের হস্তান্তরের জন্য এনেছিলেন, তখন মোল্লা শুকুর মহল্লার কিছু অধিবাসী ওদেরকে পুনর্বাসনের জন্য সম্মত হয়। ওরা ওয়ারিশ শহরের বাইরে কোলা থানায় দেখা করতে গেল। অপহৃত মহিলারা এবং তাদের গ্রহণকারী লোকজন কিছুক্ষণ যাবত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে নিজেদের সংসার পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ওরা বাড়িতে চলে যায়। রেসালো, নেকীরাম এবং সুন্দরলাল বাবু একবার ‘মহেন্দ্র সিং জিন্দাবাদ’, একবার ‘মোহন লাল জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিতে থাকে। শ্লোগান দিতে দিতে ওদের গলা শুকিয়ে যায়।

আবার অপহৃত মেয়েদের অনেককে তাদের স্বামী, বাবা মা, ভাই বোনেরা তাদেরকে না চেনার ভান করে এবং তাদের সাথে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। অবশ্য এরা মৃত্যুবরণ করে নি কেন? নিজেদের সতীত্ব রক্ষার জন্য বিষপানে আত্মহত্যা করে নি কেন? কূপে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারত। কারণ এরা ছিল ভীরু, তাই জীবন বিলিয়ে পারে নি বরং জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

অগণিত হাজারো মহিলা তাদের সতীত্ব লুণ্ঠনের আগে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে কিন্তু তারা তো জানতনা, জীবিত থেকে ওরা কীইবা বীরত্ব দেখাল। পাথরের মতো চোখগুলো ওদেরকে এখন মৃত্যুকে তীর্যক দৃষ্টিতে অবলোকন করছে। এমনকি স্বামীরা পর্যন্ত ওদেরকে চিনতে পারছে না। অনেকে বার বার নিজের নাম উচ্চারণ করছে। সোহাগ দানী, সোহাগ বিন্তি, তাদের ভাইদের অগ্নিমূর্ত্তি দেখে সর্বশেষ মিনতির সুরে বলছে, ‘বাহারী তুমিও আমাকে চিনলে না? আমি তোমাকে কোলে বসিয়ে খাইয়েছি।’ আর বাহারী চিৎকার করতে চায় তারপর মাতা পিতার দিকে তাকায়। বাবা মা বুকে হাত রেখে নারায়ণ বাবার দিকে তাকায় এবং অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় নারায়ণ বাবা আকাশের দিকে তাকায়; যার আসলে কোনো বাস্তবতা নেই এবং সেটা ছিল আমাদের দৃষ্টির ভ্রম। এর একটি সীমারেখা আছে। যার উপরে আমাদের দৃষ্টি যায় না।

কিন্তু সামরিক বাহিনীর ট্রাকে মিস সারা বাই বিনিময়ের জন্য যেসব মহিলাদের এনেছিল, ওদের মাঝে লাজু ছিল না। সুন্দর লাল অনেক আশা নিয়ে ট্রাক থেকে অবতরণকারী শেষ মেয়েটিকে পর্যন্ত দেখেছে। অতঃপর সে নীরবে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে কমিটির তৎপরতা শুরু করে। এখন সে শুধু ভোরে প্রভাত ফেরী তো আছেই বরং সন্ধ্যায় ও মিছিল বের করে। অনেক সময় এক-আধ ঘণ্টা স্থায়ী ছোটোখাটো জনসভারও আয়োজন করছিল। এই জনসভায় কমিটির বৃদ্ধ সভাপতি উকিল কালকা প্রসাদ সুফির কাশি মিশানো বক্তৃতা শোনা যেত। রেসাল সর্বদা উকিল সাহেবের পাশে পিকদানি নিয়ে দায়িত্ব পালন করত। লাউড স্পীকার থেকে বিচিত্র আওয়াজ আসত। থানার নেকীরাম কেরানী বক্তৃতা দিতে গিয়ে ধর্ম শাস্ত্র ও পুরানের আলেক উদ্ধৃতি দিত আর উদ্দেশ্য বিহীন বক্তব্য রাখত। ফলে উপস্থিত দর্শকরা মাঠ ত্যাগ করতে শুরু করত। তখন সুন্দরলাল বাবু বক্তৃতা দিতে মাইকের সামনে হাজির হতো। কিন্তু সে দুটি বাক্যের বেশি কোন কথাই বলতে পারত না। তার গলায় কথা আটকে যেত। অবশেষে বসে পড়ত। তিনি কেঁদে ফেলতেন, দু চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইত। আবেগ আপ্লুত হওয়ায় বক্তৃতা করতে পারতেন না। কিন্তু উপস্থিত জমায়েত শ্রোতার মাঝে এক বিচিত্র- ধরনের নীরবতা বিরাজ করত। সুন্দর লাল বাবুর দু বাক্যের বক্তব্য তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করত; উকিল কালকা প্রসাদ সুফির উপদেশমূলক বক্তৃতাকে ও ছাড়িয়ে যেত। উপস্থিত শ্রোতারা তখনই কেঁদে ফেলত আর আবেগ আপ্লুত হয়ে চিন্তামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরত।

একদিন কমিটির লোকজন সন্ধ্যায় প্রচারে রাস্তায় নামে। সড়ক দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে প্রাচীন পন্থীদের ঘাঁটিতে গিয়ে উপনীত হয়। মন্দিরের বাইরে পিপল গাছের আশে পাশে সিমেন্টের পাকা চত্বরে কয়েকজন ভক্ত সাধু বসেছিল আর রামায়ণ পাঠ শুনছিল। নারায়ণ বাবা রামায়ণের সেই অংশটি পাঠ করছিল, যেখানে একজন ধোপা ধোপানীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার কাহিনি ছিল। সে বলেছিল, ‘আমি রাজা রামচন্দ্র নই যে অনেক বছর রাবনের সাথে বসবাসের পরও সীতাকে সংসারে জায়গা দেব?’ রাজা রামচন্দ্র যখন মহাসতী সীতাকে বাড়ি থেকে বহিস্কার করে, তখন সীতা গর্ভবতী ছিল। এরপরও কি রাম রাজত্বের কোনো বড়ো উদাহরণ পাওয়া যাবে?’ নারায়ণ বাবা বলতে থাকে, ‘সেটা ছিল রাম রাজত্ব। যেখানে একজন ধোপার কথাও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়’।

কমিটির মিছিল মন্দিরের পাশে থামে। আর মিছিলের লোকজন রামায়ণ পাঠ ও শ্লোক শুনতে থাকে। সুন্দরলাল রামায়ণ পাঠের শেষ বাক্য শুনার পর আপত্তি জানায়, ‘আমাদের এমন রাম রাজত্বের প্রয়োজন নেই বাবা।’

‘চুপ করো, তুমি কে?’

উপস্থিত জনতার মাঝ থেকে সমস্বরে প্রতিবাদ উঠে, ‘খামুশ’।সুন্দর লাল এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আমাকে কেউ কথা বলা থেকে থামাতে পারবে না।’

আবার সমস্বরে আওয়াজ উঠল, ‘খামুশ, (চুপ করো) আমরা তোমাকে বলতে দেবনা।’ অপর এক কোনা থেকে আওয়াজ উঠল, ‘তোমাকে হত্যা করব।’

নারায়ণ বাবা অত্যন্ত মিষ্টি ভাষায় বলল, ‘তুমি শাস্ত্রের মান মর্যাদা বুঝনা সুন্দর লাল’। সুন্দর লাল বলল, ‘আমি একটি কথা তো বুঝি বাবা। রাম রাজত্বে ধোপার কথা শুনা হয় কিন্তু আপনারা সুন্দর লালের বক্তব্য শুনতে নারাজ।’ এদিকে সমবেত জনতা যারা পিপল গাছের লাঠি নিয়ে সুন্দর লালকে মারতে উদ্যত ছিল, তারা নড়ে চড়ে বসে আর সমস্বরে বলল, ‘শুন শুন তার বক্তব্য শুন।’

রেসাল এবং নেকীরাম সুন্দর লাল বাবুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘শ্রী রাম আমাদের নেতা। এ কেমন কথা বাবাজী। তিনি ধোপার কথাকে সত্য জানলেন আর এতবড়ো মহারানী সীতার উপর বিশ্বাস রাখতে পারলেন না?’

নারায়ণ বাবা দাড়িতে বিনুনী পাকিয়ে বলল, ‘কারণ সীতা তার আপন পত্নী ছিল। সুন্দর লাল এ কথার মর্মার্থ বুঝতে পারবে না।’

‘হ্যাঁ, বাবা।’ সুন্দর লাল বাবু বলল, ‘এ সংসারে অনেক কথা থাকে, যা আমার বোধগম্য নয়। তবে সত্যিকারের রাম রাজত্ব-যা বুঝি, সেখানে মানুষ নিজে নিজের প্রতি নির্যাতন করেনা। নিজের প্রতি অবিচার করা যেমন মহাপাপ, অন্যের প্রতি অবিচার করাও মহাপাপ। আজ ভগবান রাম সীতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। কারণ তিনি রাবণের সাথে থেকেছিল। এতে সীতার কি অপরাধ? সে কি আমাদের অনেক মা বোনের মতো পরিস্থিতির শিকার ছিল না? এখানে সীতার অসতী ও সতীত্মের প্রশ্ন উঠেছে নতুবা রাবণের বন্য হিংস্রতা যার দশটি মাথা মানুষের মতো। অথচ একটি সবচেয়ে বড়ো মস্তক হলো গাধার।

 

আজ আমাদের নির্দোষ সীতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো। সীতা… লাজবন্তি আর সুন্দর লাল বাবু একথা বলার পর কাঁদতে শুরু করে। রেসাল আর নেকি রামের হাতে ছিল লাল ঝান্ডা  আর মাথায় স্কুলের ছাত্রদের লেখা শ্লোগান শোভা পাচ্ছে। ওরা সকলে ‘সুন্দর লাল বাবু জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। সমবেত মিছিলের একদিকে একজন চীৎকার করে উঠে, ‘মহারানী সীতা জিন্দাবাদ’। অন্যদিক থেকে আওয়াজ উঠে ‘শ্রী রামচন্দ্র…’।

তারপর অনেক কণ্ঠস্বর একত্রে শোনা গেল, ‘খামুস’ (চুপ কর), খামুস।’ নারায়ণ বাওয়ার সারা মাসের রামায়ণ পাঠ মূল্যহীন হয়ে গেল। সমবেত অনেক লোকজন মিছিলে শামিল হয়। মিছিলের অগ্রভাগে উকিল কালকা প্রসাদ আর কালান ফাঁড়ির কেরানী হুকুম সিং। বৃদ্ধ উকিল মাটিতে লাঠি টোকা দিয়ে বিজয়ীর বেশে এগিয়ে যাচ্ছে আর মাঝখানে সুন্দর লালও ছিল। তখনও তার দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আজ তার হৃদয়ে দারুণ আঘাত পেয়েছে আর মিছিলের লোকজন সমবেতভাবে গাইছে,

‘এটি একটি লজ্জাবতী লতা

হাত লাগালেই সংকুচিত হয়।’

তখনও ভোর হয় নি। এই গানের আওয়াজ মানুষের কানে বাজছে। মোল্লা শুকুর মহল্লার ৪১৪ নং বাড়ির বুদ্ধু তখনও বিছানায় শুয়ে গায়ে মোচড় দিচ্ছে। তার প্রতিবেশী লাল চন্দ, সুন্দর লাল ও কালকা প্রসাদ প্রভাব খাটিয়ে লালচন্দের জন্য রেশন দোকানের বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিল। লালচন্দ ছুটতে ছুটতে এসে চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে সুন্দর লালকে বলল, ‘অভিনন্দন সুন্দর লাল।’

সুন্দর লাল বলল, ‘কিসের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছ।’

‘আমি লাজু ভাবীকে দেখেছি।’

সুন্দর লালের হাত থেকে হুকোর চিলম… পড়ে যায় আর তামাকের গোল্লাটাও মেঝেতে পড়ে যায়।

‘কোথায় দেখেছ?’ সে লাল চন্দের কাঁধে ঝাকুনি দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, তড়িৎ উত্তর না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠে।

‘ওয়াগা সীমান্তে।’

সুন্দর লাল লাল চন্দকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘অন্য কেউ হতে পারে।’

লাল চন্দ তাকে ভরসা দিয়ে বলল, ‘না ভাই, সে লাজুই ছিল।’

‘তুমি তাকে চিনতে পেরেছ?’ সুন্দরলাল মেঝে থেকে মিষ্টি তামাক হাতে তুলে নিয়ে হাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে চিলিম হুকার উপর রাখল তারপর বলল, ‘তাহলে তার চিহ্ন কি ?’

‘একটি তিল চিবুকে আর একটি গালে।’

হ্যাঁ হ্যাঁ এবং সুন্দর লাল নিজেই তাকে বলল, ‘তৃতীয়টি তার কপালে।’ সে চায়না কোনো সন্দেহ থাকুক। এরপর লাজবন্তির দেহে কোথায় কোথায় তিল আছে তা তার মনে পড়ে যায়। যেমনি ছোটো ছোটো লজ্জাবতী চারার গায়ে সবুজ দানার মতো জট থাকে। হাত লাগলেই সংকোচিত হয়। তেমনি হাতের আঙ্গুলে তার দেহের তিলের প্রতি ইশারা করলে লাজবন্তি লজ্জা পেত আর চুপ হয়ে যেত। নিজেকে গুটিয়ে নিত। অর্থাৎ যেন তার সব গোপন কথা কেউ জেনে ফেলেছে আর অজানা সম্পদ লুণ্ঠনের ফলে যেন সে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সুন্দর লালের সারা দেহে অজানা আশঙ্কা, এক অজানা ভালবাসা ও তার পবিত্র আগুনে জ্বলে উঠে।

সে আবার লাল চন্দকে পাকড়াও করে, জিজ্ঞাসা করে, ‘সে ওয়াগা সীমান্তে কিভাবে গিয়ে পৌঁছল ?’

লালচন্দ জবাব দিল, ‘ভারত পাকিস্তানের মধ্যে মহিলাদের বিনিময় হচ্ছে কিনা।’

‘তারপর কি হলো ?’ সুন্দর লাল সোজা হয়ে বসে আবার বলল, ‘তারপর কি হলো?’

রেসালো ও চৌকির উপর উঠে বসে আর তামাক সেবীদের মতো কাশি দিয়ে বলল, ‘সত্যিই সত্যিই লাজবন্তি ভাবী এসে গেছে?’

লালচন্দ তার বিবরণ দান অব্যাহত রেখে বলল, ‘ওয়াগা সীমান্তে পাকিস্তান ১৬ জন মহিলা ফেরত দিয়েছে আর বিনিময়ে ভারতের ১৬ জন মহিলা গ্রহণ করেছে। কিন্তু একটি বিষয়ে বিবাদ বাঁধে। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা আপত্তি জানায় যে, সব মহিলা ফেরত দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশ মহিলা বয়স্কা-বুড়ি আর ভবঘুরে। এই ঝগড়া বিবাদের কারণে লোক জমায়েত হয়ে যায়। পাকিস্তানের স্বেচ্ছাসেবকরা লাজু ভাবীকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘তোমরা একে বুড়ি বলছ? দেখো দেখো … যতগুলো মহিলা তোমরা ফেরত দিয়েছ তার সাথে এর তুলনা হয় কি?’ আর সত্যিই লাজু ভাবী সকলের চোখের সামনে নিজের দেহের তিল লুকানোর চেষ্টা করছিল।

আবার ঝগড়া বেধে যায়। দুই পক্ষই তাদের বিনিময়কৃত মহিলাদের ফেরত নিয়ে যেতে চায়। আমি চিৎকার করে ‘লাজু ভাবী লাজু ভাবী’ নাম ধরে ডেকেছি। আমাদের সৈন্যরা আমাকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয়। লালচান্দ হাতের কনুই তুলে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত স্থান দেখায়। রেসাল এবং নেকীরাম চুপচাপ বসে ছিল। আর সুন্দর লাল উদাস চোখে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়ত ভাবছে, লাজু ফিরে আসুক বা না আসুক কিন্তু সে যেন একটি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এসে গাছের ছায়ায় বসে জিহ্বা বের করে হাপাচ্ছে। মুখ থেকে একটি বাক্যও বের হচ্ছে না, বলল, ‘পানি দাও।’ সে অনুভব করে, দেশ বিভাগের আগে ও পরে যে নির্যাতন চলছিল তা এখনও অব্যাহত আছে কিন্তু এর পদ্ধতি পালটে গেছে মাত্র। লোকজনের মাঝে আগের মতো পরিতাপও নেই। কাউকে যদি প্রশ্ন করেন, সান্বর ওয়ালায় লেহনা সিং বাস করত, আর তার ভাবী নিতু-তক্ষনাৎ উত্তর আসবে-‘সে মারা গেছে।’ এরপর মৃত্যু এর বোধগম্য নয় তাই ঘটনা এগিয়ে যায়। আরও এক কদম এগুলে দেখা যাবে, ঠান্ডা মাথায় ব্যবসায়ীরা মানুষ, মালামাল, মানুষের চামড়া মাংসের ব্যবসা ও বিনিময় করছে। যেমন গবাদি পশু ক্রয় করার সময় মহিষ অথবা গাভীর মুখের দাঁত দেখে তার বয়স যাচাই করা হয়।

এখন যে যুবতী নারী রূপে তার রূপ, তার প্রিয় গোপন তথ্য, আর রসালো ফলের মতো প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হচ্ছে। নির্যাতন এখন ব্যবসায়ীদের রন্ধে রন্ধে ঢুকে গেছে। প্রথমে বাজারে মাল বিক্রি হতো পাল্লা দ্বারা। দু হাতের উপর রুমাল রেখে নিচে দিয়ে আঙ্গুলের ইশারায় সওদা হয়ে যেতো। এখন রুমালও নেই, প্রকাশ্যে বেচা-কেনা হচ্ছে। লোকজন ব্যবসায়ের রীতিনীতিও ভুলে গেছে। এসব লেন-দেন আর কারবার দেখে পুরোনো দিনের কাহিনি মনে পড়ে যায়। তখন মেয়েদের প্রকাশ্যে বেচা-কেনার কেচ্ছা বর্ণনা করা হতো। উজবেকরা এসব অগনিত নগ্ন মেয়েদের সারির সামনে দিয়ে এগিয়ে যেতো আর এদের দেহে আঙুল দিয়ে টিপে দেখত। তখন ঐ স্থানে গোলাপী গর্তের সৃষ্টি হতো আর আশে পাশে হালকা হলুদ রং ধারণ করত। খদ্দের উজবেক এগিয়ে যেত, আর যে মেয়েকে গ্রহণ করত না, সে পরাজয়ের দুঃখে এক হাতে পায়জামার ফিতা চেপে ধরে অন্যহাতে জনতার দৃষ্টি থেকে চেহারা আড়াল করার লক্ষ্যে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদত।

 

সুন্দর লাল অমৃতসর যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কারণ সে লাজুর আগমন বার্তা জেনেছে। লাজু দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। লাজুর আগমনে সুন্দর লাল ঘাবড়ে যায়, এক কদম দরজার দিকে এগিয়ে আবার পিছনে সরে আসে। তার মন চায়, সে রাগ করে কমিটির সব হলুদ পোষ্টার আর পতাকা বিছিয়ে বসে পড়বে আর প্রাণ খুলে কাঁদবে। কিন্তু তখন আবেগ দেখান সম্ভব ছিলনা। সে পুরুষের মতো এই মানসিক অবস্থার মোকাবিলা করে আর ধীর পদে চৌকির দিকে এগিয়ে যায়, সেখানেই অপহৃত মেয়েদের ফেরত দেয়া হতো।

 

সামনে লাজু দাঁড়িয়ে আর ভয়ে কাঁপছিল। সে সুন্দর লাল ছাড়া কাউকে জানে না। আগেই তো তার সাথে সুন্দর লাল খারাপ ব্যবহার করেছে, এখন জানে না, পরপুরুষের সাথে কিছুদিন কাটানোর পর ফেরত এসেছে, কিরূপ ব্যবহার করবে তার সাথে? সুন্দর লাল লাজুর দিকে তাকায়। লাজু মুসলিম মেয়েদের মতো লাল ওড়না মাথায় দিয়েছে। অন্যান্য অপহৃত মেয়েদের দলে মিশে গিয়ে তার অপহরণকারীর কবল থেকে পালিয়ে এসেছে আর সুন্দর লাল সম্পর্কে তার দুশ্চিন্তা ছিল প্রবল, তাই পোষাক পরিবর্তন অথবা ওড়না ঠিক ভাবে মাথায় দেয়ার-কথাও মনে ছিলনা। এখন সে সুন্দর লালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, তার মনে আশা ও ভীতি ভর করেছে। সে দেখল, লাজবন্তির গায়ের রং আরও লাবন্যময় হয়েছে। আগের চেয়ে তাকে তরতাজা ও স্বাস্থ্যবতী মনে হচ্ছে। অবশ্য সে মোটা হয় নি। লাজু সম্পর্কে সুন্দর লাল যা ভেবেছিল, সত্য নয়। সে ভেবেছিল, বিচ্ছেদ বেদনায় লাজবন্তি একদম শুকিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর মুখ থেকে আওয়াজ পর্যন্ত বের হবে না। সে পাকিস্তানে থাকা কালে সুন্দর লালের কষ্ট হয়েছে। কিন্তু সে নীরব থাকে কারণ সে নীরব থাকার শপথ নিয়েছে। সে ভাবছে, পাকিস্তানে যদি সে সুখে থাকে তবে ফিরে আসল কেন? হয়ত, ভারত সরকারের চাপে নিজের মতের বিরুদ্ধে এখানে ফেরত এসেছে। কিন্তু সে বুঝছেনা যে, লাজবন্তির ফর্সা চেহারা বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে, দুঃখ বেদনায় দেহের চামড়াগুলো ঢিলা হয়ে পড়েছে। বেদনা ও দুঃখের কারণে তাকে মোটা ও স্বাস্থ্যবতী মনে হচ্ছিল। কিন্তু এই সুস্বাস্থ্যে এমন যে, দু কদম হাঁটলে মানুষ যেমন হাঁপাতে থাকে।

অপহৃতার চেহারার দিকে প্রথম তাকানোর প্রতিক্রিয়া ছিল বিচিত্র ধরনের। কিন্তু সে পৌরুষের মতো সব ভাবনার মোকাবিলা করে। ওখানে অপহৃত মেয়েদের ফেরত নেয়ার জন্য লোকজন জমায়েত হয়েছে। একজন বলছে, ‘আমরা মুসলমানদের ব্যবহৃত বাসি মেয়েদের গ্রহণ করবনা।’

নেকীরাম, রেসাল আর কালান থানার বৃদ্ধ কেরানীর শ্লোগানে লোকটির বক্তব্য তলিয়ে যায়। সবার ধ্বনির মাঝে কালকা প্রসাদের শ্লোগান পৃথক শুনা যাচ্ছিল। সে কাশি দিচ্ছিল আর তার বক্তৃতা দান অব্যাহত রেখে ছিল। সে এই নতুন সমস্যা ও বাস্তবতা গভীরভাবে অনুভব করছিল। মনে হয়, সে নতুন বেদ, নতুন পুরাণ এবং শাস্ত্রীয় গ্রন্থ পাঠ করছে। তার এই কর্মকান্ডে অন্যদেরকেও অংশীদার করতে চায়। সমবেত লোকজনের হৈ চৈ এর মাঝে লাজু ও সুন্দর লাল বাড়ির দিকে যাত্রা করে। মনে হয়, হাজার বছর আগে রামচন্দ্র এবং সীতা দীর্ঘ বনবাসের পর অযোধ্যা ফিরছে। একদিকে লোকজন প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে আর অন্য দিকে দীর্ঘদিন নির্যাতিত হওয়ার জন্য অনুশোচনা করছে।

 

লাজবন্তি ফেরত আসার পর ও সুন্দরলাল আন্তরিকতার সাথে ‘হৃদয়ে জায়গা দাও’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। কথা ও কাজে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করতে থাকে। যারা সুন্দর লালের বক্তব্যকে নেহায়েত আবেগ বলে মনে করত, তারাও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অধিকাংশ লোকের মনে আনন্দ আবার অনেকের মনে দুঃখ। বাড়ি নং ৪১৪ এর বিধবা ছাড়া মোল্লা শুকুর মহল্লার অনেক মহিলা সমাজকর্মী সুন্দর লাল বাবুর বাড়িতে আসতে ভয় পেত। অবশ্য সুন্দর লালের প্রতি কেউ মনযোগ দিক বা না দিক তা সে পরওয়া করে না। তার হৃদয়ের রানী ফেরত এসেছে। মনের শূন্যতা পূরণ হয়েছে। সুন্দর লাল লাজুর স্বর্ণমূর্তি তার হৃদয়ে স্থাপন করেছে আর নিচে দরজায় প্রহরা দিয়ে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। লাজু প্রথমদিকে ভয়ে নীরব থাকত, এখন সুন্দর লালের ভালো ব্যবহারে ধীরে ধীরে লাজবন্তি আশ্বস্ত হয়।

সুন্দর লাল লাজবন্তিকে লাজু নামে ডাকত, সে তাকে দেবী বলত। লাজু এতে এক অজানা খুশিতে পাগল হয়ে যেত। সে সুন্দর লালকে সব ঘটনা শুনাতে চায় আর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অঝুরে কাঁদতে কাঁদতে যেন সব পাপ ধুয়ে মুছে যায়। কিন্তু সুন্দর লাল লাজুর কোনো কাহিনি শুনতে চায়না বরং লাজু সান্নিধ্যে আসতে চাইলে সে কুঁচকে যেত। অবশ্য সুন্দর লাল ঘুমিয়ে পড়লে লাজু তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। ধরা পড়লে সুন্দর লাল ব্যাপার কি জানতে চাইলে, ‘না, কিছুনা’ বলে এড়িয়ে যেত, আর কিছু বলত না। সারা দিনের পরিশ্রমের ক্লান্ত সুন্দর লাল আবার ঘুমিয়ে পড়তো। অবশ্য একবার সুন্দর লাল লাজবন্তির ‘কালো দিনগুলোর’ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল, ‘সে কে ছিল ?’

লাজবন্তি দৃষ্টি নিচু করে জবাব দিয়েছিল, ‘জুম্মা’। সে আবার সুন্দর লালের মুখের দিকে তাকিয়ে আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু সুন্দর লাল বিচিত্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল আর মাথায় হাত বুলাচ্ছিল, ‘তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করেছে ?’

‘হ্যাঁ’।

‘মারধর করে নি তো ?’

লাজবন্তি সুন্দর লালের বুকে মাথা রেখে বলল, ‘না’। আবার বলল, ‘সে আমাকে মারধর করে নি সত্য কিন্তু তাকে আমার ভয় লাগত। তুমি আমাকে মারধর করো কিন্তু তোমাকে ভয় পেতামনা। এখন আবার মারবে না তো ?’

সুন্দর লালের চোখে অশ্রু দেখা দেয় আর সে লজ্জা ও দুঃখ ভরা কণ্ঠে জবাব দিল, ‘না দেবী না, আর এখন মারধর করব না।’

‘দেবী’ ডাক শুনে লাজবন্তিও কাঁদতে থাকে।

লাজবন্তি তার কাছে সবকিছু জানাতে চেয়েছিল কিন্তু সুন্দর লাল বলল, ‘অতীতের ঘটনা বাদ দাও। এতে তোমার কোনো দোষ নেই। এটা আমাদের সমাজের অপরাধ। কারণ সমাজ তোমাদের মতো দেবীদের সম্মানের সাথে জায়গা দেয় না, সম্মান করে না। এতে তোমার ক্ষতি নয় বরং সমাজেরই ক্ষতি।’

লাজবন্তির মনের কথা মনেই গোপন থেকে যায়। সে সব কথা প্রকাশ করতে পারেনি, চুপ চাপ নীরব থাকে। নিজের শরীরের দিকে তাকায়, এখন দেশ বিভাগের পর তার দেহ ‘দেবীর’ দেহে পরিণত হয়েছে। তখন তার দেহ ‘লাজবন্তির’ নেই। সে অত্যন্ত খুশি। কিন্তু এই সীমাহীন খুশির মাঝেও তার মনে ছিল একটি সন্দেহ আর খুতখুতে ভাব। সে শুয়েছিল, হঠাৎ বসে পড়ে। অনেক সময় মানুষ সীমাহীন খুশির মাঝেও ধীর পদক্ষেপের আওয়াজ শুনে সেদিকে মনযোগ দেয়।

অনেক দিন কেটে গেছে কিন্তু এখন খুশির স্থানে সন্দেহ তার মনে দানা বেঁধেছে। কারণ সুন্দর লাল বাবু তার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করেছে তা নয়। বরং লাজু এমন ব্যবহার তার কাছে প্রত্যাশা করে নি। সে সুন্দর লালের কাছে পুরোনো লাজু হতে চায়, যখন তাদের মাঝে সামান্য ব্যাপারে ঝগড়া বাঁধত আবার মিটমাট হয়ে যেত। এখন ঝগড়া লড়াই এর প্রশ্নই উঠে না। সুন্দর লাল এখন তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, লাজবন্তি একটি কাঁচের বস্তু। হাত দিয়ে টোকা দিলে ভেঙে যাবে। লাজু আয়নায় নিজের শরীর খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে তার র এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সে অনেক কিছু হতে পারে কিন্তু পুনরায় ‘লাজু’ এ পরিণত হতে পারবে না। লাজুর চোখের অশ্রু দেখার জন্য সুন্দর লালের চোখ ছিলনা আর আর্তনাদ শুনার জন্য কান। প্রভাত ফেরী নিয়মিত ভোর বেলা রাস্তায় বের হয়। মোল্লা শুকুর মহল্লার রেসালো, নেকি রামের সাথে একত্রে মিলে সুন্দর লাল কোরাসে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইতে থাকে,

“এটি একটি ছোট্ট লজ্জাবতী লতার চারা,

হাত লাগালেই সংকুচিত হয়।’

Facebook Twitter Email