সঙ অব আওয়ার সোয়্যাম্পল্যান্ড

Facebook Twitter Email

বৈশ্বিক ভ্রমণসূত্রে কোনো ভাষা প্রয়োজনীয় বিচিত্র রত্ন আহরণ করতে পারে- বিভিন্ন দেশ থেকে, নানা জাতির সাংস্কৃতিক সত্যসার মথিত করে। বহিরাগত বেনিয়ার হাত রাজনৈতিকভাবে নিজের আস্তিনে সেঁধিয়ে গেলেও উপনিবেশোত্তর ভাষাচিন্তার ডালপালা মহাদেশ জুড়ে নতুন ছাপ্পর বসিয়ে দিয়েছে। এর সুফল হাত পেতে নিতে প্রাগ্রসর জাতি মাত্রই অকুণ্ঠিত। অথচ উপনিবেশিত ভারতের দুই শতকের ইতিহাস ঘেঁষে গড়ে-ওঠা একটি সার্বভৌম পরিম-লে, বাংলাদেশ-জাতিরাষ্ট্রে রক্ষণবাদী কথার ধুয়ো কিছুতেই উবে যাচ্ছে না।

প্রযুক্তির সঙ্গে বাণিজ্যের দেন-দরবার বেড়ে যাওয়ার পর নিতান্তপক্ষেই ভাষার সে সনাতন মূল্যসীমা কোনো সুশীল আশঙ্কার মধ্যেই পড়ে না। বৈশ্বিকতার আঘাতে চোখের সামনে কত-কী-ই তো ভেঙেচুরে পয়মাল হওয়ার জোগাড়। তত্ত্বের দাপটে ভাষা-বয়ানের কথিত নৈতিকতাও খসে পড়ছে কূটাভাসপটু তাত্ত্বিকের নাকের ডগায়। হুজুগের পাল্লায় স্কুল-ঘরের নাবালক পর্যন্ত শুনতে পায় ভূগোলের রেখা ধরে ভাষা প্রবাহিত হচ্ছে লতার মতো; সব দেশে সব মাটিতে কমবেশি তার ফলন ফলতে বাধা নেই। কূপমন্ডকতার অসার চেঁচামেচি থামিয়ে দিয়ে এক ভূমিসীমার গল্প অন্য ভূমির ভাষায় যদি বাণীরূপ পায়, তাতে জাত-বেজাতেরও এমন কিছু কলঙ্ক রটে না। বাঙালিত্বের মোহর-পরা সৃষ্টিপটু মানুষের মানচিত্র কেবল রাজনীতির টুকরো কাগজেই যে আটকা পড়ে নেই। গোলকের বিভিন্ন প্রান্তে ইংরেজি ভাষা-মাধ্যমে বাঙালি-সংস্কৃতির আভা বিকিরণও যে অসাধ্য নয়, সেটা মাথায় রাখলে যুক্তরাজ্য-প্রবাসী সৃজনী কথাকার মনজু ইসলামের উপন্যাস ‘সঙ অব আওয়ার সোয়্যাম্পল্যান্ড’ বাঙালি পাঠকেরও নজর কাড়তে পারে।

ঐতিহ্যপুষ্ট বাঙালি রাজনীতির উত্তরাধিকার রক্তরসে জারিত রেখে মনজু ইসলাম টানা প্রায় তিন যুগ যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে দিয়েছেন। সেদিক বিচারে মনে করা অসঙ্গত হবে না, তাঁর জন্মভাষা বাংলা হলেও ইংরেজিতে তাঁর অধিকার কেবল পুঁথিগত নয়। ভাষার স্থানিকতা কিংবা জীবনাশ্রয়ী রূপান্তরের তীর্থঘাটা থেকে তিনি দূরের-কেউ নন বলে তাঁর পক্ষে এটা সম্ভব। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদিতার পাটাতনে পা রাখতে না পারলে এই অধিকার এমনিতে জন্মে না। সময় নিয়ে, থেমে থেমে তাঁর লেখা ‘সঙ অব আওয়ার সোয়্যাম্পল্যান্ড’ পড়ে অগোচরে বিশ্বাস জাগল ইংরেজি ভাষার সাম্প্রতিক রূপান্তরের আভাস ধরা পড়েছে তাঁর লেখায়। যদিও বলে রাখাই মঙ্গলকর, সংশিষ্ট বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু বলা আমার অধিকারের আওতায় পড়ে না। তবে অবগত আছি, সমাজ-মানুষের অভিজ্ঞতাবাদী ঐতিহ্যের সঙ্গে ভাষার যোগসাজশ একটি চির-নবায়নী মিথস্ক্রিয়া। প্রতিটি প্রাত্যহিক শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট ভূখন্ডের জীবন এবং যাপন প্রণালির প্রত্যক্ষ সম্পর্কও উপেক্ষণীয় নয়।

অবিভাজিত পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ-জাতিরাষ্ট্র পত্তনের আড়ালে যে বিষ মানবতার মুখশ্রীকে নীলাভ করে তুলেছিল ‘সঙ অফ আওয়ার সোয়্যাম্পল্যান্ড’ উপন্যাসের উপজীব্য  তার বাইরের কিছু নয়। এর উৎস ঐতিহাসিকতায় এবং একই সঙ্গে ইতিহাস-পালানো তৃণমূল মানুষের নৈমিত্তিক সংগ্রামে। সীমারেখা-টানা সময়ের প্রেক্ষাপটে স্থানিক ইতিহাসের সারসত্য ধারণ করে যা-কিছু গড়ে উঠতে পারে, তার সঙ্গে অচিহ্নিত সময়ের এবং ইতিহাসের অনধিগম্য বাড়তি বিষয়কে কীভাবে জুড়ে দেওয়া যায় তার একটি চিত্র হাজির দেখা যায় মনজু ইসলামের বয়ান-করা কাহিনিতে। যুদ্ধের অপরাভূত সত্যকে কেন্দ্রে রেখে তাতে মোটা-দাগে-স্বীকৃত চির-মানুষের মৌলিক অনুষঙ্গ জুড়ে দিয়ে বিষয়ের পটরেখা প্রসারিত রাখার কুশলী চেষ্টাও চোখে পড়বে সচেতন পাঠকের।

স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের ইতিহাসে যত প্রশ্নকে মুখ বুজে পড়ে থাকতে হয়েছে, তার সব জবাব ইতিহাসের খাস-কামরায় হানা দিয়েও জোটানো যাবে না। দলিত মানুষের লিপিবদ্ধ যত কান্না কাগজের পাতায় গুমড়ে মরে, মানুষের বুদ্ধি কিংবা মনীষা তার হদিস রাখতে পারেনি। এমনকি গোটা পৃথিবীর ইতিবৃত্ত ঘেঁটে দেখলে তাতেও হয়ত দেখা মিলবে না সভ্যতা-স্রষ্টা খুদে প্রাণের এবং তার বেদনার ইতিবৃত্তের। এ-যাবৎ লেখা-ইতিহাসের কাছে নিজের কৃতকারিতার ভাগ পায়নি যেসব দুর্বল-আধাদুর্বল মানুষ, তাদের ভাগে কিছুটা পাইয়ে দেয়াই মনে হয় লেখকের প্রধান গরজ। কাহিনি যেহেতু পর-ভাষায় বর্ণিত, পর-দেশের, পর-সংস্কৃতির কাছে তার আবেদন নিরপেক্ষভাবে পৌছে দেওয়াকে লেখক দায়িত্বের মধ্যেই গণ্য করেছেন। তার নমুনা পাওয়া যায় সেইসব প্রসঙ্গের মধ্যে যেখানে নিরেট তথ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে সৌন্দর্য এবং চারুতাকে শ্রদ্ধা করা হয়। ইতিহাসের সীমা সত্যের পায়ের কাছে কেন থমকে যায় তার উত্তর ইতিহাসের কাছেও মজুদ থাকে না। প্রশ্নের অনুপাতে উত্তর সমমাত্রিকও নয় সবসময়।

প্রবন্ধ, ছোটোগল্প, উপন্যাসসহ অন্যান্য গ্রন্থকে একসঙ্গে গণনায় না ধরলে ‘সঙ অব সোয়্যাম্পল্যান্ড’ লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। কেন্দ্রচরিত্র কামাল মিয়া আত্মপরিচয়ের সংকটে বিপন্নপ্রায়জন্মসূত্রে গালকাটা, জিভহীন এবং সেই সূত্রে বাকশক্তিহীন। নিচুবর্গের নায়ক প্রতিনিধি হলেও স্তব্ধতার সেই ঘাটতি খানিকটা পুষিয়ে নেওয়ার মতো সুন্দর গল্প বলতে পারত সে। গল্পের স্রোতা সে নিজেই। মাসের সবচেয়ে অন্ধকার রাতে বাজারের মাঝখানে বটগাছের গোড়ায় অজ্ঞাতপরিচয় বাবা-মা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল। তার প্রকৃত কার্যকারণ অবশ্য অজানা। সকালে স্টল খুলতে গিয়ে দোকানিরা তাকে উদ্ধার করে। তাদেরই একজন গ্রামের স্কুলশিক্ষক আব্বাস মিয়া তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। নিঃসন্তান গ্রামশিক্ষক আব্বাস এবং তাঁর স্ত্রী আতা বানুর স্নেহ-পরিচর্যায় তার জীবনবৃত্তের আবর্তন ঘটার কথা থাকলেও বছর না যেতেই ঘটনার গতি অন্যদিকে ঘুরে যায়। সন্তানহীন শিক্ষক দম্পতির ঘরে আসে নবজাতক কন্যাসন্তান মনি বানু।

বদলে যাওয়া অবস্থার মুখেও তাকে অবশ্য পরিবারের সদস্যের মতোই লালনপালন করা হয়। কিন্তু তার আত্মপরিচয় অস্পষ্টতার কবলে পড়ে যায়। কাহিনির পুরো পরিসরজুড়ে কামালের আত্মপরিচয়ের এই সংকট বিচিত্র অভিঘাত ঘটিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। উন-গঠিত মুখ-জিভের প্রতি স্থানীয় জনতার বিরূপ মনোভাব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অসাক্ষরতার বিপরীতে কামালকে অনানুষ্ঠানিক পড়ালেখা শিখিয়েও সমাজের কাছে তা চেপে রাখতে হয়। সুস্থেরই যেখানে শিক্ষা-সুযোগ বলতে বিশেষ কিছুই নেই সেখানে পঙ্গুর শিক্ষা কী করে গ্রাহ্য হতে পারে! কামাল মিয়া জন্মসূত্রে বাকশক্তিহীন কিন্তু সে ঐ ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো আকর্ষণীয় গল্প বলতে পারে। নিজেই নিজেকে শোনায় সেই গল্প। একটি কারণে নিজেকে সে ভাগ্যবানও মনে করতে পারে : প্রখর স্মৃতিক্ষমতার অধিকারী সে। কোনোকিছু একবার মনে বসিয়ে নিলে তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। দুই বছর বয়স থেকে সে আব্বাস মিয়ার পরিবারে বাস করতে শুরু করে। তারপরে যুদ্ধ শুরু হলে পুরো সময় জলাভূমির নৌকায় কাটিয়ে দেয়, জন্মভূমির স্বাধীনতার প্রতীক্ষায়। কাহিনির শেষ পর্যায়ে দেখা যায় যুদ্ধকালে বিয়ে-করা বিহারি মেয়ে কুলসুমসহ যুদ্ধফেরত আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমায়।

‘সঙ অব স্যোয়াম্পল্যান্ড’ উপন্যাসে মনজু ইসলাম ফিকশনের গঠনকাঠামো বিষয়ে যথেষ্ট পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার সঙ্গে উত্তর-উপনিবেশী সাহিত্য এবং সৃষ্টিশীল লিখনশৈলী বিষয়ে তাঁর অধ্যাপনা সূত্র সম্পৃক্ত মনে হয়। পুরো কাহিনিতে শিথিলতা বা বিচ্ছিন্ন উপাদান চোখে পড়ে না। কমিক রিলিফ এবং অ্যাবসার্ড বিষয় থাকলেও তা অখ- উপন্যাসের জন্য বিষফোড়া হয়ে ওঠেনি কখনো। সৌন্দর্যসৃষ্টির সহায় হিসেবে প্রতীকসহ নানা কৌশল কার্যকরভাবেই যে কাজে লাগিয়েছেন সচেতন পাঠক তা অনুধাবন করবেন। কামাল-মনি সম্পর্কের স্বরূপ কৈশোরপর্বে খোলাখুলি চিহ্নিত না হওয়ায় তাতে বিভিন্নার্থক সম্ভাবনার অবকাশ প্রচ্ছন্ন থাকে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলার মাঠ থেকে কামালের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে সরষে ক্ষেতের পাশে সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে মনি বানুর প্রথম রজঃস্রাব  অভিজ্ঞতার যে বিবরণ মেলে তা-ই লেখকের সৌন্দর্যসৃষ্টির ক্ষমতা প্রমাণের পক্ষে যথেষ্ট। উপন্যাসের কাহিনিকে তিনি হোমল্যন্ড, দ্য জার্নি এবং আইল্যান্ড এই তিন পর্বে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রত্যেক ভাগের আছে আলাদা উপযোগ-বৈশিষ্ট্য। কার্যকারণ এবং পরম্পরতাসূত্রে মিলে গিয়ে তিনটি এপিসোডের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের পথরেখা নির্মিত।

প্রথম পর্বে হানাদারের আক্রমণ-পটভূমি, দ্বিতীয় পর্যায়ে মুক্তিসেনাদের যুদ্ধসাধনা এবং তৃতীয় পর্যায়ে জলাভূমির তীরবর্তী শূন্যদ্বীপে লেগলেস নামের আরেক পঙ্গুর সঙ্গে কামালের দুঃসহ প্রতীক্ষাচিত্র রূপায়িত। মোট বাইশটি অধ্যায়ে পরস্পরস্পর্শী উপ-ঘটনার আশ্রয়ে কেন্দ্র-ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ যাতে গল্পকথকের কুশলতা লক্ষ করা যায়। ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে প্রতীক-অনুষঙ্গ জুড়ে দিয়ে রহস্যের মাত্রাকে অনেক ক্ষেত্রেই তুঙ্গে তোলার প্রয়াস চলেছে যা পাঠস্পৃহাকে আকর্ষণ করে। জানা-থাকা নিকট-ইতিহাসের অনাবরণ কখনো কখনো কাহিনির চাঞ্চল্য এবং বৈচিত্র্যকে প্রহার করে। কিন্তু বিরক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনাকে তিনি অতিক্রম করতে পারেন বলে উপন্যাসটি সত্যিকার অর্থেই পাঠকবান্ধব হতে পেরেছে। যুদ্ধের অভিঘাতে পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির মুখে সমাজের নানা তলের মানুষ নিজেদের খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। তারই ধারাক্রমে আবেগ-সংবেদনায় জাতিসত্তার অনুসন্ধান, দেশমাতৃকার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রভৃতি বিষয় উপন্যাসের উপজীব্য হিসেবে উঠে আসে।

কথাকার মনজু ইসলাম তাঁর উপন্যাসে নিজ-জীবনের স্মৃতিসম্পৃক্ত উপাদান এবং মাতৃভাষার কিছু এক্সপ্রেশন বা তার আভাস প্রমাণ-ইংরেজির সঙ্গে মিশেল দিয়েছেন। সেটা তাঁর বয়ান-পদ্ধতিকে পোস্ট-কলোনিয়াল মাত্রায় উত্তরিত হতে সহায়তা করে। যে-মাটিতে যে ভাষার জন্ম তার সঙ্গে সেখানকার জল-বাষ্প-আলো-হাওয়া এবং জীবনরীতির বাঁধুনি অচ্ছেদ্য। সেটা ধরতে চাইলে মাটি এবং মাটিতে লুটোপুটি-খাওয়া মানুষের বাকপদ্ধতি রপ্ত করে ব্যবহারিক মাপকাঠিতে তার অনুশীলনক্রিয়া কীভাবে ঘটে তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তা না হলে কারো পক্ষে অর্জিত, দ্বিতীয় ভাষায় সাহিত্যরচনা সাধ্যায়ত্ত হতে পারে না। তবে এ-ও সত্য, দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে তিনি ইংরেজি অবলস্বন করেছেন বলে নিজের ভাষা বা মাতৃভাষার বিশেষ বাকপ্রতিমাও কোথাও কোথাও ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। যেমন উপনিবেশিত আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয়-ভাষী ফিকশনিস্টরা তাদের লেখায় নিজ নিজ জন্মভাষার স্থানসাপেক্ষ প্রাবচনিক প্রকাশবৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে তাদের লেখায় ব্রিটিশ বা আমেরিকানের কায়দা-কানুন টপকে খানিকটা নতুনত্ব হাজির হয়েছে অনিবার্যভাবে।

মনোবিকলনের বিচিত্র রহস্যসূত্র উপন্যাসে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে, যদিও তাতে অভূতপূর্বতার আভাস অকাট্যরূপে পাওয়া যাবে এমন বলাও মুশকিল। স্ট্রিম অব কনসাসনেস বা চেতনাপ্রবাহতত্ত্ব সবচেয়ে বেশি খাটে কেন্দ্রচরিত্র কামালের ক্ষেত্রেই। শত্রু-শিবিরের বিপন্ন বিহারিকন্যা কুলসুমের প্রেমাশ্রয়ী মানবিক জিজ্ঞাসার সামনে কামাল মিয়া কূটতার আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বীরপাত্র বোসা খুনিকে হত্যা করে কৃতকর্মের ন্যায্যতা দেখাতে চায়। যুদ্ধ শুধু সমাজ-রাষ্ট্রের ওপরতলে দৃশ্যমান আলোড়ন-বিক্ষেপ নয়; ভেতরের অদেখা অভিঘাত আরো মারাত্মক। সেটা বোঝা যায় সাহসী বোসা খুনির মহৎ চৈতন্যের দৃষ্টান্তে। শেষবেলার নাট্যমুহূর্তে অস্ত্রের নিচে স্বেচ্ছায় গলা পেতে দেয় সে। তার মূলে কাজ করে এমন সন্দেহ, যুদ্ধোত্তরকালে তার উদ্বোধিত সত্তার পতন ঘটে যেতে পারে। যেহেতু যুদ্ধের আগে অ-মহৎ উদ্দেশে মানুষ-হত্যাই ছিল তার একমাত্র তরিকা। যুদ্ধের সঙ্গে যুদ্ধগামী জনতার আবেগ-সম্পর্কের প্রত্যক্ষতা ঐতিহাসিকতায় প্রশমিত না হলে ইতিহাসে কিংবা সাহিত্যে তার নিরাবেগ মূল্যবিচার সম্ভব নয় পুরোপুরি। তেমনি যুদ্ধোদ্ভূত আবেগ-সংহতি কালের প্রভাবকে নিরপেক্ষতা না পেলে তাকে আশ্রয়-করা সাহিত্যপ্রয়াসেও অমুখাপেক্ষী সত্যচিত্র উপস্থাপন বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। বাংলাদেশ-ভূখন্ডের স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসের কথাকার সে বিষয়ে সজাগ ছিলেন, টের পাওয়া যায়।

যে জীবন আর সংস্কৃতির বয়ানে উপন্যাসের কলেবর গঠিত, তা বাঙালির ভাষাবোধের জারকে দ্রবীভূত হয় একটি বিশেষ কালে, বিশেষ আবেদন ও অনিবার্যতার নিরিখে। অথচ যে ভাষায় তা প্রকাশিত তার সঙ্গে লেখকের জন্মবদ্ধ আবেগের যোগাযোগ প্রথমে প্রত্যক্ষ ছিল না। পরে অবশ্য তা আংশিক ঘুচে যায়, যেটাকে সমাজ-বয়ন এবং সংস্কৃতি-বয়নের জন্য ভৌগোলিকতার সাপেক্ষ-বন্ধনরূপে অস্বীকার করার জো নেই। স্বাধীনতাযুদ্ধের ভূগোল তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানের স্থানপরিসরে সীমিত। ফলে সে অঞ্চলের সংস্কৃতিকথা ইউরোপীয় পর-দেশে প্রচার সহজ নয়, বিশেষত তা যদি সৃষ্টিশীলতার শর্ত মেনে সম্পন্ন করতে হয়। যে সংবেদনী মনের বিক্রিয়া হিসেবে সাহিত্যের বিকিরণ, তা যদি ভাষা-সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন হয় তাহলে তা সাহিত্যকে, বিশেষ করে কথাসাহিত্যকে কৃত্রিমতার কবল থেকে বাঁচাতে পারে না। সাহিত্য-সমাজ-পরিপার্শ্ব এবং জীবনের সঙ্গে লেখকের যে বন্ধন তা অনুশীলনেও অর্জিত হতে পারে। তারই প্রত্যক্ষ নজির হিসেবে ‘সঙ অব আওয়ার সোয়্যাম্পল্যান্ড’ বাংলা ভাষা ব্যবহার-রত পাঠকের সামনে আসবে। ব্যক্তি বা জাতি পর্যায়ে যে স্বপ্ন পূরণ হয় এবং যে স্বপ্ন পূরণ হয় না তার মধ্যে কোনো সাধারণ রেখা থাকে কি-না সে প্রশ্ন উঠে আসে উপন্যাসের প্রোট্যাগনিস্ট কামালের মুখে। কামাল চরিত্রের উন-কাঠামোর প্রধান কারণ হিসেবে আমাদের জাতীয় স্বপ্নের অ-পূরণ এবং নাগরিকের অপ্রাপ্তিকে দায়ী করা যেতে পারে। কথাশিল্পী মনজু ইসলাম তাঁর বর্ণনায় সাহিত্য-ইতিহাসের সাব-অলটার্ন দৃষ্টিকোণকে যে কাজে লাগিয়েছেন, তা আগেই বলেছি। তাঁর অজানা না, মূলধারা ইতিহাসে অনেক সত্য চাপা পড়ে থাকে বলবানের পায়ের নীচে, এমনকি ইতিহাস-লিপির অন্ধকারে। ক্ষমতাধর নক্ষত্রের গোড়ালির নীচে তাদের প্রকাশের প্ল্যাটফরম দুমড়ে যায়।

পাকিস্তান বাহিনীর নিধনের খবর পৌঁছার মুহূর্তে তার প্রতি অন্যের প্রতিক্রিয়া সন্তোষজনক না হওয়া এবং নিজের উন-কাঠামোর প্রতি হীনমন্যতা থেকে যুদ্ধে নামার প্রশ্নে কামাল দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা তার মধ্যে নানা দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। ফলে পুরো যুদ্ধেই তার ভূমিকা প্রশ্নের ফলার নিচে ছটফট করতে থাকে। আত্মবিবরে আটকে থেকে এক ধরনের উপশম সে হয়ত বোধ করে থাকতে পারে। তার মর্মপীড়াও প্রকট আকার ধারণ করে। শারীরিক অসম্পূর্ণতার কারণেই হীনমন্যতার ভারে নিজের দেশের বিপদ-মুহূর্তে অবাধে সাড়া দিতে পারে না। তার অভিভাবক এবং পালক-পিতা আব্বাস মিয়া উদার শান্তিপ্রিয় প্রকৃতির স্কুলশিক্ষক মাত্র। গ্রামের কিছু-সংখ্যক নির্বাচিত মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি নৌকায় করে পূর্ব-পাকিস্তানের এক প্লাবনভূমি অঞ্চলে নিজেদের অপেক্ষা করিয়ে রাখেন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত। তাদের যাত্রা শুরুর আগেই অবশ্য তাঁর স্ত্রীসহ শত শত গ্রামবাসী পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বরতার বলি হয়ে প্রাণ বিসর্জন করে। পরে তারা কামাল মিয়া এবং দুজন মাঝিসহ গোটাকতেক লোক নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। যুদ্ধের পুরো সময়ে জুড়ে নৌকায় যাত্রা অভিনয়ের মতো উদ্ভট কর্মকা-ও চলতে থাকে যা যুদ্ধচিন্তায় বিপন্ন মানুষের মানসিক বিশৃঙ্খলা প্রকাশ করে।

যুদ্ধের অভিঘাতে চারপাশের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষগুলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সক্রিয় অংশীদার না হয়ে পারে না। অতিতুচ্ছ কাঠুরে বিগ সুবহান তুখোড় সম্মুখযোদ্ধায় রূপান্তরিত হয়। সামান্য গৃহবধূ মনি বানুকে পরিস্থিতির তোপে সামাজিক সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে নারীর আটপৌরে মাপ ছাড়িয়ে অমিতসাহসী কমান্ডাররূপে হাজির হতে দেখা যায়। অমন মুহূর্তে দৈহিক উন-কাঠামো এবং বাকপ্রতিবন্ধিতার অভিশাপে কেউ কেউ দেশপ্রেমের চিহ্নিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না, সে তো বেদনাদায়কই বটে। পাকিস্তান-রাষ্ট্রের শোষণ-পীড়ন, নিগ্রহ-নাশকতা এবং অনীতি-অযাচারের কবলে স্বাধীন আবাসভূমির স্বপন দেখেছিল পূর্ব-পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। কেন্দ্রচরিত্র কামাল বিরূপ বাস্তবতার মধ্যে একটি পরিবারে আশ্রিত থেকে দেশের ডাকে নিজের মতো করে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে প্রকারান্তরে যুদ্ধের পুরো সময়েই সে সক্রিয় যোদ্ধাদের পাশে থেকে নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে। অজানা পরিচয়ের এক বিহারি নারীর প্রতি মানবিক দুর্বলতা প্রকাশের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের সত্যকেও সে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কামাল চরিত্রের মাধ্যমে অবশ্য সাব-অলটার্ন পটরেখায় যুদ্ধকালে দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের মানসিক পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজচেতনা, সম্প্রদায়বোধ এবং ভ্রাতৃত্বানুভূতির মিশেলে জাতিগঠনের ধারণা কীভাবে অর্জন করা করা যায় তা উঠে এসেছে উপন্যাসের নানা চরিত্রের মিথস্ক্রিয়ায়। তাছাড়া নারীপ্রেম-দেশপ্রীতির দ্বন্দ্ব, বয়ঃসন্ধির বিহ্বলতা, শক্তির সঙ্গে প্রতিশক্তির কূটচারিতা, স্থানীয় আঁতাতী শক্তির অপকীর্তি এবং মানবতার অপমানের চিত্রও পাওয়া যাবে। নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের মিষ্টি কথাগুচ্ছ, যুদ্ধকালে জলাজঙ্গলে জলহাওয়ার সিম্ফনি এবং বাঙালিপ্রাণের মুগ্ধ সংহতি- সব মিলে যে মেলোডি তার-ই অন্য নাম ‘সঙ অব দ্য সোয়্যাম্পল্যান্ড’- জলাভূমির সেরেনাদ।

Facebook Twitter Email