পার্বত্য চট্টগ্রাম কবিতায় তারুণ্যের পদচারণা

Facebook Twitter Email

‘কত মানুষের ধারা…’

আদিবাসী সাহিত্য- বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এখন ধীরে-ধীরে আকার পেতে থাকা একটি সৃজনশীল ধারণার নাম। প্রায় পঁয়তাল্লিশটি আদিবাসী জনগোষ্ঠির বাস এদেশে। কয়েকটি বাদে প্রায় সকলেরই ভাষা-সংস্কৃতির আলাদা-আলাদা পরিচিতি রয়েছে। নৃতত্ত্ব ও নানা ঐতিহাসিক সূত্রে এসবের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ক্ষুদ্রজাতিসত্তাগুলোর সকলেই আদতে ভূমিজ নয়। অনেকেই এখানে অভিবাসী হয়েছেন বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে, গোত্রগত ঝড়-ঝঞ্ঝার কারণে। সাম্প্রতিককালের মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির একটা অংশ যেমন সে দেশের বড়ো তরফের অনাকাক্সিক্ষত সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষের মুখে পড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এদেশে ঢুকে পড়ছে বা প্রবেশে বাধ্য হচ্ছে, ধূসর অতীতেও অনুরূপ অপ্রত্যাশিত ঘটনার শিকার হয়ে প্রাচীন বার্মা দেশ থেকে কিছু জাতিগত সংখ্যালঘু ইয়োমা পর্বতমালার অরণ্য ও শ্বাপদ-সংকুল ঢালুপথ বেয়ে, নদী বা সমুদ্রপথে অবিভক্ত ব্রিটিশভারতে বা তারও আগের বাদশাহি আমলে এ বিস্তীর্ণ-উদার ভূখন্ডে  আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের মধ্যে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বা রাঙামাটি বান্দরবান খাগড়াছড়ি,এমন কি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খুমি বম চাক লুসাই খিয়াঙ পাঙখো ম্রো তন্চংগ্যা ত্রিপুরা মারমা চাকমা- এসব ক্ষুদ্রজাতিসত্তার পূর্বপুরুষের অনেকেই ছিলেন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এখনও বাস করছেন সংখ্যায় অত্যন্ত অল্প হলেও। সে কালের চট্টগ্রামি ভাষায় যাদের ঢালাওভাবে ‘রোঁয়াই’, ‘বার্মাইয়া’ বা ‘মগ’ বলে লোকায়ত পরিচিত ছিল। এখনও এদের কিছু অংশ চট্টগ্রাম জেলার সীতাকু- মিরসরাই ফটিকছড়ি রাউজান রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার জেলার উখিয়া টেকনাফ রামু প্রভৃতি উপজেলার পল্লী এলাকায় একেবারে হতদরিদ্র জীবনযাপন করে চলেছে নীরবে, নিভৃতে। আর বম লুসাই পাঙখো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির বিভিন্ন ভগ্নাংশ বৃহৎ ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্য থেকে এখানে অভিবাসিত ও পরে অভিযোজিত হয়েছেন।

 

ভূপৃষ্ঠে মানুষের স্বাভাবিক অধিকারে সংখ্যাগুরুর উদ্যত চাপে-ভারে ঘরহারা, ক্ষুধাজর্জর এসব মানুষ এ উষর, পাথুরে দুর্গম অরণ্য ও পর্বতসংকুল পরিবেশকে স্বকপোলকল্পিত পিতৃভূমির মর্যাদায় বন্দনা করে গেছেন আভূমি নত হয়ে, এখনও ওদের উত্তর-পুরুষেরা তাই করেন। শক্ত মাটির বুক চিরে জীবনধারণের উপযোগী  চাষাবাদের পত্তন করেছেন তারা। সর্বোপরি, তাদের দীন অভিবাসী সত্তাকে স্থানকালপাত্রের সমান্তরালে সাজিয়ে নিতে সে কালের রাজা-রাজন্যের আইনকানুন ও প্রচলিত সহবৎ মান্য করেছেন। এভাবে তারা এ ভূখন্ডের আলো-হাওয়া ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন হৃদয় ও চেতনার পাখা মেলে দিয়ে। ফলে গড়ে উঠেছে নতুন জীবনবোধ, নতুন পরাচেতনা, নবীন কোলাহল। পরবর্তীকালে এ ভূখন্ডেরই পার্শ্ববর্তী আদি জনসমাজ তথা বাঙালি সত্তার সঙ্গে গড়ে ওঠে তাদের সহাবস্থানের নীতি, হার্দিক মেলামেশা ও  বৈষয়িক লেনদেনের সংস্কৃতি। এও সম্ভবত ইতিহাসের এক কৌতুকী আচরণ।

 

প্রখ্যাত ইতিহাসকার অমলেশ ত্রিপাঠীর একটি বক্তব্যের কিয়দংশ এখানে প্রসঙ্গের প্রয়োজনে পাঠ করা যাক : ‘আসলে মানুষ একই সঙ্গে মুক্ত ও বন্দী। বন্দী, কারণ, ইচ্ছাশক্তিকে নিরঙ্কুশভাবে সে প্রয়োগ করতে পারে না। মুক্ত, কারণ, তাকে এগোতেই হবে- পথে বা বিপথে হোক। অতীতের শেকল এক হাতে সে খুলছে, পর মুহুর্তে জড়িয়ে পড়ছে আর এক শেকলে। ইতিহাস যেমন তাকে তৈরি করছে, সেও তেমনি তৈরি করছে ইতিহাস। কৃৎকৌশলের পরিবর্তন, জনসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের বিপ্লব, প্রকৃতির ভারসাম্যের বিনাশ বারবার জট বাড়াবে জীবনের। কখনও ডাইনে কখনও বামে বাজবে কালের মন্দিরায়। তারই সঙ্গে তাল মেলাবার চেষ্টাই ইতিহাস। তালভঙ্গ হয়নি, তাও নয়। তবু তা শাশ্বত নয়। বারে বারে মানুষকে বিশ্বের অধিকার ফিরে পেতে হয় …

 

(গ্রন্থ : ইতিহাস ও ঐতিহাসিক; পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ; জুন ১৯৮৮, কোলকাতা। পৃ. রী) ।

 

এ গদ্যের অভিমুখ রচনার পক্ষে সংগতিপূর্ণ আরেকটি উদ্ধৃতি উৎকলন করছি ভারতের আসাম  রাজ্যের অধিবাসী অধ্যাপক ইয়াসমিন সাইকিয়ার একটি লেখা থেকে :

‘ঐতিহাসিকভাবে বললে, ভারতবর্ষ সর্বদাই বহিরাগত অতিথি ও শরণার্থীদের বিষয়ে উদার ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালিদের ভারতে শরণার্থী হতে উৎসাহিত করা হয়েছিল, যার পরিণতিতে ভারতে ‘মানবিক সংকট’ দেখা দেয়। সে সময় বিপুলসংখ্যক হিন্দু শরণার্থী ভারতেই থেকে গেলেও বেশির ভাগ মুসলিম বাঙালি আবার তাদের দেশে ফিরে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে গবেষণার সময় জেনেভার রেডক্রস ইন্টারন্যাশনালের মহাফেজখানায় মূল্যবান অনেক সচিত্র দলিল-দস্তাবেজ দেখেছি, যা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, ১৯৪৮ সালে বাঙালি শরণার্থী গোষ্ঠী আসামের গুয়াহাটিতে বসত করেছে। বাংলাদেশ ভারত জেনেভা ও লন্ডনের মহাফেজখানায় পাওয়া বিভিন্ন ধরনের দলিলপত্র বলছে, গত শতকের ত্রিশের দশকেও পূর্ববাংলার মানুষ আসামে অভিবাসন ও নতুন বসতিস্থাপন করেছে। ব্রিটিশ শাসকদের দিক থেকে ব্যাপারটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, তারা চাইছিল কৃষি উৎপাদন বাড়াতে। সে সময় আসামের  মুখ্যমন্ত্রী স্যার সাদুল্লাও সরকারি মদদে তার ভোটব্যাংক বাড়াতে খুশি ছিলেন। বিশ শতকজুড়েও আসাম সরকার নীতি, ব্যবসা, চাকরি এবং/অথবা সোজাসুজি অস্তিত্বের কারণে বসতিস্থাপন করতে আসা অভিবাসীদের গ্রহণ করেছে। একটু ভালো করে বেঁচে থাকার জন্য তাদের অপরাধমূলক কাজে জড়াতে দেখা যায়নি। নিরাপদ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ খুঁজতে আসা বসতিস্থাপনকারীদের প্রতি গ্রহণমুখী মানসিকতা আমাদের দিয়েছে সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ …

 

(‘কোনো মানুষই ‘অবৈধ’ হতে পারে না’; প্রথম আলো; ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ সংখ্যা, ঢাকা)।

 

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ধৃতি দুটির তাৎপর্য এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মঙ্গোলীয় আদিবাসী ও সেটেলার বলে কথিত বাঙালিদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা রয়েছে ওখানে অবস্থান বা বসবাসের প্রশ্নে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে প্রচলিত নানা কটূক্তি কখনো-কখনো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে ইয়াসমিন সাইকিয়ার গবেষণালব্ধ অভিব্যক্তি থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র, জনপদ বা ভূখন্ডে কোনো আর্ত মানুষই অনাকাক্সিক্ষত হতে পারে না। ভারতবর্ষের সুপ্রাচীনকালের ইতিহাসও সে কথা বলছে। আর বাংলাদেশ তো ঐতিহাসিক সূত্রের সেই ধারা থেকে বিযুক্ত নয়, বরং সংগ্রথিত ও সংবদ্ধ। এ ভূ-ভাগের বাঙালি সন্তান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবিধ মনস্বী রচনা ও চিন্তাভাবনায় সেই বাণী ও ঔদার্যের উদাত্ত সমাবেশ লক্ষ করি ব্যাপক মানবিক মূল্যবোধের স্বরন্যাসে। যেমন :

 

… কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা।

হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন –

 শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন … ।

………………………………………………

রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদ কলরবে

ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত যারা এসেছিল সবে

তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে কেহ নহে নহে দূর –

আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে তার বিচিত্র সুর …

 

(‘ভারততীর্থ’; সঞ্চয়িতা- পৃ. ৫০৭, কোলকাতা)।

 

সমকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী তরুণ-তরুণীর কাব্যচর্চা  এবং তাতে ফুটে ওঠা তাদের জীবন-আকাক্সক্ষার সংবেদী অনুসন্ধান করতে গিয়ে উল্লিখিত ভূমিকাটুকু অবতারণা করা হলো। 

 

চাকমা কবিতা : নিকটে ও দূরে

ওই অঞ্চলের চাকমা সমাজ সংখ্যানুপাত ও শিক্ষা-অর্জনের বিভিন্ন অনুষঙ্গে অপেক্ষাকৃত অগ্রগামী জাতিসত্তার দাবিদার। সুকুমার শিল্পকলার চর্চায় তাদের রয়েছে কর্ষিত ভুবন। গীতিকবিতা নৃত্য নাটক  চারুকলা ও মননঋদ্ধ ভাবনাচিন্তার প্রায় সকলস্তরে চাকমা সমাজের উপস্থিতি এখন আর নতুন কোনো বিষয়ের অবতারণা নয়। কাব্যচর্চার দিকটাই এখানে আলোচনায় আনছি। চলমান একুশ শতকের শূন্য ও প্রথম দশকের চাকমা তরুণ-তরুণীরা সাইবার সংস্কৃতির এই দুর্নিবার প্রবাহের সুবাদে হৃদয় ও চেতনার গোপন কথাটির অকপট উচ্চারণে দ্বিধান্বিত নয় মোটেও। তাদের কাব্যকথার বন্ধনে উপমা-উৎপ্রেক্ষার নিবিড় নিষ্যন্দী ব্যঞ্জনা হয়ত তেমন প্রাপ্তব্য নয়। তাই বলে তা মনোযোগ আকর্ষক অনুভূতির দুয়ারকে নাড়া দেয় না, তা কী বলা যায়?  একালের ভাষায় জ্ঞাতব্য বিষয়টিকে মনোজ শব্দসম্ভারে সাজাতে চান তারা । ফলে বিদ্যুচ্চমকের মতো কিছু চিত্রপরম্পরা পাঠককে ছুঁয়ে যায় অজান্তেই। শূন্যের দশক থেকে কবিতাচর্চায় সম্পৃক্ত মুক্তা চাকমা ‘হে প্রাজ্ঞ’ নামীয় কবিতায় যেমন প্রাত্যহিক জীবনের অনুশোচনা আর অনুভাবনাকে মূর্তরূপ দেন :

 

প্রাজ্ঞ, এত কিসের গভীর ভাবনায় মগ্ন আছ তুমি?

দানাপানি নেই, ঘুম নেই দুচোখে

স্বপ্ন দেখা চোখে, বুকপোড়া কষ্টবিলাপে

সুখ কী নেই মনে?

 

ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বাজে কী শুধু প্রাণে?

হৃদয়-গহিন থেকে উৎসারিত অনুনয় আমার, উত্তর দাও-

এখনও কী তোমার প্রত্যাশার বাগানে ফুলটি ফোটেনি,

চোখে কী পড়েনি সুখপাখিকে গান গাইতে?

প্রাজ্ঞ, তুমি নির্বাক থাকলে তোমার মনের

কথাটা জানবো কীভাবে-

আমাদের ছানিপড়া চোখে তো দেখা যায় না কিছুই

প্রাজ্ঞ, লাস্যহীনার মতো মিনতি করছি

তোমাকে, উত্তর দাও-

অভিমানী কী হয়েছ আমাদের ওপর?

 

[পুষ্পকরথ (হাফিজ রশিদ খান সম্পাদিত),

মার্চ ২০০৭, পৃ. ১২৫  থেকে উদ্ধৃত]।

 

মুক্তার প্রায় সমসাময়িক তরুণ আলোড়ন খীসা। বিপুল বিশ্বের নানা আয়তনের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঢেউ তার সচেতন সত্তাকে প্রভাবিত করে। প্রান্তিক জীবনের যন্ত্রণা একদিকে, অন্য প্রান্তে বিস্তৃত সুন্দরের প্রত্যাশাগুলো বইয়ের ভাঁজে কুঁকড়ানো গোলাপের পাপড়ির মতো এখনও কেবলি দূরের প্ররোচনা হয়ে আছে বলে ভালো লাগে না তার। আলোড়ন তাই অনেক তরুণের সমস্বর হয়ে উঠতে চান এক লহমায়। হতাশার রুদ্ধ কিংবা ছায়া-ছায়া আলোময় দরজায় মোহাচ্ছন্ন করাঘাত- যার কোনো প্রসন্ন প্রতিদান নেই- প্রচ্ছন্ন মায়ার কুহেলিকায় কেবলি যা ফক্কিকার- এসবের অনুধাবনায় আলোড়ন খীসা প্রতিস্বর ধ্বনিত করেন নান্দনিক বাচনে :

 

সশব্দের নিসর্গের দিকে চিৎকার ছুঁড়ে দিয়ে

আমি ধারণ করি তোমার শব্দহীনতা

কামড়ে গুঁড়ো করি কথার পি- 

 

যেগুলো সান্ধ্যভ্রমণে তুমি পলিথিনে ভরে

           উপহার দিয়েছিলে আমাকে

 

ওই পলিথিন আজ পচে গেছে !

 

(‘উচ্ছিষ্ট আবেগমালা’, লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে) ।

 

মারমা কবিতা :  নিভৃত মননের দেউটি 

পার্বত্য অঞ্চলের মারমা জাতিসত্তার রয়েছে সারবান সাংস্কৃতিক সম্ভার। পাহাড় ও অরণ্যের দৃশ্যকল্পের ভাঁজে, ঝিরি ও ঝরনার নম্র কলতানে ওরা চিরকাল জীবনকে সাজিয়েছে নিভৃত মননের দেউটি জ্বালিয়ে। অস্তিত্বের শাশ্বত ব্যাকরণে মারমা সমাজ যোগ করেছে নতুন-নতুন উদ্দীপনা, বেদনা ও উদ্ভাসনের ধারা, উদাত্ত আর সহজতার নানা সৌরভ। কেননা জীবন নামক বহুমাত্রিক আনন্দ বেদনা হতাশা ও বিলয়ের পরিবর্তনশীল আচরণে ওরা বিশ্বাস করে অমিতাভ গৌতমের নির্দেশিত নির্বাণেই প্রকৃত পরিত্রাণ। ওই পবিত্র, বিস্তারিত অনুধ্যানে এ অবশ্যই সংহত জীবন-অভিজ্ঞতার প্রীতি ও ধৃতি। এ তো আদি, উজ্জ্বল অতীতের সংঘারাম। তারই পাশে রয়েছে বহমানকালের তারুণ্যের ‘শতজল ঝরনার ধ্বনি’ও। ওই অন্তর্লোক মানে না চিরায়তের প্রশান্ত বিধি ও বিধান। কেননা সামনে জীবনের নতুন স্পৃহা। টানে যা তাকে দুর্বার অস্থির অনুভবের তাড়নায়। এ তার সৌন্দর্যের অহংকার। অলংকারও বটে। জীবন তাকে মত্ত করে তাই জীবনেরই আহ্বানে। তাই স্বর্গ বা নরকের আদিসত্যের মোহপাশ বিচলিত করে না এ সত্তাকে। অতএব তরুণ কবি মংসিংঞো পারিপার্শ্বিকতাকে শোনাতে চান তার ইহচেতনার অনুরণন ও অভিলাষ :

 

দুটি পায়ে মাড়াবো না আমি আর

তাবতিংস স্বর্গসিঁড়ি

দুঃখ ভারাক্রান্ত মৃন্ময় পৃথিবী ফেলে

ব্রহ্মলোক কিংবা পরিনির্বাণে যাবো না

 

অর্হত্ব মার্গ ও ফল নিয়ে সিদ্ধার্থের সাথে

নির্বাণে গিয়েছ যারা, যাও

চতুরার্য সত্য বিদর্শনে এই সংসারের চক্র

ছিন্ন করবো না কোনো দিন

 

বোধিসত্ব বিশ্বন্তরের মতন নিজ কর্মফলে

জন্ম-জন্মান্তর বিপাকে-বিপাকে

বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

বাধা পড়ে আছে অসুরের সোনার শৃঙ্খলে

 

(‘সোনার শৃঙ্খল’; কাব্যগ্রন্থ : অন্তঃসত্ত্বা কার্পাসমহল ; পৃ . ২০)

 

কবিতাটিতে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বারতা আছে। জাতকের গল্পমালার চরিত্র বোধিসত্ত্ব বিশ্বন্তরের ভাগ্যলিপিকে যথাযোগ্য মান্য করেও যা নিজস্ব চৈতন্যে ফিরে আসার কথা বলে। আর তা হলো- আজকের বিশ্ববাস্তবতা। নানা প্রলোভনে বাধা পড়া এককেন্দ্রিক বিশ্বের জীবনগুলোর ব্যাপক অংশের ব্যথা-বেদনার ইতিহাস। সব জেনে-শুনেও এ গ্রহবাসী তথাকথিত জ্ঞানিজনের আত্মহুতির গল্প। ট্র্যাজেডির নতুন-নতুন মঞ্চায়ন। ‘অসুরের সোনার শৃঙ্খল’ বলে এ কবিতার স্রষ্টা মংসিংঞো যা স্মরণ করিয়ে দেন পাঠককে। বৌদ্ধমিথের পরিকাঠামোয় ধারণ করা এ অনুভূতিমালায় নতুন জীবনমন্থনের জয়াশা পাঠককে উদ্গ্রীব করে।

 

মংসিংঞো’র পরবর্তী সময়ের মারমা তরুণ অংশৈসিং মংরে। মংসিংঞো ও মংরে উভয়েই পার্বত্য বান্দরবানের সন্তান। শংখ নদীবিধৌত শৈলশহর বান্দরবান পরিযায়ী ও স্থানিক বাণিজ্যপ্রয়াসী মানুষের গমনাগমনে মুখর এক প্রাচীন জনপদ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এ জনপদ তার আশপাশের কোথাও উঁচ,ু কোথাও নমিত পাহাড়, নানা গতিবেগের ঝিরি-ঝরনার কলধারায়, পাশাপাশি নানাবর্ণের মানুষের বিচিত্র পদভারে সর্বদা সপ্রাণ। জীবনচাহিদার বিচিত্র আশা-উচ্চাশা ও উল্লাস-বেদনাকে এ শহর বাস্তবোচিত শুশ্রƒষাদান ও পরাবাস্তব প্রাণনায় প্রসারিত করে এলেও এ তরুণের পর্যবেক্ষণ ওই জীবনধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নানা কৌণিক ও জাগরচৈতন্যে। কেননা সেখানে তার চোখে কাব্যপ্রিয়তার অন্যনাম সুমিত জীবনে ছন্দহীনতার ক্রন্দন। অথচ এ তরুণের কাছে ভালোবাসার পবিত্রতা আর কাব্যচর্চা একাংগিক। এর বাইরে আলাদা করে রূপের আরাধনা তার কাছে অর্থহীনতার গোলকধাঁধা। কাজেই দেহজ রূপের জন্যে উন্মাদনায় যারা কাব্য আর ভালোবাসার বড়াই করে, তাদের বোধের সীমাবদ্ধতাকে অপাঙ্ক্তেয় মনে করেন এ তরুণ। তার সূক্ষ্ম অনুভূতি এই যে, প্রকৃত ভালোবাসার শ্রদ্ধা নিয়ে শিল্পকে, কাব্যকে হৃদয় ও চেতনায় অধিষ্ঠিত করতে হবে।

অংশৈসিং মংরের দ্বন্দ্বময় অভিব্যক্তিটি পাঠে জেনে নেয়া যাক :

 

বলো, ভালোবাসায় কী স্বাদ তুমি পাও?

জানি, মাংসের পচনধরা ফসিল তোমার

কাছে আরাধ্য

কবির যক্ষের ধন কবিতার ছন্দ

তোমার কাছে মূল্যহীন

 

তীক্ষ্ণ অনুভূতিতে তুলে ধরা

শৈল্পিক রূপের চেয়ে, দেহজ রূপ নিয়ে তুমি আত্মমগ্ন

তুমি রূপ বোঝ, শিল্প বোঝ না

শিল্পের মর্ম তোমার কাছে

অর্থহীন, অপাঙক্তেয়

 

মিনতি করি, ভালোবাসা আর শিল্পকে

এক করে দেখ না

 

ভালোবাসতে শেখো, শিল্পকে শ্রদ্ধা করো

ভালোবাসার প্রকৃত মমতায় শিল্পকে

বাঁচিয়ে রেখো অনন্তকাল।

 

[‘শিল্প’; সমুজ্জ্বল সুবাতাস (হাফিজ রশিদ খান সম্পাদিত),

ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সংখ্যা থেকে উদ্ধৃত; পৃ. ৩৩]

 

ত্রিপুরা কবিতা : উচ্চফলনশীল হৃদয়বৃত্তি

ত্রিপুরা সমাজ সুদীর্ঘকালের স্থানিক জীবনাচারের নির্যাসে এ অঞ্চলে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিম-ল রচনায় সুসামর্থ্যরে পরিচয় রেখেছেন। সুন্দরের আরাধনায় তারা বপন করেছেন প্রতিবেশিতার উচ্চলফলনশীল হৃদয়বৃত্তি ও মননশীলতার বীজ। মানবিকবোধের উচ্চাংগিক মিনারে তাদের ধর্ম ও লোকায়তিক সংস্কৃতিতে নারীর রয়েছে সাম্মানিক স্থান। একালের তরুণ ত্রিপুরা কবির যাপিত জীবনের বোধে সেই পশ্চাৎপট সমুজ্জ্বল দ্যুতিতে ধরা পড়ে। সংসারের নানা কাজ ও কর্তব্যের ক্ষুরপথে চলতে-চলতে তার মনে পড়ে, পাহাড়ের নিভৃত পল্লীতে রয়েছে যে একাকিনী- হয়তো সে তারই বোনটি, অথবা প্রতিবেশিনী কিংবা হৃদলোকে কাঁপন তোলা প্রেয়সী- যার ম্লান অথচ সুন্দর, নিষ্পাপ প্রার্থিত মুখাবয়ব তার মনে আলো জ্বালে। এক চিলতে আঙিনা বা মৌরুসি জুমভূমিতে তরি-তরকারি ও ফসলাদি ফলানোর প্রয়োজনে, সে সবের সচেতন তদারকি ও পরিচর্যায় তাকে ঢের বেশি দরকার ঘরের ঘেরাটোপে। তাই তো  মাড়াতে পারে না সে বহু দূরবর্তী, দুর্গম পথের বিড়ম্বনাভরা বিদ্যালয়ের চৌকাঠ। ওই নিস্তরঙ্গ জীবনে; কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে অপাপ-অদোষ স্বপ্নময়তায় উপনীত ওই মেয়েটিরও দাবি কী তাই বলে কম জীবনের কাছে? মেয়েটি তাই অকারণ অলস, অকারণ চঞ্চল। ভেসে বেড়াতে চায় তার মন দিগন্তের ওপারে, পাহাড়ঘেঁষা আরও দূর কোনো সব-পাওয়ার সাম্রাজ্যে। অথচ কঠিন তাৎক্ষণিকতা অনাহারী গ্রীবা বাড়িয়েই রেখেছে প্রতি পলে-পলে। স্বপান্নচ্ছন্নতা থেকে তাকে তো জাগতেই হবে বেঁচে থাকার অবলম্বনের খোঁজে। জাগাতেই হবে বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে হলেও তাদের, ঘুমিয়ে আছে যারা অন্ধকারের কালো বারান্দায়। ও একম এক সফেদ বোধে তাড়িত তরুণ মন্ত্রজয় ত্রিপুরা ডাকছেন কোনো এক পাহাড় মেয়েকে :

 

তোমাকেই বলছি হে পাহাড়ি মেয়ে

ওঠো, জুমে যাবার সময় হয়েছে

থ্রুঙ -এ ভরে নাও ভাতের মোচা

তরি-তরকারি

দা, থালাবাটি

 

আর দেরি করো না, ওঠো

পাছে লোকে তোমাকে ভুল বুঝবে

 

তুমি চোখ মেলে একটিবার চেয়ে দেখো

গাঁয়ের অন্য মেয়েরা সবাই ওঠে চলে গেছে

যে যার জুমে

তুমি তাদের পিছু ধরবে নাকি

সামনে এগিয়ে যাবে?

 

তোমার জীর্ণতা তোমার আলসেমি

কিংবা পিছুটান

সবই তোমাকে ভাঙতে হবে

 

তোমার দেহের উষ্ণতা

তোমার মনের শক্তি

তোমাকেই জাগাতে হবে

 

তাই বলছি, হে পাহাড়ি মেয়ে

রূপের মোহে নীরবে আর অহল্যা

পাথরের মতো ঘুমিয়ে থেকো না

ওঠো, ওঠো পাহাড়ি মেয়ে

তোমার-আমার সংসার

তোমার-আমার ভবিষ্যত

গড়ে নিতে হবে দুজনে মিলেই।

 

(‘তোমাকেই বলছি’; কাব্যগ্রন্থ : পাহাড়ি মেয়েটি;

পৃ. ৫৪; প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০৭)

 

 

খাগড়াছড়ির মথুরা ত্রিপুরার একটি নিরাভরণ কবিতায় পার্বত্য জনপদের আরেক দগদগে, ছেঁড়াখোঁড়া আলেখ্য ফুটে উঠতে দেখি :

 

স্বপ্নের জুমখেত ঢেকে যায়

সন্ত্রাসের কালো ছায়ায়

দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ধুলোয় ধূসরিত সবুজ প্রান্তর

ভালোবাসার বুক চিরে রচিত কাঁটাতারে বেষ্টনী

বৈরী বাতাসে কেমন করে যেন

বেঁচে আছি!

 

তবুও পাহারা দিয়ে যাই একাকী

নিরাকার স্বপ্নের পাহাড়

 

সযতনে লালিত এ স্বপ্ন

সন্ত্রাসের হেফাজতে চলে যাবে না তো?

 

(‘উদ্বাস্তু স্বপ্ন’; হাফিজ রশিদ খান রচিত ‘অরণ্যের সুবাসিত

ফুল’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত; পৃ. ৪৮; প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০৯)।

 

মথুরা আসলে ‘দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ধুলোয় ধূসরিত সবুজ প্রান্তর’ দেখে শংকিত অজস্র সত্তার কথাই বলছেন সম্বুদ্ধ একক কণ্ঠে। এ কবিতা তাই ভ্রাতৃঘাতি ও নানা জটিল-কুটিল ঘটনায় রোমকূপ খাড়া করা অন্য এক পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে আসে সামনে। গণমাধ্যমের সুবাদে ওই অঞ্চলে কখনও যাওয়া হয়নি- অথচ জনবৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক রূপময়তার গল্পে যাদের ভালোলাগে ওই জনপদকে, বাংলাদেশের এমন কোনো নাগরিকের চোখে ‘দ্বন্দ্ব-সংঘাতে’র এ ছবিটি ভীতিপ্রদ ও বেদনাবহ বৈকি। মথুরার কবিতার সুবাদে স্বদেশের একটি অংশে রাজনৈতিক মত ও পথভিন্নতার এমন চিৎকার, দলাদলি, সংঘবদ্ধ রক্তারক্তি, পাহাড়ের পাদদেশে, চিরল ঝিরির বুকে যুবজনের লাশ, নিশ্চয়, বেদনা আনে অপার। এটি সুবিদিত যে, তিন পার্বত্য জেলায় সাংবিধানিক অধিকারসমূহ সমুন্নত ও পরিচর্চিত রাখার প্রয়োজনে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সমান্তরালে কয়েকটি আঞ্চলিক দলও সেখানে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। বহু জাতিসত্তা ও নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতার অনুরোধে ওই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু আলাদা দাবি ও প্রত্যাশার কথাও অজানা নয় এখন বাংলাদেশের নাগরিক সমাজে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী জনসংহতি সমিতি ও চুক্তির বিরোধিতাকারী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি ওই প্রত্যাশার কথাগুলো উচ্চারণ করছে পৃথক অবস্থান থেকে। এ দ্বন্দ্বমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাহাড়ি জনপদে বহু রক্ত ও অশ্রুময় আখ্যানের জন্ম দিয়েছে ইতোমধ্যে। এছাড়া এ জনপদে প্রাকৃতিক সম্পদপ্রাপ্তির বিপুল প্রত্যাশায় নিত্য স্বার্থান্বেষী নজর রেখে চলেছে এমন নানা বিচিত্র দল-উপদলের উপস্থিতিও কী কম? ওই বস্তুগত লাভ-অলাভের প্রশ্নে এরাও এখানে নানাবিধ অপকর্মে লিপ্ত নয়, এ কথা কে বলবে জোর দিয়ে? অবাধ তথ্যপ্রবাহের উৎসগুলো এ বারতাও তো নিয়ে আসছে সামনে প্রতিনিয়তই। মথুরা ত্রিপুরার কবিতাটি এ রকম এক অচেনা বিপন্নতার দিকে ইংগিত রেখে নিভৃত ক্রন্দনের মতো আবহ ছড়ায় মনে।

 

 

তন্চংগ্যা কবিতা : আলোর

জন্যে আবেগঋদ্ধ ইতিকথা

এ সময়ের তন্চংগ্যা তরুণদের মনের জগতও পার্বত্য জনপদের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অনুষঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে আলোড়িত, উন্মীলিত। এর একটি হল : বিগত বিশ শতকের ষাটের দশকে বাস্তবায়িত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। বলা হয়ে থাকে, সে কালের বৃহত্তর জনপদে বৈদ্যুতিক আলো পৌঁছানোর একচোখো উপনিবেশিক সিদ্ধান্তের খেসারতে পার্বত্য রাঙামাটি ও আশপাশের অসংখ্য আদিবাসী মানুষের বসতভিটিসহ চাষাবাদের জমিজিরোত ওই কৃত্রিম হ্রদের গর্ভে হারিয়ে যায়। সে আলো বিতরণ-ব্যবস্থা তাদের জীবনকে হাহাকার ও বিষাদের কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছে আর গুঁড়িয়ে দিয়েছে গোত্রীয় সংহত জীবনের স্বপ্ন। এই ট্র্যাজেডির বেনদাঘন অনুভূতি থেকে পাহাড়ে রচিত হয়েছে বেশুমার আবেগঋদ্ধ ইতিকথা, আখ্যান ও লোককবিতার ভান্ডার। ওই ঘটনাটি তাদের জীবনে আজো অতীতের বেদনা সঞ্চয় হয়ে আছে দগদগে ক্ষতের মতো। যদিও পারিপার্শ্বিক নানা উপায়-উপকরণে ওই উন্নয়ন-উদ্বাস্তু জীবনে সান্ত¡না প্রদানের প্রয়াস নেয়া হয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। তা সত্ত্বেও পরম্পরাবাহিত ওই বিষয়টি তরুণ প্রজন্মের অন্তরকে চঞ্চল, ব্যথিত, অতপর এক ধরনের নেতিবাচক রোমান্টিকতায় নিক্ষেপ করে। ফলে সন্দেহপ্রবণ সরল মন অবিশ্বাসী নজরে বিচার করতে চায় রাষ্ট্রপক্ষে গৃহীত ও বাস্তবায়নেচ্ছু সকল উদ্যোগ, আয়োজনকে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের ওই গ্লানিময় মনস্তাপ প্রাঞ্জল উপমার আড়ালে কথারূপ পেয়েছে কর্মধন তন্চংগ্যার একটি কবিতায় :

 

আমার সৌন্দর্য দেখে সবাই মুগ্ধ হয়

কিন্তু আমি জানি আমার জন্ম কেমন

করে হয়েছে,

মা থেকে শুনেছি- স্বাভাবিকভাবে আমার

জন্ম হয়নি, করা হয় ওপেন সার্জারি।

মায়ের শরীরের অজস্র রক্ত, গগনচুম্বী  

চিৎকার অশ্রুজল আর

আত্মীয়স্বজনের চোখের জলে

অবশেষে আমার জন্ম হয়।

 

দিনে দিনে বড়ো হচ্ছি।

 

মা-বাবার আশা ছিল

তাদের রক্তের দাম আমি ফিরিয়ে দেবো-

কিন্তু তা আর হলো না, কামার্ত শূকরের

তীক্ষ্ণ নখরের থাবায়

আজ আমি বিবস্ত্র এক পতিতা

বর্ষার অঋতুস্রাবে-

শীতের দিনে ব্লাউজ ছিঁড়ে জেগে ওঠে

আমার স্তনের চর।

গায়ের ওপর প্রমোদতরী নৃত্য করে-

আমার সৌন্দর্য দেখে তাদের প্রিয়ার

কথা মনে পড়ে।

আলো উৎপন্ন হয়- দেহময় আলো, কিন্তু

তার পাশে আমার দুঃখিনী মায়ের

অন্ধকার ‘ছিদাকলা’আমাকে বাক্যহীন করে দেয়

আমি আর পারি না সইতে- মায়ের

নীরব কান্না;

আত্মীয়স্বজনের গগনস্পর্শী প্রলাপ;

কিন্তু কী করবো আমি, আমার

আত্মীয়স্বজন যে এখনো অন্ধকার জেলে বন্দী-

অধিকারহীন, চিরদুঃখী।

 

তবু আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন অন্ধকার

কেটে যাবে, আলো ফুটবে

বেঁচে থাকবো আমি ধরিত্রীর সন্তান হয়ে।

 

ছিদাকলা : তন্চংগ্যা শব্দ: শ্মশান

(বিবস্ত্র পতিতা; অরণ্যের সুবাসিত ফুল; পৃ. ৩৩-৩৪)

 

এ সময়ের আরেক তরুণ পালাশ তন্চংগ্যার অনুভূতিতেও বেদনার ঘনমেঘের ভার। তার শব্দসজ্জায় হতাশার বিপুল অবয়ব প্রত্যক্ষ করা যায়। কোন  উৎস থেকে এ না-পাওয়া বা নিঃস্বতার উৎসারণ কবিতাটিতে তার স্পষ্ট নির্দেশনা না-থাকলেও একটা আবহ পাঠকের অনুভূতিকে ঘিরে রাখে কিছুক্ষণ। বিশেষ করে ‘হারাবার কিছু নেই’- এমন নেতিবাচক অভিমান নিয়ে উচ্চারিত হতে থাকা কবিতাটি কোথাও ন্যূনতম আশা বা আলোর ঝলক আনে না। দেখা যাচ্ছে, তরুণ প্রাণের হৃদয়ঘটিত প্রেমাকাক্সক্ষাও এ শব্দ-উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রভূমি নয়। এ কী পূর্ববর্তী কর্মধন তন্চংগ্যার কবিতায় বিধৃত অনুভূতিরই আরেক সম্প্রসার, নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামের গোত্রবিভক্ত রাজনীতিময় চাওয়া-পাওয়ার চোরাবালিতে দিশার সন্ধান হাতড়ে বেড়ানো দুর্বলের আহাজারি? অন্যদিকে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের আগে যে-গোলযোগপূর্ণ বাস্তবতায় ওই অঞ্চলের মানুষগুলোকে নিত্য পরিযায়ী জীবনের ক্লেদ ও গ্লানিমা বয়ে বেড়াতে হতো, তার বিভীষিকাময় স্মৃতির দিকেও এ শব্দমালা চকিত ইংগিত তুলে ধরে। যেখানে কবি বলছেন : ‘শান্তির জন্য আমি হন্যে হয়ে ঘুরি মরি। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে…’।

এ প্রসঙ্গে পাঠকের মনে আসতে পারে ওই অঞ্চলের জন্যে সরকারিভাবে গঠিত ‘অভ্যন্তরীণ শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্স’-এর কথা। কবিতাটি পড়া যাক এবার :

 

হারাবার কিছু নেই

কী-ইবা থাকতে পারে আমার,

জীবনের সামান্য সম্বলটুকুও নেই আজ-

ঘৃণায় ভরে গেছে আমার পৃথিবীর চারপাশ,

আশার আলো চিরতরে ডুবে গেছে

হতাশার মাঝে।

বিশ্বাস শব্দটুকু মন থেকে মুছে গেছে সেই কবে;

সোনালি স্বপ্নরাও অবিশ্বাসের স্রোতে

ভেসে গেছে অন্ধকারের সাগরে

 

এতো বড়ো পৃথিবী মনে হয় যেন একটি

ছোট্ট বালুকণা,

সুখ শব্দটি খুঁজে পাই না কোথাও;

বাঁচার অমৃত স্বাদটুকু আজ তিক্ততায় ভরা।

জীবনের কোনো কিছুর প্রতি নেই সামান্য ভরসা;

সবকিছু দিনের পর দিন

ভরে যাচ্ছে নোংরা বাতাসে;

শান্তির জন্য আমি হন্যে হয়ে ঘুরে মরি

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে-

তার অস্তিত্ব খুঁজে পাই না কোথাও।

 

চারদিকে অসহায় মানুষের মরণের

শেষ চিৎকার;

মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই আমার কোথাও-

 

কী হবে বেঁচে, এভাবে?

 

(কী হবে বেঁচে ? ঐ; পৃ. ৩৬)

 

‘ইয়ান আমার দেজ, ইয়ান বেগর দেজ …’

পৃথিবীর সৌন্দর্যের শেষ নেই। দেশে-দেশে প্রাকৃতিক শোভামতি  জনপদ বা ভূভাগের খবরও মানচিত্রে কম নেই। দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট্ট রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সেই সুদূর ঐতিহাসিককাল থেকে এর কৃষিজীবী ভাবুক সন্তানেরা এ ভূখ-কে মাতৃময়ী চেতনায় বন্দনা করেছে। এ চৈতন্যের পেছনে রয়েছে তাদের সতত জাগ্রত অস্তিত্ববাদী সত্তা। এ  কোনো বিরল, অদ্ভুত মন-মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়। প্রত্যেক দেশে- যেখানে রয়েছে মানুষ নামের সচেতন সত্তাসমূহের বসবাস কিংবা সচল, সপ্রাণ অভিযোজনের ইতিবৃত্ত, সেখানেই এ বন্দনা জৈব আকাক্সক্ষার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাসনের মতোই সুলভ, দুর্নিবার। এ প্রবণতা আপাত তরঙ্গহীন, অথচ অবিসংবাদিতভাবে নিয়মতান্ত্রিক। একই অবস্থার প্রতিরূপ প্রত্যক্ষ করা যায় পার্বত্য অঞ্চলের কবি ও শিল্পীদের মনোজগতে। সম্প্রসারণে সংস্কৃতির নান্দিকারদের বাচনে, রচনে কিংবা বৃহত্তর নানা বিভাসে। যেমন একটি চাকমা গানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দেশ, মানুষ ও পরিপার্শ্বের সুনাম :

 

… ঝিমিত ঝিমিত জুনি জ্বলে

          মুড় দেজর দেবা তলে

                ইয়ান আমার দেজ

                        ইয়ান তমার দেজ

          

                ইয়ান বেগর দেজ …

 

(দেবজ্যোতি চাকমার গান; রঞ্জিত দেওয়ানের সুর; রিপন চাঙমা সম্পাদিত

ছোটোকাগজ ‘আপেং’ থেকে উদ্ধৃত।  বৈসাবি ২০১০ সংখ্যা, রাঙামাটি)।

Facebook Twitter Email