বৃন্দাবন

Facebook Twitter Email

অক্তাবিও পাস

অনুবাদ: সাজ্জাদ শরিফ

 মেহিকোর কবি অক্তাবিও পাস (১৯১৪-১৯৯৮) ছয় মাসের জন্য প্রথম ভারতবর্ষে আসেন ১৯৫১ সালে, অকিঞ্চিৎকর কূটনৈতিক কাজে। ১৯৬২ সালে দীর্ঘ ছয় বছরের জন্য আবার আসেন রাষ্ট্রদূত হয়ে- পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের দায়িত্ব নিয়ে। ভারতবর্ষ তাঁর জীবন পাল্টে দেয়। এ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রথমে বেরোয় একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ, ইস্ট স্লোপ। পরে গদ্যপদ্যের আরও বহু বই। তিনি বলতেন, গদ্যগুলো ভারতবর্ষ নিয়ে লেখা তাঁর কবিতার টীকাভাষ্য মাত্র। ‘বৃন্দাবন’ কবিতাটি ইস্ট স্লোপ থেকে নেওয়া। এটি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কবিতাগুলোর একটি। পাস ১৯৯০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

 

রাত্রিঘেরা

নিঃশ্বাসের বিশদ কানন

স্পর্শাতীত মস্ত যবনিকা

গুঞ্জরণময়

    লিখি আমি

থামি

    আমি লিখি

 

    (সবই আছে কিংবা নেই

আর, সবই ছিন্ন হয়ে ঝরে পড়ে পৃষ্ঠার ওপর

শব্দহীনতায়)

 

    এইমাত্র

পথ ধরে একটি শকট ছুটে গেল

অবসিত দালানের ভিড়ে

    আমি ছুটে চলি

আমার দীপিত যত চিন্তার ভেতরে

তারাপুঞ্জ মাথার ওপর

    এমনই এ প্রশান্ত উদ্যান

ছিলাম উদ্ভিদ আমি করেছি আলাপ

ছিলাম আবৃত হয়ে পত্রালি ও চোখে

ছিলাম গুজব তার সম্মুখতাড়িত

প্রতিমার ঝাঁক

 

(বসেছি এখন কিছু কিছু

প্যাঁচানো আঁচড়

    সাদা পটে কালো

বাতির আলোয় পোঁতা

ক্ষীণকায় অক্ষরবাগান)

 

শকটটি ছুটে চলে

নিদ্রায় বিভোর এই শহরতলিতে

    আমি ছুটে চলি

আমার চিন্তার পিছু পিছু

    আমার ও অপরের

স্মৃতি এঁটো কল্পনাভাবন

নামাবলি

    স্ফুলিঙ্গের অবশেষ

    হাস্যরোল বিলম্বিত রাতের আড্ডায়

    প্রহরের নাচ

    নক্ষত্রপুঞ্জের কুচকাওয়াজ

আর যত গড্ডলপ্রবাহ

আমার বিশ্বাস সে কি মানুষে না

    তারকারাজিতে?

আমি তো বিশ্বাস করি

    (সূচনা এখান থেকে

বিন্দুপ্রবাহের)

    আমি দেখি

 

আবহাওয়া-নিষ্পেষিত স্তম্ভের সারির দহলিজ

মড়কে খোদাই হওয়া ভাস্কর্যপ্রতিমা

দুই সারি ভিক্ষাজীবী

    আর নর্দমার আবরণ

সিংহাসনে আসীন সম্রাট

    পরিবৃত

সুগন্ধীর আসা ও যাওয়ায়

যেন বা রক্ষিতা তারা

শুদ্ধ প্রায় শরীরী কায়ায় তরঙ্গিত

চন্দনসুরভি থেকে বেলিচামেলিতে

আর তার প্রচ্ছায়াশরীর

পচন

    রূপের জ্বর

    সময়ের জ্বর

চূড়ান্ত আনন্দময় সব কিছু একাকার হয়ে

ময়ূরের পুচ্ছ এই বিশ্বচরাচর

অগণন চোখ

    অন্য সব চোখে ফুটে ওঠে

সমন্বয়

    প্রতিধ্বনি একটি চোখের

একটি নির্জন সূর্য

    লুক্কায়িত

তার যত স্বচ্ছতার বস্ত্রের আড়ালে

তার যত বিস্ময়ের জোয়ারভাটায়

সবকিছু অগ্নিময়

    পাথর রমণী জল

সবকিছু প্রস্তরিত

    রঙ থেকে রূপ

রূপ থেকে অগ্নিশিখা

    সবকিছু অপস্রিয়মাণ

কাঠ ও ধাতুর গান

দেবতার কুঠুরিতে

    মন্দিরের জরায়ুগহ্বরে

গান

যেন হাওয়া ও পানির আলিঙ্গন

আর শব্দজটের ওপরে ভেসে আছে

মানুষেরই স্বর

মধ্যদিনে তাপিত চন্দ্রিমা

বিদেহী আত্মার শিলালেখ

 

(লিখি আমি না জেনেই আমার লেখার

পরিণতি

    চোখ রাখি দুই চরণের মাঝখানে

আমার প্রতিমা বাতি

    জ্বলে

মধ্যরাতে)

 

    ঠগবাজ

পরমের হনুমান

    কুণ্ঠায় কাতর

আঁকশি

    বিবর্ণ ছাইয়ে ঢাকা

এক সাধু তাকায় আমার দিকে হাসে

যখন আমাকে দেখে আরেকটি তীর থেকে

    সুদূর, সুদূর

যেন প্রাণী যেন সন্ত আমাকে সে দেখে

দিগম্বর  জটাধারী  কালিমালাঞ্ছিত

চোখজোড়া তার এক নিবদ্ধ কিরণ এক খনিজ ঝলক

তার সাথে বলতে চেয়েছি আমি কথা

পেটের গুড়গুড় শব্দে সে আমার জবাব দিয়েছে

    গেছে  গেছে

কোথায়?

    সত্তার কোন চরাচরে

অস্তিত্বের কোন অবয়বে

    কোনো পৃথিবীর অপার হাওয়ায়

কোনো কালসীমানায়?

 

    (আমি লিখি

প্রতিটি অক্ষর বীজ

    স্মৃতি

চাপায় জোয়ারভাটা তার

এবং ফিরিয়ে আনে তার নিজ মধ্যাহ্নপ্রহর)

 

গেছে  গেছে

    সন্ত  দুরাচার  সন্ত

ক্ষুধা কিংবা মাদকের তূরীয় দশায়

হয়তো সে কৃষ্ণকে দেখেছে

    নীল গাছ অগ্নিচ্ছটাময়

খরায় ছিটকিয়ে বয় আঁধার ফোয়ারা

হয়ত সে শিলার ফাটলে

দেখেছে নারীর দেহরূপ

    এর ভাড়া

নিরাকার ঘোর

    কী যে অজুহাতে

শ্মশানঘাটে সে বাস করে

 

জনহীন পথ

ঘরবাড়ি আর তার ছায়া

সবই এক সকলই আলাদা

শকটটি ছুটে চলে

    আমি শান্ত

আমার ছুটন্ত যত চিন্তার ভেতরে

 

(গেছে  গেছে

সন্ত  ভাঁড়  সন্ত  ভিক্ষাজীবী  স¤্রাট  শাপিত

এই হলো এক

    সব সময়েই এক

    একেরই ভেতর

নিজের ভেতরে সব সময়েই হতে হয়

একে সমাপন

    নিজের ভেতরে সমাপন

ক্ষয়িত প্রতিমা)

 

    গেছে  গেছে

আমাকে সে দেখেছে আরেক তীর থেকে

    আমাকে সে দেখে

অনন্ত দুপুর থেকে তার

আমি আছি ভ্রমণপ্রহরে

শকটটি ছুটে চলে দালানের ভিড়ে

বাতির আলোয় লিখি আমি

পরম অশেষ

আমার বিষয় নয়

    তাদের সুদূরতম পাড়া

জীবনের মরণেরও জন্য এই আমি ক্ষুধাতুর

যা জানি তা জানি আমি আর তা-ই লিখি

সময়ের মূর্ত রূপ

    কাজ

সেই বিচলন যাতে সত্তাসমুদয়

প্রস্তরিত এবং বিলীন

প্রহরকে ধরে রাখা চেতনা ও হাত

আমি ইতিহাস

    আমি স্মৃতি নিজেকে যে উদ্ভাবনে রত

আমি তো নিঃসঙ্গ নই

আমার তোমার সাথে অনন্ত আলাপ

    তোমারও আমার সাথে অন্তহীন কথা

অন্ধকারে যাই আমি

    আমি পুঁতে দিই চিহ্নমালা

Facebook Twitter Email