বিড়ালদের শহর : হারুকি মুরাকামি

Facebook Twitter Email

 

হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে, জাপানের কিওতো শহরে। টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নাটক বিষয়ে পড়াশুনা করেন। পড়াশুনা শেষ করে তিনি একটি জ্যাজ বার খোলেন টোকিওতে। তিনি ও তাঁর স্ত্রী, ইয়োকো মিলে পরিচালনা করেন এই বার। গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি মুরাকামি নন-ফিকশনও লিখেছেন। এছাড়া তিনি একজন দৌড়বিদও, অংশ নিয়েছেন ম্যারাথন দৌড়ে। মুরাকামির গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে: এখানে বাতাস গান গায় (১৯৭৯), পিনবল ১৯৭৩ (১৯৮০), বুনো ভেড়ার মৃগয়া (১৯৮২), নরওয়েজীয় অরণ্য (১৯৮৭), নাচো নাচো নাচো (১৯৯৭), সীমান্তের দক্ষিণ, সূর্যের পশ্চিম (২০০০), স্পূটনিক সুইটহার্ট (২০০১), সৈকতে কাফকা (২০০৫), ১কিউ৮৪ (২০১১) ইত্যাদি। যেসব পুরস্কার পেয়েছেন: গাঞ্জো পুরস্কার (১৯৭৯), নোমা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২), তানিজাকি পুরস্কার (১৯৮৫), ইয়োমিউরি পুরস্কার (১৯৯৫), ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি পুরস্কার (২০০৬), ফ্রাঙ্ক ও’কননর আন্তর্জাতিক ছোটগল্প পুরস্কার।

 

তেংগো কোয়েনজি স্টেশনে ফিরে আসা দ্রুতগামী ট্রেন চৌলাইনে উঠল। বগিটা ছিল বেশ ফাঁকা। সেদিন কোনো কিছুরই পরিকল্পনা ছিল না তার। কোথায় যাবে আর কী করবে (বা করবে না) তা ছিল পুরোপুরিই তার নিজের মর্জি। সেটা ছিল গ্রীষ্মের এক বাতাসহীন ভোরবেলা আর ছিল প্রখর সূর্যের তাপ। ট্রেনটা শিনজুকু, ইয়ৎসুয়া, ওচানোমিজু পেরিয়ে গেল আর পৌঁছাল টোকিও সেন্ট্রাল স্টেশনে। সেটাই ছিল পথের শেষ। সবাই নেমে পড়ল আর কেতা বজায় রেখে তেংগোও নেমে পড়ল। বসল একটা বেঞ্চির উপর। ভাবল কোথায় গেলে ভালো হয়। “যদি চাই তো যে কোনো জায়গায় যেতে পারি,” নিজেকেই বলল সে। “মনে হচ্ছে দিনটা খুব গরম যাবে, সমুদ্র উপকূলে যাওয়া যায়।” সে মাথা তুল এবং প্লাটফরম নির্দেশিকাটি পড়ল।

 

সেই মুহূর্তে, সে অনুধাবন করল এতক্ষণ ধরে সে কী করে আসছিল।

 

কয়েকবার সে মাথা ঝাঁকাবার চেষ্টা করল কিন্তু মাথায় খেলে যাওয়া ভাবনাটা কিছুতেই গেল না। সম্ভবত কোয়েনজি স্টেশনে চৌলাইন ট্রেনে ওঠার সময়ই সে অচেতনে মনস্থির করে ফেলেছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল, একজন স্টেশন-কর্মচারীকে জিগ্যেস করল, চিকুরা যাবার সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ কোনটি। লোকটা ট্রেন-সময়সূচির মোটা খ-টির পাতা উল্টে গেল। বলল, তাতেইমার দিকে সাড়ে এগারটার স্পেশাল এক্সপ্রেস ট্রেন ধরতে হবে এবং সেখান থেকে লোকালে উঠে চিকুরা; দুইটার অল্প কিছুক্ষণ পরেই সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। তেংগো টোকিও চিকুরা আসা-যাওয়ার টিকেট কাটল। তারপর স্টেশনে একটা রেস্তরাঁয় গিয়ে ভাত-তরকারি আর সালাদ দিতে বলল।

 

বাবাকে দেখতে যাওয়া ছিল একটা বিষাদঘন ব্যাপার। লোকটাকে সে কখনোই ততটা পছন্দ করে নি, আর তার বাবারও তার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিল না। চার বছর আগে তিনি অবসর নিছিলেন, তার কিছুকাল পরেই ঢুকছিলেন চিকুরার স্বাস্থ্যনিবাসে যেটি বিশেষত ছিল মাথা খারাপ রোগীদের জন্য। তেংগো সেখানে দুবারের বেশি যায় নি- প্রথমবার গেছিল তিনি ওখানে ওই ব্যবস্থাটি গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই, যখন একটা প্রক্রিয়াগত সমস্যায় তেংগোর দরকার পড়ল, যেহেতু সে ছিল একমাত্র আত্মীয়, সেখানে তাকে লাগবে। দ্বিতীয়বারও যেতে হয়েছিল প্রশাসনিক কোনো একটা ঝামেলার কারণে। এই দুবারই, ব্যস।

 

স্বাস্থ্যনিবাসটি দাঁড়িয়ে আছে সৈকতের ধারের একটা বড় জমির উপর। অভিজাত একটি পুরানো কাঠের ভবনের পাশে তিনতলা কংক্রিটের ভবনটা ছিল একটা অদ্ভুত সমন্বয়। ছিল বিশুদ্ধ বাতাস, আর ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া জায়গাটি ছিল সর্বদা শান্ত। বাগানের প্রান্ত বরাবর লাগানো পাইন-বীথিকা গড়ে তুলেছিল একটা সারি। চিকিৎসা সুবিধা ছিল দুর্দান্ত। তার স্বাস্থ্য-বীমা, অবসরের বোনাস, সঞ্চয় এবং পেনশন দিয়ে তেংগোর বাবা হয়তো নিজের বাকী জীবনটা বেশ আরামেই কাটাতে পারবেন। তিনি অবশ্যই পেছনে কোনো বিশাল উত্তরাধিকার রেখে যাবেন না, কিন্তু অন্তত তার যতœটা ভালোভাবে হবে, যার জন্য তেংগো খুবই কৃতজ্ঞ। বাবার কাছ থেকে তার কোনোকিছু পাবার কিংবা তাকে কিছু দেবার অভিলাষ নেই। তারা দুজন আলাদা মানব সত্তা, যারা এসেছে একেবারেই আলাদা জায়গায় এবং আছেও আলাদা  জায়গায়। দৈবাৎ তারা কিছু বৎসরকাল একসঙ্গে কাটিয়েছে- ব্যস। এটা লজ্জাজনক যে ব্যাপারটি এমন হয়েছে, কিন্তু তেংগোর এতে একেবারেই কিছু করার ছিল না।

 

তেংগো তার বিল শোধ করল এবং প্লাটফরমে গেল তাতেইমার ট্রেনের অপেক্ষা করতে। তার সহযাত্রী ছিল সুখী দেখতে কিছু পরিবার যারা কয়েকটা দিন সমুদ্র সৈকতে কাটাতে যাচ্ছে।

 

প্রায় সবাই রোববারকে দেখে বিশ্রামের দিন হিসেবে। তার শৈশবজুড়ে, যাহোক, তেংগো রোববারকে কখনো আমোদের দিন হিসেবে দেখে নাই। তার জন্য রোববার ছিল কদাকার চাঁদের মতো যা কেবল তার অন্ধকার পিঠটাই দেখায়। যখন সপ্তাহ শেষ হতো, তার সমস্ত শরীর আলসেমি আর ব্যাথায় ভরে উঠত, আর তার ক্ষুধা যেতো গায়েব হয়ে। সে এমনকি প্রার্থনা করতো যেন রোববারগুলো না আসে, যদিও তার প্রার্থনা কখনো কবুল হয় নি।

 

তেংগো যখন বালক, তার বাবা জাপানের আধা-সরকারি রেডিও ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনএইচকে-র গ্রাহক চাঁদা সংগ্রহের কাজ করতেন। আর, প্রতি রোববার তেংগোকে সঙ্গে নিতেন যখন তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে পাওনার জন্য দেনদরবার করতে যেতেন। তেংগোকে এই ঘোরাঘুরিতে যাওয়া শুরু করতে হয়েছিল তার কিন্ডারগার্টেনে ঢোকার আগে এবং এটা চলেছিল পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠা পর্যন্ত, কোনো একটি সপ্তাহের বিরতি ছাড়া। তার ধারণা ছিল না যে, এনএইচকের অন্য সংগ্রহকারীরাও রোববারেই কাজ করে কিনা, তবে তার যতদূর মনে পড়ে, তার বাবা তেমনি করতেন। তার বাবা এমনকি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উদ্যম নিয়ে করতেন- তার একটাই কারণ হতে পারে, রোববারগুলিতে তিনি তাদের পেতে পারতেন যারা অন্য দিনগুলিতে কাজের কারণে বাইরে থাকতেন।

 

ঘোরাঘুরিতে তাকে সঙ্গে নেবার পক্ষে তেংগোর বাবার কিছু যুক্তি ছিল। একটা কারণ ছিল তিনি বালক বয়সী তেংগোকে একা বাসায় রেখে যেতে পারতেন না। সপ্তাহের অন্যদিন কিংবা রোববারগুলিতে তেংগো ইশকুল বা শিশুযতœকেন্দ্রগুলিতে যেতে পারতো কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলি রোববারে বন্ধ থাকতো। অন্য কারণ যেটা তেংগোর বাবা বলতেন, একজন বাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি সন্তানকে দেখাবেন কী ধরনের কাজ তিনি করেন। একজন শিশুর আগেভাগেই জানা উচিৎ কোন ধরনের কাজ তাকে পরিপোষণ করছে এবং তার কদর করা উচিৎ শ্রমের গুরুত্বকে। তেংগোর বাবাকেও কাজ করতে পাঠানো হয়েছে তার বাবার খামারে, রোববারের মতো অন্যান্য দিনেও, যে সময় থেকে তার কোনো কিছু বোঝার বয়স হয়েছে। কর্মব্যস্ততার মরশুমগুলিতেও এমনকি তাকে ইশকুলের বাইরে রাখা হয়েছে। তার জন্য এরকম জীবনটাই লেখা ছিল।

 

তেংগোর বাবার তৃতীয় এবং চূড়ান্ত যুক্তিটি ছিল আরও বেশি বিচক্ষণ, সেটাই ছিল কারণ যা তার সন্তানের হৃদয়ে গভীর ক্ষত রেখে গেছিল। তেংগোর বাবা খুব ভালো করেই সচেতন ছিলেন একটা ছোটো শিশু সঙ্গে থাকলে তার কাজটা সহজতর হয়। এমনকি যেসব লোক চাঁদা না দেবার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ মাঝে মধ্যে তারাও টাকা দিয়ে বসে যখন একটা ছোট্ট ছেলে তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, সবচেয়ে কঠিন রাস্তাগুলো রোববারের জন্য রেখে দেবার সেটাই ছিল কারণ। তেংগো শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে, এই ভূমিকাটাই তার বাবা চাইতেন, আর সে চূড়ান্তভাবে ঘৃণা করতো এটা। তবে সে এটাও অনুভব করতো যে যতটা চালাকির সঙ্গে পারা যায় অভিনয়টা তাকে করতে হবে যাতে তার বাবা খুশি হন। সে তার বাবাকে খুশি করতে পারলে সেদিন বাবা তার সঙ্গে সদয় আচরণ করতেন। যেন সে ছিল একটা প্রশিক্ষিত বানর।

 

তেংগোর একটা সান্ত¡না ছিল যে বাবার কারবার ছিল বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে। তারা থাকতো ইচিকাওয়া শহরের বাইরে উপশহরীয় আবাসিক জেলায়, আর তার বাবাকে ঘোরাঘুরি করতে হতো শহরের কেন্দ্রে। অন্ততপক্ষে সে তার সহপাঠীদের বাড়িগুলি থেকে চাঁদা সংগ্রহের ব্যাপারটা পাশা কাটাতে সমর্থ হতো। মাঝে মধ্যে, যদিও শহরকেন্দ্রের বাণিজ্যিক এলাকায় হাঁটাহাঁটির সময় দু’একজন সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত রাস্তায়। যখন এটা ঘটতো সে তার বাবার পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিতো যাতে তাকে দেখা না যায়।

 

সোমবারের সকালগুলোতে তার ইশকুলের বন্ধুরা খুব উত্তেজিতভাবে আগের দিন তারা কোথায় গেছে, কী করেছে, এসব বলতো। তারা যেত প্রমোদ-উদ্যানে এবং চিড়িয়াখানায় আর বেসবল খেলতে। গ্রীষ্মে তারা যেতো সাঁতার কাটতে আর শীতে যেত স্কিইং করতে। কিন্তু তেংগোর বলবার কোনো বিষয় ছিল না। রোববারের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে এবং তার বাবা অপরিচিতদের বাড়ির দরজায় বেল বাজাত, তাদের মাথা নমিত করে দাঁড়াত এবং দরজায় যারা আসতো তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো। যদি লোকেরা দিতে না চাইতো তার বাবা তাদেরকে শাসাত কিংবা তোষামোদ করতো। যদি তারা না দেবার চেষ্টা করতে যেত তার বাবা গলা চড়াতেন। কখনো কখনো তিনি তাদেরকে পথভ্রষ্ট কুকুরের মতো অভিশাপ দিতেন। তার এসব অভিজ্ঞতা এমন ধরনের বিষয় না যা তার বন্ধুদের কাছে বলা যায়। বাবু শ্রেণির লোকদের মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েদের সমাজে সে তার আগন্তুকের অনুভবটাকে এড়াতে পারতো না। ভিন্ন ধরনের জগতে ভিন্নরকম এক জীবনযাপন করতো। সৌভাগ্যজনকভাবে, তার গ্রেড ছিল অসাধারণ, তার শরীরচর্চার ক্ষমতা ও সামর্থও ছিল তেমনি। কাজেই, সে যদিও ছিল আগন্তুকের মতো পরিত্যক্ত ছিল না মোটেও। সব ক্ষেত্রেই, সে সম্মানজনক ব্যবহার পেত। কিন্তু যখন অন্য ছেলেরা রোববারে কোথাও যেতে কিংবা তাদের বাসায় ডাকতো তাদেরকে তাকে বিমুখ করতে হতো। শিগগিরই তারা তাকে জিগ্যেস করাও বন্ধ করেছিল।

 

শ্রমজীবী তোহোকো অঞ্চলের এক খামারী পরিবারে তৃতীয় পুত্র হিসেবে জন্ম নিয়ে তেংগোর বাবা যত শিগগির সম্ভব বাড়ি ছাড়েন এবং ডেরাভান্ডা লোকদের দলে জুটে মানচুরিয়াত পাড়ি দেন ঊনিশ শতকের তিরিশের দশকে। তিনি সরকারের সেই দাবিতে বিশ্বাস করেন নি যে, মানচুরিয়া একটি বেহেশত যেখানে আছে অবারিত আর সমৃদ্ধ ভূমি। কোথাও যে বেহেশতের দেখা মিলবে না তা বোঝার পক্ষে যথেষ্টই জানতেন তিনি। তিনি ছিলেন স্রেফ দরিদ্র আর ক্ষুধার্ত। যদি সে বাড়িতে থাকে তবে বাঁচতে হতো অনাহারের কিনারা দিয়ে- এমনটাই সে ভাবতে পারতো। মানচুরিয়ায় তাকে এবং অন্য ডেরাভান্ডাদের দেয়া হয়েছিল কিছু খামারের সরঞ্জাম ও ছোটো ছোটো হাতিয়ার, এবং একসঙ্গে তারা চাষবাস শুরু করেছিল। জমি ছিল অনুর্বর আর পাথুরে, শীতে সবকিছু জমে যেত। কখনো কখনো তাদের খাবার জিনিস বলতে থাকতো পথভ্রষ্ট কুকুর। যদিও সরকারের সহায়তায় প্রথম কয়েক বছর চালিয়ে নিতে পেরেছে। তাদের জীবন শেষ অব্দি বেশ থিতু হয়ে আসছিল যখন, ১৯৪৫-এর আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরোমাত্রায় আক্রমণ করে বসে মানচুরিয়ায়। আসন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে এক কর্মকর্তা যিনি তার সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন, তার কাছে গোপনে খবর পাবার পর তেংগোর বাবা চাচ্ছিলেন এটা ঘটুক। যে মিনিটে তিনি খবরটা শুনলেন যে তারা সীমান্ত পার হয়েছে, তিনি তার ঘোড়ায় চড়ে বসলেন, এবং দা-লিয়েনের উদ্দেশ্যে শেষের আগের ট্রেনটিতে চড়ে বসলেন। তার খামারের সঙ্গীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি বছর শেষের আগেই জাপানে ফিরে গেছেন।

 

যুদ্ধের পর তেংগোর বাবা টোকিওতে ফিরে যান এবং কালোবাজারি করে এবং কাঠমিস্ত্রির শিক্ষানবিশ হিসেবে অর্থ আয়ের চেষ্টা করেন, কিন্তু সমর্থ হন কেবল কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। তিনি একটি মদের  দোকানের সরবরাহকারী হিসেবে যখন কাজ করছিলেন তখনই আচমকা দেখা পান মানচুরিয়ায় পরিচিত হওয়া সেই কর্মকর্তা বন্ধুর। লোকটা যখন জানলেন যে তেংগোর বাবা কঠিন সময় পার করছেন এবং একটা জুৎসই চাকুরি খুঁজে পাচ্ছেন না, তিনি এনএইচকের গ্রাহক বিভাগে তার এক বন্ধুর কাছে সুপারিশ করার প্রস্তাব দেন, এবং তেংগোর বাবা তা গ্রহণ করেন আনন্দের সাথে। তিনি এনএইচকের প্রায় কিছুই জানতেন না, তবে তিনি যে কোনো কিছু করতে চাইছিলেন যাতে তার একটা বাঁধা আয়ের নিশ্চয়তা থাকে।

 

এনএইচকে-তে তেংগোর বাবা দারুণ উৎসাহের সঙ্গে তার কর্তব্য পালন করেন। তার প্রধানতম সামর্থ ছিল দুর্দশার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার অধ্যবসায়। জন্মাবধি যে কখনো ভরপেট খাবার খায় নি তার পক্ষে এনএইচকের চাঁদা আদায় করা কষ্টের কোনো কাজ নয়। তার দিকে ছুঁড়ে দেয়া সবচেয়ে নিষ্ঠুর অভিশাপও তার কাছে কিছুই ছিল না। তাছাড়া তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকে, খুব নিম্নপদস্থ সদস্য হলেও। তার সম্পাদিত কাজ আর তার দৃষ্টিভঙ্গি এতো অসাধারণ ছিল যে, বছর খানেক পর একজন অনুমোদিত সংগ্রাহক হিসেবে তাকে সরাসরি পুরোদস্তুর কর্মচারীর পদে নিযুক্ত করা হয়, এনএইচকেতে এমন অর্জনের কথা আর শোনা যায় নি। শিগগিরই, তিনি কর্পোরেশনের মালিকানায় থাকা বাসায় গিয়ে উঠতে সমর্থ হন এবং কোম্পানির স্বাস্থ্য-পরিচর্যার পরিকল্পনায় যুক্ত হন। এটা ছিল তার জীবনে সৌভাগ্যের সবচেয়ে বড় অভিঘাত।

 

শিশু তেংগোর বাবা কখনো তাকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে শোনান নি, কখনো ঘুমানোর আগে কোনো বই পড়েও শোনান নি। পরিবর্তে তিনি ছেলেকে শোনাতেন প্রকৃত অভিজ্ঞতার গল্প। তিনি খুব ভালো গল্প কথক ছিলেন। শৈশব ও তরুণ সময়ের বর্ণনাগুলিতে আদতেই কোনো তাৎপর্য ছিল না, তবে খুঁটিনাটি বর্ণনাগুলি ছিল খুব জীবন্ত। তাতে হাসির গল্প, মর্মস্পর্শী গল্প আর হিংসাত্মক গল্পও ছিল। জীবনকে যদি তার কাহিনির রং ও বৈচিত্র দিয়ে মাপা যেত, তেংগোর বাবার জীবন তবে তার মতো করে অবশ্যই সম্মৃদ্ধ ছিল, হয়তো। কিন্তু যখন তার গল্পগুলি তার এনএইচকের কর্মচারী হওয়ার পরের সময় পর্যন্ত পৌঁছাতো সেসব তাদের ওজস্বিতা হারিয়ে ফেলতো। তিনি এক নারীর সাক্ষাৎ পেলেন, তাকে বিয়ে করলেন এবং একটি ছেলে হলো- তেংগো। তেংগোর জন্মের পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই তার মা অসুস্থ হলো এবং মারা গেল। তারপর বাবা তাকে একা একা বড় করলেন, যখন তিনি এনএইচকের কঠিন চাকরিটি করছিলেন। তেংগোর মার সঙ্গে তার দেখা হবার ঘটনাটি কিভাবে ঘটল আর কীভাবে বিয়ে হলো, তিনি কেমন নারী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর কী কারণ ছিল, তার মৃত্যু কি খুব সহজ ছিল নাকি তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন- এসব বিষয়ে তেংগোর বাবা প্রায় কিছুই বলেন না। সে যদি জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করতো, তার বাবা কৌশলে তার প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। বেশির ভাগ সময় এসব প্রশ্নে তার মেজাজ বিশ্রীভাবে বদলে যেত। তেংগোর মায়ের কোনো একটি ছবিও থেকে যায় নি কোথাও।

 

তেংগো তার বাবার গল্প ঝেড়ে পুছে অবিশ্বাস করতো। সে জানতো তার মা তার জন্মের কয়েক মাসের মাথায় মারা যায় নি। তার মায়ের একটি স্মৃতি ছিল তার মাথায় যখন তার দেড় বছর বয়স, তার মা তার দোলনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক লোকের বাহুলগ্না হয়ে, যিনি তার বাবা ছিলেন না। তার মা ব্লাউজ খুলে ফেলেন। নামিয়ে ফেলেন অন্তর্বাসের ফিতা এবং লোকটি যে তার বাবা ছিল না, তাকে তার স্তন চুষতে দেন। তেংগো তাদের পাশেই ঘুমাচ্ছিল, তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু, একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, সে ঘুমিয়ে ছিল না। সে তার মাকে দেখছিল।

 

এটাই ছিল তেংগোর কাছে তার মায়ের ছবি। নিখুঁতভাবে পরিষ্কার দশ সেকেন্ডের এই দৃশ্যটি তার মগজের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল। তার কাছে থাকা এটাই ছিল তার মা সম্পর্কিত একমাত্র বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, যা তার মায়ের সঙ্গে তার একটি ক্ষীণ যোগসূত্র তৈরি করতে পারে। সে ও তার মায়ের সঙ্গে এটাই ছিল প্রাকল্পিক এক নাড়ির সম্পর্ক। যাহোক, তার বাবার কোনো ধারণা ছিল না যে, এই জীবন্ত দৃশ্য টিকে আছে তেংগোর স্মৃতিতে, যেনবা ময়দানে রয়ে গেছে একটা গরু! তেংগো অন্তহীনভাবে তার অংশগুলোকে উগরে দিচ্ছিল চিবানোর জন্য, এ এক জাবর কাটা যা থেকে সে নেয় তার অপরিহার্য পুষ্টি। পিতা ও পুত্র: প্রত্যেকেই বন্দী ছিল তার তার গোপনতার এক গভীর অন্ধকার আলিঙ্গনে। পরিণত বয়সে তেংগো মাঝেমধ্যে সন্দেহ করেছে তার মনের ছবিতে যে তরুণ লোকটি তার মার স্তন্য চুষছিল সেই তার জন্মগত পিতা। কারণ এনএইচকেতে সংগ্রাহকের কাজ করা তার পিতার সঙ্গে কোনো দিক থেকেই তার কোনো মিল নেই। তেংগো ছিল দীর্ঘদেহী, হালকা-পাতলা গড়নের মানুষ আর কপালটা বেশ চওড়া, সরু নাক এবং বর্তুলাকার কান। তার বাবা ছিলেন বেঁটে ও মোটা এবং খুবই অনাকর্ষণীয়। তার কপাল ছিল ছোটো, নাক চ্যাপ্টা এবং ঘোড়ার মতো সুচ্যগ্র কান। তেংগো যেখানে নিরুদ্বেগ, উদার দৃষ্টি, তার বাবাকে দেখাতো মাথা-গরম এবং একজন দৃঢ়মুষ্ঠীর লোক, তাদের দুজনের মধ্যে এসব দিক তুলনা করে লোকেরা প্রকাশ্যেই তাদের বিসদৃশতা নিয়ে টিপ্পনী কাটতো।

 

তেংগোর পক্ষে কেবল যে শরীরী বৈশিষ্ট্যের কারণে বাবার সঙ্গে সাদৃশ্য করা কঠিন হতো তা নয়, তাদের মনস্তাত্ত্বিক গড়নও ছিল আলাদা। তার বাবার মধ্যে কখনো এমন কিছুর চিহ্ন দেখা যেত না যাকে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ বলা চলে। সত্য যে, একটা গরিব পরিবারে জন্ম নিয়ে তিনি উপযুক্ত শিক্ষা পান নি। বাবার পরিস্থিতির ব্যাপারে তেংগোর মনে একটা মাত্রায় দুঃখবোধ আছে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের বনিয়াদী যে ইচ্ছা- তেংগোর ধারণা যে জিনিসটা হচ্ছে মানুষের ভেতরকার কম-বেশি স্বভাবগত তাড়না তার মধ্যে এটার অভাব ছিল। তার ভেতরে এক ধরনের ব্যবহারিক প্রজ্ঞা ছিল যা তাকে টিকে থাকার সামর্থ দিয়েছে- কিন্তু তেংগো কখনো তার বাবার মধ্যে নিজেকে খননের, বৃহত্তর ও বিস্তৃত জগৎকে দেখার সদিচ্ছার কোনো চিহ্ন উপলব্ধি করতে পারেনি। তার খিল আটকানো ছোটো জীবনের স্থবির হাওয়া কখনো তেংগোর বাবার মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিত না। তেংগো কখনোই একবারের জন্যেও তাকে হাতে বই তুলে নিতে দেখে নি। সঙ্গীত কিংবা সিনেমায় তার কোনো আগ্রহ ছিল না, তিনি কখনো ভ্রমণও করতেন না। একটা মাত্র বিষয় যাতে তিনি আগ্রহ পেতেন তা হলো তার চাঁদা সংগ্রহের রুট। তিনি এলাকাটার একটা মানচিত্র তৈরি করতেন, রঙিন কলম দিয়ে তাতে দাগাতেন এবং যখনই সময় পেতেন সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন, যেভাবে একজন জীবতাত্ত্বিক ক্রোমোজম পর্যবেক্ষণ করেন।

 

বিপরীতক্রমে, সবকিছুতেই তেংগোর আগ্রহ। একটা বিস্তৃত ক্ষেত্র থেকে সে জ্ঞান আহরণ করতো মাটি খোঁড়ায় সমর্থ বেলচার দক্ষতায়। ছোটোবেলা থেকেই তাকে দেখা হতো গণিতের বিস্ময় হিসেবে, সে উচ্চ বিদ্যালয়ের অংক কষতে পারতো যখন সে তৃতীয় গ্রেডে পড়তো। তরুণ তেংগোর কাছে গণিত ছিল তার বাবার সঙ্গে যুক্ত জীবন থেকে প্রস্থানের উপায়। গণিতের জগতে, সে হেঁটে যেত এক দীর্ঘ করিডর ধরে, নম্বর বসানো একটার পর একটা দরজা খুলে। প্রতি ক্ষেত্রে একটি করে নতুন দৃশ্য উন্মোচিত হতো তার সামনে, বাস্তব জগতের কদর্য চিহ্নগুলি একদম মুছে যেত। যতদিন পর্যন্ত সে তৎপর হয়ে অনন্ত সঙ্গতির জগতের অনুসন্ধান করতো, ততদিন সে ছিল মুক্ত।

 

তেংগোর জন্য গণিত যখন জাঁকালো একটা কল্পনার অট্টালিকা, সাহিত্য তার কাছে বড় এক জাদুর অরণ্য। গণিত অনন্তভাবে প্রসারিত হয় উপরের স্বর্গের দিকে, কিন্তু গল্পগুলি তার সামনে এমন ভাবে ছড়িয়ে থাকে যে তাদের কঠিন শিকড়গুলি প্রসারিত হয় মাটির গভীরে। এই অরণ্যে কোনো মানচিত্র নেই, কোনো দরজা নেই। তেংগো যখন বড় হয়েছে, কাহিনির অরণ্যটি গণিতের জগতের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে তার হৃদয়কে। অবশ্যই উপন্যাস পড়াটা ছিল মুক্তির ভিন্ন একটা ধরন- যখন সে বই বন্ধ করতো, তাকে ফিরে আসতে হতো বাস্তবের দুনিয়ায়। কিন্তু কখনো কখনো সে খেয়াল করতো উপন্যাসের জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসা ততটা বিধ্বংসী আঘাত ছিল না যেমনটা ছিল গণিতের জগৎ থেকে ফিরে আসা। কেন তেমনটা ছিল? অনেক চিন্তার পর সে একটা সিদ্ধান্তে এসেছিল, কাহিনির অরণ্যের বস্তুগুলি যতো স্পষ্টই হোক তাতে কোনো সোজাসাপ্টা সমাধান ছিল না, যেমনটা আছে গণিতে। কাহিনির ভূমিকা হলো মোটাদাগে একটা সমস্যাকে অন্যরূপে পক্ষান্তরিত করা। সমস্যার প্রকৃতি এবং অভিমুখের উপর ভিত্তি করে বয়ানের ভেতর একট সমাধান অবশ্যই দেয়া থাকতো। তেংগো সেই সমাধান হাতে করে ফিরে যেত বাস্তবের জগতে। সেটি ছিল জাদুর কবজের দুর্বোধ্য লেখা সমেত একটুকরা কাগজের মতো। সেটা কোনো অব্যবহিত ব্যবহারিক উদ্দেশ্য পূরণ করতো না, কিন্তু এটা একটা সম্ভাবনাকে ধারণ করতো।

 

তেংগো তার পড়া থেকে সম্ভাব্য একটা সমাধান বের করতে পারতো: আমার প্রকৃত পিতা অবশ্যই অন্য কোনোখানে আছে। ডিকেন্সের উপন্যাসের দুর্ভাগা এক শিশুর মতো তেংগো হয়তো চালিত হচ্ছিল অদ্ভুত সব পরিস্থিতির দ্বারা যাতে সে এই প্রতারকের হাতে পালিত হতে পারে। এরকম একটা সম্ভাবনা ছিল একই সঙ্গে একটা দুঃস্বপ্ন এবং একটা আশা। অলিভার টুইস্ট পড়ার পর লাইব্রেরি গিয়ে তেংগো ডিকেন্সের সবগুলো খ- চষে বেড়ালো। সে যখন ডিকেন্সের গল্প পড়ল, সে তার নিজেরই জীবনের পুনঃকল্পিত এক সংস্করণের ভেতর দাঁড় করাল নিজেকে। এই ফ্যান্টাসিগুলে বেড়ে চলল এবং আরো জটিল আকার নিতে থাকল। সেসবে একটা প্যাটার্ন যেমন ছিল তেমনি তাতে ছিল নিঃসীম বৈচিত্র। সব গল্পেই তেংগো নিজেকে বলতো যে, তার বাবার বাড়িতে সে থাকে না। ভুলক্রমে সে এই খাঁচার ভেতর আটকা পড়ে গেছে এবং একদিন তার সত্যিকার বাবা তাকে খুঁজে পাবে এবং তাকে উদ্ধার করবে। তখন তার কল্পনার সুন্দর রোববারগুলো সে ফিরে পাবে।

 

তেংগোর বাবা তার সন্তানের অসাধারণ গ্রেডের কারণে গর্ব বোধ করতেন এবং প্রতিবেশীদের কাছে অহংকার প্রকাশ করতেন। যাহোক, একই সঙ্গে তেংগোর মেধা ও প্রতিভার কারণে তিনি এক ধরনের বিরক্তিও প্রকাশ করতেন। মাঝে মধ্যে, তেংগো যখন পড়ার টেবিলে, পড়ছে, তার বাবা তাতে ব্যাঘাত ঘটাতেন, তাকে টুকিটাকি কাজের কথা বলে বা বানোয়াট কোনো অন্যায় ব্যবহারের জন্য জ্বালাতন করতেন। তার বাবার জ্বালাতনের বিষয় ছিল সর্বদা একই রকমের: প্রত্যহ নিজেই জ্বালাতন সহ্য করে অনেক পথ তিনি ঘুরতেন এবং লোকজনের শাপ-শাপান্ত সহ্য করতেন- তেংগো তখন কিছুই করতো না, শান্তি বজায় রাখতে সবকিছুকে সহজভাবে নিতো- “আমি যখন তোমার বয়সী ছিলাম আমাকে লেজ গুটিয়ে কাজ করতে হতো, যে কোনো কিছু নিয়েই আমার বাবা আর বড় ভাইয়েরা আমাকে পিটিয়ে কালশিরা ফেলে দিতো, তারা আমাকে পর্যাপ্ত খেতে দিতো না। তারা আমাকে দেখতো একটা জানোয়ারের মতো। আমি চাই না যে, তুমি কয়টা ভালো গ্রেড পেয়ে নিজেকে অসাধারণ ভাবো।”

 

লোকটা আমাকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত, তেংগো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে ভাবতে শুরু করল। তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন আমাকে নিয়ে কিংবা যে জীবন আমি যাপন করছি তাই নিয়ে। কিন্তু কোনো বাবা কি আসলেই তার সন্তানের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করতে পারেন? তেংগো তার বাবাকে নিয়ে বিচারে বসছে না, কিন্তু তার কথা আর কাজ থেকে বেরিয়ে আসা মর্মন্তুদ নীচতা সে অনুভব না করে পারল না। ব্যাপারটি এমন না যে, তেংগোর বাবা তাকে ব্যক্তি হিসেবে ঘৃণা করে, বরং তিনি তেংগোর ভেতরের কোনোকিছুকে ঘৃণা করেন যে ব্যাপারটাকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন না।

 

ট্রেন যখন টোকিও স্টেশন ছাড়ল, তেংগো তার কিনে আনা পেপারব্যাক বইটি বের করল। বইটা ছিল ভ্রমণ বিষয়ক গল্পের একটি সংগ্রহ এবং এতে একটি গল্প ছিল যার শিরোনাম “বিড়ালদের শহর”- একটি ফ্যান্টাসি ধরনের গল্প, এক জার্মান লেখকের লেখা যিনি তেংগোর পরিচিত কোনো লেখক নন। বইয়ের পূর্বকথা অনুসারে গল্পটি লেখা হয়েছে দুই মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি কোনো সময়ে।

 

গল্পটি এরকম: এক তরুণ একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিশেষ কোনো গন্তব্য মাথায় না রেখে। সে কোনো ট্রেনে চড়ে বসে আর যে কোনো একটা স্টেশনে নেমে পড়ে যদি জায়গাটি তার মধ্যে আগ্রহ জাগায়। সে একটা ঘর ভাড়া নেয়, জায়গাগুলো ঘুরে দেখে এবং যতদিন তার ভালো লাগে সেখানেই থাকে। আগ্রহ মিটে গেলে অন্য কোনো ট্রেনে চড়ে। সে এভাবেই তার প্রত্যেক ছুটি কাটায়।

 

একদিন সে ট্রেনের জানালা থেকে একটা সুন্দর নদী দেখল। শান্ত সবুজ পাহাড়গুলি আঁকাবাঁকা প্রবাহের ধার দিয়ে, এবং সেসবের নিচে পুরানো পাথরের সেতু সহ খুব ছোট্ট একটা শহর, যেখানকার একটা স্টেশনে ট্রেন থামল। আর যুবক তার ব্যাগ সমেত নেমে পড়ল। অন্য আর কেউ নামল না, আর, যখনই সে নামল ট্রেনটা চলে গেল।

 

স্টেশনটিতে কেউ কাজ করে না, খুব কম তৎপরতা সেখানে লক্ষ করা গেল। যুবক সেতু পার হলো এবং শহরের ভেতর ঢুকল। দোকান-পাট সব বন্ধ, শহরটাও ফাঁকা। শহরের একমাত্র হোটেলের ডেস্কে কোনো লোক নেই। জায়গাটিকে একেবারেই বসতিহীন মনে হলো। হয়তো সমস্ত লোক অন্য কোথাও ঘুমাতে গেছে। কিন্তু এখন সবেমাত্র সকাল সাড়ে দশটা বাজে, বৈকালিক ঘুমের জন্য খুব অসময়। হয়তো কোনো কারণে সবাইকে শহর ছাড়তে হয়েছে। যাই হোক, আগামীকাল সকালের আগে পরবর্তী ট্রেন আসবে না, কাজেই তার কোনো বিকল্প নেই এখানে রাত কাটানো ছাড়া। সে সময় কাটানোর জন্য শহরটাতে ঘুরে বেড়ালো।

 

আসলে এটা বিড়ালদের শহর। যখন সূর্যাস্ত হতে শুরু করল, সেতু পার হয়ে অনেক বিড়াল দলবেঁধে আসতে শুরু করল- সমস্ত ধরনের ও রঙের বিড়াল। এরা সাধারণ বিড়ালের থেকে বেশ বড়ো, কিন্তু তবু তারা বিড়ালই। এ দৃশ্য দেখে যুবক ধাক্কা খেল। সে দৌড় দিয়ে শহরের কেন্দ্রে ঘণ্টা-ঘরে গেল এবং  চূড়ায় উঠে লুকিয়ে থাকল। বিড়ালেরা তাদের কাজে গেল, দোকানের  ঝাঁপ খুলে কিংবা নিজেদের ডেস্কে গিয়ে বসে তাদের দিনের কাজ শুরু করল। শিগগিরই আরও বিড়াল এলো, অন্যদের মতো সেতু পার হয়ে। তারা দোকানগুলোতে ঢুকল কেনাকাটা করতে কিংবা টাউন হলে গেল তাদের প্রশাসনিক কাজকর্ম করতে কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টে ঢুকে খাবার খেল কিংবা পানশালায় ঢুকে বিয়ার পান করল এবং বিড়ালদের গান গাইল প্রাণোচ্ছলভাবে। বিড়ালেরা যেহেতু অন্ধকারে দেখতে পায়, তাদের প্রায় দরকারই পড়ে না আলোর, কিন্তু সেই বিশেষ রাতটিতে চারদিকে পূর্ণ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল শহর। সেই আলোয় যুবক ঘণ্টাঘরের উচ্চাসন থেকে দেখতে পাচ্ছিল খুঁটিনাটি সবকিছুই। যখন ভোর হয়ে এলো, বিড়ালেরা তাদের কাজ শেষ করল, বন্ধ করল দোকান-পাট, এবং দল বেঁধে ফিরে গেল সেতু পার হয়ে।

 

সূর্য উপরে উঠে আসার পর, বিড়ালেরা চলে গেল, আবারও ফাঁকা হয়ে গেল শহর। যুবক নেমে এলো নিচে, হোটেলের একটা বিছানা খুঁজে নিলো নিজের জন্য, এবং ঘুমাতে গেল। যখন তার ক্ষুধা পেল হোটেলের রান্নাঘরে পড়ে থাকা অবশিষ্ট কিছু রুটি আর মাছ খেল। অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সে ঘণ্টা ঘরে গিয়ে আবারও লুকিয়ে পড়ল এবং সকাল না হওয়া পর্যন্ত বিড়ালদের কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করতে থাকল। ট্রেনগুলি স্টেশনে থামল দুপুরের আগে এবং বিকাল পড়ে এলে। নতুন কোনো যাত্রী নামল না আর কোনো যাত্রী উঠলও না। যদিও ট্রেনগুলি স্টেশনে থেমে থাকল ঠিক এক মিনিট সময় ধরে তারপর আবারও চলে গেল। সে এই ট্রেনগুলির কোনো একটি ধরতে পারতো এবং বিড়ালদের এই ছমছমে শহরটাকে পেছনে ফেলে চলে যেতে পারতো। কিন্তু গেল না। তরুণ বয়স হবার কারণে তার ছিল প্রাণবন্ত আগ্রহ আর সে প্রস্তুত ছিল অভিযানের জন্য। এরকম আরও আজব দৃশ্য সে দেখতে চাইল। যদি সম্ভব হয়, সে খুঁজে বের করতে চায় কখন এবং কীভাবে এটা বিড়ালদের শহর হয়ে উঠল।

 

এই তৃতীয় রাত্রিতে ঘণ্টা-ঘরের নিচের চত্বরে সে একটা গোলমালের শব্দ হতে শুনল। ‘হেই, মানুষ মানুষ গন্ধ পাচ্ছো?’ একটা বিড়াল বলল। ‘তুমি এখন বললা, গত কয়দিন ধইরাই এই উদ্ভট গন্ধটা আমি পাইতেছি মনে হইতেছিল,’ আরেকজন গলা মিলাল তার নাক টেনে টেনে। ‘আমিও পাইতেছি,’ আরেকটি বিড়াল বলল। “আজব তো। এখানে কোনো মানুষ কেমনে থাকবে,” কেউ যোগ করল, “না অবশ্যই না। এই বিড়ালের শহরে কোনো মানুষ আসার কোনো পথই নাই।” “কিন্তু গন্ধটা তো এখানে অবশ্যই আছে।” বিড়ালগুলো দলে দলে ভাগ হয়ে গেল এবং পর্যবেক্ষক দলের মতো করে খোঁজাখুজি শুরু করল। এটা তাদের বের করতে খুব অল্প সময়ই লাগল যে, ঘণ্টা-ঘরটাই গন্ধের উৎস। যুবক শুনতে পেল তাদের নরম থাবা ফেলে ফেলে থপ থপ করে উপরে উঠে আসার শব্দ। এই শেষ, তারা আমাকে পেয়ে গেছে! সে ভাবল। তার গন্ধ মনে হলো বিড়ালদের ক্রোধ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই শহরে হয়তো মানুষদের প্রবেশ করার কথা না। বিড়ালদের আছে বড় আর ধারালো নখর আর ধারালো শাদা দাঁত। যদি তারা তাকে খুঁজে পায় তাহলে না জানি কী ভয়ানক দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে তার জন্য, তবে সে নিশ্চিত যে তারা তাকে এই শহর থেকে জীবিত ফিরে যেতে দেবে না।

 

তিনটি বিড়াল ঘণ্টা-ঘরের উপরে পর্যন্ত উঠে এলো এবং বাতাসে গন্ধ শুঁকল। একটা বিড়াল গোঁফ টেনে বলল, ‘অদ্ভুত! গন্ধ পাইতেছি মানুষের, অথচ কোনো মানুষ নেই।’

 

‘খুবই অদ্ভুত! আসলেই তো এখানে কেউ নাই।’ দ্বিতীয় বিড়ালটা বলল, ‘আচ্ছা চলো, অন্য কোথাও খুঁজি।’

 

বিড়ালগুলো মাথা খাড়া করল, বিভ্রান্ত হলো এবং ফিরে গেল নিচের সিঁড়িতে। যুবক তাদের পায়ের শব্দ রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে শুনল। সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, কিন্তু বুঝতে পারল না কী ঘটল আসলে। তারা তাকে না পাবার কোনো কারণ নেই, তবে কোনো কারণে তারা তাকে পায় নি। যাহোক, সে মনস্থির করল যে, সকাল হলেই সে স্টেশনে যাবে এবং শহর ছেড়ে যাবার ট্রেন ধরবে। ভাগ্য তো সব সময়ের জন্য প্রসন্ন থাকে না।

 

পরদিন ভোরে, যাহোক, ট্রেনটি স্টেশনে থামল না। সে দেখল ট্রেনটি গতি না কমিয়ে চলে গেল। বিকাল বেলার ট্রেনের ক্ষেত্রেও ঘটল একই ঘটনা। সে দেখল নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রকৌশলী লোকটি বসে আছেন। কিন্তু ট্রেনটি থামার কোনো লক্ষণ দেখাল না। যেন বা কেউই দেখেনি যে ট্রেনের জন্য এক যুবক অপেক্ষা করছে- যেন তারা স্টেশনটাকেও দেখে নি। রেলপথ ধরে অপরাহ্নের ট্রেন অদৃশ্য হয়ে যাবার পর জায়গাটা আগের থেকে বেশি নিঃশব্দ হয়ে এলো। সূর্য ডুবতে শুরু করল। তখন বিড়ালদের আসার সময়। যুবক বুঝল যে এমনভাবে হারিয়ে গেছে যে তার পুনরুদ্ধার অসম্ভব। এটা বিড়ালদের শহর নয়, সে অবশেষে অনুধাবন করল, এ এমন এক স্থান যেখানেই তার হারিয়ে যাবার কথা- এ অন্য এক জগৎ যা কেবল বিশেষভাবে তারই জন্য প্রস্তুত করা। আর কখনোই, অনন্তকালের জন্য, কোনো ট্রেন এই স্টেশনে তাকে তার জগতে ফিরিয়ে নেবার জন্য আর থামবে না।

 

তেংগো দুবার পড়ল গল্পটা। “এ এমন এক স্থান যেখানেই তার হারিয়ে যাবার কথা” বাক্যটি তার মনোযোগ কাড়ল। সে বইটা বন্ধ করল এবং চোখ দুটোকে ঘুরে বেড়াতে দিলো জানালার পাশে পিছিয়ে যেতে থাকা একঘেয়ে কারখানার দৃশ্যের উপর। একটু পরেই সে ঘুমের ভেতর তলিয়ে গেল- খুব দীর্ঘ ঘুম নয়, কিন্তু গভীর। সে জেগে উঠল ঘামে ভিজে। ট্রেন ছুটছিল মধ্যগ্রীষ্মের বোসো উপদ্বীপের দক্ষিণ দিকের তটরেখা ধরে।

 

এক সকালে, যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো, অনেক সতর্ক চিন্তার পর তেংগো ঘোষণা করেছিল যে রোববারগুলোতে বাবার সঙ্গে ঘোরাঘুরিতে যাওয়া সে বন্ধ করতে যাচ্ছে। সে তার বাবাকে বলেছিল যে, সময়টাকে সে পড়াশুনা করে এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলে কাটাতে চায়। অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চায় সে।

 

তেংগো তার যা বলার দরকার বলেছিল সুনির্দিষ্টভাবে আর সংগতভাবে। তার বাবা, অবশ্যম্ভাবীরূপে যা হবার কথা, ফেটে পড়লেন। অন্য পরিবারগুলো কী করে তা তিনি থোড়াই কেয়ার করেন, তিনি বললেন, ‘আমরা আমাদের মতো করেই করি সবকিছু। আর তোমার কী সাহস যে তুমি ‘স্বাভাবিক জীবন’ নিয়ে বলছো! সবজান্তা সাহেব, ‘স্বাভাবিক জীবনের’ কী বোঝেন আপনি?’ তেংগো তার সঙ্গে তর্ক করার চেষ্টা করল না। সে শুধু তাকিয়ে থাকল চুপচাপ, সে জানে বাবা তার কথার কিছুই আমলে নেবেন না। শেষমেষ, সে যদি তার কথা না শোনে তাহলে তিনি তার ভরণ-পোষণ দেবেন না। তেংগোকে জাহান্নামে যেতে হবে।

 

তেংগোকে যা বলা হলো সে তাই করল। সে তার মনস্থির করে রেখেছিল। ভয় সে পাবে না। এখন তাকে এ খাঁচা ছেড়ে যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছে, সে আগের থেকে বেশি নিরুদ্বেগ ছিল। কিন্তু দশ বছর বয়সী বালকের পক্ষে স্বনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকার কোনো উপায় ছিল না। দিনশেষে যখন তার ক্লাস শেষ হলো, সে তার দুর্ভাগ্যের কথা তার শিক্ষকের কাছে প্রকাশ করল। তার শিক্ষক ছিলেন মধ্য তিরিশের এক অবিবাহিত নারী, মুক্তমনা ও উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ। সহমর্মিতা নিয়ে তিনি তেংগোর কথা শুনলেন, সেই সন্ধ্যায় তেংগোকে সঙ্গে করে তিনি বাবার বাসায় গেলেন। দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বললেন তারা।

 

তেংগোকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল, তাই সে নিশ্চিত ছিল না যে তাদের মধ্যে কি কি কথা হয়েছিল, তবে শেষমেষ তার বাবাকে তরবারির খাপে ভরতে হয়েছিল। তার রাগ যতো চরমই হোক, তিনি দশ বছর বয়সী কোনো ছেলেকে একা ছেড়ে দিতে পারেন না। কোনো বাবার সন্তানকে দেখভাল করার কর্তব্য আইনগত ব্যাপার।

 

বাবার সঙ্গে তার শিক্ষকের আলাপের ফলস্বরূপ তেংগো তার রোববারগুলো ইচ্ছামতো কাটানোর স্বাধীনতা পেয়েছিল। এটাই ছিল প্রথম একটি বাস্তব অধিকার যা সে তার বাবার কাছ থেকে জয় করে নিয়েছিল। তার মুক্তি ও স্বাধীনতার দিকে সে তার প্রথম পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছিল।

 

স্বাস্থ্যনিবাসের অভ্যর্থনা টেবিলে তেংগো তার ও তার বাবার নাম দিলো।

 

নার্স জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি আপনার আজকের সাক্ষাতের ইচ্ছার কথা কোনোভাবে আমাদেরকে জানিয়েছিলেন?’ তার কণ্ঠে কঠিন একটা তীক্ষ্মতা। অল্পবয়সী এক নারী, ধাতব-ফ্রেমের চশমা পরেছেন, আর তার বব-কাট চুল কিছুটা ধূসর।

 

‘না, আজ সকালে আসার কথা হঠাৎ করেই ভাবলাম আর ট্রেনে আসতে আসতে ইচ্ছা হলো,’ তেংগো সৎভাবেই বলল কথাটা।

 

নার্স খানিকটা বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘সাক্ষাৎকারীরা কোনো রোগীকে দেখতে আসার আগে জানানোই নিয়ম। আমাদের একটা শিডিউল আছে দেখা করার, আর রোগীর ইচ্ছার ব্যাপারটাকেও আমরা গুরুত্ব দিই।’

 

‘দুঃখিত! আমি জানতাম না।’

 

‘শেষ কবে দেখা করেছেন?’

 

‘দুবছর আগে।’

 

‘দু বছর আগে,’ হাতে একটা বলপয়েন্টসহ সাক্ষাৎকারীদের তালিকাটা পরীক্ষা করতে করতে বলল নার্স, “আপনি বলতেছেন, এই দুবছরে আপনি আর একবারও আসেন নাই?”

 

‘হ্যাঁ, তাই,” তেংগো বলল।

 

“আমাদের নথিপত্র অনুযায়ী আপনিই কাওয়ানা সাহেবের একমাত্র আত্মীয়।”

 

“ঠিক বলেছেন।”

 

মেয়েটি চকিতে তাকাল তারদিকে, কিন্তু কিছুই বলল না, তার চোখে নিন্দা ছিল না, সে কেবল তথ্যগুলো পরীক্ষা করছিল। দৃশ্যত, তেংগোর ঘটনাটা খুব ব্যতিক্রমী কিছু না।

 

‘এ সময়, আপনার বাবা গ্রুপ রিহ্যাবিটেশনে আছেন। আধা-ঘণ্টার মধ্যে শেষ হবে। তারপর দেখা করতে পারবেন।’

 

‘উনি কেমন আছেন?’

 

‘শারীরিকভাবে ভালো আছেন। অন্যান্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওঠানামা আছে,’ তর্জনী দিয়ে কপালের পাশে টোকা দিয়ে বলল মেয়েটি।

 

তেংগো তাকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রবেশপথের পাশের লাউঞ্জে গেল অপেক্ষা করতে। মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে গেল মাঝে মাঝে, সমুদ্রের গন্ধ  ও পাইনসারির শান্ত ধ্বনিসহ। গাছগুলির শাখায় থাকা ঝিঁঝিপোকা হৃদয়বিদারক চিৎকার করে যাচ্ছিল। গ্রীস্মের চূড়ান্ত সময় এটা, কিন্তু ঝিঁঝিপোকাগুলো যেন এটা জানে যে সময়টা বেশিদিন থাকবে না।

 

অবশেষে চশমাপরা নার্সটি তেংগোকে বলতে এলো, এখন তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারে। ‘আমি আপনাকে তার ঘর দেখিয়ে দিচ্ছি,’ সে বলল। তেংগো সোফা থেকে উঠল এবং দেয়ালের লম্বা আয়নার সামনে দিয়ে যেতে যেতে প্রথমবারের মতো অনুধাবন করল কি পঙ্কিল পোশাক সে পরে আছে: জেফ কে জাপান ট্যুরের টি-শার্ট ফিকে হয়ে যাওয়া ডাংগারি শার্টের নিচে যার বোতামগুলো বিসদৃশ, খাকি রঙের আর এক হাতার কাছে পিৎজা সসের কণা লেগে আছে, মাথায় বেসবল খেলার টুপি- তিরিশ বছর বয়সী সন্তানের জন্য দু’বছর পর বাবাকে হাসপাতালে দেখতে আসার পক্ষে জুৎসই পোশাক নয়। তার সঙ্গে এমন কিছুও নেই যা এমন একটা উপলক্ষে একটি উপহারের কাজ করতে পারে। নার্স তার দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাবে তাতে আর আশ্চর্য কি!

 

তেংগোর বাবা ঘরে ছিলেন, একটা চেয়ারে বসে ছিলেন খোলা জানালার পাশে, তার হাত দুটি ছিল হাঁটুর উপর। কাছের একটা টেবিলের উপর ছিল কিছু কোমল হলুদ ফুলসহ পাত্রে লাগানো একটি গাছ। মেঝে বানানো হয়েছে নরোম জিনিস দিয়ে যাতে কেউ পড়ে গিয়ে আহত না হয়। তেংগো প্রথমটায় বুঝতেই পারে নি বুড়ো যে লোকটি জানালার ধারে বসা ছিলেন তিনি ছিলেন তার বাবা। তিনি চুপসে গেছেন- ‘সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন’ বলাটাই হয়তো বেশি সঠিক। তার চুল ছোটো এবং এত শাদা যেন তুষার ঢাকা উঠান। তার গাল বসে গেছে, একারণেই হয়তো তার চোখের কোটর দুটিকে বড় দেখাচ্ছিল আগের থেকে। কপালে তিনটি ভাঁজ পড়েছে। তার চোখের ভ্রু ছিল অনেক লম্বা আর ঘন, তার কানদুটিকে দেখাচ্ছে আগের থেকে বড়; লাগছে যেন বাদুড়ের পাখা। দূর থেকে, তাকে যতোটা না কম মানুষ বলে মনে হলো, তার চেয়ে বেশি মনে হলো অন্য কোনো প্রাণি, কোনো একটি ইঁদুর বা কাঠবিড়াল- খুব ধূর্ত কোনো প্রাণি। যাহোক, তিনি ছিলেন তেংগোর বাবা- কিংবা বলা যায় তার বাবার ধ্বংসাবশেষ। যে বাবাকে তেংগোর মনে পড়ে, তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ, পরিশ্রমী মানুষ। অন্তর্দৃষ্টি এবং কল্পনা হয়তো তার কাছে দূরের জিনিস ছিল; কিন্তু তার কাছে তার নিজের নৈতিক নিয়ম ছিল আর ছিল কঠিন বিষয়বোধ। যে লোকটিকে তেংগো সামনে দেখল তিনি একটি শূন্য খোলশ ছাড়া আর কিছ্ইু ছিলেন না।

 

‘কাওয়ানা সাহেব!’ নার্স তেংগোর বাবাকে বলল খুব সতেজ স্পষ্ট স্বরে- যা অবশ্যই রোগীদের সম্বোধনের জন্য তাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়েছে। ‘কাওয়ানা সাহেব! দেখেন কে এসেছে! এই যে আপনার ছেলে এসেছে টোকিও থেকে।’

 

তেংগোর বাবা তার দিকে ফিরলেন। তার অভিব্যক্তিশূন্য চোখদুটি দেখে তেংগো ভাবল, সোয়ালো পাখির দুটি শূন্য বাসা ঘরের ছাঁইচ থেকে ঝুলছে।

 

‘হ্যালো,’ বলল তেংগো।

 

তারা বাবা কিছুই বললেন না। পরিবর্তে তিনি সোজাসুজি তেংগোর দিকে তাকিয়ে থাকলেন যেন তিনি বিদেশি ভাষায় লেখা কোনো বুলেটিন পড়ছেন।

 

“ডিনার শুরু হবে সাড়ে ছ’টায়,” নার্স তেংগোকে বলল, “তখন পর্যন্ত আপনি নির্দ্বিধায় থাকতে পারেন।”

 

নার্স চলে যাবার পর তেংগো মুর্হূর্তের জন্য ইতস্তত করল আর তারপর তার বাবার কাছে গেল, বসল তার বিপরীত দিকে রাখা চেয়ারে। একটি ফিকে হয়ে যাওয়া, কাপড়-মোড়ানো চেয়ার, এর কাঠের অংশগুলো দীর্ঘ ব্যবহারে দাগ-পড়া। তার বাবার চোখ তার নড়াচড়াগুলোকে অনুসরণ করল।

 

‘কেমন আছেন?’ তেংগো জিগ্যেস করল।

 

‘ভালো। ধন্যবাদ,’ রীতিমাফিক বললেন তেংগোর বাবা। তেংগো জানতো না এরপর কী বলবে। তার ডাংগারি শার্টের তৃতীয় বোতামটি নিয়ে খেলতে খেলতে সে তার দৃষ্টি ফেরাল বাইরে পাইন গাছগুলির দিকে এবং তারপর বাবার দিকে ফেরাল আবার।

 

‘তুমি কি টোকিও থেকে এসেছ?’ জিগ্যেস করলেন তার বাবা।

 

‘হ্যাঁ, টোকিও থেকে।’

 

‘নিশ্চয়ই এক্সপ্রেস ট্রেনে এসেছ?’

 

‘হ্যাঁ,’ তেংগো বলল। “তাতেইমা পর্যন্ত, তারপর গাড়ি বদল করে চিকুরা পর্যন্ত এসেছি লোকাল ট্রেনে।”

 

‘সাঁতার কাটতে এসেছ?’ তার বাবা জিগ্যেস করলেন।

 

‘আমি তেংগো। তেংগো কাওয়ানা, আপনার ছেলে।’

 

তার বাবার কপালের ভাঁজগুলো গভীর হলো। ‘অনেক লোক তাদের এনএইচকে গ্রাহক চাঁদা দিতে চাইতো না বলে মিথ্যা কথা বলতো।’

 

‘বাবা।’ তেংগো তাকে ডাকল। অনেকদিন সে এই শব্দটা উচ্চারণ করেনি। ‘আমি তেংগো, আপনার ছেলে।’

 

‘আমার কোনো ছেলে নেই।’ তার বাবা ঘোষণা করলেন।

 

‘আপনার কোনো ছেলে নেই?’ তেংগো যন্ত্রের মতো পুনরুক্তি করল।

 

তার বাবা মাথা নাড়লেন।

 

‘তাহলে আমি কে?’ তেংগো জিগ্যেস করল।

 

‘তুমি কিছুই না।’ তার বাবা দুবার সংক্ষেপে মাথা নেড়ে বললেন।

 

তেংগো তার নিশ্বাস ধরে রাখল। সে কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। তার বাবারও আর কোনো কিছু বলার ছিল না। প্রত্যেকেই নিঃশব্দে বসে রইল। নিজেদের চিন্তার জট হাতড়াতে হাতড়াতে। কেবল ঝিঁঝিপোকাগুলো কোনো বিভ্রম ছাড়াই চিৎকার করে গেল, সবচে উচ্চৈঃ স্বরে।

 

তিনি হয়তো সত্যই বলছেন, তেংগো ভাবল। তার স্মৃতি হয়তো ধ্বংস হয়ে গেছে- কিন্তু তার কথাগুলো হয়ত সত্য।

 

‘আপনি কী বুঝাতে চান?’ তেংগো জিগ্যেস করল।

 

‘তুমি কিছুই না।’ তার বাবা পুনরুক্তি করলেন, তার কণ্ঠস্বরে কোনো আবেগ নেই। ‘তুমি কিছুই ছিলে না, তুমি কিছুই না, আর তুমি কিছু হবেও না।’

 

তেংগো তার চেয়ার ছেড়ে উঠতে চাইল। সে স্টেশনে যাবে এবং তারপর টোকিওতে ফিরে যাবে। কিন্তু সে দাঁড়াতে পারল না। সে যেন সেই যুবক যে বিড়ালদের শহরে গিয়েছিল। তার কৌতূহল ছিল। তার দরকার ছিল একটা স্পষ্ট জবাবের। লুকিয়ে চলার বিপত্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু সে যদি সুযোগটাকে চলে যেতে দেয় তাহলে হয়তো নিজের সম্পর্কিত রহস্যটি কখনো আর জানতেই পারবে না। তেংগো তার মাথার ভেতরের শব্দগুলোকে নানাভাবে সাজাতে থাকল যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেগুলো বলার জন্য প্রস্তুত হলো। এ হলো সেই প্রশ্ন যা সে তার ছোটবেলা থেকে জিগ্যেস করতে চাইতো কিন্তু কখনোই বলে উঠতে পারেনি: ‘আপনি তবে বলছেন যে, আপনি আমার জন্মদাতা পিতা নন? ঠিক? আপনি বলছেন যে আমাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তাই তো?’

 

‘রেডিও তরঙ্গ চুরি করা একটি বে-আইনি কাজ,’ তেংগোর বাবা বললেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে, “এটা টাকা কিংবা অন্য মূল্যবান কিছু চুরি করার থেকে আলাদা কিছুই না, তাই না?’

 

‘আপনার কথা হয়তো ঠিক,’ তেংগো আপাতত সম্মত হলো।

 

“রেডিও তরঙ্গ আকাশ থেকে বৃষ্টি বা তুষারের মতো এমনি এমনি পড়ে না,” তার বাবা বললেন।

 

তেংগো তার বাবার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল। হাতদুটো সোজাসুজি তার হাঁটু বরাবর রাখা। ছোটো, কালো হাতগুলি, দীর্ঘদিন বাইরে কাজ করার ফলে হাড়ের মতো ধূসর।

 

‘আমার মা তাহলে আদতেই অসুস্থ হয়ে মরে নাই, যখন আমি ছোটো ছিলাম, তাই না?” তেংগো জিগ্যেস করল অনুচ্চ স্বরে।

 

তার বাবা উত্তর দিলেন না। তার অভিব্যক্তি পাল্টাল না, এবং তার হাতগুলি নড়ল না। তার চোখ পড়ে থাকল তেংগোর ওপর যেন তারা অপরিচিত কিছু পর্যবেক্ষণ করছে।

 

‘আমার মা আপনাকে ছেড়ে গেছিল। সে আপনাকে এবং আমাকে ছেড়ে গেছিল। অন্য এক লোকের সঙ্গে চলে গেছিল সে। আমি কি ভুল বলছি?’

 

তার বাবা মাথা নাড়লেন, ‘রেডিও তরঙ্গ চুরি করা ভালো না। কারণ যা ইচ্ছা তাই করে তুমি পার পেতে পারো না।’

 

এই লোকটা আমার প্রশ্নগুলো ঠিকই বুঝেছে। সে শুধু সরাসরি উত্তর দিতে চাইছে না। তেংগো ভাবল।

 

‘বাবা,’ তেংগো তাকে সম্বোধন করে বলল, ‘তুমি হয়ত আসলেই আমার বাবা নও, কিন্তু এখন আমি তোমাকে এটা বলেই ডাকব কারণ আমি জানি না তোমাকে অন্য আর কি বলা যেতে পারে। সত্যি বলতে কি, আমি তোমাকে কখনো পছন্দ করি নি। হয়তো আমি তোমাকে বেশির ভাগ সময় ঘৃণাই করেছি। তুমি সেটা জান, তাই না? কিন্তু যদি আমি ধরেও নিই যে আমাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, তোমাকে আমার ঘৃণা করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। জানি না ততটা দূর আমি যেতে পারতাম কিনা যাতে আমি তোমার প্রিয় হতে পারি, কিন্তু আমার ধারণা এখন আমি যতটা বুঝি তোমাকে নিদেনপক্ষে তার চেয়ে বেশি বুঝতে চেষ্টা করতে পারতাম। আমি সবসময় জানতে চেষ্টা করেছি আমি কে আর কোথা থেকে এসেছি। এটাই শুধু। এখন এখানে যদি তুমি সত্য বলো, তোমাকে আমি আর ঘৃণা করব না। আসলে, আমি এই সুযোগটা নিতে চাইব যে যাতে তোমাকে আর ঘৃণা করতে না হয়।”

 

তেংগোর বাবা অভিব্যক্তিহীন চোখে তার দিকে তাকিয়েই থাকলেন, কিন্তু তেংগো অনুভব করল সে ওই সোয়ালোর শূন্য বাসার গভীরে অবশ্যই কোথাও মৃদু আলোর একটা দীপ্তি দেখতে পাবে।

 

‘আমি কিছুই না, তুমি ঠিকই বলেছ,’ বলল তেংগো, ‘আমি এমন একজন যাকে রাতের সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যে একা একা ভাসছে। আমি কোথাও যাই, কিন্তু কেউই নাই সেখানে। কোনোকিছুর সঙ্গেই আমার সংযোগ নাই। একটি পরিবারের সবচেয়ে কাছের সত্তাটাই তুমি, কিন্তু তুমি একটা রহস্য ধারণ করে আছো। ইতোমধ্যে, দিনকে দিন খারাপ হয়ে চলেছে তোমার স্মৃতি। তোমার স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমার সম্পর্কিত সত্যটাও হারিয়ে যাচ্ছে। সত্যের সাহায্য ছাড়া, আমি কিছুই না আর আমি হতেও পারব না কোনোকিছু। তোমার কথাটাই ঠিক।’

 

‘জ্ঞান খুব মূল্যবান সামাজিক সম্পদ,’ একঘেয়ে সুরে বলতে থাকলেন তেংগোর বাবা, যদিও তার স্বর আগের থেকে কিছুটা শান্ত, যেনবা কেউ ভল্যুমটা কমিয়ে দিয়েছে, “এটা এমন একটা সম্পদ যা অবশ্যই বিপুলভাবে মজুদ হবে এবং সর্বোচ্চ সতর্কভাবে ব্যবহৃত হবে। অবশ্যই তা কার্যকররূপে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হবে। সেই কারণেও এনএইচকের জন্য সমস্ত গ্রাহক চাঁদা পরিশোধ করা জরুরি এবং …।’

 

সে তার বাবাকে থামাল। ‘আমার মা কেমন মানুষ ছিলেন? তিনি কোথায় গেছেন? কী হয়েছিল তার?’

 

তার বাবা তার মন্ত্রযপ করা থামালেন, তার ঠোঁটদুুটি একদম বন্ধ হয়ে গেল।

 

তার কণ্ঠস্বর নরোম হলো আরও, তেংগো বলতে থাকল, ‘মাঝে মাঝে একটা ছায়াচিত্র দেখি মনের মধ্যে- একটাই ছবি বারবার। আমার সন্দেহ হয় সেটা বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোনোকিছুর স্মৃতি কিনা। আমার বয়স তখন দেড় বছর, আর মা আছেন আমার পাশেই। তিনি এবং এক যুবক পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আছেন। লোকটা আপনি নন। তিনি কে সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, কিন্তু অবশ্যই আপনি নন।’ তার বাবা কিছুই বললেন না, তবে তার চোখ দুটি স্পষ্টত অন্যকিছু দেখছিল- যা এখানে নেই।

 

‘আমি চাইছি যে তুমি কিছু একটা পড়ে শোনাও,’ তেংগোর বাবা খুব আনুষ্ঠানিক স্বরে বললেন, একটা দীর্ঘ বিরতির পর, ‘আমার দেখার দৃষ্টি এতোটা খারাপ হয়ে গেছে যে কোনো বই আর পড়তে পারি না। ঐ শেল্ফে কিছু বই আছে। তোমার পছন্দ মতো একটা বেছে নাও।’

 

তেংগো উঠল এবং বুকশেল্ফের প্রধান খ-গুলো খুঁটিয়ে দেখল। বেশির ভাগই ঐতিহাসিক উপন্যাস যার প্রেক্ষাপট প্রাচীন সময় যখন অঞ্চলটিতে সামুরাইরা ঘুরে বেড়াত। পুরোপুরি সেকেলে ভাষায় লেখা ছাতাপড়া প্রাচীন বইগুলো থেকে তার বাবাকে পড়ে শোনাতে পারল না তেংগো।

 

‘যদি আপনি কিছু মনে না করেন, আমি বরং বিড়ালদের শহর নিয়ে একটা গল্প পড়ব,’ তেংগো বলল, ‘আমার পড়ার জন্য যে বইটা এনেছিলাম ওতেই আছে গল্পটা।’

 

‘বিড়ালদের শহর সম্পর্কে গল্প,’ তার বাবা বললেন শব্দগুলোর স্বাদ নিতে নিতে, ‘আচ্ছা পড়ে শোনাও আমাকে যদি তোমার খুব অসুবিধা না হয়।’

 

তেংগো তার ঘড়ির দিকে তাকাল। “মোটেও কোনো সমস্যা না। আমার ট্রেন ছাড়ার আগে অনেকটা সময় হাতে আছে। খুব অদ্ভুত একটা গল্প এটা। আমি জানি না, এটা আপনার পছন্দ হবে কিনা।”

 

তেংগো তার পেপারব্যাক বইটা বের করল এবং ধীরে ধীরে পড়া শুরু করল, খুব স্পষ্ট, শ্রুতিযোগ্য স্বরে, নিঃশ্বাস নেবার মাঝে দুই কি তিনবার থেমে থেমে। সে যখন পড়া থামাচ্ছিল, তার বাবার দিকে চকিতে তাকাচ্ছিল কিন্তু আপাত কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছিল না তার মুখে। তিনি কি গল্পটা উপভোগ করছিলেন? সে বলতে পারবে না।

 

‘বিড়ালদের শহরে কি টেলিভিশন আছে?’ তার বাবা জিগ্যেস করলেন তেংগো যখন থামল। গল্পটা জার্মানিতে লেখা হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে। তখন তাদের টেলিভিশন ছিল না। তবে রেডিও ছিল।’

 

‘শহরটি কি বিড়ালরাই বানিয়েছিল? নাকি বিড়ালেরা সেখানে থাকতে আসার আগে মানুষই সেটাকে বানিয়েছিল?’ তার বাবা জিগ্যেস করল, যেন তিনি জিগ্যেস করছেন নিজেকেই।

 

‘আমি জানি না,” তেংগো বলল, ‘তবে মনে হয় মানুষই শহরটাকে বানিয়েছিল। হয়ত তারা কোনো কারণে চলে গিয়েছিল, যেমন, তারা হয়ত সবাই কোনো একটা মহামারিতে মারা গিয়েছিল আর বিড়ালেরা এসেছিল সেখানে থাকতে।”

 

তার বাবা মাথা নাড়লেন, ‘যখন একটা শূন্যতা তৈরি হয়, কোনোকিছুকে এসে পূরণ করতে হয় সেই শূন্যতা। এটাই সবাই করে।’

 

‘এটাই কি সবাই করে?’

 

‘একদম তাই।’

 

‘কোন ধরনের শূন্যতাকে পূরণ করছেন আপনি?’

 

তার বাবা মুখ গোমড়া করলেন। তারপর তিনি তার কণ্ঠে একটা বক্রোক্তির ছোঁয়া এনে বললেন, ‘তুমি সেটা জানো না?’

 

‘আমি জানি না,’ তেংগো বলল।

 

তার বাবার নাসারন্ধ্র জ্বলে উঠল। একদিকের ভ্রু উপরে উঠল কিঞ্চিৎ। “যদি তুমি ব্যাখ্যা ছাড়া সেটা বুঝতে না পারো, ব্যাখ্যা সহ বললেও তুমি বুঝতে পারব না।”

 

তেংগো দৃষ্টিটাকে সরু করে তাকাল, বোঝার চেষ্টা করল লোকটার অভিব্যক্তি। তার বাবা কখনোই এমন অসুবিধাজনক, সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন নি। তিনি সব সময় কথা বলতেন মূর্ত, ব্যবহারিক শব্দ ব্যবহার করে।

 

‘বুঝলাম। আপনি এক ধরনের শূন্যতা পূরণ করেছেন,’ তেংগো বলল, ‘ঠিকাছে, তাহলে আপনি যে শূন্যতা সৃষ্টি করে যাবেন কে তা পূরণ করবে?’

 

‘তুমি,’ তার বাবা ঘোষণা করলেন, সোজা তেংগোর দিকে তার তর্জনী তাক করে, “এটা কি খুব স্পষ্ট না? আমি একটা শূন্যতা পূরণ করে চলেছি যা কেউ তৈরি করে রেখে গেছে, কাজেই তুমিও সেই শূন্যতা পূরণ করবে যা আমি রেখে যাচ্ছি।’

 

“যেভাবে বিড়ালেরা এসে মানুষের চলে যাবার পর শহরের শূন্যতা পূরণ করেছিল।”

 

‘হ্যাঁ,’ বললেন তার বাবা। তারপর তিনি শূন্যমনে তাকিয়ে থাকলেন তার বাড়ানো তর্জনীর দিকে যেনবা কোনো রহস্যময়, স্থানচ্যূত কোনোকিছুর দিকে।

 

তেংগো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, ‘হ্যাঁ, তাহলে কে আমার বাবা?’

 

‘একটা শূন্যস্থান। তোমার মা তার শরীরকে যুক্ত করেছিল একটা শূন্যতার সাথে এবং তোমার জন্ম দিয়েছিল। আমি সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছি।’

 

এতটা বলার পর তার বাবা তার চোখ দুটি এবং মুখ বন্ধ করলেন।

 

‘আর তিনি চলে যাবার পর আপনি আমাকে লালন পালন করলেন। এটাই কি আপনি বলতে চাইছেন?’

 

একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে তিনি বললেন, যেনবা একটা সহজ সত্যকে কমবুদ্ধির শিশুকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন, ‘সেকারণেই আমি বলেছি, ‘যদি তুমি ব্যাখ্যা ছাড়া বুঝতে না পারো, তবে ব্যাখ্যার সাহায্য নিয়েও তুমি বুঝতে পারবা না।”

 

তেংগো তার হাত দুটি ভাঁজ করে কোলের উপর রাখল এবং তার বাবার মুখের দিকে সরাসরি তাকাল। এই লোকটা শূন্য খোলস নয়, সে ভাবল। একজন রক্ত-মাংসের মানুষ তিনি, খুব সংকীর্ণ, গোঁয়ার যার আত্মা, সমুদ্রের ধারের এক টুকরা ভূমিতে থেমে থেমে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন। নিজের ভেতর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা শূন্যতার সঙ্গে বাঁচা ছাড়া অন্য কোনো উপায় তার নেই। অবশেষে ঐ শূন্যতা অবশিষ্ট স্মৃতিকেও গ্রাস করবে, কেবল সময়ের ব্যাপার।

 

বিকাল ৬টার একটু আগে তেংগো তার বাবাকে বিদায় বলল। যখন সে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছিল, তারা জানালার পাশে পরস্পরের কাছাকাছি বসে থাকল কিছুই না বলে। তেংগোর আরও অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিল, কিন্তু সে জানতো যে কোনো উত্তর সে পাবে না। তার বাবার শক্ত করে এঁটে রাখা ঠোঁটদুটি দেখে তাই বোঝা গেল। যদি তুমি ব্যাখ্যা ছাড়া কোনোকিছু না বোঝো, ব্যাখ্যাসমেতও তুমি তা বুঝতে পারবে না, তার বাবা যেমনটা বলেছিলেন।

 

যখন তার সময় নিকটবর্তী হলো, তেংগো বলল, ‘আজ আপনি অনেক বলেছেন, পরোক্ষ কথা এবং কখনো কখনো বোঝা দুঃসাধ্য, কিন্তু হয়ত এতটা সৎ এবং খোলাখুলি হতে পারাই আপনার পক্ষে সম্ভব। আমি অবশ্যই এর জন্য কৃতজ্ঞ থাকব।’

 

তখনও তার বাবা কিছুই বললেন না, তার চোখ একটি দৃশ্যে নিবদ্ধ যেন কোনো পাহারার দায়িত্বে থাকা সৈনিক, মনস্থির করেছেন দূরের পাহাড়ের উপর বর্বর জাতির লোকদের পাঠানো অগ্নি-সংকেত কোনোক্রমেই দৃষ্টিচ্যূত করবেন না। তেংগো বাবার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে দেখবার চেষ্টা করল, কিন্তু বাইরে কেবলই পাইন উদ্যান, আসন্ন সূর্যাস্তের আভায় রঞ্জিত।

 

‘এ কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত, কিন্তু বস্তুত আমি কিছুই করতে পারি না আপনার জন্য, শুধু এই আশাটুকু রাখতে পারি যে, যে প্রক্রিয়ায় আপনার শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে তা বেদনামুক্ত হোক। আমি নিশ্চিত যে, আপনি অনেক যাতনা সয়েছেন। আপনি আমার মাকে এতটা গভীরভাবে ভালোবেসেছেন যতটা আপনার পক্ষে সম্ভব। আমি তা বুঝতে পারি। কিন্তু তিনি চলে গেছেন, সেটা অবশ্যই কঠিন ছিল আপনার জন্য- যেন এক শূন্য শহরে বাস করা। তবু, সেই শূন্য শহরে আপনি আমাকে বড় করে তুলেছেন।’

 

একদল কাক উড়ল আকাশে কা কা করতে করতে। তেংগো উঠে দাঁড়াল। বাবার সামনে গেল আর তার হাত রাখল তার কাঁধের উপর। “বিদায়, বাবা। আমি শিগগিরই আবার আসব।”

 

দরজার হাতলে হাত রেখে, তেংগো শেষবারের মতো ফিরে তাকাল এবং দুঃখ পেল বাবার চোখ থেকে একফোটা জল গড়িয়ে পড়তে দেখে। সিলিংয়ের ফ্লুরোসেন্ট আলোর নিচে তা চকচক করল ঘোলাটে রূপালি রঙের মতো। জলের ফোটাটি ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল তার গালে এবং পড়ে গেল তার কোলের উপর। তেংগো দরজা খুলল এবং চলে গেল সেই ঘর ছেড়ে। স্টেশন পর্যন্ত সে একটা ক্যাব নিলো এবং চড়ে বসল সেই ট্রেনে যেটি এখানে তাকে নিয়ে এসেছিল।

 

[জ্যায় রবিনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে]

Facebook Twitter Email