যুদ্ধের বিপক্ষে কবিতা : পাঁচ কবির পাঁচটি কবিতা

Facebook Twitter Email

 

(জন্মলগ্ন থেকে মানুষের জীবন ও জীবিকা, ধর্ম ও রাজনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, উত্থান ও পতন, এ রকম প্রতি অনুষঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের বড়ো একটা অংশ এই যুদ্ধেরই বিভীষিকা ও ইতিহাস। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থও মূলত যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা ও বিস্তার। অনাদিকাল থেকে মানুষের এক নির্মম ও প্রিয় খেলা এই যুদ্ধ। বিপরীতক্রমে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সব সময়ই যুদ্ধের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে সমাজের অগ্রসর অংশ, কবি ও সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিজ্ঞানীরা প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এই কবি-সাহিত্যিকেরা বিরামহীনভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। বিশ্ব সাহিত্যের প্রথম দিকে যুদ্ধ-বিরোধী কবিতা লেখেন হোমার। তারপর পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত কবিই যুদ্ধ-বিরোধী কবিতা লিখেছেন। এখনো লেখা হচ্ছে অসংখ্য। এরকম হাজার হাজার কবিতা থেকে কয়েকটা কবিতা বেছে নেয়া দুঃসাধ্য। অনেকটা দৈবচয়ন করে গত শতাব্দীর পাঁচজন কবির পাঁচটি কবিতা অনুবাদ করা হলো।)

 

‘ওয়ারশতে’

(ওয়ারশ, ১৯৪৫)

চেশয়া মিওশ

 

কি করছো এখানে, কবি, এই ধ্বংসস্তূপে

সন্ত জনের মন্দিরে, এই রৌদ্রমুখর

বসন্তদিনে?

কি ভাবছো এখানে, কোথা হতে বাতাসে ভেসে আসে

স্রোতস্বিনী  ভিশুয়ায় ছড়ানো

পাথরকুচির লালধুলো?

কখনো শপথ করো নি তুমি

ধর্মাচারী এক শোকপালনকারী হতে।

কখনো শপথ করো নি তুমি

ছুঁয়ে দেখতে তোমার জাতির গভীরতর ক্ষত।

অতএব, পবিত্র করো নি তুমি ওদের

ঐ অভিশপ্ত পবিত্রতা দিয়ে, যা প্রণোদিত করে

উত্তরসূরিদের, শতাব্দীর পর শতাব্দী।

অথচ এন্টিগোনের শোকার্তরা

খুঁজছে ওর ভাইটিকে

যদিও ওটা ওদের সহিষ্ণুতা ধরে রাখার

ক্ষমতার ঊর্ধে। এবং হৃদয়

এক পাথর, যার ভেতর লুকিয়ে রয়েছে

পতঙ্গের মতো, প্রবল অসুখী এক দেশের

অন্ধ ভালোবাসা।

ভালোবাসতে চাইনি আমি ওভাবে।

আকল্প না ওটা আমার।

দুঃখ-প্রকাশ চাইনি আমি ওরকম।

আলেখ্য না ওটা আমার।

খুব হালকা আমার কলম

ক্ষুদে এক হামিংবার্ডের পালকের চেয়েও।

বয়ে বেড়ানো খুব বেশি এ বোঝা

কীভাবে বাস করতে পারি আমি আর এদেশে

যেখানে আমার পায়ের পাতা ধাক্কা খায়

অসমাহিত আপনজনের হাড়ে?

আমি শুনি ওদের কণ্ঠধ্বনি, দেখি ওদের করুণ হাসি।

কিছু লিখতে পারি না আমি, পাঁচটা হাত

আঁকড়ে ধরে আমার কলম এবং আদেশ দেয়

লিখতে ওদের জীবনের গল্প আমাকে, এবং মৃত্যু।

আমি জন্মেছিলাম কি

এক শোকপালনকারী হতে?

আমি তো চাই উৎসবমুখর গান গাইতে,

সবুজ বন-প্রান্তরে, যেখানে শেকসপিয়র

নিয়ে যায় আমাকে প্রায়শ। ছাড়ো,

কবিদের কাছে একটা সুখের মুহূর্ত,

না হয় ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী তোমার।

আনন্দ ছাড়া বাঁচা এক পাগলামো

এবং মৃতের কাছে এর পুনরাবৃত্তি করাও ঐ একই

যাদের বেঁচে থাকা ছিল এক সুখবিলাস,

চিন্তায়, কর্মকান্ডে এবং একমাত্র

দুটো উদ্ধারকৃত শব্দে :

 

 

‘এক আইরিশ বায়ুসেনা

আগাম দেখে নেয় ওর মৃত্যু’

উইলিয়াম বার্টলার ইয়েটস

 

জানি একদিন মুখোমুখি হব আমার ভাগ্যের

উপরে ভেসে বেড়ানো ঐ মেঘের ভেতর কোথাও;

ওগুলো, আমি যুদ্ধ করি যা, আমি ঘৃণা করি না,

ওগুলো, আমি পাহারা দেই যা, আমি ভালোবাসি না;

আমার দেশ এক কিলতার্তীয় ক্রুশ,

আমার দেশের মানুষেরা কিলতার্তীয় দরিদ্র, কোনো সমাপ্তি

বয়ে আনতে পারে না কোনো ক্ষতি

অথবা পারে না খুশি করতে ওদের আগের চেয়েও বেশি।

না কোনো কানুন, না কর্তব্য পারে পাঠাতে আমাকে এক যুদ্ধে,

না সাধারণ মানুষ, না উৎফুল্ল জনতা,

আনন্দের এক নিঃসঙ্গ প্রণোদনা

মেঘের ভেতর তাড়িয়ে এনেছে এমন সংক্ষুব্ধতা;

ভারসাম্য এনেছি আমি সবকিছুর; মনে এনেছি সবই,

মনে হয়েছে নিঃশ্বাসের নির্মম অপব্যয় আগামী ঐ বছরগুলো

এবং পেছনের বছরগুলোও নিঃশ্বাসের অনিয়ন্ত্রিত অপচয়

এই জীবনের সঙ্গে ভারসাম্য; এই মৃত্যুর।

 

সত্য ও ন্যায়বিচার।

 

 

জার্মান দুর্গতি

(১৯৪৩)

বের্ট্রল্ট ব্রেস্ট

 

একদা আদেশ দিয়েছিল আমাদের নেতারা

বেরিয়ে যেতে ও জয় করতে ডানজিগের ছোট্ট শহরটা

অতএব কামান ও বোমারু নিয়ে আমরা অনুপ্রবেশ করি পোল্যান্ডে এবং

মাত্র ক’দিনের ভেতর দখল করি সমগ্র পোল্যান্ড।

একদা আদেশ দিয়েছিল আমাদের নেতারা

বেরিয়ে যেতে ও দখল করতে প্যারিসের বড় শহরটা

অতএব কামান ও বোমারু নিয়ে আমরা দখল করি ফ্রান্স এবং

একদা আদেশ দিয়েছিল আমাদের নেতারা

জয় করে নিতে চাঁদ, ও মহাসাগরের তলদেশ,

এবং তখন খুব খারাপ হয়ে উঠেছিল রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধটা

শত্রুরা ছিল সবল এবং আমরা ছিলাম আমাদের বাড়িঘর হতে অনেক দূরে

ঈশ্বর রক্ষা করুন এখন এবং ফিরিয়ে নিন আমাদের ঘরের কোণে

ফিরিয়ে নিন আমাদের বাড়িঘরে আবার।

 

 

শয়তান

(১৮৭০)

আর্তুর র্যাঁবো

 

লাল বৃত্ত আঁকা মেশিনগানের মুখগুলো হুঙ্কার তোলে যখন

দিনের অনিঃশেষ প্রসারণের দিকে

যখন লাল অথবা সবুজ, ঠমকে রাজার সামনে ওদের

জড়ো করা বিপুল সৈন্যদল ছত্রখান হয়ে পড়ে ও মিলিয়ে যায়

এবং ঘটে যখন এক দানবীয় উন্মাদনা

অসংখ্য মানুষের একটা ধোঁয়ার কু-লী উঠে যায় আকাশে

অসহায় বোকার দল। -মৃত, এই গ্রীষ্মে, পোড়া ঘাসে,

প্রকৃতির বুকে, কে বোঝে এ মানুষগুলোর হাসি;

একজন ঈশ্বর আছেন, ক্রুদ্ধ বাতাসে হাসেন যিনি

সোনালি শিখা ছড়িয়ে, এবং ঝিমোন

মর্মরিত প্রার্থনার মেঘের ভেতর, এবং জাগেন তখনি কেবল

যখন ঐ কান্নাবিজড়িত মায়েরা

নতজানু হয় ওদের পুরোনো কালো চাদরে জড়িয়ে,

নিদারুণ মর্মপীড়ায় –

এবং ওদের শেষ ছোট্ট মুদ্রাটি জমা হয় প্রভুর কোষাগারে।

 

(ইংরেজি অনুবাদ : পল স্মিথ)

 

 

বোকা বাজায় ঘণ্টি

ওয়াল্টার ডি লা মেয়ার

 

এসো, মৃত্যু, কী কথা আছে তোমার সঙ্গে আমার;

এবং তুমি, বোকা এক অসহায়;

এবং ভালোবাসো- ডানাভাঙা এক বালককে;

এবং দেখাও করুণা:

বোকা মানুষটা এখন গান গাইবে তোমার সামনে,

যেমন গেয়ে থাকে বোকারা, সচরাচর।

 

ওহো, সংগীতেরও আছে সামান্য অনুভূতি কিছু,

এবং এইমাত্র বলা এক গৎ,

এবং এরিমধ্যে বুড়িয়ে গেছে পৃথিবী,

এবং দুর্বল বোধন আমার হয়ে উঠেছে ঘন-সংবদ্ধ;

তবু কিছু গোপন আছে আমারও- অন্ধকার, প্রিয় আমার,

তোমাদের সবার নিঃশ্বাসের জন্য, কাছে আসো

এবং দেখো নিদেনপক্ষে কিছু করালদর্শন শ্রোতা বলে

আমি বাজাবো আমার ঘণ্টিগুলো।

 

ওরা সবাই যুদ্ধে!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওদের শরীর রয়ে যায়

জ্বলন্ত সূর্য ও বরফশীতল তারাদের নীচে

পাগল-করা শোকের সংগীত

বৃষ্টি ও রক্ত মেশা কাদার ভেতর দিয়ে

শীতল কামান টেনে নেয়া; চোখে

তীব্র দীপ্তি ছড়ায় নতুন চাঁদ

বিস্তারিত উন্মাদনা নিয়ে!

 

চুপ!… ব্যবহার করি আমি শব্দ

অর্থ যেগুলোর খুব সামান্যই বুঝি আমি;

এবং নিঃশব্দ পাখিরা

ভালোবাসার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে!

পাতা ও ফুলের ছায়ার আড়াল হতে বেরিয়ে,

কাঁপে অবিমৃশ্যকারিতায়

যা এমনকি মধ্যদিনেও দুঃখকাতর

সাবধান, সাবধান এজন্য নয় যে যা বলেছি আমি

মানুষের উন্মত্ত আতিথ্যে

আমার চেয়েও বোকা,

বিদ্বেষে, ঘৃণ্য হতাশায়,

যে হত্যা করে, এবং মরে যায় যে-

খুব সাদামাটাভাবে বলিনি আমি এসব, তাহলে?

তবুও ফিসফিস করে করুণা, ‘কেন?’

 

তোমার বোকা বিষয়, সমাধির দিকে ধাবিত তোমার,

শিশুদের জানার মতো কোনো কিছু নয় আমার বিষয়টা

এবং মৃত্যুর- কোনো কান ছিল না। সে চুমুক দিয়েছে

যেখানে ভয় শিরশির

চোখবিহীন কীটেরা নিদ্রায় নিশ্চুপ;

তবুও, হাসে সে যখন, হাত প্রসারিত করে

ওর দাঁতাল চোয়ালের এক পাশ হতে অন্য পাশে

বিবর্ণ পাতলা হাড়গুলো মড়মড় করে, এবং… সেখানে,

সেখানে;

শোনো কেমন করে আমার ঘণ্টিগুলো বাতাসের

পরিসেবা হটিয়ে দেয় দূরে!…

 

নাহ্, একটা স্বপ্ন কিন্তু ছিল আমারও

এই এক পৃথিবী পাগলের মাঝে।

আমার মতো এত সাধারণ আর একটা সুখী পাগলও কি নেই

যে আমি পাগল এক শূন্য দৃশ্যের মতো

জলাভূমি ও উইলো গাছের ভেতর

যেখানে বয়ে যায় উদাস বাতাস

কিন্তু ঐ জঘন্য শয়তান-পাগল

যে পচে যায় ওর নিজের মস্তিষ্কে,

এবং গণনা করে মৃতদের,

এক সজ্জন নয়- এবং দুই-

অথচ ঐ দৈত্যগুলোর জন্য ওরা ছিল,

সাহসী, বিশ্বস্ত, সত্য,

যখন, বাতাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে,

পৃথিবীর প্রিয় সবুজ ও নীল

স্বর্গ ওরা ভাগ করে নিয়েছিল

সুন্দরের সঙ্গে যারা ওখানে ওদের আদেশ দিয়েছিল…

 

ওখানে, এখন! সে যায়-

পুরোনো হাড়গোড়; ওকে ক্লান্ত করেছি আমি।

ওহে, এবং আলো কমে যায়,

এবং ক্লান্ত, নির্দোষ

স্বপ্নের ঘোরে এখন হতে…

আসো, ভালোবাসো, বালক আমার,

ঝিমোনো ঐ মাথা দুলিয়ে

এখন সময়, তোমার প্রার্থনা বলা হয়েছে।

Facebook Twitter Email