প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কবিতা

Facebook Twitter Email

 

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল বিংশ শতাব্দী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অচিন্তনীয় অগ্রগমনে, প্রযুক্তি ও জীবনমানের অভাবনীয় উৎকর্ষতায়, সৃষ্টির নানা বৈচিত্র্য ও অভিনবত্বে বিংশ শতাব্দীর কোনো তুলনা নেই। একদিকে যেমন বিস্ময়কর  আলোকময় অগ্রগতি, অন্যদিকে এ শতাব্দী কালিমালিপ্ত হয়েছে দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ তা-বে। দুটি বিশ্বযুদ্ধেরই সূত্রপাত হয় ইউরোপে, বিবদমান পক্ষগুলোও প্রায় অবিকৃত থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ সালে, আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে, শেষ হয় ১৯১৮ সালে মিত্র শক্তির জয়ের মধ্য দিয়ে। শিল্পের যে কোনো শাখার মতোই যুদ্ধের বিভীষিকা ও তা-ব আহত, বিমর্ষ করে কবিদের। তারা রচনা করেন অসামান্য সংবেদনশীল পঙ্ক্তিমালা। কেবল কলম নয়, তারা সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে স্বদেশের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিলেন। যুদ্ধের কবিতাগুলো তাই হয়ে উঠেছে জীবন্ত, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্যুতিতে ঝলমলে। অতীব দুঃখের ব্যাপার,  লড়াইরত অনেক কবি ফ্রন্টে শত্রুর গুলিতে বা কামানের শেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন, অকালে ঝরে গেছে অনেক অমূল্য প্রাণ ও প্রতিভা।  এখানে সংকলিত দশটি কবিতাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ওপর রচিত ইংরেজি কবিতাসমূহের মাঝে শ্রেয়তর ভাবা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শততম বর্ষ স্মরণে বিখ্যাত দশটি কবিতা এখানে অনূদিত হলো।

জন ম্যাকরে

জন ম্যাকরে ১৮৭২ সালে কানাডায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন কবি, চিকিৎসক, লেখক, শিল্পী ও সৈনিক। ‘ফ্লান্ডার্সের মাঠে’ কবিতাটির জন্যই তিনি সমধিক পরিচিত, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে লেখা বিখ্যাত কবিতাসমূহের মাঝে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কবিতাটি লিখেছেন। দুর্ভাগ্য প্রথম মহাযুদ্ধের একেবারে শেষদিকে ১৯১৮ সালে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

 

ফ্লান্ডার্সের মাঠে

 

পপি ফুল ফোটে ফ্লান্ডার্সের মাঠে

সারির পর সারি ক্রুশচিহ্নের মাঝে,

চিহ্নিত করে আমাদের স্থান আর আকাশে

আজো সাহসভরে গান গায় ছোট্ট গানের পাখি, ওড়ে

নীচের বন্দুকের আওয়াজের মাঝে তা সামান্যই শোনা যায়।

 

আমরা হলাম মৃত। কিছুদিন আগেও ছিলাম জীবিত

সূর্যোদয় দেখেছি, দেখেছি সূর্যাস্তের রঙিন আভা।

ভালোবেসেছি আর পেয়েছি  প্রিয়তমের ভালোবাসা

আর এখন কিনা আমরা শুয়ে আছি

ফ্লান্ডার্সের মাঠে।

 

শত্রুর সাথে আমাদের বিবাদ এখন তোমাদের কাঁধে:

পড়ন্ত হাত থেকেই তোমদের দিকে ছুড়ে দেই

আলোকমশাল; তাকে তোমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরো।

আমরা যারা মৃত যদি তাদের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করো

তবে আমরা ঘুমাব না, যদিও পপি ফুল ফুটবে

ফ্লান্ডার্সের মাঠে।

 

 

মারজোরি পিকথল

 

 

 

মারজোরি পিকথল ১৮৮৩ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বয়স যখন সাত বছর তখন পিতামাতার সাথে কানাডায় অভিবাসী হয়ে চলে যান এবং আমৃত্যু সেখানেই বসবাস করেন। তাকে একসময় তার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ কানাডীয় কবি হিসেবে মনে করা হতো। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি ভ্যানকুভারে মৃত্যুবরণ করেন।

মার্চপাস্টরত মানুষেরা

 

শীতের সাদামাটা আকাশের নীচে

আমি দেখেছি সহস্র যিশুখ্রিষ্ট হেঁটে যায়

তারা গায় একটি অলস গান আর

স্বাধীনভাবে হেঁটে যায় কালভারি।

 

রুক্ষ ঠোঁট আর যতœহীন আঁখি নিয়ে

তারা মাচপাস্ট করে যায় পবিত্রতম সখ্যে

স্বর্গ সারিয়ে দিতে পারে পৃথিবীর ব্যাধি; তারা দিয়েছে

তাদের পৃথিবী-লালিত ন্বপ্নদের কবরের খাপে ভরে।

 

তারা বিশুদ্ধ হৃদয় আর অবিচল প্রাণ নিয়ে

মৃত্যুর ভোজনোৎসবে পান করেছে জীবন

যারা সুদূরে, বিচ্ছিন্ন, তাদের প্রত্যেকের জন্য,

সাতটি তলোয়ার বন্দি করেছে একটি রমণীর হৃদয় ।

 

 

 

 

 

 

 

রুপার্ট ব্রুক

 

 

রুপার্ট  চসার ব্রুক জন্মগ্রহণ করেন ইংল্যান্ডে, ১৮৮৭ সালে । তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন, যে কারণে প্রখ্যাত আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস তাকে আখ্যায়িত করেন ‘ইংল্যান্ডের সুদর্শনতম যুবক’ হিসেবে । তার কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে মূলত যুদ্ধ নিয়ে রচিত আদর্শবাদী সনেটসমূহের কারণে, যা তিনি লিখেছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের সময়পর্বে। এখানে অনূদিত ‘সৈনিক’ কবিতাটি খুবই বিখ্যাত।  দুর্ভাগ্য যে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি দেখে যেতে পারেননি, তার আগেই ১৯১৫ সালে এই ক্ষণজন্মা কবি মৃত্যুবরণ করেন।

সৈনিক

 

যদি আমি মৃত্যুবরণ করি, আমাকে নিয়ে শুধু এটা ভেবো

বিদেশের মাটিতে কোথাও একটি অঞ্চল জুড়ে

চিরকালের এব ইংল্যান্ড আছে, থাকবে চিরকাল।

সেই পবিত্র মাটিতে পবিত্রতর এক দেহভস্ম লুকানো আছে

সেই দেহছাই যা জন্ম দিয়েছে ইংল্যান্ড, আকার দিয়েছে, দিয়েছে বোধ

একদা সে দিয়েছিল ভালোবাসার জন্য ফুল, ঘুরে বেড়ানার জন্য পথ

ইংল্যান্ডের একটি প্রাণ যা শ্বাস টেনেছে ইংল্যান্ডের বায়ু থেকে

তার নদীদের জলে ধৌত সে দেহ, তার রৌদ্রে ঝলমল

আর ভাবো, এ হৃদয়, ঝেড়ে ফেলেছে সব পাপ

চিরন্তন মনের এবটি স্পন্দন, কিছু কম নয়

প্রচার করে সে কথাই ইংল্যান্ড যা শিখিয়েছে

ইংল্যান্ডের দৃশ্য ও সুর, তার দিনের মতোই সুখীস্বপ্নে

আর হাস্যরোল, বন্ধুদের জ্ঞান, তাদের অপূর্ব ভদ্রতা

আছে শান্তিতে এ হৃদয়ে, এক ইংলিশ স্বর্গের নীচে!

 

 

 

 

রুডইয়ার্ড কিপলিং

 

 

জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং প্রখ্যাত ইংরেজ কবি, ছোটোগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক। তার জন্ম ভারতের মুম্বাই শহরে ১৮৬৫ সালে, ভারত তখর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ভারতে জন্ম নিলেও কিপলিং তার পিতামাতার সাথে পাঁচ বছর বয়সে ইংল্যান্ড চলে যান। তাকে ছোটোগল্পের শৈলী নির্মাণের এক অসামান্য শিল্পী মনে করা হয়।  ছোটোদের জন্য লেখা তার The Jungle Book (১৮৯৪) ও Kim (১৯০১)  ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। ইংরেজ সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার  লাভ করেন (১৯০৭)।

আমার ছেলে জ্যাক

 

‘তোমরা কি কেউ জানো আমার ছেলে জ্যাক কেমন আছে?’

এই বহরে নয়

‘বলো তো, কবে সে ফিরে আসবে?’

এই প্রবাহিত বাতাসের সাথে নয়, এ ¯্রােতের সাথে নয়।

 

‘তোমরা কি  কেউ তার কোনো খোঁজ জানো?’

এই দলে নয়

যা ডুবে গেছে তার ভেসে ওঠবার সম্ভাবনা কম।

এই প্রবাহিত বাতাসের সাথে নয়, নয় এ ¯্রােতের সাথে।

 

‘হায়, আমি কী করে শান্তি খুঁজে পাব?’

এই বহরে নয়

কোনো বহরেই নয়

সে তার বন্ধুদের ফেলে যায়নি কোনো লজ্জায়

এমনকি ওই প্রবাহিত বাতাসকে, ওই ¯্রােতকেও  নয়।

 

তবে তোমার মাথা আরও উঁচু করে ধরো

এই ধারা

আর প্রতিটি ধারাই

তোমার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলো সেই ছেলে

মিলিয়ে গেছে ওই প্রবাহিত বাতাসের সাথে, ওই বহমান ¯্রােতে।

 

 

 

চার্লস হ্যামিলটন সোরলে

 

 

 

চার্লস হ্যামিলটন সোরলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একজন ব্রিটিশ কবি  যিনি ১৮৯৫ সালে স্কটল্যান্ডের এবারডিনে জন্মগ্রহণ করেন। অন্য বেশ কিছু বিশ্বযুদ্ধের কবির মতো ইনিও ক্ষণজন্মা, যুদ্ধচলাকালীন ১৯১৫ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিটেন যখন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, সেসময়ে সোরলে জার্মানিতেই উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করছিলেন। জার্মান কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করলেও ছেড়ে দেয়। ব্রিটেনে ফিরে এসে তিনি যুদ্ধরত একটি সেনাদলের সাথে স্বেচ্ছায়  যোগ দেন এবং দ্রুতই সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন।  ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলে যুদ্ধ চলাকালীন তিনি শত্রুর গুলির আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। সোরলেকে প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে নিহত তিনজন গুরুত্বপূর্ণ কবির একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।

জার্মানির প্রতি

 

তুমি আমাদের মতোই অন্ধ। তোমার ক্ষত কোনো মানুষের সৃষ্টি নয়,

এবং কোনো মানুষ দাবি করেনি সে তোমার দেশ দখলে নিয়েছে।

সীমায়িত ধারণার আবদ্ধ প্রান্তরে হাতড়ে ফেরে অন্ধের মতো

আমরা হোঁচট খাই আর আমরা কিছুতেই বুঝি না।

তুমিই কেবল দেখেছ তোমার সমুখে বিপুল পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ,

আর আমরা, আমাদের নিজস্ব মননের সরু হয়ে যাওয়া পথ,

আমরা প্রত্যেকেই আমাদের প্রিয় পথে দাঁড়াই ঋজু,

ফোঁসফোঁস করি আর করি ঘৃণা। এক অন্ধ লড়াই করে আরেক অন্ধের সাথে।

 

শান্তি ফিরে এলে আমরা পুনর্বার ভেবে দেখতে পারতাম

বিজয়ীর নতুন দৃষ্টিতে আমাদের পরস্পরের প্রকৃত স্বরূপ

আর হতাম বিস্মিত।  আমরা গড়ে উঠব আরও দয়ালু আরও উষ্ণ হয়ে

আঁকড়ে ধরব পরস্পরের হাত আর  হেসে উড়িয়ে দেব পুরোনো কষ্ট,

যখন শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত বইবে ঝড়

আর অন্ধকার, বজ্রপাত ও তুমুল বৃষ্টিধারা।

 

 

ইভর গারনে

 

 

 

ইভর বারট গারনে ছিলেন একজন ইংরেজ কবি ও গীতিকার। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯০ সালে।  কৈশোরেই তিনি প্রতিভার দ্যুতি ছড়ান এবং মাত্র ১৪ বছর বয়সে সংগীত রচনা শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তার পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, তিনি সৈনিক হিসেবে তাতে যোগ দেন। যুদ্ধের ফ্রন্টে গিয়ে প্রবল উদ্যমে কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং প্রথম কাব্য Severn and Somme প্রকাশের উদযোগ নেন। দুর্ভাগ্য ১৯১৭ সালে শত্রু হামলায় তিনি গুরুতররূপে আহত হন। এছাড়া তিনি জার্মানদের গ্যাস হামলার শিকার হন যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর  নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ১৯৩৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার প্রেমের প্রতি

 

চলে গেছে সে, আর আমাদের সব পরিকল্পনা

এখন প্রকৃতই অর্থহীন।

কটসউল্ডের পথ ধরে আমরা আর হাঁটব না

যেখানে ভেড়ারা পড়ে আর ঘাস খায়

শান্তভাবে, পরিপার্শ্বের প্রতি উদাসীন।

 

তার দেহ ছিল বিদ্যুৎগতির

তবে তুমি যে  রূপে চিনতে

সে রূপ নয়, সেভার্ন নদীতে

নীল আকাশের নীচে

আমাদের ছোটো তরী বেয়ে যখন চলতাম

 

এখন তোমার তাকে চেনার কথা নয়…

সে কিন্তু মারা গেছে

মহত্ত্বের মর্যাদায়, সুতরাং ঢেকে দাও তাকে

গর্বের ভায়েলেট ফুল দিয়ে

সেভার্ন নদীর তীরে ফোটা বেগনি ফুল দিয়ে।

 

ঢেকে দাও, দ্রুত ঢেকে দাও তাকে!

আর স্মৃতিতর্পণের ফুলস্তবকের

জমে ওঠা পুরু পর্দায়

লুকিয়ে রাখো ওই লাল ক্ষতচিহ্ন

যা আমাকে যে কোনোভাবে ভুলে থাকতে হবে।

 

এডওয়ার্ড থমাস

 

 

ফিলিপ এডওয়ার্ড থমাস একজন অ্যাংলো-ওয়েলস কবি ও প্রাবন্ধিক যিনি ১৮৭৮ সালে ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুদ্ধ-বিষয়ক কবিতার কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত, যদিও তার অল্প কিছু কবিতাই সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত। ১৯১৫ সালে তিনি যখন প্রথম মহাযুদ্ধে লড়াই করতে যোগ দেন তখন তিনি লেখক হিসেবে সুপরিচিত। এর মাত্র একবছর আগে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। ইনিও বিশ্বযুদ্ধের এক অমূল্য বলি, ফ্রান্সের উপকূলে আরাসের যুদ্ধে (১৯১৭) লড়াইরত অবস্থায় তিনি নিহত হন।

আলো নিভে গেছে

 

আমি চলে এসেছি ঘুমের সীমান্তে,

এক তলাহীন গভীরতায়

সেই জঙ্গলে, যেখানে সবাই পথ হারায়

তা সে পথ যত সোজা কিংবা যত বাঁকাই হোক,

আজ কিংবা কাল; তারা বেছে নিতে অক্ষম।

 

অনেক পথ আর রাস্তার মাথা

সৃষ্টির প্রথম ফাটল থেকে শুরু করে

জঙ্গলের প্রান্তসীমা পর্যন্ত গেছে

আর বিভ্রান্ত করেছে পথিকদের

এখন হঠাৎ করেই অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে,

যার ভেতরে তার হারিয়ে যায়।

 

এখানে মৃত্যু ঘটে ভালোবাসার

হতাশা বা আশা সব নিভে যায়

সকল আনন্দ কিংবা ঝামেলা- সবই

সবচেয়ে মধুর কিংবা সবচয়ে তেতো

এখানে ঘুমের ভেতর সমাপ্তি যা মধুরতর

সবচেয়ে মহান কাজের চেয়েও মহৎ।

 

এমন কোনো পুস্তক নেই

না আছে এমন প্রিয়তম  সৌন্দর্যের মুখ

যা থেকে আমি মুখ ফিরাব না

অনিশ্চিতের পথে চলে যাই

আমাকে একাই প্রবেশ করতে ও ছেড়ে যেতে হবে,

আমি জানি না কীভাবে তা করব।

 

 

দীর্ঘ বৃক্ষের জঙ্গলের চূড়ায়;

তার মেঘাচ্ছন্ন পল্লব নামিয়ে দেয়

সমুখে, তাকের ওপর তাক

তার নীরবতা আমি শুনি আর মেনে চলি

পথ হারিয়ে ফেলতে পারি সহজেই

সঙ্গে নিজেকেও।

 

এ. ই. হাউজম্যান

আলফ্রেড এডওয়ার্ড হাউজম্যান ১৮৫৯ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন ধ্রুপদী প-িত ও কবি ছিলেন যিনি সাধারণ পাঠকের কাছে তার বিখ্যাত কাব্য  A Shropshire Lad-এর ছন্দবদ্ধ ও বিশেষ আঙ্গিকের কবিতাসমূহের জন্য সুপরিচিত। কেবল কবি নয়, তিনি বিখ্যাত তার পা-িত্যের কারণে। নিজ যোগ্যতাতেই প্রথমে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন ভাষার অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা  শেষ হওয়ার বহু বছর পরে, ১৯৩৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

এখানে ঘুমাই আমরা মৃতরা

 

এখানে ঘুমাই আমরা মৃতরা

কেননা আমরা চাইনি বেঁচে থাকতে

আর বেঁচে থেকে অপমানিত করতে

সেই মাটিকে, যা আমাদের জন্ম দিয়েছে।

 

জীবন, নিশ্চিত করে বলা যায়

তাতে হারানোর বেশি কিছু নেই

কিন্তু যুবকেরা ভাবে এটা অমূল্য

আর আমরা ছিলাম যুবা।

 

 

 

 

আইজ্যাক রোজেনবার্গ

 

আইজাক রোজেনবার্গ ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ইংরেজ কবিদের মধ্যে অন্যতম। বস্তুত তার Poems from the Trenches কাব্যকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ওপর লিখিত সবচেয়ে প্রতিভাপূর্ণ রচনা বলে মনে করা হয়। বিশ্বযুদ্ধ চলাকানীন ফরাসি শহর আরাসের নিকট শত্রুর  চোরাগুপ্তা বুলেটে তিনি মারা যান (১ এপ্রিল, ১৯১৮ সাল)। সময়টা ছিল ভোরবেলা, নৈশপ্রহরা শেষ করে তিনি ট্রেঞ্চে ফিরছিলেন। এখানে অনূদিত তার ‘ট্রেঞ্চে ভোর’ কবিতাটিকে অনেক সমালোচকই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ওপর রচিত শ্রেষ্ঠ কবিতার মর্যাদা দিয়েছেন।

 

ট্রেঞ্চে ভোর

 

অন্ধকার ভেঙেচুরে সরে যায়।

এ যেন চিরকালের সেই একই প্রাগৈতিহাসিক সময়,

কেবল একটি জীবন্ত বস্তু আমার হাতে লাফিয়ে ওঠে,

একটি কিম্ভূত অবজ্ঞাপূর্ণ ইঁদুর,

যখন আমি কার্নিশের একটি পপি ফুল তুলে নিই

আমার কানের পেছনে গুঁজে দিতে।

মজার ইঁদুর, তারা তোমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়বে

যদি টের পায় তোমার সহানুভূতি বৈশ্বিক।

এখন তুমি এই ইংরেজের হাত ছুঁয়েছ

কোনো জার্মান হাতে উঠেও তুমি একই কা- ঘটাবে

সন্দেহ নেই, শীঘ্রই, নিজের আনন্দেই তুমি

পাড়ি দিবে মাঝখানের ওই ঘুমন্ত সবুজ চত্বর।

মনে হয় তুমি নিজে নিজেই হাসো যখন দাও পাড়ি,

তীক্ষè চোখ, সুগঠিত পা,  চঞ্চল দৌড়বিদ,

আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তোমার চেয়েও কম,

হত্যার স্বেচ্ছাচারিতার হাতে আমি বন্দি,

পৃথিবীর প্রান্তরে যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে

ফ্রান্সের বিধ্বস্ত  মাঠগুলি।

আমাদের চোখে কী দেখো তুমি

গর্জনরত হিসহিসে লোহা আর আগুনশিখা

সজোরে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে,  সে কোনো বেহেশতে?

কোন সে কম্পন – কোন সে বীতশ্রদ্ধ হৃদয়?

পপি ফুলেরা যাদের শেকড় মানুষের শিরায় বাহিত

নেমে পড়ো আর নিঃসৃত করো সব বর্জ্য :

আমার কানে রাখা মাইন কিন্তু নিরাপদ-

ধুলা মেখে কেবল কিছুটা সাদা ।

 

 

শার্লেট মিউ

 

শার্লেট মেরি মিউ একজন ইংরেজ কবি যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৯ সালে ইংল্যান্ডের ব্লুমসবারিতে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন স্থপতি যিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলে পুরো পরিবার অভাবের মাঝে পতিত হয়।  লেখালেখির প্রথম পর্যায়ে মিউ ছোটোগল্প লিখতেন। তার প্রথম কাব্য The Farmer’s Bride  প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। টমাস হার্ডি এবং আরও অনেকের মতে মিউ ছিলেন তার সময়কার সেরা ইংরেজ মহিলা কবি, যার কবিতা ইংরেজি কবিতার দুটি পর্ব- ভিক্টোরিয়ান ও আধুনিকতার মিশ্রণ। ১৯২৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জুন ১৯১৫

 

আজ কে প্রথম জুনে ফোটা প্রথম গোলাপের কথা ভেবেছে?

হয়ত কোনো চকচকে চোখ আর

ঝাঁকড়া উজ্জ্বল চুলের শিশু কুড়াতে যাবে তাকে

এক সবুজ রৌদ্রকরোজ্জ্বল পথে যা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে

যেন শহরের ঢেকে রাখা বাতি থেকে ঝরে পড়া সাহসী নক্ষত্রসকল

এ সামান্য জুনের কী অর্থ এক বিপুল ভাঙা পৃথিবীর কাছে যার চোখ নিষ্প্রভ

ভয়ের অবয়বের দিকে, দুঃখের মুখের দিকে খুব বেশি তাকিয়ে

অথবা এই বিধ্বস্ত পৃথিবীর কী অর্থ আছে জুনের কাছে, শিশুটির কাছে

তার ছোট্ট আকুল হাত, চকচকে চোখ, ঝাঁকড়া উজ্জ্বল চুলের মাথাটির কাছে?

 

 

Facebook Twitter Email