তপন রায়চৌধুরী শ্রদ্ধাভাজনেষু

Facebook Twitter Email

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী ২৬শে নভেম্বর (২০১৪) রাতের বেলায় তাঁর অক্সফোর্ডের বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, প্রায় বছর খানেক অসুস্থ থাকার পর। তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৮ বছর, কারো কারো মতে, ৯০ বছর । তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের কীর্তিপাশা গ্রামে, এক জমিদার পরিবারে। বড়ো হয়ে তিনি লেখাপড়া করেন কলকাতায় আর অক্সফোর্ডে।

তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। হাজার হাজার বাঙালি ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া করলেও, ইতিহাসচর্চায় বাঙালিদের বিশেষ অবদান আছে, অথবা অবদান থাকলেও তা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, গত এক শো বছরের ইতিহাস খেকে তা মনে করা শক্ত। তবে যদুনাথ সরকার ইতিহাসচর্চায় যেমন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন, ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে তেমন অসাধারণ ভূমিকা রেখে গেছেন তাঁর ছাত্র তপন রায়চৌধুরী। যদুনাথ সরকার সামাজিক ইতিহাসের নতুন ধারা প্রবর্তন করেছিলেন, তপন রায়চৌধুরী কেবল সামাজিক ইতিহাস নয়, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং মননশীলতার ইতিহাস রচনারও পথ দেখিয়ে গেছেন।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন যদুনাথ সরকারের তত্ত্বাবধানে। সম্রাট আকবর ১৫৭৪ সালে তাঁর সেনাপতি মুনিমকে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গদেশ দখলে আনার জন্যে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও আকবরের দশ-দশজন সুবেদার বঙ্গদেশ পুরোপুরি অধিকার করতে পারেননি ১৬০৫ সাল পর্যন্ত। এই অঞ্চল সত্যিকারভাবে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় জাহাঙ্গীরের আমলে। বঙ্গদেশে মোগলদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সেই আদিপর্বের সমাজ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তপন রায়চৌধুরী, তাঁর ডক্টরেটের জন্যে। তাঁর সেই গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থের নাম ছিলো ‘বেঙ্গল আন্ডার আকবর অ্যান্ড জাহাঙ্গীর’ (কলকাতা, ১৯৫৩)। এই গবেষণা তিনি কী গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন, তা বোঝা যায় এর জন্যে তাঁর ফারসি ভাষা শেখার ঘটনা থেকে। ফারসি শিখে তিনি সমকালীন দলি-দস্তাবেজ এবং ঐতিহাসিক বিবরণ ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তাঁর কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। সামাজিক ইতিহাস লেখার উন্নততর আদর্শ দেখে গ্রন্থটি দ্বিতীয়বার দিল্লি থেকে প্রকাশিত হওয়ার সময়ে (১৯৬৯), তিনি দীর্ঘ একটি ভূমিকা লেখেন। তাতে তিনি তাঁর অতৃপ্তির কথা জানান এবং এই ভূমিকায় দেখান কিভাবে পুরো গ্রন্থটি রচনা করা যেতো।

 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করার পর তিনি অক্সফোর্ডে যান দ্বিতীয়বার ডক্টরেট করার জন্যে। এবারে আর সামাজিক ইতিহাস নয়, গবেষণা করেন অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিলো: সতেরো শতকে ডাচ ঈস্ট ইন্ডিয়া কম্পেনির করোম-লে অর্থাৎ তামিল নাদুর উপকূলে ব্যবসা-বাণিজ্য। এ কাজের জন্যে  তিনি ভালো করে ডাচ ভাষা শেখেন। তাঁর এই অভিসন্দর্ভের উপর ভিত্তি করে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় নেদারল্যান্ডসের হেগ থেকে, ১৯৬২ সালে। এই গ্রন্থের নাম ‘ইয়ান কম্পেনি ইন করোম্যান্ডেল, ১৬০৫-১৬৯০।’ দক্ষিণ ভারতের উপকূলে ডাচ-বাণিজ্যের রাজনৈতিক পটভূমি, সমস্যা, ব্যর্থতা এবং সাফল্য নিয়ে তিনি আলোচনা করেন এই গ্রন্থে।

 

কর্মজীবনে তিনি কলকাতার মওলানা আজাদ কলেজ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, দিল্লি স্কুল অব একোনোমিক্স, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলায়েল কলেজে কাজ করেন। এ ছাড়া, কয়েক বছর আগে তিনি ভারতের জাতীয় গবেষণা অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং আমৃত্যু সে পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধি পান। আর ভারত সরকারের তরফ থেকে পান পদ্মভূষণ।

 

মস্ত বড়ো পন্ডিত হলেও, পরিচিতদের কাছে তিনি ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে ছিলেন না। তিনি ছিলেন সবার তপনদা। তাঁর ই-মেইল আইডি-ও ছিলো ‘তপনদা অ্যাট এওএল ডট কম’। সেই সর্বজনপ্রিয় তপনদার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় চল্লিশ বছর আগে- ১৯৭৪ সালের গরমের সময়ে। তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজে এসেছিলেন আটটা সেমিনার দেওয়ার জন্যে। সেই আটটা বক্তৃতায় আমি উপস্থিত ছিলাম। কয়েকটি বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন বঙ্গদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে। আর কয়েকটা বক্তৃতা করেছিলেন ইতিহাস চর্চার বিভিন্ন দিক অর্থাৎ বিভিন্ন ধারা নিয়ে।

 

তাঁর এই সেমিনারে যোগদানের আগে পর্যন্ত ইতিহাস বলতে বুঝতাম সন-তারিখ আর ঘটনাপঞ্জীর ফিরিস্তি- একজন রাজা করে জন্মগ্রহণ করেন, কবে সিংহাসন আরোহণ করেন, কবে কোন যুদ্ধ করেন, শাসন-ব্যবস্থা কেমন ছিলো, কবে- কিভাবে মরে যান, রাজা হিশেবে তাঁর কৃতিত্ব অথবা ব্যর্থতা কোথায় ইত্যাদি- এক কথায় রাজনৈতিক ইতিহাস। এর বাইরে যে ইতিহাস হতে পারে পরিবারের, সমাজের, জীবনযাত্রার, উৎসব-আনন্দের, ব্যবসা-বাণিজ্যের, কৃষির, উৎপাদনের, বণ্টনের, রোগের, বিজ্ঞানের- তা জানা ছিলো না। তপন রায়চৌধুরী ইতিহাসের নানা ধারার সঙ্গে উপস্থিত অধ্যাপকদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কথা, মননশীলতার ইতিহাসের কথা। বিজ্ঞানের ইতিহাস, ধারণার ইতিহাস, উদ্বেগের ইতিহাস ইত্যাদি নানা শাখার কথা। গবেষণা এবং অধ্যয়নের নানা দিক নিয়েও তিনি আলোচনা করেছিলেন, দৃষ্টান্ত সহকারে। মনে আছে, যা লেখা আছে, সেটাকেই না-পড়ে দুই লাইনের মাঝখানকার ফাঁকা জায়গাটা কী করে পড়তে হয়, সে বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। অর্থাৎ লেখক যা সরাসরি বলছেন, তার চেয়েও বড়ো সত্য বলতে পারেন, কিছুই না-বলে অথবা প্রাসঙ্গিকভাবে। ধরা যাক, ১৯১০ সালের একটি গল্পে পড়ছি: ‘ওর আর আমার পছন্দ ছিলো হুবহু এক। প্রিয় কবি, প্রিয় লেখক, পছন্দের গান-বাজনা সবকিছুতেই আমরা অভিন্ন। খালি ওদের রান্না থেকে পেঁয়াজের গন্ধ পেতাম।’ এখানে যা লেখা নেই তা হলো ‘আমি’ হিন্দু, ‘ও’ মুসলমান- এই সাম্প্রদায়িক পরিচয়। হিন্দু ও মুসলমানের রান্না এক নয়। দুজনের পছন্দও হুবহু এক নয়।

 

তপন রায়চৌধুরী তখন ‘নর্মস্ অব ফ্যামিলি লাইফ অ্যান্ড প্যার্সোনাল মরালিটি অ্যামং দ্য বেঙ্গলি হিন্দু এলিট, ১৬০০-১৮৫০’ নামে এাকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধের সূত্র ধরে বলেছিলেন যে, শিক্ষিত বাঙালি সমাজে বন্ধুত্বের ধারণা উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত ছিলো না । বন্ধু যে আত্মীয়ের মতো অথবা আত্মীয়ের চেয়েও বড়ো হতে পারে, এ ধারণা উনিশ শতকের মাঝামাঝি দানা বাঁধে। বলেছিলেন, প্রেম এবং বিবাহেরও ইতিহাস আছে এবং তা নিয়ে রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সম্ভব। আর সত্যি সত্যি পরে ‘ঔপনিবেশিক পরিবেশে প্রেম, বিবাহ ও যৌনতা’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন (২০০০)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সেমিনারে তিনি এক ফরাসি ঐতিহাসিকের লেখা দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কার উদ্বেগের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এখন সেই লেখকের নাম আর মনে নেই। তখন উদ্বেগের ইতিহাস ছিলো অভিনব। কিন্তু এখন ইন্টারনেট খুঁজলে উদ্বেগের বহু ইতিহাস দেখা যাবে।

 

স্বাধীনতার ঠিক পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। স্বপ্নদ্রষ্টা এই উপাচার্য অনুভব করেছিলেন যে, বাংলাদেশের বিবিধ বিদ্যা নিয়ে পঠন-পাঠন এবং গবেষণার জন্যে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭৩ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সেই প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের নানা পাঠক্রম রচনার পরিকল্পনা এবং এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কার্যক্রম। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ আশা করেছিলেন যে, এই প্রতিষ্ঠানে কাজ হবে প্রধানত বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস নিয়ে। এই পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অধ্যাপক মুরশিদ নিমন্ত্রণ করেন কিছু বিদেশী পন্ডিতকে। এই পন্ডিতদের কেউ গবেষণা করবেন, কেউ অধ্যাপনা করবেন- এই ছিলো তাঁর প্রত্যাশা। তপন রায়চৌধুরীকেও সফরকারী অধ্যাপক হিশেবে নিমন্ত্রণ করেছিলেন অধ্যাপক সারওয়ার মুরশিদ।

 

তখন আমরা তরুণ শিক্ষক। অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী আসছেন অক্সফোর্ড থেকে- এটা আমাদের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার করেছিলো। ঈশ্বরদি বিমানবন্দর থেকে তাঁকে আনতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক আলী আনোয়ার। আন্দাজ করে কিন্তু ঠিক ঠিক তিনি তাঁকে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। অক্সফোর্ড সম্পর্কে আমাদের ধারণাটা তখন এমন আকাশ-ছোঁওয়া যে, আলী আনোয়ার তাঁকে ‘আপনি কি অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী?’ প্রশ্নটা করেছিলেন ইংরেজিতে- যদি তিনি বাংলা ভুলে গিয়ে থাকেন। হায় রে! যিনি পরে লিখবেন ‘বাঙালনামা’, তিনি ভুলে যাবেন বাংলা! তবে প্রথম দিন তপনদাও বক্তৃতা দিতে গিয়ে বাংলায় তাঁর আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে খানিকটা সংশয় দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, বাংলায় বক্তৃতা করা অথবা বাংলায় লেখা- কোনোটাই অনেকদিন করেননি। কিন্তু তিনি যখন তাঁর সেই আংশিক লিখিত বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন, তখন তা সাবলীল বাংলাতেই দিয়েছিলেন। তিনি সপ্তাহ দুয়েক ছিলেন রাজশাহীতে। তার মধ্যে ক্লাব এবং ক্লাবের বাইরে বহুবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে- প্রায় রোজই হয়েছে। আমাদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন একাধিকবার।

 

রাজশাহীর দশ বছর পরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তাঁর অক্সফোর্ডের বাড়িতে, ১৯৮৪ সালে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে কুলাঙ্গার হয়েছি। নিবাস লন্ডন। পেশা বেতার সাংবাদিকতা। ১৯৮০-এর দশকে ভারত সম্পর্কে ইংল্যান্ডে নতুন করে উৎসাহ দেখা দিয়েছিলো। যে-ভারতকে ছেড়ে এসেছিলো ১৯৪৭ সালে, সেই ভারত সম্পর্কে জানার জন্যে হঠাৎ বিপুল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিলো ব্রিটেনের  লোকেদের মনে। বৃদ্ধদের মনে জেগেছিলো নস্টালজিয়া, আর তরুণদের মনে কৌতূহল। কিন্তু কেন ? এ বিষয়ে একটা প্রোগ্রাম করতে গিয়ে তাঁকে আমি ইন্টারভিউ করতে গিয়েছিলাম অক্সফোর্ডে। তিনি কী কী বলেছিলেন, এখন মনে নেই। কিন্তু আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট পর্বে ছাত্রছাত্রীরা রীতিমতো দল বেঁধে ভারত সম্পর্কিত কোর্স নিয়েছিলো, কিন্তু পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট পর্বে খুবই কম ছাত্রছাত্রী আগ্রহী ছিলো, এ কথা তিনি বলেছিলেন। ভারত সম্পর্কে উৎসাহের এ জোয়ার শুরু হয়েছিলো ‘আ জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’ টিভি সিরিয়াল দিয়ে। ছেড়ে-আসা ভারতকে দেখে বৃদ্ধবৃদ্ধাদের মনে অতীত দিনের মায়াময় স্মৃতি জেগে উঠেছিলো। আর তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জেগে উঠেছিলো যাকে দেখিনি সে না জানি কতো মধুর- এই রোম্যান্টিক অনুভূতি। ভারতবর্ষকে নিয়ে লেখা কয়েকটি উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিলো এ সময়ে, যার মধ্যে ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ই প্রধান। রিচার্ড অ্যাটেনবরার ‘গান্ধী’ও ছিলো তখনকার অন্য একটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। মোট কথা, ব্রিটেনে ভারত সম্পর্কে দারুণ কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিলো। এবং তপনদা সেসব কথা বলেছিলেন।

 

এটা ছিলো তপনদাকে বেতারের জন্যে প্রথম ইন্টারভিউ করার ঘটনা। তারপর উনিশ বছরে অ-নে-ক-গু-লো ইন্টারভিউ করেছিলাম নানা প্রোগ্রামের জন্যে। বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের জন্যে লম্বা ইন্টারভিউ করেছিলাম। তা ছাড়া, তাঁর বাড়িতে বেড়াতে গেলে নানা গল্প প্রসঙ্গে নানা বিষয় উঠতোই। তিনি ছিলেন জমিয়ে গল্প করার মানুষ। আর এসব গল্পে যেমন কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় থাকতো, তেমনি থাকতো হাসির অফুরন্ত উপাদান। তপনদা কী রকম রসিক মানুষ ছিলেন, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তাঁর আত্মজীবনীমূরক রচনা- ‘রোমন্থন, অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা, (২০০৩) অংশত তাঁর আত্মজীবনী ‘বাঙালনামা’ (২০০৭)। তিনি যখন ‘রোমন্থন’ রচনা করেন, তখন সাফল্য সম্পর্কে তাঁর বোধহয় ষোলো আনা আত্মবিশ্বাস ছিলো না । কিন্তু বইটি যখন পাঠকরা প্রবল আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করলেন, তখন লিখতে আরম্ভ করেন ‘বাঙালনামা’। ১৮৭০-এর দশকে প্রথম বাংলা আত্মজীবনী প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সম্ভবত কয়েক শো আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ এখন কম্পিউটারের দৌলতে বই প্রকাশনা সহজ হয়ে যাওয়ার পর সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত লোকেরা অনেকেই তাঁদের জীবন, কীর্তি, দেশভ্রমণ, খানাপিনা, স্ব-আরোপিত গুরুত্ব ইত্যাদির কথা রোমন্থন করেন। এসব আত্মজীবনী অনেকগুলো থেকে ধারণা হতে পারে যে, এঁরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্তর্ভুক্ত।

 

এই আত্মজীবনীর বাঁধ-ভাঙা প্লাবনের মধ্যে কোনো কোনো পাঠযোগ্য আত্মজীবনীও খরবেগে ভেসে যাচ্ছে। ‘ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ আত্মজীবনী হলেও মূলত রঙ্গব্যঙ্গের বই। তাই তা স্বল্পায়ু হলে অবাক হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ‘বাঙালনামা’ রীতিমতো আত্মজীবনী। ‘বাঙালনামা’ হারিয়ে যাবে না। সহজে হারানোর মতো বই নয় এটি। সত্যি বলতে কী, সাফল্যের মাপে বিচার করলে গত অর্ধশতাব্দীতে যেসব আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে, ‘বাঙালনামা’ তাদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা। বিশেষ করে গল্প বলার ভঙ্গি বিবেচনা করলে এ বইয়ের প্রথম অংশ বাংলা ভাষার রচিত বিভিন্ন ধরনের আত্মজীবনীর মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আত্মজীবনী। তবে লেখক অক্সফোর্ডে গবেষণা করতে যাওয়ার কাহিনী বলতে আরম্ভ করার পর থেকে প্রথম দিকের রচনায় যে-সাবলীলতা এবং সরসতা ছিলো, তার অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। যদিও জ্ঞানপিপাসু বিশেষ শ্রেণীর পাঠক এই অংশকেও কৌতূহলের বিষয়বস্তু বলে বিবেচনা করতে পারেন।

 

আগেই বলেছি, তপনদা ইতিহাসচর্চা করেছিলেন সামাজিক ইতিহাসের পথ ধরে। তখনকার বঙ্গদেশে যদুনাথ সরকার ছাড়া অন্য কেউ এ পথে হাঁটেননি। তারপরে তপন রায়চৌধুরী এগিয়ে যান অর্থনৈতিক ইতিহাসের পথে। দুটোই কাজ । কিন্তু এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। এর পর তিনি তুলে নেন মননশীলতার ইতিহাস রচনার কাজ, যে-কাজে আরও সূক্ষ্ম, আরও জটিল, আরও বিশ্লেষণাত্মক। তাঁর এই নতুন পথের প্রথম ফসল হলো ‘ইউরোপ রিকনসিডার্ড’ (১৯৮৮)। এই গ্রন্থে তিনি উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে শিক্ষিত হিন্দু বিশিষ্টজনরা কিভাবে ইউরোপকে নতুন দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ আলোচনা করার জন্যে তিনি উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের তিনজন প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছিলেন- ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং বিবেকানন্দ। চিন্তাধারার দিক দিয়ে এই তিন বিখ্যাত ব্যক্তি একে অন্যের থেকে যথেষ্ট আলাদা । কিন্তু তিনজনই জাতীয়তাবাদী। তিনজনই তাঁদের হিন্দু পরিচয় সম্পর্কে অতিসচতেন। তাই পাশ্চাত্য ধারাণা দিয়ে তারা যতোই প্রভাবিত হোক না কেন, তিনজনই নিজেদের ভারতীয় পরিচয় অক্ষুণœ এবং জাগ্রত রাখার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। স্বভাবতই তাঁদের ইউরোপ-দর্শনে- এক ধরনের সাদৃশ্য আছে। অপর পক্ষে, সমাজের যে-অংশ পাশ্চাত্যকে বিনা দ্বিধায় অনুকরণীয় আদর্শ বলে গ্রহণ করেছিলো, সে অংশ পাশ্চাত্যকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছিলো কিনা, অথবা দেখে থাকলে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কোনো বিবর্তন হয়েছিলো কিনা, তা বোঝার উপায় থাকে না। এর দশ বছর পরে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘পার্সেপশনও, ইমোশন্স, সেন্সিবিলিটিজ : ইন্ডিয়া’স কলোনিয়াল অ্যান্ড পোস্ট-কলোনিয়াল এক্সপেরিয়েন্সেজ।’ নাম থেকেই বোঝা যায়, এ বইয়ের দৃষ্টিবিন্দুতে কোনো একটি সুর্নিদিষ্ট বিষয় নেই। আসলে তিনি বিশ শতকের শেষ দশকে যেসব প্রবন্ধ লিখেছেলেন, এ গ্রন্থ হলো তার সংকলন। তবে এই বিচিত্র বিষয়বস্তুকে তিনি ঔপনিবেশিকতা এবং উত্তর-ঔপনিবেশিকতার সূত্র দিয়ে বাঁধতে চেষ্টা করেছেন। ব্রিটেনের প্রভাব এবং ব্রিটেন সম্পর্কে বঙ্গদেশের পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গিই এ গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু। ‘ইউরোপ রিকন্সিডার্ড’ গ্রন্থে তিনি স্বামীজ বিবেকাবন্দ সম্পর্কে লেখার পর এ গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে নিজের আরও ভাবনাকে প্রকাশ করেন অনেকটা ‘পুনশ্চ’র মতো। ভারতে সাম্প্রদায়িকতা যে ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে এবং তা জাতীয় পরিচয়কে আবিল করে তুলছে, এটা তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে আহত করেছিলো। সে জন্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গ এসেছে একাধিক প্রবন্ধে। তবে বিশেষ করে ‘স্বস্তিকার ছায়া: হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত’ প্রবন্ধে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। উনিশ শতকে ধর্ম সম্পর্কে মনোভাবে যে-বিবর্তন ঘটে, সে সম্পর্কে আলাদা করে একটি প্রবন্ধ আছে। একাধিক প্রবন্ধ আছে ঔপনিবেশিক শাসন বিষয়ে। তার মধ্যে একটির নাম ‘রাজ রিকন্সিডার্ড’। পুরোনো ধারণাগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করা এবং ফিরে দেখার মনোভাব এ গ্রন্থে আগাগোড়াই জোরালো। রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধীজীকে বাদ দিয়ে ইংরেজ রাজত্বের কথা আলোচনা করা এক রকম অসম্ভব। তাই এই দুই যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বও বারবার এসেছেন এ গ্রন্থে। উনিশ শতকে যুক্তিবাদ এবং লিবারেল্ইজ্্ম্ শিক্ষিত সমাজের একাংশকে আলোকিত করেছিলো- সে নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। তাঁর চিন্তা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব এবং সেখানে থেকে সরতে তিনি রাজি নন। তাই তাঁর বিশ্লেষণ এবং বক্তব্যের সঙ্গে সর্বত্র একমত হওয়া সম্ভব নয়, স্বাভাবিকও নয়, কিন্তু তাঁর বক্তব্য পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।

 

তপনদা উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক, পন্ডিত। সে তাঁর অ্যাকাডেমিক পরিচয়। কিন্তু ব্যক্তি হিশেবেও তিনি কম উল্লেখযোগ্য নন। একজন আন্তরিকতাপূর্ণ বন্ধুবৎসল মানুষ তিনি। উনিশ শতক থেকে বাঙ্গালিদের মধ্যে যে-আড্ডার কালচার গড়ে উঠেছিলো, তিনি তার একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিত্বশীল মানুষ। তাঁর ‘পরচরিতচর্চা, নির্দোষ আনন্দ এবং উপভোগের বস্তু। বাঙালিত্বের আরও এক বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে প্রবল ছিলো- খাওয়া- দাওয়ার কালচার। তিনি পেটুক ছিলেন না মোটেই, কিন্তু দারুণ ভোজনরসিক ছিলেন। বোধ হয়, হেন জন্তু নেই, যার মাংস তিনি  চেখে দেখেননি। হেন জলজ প্রাণী নেই, যা তাঁর পাতে পড়েনি। তাঁর বাল্যবয়সে তাঁদের বাড়ির বাবুর্চি ছিলো আন্দামানে জেল-খাটা এক খুনের আসামী। গোমাংসের নানা ধরনের রান্নাসহ সে ছিলো- নানা রান্নার মাস্তান। নানা স্বাদের রান্না খাওয়ার হাতে খড়ি হয় তাঁর তখন থেকেই।

 

নতুন খাবার চেখে দেখার মতো তাঁর নতুন বিদ্যা শেখার আগ্রহ ছিলো প্রবল। ‘বাঙালনামা’ লেখার জন্যে তিনি একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার কিনতে চাইলেন। কম্পিউটার সম্পর্কে বয়স্ক লোকেদের একটা অকারণ ভীতি থাকে । কিন্তু তপনদার ছিলো না। তাঁকে কম্পিউটার কেনার ব্যাপারে আমি আমার সাধ্যমতো পরামর্শ দিয়েছিলাম। কম্পিউটার এলো। এবারে সফ্টওয়ার বসানোর  পালা। আমি প্রথমে তাঁকে অভ্র ফন্ট বসিয়ে দিয়েছিলাম- ওটা ব্যবহার করা সহজ হবে মনে করে। কিন্তু তপনদা ঠিক আয়ত্ত করতে পারলেন না । তখন বসিয়ে দিলাম বিজয় ফন্ট। আর কীবোর্ডে স্টিকি টেইপ দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলাম ছাপানো অক্ষরগুলো। তপনদা একেবারে অআকখ থেকে শুরু করেছিলেন। যখনই কোনো যুক্তাক্ষর নিয়ে অথবা ওয়ার্ড প্রোগ্যাম নিয়ে সমস্যা দেখা দিতো, তখনই আমাকে তিনি ফোন করতেন। শেষ পর্যন্ত গোটা ‘বাঙালনামা’  তিনি নিজেই টাইপ করে দিয়েছিলেন।

 

বরিশালের মাটিতে তাঁর শিকড় পোতা ছিলো। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা তিনি অনুরাগের সঙ্গেই ব্যবহার করতেন। তিনি যখন রাজশাহীতে গিয়েছিলেন তখন একদিন তাঁর সহপাঠী-বন্ধু মুখলেসুর রহমানের গাড়িতে আমাদের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। রাস্তাটা একটা জায়গায় এমন আকস্মিক বাঁক নিয়েছিলো যে, হুঁশিয়ার না-থাকলে গাড়িসহ মাঠের মধ্যে গড়িয়ে পড়া সম্ভব ছিলো। তপনদা তাই দেখে মুখলেস দাদাকে বললেন, ‘দেইক্খো, কোলায় পইড়ো না।’ ‘কোলা’ কথাটা যে কতোদিন পড়ে সেবারে  শুনেছিলাম, তার ঠিক নেই। বস্তুত, শব্দটা আমার স্মৃতি থেকেই ঝরে পড়েছিলো। তপনদার মুখে শুনে নতুন করে মনে পড়লো। বুঝতে পারলাম, বরিশালের লোক তিনি। ‘পরচরিতচর্চা’য় মজার মজার বরিশালের ভাষা ব্যবহার করেছেন। তার মধ্যে একটা তিনি বলেছেন এ কে ফজলুল হকের বরাত দিয়ে। একবার বরিশালে গেলে হক সাহেবের এক বন্ধু নাকি তাঁকে বলেন, ‘তোমার জন্যে লোকেদের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না।’ তার উত্তরে হক সাহেব নাকি তাঁকে বলেন, ‘মুখ দেখাইতে না পারলে  হোগা  দেখাইলেই পারো।’

 

মৃত্যুর এক বছর আগে- ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে- তাঁর বড়ো রকমের একটা স্ট্রোক হয়। এর ফলে তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রায় সবটাই লোপ পায়। তিনি তখন তাঁর স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তান- তাঁদের কন্যাকেও চিনতে পারতেন না। তখন আমরা বাংলাদেশে ছিলাম। প্রায় তিন মাস পরে লন্ডনে ফিরে গিয়ে অক্সফোর্ডে তপনদাদের বাড়িতে যাই। শুনলাম, তখনও তিনি হাসপাতালে এবং তাঁকে অক্সফোর্ড নয়, অক্সফোর্ড থেকে মাইল পনেরো দূরে একটা ছোটো হাসপাতালে রাখা হয়েছে। জায়গাটা আমার চেনা নয়। তাই সেখানে গিয়ে তাঁকে দেখে আসতে পারিনি। তবে হাসি বৌদির কাছে শুনেছিলাম যে, তাঁদের দেখেও চিনতে পারেন না। বৌদি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি নিয়ে যান। তাতে রবীন্দ্রনাথকে দেখে তপনদা চিনতে পেরেছিলেন। আর একটি ছবিতে গান্ধীজীকে দেখিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘খারাপ মানুষ।’ খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা জিজ্ঞেস করায় বৌদিকে তিনি নাকি বলেছিলেন যে, ‘তিনি সবার জন্যে রান্না করেন, কিন্তু তাঁকে খেতে দেওয়া হয় না।’ বলা বাহুল্য, এ উক্তির মধ্যে বিন্দুমাত্র সত্য ছিলো না। তপনদার ছিলো ছবির মতো স্মরণশক্তি। সেই তপনদার স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় সত্যি মর্মান্তিক কষ্ট পেয়েছিলাম। সবই ভাগ্য।

 

আমার আবার দেশে ফিরতে হলো। শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয় অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে। তখন প্রায় দশটা বাজে। তপনদা চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। আমরা কথা বলতে জেগে উঠলেন। মুখে কোনো ভাবলেশ নেই। মুখটা একটু ফাঁক করে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। দাঁতগুলো একেবারে কালো, সম্ভবত ওষুধের প্রতিক্রিয়ার। আমরা দুজন সামনের চেয়ারে বসে পরিচয় দিলাম। তপনদা মুখে এক ফালি হাসি ফুটিয়ে তাকিয়ে থাকলেন। বুঝতে পারলাম, চিনতে পারেননি। বৌদি থাকলে, তিনি সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু তিনি অসময়ে ঘুমুচ্ছিলেন (তাঁকে কখনো এমন সময়ে ঘুমোতে দেখিনি)। আমাদের চিনতে কিভাবে তাঁকে সাহায্য করতে পারি, তারই চেষ্টা চলতে থাকলো। এক সময়ে আমি বললাম, তপনদা, আপনি এক সময়ে আমার একটা বইয়ের রিভিউ করেছিলেন। তপনদা তিন-চারবার চেষ্টা করে ‘রিভিউ’ শব্দটা বলতে পারলেন। আমি তাঁদের জন্যে কলকাতা থেকে আনা এক প্যাকেট দার্জিলিঙের চা নিয়ে গিয়েছিলাম। সে প্যাকেটটা যতœকারিণীর হাতে দিয়ে আমরা দুজনেই তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে এক সময়ে উঠে পড়লাম।

 

তপনদা ছিলেন একজন অত্যন্ত ভালো শিক্ষক। তাঁর অগণিত ছাত্রদের মধ্যে একজন উইলিয়াম র‌্যাডিচি তপনদার তত্ত্বাবধানে উইলিয়াম মাইকেল মধুসূদনের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট করেছিলেন ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে। সেই সূত্রে উইলিয়াম তাঁর করা ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য স্লেয়িং অব মেঘনাদ’ তপনদাকে উৎসর্গ করেন। তপনদার সঙ্গে আরও দুজনকে। রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত আর আমাকে। ঐ একটা জায়গায় তপনদার সঙ্গে আমার নামটা যুক্ত থাকলো।

 

মহাভারতের চরিত্র দ্রোণাচার্যের কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখেছিলেন অর্জুন, অদ্বিতীয় ধনুর্ধর। একলব্যও তাই দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু নীচুজাত বলে দ্রোণাচার্য তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। একলব্য তখন বনের মধ্যে দ্রোণাচার্যের মূর্তি তৈরি করে তাঁকেই গুরু কল্পনা করে ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হন। তপনদার কাছে লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাইনি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে তাঁর সেমিনারে যোগ দিয়ে দূর থেকে মনে মনে তাঁকেই গুরু হিশেবে গ্রহণ করেছিলাম। তার ফলে আমি একলব্যের ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার মতো ইতিহাসবিদ্যায় পারদর্শী হতে পারিনি, কিন্তু ইতিহাসচর্চা করেছি। আমার সেই দ্রোণাচার্য, না দ্রোণাচার্যের থেকে অনেক মহৎ গুরু তপন রায়চৌধুরীকে তাঁর প্রয়াণে প্রণাম জানাই।

Facebook Twitter Email