লাশের শকট

Facebook Twitter Email

মাধনগরের হাটে গরু বেচতে আসা লোকটার মাথায় বাজ পড়ে মরার পরে অনেকক্ষণ লোকজন আহা-উহু করলেও শেষপর্যন্ত মেকু চৌকিদারের কাঁধেই দায়িত্ব বর্তায় লাশটাকে তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেবার। এই দায়িত্ব যে তার ওপরেই বর্তাবে সেটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরে মেকু চেষ্টা করছিল ভিড় ছেড়ে কেটে পড়ার। কিন্তু ততক্ষণে পরিষদের চেয়ারম্যান এসে গেছে। সে যেখানে যাবে সেখানে দায়িত্বরত কারো ঠাঁইনাড়া হবার উপায় থাকে না। কাজেই মনে মনে যতই কেটে পড়ার ইচ্ছা থাকুক, হাট ছেড়ে চলে যাওয়ার সাহস পায় নি মেকু। হাট কম্পানির লোকদের নিয়ে মসজিদের মধ্যে কিছুক্ষণ মিটিং করে চেয়ারম্যান মেকুকে ডাকতে পাঠায়। অজু ছাড়া মসজিদে ঢুকবে কি না তা নিয়ে ইতস্তত করতে করতে কিছুটা সময় চলে গেলে চেয়ারম্যানের হুঙ্কার ভেসে আসে- ওই শালা আমড়া কাঠের ঢেঁকি! তোর পায়ে কি গোঁদ হইছে? আসতে এত সময় লাগে কীজন্যে?

হাট কম্পানির একজন ধুয়া ধরে- বুড়া হাবড়া দিয়া এই যুগেত কাম চলে না চিয়ারম্যান সাব। এইসব কামে দরকার জুয়ান-তাজা ছাওয়াল। এক ডাকে ফোর্থ গিয়ারে ছুটে আসবি।

মোটরসাইকেলের যুগে তাড়াতাড়ি বোঝাতে ফোর্থ গিয়ার শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে আজকাল। যে যুগের যে বুলি। তবু উপমা শুনে একটু হাসে চেয়ারম্যান- ভালো কথা কইছেন তো! তারপর মেকুকে বলে- লাশটা বাড়িত পৌঁছান লাগবি। সক্কলেই দেখিছে বাজ পড়ে মারা গেছে মানুষটা। থানার সাথে কথা হইছে আমার। এইটারে আবার হাসপাতালে কাটা-ছিঁড়ার জন্যে পাঠানের কাম নাই। তার ঝামেলা অনেক। তুই এইডারে তার গাঁয়েত পৌঁছানোর ব্যবস্তা কর।

কুন গাঁ?

দাবড়ে ওঠে চেয়ারম্যান- সেইডাও কি আমার জানা লাগবি? তুমি শালা আছো বাল ছিঁড়তে! মানুষজনেক জিগগেস কর‌্যা যা করার কর।

হাট কম্পানির লোককে বলে- অর হাতে তিনশো টাকা দ্যান।

হাত কচলায় মেকু। বলে- তিনশো ট্যাকাত হয় না চিয়ারম্যান সাব। কুন গাঁয়েত না জানি বাড়ি! ভ্যানআলারা যে কত চায় কে জানে!

আচ্ছা যা তুই। আগে ভ্যান ঠিক র্ক। তারপরে টাকা লাগলে আরো দেওয়া যাবি।

 

ভ্যানঅলারা তো আর মেকুর মতো চাকরি করে না। হুকুমের গোলামও না। তারা কেউ যেতে চায় না। না বাবা লাশ টানবার পারব না!

কেউ রাজি হয় না। অসহায় বোধ করে মেকু। শেষে কি লাশটাকে তার নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে যেতে হবে?

অবশেষে দেলবরকে পাওয়া যায়। হাটের ভিড়ের বাইরে নিজের ভ্যানরিকশায় চিৎশোয়া অবস্থায় উদাস মনে বাতাস খাচ্ছিল। ইদানীং সে প্রায়ই উদাস থাকে। তার বউ তাকে ছেড়ে দিন পনেরো আগে চলে গেছে অন্য পুরুষের হাত ধরে। কারণ দেলবর তাকে সন্তান দিতে পারেনি। পুরুষ মানুষের বউ চলে যাওয়ার মতো লজ্জা আর কী হতে পারে! লজ্জা ধামাচাপা দেবার জন্যে দেলবর আর তার মা বলে যে বউ গেছে ঢাকায় গার্মেন্টের চাকরি করতে। ঐ জাগাত কাঁচা পয়সা। এক বছরের মধ্যে তাদের ঘরে ছনের বদলে টিনের চালা ঝকমক করবে।

তো দেলবর এককথাতেই রাজি হয়ে যায়- কুন্টি যাওয়া লাগবি?

বাজপড়ে মরা লোকটার গাঁ-গেরামের হদিস ততক্ষণে নিয়ে ফেলেছে মেকু। বলে- তেলকুপি ঘাট।

ওরে বাপরে। সে তো অনেক দূর।

চল্ বাপ। দুইজনে গপ্পো-গাছা করতে করতে যাব। তাহলে আর দূরের রাস্তা মনে হবি না।

 

২.

আগের যুগে খেজুরের পাটিতে মোড়ানো হতো লাশ। বাঁধা হতো নারকোলের দড়ি দিয়ে। এখন খেজুরের পাটিও পাওয়া যায় না, নারকোলের দড়িও না। তাই খলপা দিয়ে মুড়ে নাইলনের দড়ি পেঁচিয়ে লাশকে তোলা হয়েছে ভ্যানে। লাশ পচে গন্ধ ছড়াতে দেরি আছে। তবু পোড়া একটা চিমসে গন্ধ নাকে লাগছে। দেলবর বুদ্ধি জোগায়- চার-পাঁচটা আগরবাতি জ্বালায়া লাশের পাশে গুঁজ্যা দ্যাও।

সেটা করা হলো। তবে মেকু সঙ্গে সঙ্গে এক বোতল গোলাপজল আর এক শিশি বেলি-আতরও আদায় করে নিল। ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা মানুষ দেখেও অন্যদের তেমন মায়া হয় না, কিন্তু মরে যাওয়ার পরে যে কোনো মুর্দার ব্যাপারে লোকজন একটু উদারই হয়। এটুকু বাড়তি খরচ করতে হাট কম্পানির লোকের কোনো আপত্তি দেখা গেল না।

আগের যুগে একটা গঞ্জ বা জনপদ পাওয়া যেত অনেক দূর পর পর। তাই দূরে কোথাও যেতে হলে দরকারি জিনিসগুলো বেঁধে-ছেঁদে নিয়ে রওনা দিতে হতো মানুষকে। এখন আর সেই সমস্যা নাই। রাস্তার মোড় ফিরলেই একটা করে ছোটো বাজার। বাজার না থাকলেও তেল-নুন-বিড়ি-সিগারেটের দোকান। চায়ের দোকান তো সব পাড়া-মহল্লাতেই। কাজেই সঙ্গে তেমন বোঝা নিতে হয় না। তবু বিড়ি-সিগারেট যথেষ্ট পরিমাণে নিয়ে নেয় মেকু। নিজের জন্যে, দেলবরের জন্যেও।

ভ্যান চলতে শুরু করে আর মেকুর কথাও শুরু হয়। সে বসেছে লাশের পাশে দেলবরের ঠিক পেছনেই বামদিকে। গল্প শুনতে খারাপ লাগে না দেলবরের। সে-ও ভ্যানের প্যাডেল মারতে মারতে হুঁ-হাঁ করতে থাকে।

কিন্তু যেকথা তাদের মাথায় আসার কথা কিন্তু আসে নি, তা হচ্ছে বৃষ্টি। অকাল ঝড়-বৃষ্টি আর ঠাঠা পড়ার কারণেই যে আজকে তাদের লাশ বইতে হচ্ছে, সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল তারা হাটজুড়ে রোদ ফিরে আসতে দেখে। বনবেলঘরিয়া পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশে মেঘের ছায়া, টাউনের পশ্চিম মাথা থেকে পুবের মাথায় আসতে আসতে সেই মেঘ কালো হয়ে ওঠা বোঝা যাচ্ছিল। সন্ধ্যাও তখন বাঁক্রে গেছে। পরিস্থিতি বুঝে দেলবরকে নিয়ে চা-বিরতি করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে মেকু চৌকিদার। কিন্তু কালুর মোড় পার হতে হতেই রাত ঘন হয়ে আসা, বৃষ্টি, আর বিদ্যুতের আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়ে যাওয়া- এই তিন বিপদ একসঙ্গে ঘটে। মেকু বলেছিল বটে যে কোনো ছাউনির নীচে বৃষ্টি ধরে আসা পর্যন্ত দাঁড়ানো যেতে পারে, কিন্তু নিজেও জানত যে অপঘাতের লাশ নিয়ে যার ছাউনির নিচেই যাওয়া হোক, কেউই ভালো চোখে দেখবে না। তাই নিজেদের ভিজে যাওয়াই সই- ঠিক করে নিয়ে অবিরাম চলতে থাকা।

ঝুপঝুপ বৃষ্টির সাথে সাথেই পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং, রাস্তার পাশের বাতিগুলো নিভে যাওয়া আর লোকজনের উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো যুগপৎ ঘটতে থাকাকে মেকুর মন এক অপার্থিব ঘটনা বলে মনে করতে থাকে। আর প্রায় সাথে সাথেই মেকু চৌকিদারের মনে ব্রিটিশ আমলে ঘটা অপঘাতে মরা লাশ নিয়ে নানা ভয়ের গল্প একে একে ভেসে আসতে থাকে। বৃষ্টি আরো জোরে নামলে যে বিড়ি পর্যন্ত খাওয়া যাবে না এটা বুঝে চট করে একটা বিড়ি ধরিয়ে সে এগিয়ে দেয় দেলবরের দিকে। বিড়ি হাতে পেয়ে দেলবরকে একটু খুশি মনে হয়। একটা জোরটান দিয়ে বলে- শালার বিষ্টি আর আন্ধারে ভ্যান বওয়া কঠিন রে বাপ! মনে হয় লাশের উজন বাড়তিছে।

তাই মনে হচ্ছে? লাশের উজন বাড়তিছে দেলবর?

একটু হাসির শব্দ করে দেলবর জানায়- এমনি কলাম। তাই কী আর বাড়ে?

অপঘাতের মরা রে বাপ, কত কিছুই তো ঘটবার পারে!

সঙ্গে সঙ্গে মুখ খুলে যায় মেকু চৌকিদারের। আর কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই সেই ভয়ঙ্কর গল্পটা বলা শুরু করে তার জিভ আর মুখের মাংসপেশিগুলো। সেই সায়েবের আমলের কথা। মেকুরই এক চাচার বাপ পুলিশে চাকরি করত। সেই আমলের চাকরি বাবা! ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নাই। তো সেই চাচার বাপের ডিউটি পড়ল একরাতে একটা বেওয়ারিশ লাশ পাহারা দেওয়ার। অমাবস্যার রাত। তার উপরে তখন তো গাঁয়ে-গঞ্জে বিজলি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বিজন এক মাঠের ধারে একটা গরুর গাড়ির ওপরে লাশ নিয়ে বসে থাকা। বেলা উঠলে আলো ফুটলে তারপরে গাড়োয়ান আসবে। তারপরে না সেই লাশ নিয়ে সদরে রওনা দেওয়া। লাশের পাশে একটা কুপি বাতি জ্বালিয়ে নিয়ে বসে থাকা। হঠাৎ সেই পুলিশ-দাদা খেয়াল করে যে লাশ নড়ছে। প্রথমে ভাবল এটা বোধহয় চোখের ভুল মনের ভুল। কিন্তু একটু পরেই দেখা গেল লাশ উঠে বসছে। মেকুর দাদা পুলিশদের মধ্যেও সাহসী আর তাগড়াই বলে বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এইভাবে একটা লাশকে উঠে বসতে দেখলে চব্কা লাগারই কথা। এইরকম অবস্থায় বুদ্ধিও কাজ করে না, শরীরও কাজ করে না। কিন্তু সেই আমলের পুলিশ বলে কথা! মেকুর দাদা হুঙ্কার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল লাশের ওপর। পালোয়ানদের কুস্তি লড়ার মতো করে লাশকে আবার শুইয়ে দিল গরুগাড়ির বাতার ওপর।

উরেব্বাপরে! এত সাহস আছিল মানুষডার!

দেলবর ফোঁস নিশ্বাসের সাথে বলে।

সাহসের কথা আর কচ্ছি কী!

তারপর কী হলো?

তারপর সারারাত ধর‌্যা সেই একই ঘটনা বারবার ঘটা। লাশ বারবার উঠ্যা বসে, আর দাদা কুস্তি কর‌্যা তাক শোয়ায়া দেয়।

মরিছে রে!

এবার কথা শুনে মনে হয় দেলবর নিজেও ভয় পেয়েছে অনেকখানি।

না মরেনি আমার চাচার বাপ। জাঁহাদার মানুষ আছিল তাই। তা না হলে সেই সুমায় কয়জন বাঙালি আর পুলিশে ঢুকার সুযোগ পায়!

ঠিক।

শিখ-পাঞ্জাবি-বিহারি-গুর্খার সাথে কমপিটিশন দিয়া ঢুকা লাগে তখন পুলিশে!

তারপর কী হলো?

সারারাত এইভাবে কাটল তার। ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে লাশ আর নড়ে না। মানে রাতের আন্ধার ছাড়া লাশের ওপর বদ কোনো জিনিস আছর করতে পারে না। ভোরের আলো ফুটল আর সেই বদ জিনিস বিদায় নিল। আর আমার সেই চাচার বাপ সকাল বেলা পুলিশের চাকরি ছাড়ান দিয়া সোজা বাড়িত।

ক্যা?

আরে বাবা চোর-ডাকাতের সাথে লড়াই করার জন্যে পুলিশ। কিন্তু পুলিশের চাকরি করতে যায়া যদি লাশের সাথে কুস্তি করা লাগে, তাইলে সেই চাকরির দরকার নাই আমার দাদার।

এই কথার উত্তরে কোনো কথা আসে না দেলবরের দিক থেকে। তবে ভ্যানের প্যাডেল মারতে মারতে প্রতিবার তাকে সশব্দে টানতে শোনে মেকু। জিগগেস করে- একটু জিরায়া লিবু নাকি বাপ?

নাহ। একবারে জায়গামতো পৌঁছায়া এই কান্ধের মরা আগে নামাই।

 

কিন্তু রাস্তা যে ফুরাচ্ছেই না!

এদিকে বৃষ্টিও থামার কোনো লক্ষণ নাই। এতক্ষণ ধরে পানিতে ভিজে ভিজে সত্যি সত্যিই লাশের ওজন, ভ্যানের ওজন, মেকুর ওজন, দেলবরের নিজেরও ওজন বেড়ে গেছে। প্যাডেল মারতে মারতে কষ্টই হচ্ছে। তবু থামে না সে। নিজের মনেই বলে- এই এলাকার মানুষগুলান সব মাগিমানুষ না কি? সাঁঝ লাগতে না লাগতে ঘরে দুয়ার লাগাইছে। বাইরে একখান মানুষও নাই।

দেলবর নিজেও জানে যে কথাটা ঠিক না। গাঁয়ের মানুষও এখন এত সকাল সকাল ঘুমায় না। তারা বিদ্যুৎ থাকুক আর না থাকুক, মোড়ে মাড়ে চায়ের দোকানে বসে গুলতানি মারে অন্তত রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। আজ বৃষ্টির জন্যেই কোনো আসর নাই।

তার কথাকে সঙ্গ দেবার জন্যেই বোধহয় মেকুও কথা বলে যায়- মানুষ কী আর এখন সেই মানুষ আছে রে! এখন কি আর পাড়া-মহল্লার মানুষ একসাথে বস্যা সুখ-দুঃখের গল্প করে? করে না। এখন ঘরে ঘরে হইছে টেলিভিশন। সাঁঝের আলো নিভার সাথে সাথে সব শালা হাঁস-মুরগির লাখান ঢুকে নিজের নিজের খোঁয়াড়ে। মাঝরাত পযযন্ত পুটকি উবুত কর‌্যা দেখে সিরিয়াল না কী বাল!

এই কারণেই তো মানুষে মানুষে মোহাব্বত এখন এত কম!

মুখ দেখাদেখিই নাই, মোহাব্বত আসে কীভাবে!

কথা বলে চলেছে বটে, কিন্তু দেলবরের এখন সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছে তার ভ্যানের ওজন অনেক বেড়ে গেছে। লাশের ওজনের কারণে ভ্যানের চাকাগুলো বোধহয় মাটির নিচে সেঁধিয়ে গেছে। চাকা থাকলে তো তাকে এতটা কষ্ট করতে হয় না! মনে হচ্ছে চাকাবিহীন ভ্যানটাকে সে ছেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ভেজা মাটির ওপর দিয়ে। শেষে অবস্থা কি এমন দাঁড়াবে যে চাকাদুটোর মতো, পুরো ভ্যান, মেকু এবং সে নিজেও ডুবে যাবে নরম মাটির নিচে! ডাক পড়ে মরা লাশ মানে তো অপঘাতেরই লাশ। এই লাশের ওপরেও বদ কোনোকিছু ভর করে নি তো! একবার তার ইচ্ছা করে ভ্যান থেকে নেমে চোঁ চাঁ দৌড় দেয়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় সে। মেকু চৌকিদার অনেক পুরনো মানুষ। তেমন কিছু ঘটলে ঠিকই টের পাবে, এবং সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করবে তাকে।

যখন মনে হচ্ছে আর পারছে না সে, ঠিক তখনই দেখা যায় তেলকুপি ঘাটে এসে পৌঁছেছে ওরা। ঘাটের পারে বড় বাজার। সেখানেও এখন বিদ্যুৎ নাই। কিন্তু আলো আছে যথেষ্ট। মানুষও আছে অনেকই। বৃষ্টি এখানেই সেই একই রকম ঝিরঝিরে। তবু বৃষ্টি উপেক্ষা করে লোক চলাচলও আছে।

এতক্ষণে দেলবরের মনে হয় তারা আবার লাশের জগৎ থেকে জ্যান্ত মানুষের জ্যান্ত জগতে এসে পৌঁছেছে। নিজের ভীতি আবিষ্কার করে নিজেরই লজ্জা লাগে তার এখন।

 

মাথায় বাজপড়ে মরা হতভাগ্য মানুষটার বাড়ি পৌঁছাতে তাদের আর সমস্যা হয় না। এবং তখন বৃষ্টিও থেমে যায়।

 

৩.

নিজের বিধবা হয়ে যাওয়ার খবর যেন মহিলাকে বিন্দুমাত্রও নাড়া দিতে পারে না। সে মেকুর কাছ থেকে বৃত্তান্ত শোনার পরে প্রথম প্রশ্নটা করে- আমার গরু?

তাই তো! এই লোকটা যে গরু বিক্রি করতে হাটে গিয়েছিল সেকথা তারাও শুনেছে। কিন্তু গরুটার কী অবস্থা, সেটাও বাজ পড়ে মরেছে কি না, না মরলে কার হাওলায় আছে, এসব কোনো তথ্যই তো তারা নিয়ে আসে নি।

মেকু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দেলবর হড়বড়িয়ে বলে- ঐসব আমরা জানি না। আমরা লাশ দিবার আইছি। লাশ বুঝ্যা নিয়া আমাগের ছাড়ান দ্যান।

কিন্তু সদ্যবিধবাকে যেন স্পর্শই করে না দেলবরের কথা। সে পুনরুক্তি করে প্রশ্নের- আমাগের গরু?

নিরুপায় ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকায় মেকু। কার সাথে কথা বলবে? এই বাড়িতে থাকার মধ্যে আছে ঐ মহিলা আর তিন ছেলে-মেয়ে। পাড়ার লোক আছে সাত-আটজন। নারী-পুরুষ মিলিয়েই আছে। কিন্তু তারাও যেন লাশ বুঝে নেবার চেয়ে ঐ মহিলার প্রশ্নের উত্তরটা জানতেই বেশি আগ্রহী।

তারা দুইজন, বিশেষ করে মেকু চৌকিদার, অভিজ্ঞতা থেকে বোঝে যে, লাশ বয়ে আনা খুবই মানবিক একটা কাজ হলেও, কোনো বাড়িতে লাশ বয়ে এনে সেখানে আতিথেয়তার প্রত্যাশা করা যায় না। কারণ খবর শোনা এবং লাশ দেখার পরে প্রথমেই প্রিয়জনদের মধ্যে কান্না আর মাতম শুরু হয়। কেউ কেউ আছারি-পাছারি কাঁদে, কেউ কেউ শোকে মূর্ছা যায়, কেউ কেউ একেবারে নিশ্চল পাথর হয়ে যায়। সেখানে লাশ বয়ে আনা মানুষদের খাতিরদারি করার কথা মনে আসতে একটু দেরিই হয়। কিন্তু তারপরেও অন্তত কিছুটা পরে হলেও জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কারো না কারো চোখ পড়ে লাশবাহকদের ওপর, তারা হয়ত পাশের বাড়ির কোনো এক ঘরের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে বসানোর ব্যবস্থা করে, হাত-পা ধুয়ে একটু জিরিয়ে নেবার আয়োজন করে দেয়, ভাত-তরকারি না দিলেও মুড়ি-নাড়–-ছাতু সামনে বেড়ে দেয়।

কিন্তু এখানে, এই বাড়িতে তেমন কিছু তো দূরের কথা, লাশটার প্রতিই কারো কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সবাই ব্যগ্র গরু নিয়ে।

মেকু একটু হতাশ হলেও সেটা চেপে রেখে যথেষ্ট সহানুভূতির সাথেই বলে- গরুর কথা আমরা জানি না মা। আপনেরা লাশটা বুঝ্যা ল্যান।

মহিলার কানের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনো অদৃশ্য বাতাস যেন লুকিয়ে ফেলে মেকুর বাক্য দুটো। সে তাদের দিকে জ্বলজ্বলে চোখের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েই থাকে। আবার জিগগেস করে- আমাগের গরু?

আরে বাপু গরুর সোম্বাদ তো আমরা জানি না।

দেলবর একটু রুষ্টতার সাথেই মহিলাকে জিগগেস করে- কী গরু? পঞ্চাশিয়া না লাখিয়া?

লাখিয়া!

মহিলা উত্তর করার সাথে সাথে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ার লোকেরাও এবার সরব হয়ে ওঠে- লাখিয়া গরু  লাখিয়া। সে এক গরুর মতন গরু। দেখলে জান ভইরা যায়।

লাখ টাকা দামের গরু নিয়ে মানুষ তো উদ্বিগ্ন থাকবেই।

অনেক মানুষই এখন গরু পুষে মোটা-তাজা করে বিক্রি করার পেশা নিয়েছে। পঞ্চাশিয়া গরু তিন মাস পালন করে বিক্রি হয় পঞ্চাশ হাজারে। আর লাখিয়া গরু ছয় মাস পেলে-পুষে বিক্রি করা হয় লাখ টাকার কাছাকাছি দামে। ছয় মাস ধরে পালন করা গরু! দাম ছাড়াও মায়ার একটা ব্যাপারও তো আছে। দুঃখই লাগে পরিবারটার জন্যে। তবু মেকু বলে- আপনেরা কাল বিয়ান বেলাত হাট কম্পানির সাথে দেখা কর‌্যা গরুর খবর লিবেন। এখন লাশটা বুঝ্যা লিয়া আমাগের দুইজনাক বিদায় দ্যান।

মহিলা নড়ে না। তার ঠোঁটও বোধহয় নড়ে না। কিন্তু শব্দ ভেসে আসে- রোজ ছাওয়াল-মিয়াক না খাওয়ায় হলেও গরুর মুখে এক কেজি গুঁড়া দিছি।

ওরা নিজেরা গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসার সাথে জড়িত না থাকলেও জানে যে এইরকম গরুকে রোজ সারাদিনে অন্তত এককেজি গমের গুঁড়া, চালের গুঁড়া আর ভুট্টার গুঁড়া মিশিয়ে খাওয়াতে হয়।

কিন্তু এসব কথা এখন আসছে কেন?

মহিলা তবু বলে চলে- রোজ দুইবার কর‌্যা নাহায়া দিছি। হায়রে, দূরের টিপকল থাইকা পানি টানতে টানতে আমার ছাওয়াল-মিয়্যার হাতের রগ ফুইলা গেছে।

এবার তাদের ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকায় মেকু-দেলবর।

রোজ সারাদিনে পুনারো-ষোলো কেজি পানি খাওয়ান লাগিছে।

তো?

গরুর গায়েত একফোঁটা রোদের আঁচ লাগাবার দিইনি।

আপনের সোয়ামীর লাশটা ঝিরির পানিত ভিজতিছে মা। মুর্দার একখান বেবস্তা করেন মা।

মহিলা এবারও শুনতে পায় না দেলবরের আকুতি। সে বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বলে- মাসে মাসে পশু ডাক্তারেক টাকা দিছি। গরুর ওষুধ কিনিছি। ছাওয়াল-মিয়্যার জ্বরজারির নিদান কিনবার পারি নি।

ধূর! এবার আর ধৈর্য রাখতে পারে না দেলবর- এইসব শুনান কিসের জন্যে? আমরা লাশ লিয়্যা আসিছি, লাশ বুঝ্যা ল্যান। নাহলে এই জাগাত নামায়া দিয়া আমরা বিদায় লিব বুললাম! এই মেকু চাচা ধরো, লাশ নামাই!

মেকুও যথেষ্ট বিরক্ত। সে হাত লাগায়। অথচ পরিবারের অন্য কেউ বা পাড়া-পড়শি হাত  লাগায় না।

এমনিতেই মরার পরে শুকনো কাঠির মতো মানুষের লাশেরও ওজন অনেক বেড়ে যায়। আর এই লোকটা ছিল লম্বায় অনেক বড়ো-সড়ো। লাশের আকারও বড়। তার ওপর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে লাশ তো লাশ, লাশ-প্যাঁচানো খলপা পর্যন্ত হয়ে গেছে একমণ ভারী। দুজনের পক্ষে একটু বেশিই ভারী। কিন্তু তবু তারা হাঁচড়ে-পাঁচড়ে লাশটাকে ভ্যানের ওপর থেকে নামায়। একজন মাথার দিকে, আরেকজন পায়ের দিকে ধরে থাকে। হাঁপাতে হাঁপাতে জিগগেস করে মেকু- লাশ কোন জাগাত রাখি? উঠানে না বারান্দাত?

এবারও কোনো উত্তর আসে না। বৃষ্টির মধ্যে লাশ খোলা উঠানে নামিয়ে রাখতে তাদের বিবেকে বাধে। তাই তারা বারান্দার দিকে এগুতে চায়। বারান্দায় উঠতে হলে দাঁড়ানো লোকগুলোকে তো সরে জায়গা দিতে হবে। কিন্তু কেউ একটুও নড়ে না।

মেকু আর দেলবর লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হিমসিম খায়। কিন্তু নামানোর সুযোগ পায় না। তারা দুজন তাই লাশটাকে পাঁজাকোলা করার মতো ধরে নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে ভ্যাবলার মতো।

আর তাদের ঘিরে দাঁড়ানো লাশের পরিবার এবং প্রতিবেশীরাও দাঁড়িয়েই থাকে- গরুর শোকে এবং আরো বেশি দারিদ্র্যের ভয়ে কাঠ কাঠ হয়ে।

Facebook Twitter Email