সমবেদনা প্রকাশের অব্যবহিত পূর্বে  

Facebook Twitter Email

পরবর্তী গল্পগ্রন্থের জন্য গল্প বাছাই করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো। অর্ধেক গল্পই প্রথম পুরুষে লেখা। অর্থ হচ্ছে, এগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আত্মজৈবনিক ব্যাপার-স্যাপার ফ্যাক্ট অথবা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে যা হোক কিছু একটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে,আমি এটা থেকে বের হতে চাই। অর্থাৎ এই যে, প্রায় প্রতিটি জায়গায় অবধারিতভাবে এখানেও আমি আমার গল্প বলেই শুরু করে দিলাম মনে মনে যা বলব বলে ভেবেছিলাম। অর্থাৎ নিজের সাথে একটা জোর চুক্তি সম্পাদন করতে চাচ্ছি এই শর্তসাপেক্ষে যে, এখন থেকে কিছুদিনের জন্য তোমার এই তুমিবিষয়ক গল্প-টল্প বাদ দাও। এখন গণ-মানুষের কথা বলো,অর্থাৎ আম-জনতার যাদেরকে এই জেনারেশন ডাকে ম্যাঙ্গো-পিপল। তাদের কথা বলো। তোমার বুঝতে অসুবিধা হলে ভেঙেই বলি, তুমি তৃতীয় পক্ষের কথা বলো।

 

এভাবেই শুরু। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একটু দেরি করে বিছানা ছাড়ার অভ্যাস মুস্তাফিজের। অন্য আরো অনেকের মতো যারা আম-জনতার অংশ। বোঝা যাচ্ছে শুরুটা ভালোই হয়েছে। শর্তমোতাবেক এগুচ্ছে। দেখা যাক সামনে কী আছে অথবা এভাবে কতদূর যায়। ব্যাচেলর মানুষ মুস্তাফিজ। চল্লিশের দরজা পার হয়ে এসেছে তাও প্রায় বছর দুই-তিন হয়ে গেল। এখনও সাইলাস মারনারের মতো টাকা জমানোর অভ্যেস বলতে পারেন বদ অভ্যেস তার। অভ্যেস বা স্বভাব সে যাই হোক টাকা সে জমিয়েই যাচ্ছে। কবে কিভাবে খরচ করবে সে ব্যাপারেও তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা হওয়ামাত্র সে টাকা তুলে এনে অটবির আলমারিটার সেফ-লকে ঢুকিয়ে রাখে। তারপর সপ্তাহের ছুটির প্রথম দিন, কখনো কখনো দ্বিতীয় দিন, দেরিতে ঘুম থেকে উঠে ‘যা হোক’ নাস্তাজাতীয় কিছু একটা খেয়ে সামান্য আয়োজন সম্পন্ন করে সে টাকা গুনতে বসে যায়। রেলিজিয়াসলি…

 

আজও সেরকম ইচ্ছা ছিল তার। বলা হয় নি আগে সামান্য জটিল রকম কৃপণ টাইপের এই মুস্তাফিজ। চায়ের মতো হালকা জিনিসের পেছনেও সে পয়সা ব্যয় করতে রাজি নয়। অফিসে যদি কোনো সহকর্মী তার রুমে তাকে চা খেতে বলে তখন অবশ্য একটা বিগলিত হাসি দিতে সে মোটেও কৃপণতা করে না। তার চরিত্রে আরো অদ্ভুত কিছু রকম-সকম আছে। সে নিজে থেকে না বললে আপনার পক্ষে সম্ভব নয় সেগুলোর কুল-কিনারা করতে অথবা ধরতে পারা।

 

তো সেদিন আমাকে…, দেখা যাচ্ছে এখানেও স্ব-প্রেমে নিদারুণ প্রভাবিত আমি মুস্তাফিজের গল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছি অথবা পড়ছি শর্ত-টর্ত সব ভেঙে-চূড়ে। আপনি জেনে থাকবেন আর না জেনে থাকলে জেনে নিন, এ যুগের নিয়ম অনুসারে শর্ত দেবার অর্থই হচ্ছে শর্ত ভাঙার পূর্ব-শর্ত। আমি আর এ থেকে আলাদা হব কেমন করে। কাজে কাজেই এ থেকে আমার মুক্তি সহজে ঘটছে বলে মনে হয় না। প্রিয় পাঠক, এ আত্ম-প্রচারণা বা স্বপ্রণোদিত উপস্থাপনা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন, প্লিজ। ভীষণ রকম অসহায় হয়ে পড়েছি নিজের এই নার্সিসিস্ট বাক-প্রবণতার কাছে।

 

যা হোক, গল্পেরই প্রয়োজনে মুস্তাফিজ আর আমি একে অপরের পরিচিত। এবং কেন জানি, কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমাকে সে বিশেষরকম পছন্দও করে। ঠিক পছন্দ কিনা জানি না। তবে অফিসের অন্যান্য যে কারো তুলনায় আমার সাথে কথা বলতে , বিশেষ করে তার মনোজগতে নিত্য-নৈমিত্তিক যেসব উথাল-পাতাল ঘটনা ঘটে যায়, সেগুলোর অংশীদার হতে অনেকটা বাধ্য করে।

 

প্রথম প্রথম ভালোই লাগত। আমার দুএকটা গল্পের মাল-মশলা কোথাও কোথাও তার ওইসব অদ্ভুত চিন্তা-ভাবনা থেকেই উৎসারিত অথবা অনুপ্রাণিত। তবে সে বাচাল নয় আমার আরেক সহকর্মী মিসেস ইসলামের মতো। মা গো মা, আপনি যদি দুর্ভাগ্যক্রমে এই মহিলার কথার খপ্পড়ে পড়েন, লক্ষ্য করুন-মহিলা নয়, মহিলার কথা, আপনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকবে না।

 

আমাদের অফিসে মিসেস ইসলাম যোগ দেবার পর পর একদিন প্রিয়দর্শিনী সাগুফতার সাথে দেখা হয়ে গেলো বসুন্ধরা সিটির ফুডকোর্টে। এ কথা সে কথার পর সাগুফতার কথা থেকে বুঝতে পারলাম, সে মিসেস ইসলামকে কোন এক আত্মীয়তাসূত্রে আগে থেকেই চেনে আর কি। অ্যাট লিস্ট তার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটুকু আছে যেটুকু থাকাই আবার যথেষ্ট। তো মিসেস ইসলাম আমার নতুন সহকর্মী জানতেই সাগুফতা কেমন দারুণ এক কায়দায় যেন তার ভ্রƒদুটি নাচিয়ে ফেলল। সেটার দুয়ে দুয়ে চার করলে অর্থ হয় এরকম যে, তার ভ্রƒযুগল আর সব সুন্দরী তরুণীদের মতন, দেখুন এবং স্বীকার করুন এখানেও আম-জনতার একটা প্রতিফলন আছে, অসম্ভব কারুকাজ করে আঁকানো-সাজানো থাকে মাসের ত্রিশ দিন। তার মুখম-লের আর প্রতিটি অংশের মতো যেখানেই শিল্পীর তুলির কিছু আঁচড় ফেলার সুযোগ আছে। এবং এই ভ্রজোড়া নাচিয়েও যে বিশেষ অর্থবোধক কোন বক্তব্য প্রকাশ করা যায় সেটা সাগুফতাকে না দেখে থাকলে আমার কথা কেবল বাগাড়ম্বর বলেই মনে হবে।

 

তো ভ্র নাচিয়ে ঘাড় দুলিয়ে শিফন ওড়নাটা বুকের আরো খানিকটা ওপরে তুলে, আমি আগেই বলেছি অথবা যথেষ্ট পরিমাণে ইঙ্গিত দিয়েছি প্রিয়দর্শিনীর ব্যাপারে, সাগুফতা আমাকে যা বলল তার পূর্ণ ব্যঞ্জনা হচ্ছে-আচ্ছা, তোমার ওই কলিগ মিসেস ইসলামের সাথে কথা বলার সময় তুমি কিছু বলার চান্স পাও তো! বুঝুন!

 

বিমূঢ় হয়ে আমি সাগুফতার মতো হাল্কা ভ্র নাচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। তাতে আমার মুখের মানচিত্রে যে রূপ ফুটে উঠল তাতেই সাগুফতা তার কথার যথোপযুক্ত উত্তর পেয়ে গেল। আর সেদিন থেকে আমিও জানলাম এবং শিখলাম যে, মিসেস ইসলামের মতো মুখে খই না ফুটিয়ে কপালের নির্দিষ্ট মার্জিনমাফিক শুধু ভ্র উঠা-নামা করেই অনেক কথা বলে ফেলা যায়। শর্ত একটাই-শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। উফ, আবার শর্ত !

 

তো, মিসেস ইসলামের মতো না হলেও আমাদের ইতোমধ্যে ভুলতে বসা এই গল্পের প্রধান চরিত্র মুস্তাফিজও ভালোই কথা বলে। সুন্দর করেই বলে। যদিও কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ হঠাৎ দুএকবার ‘আই আই আই’ জাতীয় হাই তুলে একটা অহেতুক বিরক্তির কারণ ঘটায়। আর তখন আমার মনে হয়, জমানো টাকার চিন্তায় রাতে তার ভালোমত ঘুম হয় না বলেই এরকম আই-হাই অবস্থা। তারপরও অফিসের একঘেয়েমির মাঝে তার অভিনব চিন্তা-ভাবনার বয়ান শুনে আমি কখনো কখনো বলা যায় মুগ্ধ, ক্ষেত্রবিশেষে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি।

 

বলা হয় নি,মুস্তাফিজ একজন দারুণ রকম পড়–য়া মানুষ। শুনে অবাক হতে পারেন, শুধু এই বই কিনতেই সে যা কৃপণতা করে না। এটাই নাকি তার একমাত্র বিলাসিতা। তার স্বভাব-বিরুদ্ধ এই অর্থখরচজনিত বিলাসিতা তাকে আনন্দ দেয় নির্মল, তার একাকী জীবনকে রাঙিয়ে রাখে সব সময়, তার আপাত নিসঙ্গতা তাকে তেমনভাবে ছুঁয়ে যাওয়ার অবকাশ পায় না বলেই তার কাছে মনে হয়। সে এরকম ভাবনাতেই নিজেকে আচ্ছন্ন রাখতে পছন্দ করে। এসব কাব্যিক কথা-বার্তা ভাববেন না আমার, স্বয়ং মুস্তাফিজের নিজস্ব মুখ-নিসৃত অমৃত বাণীসকল।

 

এভাবেই বলতে বলতে একদিন সে মানে মুস্তাফিজ আমাকে বলে ফেলল, আচ্ছা, বলেন তো জনাবে আলা অমুক হালদার আমাদেরকে উনার রুমে এখন আর চা খেতে কেন ডাকেন না। আগে তো প্রায়ই উনার রুমে যেতাম-টেতাম চা-টা খেতে। এখন আর ডাকেন-টাকেনই না। বিষয়টা কেমন যেন রহস্যজনক !

 

রহস্য-টহস্য জানি না। আপনার যদি মনে হয় উনি আর ডাকছেন না, তো আপনি একদিন উনাকে ডেকে চা খাইয়ে আবার পুরোনো নিয়মটা চালু করে দিন। হয়ত উনি খেয়াল করেছেন, আপনি বা আমি শুধু উনার রুমে গিয়ে চা খেয়ে আসি। ফিরতি আপ্যায়নটা তো করা উচিত। সেটা আমার তরফ থেকেও শুরু হতে পারে। তবে যেহেতু উনার এই না ডাকার ব্যাপারটা আমার নজরে আসে নি, বিষয়টার দায়িত্ব আপনি নিলেই ভালো হয়।

 

হু ঠিকই বলেছেন। কিন্তু জানেন তো ব্যাচেলর মানুষ। চা-টা খাওয়ানোর আপ্যায়নিক ব্যাপার-স্যাপার আমাকে দিয়ে ওরকম খুব একটা হয় না। বলতে পারেন, আমার ধাত বা অভ্যাসেই নাই। তাই বলে আমি যে একেবারে অসামাজিক তাও কিন্তু নয়। সেটা তো আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন। আচ্ছা ভাই আপনি একদিন ডাকেন না উনাকে আপনার রুমে। আমি না হয় থাকলাম-টাকলাম আপনার সাথে ওই সময়।

 

ওকে ঠিক আছে আপনি যখন বলছেন হবে না হয় একদিন। তবে কি জানেন এসব চা-টা কে খাওয়ালো আর না খাওয়ালো-এগুলো খুবই মামুলী অর্থহীন ব্যাপার। এই চা খাওয়ানোর ওপর একে অপরের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের ওঠা-নামা নির্ভর করে না। সেটা একেবারেই অন্য ব্যাপার। আন্তরিকতার বিষয়টা চলে আসে এখানে। আচ্ছা বাদ দেন বলছেন যখন হবে একদিন। দেখা যাক এরপরে উনার রেসিপ্রকাল রেসপন্স কেমন হয়। এক নিশ্বাসে বলা আমার নিরাসক্ত জবাবের প্রেক্ষিতে মুস্তাফিজের কথা বলার মুড সেদিনের মতো অফ হয়ে যায়।

 

দুই.

 

আজ ছুটির দিন। নিয়মমাফিক দেরিতে বিছানা ছেড়ে নাস্তা সেরে মুস্তাফিজ যখন তার টাকার বাক্সগুলি নিয়ে বসতে যাবে, ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠে তার উপস্থিতি জানান দেয়। অফিস সহকারী মাইদুলের কাছ থেকে একটা দুসংবাদ এল। সহকর্মী জনাব হালদারের মাতৃবিয়োগের খবরটা মাইদুল যতটা করুণ স্বরে বলা সম্ভব বলে টেলিফোনটা ছেড়ে দিল।

 

মুস্তাফিজের টাকা গোনার সাপ্তাহিক কর্মসূচীতে সাময়িক বাধা পড়ল। সে একটা ভাবনার দ্বারা তাড়িত হলো এমন যে, এখন তার জনাব হালদারকে সমবেদনাসূচক একটা ফোন কল করা উচিত কিনা। তার সাধারণ মানবিক প্রবণতা মত দিলো, উচিত। এরকম অবস্থায় যে কোন সভ্য মানুষের সান্ত¦নামূলক কিছু বলা সঙ্গত এবং স্বাভাবিক।

 

কিন্তু ওই যে মুস্তাফিজের কিছু অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার আছে। তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনার ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল দূরে কোথাও আর তাকে এরকম ভাবতেও বাধ্য করল, জনাব হালদার অনেকদিন তার রুমে চা খেতে ডাকেন না। এমন না যে তিনি আগেও কখনো আগ বাড়িয়ে নিজের থেকে ডেকেছেন। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন জনাব হালদারকে মনে হতো একজন দিলখোলা প্রাণবন্ত মানুষ। অন্তত মুস্তাফিজ সেরকমটাই ভাবতে চাইত। চমৎকার হো হো হা হা করে হাসতে পারেন যখন উপযুক্ত পরিস্থিতি উপস্থিত হয়। একটা দারুণ সুখী পরিবারের কর্তা। আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ নেই তার কারো বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো ধরনের বিদ্বেষ পুষে রাখা বা সেরকম কোনো ম্যালিশাস প্রবণতা দ্বারা চালিত হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই  তার একাধিক অফিসিয়াল কর্মকা-ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি একটি অত্যন্ত নীচু মনের কঠিন পজেশনে আছেন যার পরিচয় মিলেছে যখন তিনি কোনো একটা স্বাভাবিক রুটিন প্রক্রিয়াকে কেবল অসৎ এবং অসুস্থ চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমন জটিল অসমাধানযোগ্য অবস্থায় নিয়ে গেছেন যেখান থেকে ওই কাজটি আর কিছুতেই উদ্ধার করা সম্ভব নয় কোনোভাবেই।

 

একটা কনক্রিট উদাহরণ দিলে বিষয়টার স্বচ্ছতা প্রমাণ করা যায় অনায়াসে। কিন্তু মুস্তাফিজ ওই বিষয়টা নিয়ে আর ভাবতে চায় না। এমন নয় যে, অলস ভাবনা-চিন্তা তার অপছন্দের কিছু। বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। যে কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে সময় কাটিয়ে দিতে পারে তার বিছানায় অথবা সোফায় আধশোয়া হয়ে। তবে জনাব হালদারের বিষয়টা এলেই সে কেমন যেন আড়ষ্ট বোধ করে। তার একেবারেই ইচ্ছা করে না ওরকম অদ্ভুত ব্যাখ্যাতীত আচরণের পেছনে জনাব হালদারের কি বিশেষ স্বার্থ লুকিয়ে ছিল সেটা নিয়ে তার স্বভাবসুলভ ভাবনার চোরাবালিতে ডুবে যেতে। বিষয়টা শুধু তাকে বিব্রত করে।

 

তবে ভাবতে না চাইলেই তো হবে না। জনাব হালদার তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেনাকাটাসংক্রান্ত ফাইলটা নিয়ে যেরকম ছেলেমানুষী এবং অপ্রয়োজনীয় টানা-ছেঁড়া করেছিলেন, অত্যন্ত সংবেদনশীল ভদ্র গোছের মুস্তাফিজ শুধু পুরুষ মানুষ বলে বহু কষ্টে চোখের পানি আটকে রেখেছিল। জনাব হালদারের সেই বিশেষ আচরণগত জটিলতার গুঢ়ার্থ আজ তক মুস্তাফিজ বা আমার  পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হয় নি। বলা প্রয়োজন এরপর বিভিন্ন সময় জনাব হালদার তার চরিত্রের বিভিন্ন নিম্ন সারির গুণ বা দোষের পরিচয় দিতে শুরু করলেন নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায়। ওই ঘটনাটা ছিল অনেকটা টার্নিং পয়েন্টের মতন তার সম্পর্কে সতর্ক হবার জন্য।

 

যা হোক আমার কথা চলেই এল যদিও ভীষণ সচেতন ছিলাম আড়ালে থাকার। তা আর হলো না। সামনে চলে এলাম এ কারণে যে মুস্তাফিজ ওই বিশেষ ঘটনা নিয়ে সবিস্তারিত আমাকে সবকিছু বলেছিল। বলতে গিয়ে বেচারা কেমন অসহায়ের মতো তার দুপায়ের জুতা একটার সাথে আরেকটা ঘষে যাচ্ছিল ক্রমাগত। তার অদ্ভুত স্বভাবের একটি। আমি তাকে সান্ত¦না দিয়ে বলেছিলাম আরে ভাই সরকারি চাকরি করতে গেলে উপরওয়ালাদের এরকম কত ধরনের আচরণ দেখতে হবে, সহ্য করতে হবে, তার ঠিক আছে? সব কিছুকেই আমলে নিলে তো চলবে না। কিছু কিছু বিষয়, জাস্ট ইগনোর-জাস্ট গিভ এ ড্যাম শিট। মুস্তাফিজ আমার দিকে একটা ভ্যাকান্ট লুক দিয়ে বলেছিল, তাই বলে আমার মতো একজন নিরামিষ মানুষের সাথে! যে আমি কারো সাতেও নেই পাচেও নেই?

তিন.

 

আজ মুস্তাফিজ আবার একসাথে অনেকগুলো চিন্তার ভীড়ে হোঁচট খেতে লাগলো। ওই ঘটনার পর থেকেই মূলত সে জনাব হালদারের রুম এড়িয়ে চলে। আরো কিছু কথা তার কানে আসে নানা উৎস থেকে। আর বিভিন্ন সময় জনাব হালদারের কিছু প্রশ্নবোধক সন্দেহজনক বডি-ল্যাঙ্গুয়েজের কথা মনে পড়ে যায় তার। মুস্তাফিজ একটা সময় বুঝতে পারে, এই লোকটা সম্পর্কে তার প্রাথমিক ধারণা একেবারেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি তার হাসির মতো সরল নন। হাসিটা তার মায়াবী একটা মুখোশমাত্র।

 

তাই যখন অফিসের জুনিয়র লেডি কলিগকে তার রুমে পাওয়া গেলো অপ্রস্তুত অবস্থায়, যেটা একটা গুঞ্জরণের ঢেউ ছড়িয়ে দিলো চারপাশে ঘটনার স্বাভাবিক নিয়মে, তখন মুস্তাফিজ বা আমি দু’জনেই,নিশ্চয় আরো অন্যান্য সবার মতো, ধাক্কা খেলাম মারাত্মক। কেউ একজন মুখ-আলগা বলেই ফেললো, ব্যাটার আলুর দোষ আছে। আমি এই আলু সংক্রান্ত বিশেষ শব্দগুচ্ছের কোন মর্মার্থ কখনই বুঝে উঠতে পারিনি। বিভিন্ন সময় একাধিক ঘটনায় এর প্রয়োগ দেখেছি,কিন্তু ওই যে বললাম, ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। অবশ্য কেউ কেউ আমাকে বোঝানোর নিষ্ফল চেষ্টা করেছে। তাতে বোঝার ক্ষেত্রে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। যদিও এটা উচ্চারণের সাথে সাথে উচ্চারণকারী এবং উপস্থিত অন্যান্যদের অবয়বে যে একটা পরিষ্কার পরিবর্তনের ছাপ পড়ে সেটা কখনোই আমার এমনকি ক্ষীণ দৃষ্টির নজর এড়ায়নি। আর এটার যে একটা অশ্লীল অথবা অগ্রহণযোগ্য কোনোটেশন আছে,সেটাও আমার অবচেতন চেতন আমাকে জানিয়ে দেয়। কাজেই আমি যে একবারে কিছুই বুঝতে পারিনি তাও বোধ করি পুরোপুরি সঠিক নয়।

 

যা হোক, মুস্তাফিজ আরো বেশি চিন্তার পাক-স্রোতে ঘুরপাক খেতে লাগলো। প্রায় সে কেমন এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় শুনতে পায়, জনাব হালদারের বাসায় আজ ডিনার পার্টি  হচ্ছে,কাল মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অফিসের কেউ কেউ নিমন্ত্রণ পেয়ে সেসব পার্টিতে যায়। মুস্তাফিজও মনে হয় কোন একবার দাওয়াত পেয়েছিল। ওই একবারই। অথচ সে ব্যাচেলর মানুষ। তাকে কি এরকম পার্টিতে জনাব হালদার মাঝে মাঝে ডাকতে পারেননা? পারেন,তবে ডাকেননা। কারণ মুস্তাফিজ তার কাছে সেরকম প্রযোজনীয় কেউ নয়। তাকে কখনো এভাবে-সেভাবে অফিসে তার দরকার পড়েনা। অর্থ দাঁড়াচ্ছে, জনাব হালদার ভীষণরকম স্বার্থ-সচেতন মানুষ। তার প্রয়োজনের নিক্তিতে কারো পাল্লা চাহিদা অনুযায়ী ভারী হলে তিনি তাকে যতটা সম্ভব তোয়াজ করে চলবেন। দেখুন,অথবা আমাদের কাছ থেকেই জানুন,তিনি কিভাবে তার উর্ধতন বসের সামনে তেল মেরে হাত কচলিয়ে কথা বলে থাকেন,যেটা আমরা অফিস-মিটিংগুলোতে খেয়াল করে থাকি। অথচ, মুস্তাফিজ অথবা আমি দু’জনেই জানি, কী বিশ্রী নামে তিনি তার বসকে পেছনে ডেকে থাকেন। আর বসের ব্যক্তিগত জীবনের রসালো গল্পগুলো কেমন ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রসঙ্গ ছাড়াই কচলাতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত তা থেকে একটা দুর্গন্ধ না ছড়ায়।

 

এ সমস্ত সপ্রতিভ-বিপরীত চিন্তার ঢেউ মুস্তাফিজের মানস-সরোবরে এসে আঘাত করতে থাকে,আছড়ে পড়তে থাকে একটার পর একটা। সে সজ্ঞানে পুরুষ মানুষ। এরকম মেয়েলি ছিঁদকাদুনে স্বভাব তাকে মানায়না একদম। বিষয়টা মুস্তাফিজ খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। জনাব হালদার কি করছেন আর কি বলছেন সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত অভিরুচি বা চরিত্রগত ব্যাপার। এটা একজন মানুষের রক্তজাত ইনহিরেন্ট ম্যাটারের মতো সিরিয়াস বিষয়। চাইলেই এর বাইরে কেউ যেতে পারেনা। কারণ এটা থেকে বের হতে চাইলেই একটা মনস্তাত্ত্বিক সংঘর্ষের আশঙ্কা থেকে যায়। এক্ষেত্রে তার কিছুই করার নেই-এটা মুস্তাফিজের মতো বুদ্ধিমান মানুষের বোঝা উচিত।

 

মুস্তাফিজ বালিশটা টেনে নিয়ে বিছানায় অর্ধেকটা হেলান দিয়ে ভ্রুদু’টি সামান্য কুঁচকে ফেললো। তার কি সত্যি সত্যি একটা ফোন করা উচিত না? স্যার, মাই কনডোলেন্সেস, বলা উচিত নয়? কিন্তু বালিশটায় হেলান দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই সে পুরোটা সটান হয়ে শুয়ে পড়লো। আর বিছানায় জমা করা টাকার বিভিন্ন সাইজের বাক্সগুলো গায়ের নকশী কাঁথাটা দিয়ে ঢেকে দিলো সে। আরেকবার তার মনে হলো,আচ্ছা,এরকম পরিস্থিতি তার ক্ষেত্রেও তো হতে পারে। ব্যাপারটার ব্যাখ্যা তখন কেমন দাঁড়াতে পারে জাতীয় ভাবনার জটাজালে আটকে গিয়ে মুস্তাফিজ আবার এক সুগভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। অথচ আজ সে বেশ দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছিল। রাত জেগে আয়েশ করে জে,কে,রোলিং-এর দ্য ক্যাজুয়াল ভ্যাকান্সি পড়তে পড়তে সে ঘড়ির কাটায় ভোর পোনে চারটার মতো বাজিয়ে দিয়েছিল।

 

চার.

 

পরদিন সকালে মুস্তাফিজ যথাসময়ে অফিসে হাজির। রুমে ঢুকেই প্রতিদিনের অভ্যাসমাফিক কম্পিউটারটা চালিয়ে দিয়ে একবার এদিক-সেদিক আরেকবার দেয়ালে ঝুলানো নিরুদ্দেশে উড়ে যাওয়া পাখির ছবি-লাগানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে নিলো। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতেই একটা মেঘাচ্ছন্ন দিনের ছবি পরিষ্কার হয়ে উঠলো। বেশ কিছু সময় নিয়ে সে তার জানালার নীচে বাগানটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলো। বাগান, তবে পুষ্প-পল্লবের কোন হদিস নেই,কিছু ঘাস-আগাছা ছাড়া…

 

তার সেই শূন্য দৃষ্টিতে একটা প্রশ্নই বারবার ঘোরা-ফেরা করছিল। যাবো কি যাবো না? যেন সে চিরকালের সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকা একজন হতভাগা হ্যামলেট-টু গো অর নোট টু গো ? টু কনভে হিজ কনডোলেন্সেস অন দ্য স্যাড পাসিং অ্যাওয়ে………

 

উহু, ব্যাপারটা ঠিক হবে না একদমই। তোমার যাওয়াই উচিত। পেছনের সব কিছু ভুলে তুমি তোমার মত করে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবো এবং সিদ্ধান্ত নাও। অন্যের অস¦াভাবিক আচরণ কেন তোমার সুস্থ চিন্তার চিরন্তন গতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করবে যে তুমি যা নও সেভাবে প্রতিভাত হবে। সুতরাং, যাও।

 

মুস্তাফিজ জানালা থেকে সরে আসে। দেয়ালে ঝোলানো আয়নাটায় নিজের ক্রমশ ক্ষয়িষু চেহারাটা একবার দেখে নেয়। এরপর রুম থেকে বের হবার আগে দু’পায়ের জুতা একটার সাথে আরেকটা একবার ঘষে নেয়। তার অদ্ভুত স¦ভাবের একটি। সিঁড়ি দিয়ে টপটপ করে উঠে যায় তিনতলায় একেবারে জনাব হালদারের রুমের সামনে।

 

দরজায় নক করার আগে ভেতর থেকে কথা ভেসে আসে। বোঝা যায়, মুস্তাফিজের আগেই অন্যান্য সমব্যথীরা চলে এসেছে জনাব হালদারের রুমে। মুস্তাফিজ একটু হাল্কা বোধ করে। হাল্কা টোকা দিয়ে দরজাটা খুলেই সে বলে ওঠে,

 

স্যার, আসবো? আদাব…….।

Facebook Twitter Email