রোমান সাম্রাজ্য

Facebook Twitter Email

মূল : আইজ্যাক আসিমভ

অনুবাদ : আফসানা বেগম

ভেস্পাসিয়ানের বংশ

ভেস্পাসিয়ান

নিরোর ক্ষমতার সমাপ্তি রোমের ইতিহাসে একটি ভয়ানক অধ্যায়। এই পতন রোমের সাধারণ মানুষের সামনে এটাই প্রমাণ করে যে রোমের শাসন একটি ‘অভিজাত পরিবারের’হাতে বন্দী নয়। এই ক্ষমতা অন্য মানুষের হাতেও চলে যেতে পরে। যে কোনো যোগ্য ব্যক্তি অথবা বিশেষ করে সেনাপ্রধানদের হাতে চলে যেতে পারে। সেনাবাহিনীরা এই শিক্ষা শিরোধার্য হিসেবে গ্রহন করল।

কিন্তু গ্যালবার বিষয়ে সমস্যা ছিল যে তিনি ছিলেন সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ। সেনাপ্রধানকে সরকার প্রধান বানানোর প্রথম পছন্দ হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই দুর্বল। বয়সের ভারে তিনি কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন আর মাঝে মধ্যে তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ধরাধরি করে উঠিয়ে নিয়ে যেতে হতো। তার ওপরে তিনি আবার কিছুটা কৃচ্ছতা সাধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হিসেবী হয়ে যাওয়া হয়তো কখনও কখনও ভালোই কিন্তু একজন নতুন অভিষিক্ত সম্রাটের কাছে সৈন্যদের কিছু আবদার থাকে। তারা আশা করেছিল যে সম্রাট হয়ে তিনি তাদের বোনাস বাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু তার আগেই এর ঠিক উল্টো সিদ্ধান্ত নেয়াটা গ্যালবার জন্য আত্মহত্যার মতোই একটি পদক্ষেপ হয়েছিল।

অন্য সেনাবহিনীরাও তাদের নিজ নিজ প্রধানকে সরকার প্রধান হিসেবে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। মার্কাস সালভিয়াস অথো ছিলেন গ্যালবার অধীনে একজন সেনা। তিনি সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে একটি বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নেন। কারণ গ্যালবা নিজের উত্তরসূরী হিসেবে তাকে ছাড়া অন্য আরেকজনের কথা ভাবছিল। প্রিতোরিয়ান গার্ডদেরও সমর্থন পান অথো। কারণ আশাপ্রদ বোনাস কেটে নেয়ার জন্য তারা এমনিতেই গ্যালবার উপরে ক্ষেপে ছিল। মাত্র সাত মাস রাজত্ব করার পরে গ্যালবা নিহত হন।

অথোকে সিনেটের সদস্যরা (যাদের অন্য কিছু করার ছিলও না) মেনে নিলো। যদিও সিনেট তাকে সমর্থন করল কিন্তু সেনাবহিনীর একটি অংশ তাকে কিছুতেই মেনে নিলো না। তাই মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো।

জার্মানির সেনাপ্রধান আউলুস ভিটেলিয়াস ছিলেন সেই মানুষ যিনি গ্যালবার জায়গায় সেনাপ্রধান হিসেবে যোগদান করেছিলেন। সেই সেনাবহিনীর কাছে যখন গ্যালবার মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছল তখন সাথে সাথে সেনারা অথোকে সম্রাট হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। তারা ভিটেলিয়াসকে সম্রাট হিসেবে দেখতে চাইল। তারা ইতালির দিকে যাত্রা শুরু করল। যুদ্ধে তারা অথোর সেনাবাহিনীকে পরাজিত করল। অথো আত্মহত্যায় বাধ্য হলে তারা ভিটেলিয়াসকে সম্রাট হিসেবে ঘোষনা করল। তখন সিনিটের মত না পাওয়ার আর কোনো কারণ ছিল না।

এরই মধ্যে ভেস্পাসিয়ান, যে সেনাপ্রধান কিনা ধীরে ধীরে ইহুদিদের বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হয়েছিলেন, নিজেও সম্রাটের আসনে বসার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি মিশর দখল করেছিলেন যেটা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের শষ্যক্ষেত্র। এই দখল তাকে রোমে খাদ্য সরবরাহের উপরে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা দিয়েছিল। তিনি ইতালিতে প্রবেশ করে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ভিটেলিয়াসের বাহিনীকে পরাজিত করেন। মাত্র আধা বছর শাসন করার পরে ভিটেলিয়াসকে হত্যা করা হয়। ৬৯ খ্রিষ্টাব্দে (রোমান ৮২২ সালে) ভেস্পাসিয়ান সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

যে বছর ভেস্পাসিয়ান সম্রাটের আসনে বসেছিলেন তখন এক বছরের সামান্য কিছু বেশি সময়ে রোম পরপর চার জন সম্রাটকে পেয়েছিল। ৬৮ থেকে ৬৯ সালের ওই সময়টিকে তাই বলা হয় ‘চার সম্রাটের বছর’। নিজস্ব জাতির মধ্যে ভেস্পাসিয়ানের নাম ছিল ফ্লেভিয়াস। তাই রোমান সম্রাটদের মধ্যে তিনি ফ্লেভিয়াস বংশের প্রবক্তা।

ভেস্পাসিয়ানও গ্যালবার মতো অনেক বেশি বয়সে সম্রাট হয়েছিলেন। ক্ষমতায় বসার সময়ে তার বয়স ছিল ৬১। কিন্তু গ্যালবার মতো অসুস্থ নয়, বরং তিনি ছিলেন মানুসিক এবং শারীরিকভাবে বেশ শক্ত সমর্থ। তিনি সেনাবাহিনীর উপরে একটি একছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলেন যেন তাদেরকে সবসময় তার সমর্থনে পাওয়া যায়। যাই হোক, তিনি নিজেকে অগাস্টাসের অনুসারী বলেই ভাবতেন। তাই রোমের সেই আগের রাষ্ট্রব্যাবস্থা, রোমে বসে দূরবর্তী রিপাবলিক দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রন করা, তিনি অব্যহত রাখলেন।

তবে তার প্রথম কাজ ছিল নতুন কিছু নিয়মের প্রবর্তন করা। নিরো আর ক্যালিগুলার মতো বিলাসী দুজন সম্রাটের হস্তক্ষেপে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন ভয়বহ হুমকির মুখে ছিল। ভেস্পাসিয়ান তাই তখন দেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছিলেন। এটা করতে গিয়ে তিনি করের ক্ষেত্রে কিছু পবিবর্তন আনলেন। দেশের অর্থনীতি কঠোর একটা অবস্থানে এলো তখন। ভেস্পাসিয়ান নিজে ছিলেন একজন সাধারণ, নিরাভরণ মানুষ। তাই রাষ্ট্রকেও সাধারণভাবে সাজাতে চাচ্ছিলেন। তিনি যে খুবই সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলেন, এ নিয়ে তার কোনো দুঃখবোধ বা লজ্জা ছিল না। (তিনিই ছিলেন রোমের প্রথম সম্রাট যিনি অভিজাত কোনো পরিবার থেকে আসেন নি।) তবে সিনেটের যেসব ঐতিহাসিকরা নিরোকে বিলাসী আখ্যা দিয়েছিলেন তারাই ভেস্পাসিয়ানকে কৃপণ বলতে ছাড়েন নি। কিন্তু ভেস্পাসিয়ানের এই হিসেবী স্বভাব রোমের জন্য সুদিন বয়ে এনেছিল। কারণ সেই সময়টা বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভেস্পাসিয়ানের তদারকিতে রোমের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন হয়েছিল।

ভেস্পাসিয়ান সেনাবাহিনীকেই একটি নতুন চেহারা দেয়ার চেষ্টা করতেন। তার সিংহাসনে বসার আগে যেসব সেনাবাহিনী কিছুটা বিশৃঙ্খল ছিল তাদের তিনি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসেন।

সেনাবাহিনীকে পূণরায় শৃঙ্খলাবদ্ধ করা সে সময়ে জরুরি প্রয়োজন ছিল। কারণ অগাস্টাসের আমলের পর থেকেই সেনাবাহিনী একটু একটু করে নিয়ম নীতি থেকে সরে যাচ্ছিল। ভেস্পাসিয়ানের সময়ের আগে আগে তাদের ইতালিয় জাতীয়তাবাদ থেকে সরে যেতে দেখা গেছে। এর কারণ অবশ্য একটু মাথা ঘামালেই বোঝা যায়। তিনি রাজ্যের দূরবর্তী প্রদেশগুলোর সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে চাচ্ছিলেন। তারা যেসব অংশে কার্যকলাপ চালাচ্ছিলেন সেখানে তাদের কী করে আরও বেশি সংগঠিত হতে হবে, এ বিষয়ে ভেস্পাসিয়ান নতুন নীতিমালা তৈরি করলেন। গাউলস, প্যানোনিয়াস আর থ্রেসিয়ানস সৈন্যদের মধ্যে পালাক্রমে কাজ করার নিয়ম তৈরি করাতে তারা স্বস্তি পেয়েছিল। সুনাগরিক হিসেবে তাদের মাঝে মধ্যে তাদের পুরস্কৃতও করা হতো।

সুতরাং এইসব নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের অনেক সুফল পাওয়া গিয়েছিল। রাজ্যের দূরবর্তী অংশগুলোর সাথে কেন্দ্রের সংযোগটি দৃঢ় হলো। এর ফলে রোমান সংস্কৃতি আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করল। ল্যাটিন ভাষা আর গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির মিশ্রণ ইউরোপের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

কিন্তু এভাবে প্রতিটি অঞ্চলের সেনাবাহিনীকে সেই অঞ্চলের উপযুক্ত করে তোলায় কিছু বিপত্তিও দেখা দিলো। গাউলের একজন মানুষ হয়তো ল্যাটিন বলতে শিখতে পারে, রোমান দেশি কাপড়, তোগা পরতে পারে, আবার গ্রিক বা ল্যাটিন সভ্যতার সাহিত্যও পড়তে পারে কিন্তু কিছুতেই রোমের ইতিহাস বা ঐতিহ্যের সাথে একাত্ম হয়ে যেতে পারে না। যার নিজের পূর্বপুরুষ বলতে রোমে কেউ নেই কিংবা প্রকৃতপক্ষে নিজের পূর্বপুরুষকে সে নিজেই হত্যা করে তাদের জায়গা জমি সব খুইয়েছে, এরকম একজনের পক্ষে রোমের আদি বাসিন্দাদের সাথে একাত্ম হওয়া সম্ভব নয়। সে যদি কেবল একজন সৈন্য হয় তবে সে বড়জোর তার সেনাপ্রধানের কাছে বিশ্বাসী হওয়ার চেষ্টা করে। নিজের জায়গা থেকে একটা দূরবর্তী শহরে থেকে তার আর কী করার আছে! সে সিনেটের লোকজনকেও ঠিকমতো চেনে না। তার কমান্ডার যদি তাকে নিজের শহরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আদেশ দেন তবে সে তা-ই করতে বাধ্য থাকে।

এরকম অদ্ভুত ব্যাপার একবার প্রমাণিত হলো। ৬৯ সালে যখন স্পেন, গাউল আর সিরিয়া থেকে সেনাবাহিনী রোমের দিকে একযোগে আসতে লাগল , সবাই তাদের নিজ নিজ সেনাপ্রধানের জন্য লড়তে আসছিল। এছাড়া তাদের অন্য কোনো জাতীয়তাবোধ ছিল না।

ভেস্পাসিয়ানও এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন করতে পারেন নি। সেনাবাহিনীগুলো ইতালির লোকদের দিয়ে ভরে দেবার ক্ষমতা তার ছিল না। আর তাছাড়া হাজার হাজার সৈন্যের বাহিনীতে কেবল ইতালিয়দের নিয়ে গঠন করার মতো কোনো ঘটনা ঘটতই না। কারণ তত বেশি ইতালিয় যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি ছিল না। তাই বিভাগিয় পর্যায়ে আঞ্চলিক লোকজনকে দিয়ে যুদ্ধ চালানোই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। প্রিতোরিয়ান গার্ডেরা ছিল কেবল ইতালিকেন্দ্রিক। তারা ছিল কেবল রোমের স্থানীয় গুরুতর সমস্যা সামলানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। এই দলটির প্রতিটি সদস্য ইতালিয় হতে বাধ্য ছিল। ভেস্পাসিয়ান তার নিজের ছেলে টাইটাসকে এই দলের প্রধান করে দিয়েছিলেন। তাদের নিজেদের দায়িত্বের প্রতি আরও সচেতন করতেই ভেস্পাসিয়ান এটা করেছিলেন।

ভেস্পাসিয়ান সিনেটেও কিছু রদবদল করেছিলেন। অপ্রয়োজনীয় কিছু সদস্যকে ছেঁটে ফেলে নতুন দক্ষ মানুষকে যোগ দিতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তারপর তাদেরকে সতর্কতার সাথে সরকারি সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন। খরচের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া সত্ত্বেও তিনি শহরের সৌন্দর্য বর্ধনে যথেষ্ট কাজ করেছিলেন। শহরের উন্নতি সাধনে জায়গায় জায়গায় তিনি স্থানীয় রোমানদের কাজ দিয়েছিলেন। এতে তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান হয়েছিল আর পুরো শহরটির চেহারা গিয়েছিল বদলে।

তার সুযোগ্য নেতৃত্বে সম্রাটের প্রতি রোমের মানুষের আস্থা ফিরে এলো। নিরোর হঠকারিতা আর আত্মমগ্নতার কারণে তারা এই পদটির উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। গাউলে কিছু ছোটখাট বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল সে সময়ে। আর টাইটাস জুডিয়ায় ঝটিকা হামলা চালিয়ে জেরুজালেম দখল করে ফেলেছিলেন। ভেস্পাসিয়ান পূর্বদিকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব দখল করেছিলেন। সেদিকের এশিয়া মাইনরের স্বাধীন অঞ্চলগুলো দখল করে রোমের বিভাগ হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। সিরিয়ার বিভাগ পূর্বদিকে বাড়তে বাড়তে ব্যাবসা বনিজ্যের কেন্দ্র পালমিরাকে পর্যন্ত দখল করে নিয়েছিল। সেদিকে রোমের জন্য ছিল ব্যাপক সম্ভাবনা। আর তাই পার্থিয়ানরা তাদের শক্তিকে খাটো করে দেখার সাহস পায়নি। এ কারণেই তাদের আর কখনই জুডিয়া দখল করার জন্য বিদ্রোহ করতে দেখা যায় নি। ৬৮ সালে যে অরাজকতা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে একটা যুদ্ধ লেগে যেতে পারত। কিন্তু পার্থিয়া তখন রোমের ভয়ঙ্কর শক্তির আন্দাজ পেয়েছিল বলে একেবারে চুপ মেরে গিয়েছিল।

টাইটাস রোমে ফেরত এসেছিলেন ৭১ সালে। টাইটান জুডিয়ার বিদ্রোহ দমন করে সেখানকার দখল নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। এই বিজয় ছিল রোমান সাম্রাজ্যের জন্য বিশাল ঘটনা। এই বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল তাদের পিতা-পুত্রের। তখন থেকেই এই নতুন বংশের শাসন কাজের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।

নিরোর আমলে বৃটেনে হামলার সময়ে রোমে যে আগুন লেগেছিল সে ক্ষয়ক্ষতি ৭৭ খ্রিষ্টাব্দে পুরোপুরি পুষিয়ে নতুন করে গড়ার কাজ শেষ হয়। নেইয়াস জুরিয়াস অ্যাগ্রিকোলা নামে একজন কাজপাগল জেনারেলের তত্ত্বাবধানে ওয়েলসে হামলা চালিয়ে দখল করে নেয়া হয়। তারপর ৮৩ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর দিকে আরও অগ্রসর হয়ে আধুনিক অ্যাবার্ডিন পর্যন্ত তারা দখল করে নেয়। রোমের একটি যুদ্ধজাহাজের বহর স্কটল্যান্ডের উত্তর তীর ঘেঁষে মহড়া দিতে থাকে আর আয়ারল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা করে। অ্যাগ্রিকোলার বিশেষ চেষ্টায় বৃটেনের দখলকৃত অংশে দ্রুত রোমান সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু বৃটেনের পুরোটা রোম সাম্রাজ্যের দখলে আসতে না আসতেই ভেস্পাসিয়ানের সময় ফুরিয়ে আসে। তিনি জানতেন যে তিনি মারা যাচ্ছেন। মৃত সম্রাটের প্রতি দেবতার সম্মান প্রদর্শনের রোমান আইনের দিকে কটাক্ষ করে তিনি হতাশ হয়ে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি যে আমি একজন দেবতায় পরিণত হতে যাচ্ছি।’জীবনের শেষ মুহূর্তটিতে তিনি আশেপাশের লোকজনকে ডেকে বলেছিলেন তাকে ধরে ধরে দাঁড় করিয়ে দিতে। বলেছিলেন, ‘দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই একজন সম্রাটের মৃত্যু হওয়া উচিৎ।’

৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (রোমান ৮৩২ সালে) যখন তিনি মারা যান, তখন তিনি সত্যি সত্যিই রোমের শাসন ব্যবস্থা আর সাম্রাজ্যের অবস্থা তুঙ্গে তুলে ধরে তারপর মৃত্যুবরণ করেন। নিরোর সময়ে রোমের যে ভয়ানক ক্ষতি হয়েছিল, ভেস্পাসিয়ান তার দশ বছরের শাসনামলে তা পুষিয়ে এনেছিলেন।

টাইটাস

কোনোরকম বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই টাইটাস তার বাবার আসনে অধিষ্ঠিত হন। ভেস্পাসিয়ান প্রথম থেকেই উত্তরাধিকারের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তাই নিজের ছেলেকে নিয়ে সরকার পরিচালনার কাজ করতেন। সম্রাটের আপন ছেলে উত্তরাধিকারী হওয়ার ব্যাপারে এটাই ছিল রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম উদাহরণ।

টাইটাস এমনিতেই চমৎকার জীবন যাপন করতেন। আর সিংহাসনে আসীন হবার পরে তিনি আরও বেশি অমায়িক আর প্রজাকাতরতা দেখিয়ে মানুষের মন জয় করে নিলেন। সিংহাসনে বসে তিনি আরও কঠোর পরিশ্রমী হয়ে গেলেন। রোমের অধিবাসীরা সম্রাট হিসেবে তার একটিমাত্র দোষের কথা উল্লেখ করতে পারে। তা হলো তিনি ইহুদি একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছেন। জুডিয়ায় যুদ্ধ চলাকালিন টাইটাস হেরোড অ্যাগ্রিপা-২-এর বোন বেরেনিসের সংস্পর্শে আসেন। তারা দুজন দুজনের প্রতি আসক্ত হন। যুদ্ধ জয়ের পরে টাইটাস যখন রোমে ফিরে আসছিলেন তখন সিদ্ধান্ত নেন যে বেরেনিসকে সাথে নিয়ে যাবেন আর তাকে বিয়ে করবেন। রোমের অধিবাসীরা এই অসম বিবাহ কিছুতেই মেনে নিতে রাজি হয়নি। তাদের অবিবেচকের মতো মতের কারণে টাইটাস তাকে সাথে নিয়ে এলেও আবার জুডিয়ায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন।

টাইটাসের শাসনামল বৃটেনে রোমের প্রচারণা চালানো ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তার বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না এনে বলা যায় যে তিনি ছিলেন একবারে আদর্শ একজন সম্রাট। কিন্তু দুভার্গজনকভাবে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র দুই বছর। ৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ৪০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার ক্ষণস্থায়ী রাজত্ব রোমের ইতিহাসে একটি আকস্মিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নেপলিসের কাছাকাছি একটি পর্বত আছে যার নাম ভিসুভিয়াস। জ্ঞানী ব্যাক্তিরা একে আগ্নেয়গিরি বলে মনে করতেন। কিন্তু তখন বিদ্যমান মানুষের স্মৃতিতে কেউ কখনও এক লাভা উদগীরণ করতে দেখেনি। এর কোল ঘেঁষে দুটো ছিমছাম শহর পম্পেই আর হারকিউলেনিয়াম। এই শহর দুটোর ঢালে ছিল ছোট ছোট খামার। পম্পেই ছিল অভিজাত রোমানদের ছুটি কাটানোর জায়গা। রোমান সুবক্তা সিসেরো ছিলেন সেই অভিজাতদের মধ্যে একজন যিনি সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে একটি বিশাল বাড়ির মালিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

৬৩ খ্রিষ্টাব্দে, নিরোর শাসনামলে, সেই পুরো অঞ্চলটাতে একটি ভূমিকম্প হয়ে যায়। ভূমিকম্পে পম্পেই আর নিয়াপোলিসের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর সেখানে ক্ষতিপূরণের কাজও হয়ে যায়। যাই হোক ৭৯ সালের নভেম্বর মাসে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি ভয়ানকভাবে লাভা উদগীরণ শুরু করে। কয়েক ঘন্টার ভেতরেই পম্পেই আর হারকিউলেনিয়াম শহর লাভার নিচে তলিয়ে যায়।

এই দুঃখজনক বিপর্যয় আধুনিক ইতিহাসবিদদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আঠারশ’শতকের শুরুর দিকে পম্পেই শহরে ধীরে ধীরে খনন কাজ শুরু হলো। পাওয়া গেল একটি সম্পূর্ণ শহর যা কিনা ফসিল হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে সেই রোমান সময় থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত। মন্দির, থিয়েটার, ব্যায়ামাগার, বাসাবাড়ি, দোকানপাট, সবকিছু পাওয়া গেল। সে শহরের চিত্রকলা, সাহিত্য এমনকী সামান্য টানা হেচড়ার দাগ পর্যন্ত পাওয়া গেল। মানুষের জীবন ধ্বংস না হতে হলে ইতিহাসবিদেরা এরকম দুর্ঘটনা বারবার ঘটুক, এমনটাই চান।

যেখানে লাভা উদগীরণ হচ্ছিল, টাইটাস দ্রুত সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন উদ্ধার অভিযান জোরদার করে বেঁচে যাওয়া মানুষদের দ্রুত সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে। তিনি যখন সেখানে গিয়েছিলেন তখন রোমে তিন দিনের জন্য আগুন লেগে যায়। তিনি আবার সেখানেও ছুটে এসেছিলেন।

সবচেয়ে সুখের কথা হলো টাইটাস রোমে বিশাল এবং নতুন হাম্মামখানা স্থাপন করেছিলেন যেই কাজ শুরু করেছিলেন তার বাবা ভেস্পাসিয়ান। তার সময়ে রোমে প্রথম এবং বিরাট অ্যাম্ফিথিয়েটার তৈরি হয়।  ভেস্পাসিয়ান এই থিয়েটারের কাজ শুরু করেছিলেন নিরোর প্রাসাদে। তিনি প্রাসাদের তোরণ খুলে দেন যেন জনগণ ভেতরে গিয়ে দেখতে পারে। অ্যাম্ফিথিয়েটারটি ছিল পাঁচ হাজার মানুষ একসাথে বসে দেখার মতো বড়ো। পাথরের তৈরি থিয়েটারটি সে যুগে এবং এই আধুনিক যুগেও একটি বিশাল স্থাপনা। এটা ছিল রোমানদের জন্য রথের প্রতিযোগিতা, গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই আর পশুর লড়াই দেখার যথার্থ জায়গা।

ওই অ্যাম্ফিথিয়েটারকে ফ্লেভিয়ান অ্যাম্ফিথিয়েটার নামকরণ করলেই ভালো হতো। কিন্তু সেটির অবস্থান ছিল নিরোর একটি বিশাল মূর্তির পাশে। সাধারণ আকৃতির চেয়ে বড়ো সেই মূর্তিকে রোমের লোকেরা বলত ‘কলোসি’ (এখান থেকেই কলোসাল শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিল)। আর এভাবেই সেই অ্যাম্ফিথিয়েটারের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কলোসিয়াম’। এখন পর্যন্ত এটি কলোসিয়াম নামেই পরিচিত। যদিও অনেকটা ধ্বংসপ্রাপ্ত কিন্তু এখনও রোমের আদি ঐতিহ্য বলতে এই অ্যাম্ফিথিয়েটারের কথাই প্রথমে মনে আসে।

ডমিশিয়ান

টাইটাসের মৃত্যুর পরে তার তার ছোটো ভাই ডমিশিয়ান (টাইটাস ফ্লেভিয়াস ডমিশিয়ানাস) সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হলেন। এটা ছিল এমন যে ইতিহাস যেন আবার ফিরে ফিরে আসছে। ভেস্পাসিয়ানের পরে টাইটাস আর তারপরে আবার ডমিশিয়ান, দেখে মনে হচ্ছিল অগাস্টাসের সময় যেন আবার ফিরে এসেছে। এই বংশের সকলে ছিলেন ভালো ভালো আইনের প্রবক্তা সুতরাং তারা সিনেটের পক্ষ থেকে সম্মানও পেয়েছিলেন প্রচুর। সিনেটের সদস্যরা সবসময় তাদের সুনাম করত আর পরবর্তী কালে সিনেটের ঐতিহাসিকেরা তাদের সম্পর্কে অনেক ভালো কথা লিখে গেছেন। ডমিশিয়ান ক্ষমতায় আসার পরে মনে হয়েছিল যেন অগাস্টাসের পরে টিবারিয়াস ক্ষমতায় আসার সেই ঘটনারই পূনরাবৃত্তি হলো।

কারণ টিবারিয়াসের মতো ডমিশিয়ানও ছিলেন খুব চুপচাপ, শান্ত আর জনপ্রিয়তার জন্য মোটেও কাঙাল নয়। তিনি খামাখা সিনেটের সদস্যদের অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের রীতি বন্ধ করেন। এসব নিয়ে বেশি মাতামাতি তার পছন্দ ছিল না। তিনি সিনেটের সদস্য এবং অন্য সবার কাছেও কঠিন নিয়মনীতি অনুসারী একজন সম্রাট ছিলেন। তিনি রোমের প্রাচীন সংস্কৃতি ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতেন। পারিবারিক জীবনে শান্তির প্রয়োজনীয়তা মানুষকে বোঝাতেন। ৮০ খ্রিষ্টাব্দে আগুনে ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির তিনি আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন। বড়ো ভাই সম্রাট টাইটাসের স্মরণে তিনি তোরণ নির্মান করেন। তিনি জনগণের ব্যবহারের জন্য লাইব্রেরি স্থাপন করেন আর তাদের বিনোদনের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন করতে থাকেন। দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে আইনকানুনে কড়াকড়ি আনেন তিনি। আবার রোমের ভেতরেও রাজকীয় সেনাদের সংগঠিত করেন।

রাইন আর দনিয়ুবের তীর ধরে সাম্রাজ্যের উত্তর সীমানায় দুই নদীর উৎসের মুখে নিরাপত্তা বেশ শিথিল ছিল। যে জায়গাটির কথা বলছি সেটি বর্তমানে জার্মানির দক্ষিণপশ্চিমে ব্যাডেন আর উরটেমবার্গ শহর। নদীদুটির উৎসের কাছে তারা আরও বেশি দক্ষিণপশ্চিমে সরে গিয়েছিল। জার্মানির উপজাতি মানুষেরা সেখানে চেষ্টা করলেই ইতালি আর গাউলের মাঝখানের জায়গাটা বিচ্ছিন্ন করে রোমানদের জন্য ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারত।

ডমিশিয়ানের সময়ে এই দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে খুব গুরুত্বের সাথে নেয়া হয়েছিল। সেই উপকূলের জার্মান চাট্টি উপজাতি সেই অগাস্টাসের সময় থেকেই রোমানদের সাথে থেমে থেমে যুদ্ধ করেই আসছিল। তাই ডমিশিয়ান চিন্তা করলেন যে এই সমস্যার একটা সমাপ্তি প্রয়োজন। ৮৩ সালে একটি সেনাবহিনী প্রধান হয়ে তিনি রাইন পেরিয়ে গেলেন। তিনি বাহিনীর সহায়তায় চাট্টিদের পরাজিত করলেন আর সে জায়গা রোম সাম্রাজ্যের দখলে চলে এলো।

টিবারিয়াসের মতো তিনিও খরচ বাঁচানোর জন্য রোম থেকে অনেক দূরের কোনো স্থান দখলের পরিকল্পনা হাতে নেননি। চাট্টিদের তাড়িয়ে জার্মানির জায়গাটা দখলের পরে তিনি অবশ্য প্রশান্তি পেয়েছিলেন। তবে আর বেশিদূর আগাবেন না বলে সীমানা হিসেবে জার্মানির দক্ষিণপশ্চিম দিক ঘেঁষে দূর্গের একটি সারি তৈরি করেছিলেন। সেদিকের সীমানায় পুরোটা ঘেরা দেয়া হয়ে গেলে আর কোনো আক্রমনের সম্ভাবনা ছিল না।

এছাড়া তিনি বৃটেন থেকে অ্যাগ্রিকোলাকে ডেকে আনিয়েছিলেন। সিনেটে ডমিশিয়ানের শত্রুরা বলেছিল যে তিনি একাজ করেছেন কেবল হিংসার বশে। কিন্তু এটা ছিল কেবলই অ্যাগ্রিকোলার প্রতি তার স্বাভাবিক ব্যবহার। কারণ দীর্গদিন ধরে রোমের বাইরে অবস্থানরত অ্যাগ্রিকোলাকে তিনি মুক্তি দিতে চাচ্ছিলেন। স্কটল্যান্ডের উত্তর দিকের পাহাড়ী অঞ্চল আর আয়ারল্যান্ডের অসভ্য আইরিশ মুর জাতিকে দখল করতে তখন অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করতে হয়েছিল। বহু রক্ত আর গচ্ছিত সোনার অপচয়ের দিকেও ডমিশিয়ান ফিরে তাকাননি। কারণ রোমের এত কাছের অঞ্চলে যে করেই হোক, ক্ষমতার বিস্তৃতি তার মতে খুব জরুরি ছিল।

ডমিশিয়ানের অন্তর্মুখী স্বভাব তাকে বারবার একাকিত্বে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। একই ঘটনা অর্ধশতাব্দী আগে টিবারিয়াসের সাথেও ঘটেছিল। যেহেতু তিনি কাউকে বিশ্বাস করতেন না তাই কারও সাথে সহজ, স্বাভাবিক হতে পারতেন না। আর তাই তিনি যতই নিজের ভেতরে নিজেকে আবদ্ধ রাখতেন, কোর্টের সদস্যরা, সেনাবাহিনীর প্রধানেরা তার প্রতি ততই সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠত। তারা সবসময়ই ডমিশিয়ান কী ভাবছেন, এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে ভুগত। প্রায়ই তারা একে-ওকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে, এ ধরণের গুজবে কান দিয়ে আশঙ্কায় ভুগতেন।

ডমিশিয়ানের এ ধরনের ব্যক্তিগত সমস্যা তাকে জেনারেলদের কাছে জনপ্রিয় হতে বাধা দিয়েছিল। তাই জেনারেলরা একসাথে হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সিদ্ধান্ত নিলো। জার্মান সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান অ্যান্টোনিয়াস স্যাটার্নিয়াস তার বাহিনীসহ ৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ করে নিজেকে সম্রাট ঘোষনা করল। স্যাটার্নিয়াস জার্মানির কিছু অসভ্য উপজাতির কাছে সাহায্য চাইলেন। সেই অসভ্য জাতিগুলোর উপর নির্ভর করলে তাকে রোমান সেনাদের হাতে মৃত্যুবরণ করতে হতো। সুসংগঠিত রোমান বাহিনীর হাতে মারা পড়ে সাম্রাজ্যের আনাচেকানাচে তাদের মৃত শরীরগুলো পড়ে থাকতে দেখা যেত।

অসভ্য জাতিরা সামনে এগিয়ে আসতে সাহস পেল না। ডমিশিয়ান প্রাথমিক অবস্থায়ই বিদ্রোহ দমন করে ফেললেন। ডমিশিয়ানের সন্দেহপ্রবণ মন এই ঘটনার পর থেকে আরও বেশি সতর্ক হয়ে গেল। তিনি এই বিদ্রোহে কলকাঠি নাড়ার ক্ষেত্রে যাদের হাত আছে বলে মনে করলেন সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার শান্ত স্বভাব এই ঘটনার পরে একেবারে বদলে গেল। তিনি হয়ে উঠলেন প্রতিশোধপরায়ণ।

তিনি রোমের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিককে ফাঁসিতে ঝোলালেন। তিনি মনে করেছিলেন, যেহেতু তারা একটি আদর্শ মুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্তার কথা বলেন, সুতরাং তারা সব সম্রাটের বিপক্ষের শক্তি। তিনি সাা¤্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বসবাসরত ইহুদিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিলেন কারণ তার মনে হয়েছিল তারা ইহুদি হওয়াতে কখনই কোনো ফ্লেভিয়ানের পক্ষের হতে পারেন না। খ্রিষ্টানদের উপরেও নানান অত্যাচারের কথা শোনা গেছে কারণ রোমানরা তখনও তাদেরকে ইহুদিদেরই একটি অংশ বলে মনে করত।

এর পরে আর কখনও যেন কোনো সেনাবিদ্রোহ না ঘটে সেজন্য ডমিশিয়ানস বড়ো বড়ো সেনাবাহিনীকে চারটি অংশে বিভক্ত করে চার স্থানে রাখার হুকুম দিলেন। পৃথকভাবে থাকলে তারা আর এক হয়ে বিদ্রোহ সংঘটন করতে পারবে না বলেই তিনি মনে করতেন। এভাবে বড়ো বাহিনী কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছিল। এভাবে রোমের বিশাল সেনা শক্তি টুকরো টুকরো হয়ে গিয়ে তাদের মিলিত ক্ষমতা হারিয়েছিল। সে অবস্থায় যুদ্ধে অন্য কাউকে পরাজিত করা অথবা কেবল সামান্য কোনো অসভ্য জাতিকে পরাজিত করাও তাদের জন্য বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো।

যেমন ধরা যাক, ডমিশিয়ানের সময়ে ডেশিয়ানদের সাথে বেশ যুদ্ধ বেধে গেল। ডেশিয়ান উপজাতিরা থাকত দানিয়ুবের নিচে, উত্তর দিকে। ওই জাতিই পরবর্তী কালে স্বাধীন রাষ্ট্র রোমানিয়া তৈরি করেছিল। ৮০ খ্রিষ্টাব্দে ডেশিয়ান জাতি, তাদের নেতা ডেসিবালাসের নেতৃত্বে যুদ্ধংদেহী হয়ে শীতকালের বরফ জমা দানিয়ুব পাড়ি দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের দক্ষিণে মোয়েশিয়ার দখল নেয়ার জন্য আক্রমন করল।

ডমিশিয়ান বাধ্য হয়ে তাদের তাড়া করেন। তিনি বাহিনীসহ তাদের মোয়েশিয়া থেকে তাড়িয়ে দেন আর ডেশিয়ার দখলও নিয়ে নেন। তার পরের কয়েক বছর রোমানরা সেখানে বেশ গর্বের সাথে রাজত্ব করেছে। যাই হোক, স্যাটার্নিনাসের বিদ্রোহ ডমিশিয়ানকে কিছুটা মনোবলহীন করে দেয়। রোমান সেনাবাহিনী ডেশিয়ায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। জার্মানির উপজাতিরা তাদের এমনভাবে হারিয়ে দেয় যে ডমিশিয়ান বুঝতে পারেন, এরপরে আরও হামলা চালানোর শক্তি তাদের নেই।

যদিও এটা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য কিন্তু তবু ডমিশিয়ান ডেসিবালুর ইচ্ছা মেনে নেন। ডেসিবালু স্বাধীন দেশের নেতা ছিলেন অথচ ডমিশিয়ানের হাতে মুকুট পরতে চাচ্ছিলেন। ৯০ খ্রিষ্টাব্দে ডমিশিয়ান ডেসিবালুর দাবির মুখে তাকে ডেশিয়ায় শান্তি বজায় রাখার পরিবর্তে বাৎসরিক হারে টাকা দিতেও রাজি হন। এটা করা ডমিশিয়ানের জন্য যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করার চেয়ে সহজ ছিল। কিন্তু সিনেটের সদস্যরা একে রোমান ইতিহাসে প্রথম অসম্মানজনক আঁতাত হিসেবে চিহ্নিত করে।

শেষ পর্যন্ত ৯৬ খ্রিষ্টাব্দে (৮৪৯ রোমান সালে) ডমিশিয়ানের শেষ বছরগুলো, যেগুলোকে ঐতিহাসিকেরা সন্ত্রাসের রাজত্ব বলে বর্ণনা করেছেন, তার সমাপ্তির দিকে এগিয়ে গেল। প্রাসাদে ষড়যন্ত্র শুরু হলো। আশেপাশের কিছু মানুষ আর স¤্রাজ্ঞী নিজেও এই ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহন করলেন। ডমিনিয়াসকে বন্দী করে হত্যা করা হলো।

এভাবেই ভেস্পাসিয়ানের বংশের শাসন শেষ হলো। তারা রোমের বুকে সাতাশ বছর ব্যাপি শাসন চালিয়েছিল। এই বংশের কাছে রোম পরপর তিনজন শাসক পেয়েছিল।

নার্ভার বংশ

ষড়যন্ত্রকারীরা, যারা ডমিশিয়ানকে হত্যা করেছিল তারা এক প্রজন্ম আগে নিরোর হত্যাকারীদের কাছেই বিষয়টি শিখেছিল নিশ্চয়। তারা নিজেদের মধ্যে তর্কে ব্যস্ত জেনারেলদের মাঝখানের ফাঁকটুকু নিয়ে একটুও সময় নষ্ট করেনি। তাদের কাছে তাদের প্রার্থী তৈরি ছিল। তারা যেহেতু সেনাবাহিনীর লোক নন তাই তারা কোনো জেনারেলকে পছন্দ করেননি। (তারা তাদের পেছনে প্রিতোরিয়ান গার্ডদের সমর্থনও আশা করেছিলেন।) তারা নির্বাচন করেছিলেন একজন সিনেটরকে।

তাদের পছন্দ ছিল প্রচ- সম্মানিত একজন সিনেটর নার্ভা (মার্কাস ককেসিয়াস নার্ভা)। নার্ভার বাবা ছিলেন একজন বিখ্যাত আইনজীবি আর সম্রাট টিবারিয়াসের বন্ধু। নার্ভা নিজেও ভেস্পাসিয়ান আর টাইটাসের অধীনে ট্রাস্টে কাজ করেছিলেন। ৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ডমিশিয়ানের সাথে কনসলের কাজও করেছিলেন। পরে অবশ্য ডমিশিয়ানের সুনজর থেকে তিনি বঞ্চিত হন আর সম্রাট তাকে দক্ষিণ ইতালিতে নির্বাসনে পাঠান।

ডমিশিয়ানের মৃত্যুর সময়ে নার্ভার বয়স ছিল ষাটের ঘরে। আর তাকে দেখে মনে হতো না যে তিনি অনেকদিন বাঁচবেন। কোনো সন্দেহ নেই যে যারা তাকে সমর্থন দিয়েছিল তারা সেই আশাতেই ছিল যে তার শাসনামল হবে খুব ছোট আর ওইটুকু সময়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে পারবে।

নার্ভা সিনেট আর সম্রাটের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বৈরি সম্পর্ক তা শেষ করার কাজে মনোযোগ দিয়েছিলেন। কাগজে কলমে লিখিত নিয়মটাকে তিনি বাস্তবে রূপ দিতে চাইতেন। তিনি দেখাতে চাইতেন যে রাজ্য চলে সিনেটের কথায় আর সম্রাট আসলে সিনেটের নিয়োগকৃত একজন সরকারী কর্মচারি মাত্র। কোনোদিন কোনো সিনেটরকে ফাঁসিতে ঝোলাবেন না বলে যে প্রতিজ্ঞা করেছিরেন তা তিনি রক্ষা করেছিলেন। তিনি কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবাইকে অভ্যস্ত করেন। রাজনৈতিক অপরাধে মানুষকে শাস্তি দেন তিনি। সাম্রাজ্যের অধীনে একটি ডাকবিভাগ চালু করেন। রাজ্যের শিশুদের জন্য তিনি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি নিজের মানবীয় গুনাবলী আর সাধারণ মানুষের প্রতি দয়া প্রকাশের জন্য প্রচুর পদক্ষেপ নেন।

যদিও মানুষের জীবনে আরাম আয়েশ এনে দেবার এই প্রচেষ্টা নার্ভার সরকারের একটি প্রশংসার যোগ্য পদক্ষেপ কিন্তু তা সত্ত্বেও ওরকম প্রাচীনপন্থী একটি সমাজে সেটাকে অলুক্ষুণে একটা ব্যাপার বলেই ধরে নেয়া হতো। তার ওপরে স্থানীয় সরাকারও অসহযোগিতা শুরু করেছিল। তার চেয়েও বড়ো কথা যে তারা সম্রাটের মুখাপেক্ষী হয়েই অপেক্ষা করছিল। রোমের মহান সম্রাট সবার জন্য সহৃদয় হবেন এমনটাই সবাই প্রত্যাশা করত। তিনি ছিলেনও তাই। কিন্তু এমন একটা সময় এলো যখন কেন্দ্রীয় সরকার হয়ে পড়ল দুর্নীতিগ্রস্থ আর অযোগ্য। তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য ভালো কিছু করতে পারছিল না, সে জায়গায় স্থানীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করবে কী করে?

কিন্তু তখনকার জন্য শুধু প্রিতোরিয়ান গার্ডরাই ছিল ভীষণ অসন্তুষ্ট। ডমিশিয়ান তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন কারণ তিনি কোনো একসময় তাদের সাহায্য করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন যে ক্ষমতায় থাকতে হলে প্রিতোরিয়ান গার্ডদের হাতে রাখতে হবে। পাশাপাশি তিনি তাদের ভাতাও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন আর এছাড়াও নানারকম স্বাধীনতা ভোগ করতে দিতেন। নার্ভার কঠোর অর্থনীতি আর সিনেটের প্রতি নির্ভরতা প্রিতোরিয়ান গার্ডদের বিরক্তি বাড়িয়ে তুললেও, হতাশার সাথেই তারা ডমিশিয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা আর তাদের নিজস্ব প্রধান যে কিনা সেই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন, দুজনেরই ফাঁসি চাইল। নার্ভা দেখলেন যে তিনিও গ্যালবার মতো একই পরিণতির দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু সাহস নিয়ে তিনি প্রেতোরিয়ান গার্ডদের মুখোমুখি হয়ে তাদের দাবি নিয়ে কাজ করতে চাইলেন। নার্ভা নিজের জীবন হারাননি তবে তাদের কাছে একরকম অপমানিত হয়েছিলেন। তিনি দেখলেন যে তার কাছে সুবিচার না পেয়ে তারা নিজেরাই ষড়যন্ত্রকারীদের হত্যা করেছে। আর এজন্য তারা সিনেটের মাধ্যমে “ধন্যবাদ”ছিনিয়ে নিতে নার্ভাকে বাধ্য করেছিল।

নার্ভা বুঝতে পারছিলেন যে তিনি প্রিতোরিয়ান গার্ডদের নিয়ন্ত্রন করতে পারছেন না। তার মৃত্যুর মাধ্যমে পুরো সা¤্রাজ্যে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে, এরকম তিনি সন্দেহ করছিলেন। তার কোনো সন্তান ছিল না যার উপরে তিনি নির্ভর করতে পারেন যেমন ভেস্পাসিয়ান করেছিলেন টাইটাসের উপরে। অগত্যা তিনি কিছু ভালো জেনারেলের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করলেন যাদের কাউকে তিনি দত্তক নিতে পারেন আর পরবর্তী কালে তার উত্তরাধিকারীর মর্যাদা দিতে পারেন। টাইটাসের মতো ভক্ত পুত্র সন্তান না হলেও অন্তত টিবারিয়াসের মতো পুত্র তো তিনি পেতে পারেন।

অনেক হিসাবনিকাশ করে শেষে তিনি পছন্দ করলেন ট্র্যাজানকে (মার্কাস উল্পিয়াস ট্র্যাজানাস)।  ৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ট্র্যাজান আধুনিক শহর সেভিলের কাছে স্পেনে জন্ম গ্রহন করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম সম্রাট যিনি ইতালির বাইরে জন্মেছিলেন (অবশ্য তিনি ইতালিয়ান সংস্কৃতিতে শিক্ষিত ছিলেন)। তিনি নিজেও একজন সৈন্য ছিলেন আর একজন সৈন্যের পুত্র ছিলেন। সুতরাং সারাজীবন দক্ষতা আর যোগ্যতার বলেই রাজ্যের সেবা করে গেছেন।

তাকে দত্তক নেয়ার তিন মাসের মাথায় নার্ভা মৃত্যুবরণ করেন। নার্ভা প্রায় দেড় বছর সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। এর পর ট্র্যাজান শান্তিপূর্ণভাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।

ট্র্যাজানকে নার্ভার সব আদর্শ মেনে চলতে হয়েছিল। তাকেও প্রতিজ্ঞা রাখতে হয়েছিল যে কখনও কোনো সিনেটরকে ফাঁসিতে ঝোলানো যাবে না আর সিংহাসনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য কাউকে বেছে নিয়ে তাকে দত্তক নিতে হবে  যাতে পরবর্তী কালে সে সিংহাসনে বসতে পারে। আর সত্যি হয়েছিলও তাই। তারপর থেকে বেশ কয়েকজন সম্রাট একজন আরেকজনকে দত্তক নিয়ে উত্তরাধিকারী বানিয়েছিলেন আর সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। কোনো কোনো সময় তাদের পারিবারিক উপাধির পরে “অ্যান্টনিজ”যোগ করে তাদের ডাকা হয়।

রৌপ্যযুগ

নার্ভার মাধমে রোমান রাজ্যে যে শান্তি, নিরাপত্তা উন্নতির ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, তাতে রোমের অভিজাত শ্রেণি যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। রোমান ঐতিহাসিকেরাও নার্ভার পরের সব সম্রাটদের বর্ণনা করতে গিয়ে আগের সব সম্রাটের আমলকে অন্ধকার যুগ বলে বর্ণনা করেছেন। সিনেটের প্রতি সহনশীলতা দেখানোই এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

কিন্তু ঐতিহাসিকেরা হয়তো সেভাবে নজর দেননি। সে যুগে প্রতিশোধপরায়ণতা ছিল অনেক প্রকট। ঐতিহাসিকদের লেখা যে কয়েকটি বই বেঁচে গেল, তাতে দেখা গেল যে আগের সমস্ত স¤্রাটেরা সবাই ছিলেন অন্ধকার যুগের প্রবক্তা। কিন্তু তখনকার এক একজন সম্রাট যতই খারাপ হোন না কেন, সিনেটের ঐতিহাসিকদের লেখায় তাদের যত খারাপ বর্ণনা করা হয়েছে, বাস্তবে তারা আদৌ সেরকম ছিলেন কি না সন্দেহ।

ঐতিহাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন কর্নেলিয়াস টেসিটাস। ফ্লেভিয়ানদের সময় থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল আর ডমিশিয়ানের সময় পর্যন্ত বেশ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি ছিলেন অ্যাগ্রিকোলার মেয়ের স্বামী। বৃটেনে রোমান সংস্কৃতি প্রচারের ব্যাপারে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি অগাস্টাসের মৃত্যুর সময় থেকে শুরু করে ডমিশিয়ানের সময় পর্যন্ত সম্রাটদের ইতিহাস রচনা করেছিলেন। সিনেটের প্রতি প্রজাতন্ত্রীয় মতবাদে বিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি ইতিহাসগুলো লিখেছিলেন। তাই ওই সময়টাতে কোনো সম্রাটের মধ্যেই তিনি ভালো কিছু দেখতে পাননি। বিশেষ করে তিনি সাংঘাতিকভাবে টিবারিয়াসের নিন্দা করেছিলেন। হয়তো টিবারিয়াসের চরিত্রের সাথে ডমিশিয়ানের মিল পাওয়া যায়, সেজন্য।

টেসিটাস অ্যাগ্রিকোলার একটি জীবনী গ্রন্থ লিখেছিলেন। বৃটেনের ইতিহাসের উপরে আলোকপাত করেছে বলে বইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৮৯ থেকে ৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টেসিটাস রোমে ছিলেন না। সেই সময়টায় মাঝে মাঝে তিনি জার্মানিতে থাকতেন। জার্মানির ইতিহাস নিয়ে তখন তিনি একটি বই লিখেছিলেন। জার্মানির সেই শুরুর দিনগুলোর বিষয়ে যদি আমরা জানতে চাই তাহলে বলা যেতে পারে তার বইটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। বইটি পড়লে অবাক হতে হয় যে প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা কত নিখুঁত। টেসিটাস প্রতিটি ঘটনার বর্ণনায় পারতপক্ষে নিরপেক্ষ থাকতে চেষ্টা করেছেন। তাছাড়া তিনি ওই বইয়ে জার্মানির লোকদের সাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত জীবনাচরণের সাথে রোমের মানুষদের আকণ্ঠ বিলাসিতায় ডুবে থাকা জীবনের তুলনা করেছেন। তবে নিজের মতামত জাহির করার জন্য তিনি হয়তো একটি পরিস্থিতিকে অনেক বেশি উপরে তুলে আরেকটিতে অনেক বেশি নিচে নামিয়ে এনেছেন।

আফ্রিকার সমুদ্রতীরে ৭০ খ্রিষ্টাব্দে আরেকজন তরুণ ইতিহাসবিদের আবির্ভাব হয়েছিল। তার নাম গেইয়াস স্যুটোনিয়াস ট্র্যাঙ্কুইলাস। তার বিখ্যাত বইয়ের নাম “বারোজন সম্রাটের জীবন”। এই বইটি জুলিয়াস সিজারসহ ডমিশিয়ান পর্যন্ত তার পরের এগারো জন সম্রাটের জীবনের গল্প। স্যুটোনিয়াস গুজোবে রটা গল্প মজা করে লিখতে পছন্দ করতেন। সাধারণ ঐতিহাসিকেরা যেসব ঘটনা এড়িয়ে গেছেন, তিনি সেগুলো রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করেছেন। যাই হোক, সেসব মজাদার গুজোবের বর্ণনার কারণে তার বইটি তখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল আর আজও একই আগ্রহ নিয়ে পঠিত হচ্ছে।

তখনকার যুগে রোমান নন কিন্তু জনপ্রিয় এমন একজন ইতিহাসবিদ হলেন ইহুদি জোসেফ। তিনি নিজের নামের রোমানিয় রূপ দিয়েছিলেন ফ্লেভিয়াস জোসেফাস। তিনি ৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন। কেবলমাত্র ইহুদি শিক্ষায়ই শিক্ষিত নন, রোমান শিক্ষাও গ্রহন করেন জোসেফাস। তাই দুই সংস্কৃতিতেই সমানভাবে বিচরণ করতেন তিনি। ৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রোমে যান রোমান সংস্কৃতি আরও ভালো করে শিখতে। আবার জুডিয়ায় ফিরে এসে সেখানকার সংস্কৃতির সাথেও তাল মেলান। দুই জায়গার জাতীয়তাবাদের উন্নতি কল্পে তিনি সমানভাবে কাজ করে যান।

তবে তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ইহুদিদের মধ্যে যখন বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল তখন রোমের বিরুদ্ধে একটি সৈন্যদল নিয়ে তিনিও রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। তিনি অনেকটা সময় ধরে শক্তিশালী বিপক্ষের বিরুদ্ধে সফলতার সাথে লড়ে গিয়েছিলেন। যখন শেষ সময়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে তখন অন্য আর সব পরাজিত কাপুরুষ নেতার মতো তিনি আত্মহত্যা করেননি। বরং সে জায়গায় তিনি ভদ্রভাবে মাথা নত করে ভেস্পাসিয়ান আর টাইটাসের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাই সে শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি রোমান নাগরিকের মর্যদা নিয়ে রোমে বসবাস করে কাটিয়েছেন। তিনি ৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

নিজের জাতিকে ত্যাগ করার বিষয়টি নিয়ে তিনি মর্মাহত হননি, তা নয়। ইহুদি বিদ্রোহের স্মৃতিচারণ করে তাই বই লিখেছিলেন। নাম ছিল “ইহুদিদের যুদ্ধ”। ভেস্পাসিয়ানের শাসনামলের শেষের দিকে বইটি ছাপা হয়। ইহুদি বিদ্রোহী হিসেবে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, আত্মজীবনী গ্রন্থে সেসব যুক্তি খ-ন করেছেন। আরেকটি বইয়ে তিনি বর্ণনা করেছেন কেন এবং কীভাবে ইহুদিরা বিদ্রোহের দিকে এগিয়ে গেছে। কতটা অত্যাচারিত হয়ে, কী বিপর্যয়ের মুখে তারা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়েছে। তার বিখ্যাত বই হলো “ইহুদিদের স্বর্ণযুগ”(দ্য জুইশ অ্যান্টিকুইটিস) যাতে ইহুদিদের প্রাচীন ইতিহাস (বাইবেলকে নতুন করে বর্ণনা করাসহ) থেকে শুরু করে তাদের বিদ্রোহের সূচনা পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।

বইটিতে একটি প্যারাগ্রাফে নাজারেথের যীষুর কথা বলা হয়েছে। এটাই বাইবেলের দ্বিতীয় পর্বের বাইরে অন্য কোথাও যীষুর সম্বন্ধে নতুন কোনো তথ্য সমৃদ্ধ বই। অবশ্য বেশিরভাগ জ্ঞানীগুনী ব্যক্তিরা মনে করেন যে বাইবেলের বাইরে যীষুর সম্পর্কে এসব বর্ণনা পুরোপুরি সত্য নয়। পরে টিবারিয়াসের সময়ে আবার কিছু খ্রিষ্টানের সহায়তায় জোসেফাসের বর্ণনা যে ভিত্তিহীন আর যথেষ্ট নয়, এ নিয়ে জুডিয়ায় আলোচনাও হয়েছে।

ফ্লেভিয়ানদের রাজত্বের সময়টায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল। অবশ্য সমালোচকরা এইসব সাহিত্যকে অগাস্টাসের সময়কার সাহিত্যের সাথে তুলনা করে খুব উচ্চমানের বলে মনে করেন না। তারা ফ্লেভিয়ানের সময়কে সাহিত্যের “রৌপ্যযুগ”হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই রৌপ্যযুগে জনপ্রিয় ছিলেন তিনজন অসাধারণ রম্যলেখক। রম্যলেখকরা সব খারাপ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসিঠাট্টা মিলিয়ে গল্প লিখতেন। ঠাট্টার মাধ্যমে খোঁচা দিয়ে তারা মানুষকে শিক্ষা দিতে চেষ্টা করতেন। রম্যলেখক তিনজন হলেন পার্সিয়াস (আউলাস পার্সিয়াস ফ্ল্যাকাস), মার্শাল (মার্কাস ভ্যালেরিয়াস মার্শালিস) আর জুভেনাল (ডেসিমাস জুনিয়াস জুভেনালিস)।

পার্মিয়াস ছিলেন প্রথম আর প্রকৃতপক্ষে এসেছিলেন ফ্লেভিয়ান আমলেরও আগে। সে কারণে তিনি ক্লডিয়াস আর নিরোকে নিয়েও রম্যরচনা লিখেছিলেন। জেনারেলরা কেউ যখন তাদের আদর্শ থেকে এতটুকুু নেমে গেছেন তখনই পার্সিয়াস সেই ঘটনা নিয়ে রম্য লিখেছেন। প্রতিদিন এরকম লিখতে লিখতে এই বিষয়ে তিনি দক্ষ হয়ে উঠলেন। তিনি মাত্র তিরিশ বছর বয়সে মারা যান। এত অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ না করে তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন তবে তার রম্য সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হতো আর তার আরও বেশি নামডাক হতো।

৪৩ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনে জন্মেছিলেন মার্শাল। নিরোর আমলে তিনি রোমে আসেন আর সেখানেই ১০৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার রম্য কবিতা, ছড়া, বিশেষ করে খুবই ছোট আকৃতির দুই থেকে চার লাইনের অনুকাব্যের জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি ওই ধরনের ১৫০০ ছড়া লিখেছিলেন যেগুলো চৌদ্দটি বইয়ে ছাপানো হয়েছিল। তার চোখের সামনে যতরকম অসঙ্গতি তিনি দেখতে পেতেন, তাই নিয়েই লিখে যেতেন। তারপরে ছাপা হওয়ার সাথে সাথেই তার অনুকাব্য সকলের মুখে মুখে ফিরত। হয়তো যাদের নিয়ে সেসব লেখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তার রম্যের খোঁচা বচরের পর বছর ধরে খেয়ে এসেছেন।

মার্শাল তার সময়ে ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়। টাইটাস আর ডমিশিয়ান দুজনেই তার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এটা কিছুটা হতো এই কারণে যে তার রচনা ছিল খুবই মজার আর কিছুটা এই কারণে যে তিনি তার রম্য রচনায় কিছু অসামাজিক বা অসভ্য বিষয়ের অবতারনা করতেন। তাই তার রম্য কৌতুক বেশিরভাগই ছিল কিছুটা আদি রসাত্মক।

একটি স্বাভাবিক রসবোধপূর্ণ কৌতুক-কবিতার উদাহরণ হিসেবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে,

Non amo te, Sabidi, nec possum dicere quare;

Hoc tantum possum dicere, non amo te.

এর অর্থ হলো, ‘তোমাকে ভালোবাসতে পারি না, সাবিডিয়াস, বলতেও পারি না কেন; শুধু এটুকু জানো, পারি না ভালোবাসতে।’

এই অনুকাব্যটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল থমাস ব্রাউনের আধুনিক সংস্করণে। ১৭৮০ সালে থমাস ব্রাউন যখন যখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তখন তার ডিন ডক্টর ফেলকে নিয়ে এই ছড়াটির প্যারোডি করে লিখেছিলেন,

ডক্টর ফেল, ভালোবাসি না তোমায়।

কারণ শুধায়ো না আমায়;

কিন্তু এ শুধু আছে আমার জানায়,

ডক্টর ফেল, ভালোবাসি না তোমায়।

জুভেনাল ছিলেন রম্যলেখকদের মধ্যে হয়তোবা সবচেয়ে বড় কিন্তু কিছুটা রসহীনও। মাঝে মাঝে সমাজের মধ্যে ঘটা দুর্বিসহ ঘটনায় তিনি এতটা বিমর্ষ হয়ে পড়তেন যে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারতেন না। তখন তিনি তার লেখায় হাস্যরসবোধের পরিবর্তে কঠোর কঠিন ভাষার প্রয়োগ করতেন। তিনি রোমের লোকদের অযথা বিলাসিতা আর লোক দেখানোর স্বভাবকে ঘৃণা করতেন। তার লেখার মাধ্যমে স্বৈরাচারী কোনো মানুষ বা একদল স্বেচ্ছাচারী লোককে একইরকমের প্রবল আক্রোশ নিয়ে আক্রমন করতেন। তিনি রোমের মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে নানা কটাক্ষ করতেন। তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে তারা কেবল খাওয়া আর খেলার প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে পারে। কিন্তু এটাই প্রমাণ করে না যে সম্রাটদের আমলে রোম পৃথিবীর আর সব সভ্য দেশের চেয়ে জঘন্য কোনো জায়গা ছিল। সন্দেহ নেই যে আজ যদি জুভেনাল বেঁচে থাকতেন তবে এখনও তিনি একইরকমের রম্য কবিতা লিখে যেতেন, কঠিন হলেও সত্যি যে লিখতেন নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডন কিংবা মস্কোকে নিয়ে। এটা মনে রাখা দরকার যে খারাপ একটা পরিস্থিতিতে মানুষ অনেক পাপকাজে লিপ্ত হতে পারে কিন্তু আড়ালে আবডালে যে অনেক ভালো ও দয়ালু মানুষ কিংবা ভদ্রলোকেরা থাকেন তারা তাদের মতো কাজ করেই যান। সেসব খবর কখনও পত্রিকার প্রথম পাতায় আসেও না আর কেউ জানতেও পারে না।

একটু প্রাচীন ধরণের কবিতা লিখতেন কুব লুকান (মার্কাস অ্যানাইয়াস লুকানাস)। তিনি ৩৯ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের করডিউবাতে জন্মগ্রহন করেন। তরুণ নিরোর শিক্ষক সেনিকার ভাগ্নে ছিলেন তিনি। তার সবচেয়ে আলোচিত কাজ হলো জুলিয়াস সিজার আর পম্পেইয়ের মধ্যেকার যুদ্ধ নিয়ে একটি কাব্যগ্রন্থ। তার কাজের মধ্যে বলতে গেলে এটাই পুরোপুরি অক্ষত আছে।

তিনি নিরোর বন্ধু ছিলেন। তবে এই বন্ধুত্ব যেমন তার জন্য তেমনই তার মামা সেনিকার জন্য গুরুতর হয়ে দেখা দেয়। নিরো লুকানের কবিতার ব্যাপারে খুব হিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন আর তাকে জনসমক্ষে আবৃত্তি করতে বাধা দেন। একজন কবির জন্য এটা ছিল চরমতম শাস্তি। তার সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হলে তিনি নিরোর বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। ধরা পড়লে লুকান আদালতের পক্ষের রাজসাক্ষী হয়ে যান আর তার সাথে ষড়যন্ত্রকারী বাকিদের পরিত্যাগ করেন। কিন্তু তার পরেও লুকানকে ধরে নিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়। এরপরে রোমে আরও একটি স্প্যানিশ স্কুল গড়ে ওঠে। রৌপ্যযুগের দার্শনিকদের আদর্শ অনুযায়ী সেনিকা, মার্শাল আর লুকানের কথা মাথায় রেখে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন কুইন্টিলিয়ান। মার্কাস ফেবিয়াস কুইন্টিলিয়ান ৩৫ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনে জন্মান। তিনি গ্যালবার সাথে কাজ করেছিরেন আর রোমে এসেছিলেন গ্যালবা যখন সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত। তিনি রোমেই থাকা শুরু করেন। ছাত্রদের ভাষা ও বক্তৃতা দেয়ার কায়দা শেখান। তিনিই প্রথম শিক্ষক যিনি সা¤্রাটের অনুমোদন অনুযায়ী শিক্ষাদান করার সুযোগ পান। ভেস্পাসিয়ানের তরফ থেকে তাকে এজন্য সাহায্য করা হয়। কুইন্টিলিয়ান সিসেরোর ঘোর সমর্থক ছিলেন। তিনি গ্রিক ভাষার ব্যবহার ফিরিয়ে আনতে আর গ্রিসের ধরণ অনুযায়ী রচনায় বেশি বর্ণনা আর অতি কাব্যিক বিষয়গুলো পরিহার করার চেষ্টা করেন।

রোম কখনই বিজ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিল না। সেটি ছিল গ্রিকের লোকদের জন্য প্রথম প্রশংসার বিষয়। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম শতাব্দীতে রোমানরা গ্রিসে বিজ্ঞানের প্রতি যে অবদান রেখেছিল তা পৃথিবীর যে কোনো বিজ্ঞানের ইতিহাস বইয়ে বর্ণনা করা হয়।

সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন প্লিনি (গেইয়াস প্লিনিয়াস সেকানডাস)। তিনি ২৩ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির উত্তর দিকে নোবাম কোমাম শহরে (আধুনিক কোমো শহর) জন্মগ্রহন করেন। তিনি ক্লডিয়াসের সময়ে সেনাবাহিনীর দল নিয়ে জার্মানির দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এটা ছিল ভেস্পাসিয়ান সাম্রাজ্য হারাবার পরের ঘটনা। তিনি ভেস্পাসিয়ানের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। সে সময় তিনি গাউলের কিছু অংশে আর স্পেনে গভর্নর হিসেবে কাজ করেন।

তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, পৃথিবীর সব বিষয়ে যার ছিল অপার আগ্রহ আর অনুসন্ধিৎসা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন জ্ঞানার্জনে। তার প্রধান রচনা “প্রাকৃতিক ইতিহাস”৭৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল সাইত্রিশ খ-ে লিখিত আর টাইটাসকে উৎসর্গীকৃত। এটা কোনো মৌলিক রচনা ছিল না। দুই হাজারেরও বেশি প্রাচীন বই থেকে সংগ্রহ করে পাঁচশ’লেখকের লেখাকে একত্রিত করে তিনি এই বিশাল রচনাটির আয়োজন করেছিলেন। রচনা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই নিরপেক্ষ আর রসবোধসম্পন্ন।

বইটি মহাকাশ বিজ্ঞান এবং ভূগোল নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছে। তবে এর মূল বিষয় ছিল জীববিজ্ঞান। এখানে তিনি অসংখ্য পরিব্রাজকের রচনা থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ লিপিবদ্ধ করেছেন। এখানে পঙ্খীরাজ ঘোড়া, মৎস্য কন্যা, এক শিংওলা ঘোড়া, মস্তকবিহীন মানুষ, দীর্ঘ পা বিশিষ্ট অবাস্তব মানুষ আরও অনেক কিছুর মজাদার বর্ণনা আছে। বইটি ছিল মনোমুগ্ধকর আর এত বেশি কপি ছাপানো হয়েছিল যে বহুদিন পর্যন্ত সব জায়গায় পাওয়া যেত। বাস্তবধর্মী সমস্যা নিয়ে লেখা বই কখনও এত বেশি বিক্রি হতে দেখা যায়নি। প্লিনির রচনার খ্যাতি মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের প্রথম দিকে পর্যন্ত সমানভাবে জনপ্রিয় এবং একটি আশ্চর্যজনক সৃষ্টি হিসেবে সমাদৃত ছিল। একে সবসময়ে একটি পৃথক ঐতিহ্যবাহী কাজ হিসেবেই দেখা হতো।

প্লিনি জীবনের শেষে একটি ভয়াবহ নাটকীয় পরিণতির দিকে যান। টাইটাসের অধীনে তিনি নেপলসে একটি যুদ্ধ জাহাজ বহরের দায়িত্বে ছিলেন। তার জায়গায় বসেই তিনি ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাত হতে দেখছিলেন। অগ্নুৎপাত কাছে থেকে দেখে লেখার মধ্যে নিখুঁতভাবে ঘটনাটি ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি সেটির কাছে গেলেন। কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করার কারণে লাভার ছাই আর ধোঁয়ার মধ্যে বন্দী হয়ে যান তিনি। পরে সেখানেই তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

অন্য জনপ্রিয় লেখকদের, যাদের লেখা অনেকদিন বেঁচে ছিল তাদের মধ্যে একজন হলেন আউলাস কর্নেলিয়াস সেলসাস। টিবারিয়াসের সময়ে তিনি যেখানে যা পেয়েছেন তাই দিয়ে মানুষকে গ্রিক শেখানোর চেষ্টা করেছেন। গ্রিক ঔষধের উপরে লেখা তার যে বইটা তিনি লিখেছিলেন সেটি আধুনিক যুগের প্ররম্ভে আবিস্কৃত হয়েছিল। তখন সেলসাসকে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছিল। সেটি ছিল তাকে দেয়া চরম সম্মান।

ক্যালিগুলার আমলে পম্পোনিয়াস মেলা (সে সময়কার আরেকজন স্প্যানিশ জ্ঞানী ব্যক্তি) গ্রিক মহাকাশ বিজ্ঞানের উপরে নির্ভর করে একটি জনপ্রিয় ছোট ভূগোল বই লিখেছিলেন। তিনি সতর্কতার সাথে সেটি থেকে জটিল গাণিতিক বিষয়গুলো বাদ দিয়েছিলেন যেন মানুষের জন্য পড়তে সহজ হয়। সে সময়ে তার এই মহাকাশবিজ্ঞানের বই খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এটি মধ্যযুগেও খুব সমাদৃত ছিল। মানুষের প্রাচীন ভূগোলের জ্ঞান বলতে যা বোঝায়, তা বইটিতে ছিল।

প্রকৌশল বিদ্যা, যাতে রোমানরা সবসময় এগিয়ে ছিল, সেই ক্ষেত্রে অনেক বড় বড় কাজ হয় সে সময়ে। অগাস্টাসের আমলে ভিট্রুভিয়াস (মার্কাস ভিট্রুভিয়াস পোলিও) একটি বিশাল আকৃতির স্থাপত্যবিদ্যার বই লেখেন আর সম্রাটকে উৎসর্গ করেন। বহু বছর তার বইটিই ওই বিষয়ে একটি আদর্শ লেখা হিসেবে গণ্য হতো।

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় অবদান রাখার জন্য স্মরণ করা যেতে পারে সেক্সটাস জুলিয়াস ফ্রন্টিনাসকে। তিনি ৩০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম গ্রহন করেছিলেন। ভেস্পাসিয়ানের অধীনে তিনি বৃটেনে গভর্নরের কাজ করেন। তিনি সেনাবিজ্ঞান আর ভূমিজরিপের উপরে বই লেখেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তার বইগুলো অবিকৃতভাবে পাওয়া যায়নি। ৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট নার্ভা তাকে রোমের পানি সরবরাহের কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেন। এর ফলে তিনি রোমের পানি সরবরাহের বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই ভলিউমে লেখা বইয়ের কাজ শেষ করেন। এটিই সম্ভবত মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন প্রকৌশল বিদ্যার বই। তিনি রোমান প্রকৌশলীদের কাজ নিয়ে খুব গর্বিত ছিলেন। কিন্তু মিশরিয় আর গ্রিক প্রকৌশলীদের সাথে তুলনা করলে সেটা তেমন কোনো কৃতিত্বই নয়।

গ্রিসের বিজ্ঞান চর্চার আলো কমে এলেও তা সাম্রাজ্যের প্রাচীন পথপ্রদর্শক ছিল। নিরোর অধীনে সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন গ্রিক ডাক্তার ডিওসকরিডেস। তিনি পাছগাছড়া থেকে ঔষধ তৈরি করতে পছন্দ করতেন। এই সুবাদে গাছপালা ব্যবহার করে ঔষধ তৈরির পদ্ধতি বিষয়ে তিনি পাঁচটি বই লেখেন। এটিই হয়তো ঔষধ তৈরির পদ্ধতি বিষয়ে সবচেয়ে প্রাচীন বই যা মধ্যযুগ পর্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

বলতে গেলে একই সময়ে, অ্যালেক্সান্দ্রিয়ার আমলে একজন মহান ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। তার নাম ছিল হিরো অথবা হিরোন। তিনিই ছিলেন প্রাচীন যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী আর আবিস্কারক। তিনি একটি শূন্য গেলাকার ফাঁপা বস্তু তৈরি করেছিলেন যার একটি বাঁকানো হাতল ছিল। তাতে পানি ফোটানো যেত। হাতলের ভেতর দিয়ে বাষ্প বেরিয়ে এসে গোলাকার অংশটিকে ঘোরাত (আজকাল মাঠে পানি দেয়ার জন্য এই সূত্রের ব্যবহার হয়)। এটিকে খুব প্রাচীন একটি স্টিম ইঞ্জিন বলা যেতে পারে। তখন যদি সমাজটা ততটা এগিয়ে থাকত যে তার এই আবিষ্কারের কদর জানত তবে সেকানে একটি শিল্প বিপ্লব ঘটে যেত। কিন্তু সমাজের শিক্ষাদীক্ষা সেই পর্যায়ে ছিল না আর তাই সেই সূত্র কাজে কর্মে লাগাতে আরও সাতটি শতাব্দী লেগে গেছে। হিরো বলবিদ্যা নিয়েও গবেষণা করতেন। তিনি বাতাসের গতিবিধি আর আচরণ নিয়ে গবেষণার পরে ফলাফল লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এই কাজটি ছিল তার সময়ের জন্য অত্যন্ত আধুনিক।

ক্যালিগুলা, নিরো আর ডমিশিয়ানের সময়ে অস্থির অবস্থার মধ্যেই সাহিত্য আর বিজ্ঞান চর্চা অস্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলছিল। সে সময়ে দপ করে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, কেন যেন নার্ভা বা তার পরের যে সকল সম্রাট নার্ভার অনুসারী ছিলেন তাদের শাসনামলের শান্ত সময়ে আর সেভাবে জ্বলে ওঠেনি। বরং যেন সুস্থ সুন্দর নিয়মের আড়ালে সৃষ্টিশীলতায় ভাটা পড়েছিল।

ট্র্যাজান

সত্যি কথা বলতে কী, ট্র্যাজানের মতো রোমান নন এমন একজন প্রাদেশিক মানুষের পক্ষে সম্রাট হওয়া আর জনপ্রিয় হওয়া অসম্ভব হয়নি। এটাই প্রমাণ করে যে ইতালিতে জন্মানো মানুষের শাসনের ব্যাপারে রোমে যে অগ্রাধিকার ছিল তা তখন শিথিল হয়ে এসেছিল। অগাস্টাস এই ইতালি কেন্দ্রিক শাসনব্যাবস্থা চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। একটির পরে একটি ঘটনার চাপে জুলিয়াস সিজারের পরিকল্পনার রোম যেন ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছিল। রাজ্যের দূরবর্তী প্রদেশের মানুষেরা শাসন কাজে অংশগ্রহন করবে আর সবার মিলিত প্রচেষ্টায় সাা¤্রাজ্য পরিচালিত হবে এমন স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

নার্ভার মৃত্যুর সময়ে ট্র্যাজান রাইন আর দািনয়ুবের তীরবর্তী অঞ্চল সামলাচ্ছিলেন। ডমিশিয়ান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তিনি সেখানেই ছিলেন। একমাত্র যখন সেই এলাকায় রোমান আধিপত্য পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন তিনি রোমে ফেরত এসেছিলেন। তার অবর্তমানেও সেখানে তেমন কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। এটাই প্রমাণ করে যে নার্ভার আমলে ইতালিতে একটি অনাবিল প্রশান্তি বিরাজ করছিল যাতে একজন প্রাদেশিক প্রধানের অবর্তমানেও কোথাও কোনো আঁচ লাগেনি। সব জায়গায়ই প্রশান্তি বজায় রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছিল।

৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ট্র্যাজান বিপুল পরাক্রমে রোমে প্রবেশ করেন। তার ব্যক্তিত্ব আর বীরত্ব এক পলকে রোমের প্রিতোরিয়ান গার্ডদের মন জয় করে ফেলে।

ট্র্যাজান রোমের বাইরে রোমান সংস্কৃতির বিস্তৃতির জন্য নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহন করলেন। নব্বই বছর আগে জার্মানিতে ভ্যারাসের হত্যার পর থেকে রোমের নিয়ম কানুন প্রতিরক্ষামূলক ছিল। নতুন এলাকা দখলের ক্ষেত্রে প্রাদেশিক আয়ের উপরে নির্ভরশীল ছিল তারা। কখনও বৃটেন বা রাইন-দানিয়ুবের তীর থেকে আসা অর্থও ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু তাতেও বিপক্ষ শক্তিগুলোর সাথে যে আর কোনো ধরনের ঝামেলা হবে না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

ট্র্যাজানের চরিত্র এরকম ছিল না। তার চোখে, শত্রুর অভাবে রোম যেন একেবারে মিইয়ে পড়েছিল। ডমিশিয়ানের সময় ঝিমিয়ে পড়া যেন চরমে পৌঁছেছিল। ডমিশিয়ান ভালোমানুষি দেখানোর পরিবর্তে ডেশিয়ানদের কাছে শান্তি কিনে নিয়েছিলেন। ট্র্যাজান এই অবস্থা বদলাতে চাইলেন। তিনি রোমের সেনাবাহিনীকে নতুন করে তৈরি করলেন। তাদের মনোবল দৃঢ় করার কাজে মনোযোগ দিলেন। তিনি রোমে ভালো করে গেঁড়ে বসতে না বসতেই ডেশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে লাগলেন।

প্রথমত তিনি তার সম্বর্ধনায় অংশ নিলেন। ১০১ খ্রিষ্টাব্দে ডেসিবালুস (তখনও সেখানে একজন ডেশিয়ান রাজা ছিলেন) থেকে যখন হামলার হমকি দেয়া হলো, তখন দানিয়ুবের তীর ধরে ট্র্যাজান তার বাহিনী নিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। দানিয়ুবের তীর বেয়ে আরও উত্তরদিকে এগিয়ে যেতে যেতে রোমান সৈন্যেরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। একসময় ডেশিয়ানের ভেতরে প্রবেশ করে ফেলল। দুই বছরের মধ্যে ডেসিবালুকে পুরোপুরি পরাস্ত করল তারা। তারপর তাকে শান্তিচুক্তিতে বাধ্য করল। চুক্তির ফলশ্রুতিতে সেখানে রোমান রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প খোলা হলো।

ডেসিবালুর কাছে এর পরে রাজ্য পরিচালনা করা খুব অসম্মানজনক ছিল। ঠিক যেমন ডমিশিয়ানের শান্তিচুক্তি ছিল রোমের জন্য অসম্মানজনক। সুতরায় রোমানদের সবাই খুশিই হলো। ডেসিবালুর অপমানিত মুখ তাদের কারও মধ্যে কোনো বেদনার উদ্রেগ করেনি। ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে ডেসিবালু আবার রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এবারে ডেশিয়ানরা আগের চেয়েও ভয়াবহ পরাজয় বরণ করে। ডেসিবালু হতবুদ্ধি হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এবারে ট্র্যাজান আর কোনো সুযোগ নেননি, কাজটিা আধাখেঁচড়া রাখেননি। ১০৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ডেশিয়ার পুরোটা দখল করে নেন আর সেটিকে রোমান প্রদেশ বানিয়ে ফেলেন। তারপরে তিনি সেখানে রোমান বাড়িঘর, শহর বানানোর কাজে হাত দেন যেন শহরটি দ্রুত রোমান সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। কৃষ্ণসাগরের উত্তর তীর ঘেঁষে ডেশিয়ার অংশটি প্রকৃতপক্ষে রোমের মতো করে সাজানো যায়নি। এটি বহুদিন ধরে গ্রিসের মতোই ছিল। গ্রিক ভাষাভাষীদের বসবাস ছিল সেখানে। তখন রোমের অধীনে চলে গেল। সেইদিকের সমুদ্রতীরবর্তী প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা তখন একটি মাত্র সরকারের অধীনে চলে গেল। রোমান সাম্রাজ্য উত্থানের আগে এরকমটা মানব সভ্যতার অন্য কোনো ইতিহাসে দেখা যায়নি।

ডেশিয়া কখনই বিপদমুক্ত প্রদেশ ছিল না। এছাড়াও উত্তর আর পূর্বদিকে ছিল দলে দলে অসভ্য উপজাতির মানুষ। ডেসিয়া বলতে গেলে কোনো দিক থেকেই সুরক্ষিত ছিল না। তাই সেখানে বারোমাসই হামলা, আক্রমন লেগে থাকত। দেড়শ শতাব্দী ধরে রোমের অধীনে রাখার জন্য রোমকে ডেশিয়ার পেছনে এত বেশি অর্থ বিসর্জন দিতে হয় যে জায়গাটির কথা ভাবলে তা যেন হয়ে দাঁড়ায় খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। অবশ্য দানিয়ুবের দক্ষিণে ধনী প্রদেশগুলোতে কিছু সরবরাহের ব্যাপারে ডেশিয়া সাহায্য করেছিল।

একসময় দেখা গেল বহুবছর যাবৎ রোমের অধীনে থাকা দক্ষিণের ধনী প্রদেশগুলোর তুলনায় ডেশিয়াই বেশি রোমান হয়ে উঠেছে। তখনকার ডেশিয়া পরবর্তী কালে রুমানিয়া নাম পেয়েছে। বর্তমানে আমরা যাকে রোমানিয়া বলে জানি। নিজের নামের ভেতর দিয়েও দেশটি যেন রোমের স্মৃতি বহন করে চলেছে। আর সেখানকার বর্তমান অধিবাসীরাও নিজেদের ট্র্যাজানের সময়কার সেই রোমান উপনিবেশিকদের বংশধর বলেই মনে করে। বিষয়টি আরও নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় কারণ রোমানিয়ার যে নিজস্ব ভাষাটি আছে তা প্রায় ল্যাটিনের মতো। এটাকে এক ধরণের রোমান ভাষাই বলা যেতে পারে। (যদিও কিছু ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ আর পর্তুগিজ শব্দ ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করেছে।) তার পরের শত শত বছরে ভাষাটি হাজার হাজার দাসের মুখের সমুদ্রপ্রমাণ ভাষার সাথে মিলে গিয়ে, একবার উত্তরের প্রভাব, আরেকবার দক্ষিণের প্রভাব নিয়ে আজও টিকে আছে।

ডেশিয়া জয়ের চিহ্নস্বরুপ ট্র্যাজানকে রোমে চিরকাল দাঁড় করিয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছিল। ১১০ ফুট উঁচু একটি স্তম্ভের মধ্যে তার মূর্তি স্থাপন করে জয়ের মহিমা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই স্তম্ভের মধ্যে ডেশিয়া জয়ের কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে খোদাইকৃত ২৫০০ মানুষের আকৃতি তৈরি করা হয়েছে। খোদাই কাজের এই বিশাল পরিসরে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বন্দীদের হত্যা আর জয়ী হয়ে রোমে ফিরে আসা পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে ট্র্যজান  নার্ভার আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তার ভেতরে এক দয়াশীল পিতা বাস করত। সরকারিভাবে দরিদ্র শিশুদের জন্য সাহায্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এটা যে কেবল মানবিক ব্যবহারের জায়গা থেকে করেছিলেন, তা নয়। সা¤্রাজ্যে শিশু জন্মহার দিনদিন কমে যাচ্ছিল। তাই ভবিষ্যতে সৈন্যের অভাব হতে পারে, এই বিষয়টি তাকে চিন্তায় ফেলেছিল। তিনি জানতেন, দরিদ্র পরিবারগুলোকে যদি সহায়তা দেয়া যায় তাবে সেটাই ভবিষ্যতে প্রচুর সৈন্য তৈরি নিশ্চিত করবে।

এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, দুঃখজনক হলেও সত্যি, সে সময়ের রোমে মানুষের মৃত্যুর হার ছিল আজকের দিনের মৃত্যুর হারের চেয়ে অনেক বেশি। আজকের বিজ্ঞানে আর চিকিৎসায় উন্নত দেশগুলোর চেয়ে সেদিনের রোম অনেক পিছিয়ে ছিল। তাই মানুষের জীবনকালও ছিল কম। তাই জন্মহারে সামান্য উন্নতি সেদিনের রোমে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আজ সমস্ত পৃথিবীর কোথাও তার তত গুরুত্ব নেই। রোমের মতো জন্মহার যদি ততটা কমে যেত তবে আজকের দিনে একটি পুরো জাতি হয়তো নিঃশেষ হয়ে যেত।

কিন্তু রোমে ট্র্যাজানের দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতি, যদিও সে সময়ে রোমের জন্য তিনি সুনামই বয়ে এনেছিলেন কিন্তু তবু রোমের জন্য সময়টা ততটা সুখকর ছিল না। তার অবর্তমানে সরকারের বিভিন্ন স্তরে অরাজকতা আর দুর্নীতি শুরু হয়েছিল। শহরগুলো, বিশেষ করে পূর্বদিকের অঞ্চলগুলো একত বেশি দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে গেল যে তাদের অর্থনীতি প্রায় ভেঙেই পড়ল। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক বিষয়েই নয়, রাস্তাঘাট বানানোসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল।

১১১ খ্রিষ্টাব্দে ট্র্যাজান ছোট প্লিনিকে (গেইয়াস প্লিনিয়াস সিসিলিয়াস সেকুনডাস) বিথিনিয়াসের গভর্নর করে সেখানকার দায়িত্ব বুঝে নেবার জন্য পাঠান।  ছোট প্লিনি ছিলেন প্লিনির ভাগ্নে যিনি ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাতের সময় মারা যান আর তাকে একসময় বড় প্লিনি বলে ডাকা হতো।)

ছোট প্লিনি সেই সময়কার সাহিত্যের কিছু মহারথীর বন্ধু ছিলেন। বিশেষ করে তিনি মার্শাল আর ট্যাকিটাস ছিল তার ঘনিষ্ট। তিনি নিজেও কখনও কখনও লেখালেখি করতেন। তিনি তার চিঠির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সেই একচোখা চিঠিগুলো ছাপিয়ে ছিলেন যেন মানুষ তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।

সেগুলোর মধ্যে একটি চিঠি আজও মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। চিঠিটি তিনি বিথিনিয়া থেকে ট্র্যাজানকে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি পড়লে মনে হয়, খ্রিষ্টানরা যেন কেবলমাত্র খ্রিষ্টান হওয়ার অপরাধেই শাস্তি পেয়ে যাচ্ছিল। এমনকী প্লিনি অনুভব করেছিলেন যে কোনা খ্রিষ্টান যদি স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয় তবে যেন তার সাতখুন মাফ হয়ে যাবে। সে আগে ধার্মিক খ্রিষ্টান থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই, তাকে মাফ করে দেয়া হবে। এছাড়াও প্লিনি মানুষকে যত্রতত্র বিনাদোষে শাস্তি দেবার ব্যাপারটি নিয়েও খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন। নানান ঘটনা দেখে শুনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে খ্রিষ্টানদের জীবন যাপন মোটেও অপরাধীর জীবনযাপন নয়। বরং তারা খুব শান্তিপূর্ণ কাজেকর্মে অভ্যস্ত। তাদের আদর্শ অত্যন্ত উচ্চমানের। আর তখন প্লিনি তার এই অনুভূতিকে চিঠির মাধমে জনসমক্ষে উপস্থিত করেন। সকলকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে খ্রিষ্টান ধর্ম একটি শান্তির ধর্ম বলেই এত দ্রুত প্রচার পাচ্ছে। নমনীয় না হয়ে এটি যদি মানুষে মানুষে হানাহানি আর মারামারি বাড়িয়ে দিত তাহলে বিস্তৃতির ক্ষেত্রে এর পথ রুদ্ধ হতোই।

ট্র্যাজান প্লিনির আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। খ্রিষ্টানদের যেন অপরাধী হিসেবে বেছে বেছে ধরে আনা না হয় আর তাদের ধর্মান্তরিত করতে বাধ্য না করা হয়, এ ব্যাপারে তিনি আদেশ দেন। ট্র্যাজান বলেন, একমাত্র তারা যদি সত্যি কোনো অপরাধ করে থাকে আর আইনত তাদের শাস্তিবিধান হয় তবেই যেন তাদের শাস্তি দেয়া হয়। (প্রশ্নাতীতভাবে প্লিনি আর ট্রাজানকে আধুনিক যুগে “খ্রিষ্টানদের প্রতি দয়ালু”হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।)

ছোট প্লিনি চিঠিগুলো লেখার পরে খুব বেশিদিন বাঁচেননি। হয়তো তিনি বিথিনিয়ার গভর্নর থাকা অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন।

ডেশিয়া দখলের পরে সেখানে স্বাধীনতা খুব বেশি দিন বজায় থাকেনি। কারণ পূর্বদিক থেকে ক্রমাগত হামলা হচ্ছিল। ডেশিয়ানরা রোমের পুরোনো শত্রু পারথিয়ার কাছে সাহায্য চেয়েছিল, ট্র্যাজান সেটা ভোলেননি। তার উপরে এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে বিশাল উর্বর জমি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আর্মেনিয়া। সেই নিরোর আমলে রোমের সাথে একবার যুদ্ধ হয়েছিল। তারপর থেকে আর্মেনিয়ার সাথে বেশ বুঝেশুনেই চলছিল তারা।

১১৩ খ্রিষ্টাব্দে অবশ্য পারথিয়ার রাজা চোসরইস আর্মেনিয়ায় একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন আর পঞ্চাশ বছরের সাময়িক যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভঙ্গ করলেন। পারথিয়ার জন্য এরকম একটি কাজ করা ছিল সে সময়ে নিতান্তই বোকামি। কারণ কয়েক যুগ ধরেই তারা মোটামুটি বিপর্যয়ের মুখে ছিল। তাদের সিংহাসন নিয়ে কাড়াকাড়ির সাধারণ গ-োগোলে নিজেরাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল আর রোম তখন ছিল পুরোপুরি শক্তিশালী আর সংগঠিত। সত্যি কথা বলতে কী, তার আগের বিশ বছর ব্যাপী রোমান সেনাবাহিনী পুর্বদিকে আগাতে আগাতে আরবের সীমানা পর্যন্ত চলে গিয়েছে। বাণিজ্যিক শহর পেত্রা, জুডিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ আর তার সাথে জুডিয়া আর মিশরের মাঝখানের সিনাই পেনিনসুলা রোম আগেই দখল করে ফেলেছিল এবং ১০৫ খ্রিষ্টাব্দের ভেতরেই আরবীয় প্রদেশে পরিণত করেছে। এটা প্রমাণ করে, পূর্বদিকে রোমের অবস্থান এতটাই পাকাপোক্ত ছিল যে পারথিয়াকে হারিয়ে দেয়া তাদের জন্য তখন কোনো বড় ব্যাপার নয়।

রাজা চোসরইস হয়তো সাথে সাথেই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিরেন। আর তাই দ্রুত ট্র্যাজানকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি খুব দেরি করে ফেলেছিলেন। ট্র্যাজান সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি। তিনি বাহিনী নিয়ে পূর্বদিকে হাঁটা শুরু করেন আর বলতে গেলে একেবারে লড়াইবিহীনভাবে আর্মেনিয়া দখল করে নেন। এটিকে রোমের দূরবর্তী একটি প্রদেশে পরিণত হতে হয়। তার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল আরও দক্ষিণ-পূর্বে অগ্রসর হওয়া। আরও এগিয়ে তারা পারথিয়ার রাজধানী টেসিফোনে পৌঁছে গেলেন। সে শহর দখল করে মেসোপটমিয়ার কাছাকাছি পার্সিয়ান সমুদ্রের তীরে উপস্থিত হন ট্র্যাজান।

এটাই ছিল পূর্বদিকে রোমান সেনাবহরের দূরতম সফর। ষাট বছর বয়সী ট্র্যাজান সমুদ্রের তীরে পার্সিয়া আর ইন্ডিয়ার দিকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাকিয়ে ছিলেন। ঠিক ওইখানে সাড়ে চারশ’বছর আগে অ্যালেক্সান্ডার বিশাল জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। হতাশায় তার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, ‘ইস্ আজ যদি আমার বয়স আরও কম থাকত!’

সেই সময়ে রোমান সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি পেয়েছিল। ১১৬ খ্রিষ্টাব্দে (৮৬৯ রোমান সালে) ট্র্যাজান আসিরিয়া আর মেসোপটোমিয়াকেও রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেন। দুটোই রোমের প্রদেশ হয়ে যায় আর টিগরিস নদী সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের সীমানা হয়ে দাঁড়ায়।

সে সময়ে রোমান সা¤্রাজ্যে একদিকে ১৮০,০০০ মাইল, অন্যদিকে ৩,৫০০,০০০ মাইল রাস্তা দিয়ে ঘেরা ছিল। বলতে গেলে বর্তমান আমেরিকার আয়তনের সমান। তখন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০০,০০০,০০০ এর কিছু বেশি। কেবল রোমেই ছিল ১,০০০,০০০ মানুষ। এখনকার হিসেবেও এটি ছিল একটি বিশাল সাম্রাজ্য। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এ পর্যন্ত যত সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয়েছে (তুলনামূলকভাবে ক্ষণস্থায়ী পারস্য সাম্রাজ্য ছাড়া) তার মধ্যে এটি ছিল বিস্ময়কর। কোনো সন্দেহ নেই, এই সাম্রাজ্য অগাস্টাসের পরবর্তী শতাব্দীর মানুষের মনে এমন ছাপ ফেলেছিল যে সাম্রাজ্যটি স্থাপনের পথে যত মৃত্যু আর হাহাকার ছিল তার সবটা এর বিশালতার কাছে উবে গেছে।

কিন্তু পার্থিয়ানদের হার মানিয়ে রাখা রোমান সাম্রাজ্যের কাছে সহজ ছিল। একবার প্রায় তারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিল। ট্র্যাজান সে সময়ে রোমের ভেতরে কোথাও অরাজকতার খবর পেয়ে সেখানে মনোনিবেশ করেন। পার্থিয়ার দিকে বহুদূর এগিয়েও আবার ফিরে আসেন। ১১৭ খ্রিষ্টাব্দে ট্র্যাজান দক্ষিণ এশিয়া মাইনর থেকে রোমে ফেরার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

 

Facebook Twitter Email