সংস্কৃতির সমন্বয়

Facebook Twitter Email

ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত আলোচনা করলে দেখা যায় তা ধারাবাহিক, সংশ্লেষণমূলক ও ক্রমবর্দ্ধমান। এই ভারতবর্ষের মাটিতে অতীতকালে বহু বিপরীত উপাদানের সমন্বয় ঘটেছিল। ইসলামের আবির্ভাবে বিরোধ ও সমন্বয়মূলক সেই একই প্রক্রিয়া হাজারগুণে বদ্ধিক হয়ে দেখা দিল। এদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ভারতবর্ষের ধম্মীয় ও সামাজিক সংস্থানকে উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর হতে হলো। এমন একটি জীবনদর্শনের মুখোমুখি এসে তাকে দাঁড়াতে হলো যা তারই মত পরিণত ও সুনিদ্দিষ্ট। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তাদের ভেতরকার সংঘাত আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠলো। হিন্দুধর্ম্মের মধ্যে সন্ন্যাসদম্মীর সংসার বিমুখতার প্রশ্রয়- বিশুদ্ধ সত্তার উপর অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে পাথিব ব্যাপারকে তা নিতান্তই অকিঞ্চৎকর ক’রে তুলেছিল। ইসলাম যখন ভারতের মাটিতে প্রবেশ করলো, হিন্দুধর্ম্মের উপরোক্ত  অবস্থাটাকে সে তখন বলবৎ দেখতে পায়। অপরপক্ষে ইসলাম ছিল সন্ন্যাস-বিরোধী এই পৃথিবীতেই তার দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত। জীবন সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল জীবন্ত, সুসংবদ্ধ ও সামাজিক। প্রাচীন হিন্দুধর্ম্মের ধ্যানধারণা এই নবাগত তরুন ধর্ম্মের সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল; শুধু তাই নয়, নতুনের সংঘাতে পুরাতন সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিমূল পর্য্যন্ত নড়ে উঠল।

 

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা ও সংঘাত থেকে যে নতুন কতকগুলো সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল তাদের সমাধান ভারতীয় সংস্কৃতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। হিন্দু ও মুসলমানের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব দেখে প্রথমে মনে হতে পারে যে সমাধান সম্পূর্ণ লাভ করতে পারে নি। কিন্তু যখন লোক সংখ্যার বিস্তৃতির কথা বিবেচনা করা যায়, যখন অনেক বিষয় চোখে পড়ে যেখানে হিন্দুর জীবন ও মুসলমানের জীবনে সংঘর্ষ স্পষ্ট, তখন এই ভেবে বিস্ময়বোধ করি যে দুই সংস্কৃতির মধ্যে আজও সম্পুর্ণ মিলন না ঘটলেও তাদের মধ্যে এতোদূর মিলন ঘটতে পেরেছে। তা ছাড়া আরও বিচার্য যে সমস্ত বিষয়ে উভয়ের মধ্যে সংঘাত তা নিতান্তই জড়পদার্থ নিয়ে। মধ্যযুগের ভারতবর্সের ইতিহাস রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক আধিপত্যলাভের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। বস্তুত, সকল যুগে সকল জাতির ইতিবৃত্তই এই। ধর্ম্মীয় অথবা সাম্প্রদায়িক বিরোধের চিহ্ন তখন প্রায় ছিল না বললেই চলে। মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে মুসলমান হিন্দুর সঙ্গে লড়াই করেছে নিঃসন্দেহ, কিন্তু ধর্মীয় অথবা সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নিয়ে সেই লড়াই খুব কমই বেধেছে; সত্যি কথা বলতে মোটে বাধেই নি। মুসলমান ও মুসলমানের মধ্যে, হিন্দু ও হিন্দুর মধ্যে যেরুপ বিরোধ ঘটেছে  হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেও তেমনি নিয়মিত অথবা অনিয়মভাবে বিরোধ ঘটেছে; বিরোধী পক্ষের কেউ কখনো ধর্ম্মের প্রশ্নকে মনে স্থান দেয় নি।

 

আরবজাতি কর্ত্তৃক সিন্ধুদেশ আক্রমণের পেছনে ব্যাণিজ্যিক প্রয়োজনের প্রেরণা। জগনীর মামুদ তুর্ক-পারসিক সাম্রাজ্যের স্থাপন ও শক্তিবৃদ্ধিকল্পেই ভারতীয় ঐশ্বর্য্যকে কাজে লাগাবার জন্য অভিযান চালিয়েছিলেন। মধ্য এসিয়া থেকে চাপের ফলে আফগানেরা ভারতবর্ষে দলেদলে প্রবেশ করতে লাগল। পূর্ব্বেও ভারতীয় সীমান্তের জনগণের জীবন যেভাবে বিপর্য্যন্ত হয়েছে। এবারেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল। আর্যরাও ঠির একই উদ্দেশ্য ভারতে প্রবেশ করেছিল। হিন্দু রাজরত্বর সময়ে কত অভিযানকারী দল যে এদেশে অভিযান চালিয়েছে তারও সীমাসংখ্যা নেই। আফগান ও তুর্ক আক্রমণগুল পুরাতন কাহিনীরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে নিঃসংশয়ভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে এই নীতি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কার্যকরী হয়েছে। নীতিটি পুরাতনের পুনরাবৃত্তি বটে, তবে একটু তফাৎ আছে। আর্যদের ভারত আগমনের পর আফগানদের আক্রমণের পূর্ব্ব পর্যন্ত যে সমস্ত অভিযানকারীর দল ভারতে প্রবেশ করেছে, তাদের কারও উন্নতধরণের নতুন জনপ্রবাহ এমন সব মানুষ আমদানী করল যারা ইসলামীয় সভ্যতার সারটুকু না হলেও অন্তত বাহিক আচরণগুলোকে গ্রহণ করেছিল। সমস্যা দেখা দিল দুই বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের সমস্যারূপে একের ভেতর অপরের বিলীন হওয়ার সমস্যারুপে নয়।

 

ভারতবর্ষের উপর ইসলামের প্রভাব খুব গভীর ও নিবিড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। পুরাতন চিন্তাধারার সঙ্গে নতুন চিন্তাধারার সংযোগের ফল এই হলো যে যাঁদের মন তীক্ষ্ণও অনুভূতিপ্রবণ, তাঁরা বিশ্বের সনাতন সমস্যগুলো নিয়ে আবার নতুন করে ভাববার তাগিদ বোধ করলেন। প্রাচীন রীতিনীতির অত্যাচার থেকে মানুষের মন হলো মুক্ত। হিন্দু ও ইসলামীয় চিন্তাধারার সংযোগকে চিহ্নিত করবার জন্যে দেখা দিল নতুন ধর্ম্ম, নতুন জীবনবাদ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই উভয় সংস্কৃতির মধ্যে মিলনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে পারে নিএইজন্যে যে স্থানিক ব্যবধান ও দুরধিগমতা তখনো প্রবলরূপে বর্ত্তমান ছিল। রাজধানী ও পল্লীজীবনের মধ্যে চিন্তা ও সংস্কৃতির যোগ তখনও মাত্র আংশিকরূপে বিদ্যমান। নগরগুলোতে অবশ্য এই দুই সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল, মুসলমানের সংখ্যালঘুতার অসুবিধা তার রাজনৈতিক গুরুত্বের দারুন চাপা পড়ে গিয়েছিল। ক্ষুদ্র, সংহত ও মোটের উপর একজাতিবদ্ধ মুসলমান অভিজাত সম্প্রদায় নাগরিক সংস্কৃতিকে একটি বিশিষ্ট রূপ দিলেন। গ্রামাঞ্চলে কিন্তু তা হলো না। যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় স্থানীয় সম্প্রদায়গুলির তাদের স্বতন্দ্র সত্তা অনেকখানি অব্যাহত রাখ্লো। মানুষে সানুষে নিয়মিত অদলবদল কিম্বা বিভিন্ন ভাবধারার নিয়ত বিনিময় না ঘটলে যা হয় তাই হলো : সামাজিক ব্যবস্থার অন্তনিহিত কঠোরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ফলে গ্রামাঞ্চলবাসি মুসলমানেরা হিন্দু জীবনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ল। ধর্ম্মবিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হলেও গ্রামীন সংস্কৃতি মূলত হিন্দুই রয়ে গেল, কেন না মানুষ তার ধর্মবিশ্বাস বদলালেও জীবনযাত্রা বদলালো না।

 

ভারতেরইতিহাসের প্রচলিত পাঠ্যবইগুলোতে বিভেদ ও বিবাদের কাহিনিকেই জীইয়ে রাখা হয়েছে। মিলন ও স্যমঞ্জম্যবিধানের ইতিবৃত্ত হয় বিস্মৃত, নয় তো তাকে আমল দেওয়া হয় নাই। রাজবংশের উত্থানপতনের ইতিহাস, নতুন নতুন বহিঃশত্রুর আক্রমণের গল্প, অত্যাচর লুঠতরাজ ধ্বংসের লোমহর্ষক কাহিনী- এ সবই এযাবৎ আমাদের শোনানো হয়েছে। প্রচলিত ইতিহাসগুলোতে সামাজিক কি সংস্কৃতিমূলক প্রতিষ্ঠানের ক্রমিক বৃদ্ধি বা নতুন নতুন সমাজরীতির আবির্ভাব সম্পর্কে প্রায় কোনো উল্লেখ নাই বললেই চলে। অধিকাংশ হিন্দুই তাই বিশ্বাস করে যে ভারতবর্ষে সভ্যতার যা কিছু লক্ষণ চোখে পড়ে, তার মুল এদেশের প্রাচীন ইতিহাসে প্রোথিত, কাজেই ভারতীয় সভ্যতা বলতে হিন্দু সভ্যতাই বোঝাই। মুসলমানের মনেও এ সম্বন্ধে সন্দেহ ও দ্বিধার অন্ত নেই, কারন বহু শতাব্দী তারা ভারতভুমিতে বাস করেছে, সেই বিস্তৃত সময়ের মধ্যে যদি কোনো যুক্ত বিকাশ না ঘটে থাকে তা হলে তা মানতে হবে ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত হিন্দুর সংস্কৃতি এবং সেইকারণে ইসলামের প্রতিকূল। ভারতীয় সংস্কৃতির গঠনে হিন্দু ও সুমলমান পরস্পরকে সন্দেহ বিদ্বেষ ও ঘৃণার চোখে দেখে। আটশত বছসরেরও অধিক কাল ভয়াবহ মানবিক অপচয় ঘটেছে। এই ব্যর্থতাবোধই বর্তমানের সাম্প্রদায়িক তিক্ততার অন্যতম প্রধান কারণ শুধু থিয়োরির দিক থেকে বিচার করলেও মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের ইতিহাসের এই ব্যাখ্যা অচল। সমস্ত তথ্য আমাদের জানা নেই, তবু একথা জোর করেই বলা যায় যে দুটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি পরস্পরের সংস্পর্শে এলা অথচ নূতন মিলনে ফলপ্রসু হয়ে উঠল না এটা অবিশ্বাস্য। মানুষের ইতিহাসে এইরূপ বন্ধাত্ব অভুতপূর্ব ব্যাপার। আয়তন ও বিস্তারের দিক থেকে হিন্দু সংস্কৃতি ছিল অসাধারণ। যে সময় মুসলমানেরা ভারতে এলা, সে সময়ে হয়ত তার আদিম শক্তি কিছুপরিমাণে কমে এসেছে, কিন্তু তা হলেও তার ভেতর তখনও এমন অনেক কিছু অব্যাহত ছিল যার মূল্য মানুষের মনের কাছে চিরন্তন। এমন সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে মুসলমনরা তার ভারগ্রহণ করবে এটা অবধারিত। এবং যেই অনুপাতে তাদের আত্মিক শক্তি প্রবল উভয়ের মধ্যে সহযোগিতাও ঠিক সেই অনুপাতে ঘটবে এ-ও নিশ্চয়।

 

প্রাচীন ভারতবর্ষের আর্যপূর্ব অধিবাসীরা অভিযাত্রী আর্যদের হাতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই মার খেয়েছিল, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নয়। বরয় তাঁদের উচ্চতর সভ্যতা বিজেতার সাংস্কৃতিক জীবনকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করে গোটা আর্যমনটাকেই বদলে দিয়েছিল। গ্রীস দেশেও দেখি মাইকেনীয় সভ্যতা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়। কিন্তু উচ্চতর গ্রীক (Hellenic) সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে তা পরে আরও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠেছিল। রোমকদের গ্রীসদেশে শুধু রাজনৈতিক আধিপত্য লাভ করলো, কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিজিতের হাতে তাদের পরাজয় ঘটেছিল। ভারতবর্ষেও, রাষ্ট্রনৈতিক শক্তিদ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে মুসলমানরা জয়লাভ করেছিল কিন্তু মানসিক ও আধ্যাত্মিক চর্য্যার ক্ষেত্রে জয়লাভ হয়েছিল উভয়েরই। এই জয়লাভকে ঘনিষ্ঠ ও সুদুরপ্রসারী সহযোগিতা বললে কথাটা আরও ঠিকভাবে বলা হয়।

 

উভয় সংস্কৃতির মিলন প্রচেষ্টার ইতিহাসই মধ্যযুগের ভারতবর্ষের যথার্থ ইতিহাস। সে ইতিহাস বহু ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের ভেতর সহযোগ সাধনের ইতিহাস। এই প্রসঙ্গে রামানন্দ ও কবির, নানক ও চৈতন্যের নাম সহজেই মনে পড়ে। বাংলাদেশে বৈষ্ণব ধর্ম্ম ও মহারাষ্ট্রে ভক্তিবাদের বিকাশ প্রত্যক্ষভাবে ধর্ম্মীয় সংস্কৃতির মিলনের ফল। শুধু যে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেই সহযোগিতামূলক কাজের চেষ্টা দেখা যায় তা নয়। প্রথমে পাঠানদের এবং পরে বিস্তৃতভাবে মোগলদের আমলে, রীতিনীতি, কায়দাকানুন, উৎসব আচার এমন কি খাদ্যপ্রস্তুতি, সামাজিক ও গার্হস্ত্য ক্রিয়াকর্মের বেলাতেও এই রূপান্তর সুস্পষ্টরূপে চোখে পড়ে। পোষাকের বেলায় এমন একটি পরিচ্ছদের প্রচলন হলো যা আরব্য অথবা মধ্যএষিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত। এই সময়ে আর একটি ব্যাপার ঘটল সে হচ্ছে নতুন ভাষার বিকাশ। সেই ভাষা আজও নানা জায়গার নানা জাতির ভারতীদের মধ্যে ভাববিনিময়ের বাহনরূপে কাজ করে যাচ্ছে। আর বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় সমৃদ্ধ সাহিত্যগুলো মধ্যযুগীয় ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশকেই শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আমরা সেই একই মিলন ও সামঞ্জস্য বিধানের লীলা দেখতে পাই।স্থাপত্যে ও ভাস্কর্য্য, সঙ্গীতে ও চিত্রকলায়, সামাজিক আচারে ও লৌকিক বিশ্বাসে পুরাতন ও নতুনের সমন্বয় এমন সব নতুন ধারার প্রবর্ত্তন করল যার মধ্যে উভয়ের দানই ওতপ্রোতভাবে বিধৃত হয়ে আছে। এক কথায় ভারতীয় প্রতিভাবিকাশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমান ও হিন্দুর মনোভাব এমন ভাবে পরস্পরে মিশে গিয়েছিল যে যাঁরা আজ হিন্দুসংস্কৃতি অথবা মুসলমান ঐতিহ্যের নির্ভেজাল পবিত্রতা নিয়ে গর্ব করেন তাঁদের ঐতিহাসিক জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি শোচনীয় ভাবে সীমাবদ্ধ। বাবর যে সময়ে রাজত্ব করে গেছেন, মুসলিম অভ্যুদয়ের সেই পূর্বাহ্নে এই পারস্পরিক গ্রহিষ্ণুতা এতোদুর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল যে বাবর এটাকে একটি অভিনব জীবনপদ্ধতি বলে অভিহিত করে গেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন হিন্দুস্থানী পদ্ধতী।

 

দর্শন ও অর্থনীতির ক্ষেত্র প্রথম দৃষ্টিতে পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিশিষ্ট বলে মনে হলেও এই দুই ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সহযোগিতার নির্ভুল প্রমাণ পাওয়া যায়। বস্তুত ভারতীয় হিন্দুর বর্ত্তমান দৃষ্টিভঙ্গির  কতকটা অংশ বেদ-উপনিষদ থেকে আহৃত কতকটা অংশ ইসলামের শিক্ষা থেকে নেওয়া সে সম্বন্ধে ঠিক করে কিছু বলা কঠিন। ঠিক একই ভাবে, আচার আচরণে বিশ্বাসে ও বিধিতে ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রভাবের প্রমাণ মেলে। ভারতবর্ষে প্রভাব যে শুধু মাত্র ভারতীয় মুসলমানের ক্ষেত্রেই নিবদ্ধ ছিল তা নয়, তা পারষ্য ও আরবের মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকেও প্রভাবিত করেছিল। বৌদ্ধ চিন্তার ধারা সুদুর মিশর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। পন্ডিতদের মধ্যে কেউ কেউ বৌদ্ধদের প্রথম দিকের রচনা ও নির্দ্দেশের মধ্যে বাইবেলের Sermon on theMount-এর সূত্র আবিষ্কার করেছেন। এসেনীয়দের কখনও কখনও এসিয়ামাইনরবাসী বৌদ্ধ সম্প্রদায় বলে মনে করা হয়। সুফিবাদের মূল অবশ্য কোরানে নিহিত, কিন্তু ভারতীয় চিন্তাধারার দ্বারা তা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছে। খৃষ্টধর্ম, নব্যপ্লেটোবাদ, জরথ্রষ্টের ধর্ম ও অদ্বৈতবাদ, এর বিকাশে সহায়তা করেছে বটে কিন্তু সুফিবাদ বাহ্যিকভাবে সব চাইতে বেশি প্রভাবিত হয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনদ্বারা। তা যদি না হতো তবে এর বিশুদ্ধাত্বার মধ্যে ব্যক্তিসত্তাকে ডুবিয়ে দেবার সাধনা আমরা বোঝাতে পারতুম না। আমরা জানি মুসার কাল থেকে আরম্ভ করে সেমিতিক ধর্মের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, ব্যক্তিসত্তা বিলাপের এ সাধনা তার বিরোধী।

 

মানসিক প্রভাবের ক্ষেত্রে দেওয়া নেওয়াটাই নিয়ম। একদিকে যেমন ভারতীয় চিন্তাধারা সুফিবাদকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করেছে অপর দিকে তেমনি সুফিবাদও হিন্দুর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির উপর সুদুর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। শঙ্করের বেদান্তের উপর কোন বাহিক্য প্রভাব থাকতে পারে একথা খুব কম লোকেরই মনে হবে। তা হলেও এ-কথা ভাববার কারণ আছে যে তৎকালীন ভারতীয় চিন্তাপ্রণালীর সঙ্গে ইসলামের সংঘর্ষে যে দার্শনিক পরিস্থিতি, শঙ্করকে তা প্রভাবিত করেছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসের সুরু থেকে হিন্দু চিন্তার নতুন নতুন আন্দোলন, ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের নতুন নতুন সংস্কার সবই ঘটেছে উত্তর ভারতে। আট শতকের প্রারম্ভ থেকে কিন্তু হঠাৎ একটা বৈপ্লবিক পরিবত্তন দেখা গেল। ভারতীয় চিন্তা ও জীবনের নেতৃত্ব হাত বদল হয়ে চলে গেল দাক্ষিণাত্যে। শঙ্কর ও রামানুজ, নিম্বাদিত্য ও বল্লভার্চয্য- সবাই দক্ষিণ ভারতের লোক। এই দক্ষিণ ভারতেই বৈষ্ণব-ধর্ম ও শৈবধর্মের উত্থান ও সমৃদ্ধি। উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের মধ্যে এই আকস্মিক রূপান্তরের সবটুকু ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বস্তুত, জাতীয় কর্মধারার এই আকস্মিক কেন্দ্র পরিবর্তন ইতিহাসের পন্ডিতদেরও বিভ্রান্ত করেছে। সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে দক্ষিণভারতে ইসলামের অভ্যুদয়ের সঙ্গে যদি আমরা উপরোক্ত ঘটন্রক মিলিয়ে দেখি তা হলে বোধহয় সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত মেলে।

 

ভারতের মাটিতে ইসলামের প্রবেশ সর্ব্বপ্রথম ঘটে দাক্ষিণাতে। মহম্মদ বিন কাশিম কর্তৃক সিন্ধুবিজয়ের অনেক আগে থেকেই আরব্য বণিকরা ত্রিবাঙ্কুরবাসীদের সংস্পর্শে  এসেছিল। এই শান্তিপূর্ণ প্রবেশের ক্রিয়া এতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল যে মালাবারের চেরামন পেরুমাল বংশীয় সর্বশেষ রাজা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, শুধু তাই নয়, রাজ্য ছেড়ে মক্কায় তীর্থ করবার জন্যেও গিয়েছিলেন। কালিকাটোর জামোরিনের উপাধি এই কাহিনির সত্যতা প্রমাণ করে। আজ পর্যন্ত মোপলার উপস্থিতি ছাড়া জামোরিনের রাজ্যাভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে না। শঙ্করের জন্মস্থান কলাদি ছিল এমন একটি ক্ষুদ্ররাজ্যের অন্তর্ভুক্ত যার রাজাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই ধমৃান্তরগ্রহণের দৃষ্টান্তগুলি যে সামরিক বিজয়ের ফলেই ঘটেছে এমন মনে করার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। রাজা ধর্মবিশ্বাস পরিবর্ত্তন করায় রাজ্যের সমস্ত লোক যে ধর্ম্মান্তর গ্রহণ করেছে তারও প্রমাণের অভাব। তবে, মুসলিম ভাবধারা দক্ষিণভারতের তদানীন্তন জীবনের উপর কী পরিমাণ ও কতোদূর প্রভাব বিস্তার করেছিল ধর্মান্তর গ্রহণের দৃষ্টান্তগুলো তারই একটা হদিস দেয়।

 

দুই চিন্তাপ্রণালীর সংষ্পর্শ ও সংঘাত ব্যক্তিমানসে নতুন নতুন প্রশ্ন জাগিয়ে তুললো। শঙ্করের মতো তীক্ষ ও বণিষ্ঠ মেধাসম্পন্নলোক যে এই বিদেশী চিন্তাপ্রণালীর দ্বারা আকৃষ্ট হবেন ও তা থেকে তাঁর মানসিক গঠনের উপযোগী উপকরণ সংগ্রণ করবেন এটা স্বাভাবিক। উত্তর ভারতের প্রাচীণ ধর্মবিশ্বাস ও বিশ্ব দৃষ্টি ছিল সংশ্লেষণমূলক, শিষ্ট ও ধ্যানগম্বীর। দক্ষিণ ভারতের নতুন জীবনদর্শন আবেগের প্রাচুয্য ও মর্খের উপর জোর দেওয়ার ফলে আক্রমণাত্মক ও প্রবল হয়ে দেখা দিল। উত্তরের নিষ্ক্রিয়, আত্মকেন্দ্রিক ও প্রধানত বুদ্ধিদীপ্ত মানসিক গঠন সহসা এমন একটি বৈপ্লবিক প্রাণচাঞ্চল্যে রূপান্তরিত হলো যেখানে বুদ্ধি আবেগের যন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। শঙ্করদর্শনের প্রত্যেকটি বিষয় স্বতন্ত্রভাবে হয়ত পুরাতন ঔপনিষদীয় সূত্র থেকে আহৃত কিন্তু তাঁর দর্শনের ভাব ও আকার নতুন এভাবের সক্রিয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। শঙ্করের আগ্রহ ও উদ্দীপনাজনিত প্রভাব আবিস্কর কলা কি শুধুই কল্পনা?

 

ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে যে কয়জন সবচাইতে উল্লেখযোগ্য, নানাদিক থেকে একটা তাঁদের একজন। তাঁকে ভুদ্ধমাত্র ভারতীয় চিন্তাধারার সন্তান রূপে বর্ণনা করার একটা রেওয়াজ দাঁড়িয়ে গেছে। বস্তুত, একথাও বলা হয় যে তিনি বৌদ্ধধর্ম্মের উদার অথচ অসদৃশ শিক্ষার বিরুদ্ধে গোঁড়া ব্রহ্মন্যধর্মী ঐতিহ্যের জয়ধ্বজা তুলে ধরেছিলেন। এমনও বলা হয় যে তিনি বিশ্বের অবান্তবর্তার (মায়াবাদ) নীতিকে যুক্তির পথে এতো চরমে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন যে সাংসারিক সুনীতি ও ন্যায়পরায়ণতার স্থান তাতে ছিলনা। আপাতদৃষ্টিতে, শঙ্করের বিশুদ্ধ অবৈতবাদ পৃথিবীকে নিছক মায়া জ্ঞানে বরবাদ করতে চায় বলে মনে হয়: কিন্তু পৃথিবী যদি শুধুই মায়া হতো তা হলে পার্থিব ক্রিয়াদির কোনো অর্থই থাকত না। সেই ক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা যে জীবনকে বন্ধন বলে মনে করে এবং ‘তনহা’ (আকাক্সক্ষা) দমনের দ্বারা সেই জীবন থেকে মুক্তির জন্যে মানুষকে চেষ্টা করতে বলে তার বিরুদ্ধে আপত্তি করারও কিছু থাকত না। যাঁরা শঙ্করকে মায়াবাদের প্রবত্তক বলে মনে করেন, তাঁরা পর্যন্ত একথা স্বীকার না করে পারেন না যে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের নির্ব্বণ তত্ত্ব ও তজ্জনিত নিষ্ক্রিয়তার বিরোধী।

 

ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসে শঙ্করের সব চাইতে গুরুত্ব হলো এই জন্যে যে তিনি বৌদ্ধ তত্ত্বজ্ঞান (metaphysics) কে তার স্বক্ষেত্রে নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম্মাবলম্বীদের মতন তিনিও পৃথিবীর আধ্যাত্মিক সত্তাকে অস্বীকার করেছিলেন। নিছক জড়বাদ থেকে যে স্ববিরোধীতার উদ্ভব হয়, তাও তিনি দেখিয়েছিলেন। সাধারণ অভিজ্ঞাতার স্বতোবিরোধ থেকে বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বীরা এই অনুমান করলেন যে অভিজ্ঞতা জিনিষটাই অবাস্তব। কিন্তু শঙ্কর দেখালেন যে এই অনুমান যুক্তিনির্ভর নয়, অবাস্তবের প্রতয় নিজেই স্ববিরোধী। তিনি অবাস্তবতার ধারণার বদলে অনির্ব্বচনীয়তা বা রহস্যময়তা ধারনা প্রতিষ্ঠিত করলেন। যে সমস্ত বস্তুকে আমরা মায়া বলে মনে করি তারাও শঙ্করের মতানুসারে, শেষ পর্যন্ত ‘অনির্ব্বচনীয় বা ‘রহস্য ছাড়া আর কিছু নয়। এইভাবে শঙ্কর তত্ত্বজ্ঞানের ক্ষেত্রে বুদ্ধের দানের মহিমা স্বীকার করে নিলেন কিন্তু তিনি সেই সঙ্গে এটাও দেখলেন যে বৌদ্ধ দর্শনের নিঃশেষ নৈরাজ্যবাদ সাধারণ মানুষের নীতিবোধের ভিত্তিমূল পর্যন্ত নষ্ট করে দেয়। তিনি তাই বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের  মতবাদ এ পর্যন্ত মেনে নিলেন যে ভাব বা প্রথ্যয় (idea) হলো  যথার্থ মধ্যগত সত্তা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের উল্টো কথা বললেন এই যে, এই ভাব হলো একটি চিরন্তন, চিরস্থায়ী বাস্তব সত্তা,- পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুর অস্তিত্বের অন্তনির্হিত আধার। যেহেতু এই ভাব ‘মায়ার’মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত ও রূপায়িত, সেই হেতু সমস্ত অভিজ্ঞতাই আবার আপেক্ষিকভাবে সত্য। যতোদিন পর্যন্ত মানুষ পরমজ্ঞানের সাহায্যে বাস্তবিক না বোঝে যে ‘ব্রহ্ম সত্য জগম্সিথ্যা’ততোদিন সবই সত্য থাকে ও মানুষেরও তাদের সত্য বলে গ্রহণ করতে হয়।

 

এই বৌদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানকে স্বীকার করে নেওয়ার সঙ্গে শঙ্কর বৈদিক ক্রিয়াকর্মও ব্রহ্মবিদ্যাকেও মেনে নিলেন এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ক্রিয়াকলাপ অবশ্য প্রয়োজনীয় বলে রায় দিলেন। তিনি পূজার্চ্চনা ও ধ্যানাদির কার্যকারিতা নিব্বিশেষে স্বীকার করলেন ও তাকে গ্রহণ করলেন। ধরাছোঁয়ার বস্তু ব্যতিরেকে সাধারণ মানুষ ধ্যানে তৃপ্ত হয় না এই স্বীকৃতি ও জীবনের সকল কাজে ভক্তির স্থান- দুইই তিনি মেনে নিলেন। এই সমন্বয়কে দেশের জনসাধারণের মধ্যে সাধারণ মতবাদ হিসাবে প্রচার তাঁর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দান।

 

শঙ্করের দর্শন ও শিক্ষার তৃতীয় উপজীব্য হলো তাঁর কর্ম্মযোগ। তিনি তার শুধু প্রচারই করেন নি, কাজে খাটিয়ে দেখিয়েও গেছেন। শঙ্কর কর্মের বিরোধী ছিলেন এই ভ্রান্ত ধারণা আমাদের মনের মধ্যে এমন বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে একথা আমরা ভেবে দেখি না যে তা যদি সত্য হয় তো তিনি যে তত্ত্বজ্ঞানকে ভয়ানকভাবে আক্রমণ করেছিলেন যুক্তিযুক্তভাবে সেই বৌদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানেরই শিষ্যত্ব তাঁকে গ্রহণ করতে হয়। ফলত তিনি বারবার ঘোষণা করেছেন যে শাস্ত্রকথিত বিভিন্ন আচারকে কোনোক্রমেই লঙ্ঘন করা চলবে না বরং প্রাথমিক অধ্যায় গুলোতে তার প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। শঙ্করের জন্মকালে দেশে দেশে যে বিকৃত হিন্দুত্ব বিকৃত বৌদ্ধধর্ম্মের প্রচলন, তাতে কর্ম্মকে বরবাদ করা হয়েছিল। হয়ত তারই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ শঙ্কর কর্ম্মযোগের উপর জোর দিয়ে থাকবেন। গীতার বাণী থেকেও এই উপাদান সংগৃহীত হয়ে থাকতে পারে। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন শঙ্করের কর্ম্মবাদের আরেকটি, এবং অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য কারণ রয়েছে। সেটি হচ্ছে,শঙ্করের জন্মভূমিতে ইসলামের আবির্ভাব ও প্রতিপত্তি। শঙ্কার সর্ব্বদাই ব্রহ্মের ঐক্যের ধারণা ও কর্ম্মবাদের উপর জোর দিয়েছেন- তাতেই মনে হয় যে ইসলামের সঙ্গে তার গোপন একাত্মতা ছিল। যে কথা শুধু আশ্চর্য্য নয়, চমৎকারও বটে।

 

ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে শঙ্করের মূল্য এইদিক দিয়ে যে তাঁর জীবন ও বাণী সংস্কৃতির মিলনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই মিলনকে আমরা ভারতীয় ভাবধারার একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট বলে মনে করে থাকি। হিন্দুধর্ম্ম ও বৌদ্ধধর্ম্মের সবসেরা জিনিসগুলোকে তিনি তাঁর শিক্ষার অঙ্গীভুত করে নিয়েছিলেন এবং এমন একটি ব্যবহারিক জীবনবাদের জন্ম দিয়েছিলেন যা দেশের সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান দুটি ধর্ম্মের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের দ্বারা হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বীর মধ্যেকার গৃহবিবাদকে দুর করেছিলো। এ ছাড়া তিনি তাঁর যৌগিক মতবাদের ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা সেই সমস্ত উপাদান গ্রহণ করেছিলেন যা দেশীয় ভাবধারার সবচাইতে উপযোগী। তাঁর চরম অদ্বৈতবাদ যে কোনো আকারে দ্বৈতবাদকে অস্বীকার, অপৌরুষের শাস্ত্রের প্রামাণিকতার সূত্রে অদ্বৈতবাদকে প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা তাঁর নিজেই কাজকে অপৌরুষের সত্যের মৌলিক পবিত্রতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হিসেবে জ্ঞান করা- এ সমস্ত জিনিষই ইসলামের শিক্ষাকে প্রবলভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর জন্মের অব্যবহিত পূর্ব্বে তাঁর দেশে ইসলাম জীবন্ত শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিল এই ঘটনার সঙ্গে যদি আমরা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃষ্যকে মিলিয়ে দেখি তা হলে এই নূতন ধর্ম্মবিশ্বাসদ্বারা তিনি প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক মনে হয়।

 

এইভাবে শঙ্কর সংস্কৃতির মিলন-প্রচেষ্টার ভিত্তিস্থাপন করলেন। সেই প্রচেস্টাই হলো মধ্যযুগের ভারতবর্ষের ধর্ম্মীয় ইতিবৃত্ত। রামানন্দ ও কবির, নানক ও দাদু, চৈতন্য ও তুকারাম, সবাই সেই ঐতিহ্যের ধারা বেয়ে চললেন, কিন্তু এই মিলন-প্রচেষ্টার সব চাইতে উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো এই যে তা অতীত থেকে বিযুক্ত বা বিচ্ছিন্ন নয়। নূতন উপাদান পুরাতন উপাদানের সঙ্গে এমন সুকৌশলে ও সূক্ষ্মভাবে মিশে গেছে যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচেষ্টার ঐক্য ও ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রয়েছে।

 

মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সেই একই বিরোধ ও সমন্বয়ের ইতিহাস। নূতন বিজয়ের ফলে এক অভিনব সামন্ততন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছিল। তার ফলে পুরাতন কৃষিব্যভস্থার পরিবর্ত্তন দেখা দেয়। আটঘাঁট বাঁধা পুরাতন ব্যবস্থা সত্ত্বেও স¤্রাট আলাউদ্দিন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য বেঁধে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। সে চেষ্টা অসম্পূর্ণ হলেও তারমধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে সমাজচেতনার ইঙ্গিত মেলে। মুহাম্মদ তুঘলকের চামড়ার নোট প্রচলনের অকাল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল বটে কিন্তু তাতেও মুদ্রার যে নিজস্ব যথার্থ কোন মূল্য নাই, তা বিনিময়ের বাহন মাত্র, তারই ক্ষীণ চেতনার আভাস পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের এই পারস্পরিক মিলন ইতিহাসের যত্নবান ছাত্রের চোখ এড়ায় নাই। ধনতন্ত্র ও একজাতিশাসিত রাষ্ট্রের (Nation-state) মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আমরা লক্ষ্য করি, কিন্তু ভারতের ইতিহাসের বেলায় সেই সম্পর্কের কথা আমাদের মনে হয় না, মনে হলেও তাকে আমরা আমল দিই না। যে-পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে আকবর একপ্রকার তাঁর নিজের অজ্ঞাতসারেই এ দেশে ধনতন্ত্রের অভ্যুদয়ের পথ প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন তা কারও চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। শেরশাহ্ ভূমিব্যবস্থার নতুন সংগঠন সুরু করেছিলেন। আকবরের আমলে তার সমাপন হয়। এ পরিণতি ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থার দ্বারা সামন্ততন্ত্রের ভবিষ্যত উচ্ছেদের সম্ভাবনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই প্রক্রিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ হয় নাই। প্রাকৃতিক শক্তির প্রভুত্ব ও ব্যবহার তার প্রাথমিক সর্ত্ত, তখন পর্য্যন্ত সেই প্রথম সর্ত্তটীই পূরণ হয় নাই।

 

যেমন বিভিন্ন কালে বিভিন্ন জায়গায়, তেমন মধ্যযুগের ভারতবর্ষেও ভ্যক্তির বা দলের সংঘর্ষ বৈষয়িক কারণেই ঘটেছে। সেসময়কার একটি উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা দ্বারা এই ব্যাপারটির প্রমাণ করা যেতে পারে। মধ্য এশিয়ার সামাজিক ও ভোগোলিক অবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন ভারত-অভিযানের যোগ ছিল, সে কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আরেকটি ঘটনার প্রতি যথাযোগ্য মনোযোগ দেওয়া হয় নাই। সেটি হলো মধ্যযুগের ভারতবর্ষে রাজপুত শক্তির আবির্ভাব ও স্থায়িত্বকাল। সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা চলে, অষ্টম শতাব্দীর আগে ও ঔরঙ্গজেবের যুগের পরে ভারতের ইতিহাসে রাজপুতদের প্রভাব অতি সামান্য। কিন্তু এই প্রায় হাজার বৎসরের ইতিহাসে তারাই সব চাইতে বেশি আধিপত্য করে গেছে। অন্যাণ্য  ভারথীয় দল ও রাজ্যের তুলনায় তারা সংখ্যায় স্বল্প ও রাজনৈতিক শক্তিতে হীন হলেও এটা ঘটেছে। অষ্টম শতাব্দীর আগে পর্য্যন্ত ভারতীয় রাষ্ট্রনীতির শক্তিকেন্দ্র গঙ্গার তীর দেশেই সঞ্চরণ করেছে। অশোকের সময় থেকে হর্ষবর্দ্ধনের আমল পর্য্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব পূর্ব্বদিকেই সীমাবদ্ধ ছিল। অষ্টম শতাব্দী থেকে কিন্তু একটি উল্লেখযোগ্য পরিবত্তন চোখে পড়ে। দেখা যায় শক্তিকেন্দ্র পূর্বদিক থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রায় হাজার বৎসরকাল ধরে দিল্লীর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই সময়টিই রাজপুতশক্তির মহিমা ও বিকাশের কাল।

 

ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থানচ্যুত হওয়ার জন্যেই বোধ হয় এই ব্যাপার ঘটেছে। অষ্টম শতাব্দীর আগে পর্য্যন্ত ভারতের বানিজ্যিক পথ সবই পূর্ব্বাভিমুখী ছিল। ভারতীয় উপনিবেশ ও সমুদ্রপারের পত্তনগুলো অবিস্থিত ছিল পূর্ব্বদিকে। সুদূর চীন ও জাপানের সঙ্গে সংযোগ ছিল ব্যাপক ও অবিচ্ছিন্ন। ইউরোপের সহিত বাণিজ্যের উল্লেখও অবশ্য আছে, কিন্তু প্রাচ্যখ-ের বাণিজ্যের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। ফলে এই হয়েছিল যে সমুদ্রপারের দেশগুলো থেকে যে অর্থ দেশে আসতো তার প্রভাবে ভারতের রাজনৈতিক জীবন পূর্ব্বঞ্চল অবলম্বন করে ছিল। সপ্তম শতাব্দী থেকে এই অবস্থার পরিবর্ত্তন ঘটলো। আরব্য শক্তির অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষ ও প্রতীচ্যের মধ্যে এক নতুন সামুদ্রিক বাণিজ্য সুরু হল। ব্যণিজ্যিক স্বার্থের জন্য আরববাসীরা সপ্তম শতাব্দী থেকে দক্ষিণ ভারতের সংস্পর্শে এসেছিল। বাণিজ্যিক কারণে অষ্টম শতাব্দীতে তারা সিন্দুদেশ আক্রমণ করেছিল, এ-কথাও আমরা আগেই বলেছি। গুজরাট এই বাণ্যিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো। পশ্চিম থেকে অর্থ-সম্পদ ক্রমেই ভারতে আসতে লাগল।

 

রাজপুতরা যেসময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো ঠিক সেই সময় থেকেই ভারতীয় বাণিজ্যের অবস্থান্তর দেখা দেয়। এই দুটি ব্যঅপারের মধ্যে আপাতযোগ রয়েছে বলে যে অনুমান হয় সেই অনুমান আরও সুদৃঢ় হয় এইকারণে যে রাজপুতানা দিল্লী ও গুজরাটের অন্তর্ব্বত্তী বাণিজ্যপথের ঠিক উপরে অবস্থিত। অবস্থা এমন হলো যে এই পথের উপর আধিপত্য সমগ্র উত্তরভারতের উপর আধ্যিপত্যবিস্তারের চাবিকাটি হয়ে দাঁড়ালো। এই অঞ্চলের উপর প্রভুত্বস্থাপন নিয়ে বিভিন্ন রাজপুত সামন্তরাজাদের মধ্যে যে বিবাদ তা দিয়েই কাহিনীর সুরু। শীঘ্রই রাজপুত সামন্তরাজাদের বিবাদ উবে গিয়ে কলহটা দাঁড়াল মেবার ও দিল্লীর মেধ্য। আলাউদ্দিনের সময় থেকে আকবরের আমলে পর্যন্ত ভারতেতিহাসের ধারা এই সংগ্রামকে কেন্দ্র করেই আবর্ত্তিত হয়েছে। সংগ্রামে হয়ত অনেক সময়ই ধম্মীয় কিন্বা সাম্প্রদায়িক জিগির তোলা হয়েছে, কিন্তু সংঘাতের মূল ছিল আরও গভীরে। প্রধান বাণিজ্যপথকে আয়ত্বকরণ ও তা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক জীবনের উপর আধিপত্য স্থাপন। নিঃসন্দেহে এইটেই ছিল আসল উদ্দেশ্য।

 

হঠাৎ রাজপুতশক্তির স্তিমিত হয়ে আসাও সমান উল্লেখযোগ্য। রাজসিংহের বিরুদ্ধে ঔরঙ্গজেবের অভিযানের মধ্যে এই ঘটনার তাৎপর্য পাওয়া যাবে না। দিল্লী ও মেবারের মধ্যেকার পুরাণো সংগ্রামের তুলনায় আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যুদ্ধের ফল আরও বেশি অনিশ্চিত। আলাউদ্দিন ও বাবরের হাতে এর চাইতে অনেক বেশি শক্ত মার খেয়েও রাজপুতশক্তি নিশ্চিহ্ন হয়নি। আকবর রাজপুতদের পোষ মানাবার আকাক্সক্ষায় ও নিজ সাম্রাজ্যের প্রসার ও রক্ষণের উদ্দেশ্যে তাদের শক্তিকে নিয়োগ করবার জন্যে সামরিক চাপ প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সহিত বন্ধুত্বও স্থাপন করলেন। কিন্তু তিনিও তাদের শক্তিকে নির্ম্মূল করতে পারেন নাই। রাজপুত জীবনসন্ধ্যার কারণ তাই অন্যত্র খুঁজতে হবে। এ মনে করা বোধ হয় অকারণ হবে না। যে রাজপুতশক্তির অভ্যুত্থানের মতন রাজপুতশক্তির পতনও ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র নতুন করে বদলাবার ফলেই ঘটেছে, পুর্ব্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মালায়ের সঙ্গে ভারতবর্ষের যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল আরবদেশের সহিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক যখন তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো, গুজরাট ভারতের সর্ব্বপ্রধান ব্যভসায়ের বাজারে রূপান্তরিত হলো এবং সেই সঙ্গে রাজপুতানাও সাময়িক শক্তিতে প্রধান হয়ে উঠলো। উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যখন ভারতে আসার সামুদ্রিক পথ আবিষ্কৃত হলো এবং কালিকট ও ভারতের পূর্ব্ব উপকূলে বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপিত হলো তখন গুজরাটের গুরুত্ব গেল কমে এবং তারি সঙ্গে রাজপুতদের প্রাধান্যও খর্ব্ব হলো। মহারাষ্ট্রীয় শক্তির অভ্যুত্থান এই নূতন পরিস্থিতির সমসাময়িকরূপে দেখা দিল। ভারতের সঙ্গে ফিরিঙ্গি, ওলন্দাজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার ফলে পশ্চিম ঘাট পূর্ব্বতাঞ্চলের উপর আধিপত্যবিস্তার ভারতীয় অর্থনিীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। ইউরোপীয় বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক জীবন নতুন খাতে প্রবাহিত হতে সুরু করলো। এবং রাষ্ট্রনৈতিক জীবনের কেন্দ্র স্থানচ্যুত হয়ে মান্দ্রাজ ও কলকাতায় সরে এলো। এর ফল হলো এই যে শীঘ্রই রাজপুত ও মারাঠীদের রাজনৈতিক গুরুত্ব একেবারে স্তিমিত হয়ে এলো। মারাঠীরা তবু আরও একশো বছর লড়াই চালিয়ে গেলো, কিন্তু যখন ফিরিঙ্গি ও ওলন্দাজদের বদলে ফরাসী ও ইংরেজরা ইন্দো-ইউরোপূয় বাণিজ্যের প্রধান বাহক হয়ে দাঁড়ালো, তারাও ক্রমে ক্রমে মিইয়ে এলো। বোম্বাই বন্দরের পত্তন হওয়ার অবশ্য এইটুকু ভরসা জাগলো যে শক্তি হিসেবে তারা কখন একেবারে মুছে যাবে না। দিল্লীশ্বরের বিরুদ্ধে রাজপুত ও মারাঠীদের সংগ্রামকে প্রায়ই হিন্দুমুসলমানের মধ্যে সম্প্রদায় ও ধর্ম্মঘটিত কলহরূপে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু উপরের বিশ্নেষণ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে বৈষয়িক স্বার্থসংঘাতের ফলেই সাধারণত কলহের সূত্রপাত হয় এবং এর সঙ্গে মাঝে মাঝে যে ধর্ম্ম কিন্বা সংস্কৃতিঘটিত প্রশ্ন জড়িয়ে যায় সেটা নিতান্তই আকস্মিক ও অবান্তর। রাজপুত ইতিবৃত্তকে এর জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ মনে করা যেতে পারে।

 

ঐক্য ও ধারাবাহিকতার প্রেরণা ভারতের শিল্পকলার সর্ব্বতোমুখী বিকাশের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। বিভেদের মধ্যে ঐক্য এই নীতির উপরই ভারতীয় শিল্পকলার ভিত্তি। ধর্ম্মের ক্ষেত্রে এই নীতি মনকে সমস্ত বাহ্যিক ঘটনার বিমূর্ত্ত রূপের দিকে আকর্ষণ করেছে। অনির্ব্বচনীয় আবেগের মধ্যে ভগবানের সঙ্গে ব্যক্তির একাত্মবোধ অনুভব তার সাধন পদ্ধতির লক্ষ্য। সেই অন্তনিহিত ঐক্য সাধনের পরে পার্থিব বিষয়ে মনোনিবেশে বাধা ছিলনা। ঘটনার বৈচিত্রকে একটি মূল ঐক্যের বিভিন্ন তাৎপর্য্যময় প্রকাশরূপে ভাবা সহজ। স্থাপত্য হলো নিরেট বস্তুপুঞ্জর সাহায্যে এই চেতনার রূপায়ন। মন্দিরের বহিরঙ্গে রূপের  প্রাচুর্য্য! শূন্যস্থান কোথাও এতোটুকু চোখে পড়ে না। বিচিত্র কারুকার্য্য ও অলঙ্করণের সীমাহীন ব্যাপ্তি। সেই সত্যস্বরূপেরই প্রকাশ যা রূপাতীত, যার ভেতর সমস্তরূপই সূক্ষ্মভাবে বিধৃত হয়ে আছে। এদিকে মন্দিরাভ্যন্তর একটি ছোট্ট অন্ধকার কুঠরীমাত্র- তাতে এক চিলতে আলো ঢোকে কীনা সন্দেহ। সেখানে মানুষের আত্মাকে চিরন্তন রহস্যের মুখোমুখি একা গিয়ে দাঁড়াতে হয়।

 

বিশুদ্ধ হিন্দুরীতির স্থাপত্যের দৃষ্টান্ত প্রধানত দাক্ষিণাত্যেই চোখে পড়ে। এর অর্থ এ নয় যে দক্ষিণী বলে কোন একটি বিশেষ রীতি আছে। এতে শুধু এই বোঝায় যে বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য সত্ত্বেও দক্ষিণী সৌধগুলির পরিকল্পনা ও গঠনপ্রণালী মূলত এক। উত্তর ভারতের সৌধগুলি সম্পর্কে ও একথা খাটে। পৃথিবীর অপরাপর দেশের অনুরূপ স্থাপত্য রীতি থেকে  এদেশের স্থাপত্যরীতির এখানেই তফাৎ। উত্তর ভারতে মধ্যযুগে যেসব হর্ম্ম্য, দুর্গ ও সমাধি নির্ম্মিত হয়েছিল তাদের ভেতর পারসিক প্রভাবের চিহ্ন পাওয়া যায়, কিন্তু পারসিক ভঙ্গি সহিত সৌসাদৃশ্য সত্ত্বেও তাদের ভেতর এমন কিছু ছিল যা পারসিক স্থাপত্য কলার আদর্শের অজ্ঞাত। পারসিক ধাঁচ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হলেও প্রাচীনভারতের ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল তাদের সত্যিকার মূল।

 

দাক্ষিণাত্যের মন্দিরগুলিতে সর্ব্বত্রই সরল রেখার আধিপত্য। রেখা ও কোণের সাহায্যে মিলিত রচনা হ’লো সমস্ত কারুকার্য্যরে ভিত্তি। এই মন্দির-স্থাপত্যকলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য  লক্ষণ হ’লো এর অতিম-নমূলক ভাস্কর্য্য। প্রত্যেকটি স্তম্ভই নিরেট প্রস্তুরস্তূপ থেকে উৎকীর্ণ ও বিচিত্র কারুকার্য্যদ্বারা খচিত। বৈচিত্র্য এতো অধিক যে একই বিষয়বস্তু পুনরাবৃত্তি প্রায় চোখে পড়ে না। কাঞ্জিভরমের বিখ্যাত মন্দিরে প্রায় হাজারটি স্তম্ভ আছে। কিন্তু একটি স্তম্ভও অন্য আরেকটির অনুরূপ নয়। সিংহাচলের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র মন্দিরে পর্যন্ত স্তম্ভসকল পরস্পর থেকে বিভিন্ন ও তাদের প্রত্যেকের সুর আলাদা। রূপের প্রাচুর্য্য ও আড়ম্বরের সাহায্যে লোকের মনকে অভিভূত করাই এই স্থাপত্যকলার লক্ষ্য।

 

উত্তরভারতের স্থাপত্যকলারীতি তুলনায় এতোই ভিন্ন যে সেই পার্থক্য নিতান্ত সাধারণ দর্শকের দৃষ্টি এড়ায় না। সেখানকার মন্দিরগুলি পর্যন্ত সরলরেখার আধিপত্য থেকে মুক্ত। খিলান ও বৃত্তের সাহায্যে তারা এমনভাবে গঠিত যা সূক্ষ্মভাবে আবহাওয়াটাকে পর্য্যন্ত বদ্লে দেয়। গম্বুজ খুব বেশি নেই সত্য কিন্তু পিলারগুলি পর্য্যন্ত দক্ষিণ ভারতের মিনার থেকে আলাদা। যাঁরা শুধু উত্তর ভারতীয় শিল্পরীতির সহিত পরিচিত তাঁরা এটা সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন না। মন্দির ও মসজিদের অন্তর্নিহিত সাদৃশ্য অপেক্ষা তাদের মধ্যেকার পার্থক্যটাই তাদের চোখে বড়ো হয়ে দেখা যাবে। কিন্তু যাঁরা দাক্ষিণাত্যের মন্দির-স্থাপত্য দেখেছেন, উত্তর ভারতের সমস্ত স্থাপত্যের মধ্যেই তাঁরা সূক্ষ্মভাবে মসজিদের আদল খুঁজে পাবেন। এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই, কারণ উত্তর ভারতের প্রত্যেকটি উৎকৃষ্ট সৌধের মূলকথা হলো দুইরীতির সামঞ্জস্য ও মিলন।

ভাস্কর্য্য ও ম-নরীতির ক্ষেত্রে উত্তর ভারত ব্যয়কুণ্ঠ; কিন্তু এটা নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়। বরাবরই এখানে রেখার সুমিতি ও বস্তুপুঞ্জের ভারসাম্যের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এমনভাবে প্রস্তরতালকে ব্যবহার করা হয়েছে যাতে ঐক্যবোধ জন্মায়। উত্তর ভারতীয় স্থাপত্য একটি মূলভাবে কেন্দ্রায়িত। এর মূল্য সুসমঞ্জস গঠনসৌকর্য্যে নিহিত বিভিন্ন উপাদানের বৈচিত্র্য ও চটকে নয়। এইটে উল্লেখযোগ্য যে মন্দির-স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও এই দুইরীতির মিলনপ্রক্রিয়া কার্য্যকরী হয়েছিল। অন্যান্য ক্ষেত্রে বিদেশী প্রভাব স্বীকার করে নেওয়া সহজ, ধর্মের ক্ষেত্রে সে প্রভাব সহজে স্বীকৃত হয় না। ধর্মের ক্ষেত্রেও হিন্দু স্থাপত্য প্রতিভা যে  মুসলমানী আদর্শকে তার নিজের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করেছিল, তাতেই তার শক্তি ও প্রাণবন্ততার পরিচয় মেলে।

 

এই প্রভাব একতরফা ছিল না। বাস্তবিক পক্ষে তা কখনও হতেও পারে না। প্রাচীন ভারতীয় রীতির উপর যেমন সারাসেনীর প্রভাব পড়েছে, তেমনি ভারতীয় পদ্ধতিও ভারতের মুসলমান স্থাপত্যকলারীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মুসলমান স্থাপত্য কলার একটি প্রধান বিশেষত্ব হলো তার সারল্য ও দার্ঢ্য। এমন এক কঠোর মাধুর্য্যে রেখার সঙ্গে রেখার মিলন যে তার মধ্যে অতিরিক্ত সজ্জা বা ম-নের কোন স্থান নেই বললেই চলে। যেখানে অলঙ্করণ আছে সেখানেও তা বিশুদ্ধ জ্যামিতিক নক্সা বা চিত্রায়িত হস্তলিপির আকারে রূপায়িত। উত্তর ভারতের স্থাপত্যশিল্পের ক্ষেত্রে এই সাধারণ নীতির বৈপ্লবিক পরিবর্ত্তন দেখা যায়। হিন্দু ও মুসলিম উপাদান মিলে সেখানে এক নতুন ধরনের স্থাপত্যকলার সৃষ্টি হ’ল। মুসলিম স্থাপত্যরীতির কঠোরতা নমনীয় হ’য়ে এলো, হিন্দুরীতির আতিশয্য ও আড়ম্বর গেলো কমে। সামঞ্জস্য ও গঠনের উপর সারা সেনীর রীতির বরাবরের ঝোঁক; তার সঙ্গে ভারতীয় রীতির জৌলুস ও ম-নপ্রিয়তার মিলনে স্থাপত্যশিল্পে তাজমহলের মতো অলৌকিক সৃষ্টি সম্ভব হ’ল। এই দুই রীতির সুসমঞ্জস সমন্বয় যে সব সময় ঘটেছে এমন নয়; একটির দ্বারা আরেকটির অত্যাধিক প্রভাবের দৃষ্টান্তও অনেক আছে। ফতেপুর শিক্রি কিম্বা ইত্মাদ্দৌলার স্থাপত্যরীতি কৌতূহলপ্রদ সমম্বয়ের অসমাপ্ত দৃষ্টান্তরূপে তারা আজও বিদ্যমান। সেই সময়কার মুস্লিম স্থাপত্যের গঠনে কোথায় হিন্দুরীতির প্রভাব তার প্রত্যেকটির দৃষ্টান্ত দেবার দরকার আছে বলে মনে হয় না। হিন্দুযুগের শিল্পসৃষ্টিতে পদ্ম ও কলস একটি স্থায়ী প্রেরণারূপে বিদ্যমান কিন্তু মুসলমান বাদশাহ্দের সমাধিগাত্রেও এর সুনিপুণ ব্যবহার চোখে পড়ে।

 

শিল্পকলার ভেতর দিয়েই প্রধানত জাতি অমরত্ব লাভ করে। রাষ্ট্রনৈতিক পটভূমি দিন থেকে দিনে পরিবর্ত্তিত হ’তে পারে। পরিবর্ত্তমান দৃশ্য বহুক্ষেত্রেই মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেনা। দর্শনের ক্ষেত্রে পর্যন্ত অনেক সময় খুঁটিনাটি বৃত্তান্তের চাপে সমগ্রের ধারণা মন থেকে তিরোহিত হয়। শেষে এমন হয় যে বুদ্ধির সূক্ষ্ম কারিকুরির গোলকধাঁধায় আত্মা নিঃশেষে হারিয়ে যায়। শিল্পকলার ব্যাপারে কিন্তু যা সরল ও মৌলিক তাই শেষ পর্যন্ত টেকে এবং জাতির চেতনায় তাদের ছাপ রেখে যায়। সেইজন্যেই শিল্পকলা জাতির গুঢ় চরিত্রকে প্রকাশিত করে, পরবর্তী যুগ ও মানুষের হিতার্থে তাকে সুনির্দ্দিষ্ট আকার দিয়ে যায়।

 

শিল্পকলার মধ্যে আবার চিত্রকলা হলো সবচাইতে মৌলিক ও শ্বাশ্বত। বাক্য সামাজিক ভাববিনিময়ের উপায়মাত্র; সমাজরূপের পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে কথারও রূপ বদলায়। সঙ্গীত অবশ্য মৌলিক, কিন্তু তার আবেদনকে শ্বাশ্বত বলা চলে কিনা সন্দেহ। সঙ্গীত যেসব অনুভূতির সৃষ্টি করে, তা এতোই দ্রুতসঞ্চরমাণ ও নিরাবয়ব যে তার আবেদন আত্মাকে উদ্দীপিত করেই ক্ষান্ত হয়। স্পষ্ট আকার না থাকায় সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে কখনও জাতির সবিশেষ জাতীয় প্রতিভার পূর্ণপ্রকাশ হতে পারে না।

 

চিত্রকলারও মৌলিক বস্তু নিয়ে কারবার, কিন্তু তা বিশেষ জাতি বা যুগের অবয়বকেও প্রকাশিত করে। চৈনিক শিল্পের সহজাত মিতাচার যেমন চীনজাতির বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে, তেমনি প্রাচীন পারসিক চিত্রকলার সূক্ষ্ম খুঁটিনাটির সৌন্দর্য্যও পারসিক জাতির বিশেষ লক্ষণ ফুটিয়ে তোলে। পরিপূর্ণ বুর্জোয়া সভ্যতার পরিপোষক ওলন্দাজ চিত্র শিল্পের মধ্যে প্রকাশিত। বর্ত্তমান ইউরোপের নিষ্পেষিত আত্মার ক্রন্দনধ্বনি আধুনিক চিত্রে যেরূপ চমৎকার ও যথার্থ ভাবে ফুটে উঠেছে এমন আর অন্য কোন শিল্পরূপের মধ্যে দিয়ে সম্ভব হয়েছে কিনা সন্দেহ। অন্য দেশের চিত্রশিল্প সন্ধন্ধে সেকথা সত্য, ভারতীয় চিত্রশিল্প সম্বন্ধেও তা সমান সত্য।

 

প্রাচীন যুগের ভারতীয় চিত্রকলার বিস্মৃতপ্রায় সুদীর্ঘ ইতিহাস এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। তরঙ্গের পর তরঙ্গের আগত অভিযানকারীর দল যা কিছু রেখে গিয়েছিল বিরূপ আবহাওয়া ও কালের রূঢ় হস্তাবলেপ তার সবকিছুই মুছে নিয়েছে। অজন্তার গিরিগুহায় অমূল্য কীর্ত্তি ছড়িয়ে আছে, অনাদ্যন্ত কালের পটভূমিকায় মানুষের অঙ্কন-প্রচেষ্টার স্মৃতি জাগিয়ে রাখার সাধনায় তারা প্রাণবন্ত। রূপের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য  ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর মধ্যে অন্তর্নিহিত গতিকে আড়াল করে রাখে। ভারতীয় গ্রীষ্ম তাপ ও আলো বিকিরণ করে। কিন্তু সেই বিকিরণের তীব্রতাই বস্তুর বস্তুসত্তা লুপ্ত করে দিয়ে তাকে অস্পষ্ট রেখাঙ্কিত ঝাপসা ছবিতে পরিণত করে। সেইসব ছবি এমন এক সংস্কৃতির শৈল্পিক প্রকাশ যা বহুজাতির অভিজ্ঞতার সমম্বয়ে তৈরী। বিপরীদ্ধর্ম্মী প্রবণতার মধ্যে তারা সাম্যকারক। অজন্তার প্রাচীর ও ছাদ ছবিতে ভরা। সেই সব ছবির বিষয়বস্তু যেমন সাধকদের জীবন থেকে আহৃত হয়েছে, তেমনি গণজীবন থেকেও নেওয়া হয়েছে। কতগুলি ছবি জীবনের আনন্দের উচ্ছ্বসিত অভিব্যক্তি। তারা শক্তি, গরিমা, প্রেম ও যৌবনের দ্যোতক। অন্য শ্রেণীর চিত্রগুলিতে শান্ত, সমাহিত ধ্যানীর জীবনকে রূপ দেওয়া হয়েছে। নিরাসত্তি, ভক্তি, ধর্ম্মপরায়ণতা ও বিশ্বাস হলো তাদের মূলগত ভাব। এই দুই জগৎ কিন্তু বিচ্ছিন্ন বা বিভিন্ন ভাবে চিত্রিত হয় নাই। ভারতের প্রাক-ইসলামীয় স্থাপত্যশিল্পের মধ্যে জীবনের জনাকীর্ণতা ও প্রচন্ড চাপ সম্পর্কে যেমন স্পষ্ট চেতনার আভাস, এ চিত্রকলার মধ্যেও সেই চেতনারই সাক্ষাৎ মেলে। চিত্রাঙ্কিত মূর্ত্তিগুলি যেন বড় বেশি ঘনসন্নিবদ্ধঃ একটির গায়ে আরেকটি ঠেকে যাচ্ছে। পুরুষ নারী ও শিশু বিভিন্ন ভঙ্গিতে ও ভাবে একই জায়গায় এমনভাবে গাদাগাদি হয়ে আছে যাতে মন দিশেহারা হয়ে যায়। মনে হয় যে চিত্রকর জীবনের অপরিসীম, অনির্ব্বচনীয় প্রাচুর্য্যের দ্বারা এমনভাবে নিপীড়িত যে সে তার শিল্পরূপের আতিশয্যের মধ্য দিয়েই তাকে আঁকড়ে ধরতে ও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে। এই সমস্ত বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে কিন্তু পরমবস্তুর ঐক্যের চেতনা একবারের জন্যেও লুপ্ত হয় নাই। মানুষের মূর্ত্তি ও মানুষেতর জীবের মূর্ত্তির মধ্যে শিল্পী যে বিস্ময়কর অন্তরঙ্গতা স্থাপন করেছে তার মধ্যেই সমস্ত ঘটনার শুদ্ধতা প্রকাশিত হয়েছে। অজন্তার কীর্ত্তি আরও বিস্ময়কর এইজন্য যে যেই মাধ্যমের সাহদপ এই জনাকীর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ জীবনের ধারণাকে পরিষ্ফুট করা হয়েছে তা রেখামাত্র। সমস্ত ঘটনার অন্তর্নিহিত ঐক্যের যে সহজ সংস্কার, তার দৃশ্যমান রূপায়ন হিসাবেই এ চিত্রের সার্থক্য।

 

উপরোক্ত শিল্পরীতি থেকে মুঘল ও রাজপুত চিত্রকলার নিখুঁত সূক্ষ্মতার অধ্যায়ে পৌঁছতে যে-পরিবর্ত্তনের মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে সেই প্রক্রিয়াকে প্রায় দ্বান্দ্বিক মনে হয়। তা হলেও এই পরিবর্ত্তন কিছু খেয়াল মাফিক হয় নি বা হঠাৎ আসে নি। বাবর ও তাঁর বংশধরদের দ্বারা যে শিল্পরীতি ভারতভূমিতে আনীত হয়েছিলো তা প্রবল ব্যক্তিত্বের দ্বারা উদ্বুদ্ধ। জনতা সম্বন্ধে তা নিরুৎসুক মিশ্রণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ও এর সোজাসুজি কোন উৎসাহ ছিল না। এই শিল্পরীতিতে সবকিছুই স্পষ্ট আলোকে, সুনির্দ্দিষ্ট খসড়ায় দেখা দেয়। ব্যক্তিগত মূর্ত্তির প্রত্যেকটি খুঁটিনাটির প্রতি এর নজর। সে বিষয়ে তার যত্নেরও অবধি নাই। চেঙ্গিস ও তৈমুরের দরবারে সৃষ্ট ও লালিত এই শিল্পরীতির নমনীয় কিম্বা আবেগপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই ছিল। জীবনের উদ্দীপনা তারা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। অক্সিকত বিষয়ের মধ্যে সেই আবেগাকুল প্রেরণার প্রকাশ। ব্যক্তিত্বের ছাপ এইসব ছবিতে অশোভন আতিশয্যে গিয়ে পৌছঁলো। চিত্রকলা প্রতিমূর্ত্তি অঙ্কনে পরিণত হ’লো। কিন্তু সেই প্রতিমূর্ত্তি-অঙ্কনের বিস্ময়কর চাতুর্য্য অনস্বীকার্য্য। এই প্রবল, ব্যক্তিক চিত্রকলারীতির সঙ্গে যখন ভারতের প্রাচীন চিত্রকলার সংস্পর্শ ঘটলো, দুইয়ের উপাদান নিয়ে একটি নতুন শিল্পরীতির সৃষ্টি হলো। অজন্তার গঠনের পর সমন্বয়, সুমিতি ও বিস্তারজ্ঞাপক নূতন রেখা আরোপিত হ’লো। প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলার প্রবল অভীপ্সা এতে ছিল না; দরবারী কায়দায় আচ্ছন্ন এই নূতন শিল্পরীতির মধ্যে সহজাত ভাবালুতা, দরবারী আদবকে তা কখনও ভুলতে পারেনি। মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে অনুভূতিকে বিলম্বিত করার ফলেই প্রাচীন ভারতীয় শিল্পে বিমূর্ত্ত ভাবের জন্ম। মুঘল ও রাজপুত চিত্রের বেলায় সরলীকরণ ও নিয়ন্ত্রণের ফলে বিশুদ্ধ চিত্ররীতির উদ্ভব। একটি হলো উচ্ছ্বাসপ্রবণ, অপরটি স্থিতিশীল- কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার মধ্যেও পুরাতন উচ্ছ্বাসের স্মৃতি যেন জড়িয়ে আছে।

 

ভারতীয় মার্গসঙ্গীত পদে পদে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর নিরেট বনিয়াদ ও অলঙ্কার-প্রাচুর্য্যরে সঙ্গে মন্দিরের স্থাপত্যরীতির নির্ভুল সাদৃশ্য চোখে পড়ে। উত্তর ভারতের সঙ্গীত কিন্তু এর বিপরীত। সেখানে নিরেটত্ব নেই, আছে একটা মৃদু সৌকুমার্য্য। অলঙ্কার প্রাচুর্য্যরে পরিবর্ত্তে আছে সামঞ্জস্য, আছে বিস্তার। শিল্পকলায় দুইটি বিভিন্ন ও বিপরীত ভাবের সাক্ষাৎ মেলে। একটির লক্ষ্য সজ্জা, বহুব্যাপকতা, আড়ম্বর। অপরটি সারল্য, মিতাচার ও গাম্ভীর্য্যরে চেতনায় আচ্ছন্ন। একটি ঐশ্বর্য্যের প্রাচুর্য্য ও রূপের অফুরন্ততা দিয়ে আমাদের অভিভূত ক’রে দিতে চায়। অপরটি বস্তুর মিতব্যয় ও প্রকাশভঙ্গির সুচিক্কণতার সাহায্যে আমাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। প্রথমোক্ত ভঙ্গি সৌন্দর্য্যসাধনাকে তার চরমসীমায় নিয়ে যায় এবং সব কিছুই প্রকাশ করতে চেষ্টা করে। অপর ভঙ্গিটি অনেকখানিই অকথিত রাখে ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও ব্যঞ্জনার সাহায্যে তার বাণী বহন করে আনে। প্রথমটি কীর্ত্তির সমুজ্জ্বলতার মধ্য দিয়ে প্রকাশমান; অপরটি নিজেকে প্রকাশিত করে এমন এক পটভূমিকার সাহায্যে যেখানে কল্পনা সতত ক্রীড়াচঞ্চল।

 

এই দুই ভঙ্গি জীবনের এমন দুটি আদর্শকে রূপায়িত করে যারা একে অপরের পরিপূরক। সেখানেই শিল্পের চরম পূর্ণতা যেখানে রোমান্তিক ও প্রাচীন পদ্ধতি এই দুইটি পরস্পরবিভিন্ন ধারা এক অনবদ্য যুক্তস্রোতে এসে মিশে যায়। তখন জীবনে আমরা এক নূতন চমৎকারিত্বের সন্ধান পাই- সেখানে এই দুই আদর্শমূলক মনোভাব সমম্বয়ের মধ্যে দিয়ে নুতন জীবনবাদ ও মনঃপ্রকর্ষের সৃষ্টি করে। আদি ভারতীয় এবং সারাসেনীয় রীতি- একটি অপরটির সম্পূরক। এদের সমবায়ে শুধু যে বৃহৎ শিল্পেরই সূচনা হয়েছিল তা নয়, গভীর ও স্থায়ী সংস্কৃতিও জন্মলাভ করেছিল।

 

দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির সংযোগ ও সমম্বয়ের ফলে এক নূতন দর্শনের সূচনা হলো। বুদ্ধির ক্ষেত্রেই যে ধাক্কাটা প্রথমে এসে লাগবে সেটা মোটেই আশ্চর্য্যরে বিষয় নয়। প্রথম পরিচয়ের অভিনবত্ব হৃদয়ের চাইতে মনকেই বেশি আকর্ষণ করে। বুদ্ধিদ্বারা স্বীকৃত সত্য তখন তখুনি ব্যবহারকে প্রভাবিত করে না। বুদ্ধির দ্বারা স্বীকার এবং হৃদয় দ্বারা গ্রহণ- এই দুটো ব্যাপার ঠিক একই কালে ঘটে না, মাঝখানে একটা ফাঁক প্রায়ই চোখে পড়ে। কিন্তু একবার যে সত্য চেতনার অঙ্গ হয়ে যায়, তা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আবেগকে ঢেলে সাজ্তে আরম্ভ করে। শিল্পের ক্ষেত্রে তখন নূতন পরীক্ষার সূচনা হয়। এই প্রক্রিয়া ঘটতে সময়ের দরকার, তাই দেখা যায় ইন্দোসারাসেনীয় শিল্পকলা প্রধানত উত্তর ভারতেই সমৃদ্ধিলাভ করেছে।

 

ভারতীয় স্থাপত্যশিল্পে যে সব কীর্ত্তির উল্লেখ করা হয়েছে তাতে কীভাবে হিন্দু ও মুসলিম রীতির সামঞ্জস্য ঘটেছিল তা আমরা দেখিয়েছি। বৈষ্ণব কবিতা ও গান এই সমম্বয় প্রক্রিয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত। আদি কাল থেকেই বাংলাদেশে সফল শিল্পের জমি তৈরি ছিল। ইস্লামের অভ্যুদয়ের ফলে সেই সম্ভাব্যতা একটি প্রচন্ড নাড়া খেলো এবং বিভিন্ন উপাদানের সমবায়ে বৈষ্ণব কবিতার জন্ম দিলো।

 

নিষ্ক্রিয় মায়াবাদের সঙ্গে সক্রিয় ভাবের যোগসাধন ক’রে বাংলার বৈষ্ণব কবিতা সমম্বয়ের এক অলৌকিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আধ্যাত্মিকতাকে প্রায়ই হিন্দুমনের একটি প্রধান লক্ষণ বলে মনে করা হয়- সেই আধ্যাত্মিকতার মধ্যে কেমন যেন একটা নিস্ক্রিয়তা ও প্রশান্তির আমেজ আছে। মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে প্রথম প্রথম যে সব সংযোগ ঘটেছে তার প্রতিক্রিয়ার হিন্দুমন যে বিদ্রোহ করেছিল এটা বিশ্বাস করতেই হয়। সেই বিদ্রোহ যখন ব্যর্থ হলো, তা এমন এক পরাজিতের মনোভাব সৃষ্টি করলো যা সংসারের প্রতি ঔদাসীন্যের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেলো। এই সন্ন্যাসধর্ম্মী প্রতিক্রিয়া আত্মার জয়জয়কারেই ব্যস্ত- কিন্তু বৈষয়িক ক্ষেত্রে হিন্দুর গৌরবোজ্জ্বল কীর্ত্তির কথা আর তার মনে রইলো না। হিন্দু ভারতের কীর্ত্তি ও মহিমার খুব অল্প প্রমাণই আজ বর্ত্তমান রয়েছে। ঔপনিবেশিক ও বৃহত্তর ভারতের কাহিনী আজ নিতান্তই কল্পনা-কথনে পর্য্যবসিত। মানুষের মনের বিচিত্র কর্ম্মপ্রচেষ্টা- যা ছিল প্রাচীন ভারতীয় জীবনের বৈশিষ্ট্য- মধ্যযুগে আসতে না আসতে একেবারে অস্পষ্ট ধূসর হয়ে এলো। এতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই। সংসার বিরাগী মনোভাব বৈদেশিক বিজয় ও আধিপত্যের অপরিহার্য্য ফল।

 

এমন যে প্রবল সন্ন্যাসবিমুখ মুস্লিম সমাজ তাও ইংরেজকর্ত্তৃক ভারতবিজয়ের পর অনাসক্তের ভাবধারণ করলো। ঐহিক জীবনে তিক্ত পরাজয়ের গ্লানিকে মুছে ফেলবার জন্যে পারলৌকিক জীবনে পুরস্কার ও গৌরবের আশা জাগিয়ে তোলা হ’ল। পারলৌকিক শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতাজাত বাস্তব বিপর্য্যায়ের বেদনাকে ঢেকে দিতে চাইল।

 

এই যে সংসারবিমুখতা তা ভারতের প্রাক-মুসলিম সংস্কৃতিজীবনে একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক উদ্দেশ্য সাধন করেছিল। পরমাত্মার উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে এই পৃথিবীর অসাম্যগুলি যেন আর মানুষের গায়ে লাগ্লো না; যারা সমাজকর্ত্তৃক অমানুষের জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল সেইসব ভাগ্যহত লোকেরাও অদৃষ্টের সঙ্গে কেমন নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল। মানুষ যে সামাজিক অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নাই তারও কারণ এই সন্ন্যাসধর্ম্মী মনোভাব। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে ব্রক্ষের স্বরূপ। ব্রক্ষ্ম হলেন বিশুদ্ধ সত্তা, কাজেই তিনি স্থানকালপাত্রের ঊর্দ্ধে। এই পৃথিবীতে ব্যক্তিগত জীবনে যেসব লাঞ্চনা ও অপমান সইতে হয় সেসব তাই নিতান্ত্ মায়া; এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও বিলুপ্তি।

 

ইসলামের সংঘাতে এই সংসারবিমুখতার ভিত্তিমূল পর্যন্ত নড়ে উঠ্লো। ইসলাম মূলত এই পৃথিবীরই ধর্ম্ম; ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কিম্বা অতীন্দ্রিয় বিষয় দুইই তার চোখে সমান। প্রাণবন্ত, সক্রিয় এমন এক সমাজসাম্যের বাণী ইস্লাম বহন করে নিয়ে এলো যে তাকে রোধ করবার ক্ষমতা তদানীন্তন কোন রাষ্ট্রনৈতিক কিম্বা সামাজিক ব্যবস্থারই ছিল না। ইসলাম মানুষকে শেখালো যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব দৈনন্দিন জীবনে আচরণীয়; দূরবর্ত্তী ও অপার্থিব কোন এক ভবিষ্যতের ভরসায় ফেলে রাখার জিনিষ নয়। যেসব বন্ধন ও সংস্কার মানুষের মনকে এযাবৎ শৃঙ্খলিত করে রেখেছিল, প্রবল বিস্ফোরণের মতন ইস্লাম তাকে চুর্ণ বিচুর্ণ করে দিল। এই সাম্যের আহ্বানই ইসলামের বিজয়ে সহায়তা করেছে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষের স্বাধীনতার এই যে বাণী, সেই বাণীই ইসলামের অগ্রগতিকে এমন দ্রুত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।

 

বাংলার বৈষ্ণব কবিতায় এই বিরোধ ও তার অবসানের একটা শৈল্পিক অভিব্যক্তি চোখে পড়ে। বৈষ্ণব কবিতার মূলসুর প্রেম। সেই প্রেমের যে-দৃষ্টিভঙ্গি, তার মধ্যে দিয়ে সমম্বয়ের ভাবটি বড়ো চমৎকার ফুটে উঠেছে। প্রেম শুধু একটি দৈহিক কিম্বা মানসিক অবস্থা নয়, শুধুমাত্র অনুভূতি তো নয়ই। প্রেম দেহমনের এক ব্যাকুল ও তীব্র প্রেরণা, সমাজ ও ব্যক্তির সৃজনীপ্রতিভার রূপক। যুক্তিবাদীরা যুক্তির দ্বারা একে বোঝাতে পারে না; শুধুমাত্র জৈবিক প্রয়োজনের নজীর দেখিয়েও এর কারণ নির্দ্দেশ করা যায় না। অতীত ও বর্ত্তমানের নিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করে ব্যক্তি-মানস অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দ্বিধাদ্বন্দ্বহীনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে- এই বললেই বোধ হয় প্রেমের স্বরূপ সব চাইতে ভালো বোঝা যায়। কর্ম্মই হলো এই অভিসারের মূল; অভিসার যতো বলিষ্ঠ হবে কর্ম্মও ততো বিশুদ্ধ হবে। উদ্দেশ্যের বন্ধন থেকে এই কর্ম্ম মুক্ত ; জীবনের নিছক আনন্দের প্রাবল্যেই এর প্রকাশ। উদ্দেশ্য-বিহীন শক্তির অভিব্যক্তি সর্ব্বদাই লীলাচঞ্চল।

 

প্রেমকে যে ভাবেই বিশ্লেষণ করা যাক্না কেন, শেষ পর্য্যন্ত তাকে এক বিশেষ ধরণের খেলা বলে মান্তে হয়। বৈষ্ণব কবিতায় একেই বলা হয়েছে ‘লীলা’- যা অজানিত ও অজ্ঞেয় আত্মার নর্ম্মক্রীড়া স্বরূপ। এই লীলা বিশুদ্ধ লীলা কিন্তু তবু বৈষ্ণব কবিতার ‘লীলায়’যেন খানিকটা পুরনো দিনের নিষ্ক্রিয়তার আমেজ পাওয়া যায়। বিভিন্ন আবেগ ও অনুভূতির ক্ষেত্রে কবি সর্ব্বদাই ভালোবাসার নিষ্ক্রিয় পাত্র এইটেই চোখে পড়ে। কোথাও সে প্রেমিক নয়। সর্ব্বত্রই সে প্রেমাস্পদ- দয়িত। প্রথম দৃষ্টিতে হয়তো একে অপরিহার্য্য বলেই মনে হবে। বিশুদ্ধাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার যে-সম্পর্ক তা বশ্যতা ও আত্মদানের সম্পর্ক ছাড়া আর কি হতে পারে? কিন্তু এ ধারণা ভুল। সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করলে, অসীমের প্রতি মানবাত্মার এই  যে আকুতি তা রূপকমাত্র, উপমার ক্ষেত্রেই তার যা কিছু সার্থকতা। কিন্তু যখন সেই আকুতিকে আর মায়া ব’লে ভ্রম করা চলে না, আত্মার পক্ষে যা যখন একমাত্র বাস্তব সত্যে পরিণত হয়, আমরা তখন এমন এক স্তরের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, যেখানে বিষয় ও বিষয়ীর পার্থক্য একেবারে ঘুচে যায়। তখন আর মানবাত্মাকে পরবশ্য ও সীমাবদ্ধ ব’লে মনে হয় না। এই স্তরে প্রেমিক ও প্রেমাসম্পদের ব্যবধান লুপ্ত হয়। বৈষ্ণব কবিতায় কিন্তু এই ব্যবধান লেগেই আছে। তাতেই মনে হয় মায়াবাদের ধারণাকে নিঃশেষে দূর করা সম্ভব হয় নি। এদিকে আবার প্রেমকে ‘লীলা’বা বিশুদ্ধ ক্রীড়া ব’লে কল্পনা করা হয়েছে। এতে এই বোঝাচ্ছে যে নূতন বিশ্বাসের ফলে জীবন সম্বন্ধে দৈবধারণার ভিত্তিমূল পর্য্যন্ত নড়ে উঠেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও নূতন বিশ্বদৃষ্টি পুরাতনকে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত করতে পারে নি।

 

হিন্দু ও মুসলমানের জীবনবাদের মধ্যে যে সমম্বয় ঘটেছিল তার ফলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। প্রাক্-মুসলিম যুগের ভারতীয় মনের অধিকাংশ অভিব্যক্তিই মায়াবাদের রঙে রঞ্জিত। মায়াবাদী বিশ্বদৃষ্টি ব্যক্তির বিকাশে সামান্যই সহায়তা করে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পার্থক্যের চেতনাও সেখানে ক্ষীণ। সাধারণ মানুষ কেন যে মুখ বুজে জীবনের সমস্ত বৈষম্য ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছিল মায়াবাদের মধ্যে তার খানিকটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। জন্মান্তরে বিশ্বাসও এই ধারণার প্রত্যক্ষ ফল। জন্মান্তরবাদ একদিকে মানুষের প্রগতিতে অবিশ্বাসী, অন্যদিকে সমস্ত প্রাণীর মূলীভূত ঐক্য ও সাম্যের উপর জোর দিয়ে জীবনের প্রত্যক্ষ বৈষম্যকে খানিকটা দূর করে। যে আদর্শে কীটপতঙ্গ পশুপক্ষী ও মানুষকে একই দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেই আদর্শ কখনই অগ্রগতি কিম্বা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার উপর জোর দিতে পারে না, দিতে গেলে তার নিজের মতকেই খ-ন করা হয়। অপরপক্ষে, ইস্লাম মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের উপর জোর দিলো এবং তাকে জীবজগতে প্রভু ব’লে ঘোষণা করলো। ইস্লামের মতে মানুষ শুধু ঈশ্বরের অধীন, আর কারও নয়। এই বিশ্বাসটিকেই বৈষ্ণবকবি চ-ীদাস তাঁর প্রসিদ্ধ একটি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন এইভাবে :

‘শুনহ মানুষ ভাই,

সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।’

 

প্রাচীন ভারতে কথক, চারণ ও ভাটকবির দল সংস্কৃতির বিস্তারে অনেকটা সহায়তা করেছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরে দার্শনিক ভাবধারা প্রচারের কাজটুকু তাদের দ্বারাই সম্পন্ন হয়। এর একটি চমৎকার প্রমাণ হলো মুসলমানদের আমলের ‘পুথি’সাহিত্য। হিন্দুদের মধ্যে যারা কথকতা করতো তাদের বিষয়বস্তুর কখনই অভাব হ’তো না। লোককে শিক্ষা ও আনন্দ দেবার জন্যে রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক কাহিনীর অফুরন্ত ভা-ার থেকে তারা যদৃচ্ছা উপকরণ সংগ্রহ করেছে। এই ভাবেই হিন্দুধর্ম্মের শিক্ষা জনসাধারণের মধ্য ছড়িয়েছিল। হিন্দু পুরাণের চরিত্র ও আখ্যায়িকাগুলি কথকের মারফৎ এমন ভাবে সর্ব্বস্তরে ব্যাপ্ত হয়েছিল যে তা সর্ব্বসাধারণের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

মুসলমান কথকের কিন্তু অতটা সুবিধা ছিল না, কেননা ইসলাম ধর্ম্মে অলৌকিক পুরাণ কাহিনীর স্থান অতি অল্প। এদিকে আবার জনসাধারণকে কেবল নীতিকথা কিম্বা অনুরূপ শিক্ষা সাহিত্য দিয়েও ভোলানো যায় না। শুধুমাত্র ধর্ম্মমূলক উপদেশ ও নৈতিক কথামালার শক্ত রুটি চিবিয়ে কেউ কখনও বাঁচতে পারে না। অত্যদ্ভুত দৈবঘটনার কাহিনী পর্যন্ত মানবিক আবেদন ছাড়া স্বাদহীন ঠেকে। সাহসিকতার কাহিনী, নীতিকথা, অদ্ভুত রোমাঞ্চকর গল্প, চক্রান্ত, ষড়ষন্ত্র, বিশ্ববাসঘাতকতা, নিষ্ঠা, এক কথায় মানুষের জটিল জীবনে যা কিছু চোখে পড়ে সবই হিন্দুপুরাণে রয়েছে। কিন্তু মুসলমান ইতিবৃত্ত সেইদিক দিয়ে দরিদ্র। হ’লে হবে কি, মুসলমান কথক সহজে নিরস্ত হবার নয়। মুসলিম ইতিবৃত্তের মধ্যে যদি পুরাণের গল্প না থেকে থাকে তা বানিয়ে নিলেই হলো।

অন্যান্য ব্যাপারের মতো এই ব্যাপারেও আকবর পথ দেখালেন। তিনি একটি সজ্ঞান ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় এই বিষয়ে পরীক্ষা আরম্ভ করেন। হয়ত তাঁর বহু আগেই এ সম্বন্ধে চেষ্টা সুরু হয়েছিল, হওয়ারই কথা। পথিকৃৎ প্রায়শই পথিকৃৎ নন-বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি সেই ব্যক্তি যিনি পূর্ব্বতনদের ব্যর্থতাকে সফলতায় রূপান্তরিত করেন। সে যাই হোক্’কথিত আছে যে আকবরই প্রথম তাঁর সভাসদ হাস্যরসিক বীরবলকে মহাভারতের মুসলমানী সংস্করণ প্রস্তুত করতে আদেশ দেন। এর কী হাস্যকর পরিণাম দাঁড়িয়েছিল অনেকেই তা জানেন। বীরবল সম্রাটের দেওয়া বৃত্তি যতোদিন পারলেন ভোগ করলেন, তারপর একদিন স¤্রাটকে এক মারাত্মক প্রশ্ন করে বসলেন। “মহাভারতে লেখা আছে দ্রৌপদীর পাঁচস্বামী ছিল-এখন স¤্রাট তাঁর নূতন মহাভারতে তাঁর বেগমের জন্যে কয়জন স্বামী মঞ্জুর করতে রাজী আছেন আর সেই স্বামীপদের জন্যে সভাসদদের মধ্যে কাদের বাছা হবে?”এ প্রশ্নের পরে মহাভারত বেশীদূর এগোয়নি।

 

হয়তো কাহিনীটি আগাগোড়াই কাল্পনিক। কিন্তু অনেক সময় কাল্পনিক গল্পের পেছনেও সত্য লুকিয়ে থাকে। কাহিনীটিতে সেই বাস্তব সত্যেরই ইঙ্গিত রয়েছে। মুসলমান হিন্দুত্বকে তার স্বক্ষেত্রে যুঝ্বার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। প্রচারক হিসেবে কথকের গুরুত্ব অস্বীকার করা চলে না, তাই শীঘ্রই আমরা এমন সব মুসলমান কথক ও চারণের সাক্ষাৎ পেলাম যারা তাদের হিন্দু প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বীতা চালালো। হিন্দু যদি রামলক্ষ্মণের মহিমা ও তাদের পরস্পরের আজীবন ভালোবাসার কথা শতমুখে কীর্ত্তন করতে পারে মুসলমানও হাসান-হোসেনের কল্পিত ভ্রাতা আমীর হানিফার কীর্ত্তিগাঁথা রচনা করে তার সমুচিত জবাব দিতে পারে। আলী হয়ে উঠলেন এমন এক অলৌকিক বীর যিনি ভীম অর্জ্জুন দুজনই। রামচন্দ্রের একনিষ্ঠ সেবক বানরদেবতা হনুমানের কীর্ত্তিকলাপ পর্য্যন্ত প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে  দাঁড়ালো। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে আমীর উম্মিয়াকে খাড়া করা হলো।  লৌকিক কল্পনায় হনুমান অমর হ’য়ে আছেন এইজন্যে যে তিনি একলাফে সমুদ্র ডিঙিয়ে লঙ্কা গিয়েছিলেন ও লঙ্কায় গিয়ে অগ্নিকা- বাধিয়ে তুলেছিলেন। আমীর উম্মিয়াও পেছনে পড়ে নেই। কারণ তিনিও শুন্যে লাফ দিয়ে সমুদ্র পারাপার হচ্ছেন এবং তাঁর নিজের ক্ষেত্রে তিনিও একজন মস্ত যোদ্ধা। এখনও গ্রামে ঘরে ঘরে রামায়ণ ও মহাভারত হিন্দুজন সাধারণের মনে যে ভাব জাগায়, মুসলমান জনগণের মধ্যে অদ্ভুতরস ও বীররস মিশ্রিত পুঁথিসাহিত্য ঠিক সেই ভাবেরই সৃষ্টি করে।

 

এই কাহিনীগুলির ধর্ম্মীয় কাঠামো ভারতের সর্ব্বত্রই প্রায় এক। তবে তাতে রক্ত মাংস চড়ানোর ব্যাপার প্রদেশ থেকে প্রদেশান্তরে ভিন্ন। প্রাচীন স্যাক্সন কবিতায় যীশুকে যেমন প্রচন্ড যোদ্ধারূপে চিত্রিত করা হয়েছে, ভারতেও তেমনি দেখি পৌরাণিক বীরদের চরিত্র এক এক প্রদেশে এক এক ভাবে আঁকা হয়েছে। ঠিক চরিত্রান্তর অবশ্য নয়, কারণ গল্পের মূল নক্সাটুকু কিন্তু সর্ব্বত্র একই থেকে গেছে। শুধু সূক্ষ্ম রেখায় ও ভাবে নুতন রঙ চড়ানো হয়েছে যাতে বীর হয়ে উঠেছেন স্থানীয় গুণাগুণবিভূষিত দেবতাস্বরূপ। এইভাবে বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের রামচন্দ্র তুলসীদাসের রামচন্দ্র থেকে সামান্যভাবে হলেও আলাদা জীব হয়ে উঠেছেন; বাংলার কৃষ্ণ ঠিক বাঙালি ভাবেরই প্রতিরূপ। মুসলমান লোকসাহিত্যের বীরদের মধ্যেও এই প্রাদেশিকতার ঝোঁক দেখতে পাওয়া যায়। বাংলা পুঁথি সাহিত্যের আমীর হামজা নিতান্তই বাংলার জলমাটির গড়া জীব।

 

বিভিন্ন প্রদেশের লোকসাহিত্যের মধ্যে বিভেদ যতো তাৎপর্যধ্যময়, ঐক্য ততো নয়। কারণ বিভেদের মধ্যে এক এক অঞ্চলের বিশেষ সামাজিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে এবং সেই জায়গার রীতিনীতি সংস্কারের ইঙ্গিতও তারা বহন করছে। পূর্ব্ববঙ্গের গাথা ও গানে কেবলই

সমুদ্রযাত্রার কথার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়-এটা অহেতুক নয়। সেখানে বীর প্রায় ক্ষেত্রেই রাজা নন, বণিক- যদিও ভারতের অন্যান্য অধিকাংশ অঞ্চলের পৌরাণিক গল্পের কেন্দ্র হলো যোদ্ধা কিম্বা রাজা। কেবলমাত্র গুজরাটে এর ব্যতিক্রম দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু এই ব্যতিক্রমটুকুও বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। আমরা এমন সব বণিক রাজপুত্রের কথা পড়ি যাঁরা বিরাট নৌবহর সংগ্রহ করে বাণিজ্যার্থে সমুদ্রযাত্রা করেছেন। উত্তরঙ্গ সমুদ্রের বুকে ও সমুদ্রপারের দেশে অভিযান, পেছনে ফেলে আসা স্ত্রী ও কন্যাদের ভাগ্য, দ্রুত ঐশ্বর্যলাভের সম্ভাবনা অথবা আকস্মিক ভাগ্যবিপর্যয়- মানবিক আবেদনের যতোগুলি পর্দ্দা আছে কথক তার সবগুলিতেই হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন এবং সময় সময় শ্রোতার হৃদয়কে আশার সুউচ্চ দোলায় চড়িয়ে পরক্ষণেই তাকে নৈরাশ্য ও বিষাদের অন্ধকার গর্ভে নিক্ষেপ করছেন। যারা কোনদিন নিজ গ্রামের বাহিরে যায় নি তারাও সেই সময়কার এই ব্যাকুল, বলিষ্ঠ ও সামুদ্রিক জীবনের ভাবদ্বারা খানিকটা উদ্দীপিত হয়েছিল।

 

গল্পকার সময় সময় সমসাময়িক রীতিনীতির ইতিহাসকারেরও কাজ করতেন। মুসলিম বিজয়ের সামাজিক প্রতিক্রিয়া যোদ্ধা ও অভিজাত শ্রেণীর রাজধানীতেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল না, পল্লী অঞ্চলেও বিশেষ ঘোরালো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। গল্পকার এই সব সুযোগের সদ্বব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। বর্ত্তমানের দাবী মেটাবার জন্যে পুরাতন বিষয়বস্তুকে নূতন ভাবে ঢেলে সাজা হলো; এবং শিল্পের অপরিবর্ত্তনীয় মাধ্যমে পরিবর্ত্তমান রীতিনীতি সুরক্ষিত হলো।

 

ভারতীয় সংস্কৃতির বিবর্ত্তনের ইতিহাসে হিন্দু ও মুসলিম ভাবের যে সমন্বয় ঘটেছিল তার কয়েকটি দিক উপরে দেখানো হলো। বিবরণটুকু স্বভাবতই অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য। যখন দুটি প্রবল ¯্রােতের মিলন হয় কে কাকে গ্রাস করলো সে প্রশ্ন ওঠে না। দুটি ¯্রােত মিলে তখন এক নূতন আকার ধারণ করে। সেই অবস্থায় তাদের স্বতন্ত্র দানকে চিন্বার আর উপায় থাকে না। যখন দুটো জীবন্ত প্রাণী মিলিত হয় তখনও সেই একই প্রক্রিয়া ঘটে। জীবের মিলনে যে নূতন জীবের জন্ম হলো তা পিতামাতার গুণাগুণ গ্রহণ করেও স্বতন্ত্র জীব, অভিনব জীব। এই নূতন সমম্বয়ে একটি ভাব আরেকটি ভাবে সম্পূর্ণ অনুপ্রবিষ্ট হয়, কোন জিনিষই তাতে অপরিবর্ত্তিত অবস্থায় থাক্তে পারে না।

 

মধ্যযুগে ভারতীয় সংস্কৃতির বিবর্ত্তনের বেলায় ঠিক এই জিনিষটিই ঘটেছিল। পুরাতন বিশ্বাস পরিবর্ত্তিত হলো, এমন কি পুরাতন বিষয়বস্তু পর্যন্ত নূতন ভাবদ্বারা উদ্দীপ্ত হলো। মননের ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্ত্তন ঘটেছিল এবং চিত্রকলা, স্থাপত্য ও কবিতার ক্ষেত্রে যে যে কীর্ত্তি সাধিত হয়েছিল তাদের কথা আমরা বলেছি। তবে তাতে সামান্য মাত্র বলা হয়েছে, কারণ জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সমন্বয়ের সেই একই ইতিবৃত্তের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একটি নূতন ভাষার জন্ম ও বিকাশের ইতিবৃত্ত ভালো করে জানতেই একজীবন কেটে যাবার কথা। ভারতীয় চিত্রকলা ও সঙ্গীতের সুর ও ভাবে যে সূক্ষ্ম পরিবর্ত্তন  সূচিত হয়েছিল তাও অনুরূপ চমৎকার অনুধাবনীয় বিষয়।

 

এই সমন্বয়ের প্রবণতা কিছু নূতন ব্যাপার নয়, কারণ প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশেও ঠিক একই জিনিস চোখে পড়ে। মধ্যযুগে যেকটি সংস্কৃতি সমম্বয়ের সাধারণ ক্ষেত্রে এসে মিলিত হয়েছিল তাদের প্রত্যেকটিই ছিল প্রাণ বন্ত, সংস্কৃতি তাই সংযোগ ও সমন্বয় সম্ভব হতে পেরেছিল। পাশাপাশি দুটি জড়পদার্থের পারস্পরিক মিলন ঘটে না। এই প্রাচীন দেশে শতসহস্র বৎসর আগে মানবাত্মার যে অভিযান সুরু হয়েছিল তার চলা আজও থামে নাই। ভারতীয় সংস্কৃতি প্রথম যুগে গভীর পরিবর্ত্তনের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। যখন উন্নত বৈদেশিক সংস্কৃতির সঙ্গের সংস্পর্শ ঘটেছে এ তাকে আত্মস্থ করেছে, এবং ফলে নিজে আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার আজও পরিসমাপ্তি ঘটে নাই। স্থান ও কালের ব্যবধান যতোই সঙ্কুচিত হয়ে আসবে মানবমনের কীর্ত্তি আরো বেশি সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে। এই অপরিসীম বৃদ্ধি ও নবীনত্বের ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতির ঐক্য ও ধারাবাহিকতার গোপন রহস্য।

 

(তৎকালীন বানানরীতি অনুসৃত)

(২২ ও ২৩ শে ডিসেম্বর ১৯৪৩-বরোদায় প্রদত্ত কীর্ত্তিমন্দির বক্তৃতা থেকে।)

‘শিল্পকে জনসাধারণের কাছাকাছি যেতে হলে বা জনসাধারণকে শিল্পের কাছাকাছি আসতে হলে প্রথমেই আমাদের যা করা উচিত তা হচ্ছে সংস্কৃতির ও শিক্ষার বর্ত্তমান স্তর উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।’লেনিন।

‘সংস্কৃতি তৈরী করে তুলতে হলে বাস্তব উৎপাদন-শক্তির খানিকটা উন্নতি, একটা বাস্তব ভিত্তি তৈরি করে তোলা দরকার’- লেনিন।

 

 

 

Facebook Twitter Email