হাসান আজিজুল হক : সরল জটিল গভীর

Facebook Twitter Email

চলিত ভাষায় গদ্যটাকে আয়ত্ত করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এ যেন একেবারে লাগাম ছাড়া ঘোড়া। এর কেশর ধরে কেবল ঝুলে থাকা যায়। তাতে এর চলনটা হয় খাপছাড়া এবং কখনো কখনো বেশ দৃষ্টিকটুও। সেই চলতি গদ্য দিয়ে বাংলাদেশে গল্প-উপন্যাস তো অনেকেই লেখেন। প্রবন্ধ লিখিয়েরও কমতি নেই। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই চলতি গদ্যকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমরা গুটিকয়েক লেখকের মধ্যে দেখতে পাই। আর এদেরই শীর্ষে থাকা লেখকটিই হচ্ছেন হাসান আজিজুল হক। গত শতকের পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান অব্দি হাসানকে বুঝতে তাই কেবল তার গল্প-উপন্যাস দিয়েই নয়, তাঁর চিন্তার বিবর্তনটাকে খেয়াল করতে হবে। খেয়াল করতে হয় শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর অভিমত ও বিশ্লেষণগুলো। বর্তমান রচনাটি তাঁর কথাসাহিত্য ও গদ্যসাহিত্যের মূল প্রতীতির কয়েকটি দিককে শনাক্ত করার একটা প্রয়াস মাত্র। বলে রাখা ভালো, এই লেখাটির মূল লক্ষ্য যারা হাসান আজিজুল হককে এখনো পড়েন নি বা পড়তে আগ্রহী- তারা।

 

প্রথমেই তাঁর সাহিত্যের মূল দিকটিকে লক্ষ করা যাক। এটা বোধ না করে পারা যায় না যে তাঁর কথাসাহিত্যের লক্ষ্য হলো ‘বাস্তবতা’। সাহিত্যে সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের নিজের লেখা এবং তাকে নিয়ে অন্যান্যদের নানান আলোচনায় একটি কথা ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হয়- ‘বাস্তবতা’। অনেক আগে একটি সাহিত্য পত্রিকায় তিনি ‘নিজের দিকে ফিরে’নামে একটি লেখা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি ‘কেন লেখেন’তাঁর জবাব দিতে গিয়ে বাস্তবতাকেই তাঁর লক্ষ্য হিসেবে হাজির করেন, ‘মানুষকে সামনে রেখেই আমাকে আমার চারপাশের জীবনের, আমার কালের, আমার পৃথিবীর বাস্তবকে ব্যাখ্যা করে যেতে হবে। তবে যদি আমার লেখায় বিন্দুমাত্র উপযোগিতা আমি খুঁজে পাই। যে বাস্তবের মধ্যে আমি বেঁচে আছি তার ব্যাখ্যাই আমার লেখার শেষ লক্ষ্য। আমি যে কেন লিখি এই তার কৈফিয়ত।’নিজের বেলায় তো বটেই, অন্য কারো বাস্তবতা নিয়ে কোনো দ্বিধা থাকলে হাসান সেদিকটায়ও আলো ফেলেন, তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সব দায় পাশ কাটিয়ে চলার জন্য সাহিত্যিক যখন বলেন তিনি সত্যিকার অর্থে কিছুই জানেন না একমাত্র নিজেকে ছাড়া তখন তিনি সত্যি কথা বলেন না। এই কথা বলে তিনি জানাতে চান বাইরের জীবনের তিনি দর্শক মাত্র। ভিতরে ঢোকার উপায় তাঁর নেই, কাজেই সব দরজায় তালা দিয়ে একমাত্র নিজের কথা বলাই সত্য বলার উপায় তাঁর। কিন্তু তিনি কি জানেন যে বাইরের জীবনের মতোই তিনি নিজেও নিজের জীবনের দর্শক মাত্র। যে বাস্তবের অংশ তিনি, নিজেকে দেখার ভিতর দিয়ে তিনি সেই বাস্তবকেই দেখে থাকেন? বাস্তবকে যেভাবে দেখতে তিনি বাধ্য হন সেইভাবে নিজেকেও দেখেন তিনি।’এবং এই লেখাটির শেষে একটির পর একটি প্রশ্ন তিনি নিজেকেই করেন, কিন্তু সেই প্রশ্নে আঁচ তো সাহিত্যের লেখক-পাঠক সবার মনে লাগতে বাধ্য, ‘যতদিন লেখক থাকবো বাস্তবের ভিতরের জল ও আগুনের গল্প লেখার চেষ্টা ছাড়া আর কি করতে পারি আমি? বাস্তবের গায়ে স্তরান্তরিত বাস্তবের প্রতিফলন ফেলার চেষ্টা ছাড়া? বাস্তবকে নিয়ে মোহসৃষ্টি নয়, কিন্তু বাস্তবের কোনো অংশেই কি মোহ নেই? যদি তা নাই-ই থাকে তাহলে বাস্তবের স্তরান্তর ঘটানোর চেষ্টার ব্যাখ্যা কি?’

 

তো কতটা নিপুণ করে বাস্তবকে ধরতে হবে- এতে তিনি যেমন আগ্রহী, তেমনি তিনি কতটা সমাজ-রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কথক হয়ে উঠেছেন- সেটি খতিয়ে দেখার অন্যদের প্রধান বিবেচনা হয়ে উঠেছে। যেমন দৃষ্টান্ত হিসেবে সনৎকুমার সাহা ‘হাসান আজিজুল হক : ফিরে দেখা’য় তিনি লেখেন, ‘হাসান একজন সত্যিকারের সাহিত্যিক হতে চেয়েছেন। শুধুই গল্প লেখক নয়। গল্প লেখার কৌশল জেনে অনেকেই হয়ত ভাল গল্প লিখতে পারেন; চমক আর নাটকীয়তা মিশিয়ে ভাষার যাদুতে মাত করে পাঠককে একবারে মজিয়ে দিতে পারেন। এগুলো সাহিত্যিক হবার পূর্বশর্ত অবশ্যই। কিন্তু শুধু এসবেই সাহিত্য হয় না। বাস্তবতার গভীরতর তল থেকে তার ভেতরের সত্যকে লেখায় তুলে আনতে না পারলে তা শুধু লেখাই থেকে যায়, সাহিত্য হয় না।’হাসানের ‘আমৃত্যু আজীবন’গল্পের সিদ্ধির কথা বলতে গিয়ে সনৎ লেখেন, “গীতা থেকে ক্যামুর ‘রেবেল’পর্যন্ত, মানুষকে যে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, দার্শনিক শিল্পী হাসান আমৃত্যু আজীবনে মানুষকে সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। অবশ্য কাহিনীকে তিনি স্থাপন করেছেন গ্রামবাংলার হতদরিদ্র কৃষকের সংগ্রামমুখর জীবনের রূঢ় বাস্তবতায়। এইখানেই হাসান বিশিষ্ট। গল্প তাঁর মাটির ঘনিষ্ঠতম কাছাকাছি মানুষের বাস্তবতার পট থেকে একচুলও বিচ্যুত হয় না।’’লক্ষ করি, হাসানও বাস্তব সম্পর্কে এই অনড়তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তেমন করেই সর্তক, ‘বাস্তব ডাইনে বাঁয়ে হেলে না। সে সিধে খাড়া থাকে। মন্ত্র পড়ে তার কিছু করা যায় না। গঙ্গাজল ছিটিয়ে তাকে বিশুদ্ধ করা চলে না। তাকে কোনোভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেও লাভ নেই।’’

আমরা জানি, পশ্চিমাসাহিত্য থেকে এই বাস্তবতা ফলানোর কাজটা বাংলাসাহিত্যকে এক সময় নতুন নির্মাণ দিয়েছিল। বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্য মেতে উঠেছিল বাস্তবতার লাঙল দিয়ে সাহিত্যের জমি চষতে। ততদিনে সেখানে পশ্চিমা সাহিত্যের জমিতে মর্ডানিজম বা আধুনিকতাবাদের ট্রাক্টর চলছে- সে হাওয়াও যে আমাদের সাহিত্যে লাগে নি তাতো নয়। জয়েস, প্রুস্তের চেতনাপ্রবাহমূলক ধারায় গোপল হালদার, ধূর্জটিপ্রসাদের মতো লেখকদের পাওয়া গেছে; কলমকুমার মজুমদারেরও এঁদের প্রভাব আছে। কিন্তু তার ভেতরেও রিয়ালিজম বা বাস্তবতাবাদের হাতটাই আসলে শক্তমতো ধরা ছিল। কারণ বাংলা উপন্যাস কেন উপন্যাস মানেই যেন বাস্তবতার ভূমিতে নামা চাই। অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতে, গল্পের গরু গাছে উঠতে পারে, কিন্তু উপন্যাসকে বাস্তব হতেই হয়, না হলে তা উপন্যাস হয় না।

ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই যে, সাহিত্যকে তো প্রথমত সাহিত্য হতে হবে, পরে সেটা বাস্তব হলো কিনা, প্রতীকী হলো কিনা, অ্যাবসার্ড হলো কিনা বা যাদুবাস্তব বা শ¬ীল বা অশীল- এসব দাগানা যেতে পারে। এর ভেতরে মূল বিষয়টি বোধ করি প্রথমেই বলা দরকার- সাহিত্য মূলত আদতে শেকড়গতভাবে একটি কাল্পনানির্ভর কাজ, বাস্তবতা এর কা-মাত্র। কল্পনা থেকে রস পেয়ে তাকে বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাওয়াটাই এখানে কাজের কাজ। সেখানে বাংলাসাহিত্যে দীর্ঘদিন একটা উলটা কাজ চলছে। বাস্তবতাকে সাহিত্যের মূল হিসেবে ধরে নিয়ে, বাস্তব থেকে দ্বিতীয় বাস্তবতা হিসেবে একে তৈরি করা হচ্ছে। অথচ কাজটি ছিল কল্পনাকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। সেখানে আমাদের সাহিত্যে কল্পনার ভূমিকা কেবল অনুষঙ্গ হিসেবে বা অনুঘটক হিসেবে। আমাদের কথাসাহিত্যের আগে বাস্তব, মধ্যে বাস্তব, পরে বাস্তব এবং সামগ্রিকভাবে বাস্তবতাই এর আরাধ্য বিষয়। এতে করে আমাদের সাহিত্য হয়ে গেছে প্রায় একরৈখিক। বাস্তবতার বর্ণনা ছাড়া কেউ খুব ঝুঁকি নিয়ে তেমন কাজ করেন নি। যে দুয়েকজন ব্যতিক্রমী কাজ করেছে, তাদের কথা মনে রেখেও বলা যায়, বোধ করি এ কারণে আমাদের গল্প-উপন্যাসে এক ধরনের চরা পড়েছে। ফলে সৃজনশীল সাহিত্য ততটা সৃজনশীল হতে পারছে না। কারণ এতে কল্পনাকে বাস্তব করে তোলা হচ্ছে না, হচ্ছে বাস্তব থেকে দ্বিতীয় বাস্তব নির্মাণের চেষ্টা। এজন্য আমাদের বেশিরভাগ লেখকের মনোজগতে একটি প্রবণতা গেঁড়ে বসেছে- যে কোনো কিছু লেখার জন্য একটা বাস্তব ভিত্তি চাই, চাই-ই চাই। বলতে গেলে কেউই  পিকাসোর মতো ভাবতে পারেন না বা জোরালোভাবে উপলব্ধি করেন না যে, – ‘একজন মানুষ যা কিছু ভাবতে পারে, কল্পনা করতে পারে- তা-ই বাস্তব।’ফলে যে বিষয়ের কোনো বাস্তবতা নেই, ন্যূনতম ঐতিহাসিক সত্যতা ও দলিলপ্রমাণ নেই, তা নিয়ে, তাকে ঘিরে কোনো কাহিনি তৈরি করার কাজটিই বলতে গেলে কেউ চিন্তা করতে পারেন না।

 

প্রত্যেকের প্রায় লক্ষ্য হলো- হয় বর্তমানের, নয়তো অতীতের কোনো একটি বাস্তব ঘটনা ধরে তারওপর কল্পনা আরোপ করা, কিন্তু সেটা কেবল বানানো অর্থেই কল্পনা, একেবারে নিপাট কল্পনা নয়। সেখানে বাস্তবের ‘ক’নামের চরিত্র ‘জ’নামে হাজির হচ্ছে মাত্র। কুমিল্লায় ঘটা ঘটনাকে সিরাজগঞ্জে নিয়ে হাজির করা হচ্ছে। বাস্তবতার একটা বিন্দু চাই-ই চাই। সেই বিন্দুতে ভর করেই তবে কাহিনির বাকি বৃত্ত কল্পনা করা যাবে। অথচ এর উলটোাটাই ছিল কাজ, তবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ- কল্পনাকেই মূলবিন্দু করে এমনকি বাস্তবতার কোনো ধার না ধরে তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। সেই ঝুঁকি বাংলাসাহিত্যে খুব বেশি লেখক গ্রহণ করেন নি।

 

আমরা বলছি না কাফকা, আইজ্যাক বেশেভিস সিঙ্গার, গার্সিয়া মার্কেস বা হোসে সারামাগো প্রমুখের মতো লেখাই লিখতে হবে। কিন্তু সাহিত্যের কত না অদ্ভুত দৃষ্টান্ত আছে। যেমন, আমরা যখন হোসে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব’উপন্যাসটি পড়ি, কারো মনে হবে না, এটি কোনো বানানো লেখা, অথচ এরকমটা তো কোনোভাবেই ঘটতে বা হতে পারে না- যেখানে হঠাৎ করে শহরের মানুষ একের পর এক অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ এই আজগুবি কাহিনিটা কতটা ভয়াবহ রকমের বাস্তব যে এই উপন্যাসটিকে জ্ঞানত আগাগোড়া অবাস্তব মনে হলেও এ উপন্যাস আমাদের এমন একটি সত্যে নিয়ে যায়, যা বর্তমান সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো বাস্তব ও চূড়ান্তভাবে সত্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস’নামের একটি লেখায় সারামাগোর এই উপন্যাস সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘পাঠ শুরু করার পরই বোঝা যায়, এটি একটি প্রতীকী উপন্যাস। প্রতীকী না রূপক, তাও স্পষ্টভাবে বলা যায় না। যদিও বর্ণনাভঙ্গি খুবই বাস্তবসম্মত এবং ন্যারেটিভ স্টাইল মেনে।’

 

সেখানে আমাদের লেখকদের দেখি, প্রায় প্রত্যেকের ইতিহাসের কোনো আলোচিত কি অনালোচিত বা নিজের জীবনের বা অন্যকারো জীবনে ঘটা কাহিনি নিয়ে তা থেকে কোনো লেখাকে দাঁড় করান। বরাবরই এই আক্ষেপ শোনা যায়, ইতিহাসের ওই ব্যাপারটা নিয়ে কেন কোনো উপন্যাস লেখা হলো না।

বলতে গেলে, এখনো অব্দি আমরা তেমন কোনো উপন্যাস আমরা পাই নি, সৈয়দ ওয়ালীউল্লার  ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র মতো দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, যা পড়ে মনে হবে, এই উপন্যাসের পুরো ব্যাপারটা লেখকের কল্পনা থেকে উদ্ভূত, অথচ এর চেয়ে গভীরসত্য বা বাস্তব আর কিছু হতে পারে না। ফলে সালমান রুশদির মতো লেখক যিনি বলতে গেলে নিজের মগজেই তার উপন্যাস সৃষ্টি করেন, কল্পনাকে বাস্তব করে তোলেন, সে রকমের গল্প উপন্যাস আমাদের এখানে প্রায় লেখাই হয় না।

 

আমরা বলতে চাইছি, কল্পনার যে বিরাট ক্ষমতায় গল্প-উপন্যাসকে জারিত করা যায়- সেখান থেকে প্রচলের সীমাভাঙা বাংলা গল্প-উপন্যাস আমাদের ঐতিহ্য থেকে নির্মাণ করার মন-মানসিকতায় আমরা কবে পৌঁছাবো? বাস্তব থেকে সাহিত্য নির্মাণে সীমাবদ্ধতা বা সীমাবদ্ধ বাস্তব থেকে সাহিত্যে দ্বিতীয় বাস্তব তৈরি নিগড় থেকে আমরা কবে আমাদের রেহাই মিলবে। আমাদের লেখকরা কল্পনার শক্তিতে আস্থাশীল হতে পারবেন। সম্প্রতি নোবেল পুরস্কার পাওয়া চীনের মো ইয়ান ও জাপানের হারুকি মুরাকামির কথা বাদই দিলাম রবীন্দ্রনাথের চষাভূমি থেকে যে বাংলাসাহিত্যের নতুন বীজবপনের অপেক্ষা করছে, তার দিকে আমাদের যেতে দ্বিধা কাটে নি।

এটি বলতে হচ্ছে, জোর দিয়ে বলতে হচ্ছে, কারণ সাহিত্য যে এটি ‘ইমাজেনেটিভ’কাজ, শিল্পকর্ম যে বাস্তবতাকে উতরে তৈরি হয়- তার সমর্থন আমরা কোথাও খুব একটা পাই না। সাহিত্যের কাছে আমাদের মূল দাবি যেন এতে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকতেই হবে।

কথাসাহিত্যে এই প্রবণতার অভাবের কথা বলা হলো, এখন যদি বলি আমাদের সাহিত্য নিয়ে যে সব প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, তাতেও সে ব্যাপারে খুব একটা সমর্থন নেই। রবীন্দ্রনাথের মতো খুব কম ব্যক্তিই মানসলোক থেকে সাহিত্যলোকে ভ্রমণ করেছেন। ত্রিশের দশক থেকে শুরু হয় সমাজবাবস্তবতার চল এমনই এ ধাক্কা দিয়েছে যার তরঙ্গ আমাদের সাহিত্যের শিরা-ধমনীতে এখনো প্রবাহিত। সেই তুলনায় শিল্পকলায় বাস্তবতাকে অচল করে যে আধুনিকতাবাদ জন্ম নিল, যেখানে বলা হয় সাহিত্যে বাস্তবতা ফলানোর ব্যাপারটাই সবচেয়ে বড়ো প্রতারণা, এটা একটা ছল ছাড়া কিছু নয়, তেমন প্রতীকবাদের কিছু দৃষ্টান্ত বাংলাসাহিত্যে মাঝেমাঝে তৈরি হলেও, এই বিশ্বাস দৃঢ় ও স্পষ্ট হয়েছে যে- ও দিয়ে বাংলাসাহিত্যের পোষাবে না। কারণ জেমস জয়েস বা মার্সেল প্রুস্ত বা টমাস মান যে সমাজমানস ও জীবনচেতনা থেকে সাহিত্য নির্র্মাণ করেন, আমাদের সংকটগুলো সেখানে পৌঁছায় নি। আমাদের সংকট এখনো একেবারে ‘ফটোগ্রাফিক’, একেবারে খোলাভাবে সেগুলোকে দেখা যায়, ফলে সাহিত্যিক এদেশে এখনো একজন রিপোর্টারের বেশি ভূমিকা নেওয়ার দরকারও নেই, সুযোগও নেই। রিপোর্টারের সঙ্গে পার্থক্য হলো তার লেখাটি কেবল তাৎক্ষণিক একটি বিষয়কে হাজির করে, আর সাহিত্য সেটিকে তাৎক্ষণিকতার সীমা থেকে বের করে নিয়ে আসে।

জীবনের গভীর সংকট, আত্মিক অসুখের গভীর ও দার্শনিক সংকটের জায়গা থেকে আমাদের সাহিত্য এখনো দূরে, কারণ হয়ত সেই দার্শনিক জায়গাটির শূন্যতা সম্পর্কে এদেশের লেখক ও পাঠক কেউ অভাববোধ করেন না।

 

ঠিক এই জায়গাটি থেকে আমরা হাসান আজিজুল হকের কাজগুলোকে দেখার চেষ্টা করতে পারি। কারণ আমাদের সাহিত্য ও সৃজনের রুচি নির্মাণে যে-কজন লেখকের রচনা নিত্য সহায়তা দিয়ে থাকেন তার ভেতরে তিনি অন্যতম, প্রধানতম বললেও অত্যুক্তি হবে না। যদিও তাঁর প্রধান পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে ছোটোগল্পকার হিসেবে কিন্তু প্রবন্ধ ও গদ্যরচনাও যে তাঁর ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কোনো অংশে কম উজ্জ্বল নয়, তা বিশেষভাবে বোধ করার সময় এসেছে। এসেছে নতুন করে তাঁকে পাঠ করার। কারণ তা আরো আগেই থেকে বোধ করার কথা ছিল। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত দিক তিনি তার প্রবন্ধে যেভাবে তুলে এনেছেন, সেখানে তাঁর ছোটোগল্পের জায়গাজমিকে এখন কারো কারো কাছে অপেক্ষাকৃত সীমাবদ্ধও মনে হতে পারে। এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, মানুষের মৌলিক অধিকারে এমন দিক নেই যা তার কলমে উঠে আসে নি। ‘কথাসাহিত্যের কথাকতা’র পরের প্রতিটি প্রবন্ধের বইতে তিনি সেই জায়গাগুলোকে খতিয়ে দেখেছেন, আমাদের দেখিয়েছেন। বাংলাদেশে সামগ্রিক সংকট ও সম্ভাবনার গভীর সব দিকের উন্মোচনকারী লেখক তিনি- বাংলাদেশের প্রধান এক কণ্ঠস্বর।

 

তাঁর এই যে কণ্ঠস্বর আমরা আমাদের সামাজিক-সংস্কৃতিক পরিম-লের ভেতরে বেজে উঠতে দেখি, সেই কণ্ঠস্বর আমরা সাহিত্যের বেলায় একইভাবে পাই, পাই বাস্তবতা উতরে গিয়ে কল্পনার সেই মাত্রাকে স্পর্শ করতে, যেখান থেকে সৃষ্টি হয় ‘শকুনে’র মতো গল্পের, ‘বিধবাদের কথা’র মতো উপাখ্যানের। আবার সেই হাসান আজিজুল হক যখন উপন্যাসের দিকে পা ফেলেন তিনি বাস্তবতার নিরিখ ছাড়া প্রায় এগুতে পারেন না। ফলে ‘আগুনপাখি’র মতো লেখা বা সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’আমাদের মানসলোকে সেইভাবে ঘা দেয় না, যতটা তার ‘শকুন’বা ‘বিধবাদের কথা’দেয়। অথচ কী তীব্র ও মর্মস্পর্শী গদ্যে এদের বয়ান। দুটো উপন্যাস তার প্রখর তীক্ষè ও তীরের মতো স্ট্রেইটকাট অর্থে সরল-সোজাসাপ্টা গদ্য আমাদের মাতিয়ে দেয়। কিন্তু শেষাবধি এর পরিণতিতে মনে হয় ছোটোগল্পের ‘জটিল হাসান আজিজুল হক’, প্রবন্ধের ‘গভীর হাসান আজিজুল হক’উপন্যাসে এসে একটা সরল অবস্থান গ্রহণ করেন। তার মানে এই নয় যে, তাঁর উপন্যাসে জটিলতা নেই বা গভীরতা নেই- কিন্তু আবেদনের সামগ্রিকতায় ‘সরলতা’ই এখানে শিরোপা পরে।  যেভাবে তার বেশির ভাগ গল্পে পাঁক খায় জীবনের জটিলতা উপন্যাসে সেখানে মূলত সরলতা মাখানো।

 

একথাও অনেকে হয়ত মানবেন (কেউ কেউ হয়ত নাও মানতে পারেন) তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেক সরল গদ্যে তিনি হাজির করেন পরিস্থিতি ও চরিত্রদের। পঞ্চাশ ষাট দশকের লেখকদের তৎসম ও তদ্ভব শব্দে ভারী হওয়া গদ্যের বিপরীতে হাসান আজিজুল হকের গল্পের গদ্যশৈলী মিলিয়ে দেখলেই বোধ করি এর সত্যতা পাওয়া যাবে। সৈয়দ ওয়ালীউল্ল¬াহ্র গদ্যেও আমরা তদ্ভব-তৎসম শব্দের ভার দেখতে পাই। সেখানে হাসান আজিজুল হক ক্রমে গদ্যকে এমন এত স্তরে নিয়ে যান, যেমনটা রবীন্দ্রনাথ তার শেষ পর্যায়ের কবিতাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারো কারো মতে তাঁর সেইসব কবিতা ছিল অলংকারহীন, নিরাভরণ এবং নগ্ন। যেমনটা ‘অন্ধত্ব’উপন্যাসে সারামাগোর গদ্য হয়ে উঠেছে ‘বিবস্ত্র গদ্য’। এমন নগ্ন গদ্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেলায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যা সরল তা নগ্ন হতে পারে, যা নগ্ন তা-ই যে কত সরল হতে পারে হাসান আজিজুল হকের গদ্যও এর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। যেমন তাঁর একবারে শুরুর দিককার এবং একেবারে সাম্প্রতিক সৃষ্টি থেকে নিচে দুটো অনুচ্ছেদ আমরা একটু দেখে নিতে পারি-

ক. ‘একটা দমকা বাতাসে অজস্র শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। পুকুরের পানিতে প্রথমে মৃদু কম্পন, তারপর আস্তে আস্তে ঢেউ উঠল- কার হাত থেকে কোথায় ধাতব কিছু পড়ে বিশ্রী অস্বস্তিদায়ক একটা শব্দ হলো।…

 

…রফিক এগিয়ে শকুনটার ডানা ধরে ফেলল। ততক্ষণে চেতে উঠল কুৎসিত পাখিটা, অত সহজে সে ধরা দিতে চায় না। নোংরা বিরাট দুটো পাখা মেলে বিচ্ছিরি নখওয়ালা পা দুটো চরম ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চালিয়ে দৌড়াতে শুরু করল সে গাঁয়ের সরু গলিটার মধ্যে দিয়ে।

এইভাবেই ওরা ওড়বার প্রস্তুতি নেয়, ভারমুক্ত করবার চেষ্টা করে নিজেকে। বোধ হয় সে শেষ পর্যন্ত উড়তে পারত- অন্তত মুক্তি পেত এই অসহনীয় শিশুদের হাত থেকে- তাদের হিংস্র কৌতূহল আর প্রাণান্ত খেলার খপ্পর থেকে। কিন্তু তার চোখে দৃষ্টি নেই- চলার কোনো সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য নেই। শকুনটার মাথা ঠুকে গেল দেয়ালে। পেছনে পেছনে একদল খুদে শয়তানের মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ ছেলের দল নিষ্ঠুর আনন্দে ধাওয়া করছে।’’ (গল্প: শকুন)

 

খ. ‘নলিন কি বলল তাতে এক ফোঁটও কান দেয় নি দুর্গাপদ, বটকৃষ্ণ আর সবুর। তাদের হাতে একটু সময় ছিল না। ঘাড়ের ওপর হাত-পা ছুঁড়ছিল একটা ষোল বছরের ছুঁড়ি। গাঁয়ের মেয়ে, গায়ের জোর কম নয়। আধবয়েসী বক্না বাছুরের মতো উল্টাপাল্টা হাত-পা ছুঁড়চে, শাড়ির প্রায় সবটাই মাটিতে লুটোচ্ছে। তাতে একটুও পরোয়া নেই, দুর্গাপদ এক হাত দিয়ে চেপে আছে তার মুখ, যেন একটুও আওয়াজ করতে না পারে, তার অন্য হাত সাবিত্রীর খোলা স্তন দুটির ওপর কঠিন হাড়ের মতো চেপে আছে। জ্যোৎস্নার আলোয় সেই স্তন দুটো উথালা-পাথাল নাচছে। বর্ষাকালের প্রবল বর্ষণের সময় দিঘির জল টগবগ করে ফোটার সময় কুঁড়ি পদ্ম যেমন নাচতে থাকে, তেমনি নাচছে সাবিত্রীর মুক্ত স্তন দুটি। কিন্তু দেখার মানুষ নেই। দুর্গাপদও এখন অন্ধ, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। এই দুঁদে মেয়েটিকে এখন যত তাড়াতাড়ি পারে অজয়ের ও-পাড়ে নিয়ে যেতে হবে। বটকৃষ্ণ ধরে আছে তার পা দুটো, সবুর ধরেছে দুখানি হাত। জ্যোৎস্নায় এখন অজয় দেখা যায়। সে তো আবার নদ! দুর্গাপদদের দলে। আশ্চর্য নির্জন করে রেখেছে তার দুই পাড়।’ (উপন্যাস: সাবিত্রী উপাখ্যান)

প্রথমটিতে একটি শকুনকে নিয়ে নিষ্ঠুরতা আর দ্বিতীয়টিতে একটি নারীকে ভোগের জন্য কব্জা করার বর্ণনায় এত বছর পরও কি কোনো মিল কি পাঠক দেখতে পাচ্ছেন? সেই সঙ্গে প্রকৃতি সৌন্দর্যের সঙ্গে মানুষের ভয়াবহ নির্মমতার যে ভঙ্গি- এই ভঙ্গি হাসানের বিশিষ্ট ভঙ্গি।

 

২.

হাসান আজিজুল হকের ছোটোগল্পের গদ্য এবং তার প্রবন্ধের গদ্য দুয়েরই মূল বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতা। যদিও ‘আমৃত্যু আজীবন’বা ‘জীবন ঘষে আগুনে’র মতো গল্পের গদ্যের জটিলতা তার গদ্যের ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্ত। কিন্তু তাতেও সরলতা ও দৃঢ়তার কি অসামান্য মিশ্রণ-

“করমালি দুর্ভেদ্য রহস্যের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়। সে দেখতে পায় বিলেন পানি থেকে তার কুচকুচে কালো ঠোঁটদুটি জেগে উঠল, তারপর স্বচ্ছ বিমর্ষ চোখদুটি আর ধারালো তলোয়ারের মতো ছিপছিপে লিকলিকে জিভ এবং সে থুতুর মতো নীল বিষ ছিটোল। তারপরই অকস্মাৎ বিস্তৃত ফণার মাথাটা শূন্যে লাফিয়ে ওঠে। বিশাল পুকুরের মতো ফণা- সেখানে গোক্ষুরটি ধপধপ করেছে।’’ ( আমৃত্যু আজীবন)

বা

‘সমস্ত দৃশ্যটি বর্তমানে পরিপাটি। দীঘির পশ্চিম পাড়ে উচ্চতম স্থানে জনতা- সেই গম্ভীর নামাবলী সান্ত¡নাপরায়ণ পুরোহিত- সেই অতিরাগান্বিত জলবিদ্যুৎ বর্ষণকারী তেঁতুল বাগদির দল- বর্তমানে কিয়দপরিমাণে নমিত; পশ্চিমে পাড় ঢালু হয়ে নিম্নে নামে- পাড়ের শেষে আদিগন্ত অকর্ষিত ধান্যক্ষেত। মেঘসকল একাকার, পশ্চিমে হিংগুল বর্ণ, আকাশ ভারী থমথমে, চুপচাপ,- বায়ু সম্পূর্ণত স্থির, যেনবা আতঙ্কগ্রস্ত। এইবার সমবেত যুবকদল হইহামারি সহকারে হলযুক্ত ষাঁড়দুটি নিয়ে ধান্যক্ষেত্রে নামে- উৎসাহে তাদের হৃদপ-ি দ্রুত ধাবিত, পা নিশপিশ, অতি ক্ষিপ্র।’ (জীবন ঘষে আগুন)

কিন্তু ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’থেকে ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প’পর্যন্ত তাঁর গদ্যের বিকাশ ওই স্পষ্টতা ও প্রাঞ্জলাকেই দেখিয়ে দেয়। এই গদ্য আরো স্পষ্টতা ও সরলতা পায় তার দুটো উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’-এ। বলাবাহুল্য হাসানের গদ্যের সরলতায় সর্বত্রই সবলতা প্রবল। এই গদ্য পড়তে যতটা সহজ, আয়ত্ত করা ততটাই কঠিন। সেই বলিষ্ঠ সরল গদ্যেই তিনি লিখে গেছেন তার গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধ। আরও একটি বিষয় খেয়াল করার ছোটোগল্প ও উপন্যাসে হাসানের গদ্যের আবেদন একজন কবির। অন্যদিকে প্রবন্ধের গদ্যের আবেদন একজন দার্শনিকের। এর পাশাপাশি হাসান আজিজুল হক আরেক শ্রেণির রচনা লিখেছেন যা ওই গল্প বা প্রবন্ধের সঙ্গে যায় না। এর ভেতরে পড়ে ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’, ‘একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা’র মতো লেখা। সেখানে তিনি যে পরিস্থিতিগুলো হাজির করেছেন তা গল্প-উপন্যাস না হয়েও তার মাত্রা ও অভিঘাতের তীব্রতায় কোনো কমতি নেই। চালচিত্রের খুঁটিনাটি-র দূরবাসী লেখাটির যেই অংশটি তুলে ধরা যাক, এ নিয়ে শিবনারায়ণ রায়ের মন্তব্যটিও আমরা দেখে নিচ্ছি-

‘নিজের দেহের ভিতরটা মনে হয় জংধরা পুরোনো মেশিন… খেয়াল করে দেখি ব্যাগ খালি, মাথার ভিতরটা খালি, বুকের ভিতরে কতকগুলো জবরজং যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। …অনেকদিন আসা হয় নি। তবু চিনতে পারি। ডোবার কালো পচা পানি স্থির হয়ে আছে।…

দরজা খুলে যায়… আধময়লা শাদা শাড়ি পরা কোলকুঁজো ছোট মানুষটি কতো দূরে দাঁড়িয়ে- এতদূর এলাম। কিছুতেই মেঝেটুকু পেরিয়ে তাঁর কাছে যেতে পারি না।… আমি তাঁর নষ্ট ঘোলা চোখ দুটি দেখলাম। মুখের চামড়ায় ধরেছে পোড়া কালো রং, অসংখ্য ভাঁজে জীর্ণ কাগজের মতো রসহীন কপাল, শনে নুড়ির মতো পাকা এলোমোলো চুল…

মা সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। সম্ভব হয় না। নিজের বেতো অথর্ব শরীরটা নিয়ে তিনি হাঁজর পাঁজন করে আমার দিকে এগিয়ে এসে প্রথমে দুহাত দিয়ে আমার দুহাত ধরেন। খর্খরে শুকনো হাত একট টুকরা শিরীষ কাগজের মতো আমার হাড়ের উপর দিয়ে চলে যায়। তাঁর মুখের ভাঁজগুলো আরো ট্যারাব্যাঁকা হয়ে ওঠে। আমরা বুকের কাছে তাঁর শাদা মাথাটা ঘনঘন ঝাঁকুনি খেতে থাকে।… তারপর কি অসম্ভব ব্যাকুলতার সঙ্গে আমার মাথাটা টেনে নামিয়ে, টেনে অনেকটা নামিয়ে আমার গালে শব্দ করে চুমো খান- তারপর অন্যগালেও।

আমি কেন স্তম্ভিত হয়ে যাই?… প্রচ- অদৃশ্য চড়ের ভয়ে দুগাল যে আমার সিঁটিয়ে থাকে। মায়ের মুখের লালায় সেই গাল একটু ভিজে যায় আর কানের কাছে আবার ফেটে পড়ে সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ- মরুভূমির হাওয়ার মতো। যার উপর দিয়ে যায়, শুষে নেয় তার রসটুকু।

… কিন্তু আমি কিছুই বোধ করি না। কোথাও নাড়া খাই না। কিছুই জেগে ওঠে না, ব্যাগ কাঁধে জানোয়ারের মতো দাঁড়িয়ে থাকি- কিছুতেই যোগাযোগ হয় না।’

শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, বর্ণনাতে এই নিস্পৃহতা ও আবেগহীনতায় হাসান এক প্রবল ব্যতিক্রম, সবচেয়ে বড়ো কথা, “ইউরো-আমেরিকান লেখকদের অনুকরণে পশ্চিমবাংলার অনেক সমকালীন কাহিনিকারই ‘অ্যালিয়েনেশন’কে তাঁদের লেখার উপজীব্য করেছেন। কিন্তু হাসানের আট পৃষ্ঠার স্কেচে যে অনতিক্রম মানস ব্যবধানের আভাস দিয়েছেন পশ্চিমবাংলা এখনকার গল্প উপন্যাসে তার তুলনা দেখি না।

যে নাড়িটা দিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে বাঁধা ছিলাম, জন্মের পর মুহূর্তেই কেউ তা কেটে ছিন্ন করে দিয়েছে।…

কাল সকালে উঠেই ফিরতি বাস ধরতে হবে। আমি হাত-পা টান টান করে দিয়ে আবার ছাদের দিকে চেয়ে থাকি।”শিবনারায়ণের সঙ্গে আমরাও বলতে বাধ্য হই, ‘যেমন নির্মেদ গদ্য তেমনই নিরুচ্ছ্বাস আর্তি। নিঃসর্তকভাবে তারিফ করার মতো লেখক হাসান আজিজুল হক।’’লক্ষণীয় শিবনারায়ণ রায়ের কথাটি যে, ‘নিঃসর্তকভাবে তারিফ’না করে পারা যায় না হাসানকে।

ইদানীং হাসানের অনেক লেখা তৈরি হচ্ছে মুখের কথা ধরে। যেগুলো পরে লিখিত আকারে সম্পাদিত। মনে রাখার দরকার, তার সাক্ষাৎকার ও বক্তৃতাতেও এমন এক ভঙ্গি থাকে, তাতেও লেখক হাসান আজিজুল হকের কথক হিসেবে ভিন্ন আমেজ পাওয়া যায়। ফলে ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, আত্মকথা, আত্মজীবনী, সাক্ষাৎকার, বক্তৃতা থেকে তার নিজস্ব শৈলীর মূল যে দিকটা প্রকটিত সেটি হলো জটিল বিষয়ে তার সরলতা ও গভীরতাময় বিচার বিশ্লে¬ষণ। যেমন এদেশে কয় ধরনের সংস্কৃতি আছে?- তিনি উত্তর খুঁজেছেন তিনি এভাবে-“এই প্রশ্নের সহজ জবাব হচ্ছে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ললাটে যতোগুলি সরকার এসেছে, ঠিক ততগুলি সংস্কৃতিও পিছু পিছু এসেছে।’’এ বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি যা বলেন, বর্তমানেও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক,- “পাকিস্তানি আমলে প্রধান যে দুটি মশলা দিয়ে সংস্কৃতি রান্না হতো, সে দুটি মশলা হচ্ছে ইসলাম ও সাম্প্রদায়িকতা। এতদিন পরে ঐ দুটি মশলারই তীব্র ঝাঁজ আবার পাওয়া যাচ্ছে। এইখানেই বলে রাখি, যে ইসলামের কথা বললাম তা এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ইসলাম নয়, ধর্মের সঙ্গে প্রকৃতপ্রস্তাবে তার কোনো যোগ নেই। এ ইসলাম হচ্ছে রাজনীতির ইসলাম, যোগ যার ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে। সোজা কথাটা হচ্ছে, সরকারি সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন সরকারের তৈরি করে নেওয়া সংস্কৃতি, সরকারের প্রয়োজনেই তার সৃষ্টি প্রসার ও শ্রীবৃদ্ধি। ক্ষমতাসীন সরকার মাত্রেরই দধির অগ্র ও গোলের শেষ বরাদ্দ, কাজেই সরকারি সংস্কৃতির পক্ষে চর্তুদিকে কাড়া-নাকাড়া বাজতে থাকে, তার উপর পালিশ পড়ে, অগ্রসর বিজ্ঞানযুগের সব সুবিধা তার উপরেই বর্ষিত হয়, রেডিও, টেলিভিশন, কব্জা-করা খবরের কাগজ, ধুলো পড়ার মুখে ফণা গুটোনো সাপের মতো নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি সংবাদপত্র সবকিছুই তার পক্ষে তাল ঠুকে নেমে পড়ে। তখন সাংস্কৃতির আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়- কোনো বিবেচনাই আর সামনে আসতে পারে না।’’১৯৮৪ সালে ‘বাঙালি সংস্কৃতি : গ্রহণ বর্জনের সংকট’প্রবন্ধে তিনি এই যে কথাগুলো বলেছিলেন তাঁর মোচড় এখনো পাঠক মাত্রই অনুভব করবেন। এমন আরো অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়, প্রতিপদে তিনি আমাদের সমাজ সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের সংকটগুলো চিনিয়ে দিয়েছেন, সহজভাবে তুলে এনেছেন জটিলবিষয়গুলো, সেখানে ফুটে উঠেছে তার বক্তব্যে গভীরতা।

বোধ করি এটি হাসান আজিজুল হকের সবচেয়ে বড়ো দিক যে, তিনি জটিল বিষয়ের বিচিত্র স্তরী খোসল উন্মোচন করে সরলভাবে একে উপস্থাপন করেন এবং তা থেকে আমাদের এক গভীর উপলব্ধির দিকে চালিত করেন। এ কারণেও হাসান আজিজুল হক সরল জটিল ও গভীর।

তাঁর সরল জটিল ও গভীরের সবসময় থাকছে দেশ ও কালের সংকট সম্ভবনা এবং আড়ালে পড়ে থাকা বাস্তবতার উপস্থাপন। দেশ-কাল ও পটভূমি বাদ দিয়ে তো তাকে ভাবা যায় না। দেশের মানুষ ও এর ইতিহাসের চলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই তিন মাত্রায় হাসানকে আমরা খুঁজে পাই।

সব দেশের মতো বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির ভাঙাগড়া আছে। এর সমান্তরালে চলেছে তাঁর লেখালেখি। তাঁর জন্মের সময়ের অবিভক্ত বাংলা থেকে বর্তমান সময় অব্দি তার লেখার সীমানা ক্রমে প্রসারিত। আর তাঁর লেখার অঞ্চল মূল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চল। সেই জায়গায় থেকে এসেছে তাঁর দেখা মানুষ ও মানবিক পরিস্থিতির বর্ণনা।

পূর্ববাংলার মানুষ দ্বিজাতিতত্ত্বের আদর্শ ও মতবাদের ভূতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁরা টের পেল কী ভয়াবহ ভ্রান্তির ফাঁদে তারা পা দিয়েছে, সেখানে থেকে শুরু হল আতঙ্ক এবং একই সঙ্গে নতুন স্বপ্নে দেখা। মনে পড়ে যায় ইউজিন আইনেস্কোর কথা- ‘মতবাদ, আদর্শবাদ আমাদের বিভক্ত করে, কিন্তু স্বপ্ন ও আতঙ্ক আমাদের একতাবদ্ধ করে।’মনে করতে হয় বদরুদ্দীন উমরের কথায়, ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়েই বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটল। বাঙালি দেখতে  পায় ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তায় নিহিত আছে বাঙালির আত্মবিকাশের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূর্ববাংলার মানুষকে নিয়ে এল বাংলাদেশের বাস্তব ভূমিতে। স্বভূমি ও স্বভাষার প্রতি টান বোধ করার সেই মানসকাঠামো থেকে নতুন কৃষ্টি ও সৃষ্টির দৃষ্টিটা তৈরি হয়েছিল।

 

হাসান আজিজুল হকের নির্মাণভূমিকে এখানটা থেকেও দেখতে হয়। তাঁর গল্পের মূল দিক বাংলাকে তাঁর উচ্চাশার ভূমি ও উচ্চাশার ভাষা করে তোলা (এটা কখনও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, তিনি আদতে এক দেশহারা উদ্বাস্তু মানুষ, ফলে বাংলা ভাষাই তাঁর একমাত্র দেশ), বাংলাভাষাকে কাজের ভাষা করে তোল- কি জীবনে কি সাহিত্যে। এ জায়গা থেকেই তিনি হাজির করেন তার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-আত্মকথায় এদেশের পরিস্থিতি ও মানুষদের। মূলত ঘটনার পাকচক্রে পড়া মানুষের বাহ্যিক ও মনস্তত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলোর দেখা মিলে তাঁর লেখায়। এমনকি প্রান্তিক মানুষের ব্যক্তিসত্তার মনোজগতের গভীরগামী তাঁর গল্পেগুলোর লক্ষ্য বাস্তবতার কুটিল বিন্যাস এবং সেই বাস্তবতা স্থানিক বা আঞ্চলিকতাভিত্তিক করে তাঁর গল্প উপন্যাসকে গড়ন-গঠন দিয়েছে। এজন্য কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, তাঁর ছোটোগল্পের যে-তিনটি পর্ব আছে, সেগুলো মূলত স্থান ও স্থানান্তরের দিক থেকে শনাক্ত করা যেতে পারে। প্রথম পর্বটিতে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ তথা রাঢ়বঙ্গের জীবন ও মানুষ; দ্বিতীয় পর্বটি মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতে ও চক্রাবর্তে পড়া বাংলাদেশের মানুষ, তৃতীয় পর্বটি সংকটপন্ন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে থাকা মানুষের জীবন।  প্রথম পর্বে পাই দুটো বই ‘সমুদ্রের স্বপ্ন ও শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’এবং ‘জীবন ঘষে আগুন’। পরের পর্বের মূল বই ‘নামহীন গোত্রহীন’। এরপরের বইগুলো- ‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘আমরা অপেক্ষা করছি’,  ‘রোদে যাবো’, ‘মা- মেয়ের সংসার’  ও ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প’য় এসেছে বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী জটিল পরিস্থিতির অভিঘাতে তৈরি একেরপর এক গল্প। আপাতত ‘বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প’ই তাঁর শেষ গল্পগ্রন্থ। তাঁর প্রায় সব গল্পের বইতে পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা প্রামাণ্য হয়ে আছে।

এর পাশাপাশি তাঁর প্রবন্ধের বইগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক। শুরু হয়েছিল সাহিত্য-জিজ্ঞাসা নিয়ে, মানে প্রথম প্রবন্ধের বই ‘কথাসাহিত্যের কথাকতা’য় সব প্রবন্ধই লেখা ও লেখকদের নিয়ে লেখা। এরপরে ‘অপ্রকাশের ভার’, ‘অতলের আঁধি’, ‘কথা লেখা কথা’, ‘লোকযাত্রা আধুনিকতা সাহিত্য’, ‘সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য রচনা’, ‘ছড়ানো ছিটানো’, ‘কে বাঁচে কে বাঁচায়’, ‘বাচনিক আত্মজৈবনিক’এবং ‘চিন্তন-কণা’লিখতে লিখতে তিনি পেরিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের মানুষের সংক্ষোভ এবং নিজের ব্যক্তিগত সংকর্ষগুলো। এগুলো থেকে তার চিন্তার ক্রমবিবর্তন স্পষ্টত পড়ে নেওয়া যায়।

 

‘সক্রেটিসে’র মতো বইও হাসানের আরেক পরিচয়ের স্মারক। ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’, ‘একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা’এবং ‘টান’তাঁর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও বিশে¬ষণী বই; আছে ‘লন্ডন ডায়েরি’র মতো দিনপঞ্জি এবং গ্রন্থকারে অপ্রকাশি চিঠিপত্রের সম্ভার, সেটিও বোধ করি আকারে প্রকারে কম বড় নয়। ‘চন্দর কোথায়’নামের অনূদিত নাটক ও ‘জি.সি. দেব রচনাবলী’সম্পাদনা তাঁর ভিন্নধর্মী দুটো কীর্তি। কিশোরদের জন্য ‘লাল ঘোড়া আমি’ও ‘ফুটবল থেকে সাবধান’, আত্মজীবনী ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’, ‘উঁকি দিয়ে দিগন্ত’তে এসে হাসানের সেই সরল জটিল গভীরতা ক্রমে সম্পন্ন থেকে সম্পন্নতর হতে থাকে। এবং তাঁর আরো একটি স্রোত আছে যেখানে  পটভূমিকে আরো একটু ছড়িয়ে তিনি দেখতে চেয়েছেন দেশ-মানুষ ও দেশ-মানসের সরল জটিল গভীর চলনের পরম্পরা। দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘বৃত্তায়ন’, ‘শিউলি’র সঙ্গে এতে যোগ হয় আর যোগ হয় দুটো উপন্যাস- ‘আগুনপাখি’এবং ‘সাবিত্রী উপখ্যান’।

আপাতত ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’তাঁর এখন পর্যন্ত শেষ গ্রন্থ। এছাড়াও তার বেশ কিছু লেখা, বক্তৃতা এখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। কোনো কোনোটা নিয়ে একটা দুটো বই প্রকাশের অপেক্ষায়। তিনি যেহেতু এখানো ক্রিয়াশীল এবং পত্রপত্রিকার কিছুদিন পর পর তার নানান লেখা প্রকাশিত হয়ে চলেছে ফলে তার সম্পর্কে তো শেষ কথা বলার সময় আসেনি। আর তাঁর মতো লেখক সম্পর্কে শেষ কথা বলার কোনো সুযোগ বোধ করি মিলবেও না। কিন্তু তাঁর মূল প্রবণতাটি বোধ করি ওই আমরা যা বলে আসছি তা-ই রয়ে গেছে, এবং সেটি দিনে দিনে তীক্ষ্ণ তীব্র এক সরলতার আকার পেয়ে চলেছে।

Facebook Twitter Email