ঢোঁড়া সাপ

Facebook Twitter Email

Tahmina Shamiতখনও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ ঢুকে নি, বউ-ঝিরা গতরাতের কালি মুছে কেরোসিনের হারিকেনে সাঁঝবাতি দেয়, স্নিগ্ধ অথচ বুনো স্বভাবী ঝোপ জঙ্গলগুলো ফুলে-ফলে তরতাজা, কাঁঠাল  গাছ  কোটরবাসীদের অভয়ারণ্য।

এরশাদ স্বরচিত গানের রেকর্ড বাজিয়ে গামবুট পড়ে দলবলসমেত বন্যার পানি দাপিয়ে ছবি তুলে বেড়ালেন- সেই স্মৃতি তখনো টাটকা, দেশের মানুষ চেটেপুটে একটিই সরকারি চ্যানেলের যাবতীয় অনুষ্ঠান থেকে রস সংগ্রহ করে, সেই সময়ের কথা।

পাড়ার লোক আত্মীয়-স্বজন আড়ালে বলে ওজিফার মতো জেদী একরোখা মেয়ে একযুগে একটা জন্মে। সে যদি বাপের সামনে এসে আর কিছু না শুধু মাথাটা হেঁট করে একবার দাঁড়াত অমন একগুঁয়ে কত বাপের মন গলে-মলে একাকার হয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।

চারটা সন্তান জন্মে গেল অভাবের সংসারে, পেটে ক্ষুধা লুকিয়ে আলে পাথারে নেচে বেড়াল, বাপ দেখল না। শেষে কিনা যখন চোখের সামনে খাঁ বাড়ির বড়ো মেয়ে পরের বাড়িতে কাম¬¬¬¬লা খাটতে গেল, তখন অপমানে বাপ ভেতরে ভেতরে জমে এমন শক্ত হলো সে খনি শাবল দিয়েও কেউ আর ভাঙতে পারল না।

তো সেই বাপ মেয়ের এত জেদাজেদির যে একটা তীব্র কি কারণ আছে সেটা অনেকেই আঁচ করল।

সবাই বুঝেছিল ওজিফার নিজের পছন্দের বিয়েটাই ওদের বাপ মেয়ের সম্পর্কের কাল হয়েছে। আর তিনটে সুস্থ ছেলেমেয়ের পর এই চার নম্বর ছোটো মেয়েটি যার নাম দুখ্নী সে এত উলটোপালটা দোষে দুষ্ট হয়ে জন্মাল কেন?

প্রশ্ন করলে ওজিফা জবাব দেয়, সে পেটে থাকতে অভাব বেশি ছিল, ঠিকমতো খেতে পাওয়া যায় নি, বাচ্চা পুষ্টি পায় নি, গমের খুঁদ সেদ্ধ আর যবের মোটা রুটি খেয়ে দশটা মাস পার করতে হয়েছে, কেউ দেখার ছিল না?

এসব কথা অবশ্য সে জনে জনে বলে বেড়ায় নি, এতটা ব্যক্তিত্ব হারানো নয়, ওই মাঝে মাঝে বাড়ির পেছনে জঙ্গলে বা দূরে আলের ধারে বসে মা অথবা মেজো বোনটার সাথে বাপকে লুকিয়ে যখন সুখ-দুঃখের দুটো গল্প করত তখন বলত।

আঁচল বাড়িয়ে দিয়ে দেখিয়ে বলত ‘ছোল লাওয়ার একথান চিরা ত্যানা পর্যন্তক আছলনাকো, এই এক আঁচুলতই জোরে পোল্টে সারাদিন, হাগিছে, আঁচুল ধুয়ে আবার এরই মোদে ছোলক থুছি।’

একই পাড়ায় থেকেছে কিন্তু বাপের অনুকম্পা লাভের আশায় ও বাড়ির দিকে কখনও পা বাড়ায় নি, শুধু যখন বাপের বাড়িতে কাটিয়ে আসা সময় ও মানুষগুলোর সাথে শ্বশুর বাড়িরটার বৈষম্য প্রকট হয়ে দাঁড়াত তখন বাড়ির পেছনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কেঁদে বেড়াত।

সেই বাপ মরে গেলে ভাইয়েরা বোনকে তার অংশ দেওয়া তো দূরের কথা বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকতে দিল না। ওজিফাও অংশ চেয়ে ঝামেলা করে নি, তবে বাপের কবর পাড়ে বসে প্রায়ই অভিশাপের মাতম তুলেছে। ওই শাপ জিকির মাতমে কান পাতলে শোনা যায় বাপের প্রতি তার বিষোদগার!

যে বাপ নাকি ঘরের অন্ধকারে তার স্বল্পভাষিণী, নিরীহগোছের মাকে লঘুদোষে লাঠিপেটা করে আধমরা করে ফেলত, আর সেই মাটির মানুষটির কান্না ঘরের দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসত না, শুধু মুখকালো ওজিফা যখন পিতরাজের তেল কাঁসার বাটিতে গরম করে নিয়ে ঘরে ঢুকে যেত বাড়ির লোক টের পেত যে বড়ো বউ আজ হেঁটে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে না আর সেই অপারগতার লজ্জায় লাল হবে।

জিকিরের আরও বিষবাষ্প কবরের মাটি খুবলে মৃতকে আক্রমণ করতে চায় যে কিনা নিজের বয়স্ক বন্ধুর ঘরে দুই সতীনের ওপর মেয়ের বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেছিল। কেন, না গ্রামে নিজেদের ক্ষমতা আরও দৃঢ় হবে তাই। তার রোষরস লেপ্টে যায় ভাইদের গায়ে যারা বাপ মেয়ের দূরত্বের সুযোগ হাতছাড়া করে না।

তো এসব হলো সেই সলতেপোড়ানো যুগের ঘটনা, নানার মৃত্যুর ছয় মাস পর ‘দুখ্নী প্রসব হইল!’

মায়ের শঙ্কিত জরায়ুতে পিতার বেপরোয়া শুক্রাণুর স্বেচ্ছাচারিতায় সৃষ্ট ভ্রুণ দুখ্নী তার মা এবং নিজের জন্য একটি বিষাদময় যন্ত্রণাক্লিষ্ট অধ্যায়। এর আগে আরও তিনটি সন্তান এই জরায়ুতে প্রসারিত হয়ে অন্তিমে দুপায়ে লাথি মেরে শক্তি প্রয়োগ করে সাঁতরে বেরিয়ে গেছে, বেরিয়ে দেখেছে হাড্ডিসার মায়ের বুকে দুধ নেই, মায়ের পৃথিবীতে খাবারের অভাব, ভাতের জন্য থালা পেতে আরও ভাই-বোন ও বাবা জুলজুলে চোখে অপেক্ষা করে।

অনাহুত দুখ্নীর বয়স পাঁচ মাস হয়ে গেলে তার উদাসীন মা টের পেয়েছিল, ‘অ আমেনা তলপ্যটত কি ব্যান সুলসুল করোছে গো?’

‘ক্যা রে বা আরও আগে বুজিসনি ক্যা, ও ওজপ্যা ইঁই কিসের কতা, তে ব’লে তুই তিন ছোলের মাও হোছিন!’

সে বলে, মাসিকের সমস্যা সারাজীবন। দুই তিন মাস পরেও হয় আবার এমনও হয় যে রক্ত পড়তেই থাকে দু তিন মাসে বন্ধ হয় না, সে মনে করেছিল পাঁচ মাস ধরে তাই বন্ধ আছে, তা হঠাৎ পেটে শোল মাছের খলবল টের পেয়ে তো মাথায় হাত, দৌড়ে গিয়ে বসেছিল বাপের কাঁচা কবরের ধারে, আরও একথাল ভাত কোত্থেকে আসবে?

ওদিকে ক্ষুধার্ত পোয়াতির পেট বাড়ে মনে হয় ফুটানি মেরে গরম ভাত ডাল, ভাজি দিয়ে সবেমাত্র সটকে এলেন। কচি আনারস আর কচি তিতা পেঁপে কচকচ করে চিবিয়ে খেল নির্জন পুকুর পাড়ে বসে, আমেনা কবিরাজের ঘর থেকে কি শেকড়-টেকর বাটা এনে খাইয়ে দিল, তাবিজ বাঁধল, কিছুতেই কিছু হলো না, ক’দিন পেটের শোলমাছটা একটু যেন ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে থেকে ফের খলবলিয়ে উঠল আর তাবিজের টাইট দড়ি ঢলঢলে হয়ে গেল।

আর খালি পেটে অম্লরস জমে বুকের জ্বলন্ত আগুন উস্কে রাখে, সেই তাপে উগরে আসে তিতা সবুজ ফেনিল থুথু, বুক-পেটের জব্বর জ্বালা-পোড়া-ব্যাথায় কাতর হয়ে ওজিফা টালমাটাল ঘুরে বেড়াত আড়া-জঙ্গলে, ক্ষেত খামারে; তখন ভারী পেটটার উপর দমাদ্দম কিল ঘুষি মারত, ঘুষি মারত পেটের চামড়ায় হঠাৎ ফুঁসে উঠা ছোট্ট জেলী মাথা সই করে আর নিখাঁদ মনে উচ্চারণ করত, ‘মরে যা, মরে যা তুই।’

 

সাত মাসে যার কিনা তুলতুলে মাথায় রেশমের মতো চুল গজিয়ে গেছে, হাত পায়ের নখে মোটা চামড়ার পরত এসেছে সেকি আর অমরার জল থুয়ে অসময়ে বেরিয়ে আসে! অথচ ওর মৃত্যুচিন্তায় বিভোর মা প্রতি মুহূর্তে স্বপ্ন দেখত তার শাড়ি ভিজে গেছে রক্তে আর সেই রক্তস্রোতের মধ্যে একদলা বর্জ্যরে মতো বেরিয়ে এসেছে বাচ্চাটা। বাচ্চার দলাটাকে ন্যাকড়ায় মুড়িয়ে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছে তারপর পুকুড়পাড়ে বসে সাবান দিয়ে শাড়ি পেটিকোট  ধুয়ে সাফসুতরো পাক হয়ে ঘরে এসে একথাল গরম ভাত পেট ভরে খেয়ে বহু দিনের পরিত্যক্ত ঘুম নামক অনুভূতির মধ্যে ডুব মেরেছে।

তখন ছিল ভরা জ্যৈষ্ঠ মাস, মাঠে ধানের ঢিপি, ধান ঝাড়াই, মাড়াই, বাছাই, সিদ্ধ, শুকানো চলছিল; পরের বাড়ির কাজ সারা দিনমান। ইচ্ছে করে ৩৫/৪০ কেজি ওজনের ধানের বস্তা অবলীলায় কাঁধে উঠিয়ে নিত পোয়াতি আর মনেপ্রাণে চাইত বস্তার চাপে তলপেটের জঞ্জালটা ভুস করে পিছলে বেরিয়ে যাক।

লাভ হয় না বরং রাতের বেলায় কোমড় আর পেটের ব্যথায় ওর একটানা ছান্দিক গোঙানিতে বাড়ির আর সবার ঘুমের চাঁদিতে চাটি পড়ত। বড়ো ছেলে ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় আওয়াজ তুলত, চেঁচায় কিসক, ছোল প্যাটত ধরার সোমে খিয়াল আছলোনা?’

বেড়ার ওধারে চৌকিতে ছোটো ছেলেকে নিয়ে ঘুমায় বাপ সে কষে ধমক দেয়, ‘মুখত লাগাম নাই নাকি, মায়ের সাঁতে এলান একটা কতা, কুজ্যাত্যা ছোলপোল…!’

আর তখন দ্বিগুণ রাগে আর ব্যথার কষ্টে অনাগতকে মারতে শুরু করত ওজিফা।

শেষের দিকে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল, ঠেলে ওঠা কণ্ঠার হাড়ে ময়লা ব্লাউজ লটকে থাকত, আর লাগতো যেন শাড়ি জড়ানো কাকতাড়–য়ার পেটে একটা মাটির কলস বাঁধা। একবার এই কলস নিয়ে পুকুড়ে ঝাঁপ দিয়েছিল সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে; অনেক উঁচু ঘাট থেকে লাফ দিয়েছিল, যদি শূন্যে থাকতে থাকতেই ওটা বেরিয়ে আসত আর ঝুপ করে পড়ে যেত পুকুরে, তখন বিজবিজ করে বুদ্বুদ্ উঠত পানির জমিনে, ওদিকে স্রেফ না তাকিয়ে সাঁতরে পাড়ে উঠে আসত ওজিফা, শাড়িটা চিপে নিয়ে ঘরে ফিরত, তা সেদিনও ব্যর্থ হয়েছিল।

অতঃপর দশ মাস হয়ে গেলে যেদিন প্রসব ব্যথা উঠেছিল আঁতুড় ঘরে কোনো দাই রাখতে রাজি হয় নি সে। এটা ছিল তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত যেহেতু সে কাউকে টের পেতে দিচ্ছিল না ব্যথাটা।

যদিও গ্রামে ভালো দাই হিসেবে ওজিফার নাম আছে, যদিও প্রসবের জটিল মুহূর্তে তার ডাক পড়তে বাধ্য, আমেনা যে কেস হ্যান্ডেল করতে অপারগ হয়ে যায় ওজিফা সেটা চমৎকার হাতের প্যাঁচের মধ্যে নিয়ে নেয়। এমনকি গরু ছাগলের প্রসবের কালেও চিন্তিত গৃহস্থ দ্বারস্থ হয় ওজিফার, নাইবা থাকল ওর হাতে কোনো দুর্ঘটনার রেকর্ড, ‘তা বলেই কোন জ্যাতাভিমান যি তুই নিজের সময় ঘরত কাকো লিবিন না? এ্যর আগে তো কেউ না কেউ আছল।’

ব্যথা উঠেছিল এশার নামাজের ওয়াক্তে, এবারের ব্যথাটা তো আর কাটায় না আল্লা, সে দুহাত কোমড়ে রেখে ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, ঘরে ষাট পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে সেটা সবটুকু অন্ধকার চিপতে পারে নি, স্যাঁতস্যাঁতে বিষণ্ণআঁতুড় খড়ের বিছানা দাই নাইয়োরী শূন্যতার আবহে অবহেলিত।

বড়ো ছেলে আজ মালিকের খোলায় ধানের আঁটির পাহাড়ের ধারে শয্যা পেতেছে, সারাদিন ধানের কাজে পরিশ্রান্ত ঘুমে মৃতপ্রায়। মেয়েটা কিছুক্ষণ পরপর মায়ের খোঁজখবর করে ঘরের দাওয়ায় গিয়ে বসে থাকে, তারও কাজের শরীর ঘুম টুপটুপ চোখ মাথাটা দরোজায়  হেলে পড়ে।

মাঝরাতে যখন চৌকির পায়া ধরে হাঁটু মুড়ে বসেছিল সে টের পেল উরু বেয়ে গরম মোটা পানি গড়িয়ে নামছে তার সাথে তীব্র ব্যথাটা কোমড় থেকে পেটের দিকে তরঙ্গায়িত হয়ে উরুর সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে।

জরায়ুর মুখে হাত দিল, অনেকখানি খুলে গেছে, কয়েকটা পিচ্ছিল চুল আঙুল স্পর্শ করলে ওর স্বস্তি আসে, যাক ওটা ঠিকমতোই নেমেছে।

উত্তরপাড়ার তাছলিমা এই হয়েই মরেছিল, তরতাজা বাচ্চা খলবল করে বের হয়ে এল অর্ধেকটা, ও আল্লা কি কা-, পা দুখান বের হয়ে ঝুলে রইল, ওজিফাকে ওরা ডেকেছিল ভোরের দিকে যখন তাছলিমার জানটা বেরিয়ে যাচ্ছে, তার রং সাদা হয়ে গেছে, ওর প্রসবপথে দাইয়ের নির্যাতন চিহ্ন, মাটির মেঝেতে পশু বলির আলামত, ঘরের ভেতর তিন চারজন বুড়িমাগী গুদুরগুদুর করছে, সাত ঘণ্টা আগে নাকি পানি বেরিয়ে গেছে, ‘আহারে বাচ্চা শুখচরত পড়িছিল মা, গলাত ফাঁস আটকে দোম বোন্দ হ’য়ে ককন ব্যান মরিছে! কবাই পান্না ক্যা বা? আরও গপ্পো শোন, হারামজাদি বুড়িচুদিডা টানাটানি করব্যা যায়ে বাচ্চার একটা হাত ছিঁড়ে ফেলাছে।’

সেদিক দিয়ে বিপদ নাই, মাথাই নেমেছে।

ওদিকে মলের চাপ নতুন অস্বস্তি হয়ে প্রসব বেদনার সাথে সই পাতলো। অভিজ্ঞ ওজিফা সন্ধ্যাতেই সেই ঝামেলা সেরে নিতে চেয়েছিল কিন্তু সে কোষ্ঠবন্ধ নিষ্পত্তিজনক ছিল না। শেষবেলায় না বাচ্চা গু দিয়ে মখামাখি হয়ে যায়। একবার মনে হলো ডাকুক ওরা আমেনাকে, তার দৃঢ় আত্মঅহংকার চুঁইয়ে নেমে যাচ্ছিল প্রবহমান রক্তস্রোতের সাথে, ব্যথাটা মাথার ভেতর অস্বাভাবিক গোলোযোগসম্পন্ন লোডশেডিং আরম্ভ করেছিল ষাট পাওয়ার বাল্বের বিপরীতে।

সকাল দশটায় দেড়খানা লাল রুটি খেয়েছিল গুড় দিয়ে, শরীর তো সকাল থেকেই খারাপ এরমধ্যে গৃহস্থ ভাবী একপাটা আদা রসুন ধরিয়ে দিল, সেই বাটনা বেটে গোয়ালের কয়েকথান গোবর তুলে ঘুটেচাপড়া রোদে দিয়ে বাড়ি ফিরেছিল বিকেলে, একটা বিচি কলা সহকারে কয়েকটা শুকনো চিড়ে ফেলে দিয়ের্ছিল মুখে।

গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না, চিঁচিঁ করে মেয়েকে ডাকে যে দাওয়ায় বসে আকাশের দিকে হাঁ মুখ তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে, ‘গরম পানি আর বেলেট ঠিক কেরে থুস মা ও।’

এইবারে তার স্বামীর ঝিম ভাঙে, সে নড়ে বসে কিন্তু এপারে আসে না, সময় আসন্ন বুঝে আওয়াজ দেয়, ‘এ্যাত্ত জিদ্আলা মাগী মানষের কপালোত দুক্কু আছে কওছি কিন্তুক মুই, আমেনাক ডাকা যাওছে না ?’

দুবার কঁকিয়ে ঝাঁঝ ছিটিয়েছিল পোয়াতি, ‘বন জঙ্গলের মদ্যে আগে মানষের ছোল পোল হয় নি, বকরি কুত্তার ছোল হয় না, তা কে ধরবা যায়? মোর কপালোত যা আছে তা কেউ খ-াবা পারবে? যাই ল্যাকনেওলা তাই লিজেও পারবে না।’

চৌকীর পায়াটা শক্তি দিয়ে চেপে ধরে, নামাজের ভঙ্গিমায় হাঁটু মাটিতে ফেলে পা দুটো বেশ ফাঁক করে একটু উপুড় হয়ে কোঁৎ দেয়, চিড়ার ক্ষীণ শর্করা বশত হোক বা ব্যথার আদিম হিংস্রতা হোক তা শরীরে দুর্দম বন্যতা এনে দিল। তখন সে পেটে হাত দিয়ে ঠেসে নীচের দিকে নামিয়ে দিতে চায় বাচ্চা, নীচের গুম্ফামুখে তাড়িয়ে পাঠায়।

গুম্ফামুখের বিকট হাঁ এ হাত দেয়, নরম তুলতুলে চাদি গোল হয়ে আটকে আছে, থলের পানি বের হওয়া অব্যাহত আছে, একটু ভয় পায় মা, বাচ্চা শুখচরে পড়তে যাচ্ছে, খটখটে শুকনোয় বেশিক্ষণ বাঁচবে না, পেটের ভেতর মারা গেলে বিপদ, নিজের জীবন নিয়ে টানাটানি পড়বে।

ধীরে ধীরে নিজের তর্জনি ও মধ্যমা ঢুকিয়ে দিল পিচ্ছিল নরম গনগনে গরম মাংসের  ভেতরে, আঙুল ঘুরিয়ে জায়গা করে করে এগোবার চেষ্টা করার সময় বুঝতে পারে অন্যেরটা আর নিজের ব্যথার মধ্যে কত ফারাক।

হাত ভরে সরিষার তেল নেয় চপচপে, সেই হাত থরথর করে কাঁপছে, আবার ঢুকিয়ে দেয় তখনই মুখ দিয়ে সাহায্যের আর্তি বেরিয়ে আসতে চেয়েও সামাল হানে। ফেটে চিরে যাচ্ছে যোনিমুখের এক দু জায়গা, আঙুল যত গভীরে ঢোকে চেরাটা বাড়তে থাকে এবার চামড়া কেটে যাওয়া রক্ত চুঁইয়ে বেরিয়ে আসে আর মিশে যায় অমরার রক্তস্রোতে, ফেটে যাওয়া টের পায় না মা কেমন অবশ হয়ে আছে ও দেশ।

এবার সে বৃদ্ধাঙ্গুল সমেত তিন আঙুলে চেপে ধরে বাচ্চার মাথাটা। বাম হাত ধরাই আছে চৌকীর পায়া সেটা ওর হাতের মধ্যে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলেছে আর ডান হাত চেপে ধরেছে যেন শোল মাছের এক মাথা।

মাছ মারা শিখেছিল বাবার কাছে, হেন মাছ নেই সে ধরে নি, না বাপ আর যাই করুক তাকে মেয়েমানুষ করে বড়ো করে নি, সেই পাকিস্তান আমলে জাল নিয়ে শুধু নদীতে চলে যাওয়া নয় বাপের সাথে জমিতে হাল জোড়া, লাঙল দেয়া, ডোঙা দিয়ে পানি সেচা, নিড়ানি মারা সবই করতে হয়েছে বরং সে ঘরকন্নার কাজ থেকে বিরত থাকতে ভালোবেসেছে, আর যে বাপ ছিল গ্রামের অবস্থাপন্ন কৃষক, কলের গান মাইক এমনকি সেকেন্ডহ্যান্ড জিপ পর্যন্ত কিনে শখ মিটিয়ে গেছে; কেউ ভাবতে পারে নি বাপের সহচর এই বড়ো মেয়ে যে কিনা বড়ো ছেলের সমতুল্য ছিল সে বাড়ির বছর কামলার সাথে ভালোবাসা করে পালিয়ে যাবে যতই হোক সে চাকর সুদর্শন জোয়ান।

হাতের মধ্যে ধরা পড়ার পর মাছটা এবার নিজে থেকে নড়ে চড়ে ওঠে, মায়ের হৃৎপি-ের দিকে পা চালায়, বেরিয়ে আসতে চাইছে, তার জলের পুকুরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে, সে মায়ের তিনটি আঙুলের মধ্যে  মুক্তি খুঁজছে।

মাও টানছে, এখন রাত তিনটে বাজে, এতগুলো ঘণ্টা যে রমণী নীরবে তার প্রসব কার্যক্রম চালাচ্ছিল, দাওয়ায় ঘুমন্ত মেয়ে অথবা বেড়ার ওপাশে তন্দ্রাচ্ছন্ন স্বামীও যার নীরব আকুলি বিকুলি, নিজের সাথে যুদ্ধ আঁচ করতে পারে নি, এবারে সে শরীরের অবশিষ্ট শক্তি ব্যবহার করে প্রায় ইচ্ছে করেই একটা গুমোট হিম চিৎকারের সাহায্য নিয়ে নিল। শালতির দড়ির একটি প্রান্ত ধরে নালার ধারে দাঁড়ানো ওই ওজিফা অন্য প্রান্তের দড়ি যেন্ দুখনীর বাপের হাতে? সে দড়িটা ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, নড়ছে না, ওজিফা একাই বারবার ওর পাশটা নামিয়ে দিচ্ছে পানিতে ‘এ নালার পানি সেঁচে ও নালায় ফেলোরে হেঁইও…!’হেঁইও রবে যে টান খাটালো ওজিফা সেই টানে বাচ্চার মাথাটা বেরিয়ে এসে পৃথিবীর বাতাসে ঝুলে রইল।

অদ্ভুত ধৈর্যখেলায় মেতেছে বিকারগ্রস্ত নারী, মধ্যরাতে নানা আসনে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি বৃত্তে এই মুহূর্তে, ছোটোবেলায় তার আঙুলে একটা কাঁটা ফুটেছিল গভীর, সেটা টাইমমতো বের করে না ফেলায় দিন দিন সেখানে বেড়ে উঠেছিল পুঁজ ভরা টসটসে ফোঁড়া, ব্যথায় হাত ফুলে ঢোল, কারো কাছে হাত পাতে না, শেষে বাবা বলেছিল- ‘দেখি তোর হাতত কি হওছে ?’

হাতটা এগিয়ে দিয়েছিল, বাপ সেটা ধরে অন্য হাতে লুকানো ধারালো ক্ষুর দিয়ে প্যাঁচ করে কেটে দিয়েছিল, ওরে বর্জ্য রক্ত কত যে বের হলো, দুইদিনে বেদনা ফিনিশড! তারপরে জীবনে কত কাটা ফাটা ছেঁড়া পোড়া ভয়ডর নেই মেয়ের এতটুকু।

পনের বিশ মিনিট হলো বাচ্চার মাথাটা ঝুলে রয়েছে, গলায় গুম্ফামুখের ফাঁস, বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না ওজিফা, অথচ বাচ্চার কাঁধটা বের করতে পারলেই তার কাজ শেষ। সুবিধা করতে না পারার কারণ খুঁজলে খেয়াল হলো সে হাঁফাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট মতন হচ্ছে, শক্তির মজুত নিঃশেষ হবার দরুন পর্যাপ্ত কোঁৎ দিতে পারছে না, উঠে দাঁড়াতে চেয়েছিল একবার যদি তাতে কাজ হয়, নাহ্ ব্যথা ওর কোমড় আর পা কে জমিয়ে দিয়েছে আর নিম্নাঙ্গে মনে হচ্ছে একটা ফুটবল আটকে আছে। সে যখন হাঁটু গেড়ে বসে গীতের ছন্দে দুলছিল আর কাঁদছিল তখন বাচ্চা নিজের শেষ তাগিদ জানান দিতে একটু মুচড়ে উঠল যখন তার মা রক্তাক্ত পিচ্ছিল হাত দুটো দিয়ে শতাধিক বারের মতো আবারও চেপে ধরেছিল মাথাটা এবং সেইসময় তার উপর ভর করেছিল এক মণ ধান অবলীলায় কাঁধে উঠিয়ে ফেলার শক্তি।

দ্বিতীয় ‘হেঁইয়ো’ধ্বনিতে আর বিফলতা নয় টেনে বের করে দিল দুটো ক্ষুদ্র কাঁধ যা ফালের মতো আটকে ছিল গুম্ফামুখে, ছলাৎ করে মাটিতে পড়ল সুন্দর দুধকমল এক কন্যাশিশু।

সকল দায় থেকে মুক্ত হয়ে পরিশ্রান্ত সৈনিক সুদীর্ঘ সময় শেষে শান্তির পতাকা উড়িয়ে দিয়ে খড়ের বিছানায় শরীর ফেলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিল। বাচ্চাটা দুপায়ের ত্রিভুজ চিপায় গা মোচড় দিচ্ছিল; অবাক হয়ে বড়ো মেয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল ঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা দুটি ভেজা লাল প্রাণীকে।

মা শুধু ক্ষীণ কণ্ঠে জানিয়েছিল, ‘তোর আমেনা ফুবুক খপর দি বা, লাড়ি কোনা কাট্যা দিয়ে যাবা ক আর ফুলকোনা পুঁতে থো মা।’

জন্মের পরেও কাঁদে নি তবুও মা তার নাম রাখল দুখ্নী ।

যত বয়স হচ্ছিল দুখ্নীর সৌন্দর্য ম্লান হয়ে আসছিল, ৫ বছরে পেটটা বেঢপ ফুলে গেল, হাত পা চারটে কাঠির মতো সরু হয়ে গেল, ১৮ বছরে অযাচিত আকর্ষণ হয়ে বিশাল সাইজের দুটি স্তন ভেসে রইল শরীরে। বাড়ি বাড়ি সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বেচে বেড়াতো, সালমা আপা তাচ্ছিল্য নিয়ে বলেছিল, ‘পেটে থাকতে তোর মাকে বলেছিলাম পোলিও টিকার কথা তা সে বলত বাঁচলে বাঁচুক মরলে মরুক, তা এখন সারা জনম একে বয়ে বেড়াও, আহারে জীবনের কষ্ট!’

শুধু কি পোলিও, সাত বছর পর সবাই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছিল যে সে মেয়ে কানে শোনে না এবং বোবা।  দুজন মানুষের ভাত একলাই খেতে পারত এই মেয়ে, খেতে খেতে হাঁফিয়ে উঠত, আকণ্ঠ ঠেসে খেয়ে তারপর উঠে পায়ের ভারসাম্য ঠিকঠাক করে নিয়ে দৌড়ে চলে যেত খেলতে আর তার টালমাটাল চলার পথে কোনো বাধা আসলে ধুপ করে পড়ে যেত।

দুখ্নীর বাবা যে কিনা অলস বসে নিস্তব্ধ নাইলনে কাঠি নেড়ে সারাদিন মাছ ধরার জাল বুনত; সেই নির্বিকার যার প্রতি তার মা ওজিফার সকল অভিযোগ, অনুভূতি শেষ হয়ে গিয়েছিল সে দরদ করে তাকে ডাকত, ‘ওমা দুখ্নী, আসো কাছে আসো, ভাত খাবা মা?’

কি বুঝত নির্বাক, নিঃশব্দ মেয়ে, ঝট করে উঠে বাপের গা ঘেষে দাঁড়াতো ।

দুখ্নীর শরীর পঁচিশ বছরের শাখা প্রশাখায় বাড়ন্ত হলেও বুদ্ধি বিবেচনার বয়স তিনে ঠেকে রইল ।

সমাজের অবাঞ্ছিত এই বয়স্ক শিশুর একটিমাত্র বিশেষ গুণ হলো সে অসম্ভব ঔদার্যের সাথে মানুষকে ভালোবাসে ।

দুখ্নীর সমবয়সীরা জোয়ান হয়ে গেল, মেয়েগুলো সংসার করতে শুরু করে দিল, গ্রামে হাসপাতাল বসল, এনজিও ঢুকল, ঘরে ঘরে টিভি চালু হলো, টিভিগুলিতে ভারতের তারা যোগ অনুষ্ঠানমালাসমূহ সিঁদ কাটল, দুখ্নীর বাবা ততদিনে মারা গেছে, বড়ো ছেলে বিয়ে করে নতুন ঘর তুলে মাঝে বেড়া নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে, মেজো মেয়েকে মামারা ভালো বিয়ে দিয়েছে, তার ছোটো ছেলেটা ঢাকায় থেকে গার্মেন্টে চাকরি করে, সে সামর্থ্যমতো দুতিন মাস অন্তর মা আর এই বোনটাকে কিছু টাকা পাঠানোর চেষ্টা করে ।

এই নিয়ে আঁতুড় গৃহে এখন শুধু ওজিফা আর দুখ্নী বাস করছে।

দুখ্নী  পাড়া বেড়াতে ভালোবাসে, এ বাড়ি সে বাড়ি গিয়ে বসে থাকে, ছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে খেলে; মার্বেল খেলে গুটি খেলে, অপারদর্শী খেলোয়াড় দ্রুত গুটিহারা নিঃস¦ হয়ে মাতাল পদক্ষেপে দৌড়ে দুলে ঝুলে ফিরে আসে বাড়িতে। মামাদের বাড়িতে গিয়ে নিমগ্ন মনোযোগে হাঁ করে চেয়ে থাকে ভারতের তারাযোগ কেন্দ্রের শাড়ি গহনা বিজ্ঞাপিত হিংসাত্মক ও কূটনৈতিক ভিত্তিক ঝক্ঝকে রঙিন নাটকের দিকে।

সেই মেয়ে কদিন যাবত সব কিছু বন্ধ করে ঝিম মেরে বসে আছে, রুগ্ন চোখ শুন্যে পাঠানো, খাবার সামনে দিয়ে লাভ হচ্ছে না ধরেই না, দু-চারবার করে বমি করছে, নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে কাঁথা বালিশ লেপ্টে।

মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার দেখে বলল মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা।

গোটা গাঁয়ের আবাল বৃদ্ধ যুবক লিঙ্গধরের উপর স্রেফ রাগে অন্ধ হয়ে গেল ওজিফা। দুখ্নীর চুলগুলো মুুঠিতে নিয়ে মাথাটা ওখানেই ডাক্তারের টেবিলের উপর ঠেসে ধরে, এলোপাথারি মার থামে না যদি না ডাক্তার হুঙ্কার দিয়ে থামায়, ‘পাগল মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে না পারলে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো না কেন, বারবার তার পেটে বাচ্চা আসে কেন।

অ্যাবরসন রুম চেনে দুখ্নী, প্রথমে স্টিলের ঠান্ডা ট্রলিতে ওরা শুইয়ে দেবে তাকে, পা দুটো কষে বাঁধবে, এরপর তীক্ষ্ণযন্ত্রণায় বিদ্ধ করতে থাকবে, সে বোঝে না ওরা কেন ওর নি¤œাঙ্গে এভাবে খোঁচা দেয় আর তখন তারা মুখ শক্ত করে রাখে রাগত চোখে তাকায়, উরুতে ঠাসঠাস চড় মারে। সে চিৎকার করে কাঁদতে পারে না শুধু মরচে পড়া দরজার মতো গলা দিয়ে ফ্যাঁসফ্যাঁস করে আওয়াজ বেরিয়ে আসে।

ডাক্তার তথ্য দিল, কষ্ট কম করতে চাইলে টাকা বেশি মানে অজ্ঞান করা হবে সে কিছু টের পাবে না। মা শুধু নির্বিকার উত্তর হানে, ‘যত্ত তাড়াতাড়ি পারবিন যত জোরে পারবিন টান দে ব্যার কেরে ফেলান।’

সাঁঝে দুখ্নীকে নিয়ে বাড়ি ফিরবার পথে যাকেই চোখে পড়ছিল ধর্ষক বলে মনে হচ্ছিল ওজিফার, যেন মিটিমিটি শয়তানি ভরা চোখে মা মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে তারা, যেন বলে যাচ্ছে, ‘আবার বীর্য ফেলব ওর গর্ভে তারপর আনন্দের শীৎকার তুলব, ও সরু হাত দিয়ে বাঁধা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে আর ক্রন্দনরত অবাক চোখ মেলে ধর্ষকামীর অশ্লীল কর্মকা- দেখতে দেখতে ব্যথাতুর নিম্নাঙ্গ খামচে ধরবে।’ঘরে ঢুকে দুখ্নীকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে মা অতঃপর সারাদিনের দমিত বিষণ্ণতা কান্নায় রূপান্তর, চুলোয় হাড়ি চড়লো না, ঘরে খাবার নেই, ঘরের সেই একইকোনে জলন্ত আছে ষাট পাওয়ারের বাল্বটি, ঘরভর্তি স্যাঁতস্যাঁতে মৃত্যুস্তব্ধ নিঃসঙ্গতা, বিছানায় বসে কঁকিয়ে কঁকিয়ে ইশারায় খাবার চাইছে বোবা, শরীর নির্ভার হওয়ার পরে তীব্র রুচি ফিরে এসে ভয়ানক ক্ষুধা চেপে ধরেছে তাকে ।

খাবার দেয়া দূরের কথা মাঝরাত্রি পর্যন্ত সেইখানেই চেপে বসে থাকল ওজিফা, কাহিল মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে অনেকক্ষণ, মাঝে মাঝে ক্ষুধায় নড়েচড়ে উঠছে।

দীর্ঘ রাত্রি ধরে দুশ্চিন্তার প্রসব বেদনায় নিমজ্জিত থেকে শেষে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চায় মা যে ওর শরীরে যার বা যাদের হাত পড়ে তাদের কি আরও যৌনসুখ পাইয়ে দেবার জন্য দুখ্নীকে এই পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখবে নাকি আজ রাতেই মেরে ফেলবে ?

বার দুয়েক উঠে এসে মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে থাকল, বাকি ৩ টার চেয়ে এর প্রতি মায়া বেশি, মায়ের একটু কষ্ট দূর করার জন্য কতই না চেষ্টা করে দুখ্নী, থরোথরো হাতে পেঁয়াজ রসুন তরকারি কেটে দেয়, মায়ের কাপড় নিয়ে পুকুড়ে কাচতে যায়, ধুয়ে এনে সাবানের ফেনাশুদ্ধ সেই কাপড় চাপাচুপি করে রোদে মেলে দিয়ে মাকে ডেকে দেখায়।

নাহ্ এত মায়া লাগলে হবে না, এক কাজ করলে হয় তুলে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ফেলে দেবে? তা সে পাগলী তো সাঁতার জানে। বালিশ চেপে ধরলে হয় মুখে, সহজ হয় বিষ খাইয়ে দিলে, তা সে ভারী তড়পায় গো, দেখেছে সহজে জান বের হতে চায় না একদিন দুইদিন পার হয়ে যায় মাথা খারাপ হয়ে থাকে, কাউকে চেনে না, মুখ দিয়ে গেঁজলা ওঠে। শিউরে ওঠে মা না না এত কষ্ট দিয়ে মারা যায়!

যাকে জন্মেরও বহু পূর্ব হতে হত্যা করে চলেছে ওজিফা আজ সফল হবেই এই ইচ্ছায় অতঃপর বালিশটাই তুলে নেয় হাতে, ধীর স্থির ভাবে এগিয়ে আসার সময় মেঝের ওই জায়গায় চোখ যায় যেখানে খড়ের বিছানায় রক্তমাখা ছানাটা লতপত করছিল, লালের আবডালেই উঁকি দিয়েছিল ধবল তা সবার মনে এনে দিয়েছিল মুগ্ধতা, সেই ধবলে গ্রহণ লেগে আঁধার ছড়িয়েছে, গ্রহবিষ্টা গ্রহণের সময় এখনও দূর, তাই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে উদ্যত হলো মা।

বালিশটা নরম হলে সুবিধে হতো, টেট্রন আবরণের সিটকে বালিশ তেল চিটচিটে, না হয় ভাঁজ না গাঁথে মুখ শুধু পিছলে যায়, দুবার ধস্তাধস্তি  হতেই মেয়ের ঘুম ভেঙে যায়, ধরা খেয়ে নিশ্চুপ ওজিফা, বোবার রাগ বেশি, সে পায়ে দুটো আছাড় মেরে উঠে বসে, লাল চোখ মেলে মাকে শাসায় খাবার দেয় নি বলে সেই রাগে মায়ের হাত থেকে বালিশটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে, টিনের জগে গিয়ে আছাড় খেল বালিশ, ঝনঝন শব্দ তুলে জগ আর গেলাসটা মাটিতে গড়াতে থাকল, সেই শব্দে চৌকির তলায় শুয়ে থাকা বিড়ালটা উঠে দৌড় দেয় ছাদের দিকে সেখানে টিনের চিপায় অনড় তুলো হয়ে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরের খোঁজ পেয়ে শুরু হয়ে গেল ওদের তৎপরতার ধুপধাপ আওয়াজের ঢোল, আর দুখ্নী মুখ খিঁচিয়ে তার অনর্থক শব্দাবলি দিয়ে মাকে গালি দিতে শুরু করল।

হঠাৎ নিঃসঙ্গ ঘরটা সরব হয়ে বেঁচে উঠল। সেখানে বেশ কয়েকটা জীবনের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে করতে নিঃশব্দে চোখে জল ভরে উঠল ওজিফার। জল ঝরে গেলে চোখের পরিষ্কার আয়নায় বিম্বিত হলো একটা ময়লাটে সরকারি রশিদ বই যেটা বালিশের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে যার মলাটের উপর লেখা আছে ‘অসচ্ছল প্রতিবন্ধীর ভাতা পরিশোধ বই।’তার পাতায় টিপসই দিয়ে দুখ্নী মাসে ৩০০ টা টাকা পায়।

বইটা যত্নকরে আঁচলে মুছে কাঠের তাকে তুলে রাখে মা তারপর দুখ্নীর পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে গাইতে থাকে,

আয় নিন্দ ও, বায় নিন্দ ও,

কলা বাদুড়ের ছা ও,

কলা খাবো না কলা খাবো না

কলসি কিনে দাও

কলসির মধ্যে ঢোঁড়া সাপ

তেড়ে এলো বউয়ের বাপ।

আয় নিন্দ ও…বায় নিন্দ ও…।

Facebook Twitter Email